নীতিহীন রাজ পর্ব ৬৯
আশিকা আক্তার সোহাগী
“খোলা চোখেও অনেক সময় দৃষ্টি থাকে না।-সমরেশ মজুমদার।”
ঠিক তেমনই চোখের সামনে সুন্দর স্বাভাবিক মুখের মানুষের যে কত কুৎসিত রুপ থাকতে পারে ,সেটা খোলা চোখ দিয়ে দেখেও বুঝা যায় না।নিবিড় পাকা সকালে দামী মার্বেল পাথরের ফ্লোরের লম্বা করিডোর দিয়ে গমগমিয়ে হেটে গিয়ে মাইমুনার দরজায় নক করে।মাইমুনা ইদানীং নূর ম্যানসনেই বেশি থাকে।
দরজা খোলে নিবিড়কে দেখে নিজের এলোভাব হাত দিয়ে ঠিক করার চেষ্টা করে। সদ্য ঘুম ভেঙে উঠে আসায় সারা মুখে ঘুমের ছাপ।নিবিড়ের গম্ভীর মুখে দেখে মাইমুনা হাঁসার চেষ্টা করে।নিবিড় ডানেবামে না ঘুরিয়ে সরাসরি বলে,
‘আজকের পর থেকে তোকে যদি আমার চোখের সামনে দেখি ,তবে তোর হাজবেন্ডের জাল টাকার ব্যবসা এক্সপোজ হয়ে যাবে।ফ্যাশন শো নামে সেটার পেছনে মডেলদের দিয়ে শিল্পপতিদের টোপে ফেলানোর কাহিনী মিডিয়া জেনে যাবে।গুলশানের শোরুমটা যে তোরা ক্ষমতার জোরে অবৈধ্যভাবে দক্ষল করেছিস সেটাও আসল মালিক জেনে যাবে।এখন চিন্তা কর কি করবি?’
মাইমুনা নিচু হয়ে চোখের পানি ফেলে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করে বলে,’আমি কি করেছি ভাইয়া? হঠাৎ এইসব কথা কেনো বলছো?’
‘লতা মাসি আর তুই দিনে তিনবার আমাদের রুমের সামনে কেনো যাস?তোর মনে প্রতিশোধের স্পৃহা জ্বলে সেটা কি ভেবেছিস আমরা জানি না?এই বাড়ির কেউ ঘাসে মুখ দিয়ে চলে না।বাক্স পেট্রা নিয়ে আজ যে শ্বশুরবাড়ি যাবি ,উইদাউট এনি ইনভাইটেশন এমুখো আর হবি না।এবং এই বাড়ির কোন সদস্যের যদি সন্দেহ জনক কোন ক্ষতি আমি দেখি তবে সেটার রিয়েক্টশন তোর উপরেই পড়বে।’
‘আমি….’
‘শাট আপ লাইয়ার। তোর নানী যে তুকতাক করতো সেটা এখন তোর বড় মামি করে আমি খুব ভালো করেই জানি।আসলে সাপের বাচ্চা সাপই হয়।তোর মা আর তোর বাপের লোভের কারণে নূর ম্যানসনের আজ এই হাল।ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেও আজও আমাদের দোষ দেয়া বন্ধ কর।মনে মনে যদি এটাকে নিজের বাড়ি নাই ভাবিস তবে আর জীবনেও এই মুখো হবি না।মনে থাকবে? ‘
ধমকে উঠে নিবিড় প্রস্থান করে সেখান থেকে।ঈষৎ কেঁপে উঠে মাইমুনা।নিচু হয়ে চোখের পানি মুছে মনে মনে বল,’যাবো তো অবশ্যই সব জ্বলিয়ে পুড়িয়ে তবেই..”
ছয়দিন পর নির্বাচন। কিন্তু ক্যাম্পাসে পোষ্টার ছেড়া নিয়ে দুইপক্ষের মাঝে হাতাহাতি হয়েছে।একটা কফির ক্যান হাতে নিয়ে ছুটলো নিবিড় ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে। প্রতিদিন প্ল্যান চেঞ্জ হচ্ছে তাদের।আপাতত জিতার উদ্দেশ্য বিভিন্ন প্ল্যান করছে।ইতিমধ্যে কয়েকজন প্রিজাইডিং অফিসার কিনা হয়ে গেছে।তাদের অনুকূলে আছে চারটা ইউপি পরিষদ।বাকিগুলাতে প্রচুর প্রচারণা চালাচ্ছে। আর নিচ দিয়ে টাকা ঢালছে।
সাভারে ইউনিয়নে মামুন ইসলামের রুপে রুপক মন্ডল অত্যাধিক জনপ্রিয়। কিছুদিন আগে রুপক মন্ডল নিবিড়ের গুনগান গেয়ে বিভিন্ন সভা সমাবেশ করেছে।নিবিড় অবাক হয়নি।এটা উনার বাহ্যিক ব্যবহার। সমালোচনা এড়িয়ে চলার দ্বায়ে এইসব লোক দেখানো নাটক অহরহ পলিটিশিয়ানরা করে থাকে।
আজকাল নিবিড় পারিবারিক প্রাইভেট কারটা ব্যবহার করে। ফোর্ড ফ্যালকনের মডেলের বডি সেডানের এই গাড়িটা এতটাই ক্লাসি যা একদম নিবিড়ের সাথে মানানসই।সাথে একটা মেজর সানগ্লাসের কারণে একদম মাখন।আগে ছিলো ছাত্রনেতা এখন পাক্কা পলিটিশিয়ান হওয়াই মাঠের থেকে সোসাল সাইটেই বেশি ভাইরাল।নিবিড়ের ডিজিটাল টিমের জরিপে সকল যুবতি মেয়েরাই একচেটিয়া নিবিড়কে ভোট দিবে।ওরা এসব নিয়ে যে খুবই মাস্তি করে সেটা নিবিড় দেখেও দেখে না।এসব অসভ্য হ্যাংলা ,সস্তা মেয়েদের দেখলেই ওর চ*ড়াতে ইচ্ছা হয়।ভাগ্যিস জিয়ানা ছিলো তানাহলে তাবদ দুনিয়ার সকল মেয়েকে সে এক নিক্তিতে ফেলতো।
মাঝরাস্তায় আকাশের ফোন আসে।নিবিড় ব্লুটুথের সাহায্যে কথা বলা শুরু করে ,
‘বল’
‘ভাই সামির অবস্থা এখন স্ট্যাবল।কিন্তু ওর গালাগালি আমার সহ্য হয় না।গাইড়া না ফেলি?’
‘আজকেই শেষ সহ্য করার দিন।আর একটু ধৈর্য্য ধর। ‘
গাড়ি ইউটার্ন নিয়ে আবার নূর ম্যানসনের রাস্তা ধরে মক্কুকে ফোন দেয় নিবিড়।
‘ক্যাম্পাসের ঝামেলা মিটা।এদিকে আমার আরেকটা জরুরী দরকার পড়ে গেছে।আর হ্যাঁ মামুকে বলিস আমার মেডিক্যাল ডকুমেন্টস দরকার পড়লে আমার কাছেই চাইতে।অহেতুক জনে জনে জিজ্ঞেস করার কি দরকার? ‘
‘আমি এখন আর উনার সাথে কথা বলি না ভাই।’
‘কেন তোর না খুব খাতিরের লোক?’
‘উনি পলিটিক্সে জড়ানোর আগে আপনার খোঁজ খবর নেয়ার সুবাদে আমার সাথে কথা হইতো।এর বাহিরের কিছু তো না?’
‘ক্লাবে গিয়ে সুমনকে ছোটখাটো একটা ভয় দেখাবি।প্রচারণার আর মাত্র চারদিন যত উড়তে পারে পারুক।’
বলেই খট করে লাইন কেটে দেয় নিবিড়।
সোফায় বসে টি-টাইম স্পেন্ড করছে নূর ম্যানসনের সবাই।জিয়ানা এখনো ঘুমে।সাফা এখানে বেশি থাকে না।তাদের বাড়ির কাছে একটা ন্যাশনাল কলেজে অনার্সে ভর্তি হয়েছে।রাফিন দুইদিন গিয়ে খোঁজ নিয়ে এসেছে।
অন্যদিকে মেহেদী এখন যত রাতই হোক বাড়ি ফিরে আসে।কিন্তু ড্রিংক্স ছাড়েনি।প্রতিদিন গালিগালাজ করতে করতে রুমে ঢুকে।রেবেকা ছেলের অপেক্ষায় বসে থাকে মধ্যরাত পর্যন্ত। যতক্ষন মত্ত থাকে ততক্ষন ফারহানা যত্ন করে মেহেদীর।ড্রেস চেঞ্জ ,রাব করে মুখ পা পরিস্কার করা টক খাইয়ে হ্যাংওভার কমানো সবই করে।কিন্তু বাকি সময় একেবারেই এড়িয়ে চলে।প্রশ্নের উত্তর হু না তেই শেষ করে। জিয়ানার ট্রিপস জাদুর মতো কাজে দিয়েছে।ফারহানা ইদানিং তাদের পারিবারিক ব্যবসার দেখেশুনা শুরু করায় ব্যস্ত থাকে বেশি।সপ্তাহ খানেক আগে একটা সরকারি ঝামেলায় পড়েছিলো। মেহেদী আগ বাড়িয়ে গিয়ে সেটা মিটিয়ে এসেছে।ফারহানা সেটার জন্য একটা ধন্যবাদ দেয়নি দেখে ফিজানকে বলেছে ‘তোর মম একটা এস্কেপিস্ট। ‘
মেহেদী ইউএসে ব্যাক করবে নাকি করবে না এটা আদৌ বুঝা যাচ্ছে না।তার মতিগতি ছোটবেলা থেকেই বাউন্ডুলে।কিভাবে যেনো শুধু পড়াশোনার ক্ষেত্রে অন্যরকম।
রাফিন প্রশ্ন করলো,’তোর মতিগতি তো কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।তুই কি আর ব্যাক করবি না?’
মেহেদী নির্লিপ্ত ভাবে উত্তর দেয়,’না’
‘কেন?এখানে তবে কি করবি?’
মেহেদী বাঁকা হেঁসে বলে,’বাচ্চা পয়দা করবো।এত বড় বাড়ি একটা মাত্র বাচ্চা।কেমন খা খা করছে চারপাশ।’
‘ভাগ্যিস আমার গালি আসে না। তানাহলে তোকে গালি দিয়ে মে*রে ফেলতাম।এইদেশে তোর উপযুক্ত গবেষণা কেন্দ্র পাবি না।এখানে সব ভংচং চলে।নিজের সময় নষ্ট করিস না।’
মেহেদী চায়ের কাপ টি-টেবিলে রেখে সোজা হয়ে বসে বলে,
‘থোরিয়ামের নাম শুনেছিস?এটা শুধু একটা রাসায়নিক উপাদান না।এটি একটি শক্তিশালী ও নিরাপদ পারমাণবিক জ্বালানি। বিশ্বব্যাপী গবেষকরা থোরিয়াম ভিত্তিক রিঅ্যাক্টর নিয়ে কাজ করছে।এটার জন্য হিউজ বাজেট পাস করা হয়েছে।এই গবেষণা যদি সফলতা পায় তবে একটা টেনিস বল সমান থোরিয়াম একটা মানুষের সারাজীবনের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ করবে।এই চমৎকার গবেষণায় আমিও একজন সক্রিয় সদস্য ছিলাম। ‘
‘ছিলি?’ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করে রাফিন।
‘আমার রেফারেন্সে একজনকে দেশ থেকে নিয়ে গিয়ে আমার গ্রুপের প্রোজেক্টে তাকে এড করি।আমার ইউনিভার্সিটির জুনিয়র। ছেলেটা হার্ডওয়ার্কার আর আমাকে অনেক বছর থেকেই রিকুয়েষ্ট করে আসছিলো।তাই আমার এসিস্ট্যান্ট পদের জন্য যখন ল্যাব থেকে চয়েস দিলো।সবার আগে এই ছেলেটার কথায় মাথায় আসে।তারপর থেকে আমার আন্ডারে কাজ করছিলো। সবই ঠিকঠাক চলছিলো।কিন্তু ডেটের আগের দিন রাতে ফাইনাল প্রোজেক্টটা সে নিজে ফুল ক্রেডিট নিয়ে জমা করে।বাহিরের দেশে সিস্টেম কড়াকড়ি। যেহেতু সে আমার আন্ডারে ছিলো আর জমা দেয়া থেকে শুরু করে পুরো কাজ আমার করার কথা ছিলো তাই তারা সেটা রিজেক্ট করে দেয়।আমার তিনবছরের পরিশ্রম একমুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়। এরপর সেখান থেকে রিজাইন দিয়ে চলে আসি।’
রাফিনের চোখ বড় হয়ে যায়।জিয়ানা সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সম্পুর্ন কথাটা শুনে।কড়া একটা ঘুম হয়ে শরীর বেশ পাতলা লাগছে তার।বাকিটা সিঁড়িটা নামে আর ভাবে,
নিবিড় ,রাফিন আর মেহেদীর মাঝে যে একটা আঁতাত চলে সেটা বাড়ির কেউ এখনো জানে না।এরা সবার সামনে আগের মতোই চলাচল করে। জিয়ানার ধারণা এরা বাড়ির কোন সদস্যকে সন্দেহ করছে।
পানি খাওয়ার সময় হঠাৎ মেহেদীর দিকে চোখ গেলে ,জিয়ানার মাথায় একটা নিস্পৃহ কষ্ট খেলে যায়।জিয়ানা যাকে ভেবেছিলো আগাগোড়ায় একটা পারভার্ট।নিয়তির কাছে কেমন ধরাটা খেয়ে বসে আছে দেখো।যা কল্পানাতীত।মানুষের শরীরের চামড়াটা যেমন অসংখ্য র*ক্তনালীর এলোমেলো আঁকাবাঁকা বিচ্ছিরি সিনারি ঢেকে রাখে। তেমনই সহজ সুন্দর আচরণ দিয়েও নিজের সমস্ত ব্যার্থতা,কষ্ট আর ঠকে যাওয়ার করুন পরিনতি গুলাও ঢেকে রাখে।আট কুঠুরির নয় দরজার এই শরীরের প্রতিটা লোমকূপের একটা করে গল্প আছে।আছে সফলতা আর ব্যার্থতার কাহিনী। এখানে নটে গাছ মুড়োয় না আর গল্পও ফুরায় না।দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সোফার দিকে আগায়।
সিঙ্গেল কাউচে বসে রাফিন আর মেহেদীর জ্ঞান মূলক কথাবার্তা শুনে চলেছে জিয়ানা।সবই কিসব পারমাণবিক গবেষণা হাবিজাবি। হঠাৎ জিয়ানা জিয়াউলের সঙ্গের অভাব খুব অনুভব করলো। অভিমান হলো হঠাৎ। নিজের মেয়ে হলে নিশ্চিত নিজে থেকে খোঁজ খবর নিতো।
মেহেদীর নজর জিয়ানার দিকে পড়তেই চোখ কপালে তুলে জিজ্ঞেস করে ,’ব্যাপার কি? কি কুমতলব মনে মনে পাকাচ্ছো?শরীর স্বাস্থ্যের যা হাল হচ্ছে দিন দিন মানুষ ভাববে আমরা খেতে দেয় না?’
জিয়ানা চোখ ছোট ছোট করে তাকায় দেখে রাফিন মেহেদীকে বলে,’ওকে না খুচালে তোর চলে না? দেখছিস মেয়েটা অসুস্থ? ‘
‘ওর সেদিনের কান্ডজ্ঞান মনে পড়লেই ইচ্ছা করে চ*ড়িয়ে লাল করে দেয়। বেয়াদব। ‘
জিয়ানার নাক ফুলে উঠে।এই অসভ্য লোকটার জন্য একটু আগে তার মায়া হচ্ছিলো? ঠিক আছে একে বিট্রে করে উচিত কাজ করেছে।ফালতু আদমি।কিন্তু মুখে কিছুই বলতে ইচ্ছা হলো না।শুধু বিরক্ত করার জন্য জিয়ানা চোখ মুখ উল্টে ব্যাঙ্গিয়ে বলে ,
‘জঁণণীইই’
সাথে সাথেই মেহেদীর বারুদের ঘরে আগুন জ্বলে উঠে।উল্টো ঘুরে জিয়ানার মুখোমুখি হয়ে প্রশ্ন করে,’বড় মানুষের সাথে কেমন ব্যবহার করতে হয় সেটার নূন্যতম জ্ঞানও কি তোমার নেই নির্বোধ মেয়ে মানুষ কোথাকার?’
‘বয়সের অনেক ছোট একটা মেয়েকে প্রথম দেখায় কিরুপ আচরণ করতে হয় সেই জ্ঞান আপনার নেই ব্রুটাল ছেলেমানুষ কোথাকার।’
‘এত ঝগড়ুটে মেয়ে আমি আমার বাপজন্মে দেখিনি।’
‘আমিও আপনার মতো দেখতে শুনতে পুরুষের গ্রাম্য কাইজ্জাখুন্নি ব্যাডির মতো কাইজ্জা করতে দেখি নাই।’
‘ভাষার কি শ্রী?’
‘সেইম টু ইউ।’
ফিজান এদের দুইজনের ঝগড়ায় বাঁধা দিয়ে বলে,’পাপা হোয়াট ইজ কাইজ্জা?’
‘সেটা তোর এই ঝগড়ুটে চাচিকে জিজ্ঞেস কর।’
‘লাটের ব্যাটা থাকিস বাংলাদেশে অথচ দেশের কিছু জানিস না?অবশ্য জানবি কেমনে তোর তো কোম্পানি নিজেকে আম্রিখান মনে করে।’
‘আম্রিখান?’
ফিজান হেঁসে জিজ্ঞেস করে। জিয়ানা হাই ফাইভ করে বলে ,
‘হ্যাঁ।তোর বাপ প্রায় বলে শুনিস নাই ‘আ’ম ঠোডালি ফাইন।সারাজীবন শুনে আসলাম টোটালি ফাইন। এখন নতুন করে শুনি ঠোডালি।’
এইবার ফিক করে মেহেদীও হেঁসে দেয় জিয়ানার অঙ্গভঙ্গি দেখে।ঢং কিংবা জড়তা ছাড়া একটা মেয়েকে সহজেই বন্ধু ভাবা যায়। ভেতরে ভেতরে একে অন্যের উপর দয়া মায়া দেখালেও কিন্তু প্রকাশ্যে মেহেদী আর জিয়ানার সম্পর্ক দুই সতীনের মতো।রাফিন ,ফিজান আর মেহেদী ঘর কাপিয়ে হাঁসা শুরু করে। দোতলা থেকে ফারহানাও হাঁসে এদের দেখে। ভেতরে রেবেকা সবার হাঁসির শব্দ শোনে কেঁদে উঠে।আর কুলসুম চোখ মুদে খাটে হেলান দেয়।মনে মনে প্রার্থনা করে
‘কালো মেঘ এই বাড়ির উপর থেকে কাটিয়ে দাও খোদা।মানুষ গুলাকে শান্তি দাও।রাহুর দশা কাটায়ে দাও রহমানুর রাহিম।’
সবার এই সুখ সহ্য হয় না মাইমুনার।লাগেজ গুছিয়ে সেটাকে রুমে রেখে হনহনিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে যায়।
হিউম্যান সাইকোলজি বলে “ইউর লাভ ল্যাঙ্গুয়েজ ইজ সামথিং ইউ ডোন্ট রিসিভ এজ আ চাইল্ড।”
মানুষ ছোটবেলায় যে জিনিসটা পায় না ,সেই জিনিসটাই প্রিয়জনের কাছে আশা করে।নিবিড়ও সেইম।সে শান্তি পায়নি তাই জিয়ানা তার একদন্ড শান্তি।বাসায় এসে যদি জিয়ানাকে নিজ কক্ষে যদি না পায় তার মাথা আওলাঝাওলা হয়ে যায়।
বিছনার উপর ফোন পড়ে আছে।নিবিড় বের হয় রুম থেকে।সিঁড়ির কাছে আসতেই জিয়ানার আর্তচিৎকারে নিবিড়ের প্রাণ ছলকে উঠে। মনে হলো আত্মা দেহ ত্যাগ করে কয়েক ইঞ্চি উপরে উঠে গেলো।
অপরদিকে জিয়ানা ফিজানের কিডস জোনের দরজায় দাঁড়িয়ে স্তম্ভিত। গলা ছেড়ে চিল্লিয়ে উঠে।
কিছুক্ষণ আগে,
ঘুম থেকে উঠে তাহানী সোফায় ফিজানের পাশে বসে তার গেম খেলা দেখছে।রাফিন আর মেহেদী এখন নেই।তাহানীর মনে হয় বোরিং লাগছে ফিজানের গেমটা।তাই মুখ কুচকে জিজ্ঞেস করে ,
‘ফিজু ব্রো এটা ভালু না।চলো আমলা হাইড এন্ড সি খিলি?’
‘নো।’
‘ড্যাড বলেছে”যালা বিশি বিশি ফুন দিয়ে খিলে তালা বল হয় না।’
‘তোর এই ত্যা ত্যা কথা বন্ধ করবি তাহু?আর তোর ডাড মনে হয় বেশি বেশি ফোন দেখেছে তাই বড় হয়নি।আমার ড্যাড আর চাচ্চুরা কত্ত বড় দেখিছিস?’
জিয়ানা ম্যাগাজিনে চোখ রেখে এই দুই পুচকার কথা শুনছে।ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড হাঁসি পেলেও চুপচাপ বসে থাকে।তাহানী আবার বলে,
‘আমাল ড্যাড ব্যাড।ইই জন্যু বল হয়নি।’
ফিজান ফোন রেখে তাকিয়ে বলে,’ড্যাডকে ব্যাড বলতে হয় না তাহু।পাপ হবে।কি করেছে আংকেল?’
‘রাতে ড্যাড মমের উপর পি করেছে।’
‘তোর ড্যাড কি তাহা বেবি? ‘
‘উমহু ড্যাড ব্যাড এইজুন্যু মমের উপর পি করে দেয় রাতে যখন পি পায়।’
ফিজান তাহানীর মাথায় টোকা দিয়ে বলে,
‘বড়রা ওয়াশরুমে পি করে বুদ্দু। তুই জানিস না।চল আমরা সিআইডি সিআইডি খেলি?’
‘ওকি।’
বলে দুইজনই দোতলায় ফিজানের খেলার রুমের দিকে যায়।
জিয়ানার হাত থেকে ম্যাগাজিনটা টুপ করে খসে পড়ে। মুখ ধরে হাঁসি চেপে রেখে উঠে পড়ে সেখান থেকে। কে বলে বাচ্চারা কিছু বুঝে না?বাচ্চাওয়ালা দম্পত্তিদের এইজন্য বিশেষ সতর্ক থাকা উচিত।
রুমে ঢুকেই ক্যাম্পাসের জন্য ব্যাগ রেডি করার পর জিয়ানার মন হলো সিআইডি খেলা আবার কি।বাচ্চারা কি খেলছে সেটা মাঝেমধ্যে চেক করা উচিত ভেবে কিডজোনের দিকে আগায়।
অপরদিকে ফিজান একটা খেলনা বন্দুক তাহানীর হাতে দিয়ে অন্যটা নিজের কোমড়ে গুজে রেখে তাহানীকে বলে,
‘লেটস ফাইন্ড দ্যা ডেডবডি?’
‘কোতায় পাবো?’
ফিজান কিছুক্ষন চিন্তা করে বলে ,
‘চল তাহা বেবিকে আমরা ডেডবডি বানিয়ে খেলি। ও না ঘুমাচ্ছে?’
তাহানী খুশি হয়ে মাথা নাড়ায়।ফিজান একটা মাজারি সাইজের ব্যাগ থেকে মাল্টিকালারের বল ফ্লোরে ঢেলে সেই ব্যাগ নিয়ে মাইমুনার রুমে যায়।ঘুমন্ত তাহাকে সেই ব্যাগে ভরে চেইন আটকে দেয়।সেই ব্যাগ কিডজোনে এনে অন্য খেলনার ব্যাগের আড়ালে লুকিয়ে রাখে।
জিয়ানা যখন দরজায় তখন ফিজান কেঁদে কেঁদে চেইন খোলার চেষ্টা করছে।জিয়ানা চেইনের অল্প ফাঁক দিয়ে বাচ্চার আঙুল দেখে চিৎকার দিয়ে দৌঁড়ে যায়।পুরাতন ব্যাগ হওয়াই চেন আটকে গেছে।ভেতরে তাহার কোন নড়াচড়া নেই।জিয়ানার চিৎকারে বাড়ির সবাই দৌঁড়ে আসে।সবার আগে নিবিড়।
নিবিড় এসেই টান দিয়ে ব্যাগ ছিঁড়ে ফেলে।তখনই বাড়ির অন্যান্য সবাই উপস্থিত হয়।ভেতর থেকে নিথর ঘামার্ত তাহার শরীর বেরিয়ে আসে।নিবিড় কালক্ষেপ না করে ফ্লোরে শুয়ে দিয়।তৎক্ষনাৎ নাক চেপে ধরে মুখে অক্সিজেন দিয়ে বুকে দুই হাত দিয়ে সিপিআর দিতে থাকে।
বাড়ির সবাই স্তব্ধ। রাফিন এম্বুলেন্স কল করে দ্রুত।মাইমুনা বড় বড় চোখে তাকিয়ে।জিয়ানা হাত পা ঘষে যাচ্ছে অনবরত। নিবিড়ের ঘাম ছুটে যায়।মাইমুনা কোন রকমের ভারি পা টেনে তাহার কাছে এসে বসে।টান দিয়ে ছিড়ে যাওয়াই নিবিড়ের হাত কেটে রক্তে তাহার বুকের কাছের নিমা ভিজে গেছে।
সবার শেষে রেবেকা হুড়মুড়িয়ে এসে ধপ করে বসে দোয়া দুরুদ পড়ে অনবরত ফু দিয়ে যাচ্ছে।মেহেদী নিবিড়কে বলছে ‘তুই সর আমি দিচ্ছি তোর হাত কেটে গেছে। ‘নিবিড়ের সেদিকে ধ্যান নেই।সে টানা সিপিআর দিচ্ছে তো দিচ্ছেই।
নীতিহীন রাজ পর্ব ৬৮
মিনিট তিনেক পর তাহা জোড়ে কেঁদে উঠে।সেই কান্নায় সবার অন্তর আত্মা মনে হলো একসাথে রিলিফ পায়।মাইমুনা নিটল চোখে চেয়ে দেখে নিবিড়কে।তাহার কান্নায় তার গলায় কিছু একটা আটকে গেছে।মাইমুনা শ্বাস নিতে পারছে না। সে না ভাবে তার কেউ নেই? তার সব শত্রুরা বাস করে এই ম্যানসনে?তবে এরা কারা?কেনো তার সন্তানের জন্য এদের এত ব্যাকুলতা?
মনের সাথে মস্তিকের ক্ল্যাশে মানব শরীর অনেক সময় শাটডাউন হয়ে যায়।দীর্ঘদিনের একটা ভাবনা হঠাৎ করে ভুল প্রমানিত হলে চোখের পর্দা ঘোলা হয়ে যায়।মাইমুনারও তাই হলো।চারপাশ অন্ধকার করে লুটিয়ে পড়ে ফ্লোরে।
