সায়রে গর্জন পর্ব ৩৫
নীতি জাহিদ
লিমন গলা ঝেড়ে কেশে উঠলো। দিয়া লজ্জ্বা পেয়ে বুক থেকে সরে যেতে চাইলো,শাহাদ আষ্টেপৃষ্টে ধরলো। লিমনের দিকে ফিরে বললো,
– তোর গলায় কি সমস্যা?
– না মানে ভাইজান কই কি সমস্যা?
– য/ক্ষা রোগীর মতো খুক খুক করছিস কেনো?
লিমনের থেকে নজর সরিয়ে দিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো,
– একটা কম্ফোর্টেবল ড্রেস পরে এসো?
সকলে হতচকিত। শাহাদ পুনরায় বললো,
– সাইকেল রাইডিং তো পারো, ধরো তোমাকে এখন সাইকেল চালাতে হবে এমন একটা ড্রেস পরে এসো। প্রশ্ন করবেনা কোনো। দ্রুত যাও। পাঁচ মিনিট সময়।
দিয়া রুমে চলে যেতেই সবাই প্রশ্ন করছে। শাহাদ নিশ্চুপ। দিয়া রুমে ঢুকে দেখলো এই একটাই ড্রেস আছে যেটা সামলে বসা যাবে। মজুমদার বাড়িতে থাকতে বানিয়ে ছিলো। দিয়া বেরিয়ে আসলো সাত মিনিটের মাথায়। এক পলক দিয়াকে দেখে সবাইকে বললো,
– নিচে চলো সবাই একটা জিনিস দেখাবো।
দিয়ার হাতটা শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ করে সোজা হাঁটা দিলো। বাবা মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
– আব্বু, আম্মু চলুন একটা সুন্দর জিনিস দেখাবো।
শাহাদ সকলকে নিয়ে নিচে নেমে আসলো। বাড়ির বাগানের এক কোণায় এক অদ্ভুত সুন্দর জিনিসের সাক্ষাৎ হলো রায়হান সাহেবের পরিবারের সদস্যদের। মাথায় লম্বা সাদা চুল,লেজের চুল গুলাও ভীষণ সুন্দর। এত সুন্দর ব্রিড এর আগে সরাসরি কেউ দেখেনি। দিয়া সেদিকে তাকিয়ে দেখে হাম্মাদ খুশি মনে এগিয়ে আসছে। দিয়া আজ কিশোরীর ন্যায় উচ্ছ্বসিত হয়ে জোরে চিৎকার দিয়ে বললো,
– মামু…কোহিনূর…
শাহাদ দিয়ার হাত ছেড়ে দিয়ে বললো,
– যাও কোহিনূরের কাছে। তোমার জন্মদিনের প্রথম উপহার।
দিয়া চুলগুলোকে সুকৌশলে খোঁপা করে মাথায় পুনরায় ওড়না প্যাঁচিয়ে ছুটে গেলো। কোহিনূর সাদা ব্রিড, এর মাঝে দিয়া পরেছে সাদা একটা গাউন যার মাঝখানে কাটা। সহজেই সাইকেল,বাইক এবং ঘোড়াতে চড়া যাবে। দেখতে পুরো রাজকুমারী লাগছে। আজ মনে হয় যেনো ইরানী কন্যার সব সৌন্দর্য্য ফুটে উঠেছে। দিয়াকে দেখে কোহিনূর ছটফট করে দুপা মাটি থেকে উঠিয়ে দিলো। এভাবেও কূর্নিশ করা যায়? খুশিতে কোহিনূর দিয়ার চারপাশে চক্কর লাগাচ্ছে। এত বছর পর কোহিনূর দিয়াকে শনাক্ত করে ফেলেছে। প্রকৃতপক্ষে জীব – পশু এরা মানুষের চেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ। দিয়া কোহিনূরকে আগলে ধরে কেঁদে দিলো। কোহিনূরের ও চোখে পানি। হাম্মাদ ভাগ্নিকে দেখে হাসছে। একটু জোরেই বললো,
– আমিরা আপা ও এভাবে কোহিনূরের প্রিয় ছিলো।
দিয়া এক লাফে কোহিনূরের পিঠে চড়ে বসে। শিফা,শেফালী আঁৎকে উঠে চিৎকার দেয়। শাহাদ ও ভয় পেয়ে জোরে বলে,
– ফারাহ্ পড়বে…
কে শুনে কার কথা? দিয়া কোহিনূরের পিঠে চড়ার সাথে সাথেই কোহিনূর পুনরায় শূন্যে সামনের দু পা তুলে দেয়। লাফিয়ে চলছে বাগান জুড়ে। শেহজা মাকে ঘোড়ায় দেখে নিজেও হাত তালি দিচ্ছে আর চিৎকার দিচ্ছে। দিয়ার মুখে সেই হাসি। বাতাসের তোড়ে খুলে গেলো চুল। দুহাত শূন্যে মেলে দিলো দিয়া। শাহাদের মনে হলো রূপকথার রাজকন্যা। এই মোহময়ী সৌন্দর্য্য আড়াল করতেই হামিদ মজুমদার সরিয়ে ফেলেছিলো কোহিনূরকে। একদল এখনো বসে আছে কোহিনূর এবং তার মালকিনকে আত্নসাৎ করার লক্ষ্যে। কোহিনূরের মালকিন আমিরার পর দিয়া।দূর্বল চিত্তের হামিদ মজুমদার না পারলেও এবার হাম্মাদ – শাহাদ মুখোশ উন্মোচন করবে তাদের। এই কোহিনূর সংক্রান্ত কারণেই যে মুরাদ- আমিরার প্রানঘাতি হয়েছে একথা ধরনীর বুকে অবস্থানরত কিছু মানুষই জানে। যারা অপরাধ সংঘটিত করেছে তারা এবং শাহাদ,হাম্মাদ।
ঘোড়া একেবারে শাহাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। দিয়া শাহাদকে বলে,
– উঠবেন আপনি?
– না না আমি পারিনা, তুমি চাইলে শেহজাকে উঠাতে পারো।
দিয়া খিলখিল করে হেসে বলে,
– আপনি পানির জাহাজ চালাতে পারেন অথচ ঘোড়া পারেন না?
শাহাদ মাথা নাড়ালো দুপাশে। হেসে বললো,
– বেঁচে ফিরেছি আল্লাহর রহমতে, আবার আধমরা করতে চাও নাকি? আমার পেরে লাভ নেই, তোমার মত অত সাহস নেই। মেয়েটাকে তোমার মত অসীম সাহসী বানাও।
সুলতানা কবির এগিয়ে এসে বললেন,
– বৌমা আমার নাতনীটা ভয় পাবে, উঠানোর প্রয়োজন নেই মা।
শাহাদ মাকে বাঁধা দিয়ে বলে,
– কিচ্ছু হবে না আপনার নাতনীর, সাথে তার মা আছে৷ আল্লাহ ভরসা।
শাহাদ মেয়েকে ঘোড়ায় তুলে দিলো। কোহিনূর লাফিয়ে উঠলো। শিফা,শেফালী ভয়ে সুলতানা কবিরের পেছনে লুকিয়েছে। অন্যদিকে সুলতানা কবির শাহাদের পেছনে। দিয়া ওড়না দিয়ে মেয়েকে কোমরের সাথে বেঁধে পুনরায় একটা চক্কর লাগালো। আরেকবার ঘুরে এসে থামলো আগের জায়গায়। দিয়া নেমে আসলো। কোহিনূর আজ থেকে সুলতানা মঞ্জিলে থাকবে। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একজন সহিসের ব্যবস্থা করে দিলো হাম্মাদ। দিয়া দুহাতে নিজের চোখ মুচছে। হাম্মাদ ভাগ্নীকে ধরে বললো,
– উম্মি, তোমার জন্য কেউ সারাজীবন থাকবেনা। হামিও থাকবোনা। তুমি মা- বাবার জন্য দোয়া করবে। আল্লাহ তাদের বেহেশত নসিব করুন। আমিন।
নাক টেনে বললো,
– আমিন।
ঘড়িতে সন্ধ্যা হয়ে এলো বলে। প্রায় সাড়ে ছয়টা। শাহাদ বিশ্রামের জন্য রুমে গিয়েছে। ডাক্তার এসেছে, চেক আপ করছে। নেতাকর্মীরা দেখা করবে জানিয়েছিলো সব মিটিং ক্যান্সেল করে দিয়েছে। চুপি চুপি শাহীন এবং পাভেলকে নিয়ে রায়হান সাহেব কিছুক্ষন আগে বেরিয়েছেন। ভাইয়ের অনুরোধ রাখতে এই কর্তব্য পালন করা উচিত। সমাজে বাস করতে হলে কিছু কাজ দায়িত্ব এড়ানো যায়না। কি হলো ঘটনা বৃত্তান্ত শুনে আসা প্রয়োজন।
ডাক্তার চলে গিয়েছে বেশ কিছুক্ষন। দিয়া ডাইনিং এ শাশুড়িকে সাহায্য করছে। শরবত বানাচ্ছে সবার জন্য। নওরীন অফিস সেরে এসে শাহাদের সাথে দেখা করেছে। জা এর সাথে কাজে হাত লাগাচ্ছে। গল্প করছে এর মাঝে শিফা গান গাইছে দিয়ার কানের সামনে। দিয়ার কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে ঘুরে ঘুরে নেচে নেচে গান গাইছে,ওর সাথে তাল দিলো শেফালী আর নওরীন।
– রূপ সুহানা লাগতা হ্যেয়, চাঁদ পুরানা লাগতাহে, তেরে আগে ও জানাম। তু ভি ক্যায়া চিজ হ্যেয়, হার দিল আজিজ হ্যেয়, দিল চাহে দেখে তুজে… হাম হার দাম। রূপ সুহানা লাগতা হ্যেয়…
সুলতানা এবং রত্না কিচেনে চলে গেলো মেয়েদের দুষ্টুমি দেখে। দিয়া লজ্জ্বায় লাল হয়ে বললো,
– আল্লাহ এমন করছো কেনো? কি শুরু করলে তিনজন।
শেফালী বলে উঠলো,
– আজ ভাবী ঘোড়ায় চড়ে যেভাবে বাজিমাত করলো,উফ হামে তো মারডালা। ভাইজান কেমন করে তাকিয়ে ছিলো মোহাবিষ্ট হয়ে…
শিফা নাক কুঁচকে বলে,
– জঘন্য তোমার হিন্দি? ইন্ডিয়ান গভমেন্ট শুনলে তোমার ভিসা নিষিদ্ধ করে দিবে।
– উফ থাম, ওয়েট ওয়েট ভাইজান আজ রাতে ভাবীজানের জন্য গান গাইবে কিভাবে বলি?
শিফা বললো,
– বলো বলো…
এক কানে হাত দিয়ে অন্য হাত শূন্যে ছড়িয়ে সুর টেনে গাওয়ার মতো ভান করে বললো,
– আমি ফেসে যাই,তোমার উড়া চুলে
তুমি হাসলে ওই গালে আমি ফেসে যাই…
ও আমি ফেসে যাই তোমার চোখের জলে
চুয়ে পড়া কাজলে আমি ফেসে যাই…
ও আমি ফেসে যাই..
ও ও ও ও…
দিয়া চোখ বড় বড় করে রুমের দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। শাহাদ বোনদের দিকে তাকিয়ে সোজা পেছনে এসে দাঁড়ায়। পেছন থেকে আওয়াজ ছাড়ে,
– কার মনে এত প্রেম, কে এত ফেসে যাচ্ছে?
নওরীন মাথায় ঘোমটা টানে। শিফা আর শেফালী থতমত খেয়ে গিয়েছে। শাহাদের চাহনী দেখে শিফা ভয়ে বললো,
– ভাইজান… গা নে র ক লি… খেলছিলাম।
– বোর্ড পরীক্ষার আর কয়দিন আছে?
– এইতো যাচ্ছি পড়তে?
শিফা পালিয়ে গেলো। শেফালী মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। শাহাদ পুনরায় বললো,
– আবিরকে খাইয়ে দাও। মজা মাস্তি পরে করবে। বাচ্চাটার ক্ষুধা লেগেছে।
শেফালী মাথা ঝাকিয়ে নওরীনকে নিয়ে রানাঘরে চলে গেলো। ফেলে রেখে গেলো দিয়াকে। দিয়া একবার শাহাদের দিকে তাকিয়ে শরবতের গ্লাসটা বাড়িয়ে দিলো। চেয়ার টেনে বসে তিন চুমুকে শরবতটা খেয়ে উঠে দাঁড়ায়। দিয়ার দিকে তাকিয়ে মাথাটা একটু নিচু করে ধীর গলায় বললো,
– আমি ফেসে গিয়েছি…
দিয়া লজ্জায় লাল হয়ে চোখ বুজে ফেললো,শাহাদ রুমে চলে গেলো। শেফালী,নওরীন বের হলো রান্নাঘর থেকে,শিফা লুকিয়ে ছিলো পর্দার আড়ালে। শাহাদের রুমের দরজা লক করার আওয়াজ পেয়ে তিনজন পুনরায় একই গান গেয়ে উঠলো, রূপ সুহানা লাগতা হ্যেয়…চাঁদ পুরানা লাগতা হ্যেয়…তেরে আগে ও জানাম। আমি ফেসে যাই… আড়াল থেকে এই কপোত-কপোতীর ছোট্ট আলাপন পাজি গুলো দেখে নিয়েছে। কি বলেছে তা শোনেনি, শুনলে এতক্ষণে লজ্জা দিয়েই মেরে ফেলতো। লজ্জায় দিয়া দুহাতে মুখ ঢাকলো।
শাস্তি এমনো হতে পারে! পাপ কাউকে ছাড়ে না, অনেক রকমের শাস্তি হতে পারতো এই পাপী নারীর। কিন্তু সব ফেলে এমন শাস্তি হলো যার থেকে রেহাই নেই। যার কোনো সমাধান নেই। ভেতরে অপারেশন চলছে৷ মোমেনার মাথায় হাত। রেদোয়ান আজ নিঃস্ব। একটা মাত্র মেয়ে। কতই না আশা ছিলো এই মেয়েকে নিয়ে। বেশ কিছুদিন আগে মেয়ে বললো একটা ডাক্তারি ডিগ্রির জন্য সিঙ্গাপুর যেতে হবে। অথচ এই মেয়ে বাংলাদেশে কি করছে! আবার আজ এমন এক্সিডেন্টের মুখোমুখি হলো। রায়হান সাহেব ভাইয়ের পাশে বসে ভাইকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। ইচ্ছে করছে খুব কড়া করে বলতে জীবনে শুধু টাকাই চিনলি মেয়েটাকে মানুষ করতে পারলিনা। পরক্ষনে মনে হলো ভাইকে বলে কি হবে? নিজের মেয়েটাও তো মানুষ হলোনা। ডাক্তার বেরিয়ে এলো ওটি থেকে। চিন্তিত স্বরে বললো,
– ওনার দু পায়ের যা অবস্থা, রাখার চেষ্টা করেছি কিন্তু পারলাম না। কেটে ফেলে দিতে হয়েছে।
মোমেনা চেয়ার থেকে আর উঠতে পারলোনা। রেদোয়ানের দু চোখে অশ্রু। কি করলো মেয়েটা। পরিণত বয়স থেকে সবকিছুতে বাড়াবাড়ি করা শুরু করে, এতদিন ব্যাপারটাকে এড়িয়ে চলাটা আজ এক মহাভুলের কারণ হয়ে দাঁড়ালো।
রায়হান সাহেব এসে শাহীনের পাশে দাঁড়িয়ে বললো,
– আপাতত তোমার মা ছাড়া বাকিদের এই বিষয়ে আলোচনা করতে বারণ করে দিবে। শাহাদের কান অবধি হালকা বিস্তর আলাপ ও যেন বিষয়ে না উঠে খেয়াল রাখবে। ঠিক আছে?
– জ্বি আব্বু।
– আব্বু, আম্মু তো আসতে চাইছেন?
– পাভেলকে বলো নিয়ে আসতে। লিমনকে বাড়ি থেকে নড়তে বারণ করো। বাড়ির পরিবেশ আমরা না ফেরা অবধি যেন স্বাভাবিক থাকে।
– আচ্ছা আব্বু।
হাসপাতাল থেকে ফেরা হয়েছে সকলের। রাতের খাবার খেয়ে যে যার যার রুমে অবস্থান করছে। রায়হান সাহেব সবাইকে রুমে ডেকে সাবধান করে দিয়েছেন বার বার যেন শাহাদ জানতে না পারে। দিয়া রুমে ঢুকেই দেখলো শাহাদ মেয়েকে বুকের উপর শুইয়ে মেয়ের সাথে দুষ্টুমি করছে। মেয়ে মাথা বাবার বুকের সাথে লেপ্টে রেখেছে। বাবা কথা বলছে আর মেয়ে বুঝদার বাচ্চার মতো হু,হা করছে। এই যেমন মাত্র শাহাদ বললো,
– আম্মা বাবাকে তুমি মিস করেছো? হু?
– হু
– বাহ তুমি বাবার সব কথা বুঝো জানবাচ্চা?
এবার চুপ করে আছে। শাহাদ পুনরায় বললো,
– আম্মা, বাবাকে ডাকো তো…
– বাবা, বাবা
দিয়া দরজা আটকে খাটের এক কোনায় বসলো চুপচাপ। শাহাদ দিয়াকে দেখে মেয়েসহ উঠে বসে হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে দিয়াকে বললো,
– ফারাহ একটা চমৎকার কাজ করেছি। আমি নিশ্চিতভাবে জানি তুমি খুবই খুশী হবে।
দিয়া কৌতুহল নিয়ে তাকালো। শাহাদ মেয়ের থুতনী ধরে আদো গলায় বললো,
– বাবা, মা বলোতো।
শেহজা সাথে সাথে দু হাতে তালি দিতে দিতে বলে,
– মা মাম্মা.. বা বা
দিয়া মুখে হাত দিলো। মেয়ে একবার মা বলছে তো আরেকবার বাবা বলছে। মুখ থেকে হাত সরিয়ে দিয়া বললো,
– আপনি শেখালেন কি করে? এত মাস চেষ্টা করেও মেয়ে মুখ দিয়ে মা শব্দ উচ্চারণ করেনি।
– কারণ তুমি মা শব্দ মেয়েকে শেখাওনি, বাবা শিখিয়েছো আগে। মেয়ের দোষ দিবেনা।
দিয়া ধরা পড়ে গিয়ে লজ্জ্বা পেলো৷ উঠে গেলো বসা থেকে কাজের বাহানায়। শেহজা হাই তুলছে। দিয়া শেহজার বিছানা গুছাতে ব্যস্ত। শাহাদ মেয়েকে কাঁধে নিয়ে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে বেলকনিতে গেলো। মিনিট পনেরো পর মেয়েকে ঘুমন্ত অবস্থায় নিয়ে ফিরলো। শেহজার বেডে ওকে শুইয়ে দিলো। শেহজাকে শুইয়ে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়াতেই দেখলো দিয়া আচমকা দ্রুত পা চালালো। খপ করে দিয়ার হাতটা ধরলো। দিয়া মুখে শব্দ করে উঠলো। শাহাদ মুখ চেপে ধরে বললো,
– আস্তে কি করছো ফারাহ্… মেয়েটা উঠবে।
নিস্তেজ হয়ে গেলো দিয়া। শাহাদ দেখলো শেহজা নড়েচড়ে পুনরায় ঘুমিয়ে পড়েছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে শাহাদ দিয়ার দিকে তাকালো,
– পালাচ্ছো কোথায়?
– কোথায়… না তো?
আপন অধর কামড়ে অধর কোণে একপেশে হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে মানুষটা। হ্যাজেল আইয়ের মানুষটার প্রেমে পড়তে মন ও আজ বেহায়া হয়ে উঠেছে। প্রিয় পুরুষের এই হাসি যেন উপছে পড়ার খুশির ঝলক। চোখ মুখ সবই যেন হাসছে। দিয়া লজ্জ্বা পেয়ে মাথা নোয়ালো।
– জন্মদিনের দ্বিতীয়, তৃতীয় অনেক উপহারই আছে আমার ট্রলিতে। সবই বস্তুগত। আরেকটা উপহার হলো শাহাদ স্বয়ং। কোনটা চাই? চিঠির কথা মনে আছে?
ভ্রু নাচিয়ে হাসি মাখা ঠোঁটের কোণে প্রশ্ন করলো। পকেট থেকে কিছু একটা বের করে দিয়ার আধ খোলা খোঁপায় বেঁধে দিলো। খোঁপায় হাত দিয়েই বুঝতে পারলো রজনীগন্ধার গাজরা। দিয়া আরক্তিম গালে পিটপিট করে তাকালো।পুনরায় গাল নোয়ালো। এত লজ্জা কি করে ভর করলো? শাহাদ মাথা নিচু করে কবিতার মত আওড়ালো,
– আমি ফেসে যাই, তুমি হাসলে ওই গালে আমি ফেসে যাই।
একে তো মেয়েটা লজ্জ্বায় রাঙা এর মাঝে শেফালীদের তখনের সেই গানের লাইন আবার বলছে মানুষটা। লাজে লাল হয়ে আছে। অকস্মাৎ দিয়ার মনে হলো এই যাহ, শরীর কাঁপছে কেনো? পুরোনো অনুভূতি, বুক কাঁপছে। শাহাদ এমন একটা কাজ করে বসবে ভাবনাতীত ছিলো। পা টলছে। এখনি কিছু ধরে শক্তপোক্তভাবে দাঁড়াতে হবে৷ শাহাদের ওষ্ঠের বিচরণ তখন দিয়ার গলায়,পরপর কানে, বাম গালে। নিজের ভারসাম্য রক্ষার্থে শাহাদের দু কাঁধ আগলে ধরলো। প্রেয়সীর শরীর জুড়ে কম্পন টের পেয়ে দুষ্টুমি মাখা হাসি দিয়ে সরাসরি কোলে তুলে নিলো। মৃদু হলদে ল্যাম্পশেডের আলোয় সেই হাসি সুস্পষ্ট। এবারে সুর ছাড়লো,
– এখন অনেক রাত, তোমার কাঁধে আমার নিশ্বাস আমি বেঁচে আছি তোমার ভালোবাসায়…
সূর্য, দিনপঞ্জিকা, বর্ষপঞ্জিকা সব মিলিয়ে তিন বছর পেরিয়ে শাহাদ ইমরোজ আজ প্রেয়সীতে পুনরায় ডুব দিয়েছে। প্রিয়ার উষ্ণ অধর আজ শাহাদের ছোঁয়ায় আদ্রতা পেয়েছে। সিক্ত পরশ আজ কায়াজুড়ে। সবচেয়ে সুন্দর ব্যক্তিগত মুহুর্তের সাক্ষী হয়েছে শাহাদ-দিয়া দম্পতি। আজ শাহাদ নিজেকে আড়াল করেনি, রাখেনি কোনো গোপনীয়তা, কালো মলাটে বাঁধা ডায়েরীতে ছিলো তার রচিত ফারাহ্কাব্য। যেখানে ছিলো তিন বছরের চাপা প্রণয়গাঁথা। সেই ডায়েরী আজ তুচ্ছ। সুন্দরতম মিলন ঘটলো শাহাদ-দিয়া দম্পতির।
শাহাদ বলে উঠলো,
– তোমার ঠোঁটে চুমু খেতে গিয়ে মারাত্মক ভয় পেয়েছি ফারাহ্?
দিয়া ঘাবড়ে গিয়ে বললো,
– কেনো?
– Burmese Grape চেনো?
– উঁহু।
– যাকে আমরা লটকন বলি। ভেতরে ফলটা দেখেছো কেমন জুসি জুসি,টসটসে৷ একটু আঘাত পেলেই শেষ… আমি তো ওই ফিলটাই…
– চুপ করবেন…
– একদম না। আরেকবার…
সহধর্মিণীর বুকে মাথা রেখে খানিকটা সময় নিশব্দ রইলো। শাহাদপ্রিয়াও স্বামীর মাথা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলো। চিঠিতে লেখা শাহাদের সেই আকুতি আজো ভুলেনি। প্রিয় স্ত্রীর অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন কানে বিঁধছে। বুক থেকে মাথা না তুলেই প্রশ্ন করলো,
– কি হলো সোনা… আমি কি কোনো ভাবে বেশি করে ফেলেছি?
নাক টেনে চোখ মুছে বললো,
– নাহ।
– তাহলে বিষাদময় জল কেনো অক্ষিজুড়ে? তবে কি ধরে নিব সুখের?
– দুটোই।
শাহাদ মাথা তুলে প্রশ্ন করলো,
– দুটোই?
– হুম। ব্যক্তিগত মানুষটাকে কাছে পেয়ে আর…
– আর কি?
এবার জোরেই কেঁদে দিলো,
শাহাদ সোজা উঠে বসলো। দিয়াকে উঠিয়ে বুকে টেনে নিলো। শাহাদের লোমশ উন্মুক্ত বুক প্রেয়সীর চোখের জলে সিক্ত।
– আস্তে সোনা… মেয়ে উঠবে? বেশ লজ্জ্বার পরিস্থিতিতে পড়তে হবে। তুমি কি চাও মেয়ে এই অবস্থায় দেখুক বাবা মাকে?
– নাহ।
– থামো? কি হয়েছে তাই বলো?
– আপনি আমাকে না বলে কোন সাহসে সিঙ্গাপুর গিয়েছেন? কিছু হলে আমি মেয়েকে নিয়ে কোথায় যেতাম? এই কাজের জন্য আমি আপনাকে একটু ও মাফ করবোনা। প্রতিটি দিন,ক্ষণ আমার কাছে এক একটা বছর লেগেছে। আমরা মা মেয়ে জড়াজড়ি করে কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়েছি। মেয়েটা আমার বুক পেয়েছে কাঁদার জন্য। আমি তো কারো বুক পাইনি কাঁদার জন্য। আপনার কিসের অধিকার ছিলো আমাদের এভাবে কষ্ট দেয়ার?
দিয়ার মাথাটা আরো শক্ত করে চেপে ধরে শাহাদ। নিজের অজান্তেই চোখ বুঁজে। গড়িয়ে পড়ে দু ফোঁটা অশ্রু। হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলীতে চেপে মুছে নেয়। সত্যি এই প্রশ্নের উত্তর শাহাদের অজানা। হাসপাতালের দিনগুলো কে*টেছে অসহ্য যন্ত্রণায়, মাঝে মাঝে মনে হত এই হয়তো শেষ। ইচ্ছাশক্তি আর অশেষ করুণাময় সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করলেও কম হবে, এভাবে বেঁচে ফিরে আসার কথা তো ছিলোনা। অপারেশন কেবিনে একবার কানে এসেছিলো ডাক্তারের কথা, ইটস মিরাকেল! জীবনে কিছু মিরাকেল সত্যি ঘটে যায়, যা তার সাথে ঘটেছে।মেয়ের ভাগ্যে, পিতৃমাতৃহীন প্রেয়সী অদৃষ্টে তার নাম লিখা ছিলো। একেই বলে রহমত এবং তাকদীর। মাথায় একটাই নেশা চেপেছিলো তাকে সুস্থ হতে হবে, ফিরতে হবে। হিতের বিপরীত কিছু মাথায় আসেনি। হয়তো স্রষ্টাই আনতে দেয়নি। নিজেকে স্বাভাবিক করে বললো,
– এই মহাপরাধ সংঘটনের কারণে অধমের জন্য কি শাস্তির ব্যবস্থা করেছেন শাহাদ বধূ?
বুক থেকে মাথা উঠিয়ে এক ধাক্কা দিতে শাহাদকে সরিয়ে বললো,
– মেয়েকে নিয়ে যা খুশি তা করুন, মেয়ে আপনার প্রাণ। খবরদার মেয়ের মায়ের কাছে ঘেঁষবেন না। দূরে থাকবেন।
– একটু আগে যে কত কিছু ঘটে গেলো? আমার সব ভালোবাসা নিয়ে আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছো তার বেলায়?
– যা হয়ে গিয়েছে তা শেষ। নতুন করে ঘেঁষবেন না।
– কোথাও যেন শুনেছিলাম মেয়েদের ফিলিংস কাজ করে কম। বাট ইম্পোরটেন্ট কথা হচ্ছে, এতক্ষন যে পরিমান ভালোবাসা দিলাম তাতে আপনার একমাস চলে যাবে। স্যরি টু সে দ্যাট আপনাকে ছাড়া আমার একদিন ও চলবে না। সো এসব রুলস ফুলস আমার সাথে খাটাতে আসবেন না মিসেস শাহাদ,ক্লিয়ার?
সায়রে গর্জন পর্ব ৩৪
– আপনি এত বাচাল তো ছিলেন না?
– সঙ্গদোষে লোহা ভাসে।
– কিহ? কি বুঝাতে চেয়েছেন আপনি?
শাহাদ মুচকি হাসি দিয়ে পুনরায় ঝাপটে ধরলো দিয়াকে। দিয়া দূরে ঠেলছে আর বলছে,
– কাছে আসবেন না…
এতটুকুই… বাক্য আর শেষ হলোনা। ওষ্ঠদ্বয় প্রিয়পুরুষের কব্জায়। খুনশুটি,দুষ্টু মিষ্টি ভালোবাসাই একটা সম্পর্কের প্রাণ। ততক্ষন টিকে থাকবে যতক্ষন মানুষগুলো টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করবে। শাহাদ ইমরোজকে পুরোপুরি জয় করে নিয়েছে শাহাদপ্রিয়া ফারহানা মেহতাব দিয়া।
