শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৫
সুরভী আক্তার
” ও আমার বউ , আমি মারি কাটি যা খুশি করি ,, তুই কে বলার ?
” আমি সংগ্রাম জোয়ার্দার ! ভুলে যাস ক্যান আমার পরিচয় ? আমার পরিচয় আর আমাকে মনে থাকলে তো তোর এসব করার কথা নয় ! স্বচোক্ষে দেখা দৃষ্টান্ত গুলো ভুলে যাস ? বেড়িয়ে যায় মাথা থেকে ?
সংগ্রামের চোখ মুখ ঝাঁজালো । রক্তিম অক্ষি যুগল রক্ত বর্ন ধারন করছে আরো অধিক । সে রাগে কাঁপছে রিতিমত । জুনাইদ শুল্ক ঢোক গিললো । সে বাইরে যেমন তেমন , কিন্তু ভেতরে ভীত । শবনমের নিকট কঠোর সে । বাকিদের নিকট গুরুগম্ভীর চাপা স্বভাবের । মায়ের নিকট ওর আসল রুপ স্পষ্ট । সংগ্রামের নিকট ও তাই । তবে বাইরের খোলস ভেদে ওর ভিতর কার ভীত সত্ত্বা টা সংগ্রামের নিকট অধিক প্রকাশিত । কপালে ঘাম জমতে শুরু করেছে জুনাইদের ।
সংগ্রাম ওর হাবভাব দেখে চক্ষু শীতল করলো । একটু সরে আসলো । দরজা বরাবর উঁচু কাঠের আরাম কেদারাটায় বসলো । ডান পা তুললো বাম পায়ের উপর । হেলান দিলো পিছনের দিকে । এক হাত চেয়ারের হাতলে রেখে অন্য হাত উঁচু করলো । হাতের সাথে মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললো অদ্ভুত ভ্যাঙ্গানো নিরেট কন্ঠে…..
” দুই মাস আগে একটা পিস্তল আনিয়েছিলাম । ছয়টা বুলেট ছিলো । আনাতে না আনাতে তিনটে বুলেট নষ্ট হয়েছে দুটো পশু কে অক্কা দিতে গিয়ে । একটার আবার কৈ মাছের প্রাণ ছিলো, শালা দুটো বুলেট খেয়েছে আমার । একটা বুলেটের দাম কতো জানিস ? তোকে একটা খাওয়াই ,, কি বলিস ? কিরে ফুফু আম্মা !! ও ,, মাফ করবেন । কি হলো ফুফু আম্মা ? আপনার ছেলের আবার টাকার খিদে খুব , আমার একটা বুলেট খেলে আশা করি খিদে মিটবে ! খাওয়াবো একটা ?
লতিফা ঝাঁকুনি মেরে উঠলো । পুরো মুখশ্রীতে ভয়ের আঁধার নামলো তার । সংগ্রাম জোয়ার্দারের চরিত্র, ব্যাক্তিত্ব তাদের অজানা নয় । ফাও কথা ঝাড়ে না সংগ্রাম । বাতাসে কথা ভাসিয়ে মিথ্যে ভয় দেখানোর ছেলে নয় সে । লতিফা কম্পিত গলায় বুলি ফুটালো….
” দেখ সংগ্রাম ,, বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু । কি করেছি আমরা , আমার ছেলে কি করেছে ? ভয় দেখাচ্ছিস আমাদের ?
সংগ্রাম পায়ের উপর থেকে দ্বিতীয় পা নামালো । পিছনে হেলান দেওয়া থেকে সামনের দিকে ঝুঁকলো । দুই হাত ভাঁজ করে বিরক্তি প্রকাশ করলো গলা পিষে….
” জানিস না কি করেছিস ? বলতে হবে আমায় ? শ্যামা আমার বেগম , আমার সব ও ! ওকে তোদের মানতে বলি নি , বলেছিলাম তো আমার বেগমের থেকে দূরে থাকতে । প্রথম , দ্বিতীয় , আর আজ তৃতীয় বার ওকে বিভ্রান্ত করেছিস তোরা ?
” তোর বউ এমনিতেও পাগল , পাগলকে খোঁচা দিতে যাবো কেন আমরা ?
” চুপ,, আবার এক কথা বলিস ? জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো একদম ।
” মুখে চোপা মেরে সত্যিটা আড়াল করতে পারবি তুই ? তুই তো সত্যি টা বলেছিলি , পাগল তোর ঐ কালো বিদঘুটে চেহারার বউ । কি পেয়েছিস বলতো ওর মাঝে ? ঐ পাগল টাকে এতো সহ্য করিস কিভাবে ? না আছে গায়ের রংয়ের কোনো শ্রী, আর না আছে মাথার ভারসাম্য ! পাগল জেনেই বিয়ে করেছিস , নাকি বিয়ের পর পাগল জেনেছিস ? একটা বাচ্চা তো অন্য কেউ ও দিতে পারতো তোকে । একটা দাসি খাটালেই পারতিস । একটা বাচ্চা , একটা উত্তরাধিকারির জন্য ঐ পাগল টাকে বিয়ে করার কি দরকার ছিল তোর ? বিয়ে করবি না করবি না বলে শেষে কিনা একটা কুৎসিত মেয়েকে বিয়ে করলি, সেটাও কিনা পাগল ? আচ্ছা বাচ্চা হওয়ার পর ছেড়ে দিবি নাতো ওকে ? এজন্যই পাগল জেনেই বিয়ে করেছিস ?
লতিফার পরপর বিরতি হীন ঝাঁজালো গলার এতো গুলো কথায় চোয়াল শক্ত করলো সংগ্রাম । গা রি রি করে জ্বলে উঠলো । মস্তিষ্কের নিভু অগ্নি দপ করে জ্বলে উঠলো ফের । দুদিকে ঘাড় মুড়ে তেড়ে আসলো মুহুর্তের মধ্যেই । লতিফার উপর হাত উদ্ধত করতে না পেরে জুনাইদের উপর ঝাপিয়ে পড়ল । সমস্ত কথার তীব্র তোপ ঝেড়ে সপাটে একখানা আঘাত বসালো জুনাইদের বাম গালে । আচমকা আক্রমণ, আর তীব্র আঘাতের চটকানা সহ্য করতে না পেরে কয়েক পা পিছিয়ে গেল জুনাইদ । টাল সামলে হিংস্রের ন্যায় গর্জে উঠলো তৎক্ষণাৎ । লতিফা চমকেছেন । দুহাতে মুখ চেপে বৃহতাকার নয়নে তাকিয়েছেন তিনি । মুখখানা প্রসস্থ হয়েছে তার । একটু সুযোগ বুঝে কথা শোনাতে চেয়েছিলেন ।
জুনাইদ নিজেকে সামলে উঠতেই আবারো তেড়ে গেলো সংগ্রাম । থাবা মেরে গলা চেপে ধরে হিসহিসিয়ে উঠলো….
” তোর মাকে মুখ সামলাতে বল । নয়তো আমি পারবো না নিজেকে সামলাতে । জানে মেরে ফেলবো একদম ।
” আরে আম্মা তো ঠিকি বলছে ! বাচ্চার জন্যই তো বিয়ে করেছিস ঐ পাগল টাকে । এখন পাগলামো করলে আমাদের উপর দোষ চাপাস কেন ? সামলাতে পারিস না নিজের পাগল বউ কে । ওকে আজ ভয় দেখায় নি আমরা , বিশ্বাস না হলে নিজের মাকে গিয়ে জিজ্ঞেস কর । শুধু শুধু আমাদের উপর হম্বিতম্বি করিস কেন ? তোর মাও তো তোর বউকে সহ্য করতে পারে না । গত দু’দিন তোর মাই তোর বাউকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল । অন্ধকারে তোর বউ ভয় পায়,এটা কে বলতে বলেছিল তোর মাকে ? তোর মাই তোর বউয়ের ভয় পাওয়ার সুযোগ নিয়েছে এতদিন । তোর মা তোর বউকে তাড়াতে চায় এই বাড়ি থেকে । কি যোগ্যতা আছে ঐ মেয়ের এই বাড়ির বউ হবার ?তোকে একটা বাচ্চা দেবে , এই আশায় তো সহ্য করছিস ওকে ?
” তোকে আমার বেগমের যোগ্যতা মাপতে বলি নি । ওর যোগ্যতা আছে দেখেই ও আজ সংগ্রাম জোয়ার্দারের বেগম । যে সংগ্রাম জোয়ার্দার কোনো দিন বিয়ে করতে চায় নি , সেই সংগ্রাম জোয়ার্দার ওকে বিয়ে করেছে । শুধু কি বাচ্চার জন্য ? নাহ , বাচ্চা তো তুই ও জন্ম দিয়েছিস ! বাপ হতে পেরেছিস ? বিয়ে করতে চেয়েছিলি তো । শবনম কে এক দেখায় ওর সৌন্দর্যে পাগল হয়ে বিয়ে করেছিলি তো ওকে , স্বামী হতে পেরেছিস ওর ?
আমি পেরেছি , বুঝলি ? আমার বেগমকেও প্রথম দেখায় ওর প্রতি মুগ্ধ হয়েছিলাম আমি । যে মুগ্ধতার বশে আজ আমি ওর স্বামী । সংগ্রাম জোয়ার্দারের চোখে যা পড়ে , তা সংগ্রাম জোয়ার্দার নিজের করেই ছাড়ে , সেটা যেকোনো মূল্যেই হোক না কেন । যাকে তাকে ধরে না সংগ্রাম জোয়ার্দারের চোখে । আর যাকে ধরে,তাকে সে ছাড়ে না । শ্যামা আমার চোখে ধরেছে বলেই সে আমার বেগম ।স্বামীর দায়িত্ব পালন করতে একটুও সময় নষ্ট করবো না আমি । ওর দিকে যে হাত বাড়াবে , তার সেই হাত কেটে ফেলবো । সেটা তুই হোস , তোর মা’ই হোক , আর আমার মা’ই । তোদের সরাতে দুই দন্ড ও লাগবে না আমার । কে তুই ! আমার সাথে পাঙ্গা নিতে আসিস ? আমি বোকা ? তোর মতো ! তোর মতো কাপুরুষ আমি ? যে কিনা টাকার জন্য বউ পেটায় । কি ভেবেছিস , আমি কিছু জানি না । আজ সকালে শবনম কে পাঠিয়েছিলি তো আমার ঘরে ? কেন পাঠিয়েছিলি , টাকা চুরি করতে ? ছিঃ ,, লজ্জা করে না ? জুয়ার নেশায় মত্ত হয়ে বউকে চুরি করতে পাঠাস ? যে থালাতেই খাস সেই থালাতেই ফুটো করিস ?
জুনাইদ থতমত খেলো । সংগ্রাম এটাও জানে এটা ভাবতে পারে নি । কাল শবনমের উপর তো কম অত্যাচার করে নি । শবনমের পরিবার খুব সাধারণ । জমিদারি সাত গ্রামের মধ্যে শেষের গ্রাম , মহিপুর গ্রাম শবনম দের । বাপ মায়ের একমাত্র আদরের মিষ্টি মেয়ে শবনম । খুব চঞ্চল আর ছটফটে স্বভাবের ছিল এক সময় । গ্রামে ঘুরে ফিরে ছুটে বেড়ানো ছিল ওর অন্যতম সুখ । ভীষণ সুন্দর সে , এক দেখায় যে কারোর দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য যথেষ্ট । সেভাবেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল জুনাইদের । উঠতি বয়স থেকেই জুয়ার নেশায় আসক্ত জুনাইদ । লতিফা জেনেও কখনো শাসন করেন নি । বরং জমিদারি বিলাসীতায় সায় দিয়েছেন ছেলে কে । যা ওর নষ্ট হওয়ার অন্যতম অন্তরায় ছিল । গ্রামের শেষে যে বিশাল জঙ্গল , সেখানে জুয়ার আসর বসতো । এখনো বসে । মহিপুর গ্রাম জঙ্গলের পাশেই । সেই গ্রামের ভিতর দিয়ে জমিদার গ্রামে আসতে হয় । গ্রামেই প্রথম শবনম কে দেখে ছিলো জুনাইদ । চঞ্চলা উৎসুক হাসি খুশি একটা মেয়ে ।
যাকে দেখে জুয়ার নেশার সাথে সাথে বিয়ের নেশাও মাথায় চড়ে ছিল । লতিফা তো ছিলো ছেলে কে সায় দেওয়ার জন্য । শবনম কে দেখে লতিফ জোয়ার্দার ও দ্বিমত করেন নি । জমিদার বাড়ির বউ হিসাবে শবনম উৎকৃষ্ট । পরবর্তীতে পারিবারিক ভাবেই বিয়ে হয়েছিল শবনম আর জুনাইদের । বিয়ের পর পাঁচ মাস অবধি জুনাইদ ঠিক ছিলো । লতিফ জোয়ার্দারের কড়া শাসনে ছিলো । বিয়ের আগে জুয়া খেলার জন্য একবার জুনাইদ কে বাড়ি ছাড়াও করেছিলেন লতিফ জোয়ার্দার । বিয়ের পর পাঁচ মাস ঠিক চললেও লুকিয়ে লুকিয়ে আবারো জুয়ার আসরে যেতো জুনাইদ । ওর নিজের কোনো উপার্জন নেই । লতিফ জোয়ার্দারের ঘাড়ে চেপে খাওয়া ছাড়া । বিয়েতে শবনম কে যা যা গহনা দেওয়া হয়েছিল , সবগুলো ধীরে ধীরে কমতে থাকে । টাকার জন্য একসময় শবনমের উপর হাত ও ওঠায় জুনাইদ । যে হাত এখন কথায় কথায় চড়াও হয় । শবনমের গলায় একটা চেইন ছিল , গত কাল সেটাই দখল করেছে জুনাইদ । মেয়েটা কে মেরেছে অনেক । প্রথম প্রথম সহ্য হতো না শবনমের । কাঁদতো অনেক । বাপের বাড়ি গিয়ে থাকতো সদায় সদায় । বাপ মাকে কিছু বলতো না । মুখে হলেও জমিদার বাড়ির বউ সে , একটা মান তো আছে ।
এখন সয়ে গেছে সব । বাপের বাড়ি যায় না আর । যাওয়ার যে পথ নেই । বাপ টা মরলো গত বছর । মা টাও মরলো তার এক সপ্তাহ পর । ওরা মরে রেখে গেলো ওদের মেয়েটাকে । জেনে গেলো ওদের মেয়ে জমিদার বাড়ির বউ । কিন্তু এটা জানলো না , সে যার বউ তার দেওয়া শত আঘাত তাদের সেই ফুলের মতো মেয়েটার শরীরে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে হাজার । যা সবসময় মেয়েটা লুকিয়ে রাখে শাড়ি নামক পর্দার আড়ালে ।
শবনম কে মারার জন্য জুনাইদ কে অনেক বার শাস্তি দিয়েছে লতিফ জোয়ার্দার । তার শাস্তি স্বরূপ তিনি বরাবর বাড়ি থেকে বের করে দিতেন জুনাইদ কে । আবার ফিরিয়েও আনতেন । তবে সংগ্রামের শাস্তি দেওয়ার পন্থা আলাদা । সে একেবারে চেপে ধরতো জুনাইদ । ওর শাস্তির বিধান এক , সবার জন্য এক । সৈকত হওয়ার পর সৈকতের কথা ভেবে বারবার জুনাইদ কে ছাড় দিয়েছে সংগ্রাম ।
সকালের পর শ্যামার মুখে শবনমের মুখে সবটা শুনেছিল সে । শবনমের সাথে আলাদা করে কথা হয় নি ওর । আলমারি ঘেঁটে কিছু টাকা বেপাত্তা হওয়ার সাথে হিসেব মেলাতে ত্রুটি হয় নি । শবনম ভালো , শুধু ভালো নয় , খুব ভালো । সংগ্রামের অনেক ছোট ও । যখন এ বাড়িতে আসলো , আরো ছোট ছিল । সংগ্রাম কে ভয় পেতো প্রথম প্রথম । সংগ্রাম ইচ্ছে করে মশকরা করে ভাবি ডাকতো ওকে । ওর ডাক শুনে সংকোচে আরো বেশি গুটিয়ে যেতো শবনম । ধীরে ধীরে সংগ্রামের সাথে যোগ সৃষ্টি হয়েছে ওর । একসময় শবনমের ভাই হয়ে উঠেছে সংগ্রাম । এতো বছর পর আর সংকোচ থাকার কথা নয় ।
আলমারি থেকে টাকা চুরি করতে চায় নি শবনম । বাধ্য হয়েছে । নয়তো আরো মার খেতে হতো ওকে । শ্যামার অনুপস্থিতির সুযোগে আলমারি থেকে কিছু টাকা সরিয়েছে শবনম । টাকা সরিয়ে একটা কাগজের টুকরো রেখেছিল সেখানে । যেটাতে ভাঙ্গা অক্ষরে লেখা ছিলো….
” ক্ষমা করো ভাই, আমি নিরুপায় ।
সংগ্রামের বুঝতে বাকি রয় নি কিছু । সে তপ্ত শ্বাস ফেলে ছিলো শুধু । এই নিয়ে বেশি ঘাটে নি । শবনমের মুখোমুখি ও যায় নি নিজে থেকে । ওর সামনে দাঁড়ানোর মুখ নেই শবনমের ।
কিন্তু রাতে , জুনাইদ যতোই অস্বীকার যাক , আজ ও সেই শ্যামা কে ভয় দেখিয়েছে । শ্যামা স্বাভাবিক নয় । আঁধারে ফোবিয়া আছে ওর । অন্ধকারে ভয় কাজ করে ওর মাঝে । সবসময় নয় , তবে যখন ভয় পায় তখন এলোমেলো হয়ে যায় সবকিছু । সবকিছু গুলিয়ে যায় শ্যামার নিকট । কিছু ভেবে পায় না ও । মস্তিষ্ক শূন্য হয়ে আসে , দূর্বল ভীত মস্তিষ্ক ভয়ের তীব্রতায় অচল হয়ে পড়ে । স্মৃতিতে ধারণ ক্ষমতা থাকে না । বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ভুলে যায় শ্যামা । আশপাশ , আশপাশের সবকিছুই ঝাপসা হয়ে আসে । ছোট বেলা থেকে এই নিয়েই বেড়ে উঠেছে সে । এখন এটা গেঁড়ে গেছে ওর সাথে । অধিক অন্ধকারে নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারে না শ্যামা । মনে হয় কেউ গ্রাস করে নিতে আসছে ওকে । দম বন্ধ হয়ে আসে । মাথা ফেটে যায় যন্ত্রণায় । ঠিক থাকতে পারে না শ্যামা । শান্ত স্বভাবের মেয়েটা ছটফট করে । অলকা ছাড়া কেউই সামলাতে পারেন না ওকে । শ্যামা যখন ভয় পায় , তখন আম্মা ব্যতীত কাউকেই চেনার ক্ষমতা থাকে না ওর শূন্য মস্তিষ্কে । যা বোঝে, তাতে সবটা জুড়ে অলকা । পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় না শ্যামা । ধীরে ধীরে ভয়ের রেশ কেটে গেলে ঘটমান সবকিছু মেলাতে পারে না । কি ঘটলো,কি হলো,তা মাথা থেকে বেরিয়ে যায় । ভুলে যায় সব । আবার মনেও পড়ে একসময় ।
মানসিক চাপ বিভ্রান্তি থেকে সৃষ্টি এই ভয়ের উৎস । যা শ্যামা নিজের ভেতরে গুমড়ে গুমড়ে পুষে রেখে এসেছে । বিয়ের পর সংগ্রাম যেদিন রুপার শশুর বাড়ির গ্রামে গেছিলো , সেদিনই হাসপাতালে শ্যামার সম্বন্ধে সবকিছু সংগ্রাম কে খুলে বলেছেন অলকা । কিচ্ছু লুকান নি । যা শ্যামার জানা নেই তাও জানিয়েছেন সংগ্রাম কে । সংগ্রাম জানে সব । তার বেগম ভীত । ওর এই ভীতির সুযোগই নিয়েছে সালেহা, লতিফা আর জুনাইদ ।
আগে রাতে পুরো জমিদার বাড়ির সমস্ত আলো নেভানো থাকতো । সংগ্রামের কথায় এখন দিন রাত অবিরাম আলো জ্বলে পুরো বাড়িতে । এই আলো জ্বালিয়ে রাখার সূত্রেই শ্যামার অন্ধকারে ভয় পাওয়ার অসুখ সম্পর্কে জেনেছে সবাই । সবাইকে সতর্ক করে সংগ্রাম নিজে জানিয়েছিল । কিন্তু কি হলো ? দূর্বলতার সুযোগ নিলো সবাই । সবাই তো নয় , ওরই মা জড়িত এসবের সাথে ।
ঘামছে জুনাইদ । কপাল বেয়ে বিন্দু বিন্দু নোনতা জল কনা গড়িয়ে পড়ছে । সংগ্রাম চুপ থাকলো সেকেন্ড কয়েক । অতঃপর বললো গুরুগম্ভীর চাপা স্বরে…
” বারান্দায় কে ছিলো বল ?
ঘরের দরজা লাগানো ছিল তো , আমিও অন্দরের দরজা বাইরে থেকে লাগিয়ে গেছিলাম । তাহলে দোতলার বারান্দায় কে উঠলো , কিভাবে উঠলো ? বল…..
জুনাইদ ঢোক গিললো । অধর ভেজালো জিভে । বলে ফেললো নিরুপায় হয়ে..
” এবার আমি কিছু করি নি বিশ্বাস কর ! আমি যাই নি তোর ঘরে । আম্মা ও যায় নি । মামি কিছু করেছে কিনা জানিনা ।
চোখ নামিয়ে চোখ খিচে বন্ধ করলো সংগ্রাম । একহাতে নিজের ঘাড় চেপে ধরলো । ওর অনুপস্থিতির সুযোগ এরা ব্যাতিত আর কে নিতে পারে ? আর কে তার বেগমের এই দূর্বলতা সম্পর্কে জানে ?
নিজের ঘাড়ে নিজেই কয়েক টা চাপড় মারলো সংগ্রাম । অতঃপর এক মুহুর্ত অপেক্ষা না করে গটগটিয়ে বেরিয়ে আসলো ঘর থেকে । শ্যামা ঘরে একা । যদিও সে এখন জাগবে না আর । এখানে এদের সাথে বৃথা হম্বিতম্বি করে লাভ নেই ।
সংগ্রাম ঘর ছাড়তেই ফুসে উঠলো জুনাইদ । চোয়াল শক্ত করে দাঁত পিষলো । সংগ্রামের যাওয়ার পথে থুথু ফেললো থু করে । হিসহিসিয়ে উঠলো নিজের মায়ের উপর…
” তোমার ভাইয়ের ছেলের স্পর্ধা দেখলে ? ওকে কিন্তু ছাড়বো না আমি….
” কি করতে পারবি ওর ? একটা চুল ও তো ছিঁড়তে পারলি না এতো গুলো বছরে । বেকার বেকার ঐ সাত কপালি মেয়েটার পিছে লাগলি ! কি হলো এতে , সংগ্রাম কি এতোটাই বোকা ? আসল আর নকলের পার্থক্য বুঝবে না ? প্রথম দিনেই ও বুঝেছিল আমরাই ভয় দেখিয়েছি ঐ মেয়েটাকে । এখন এমনিতে ভয় পেলেও আমাদের ঘাড়েই দোষ আসবে । হাতি কাঁদায় পড়লে চামচিকেও লাথি মারতে ভোলে না । আর এ তো সংগ্রাম জোয়ার্দার । পনেরো বছর বয়সে মানুষ মারতে যার হাত কাঁপে না , ভয় লাগে না ,সে কি ছাড়বে আমাদের ভেবেছিস ? কাউকেই তো ছাড়ে না । নিজের মাকেও যোগ করলো আমাদের সাথে । সৈকতের জন্য আজও বেঁচে আছিস তুই ! এখন যা করবি ভেবে চিন্তে করবি । আপাতত হাত গুটিয়ে থাক কদিন….
ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ফেললো জুনাইদ ।
সকালের তৃপ্ত পাপমুক্ত হাওয়া । ফজরের আজান পড়েছে সবে । শ্যামা ঘুমিয়ে বিভোর হয়ে । শরীর খানা একটু গরম । সংগ্রামের শরীরের ভাঁজে লুকিয়ে উষ্ণতার মাত্রা বেড়েছে । আরামে ঘুমিয়ে সে । সংগ্রাম শ্যামা কে শক্ত করে জড়িয়ে মধ্য রাতের দিকে ঘুমিয়েছিল একটু । এখন আজানের ধ্বনিতে ঘুম ভেঙ্গে গেছে । আজই প্রথম আজানের ধ্বনিতে ঘুম ভাঙলো ওর । সংগ্রাম ঘুমন্ত চোখ দুটো খুলে তাকালো তার বেগমের দিকে । শ্যামলা চেহারা খানা শুকনো লাগছে শ্যামার । নরম ওষ্ঠ জোড়া শুকিয়ে কেমন খড়খড়ে দেখাচ্ছে । সংগ্রাম খানিক শীতল নেত্রে তাকিয়ে থেকে নিজের ওষ্ঠ যুগলের স্পর্শে ভিজিয়ে দিলো তার বেগমের শুকনো অধর ।
অতঃপর শ্যামার চুলের ভাঁজে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে উপরের দিকে চোখ তুললো ।
বিয়ে ? সংগ্রাম তো বিয়ে করতে চায় নি কখনো । কেনো করতে চায় নি হয়তো জানা, আবার হয়তো জানা নেই । লতিফা কাল রাতে বললো এই বাড়ির নাকি উত্তরাধিকার প্রয়োজন । যার জন্য নাকি শ্যামা কে বিয়ে করেছে সংগ্রাম । এটা কি আদৌ সত্যি ? একদম না । সংগ্রাম শ্যামাকে কি করে পছন্দ করে ফেললো ও নিজেও জানে না । আচমকা বিয়েও হলো শ্যামার সাথে । আচমকা না হলেও শ্যামা কেই বিয়ে করতো সে ।
সন্তান প্রয়োজন সংগ্রামের । তবে উত্তরাধিকারের জন্য নয় । তার বেগমের জন্য । বালা কে শহরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানে শ্যামার সম্বন্ধেও ডাক্তারের সাথে কথা বলেছে সংগ্রাম । শ্যামার এই মানসিকতার চিকিৎসা নেই । তবে ডাক্তার একটা সন্তানের কথা বলেছেন । যতো তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা বাচ্চা আসলে মানসিকতায় পরিবর্তন আসতে পারে প্রভাবের দ্বারা । ডাক্তারের কথায় আরো বেশি জোর চেপেছে সংগ্রামের মাথায় । সংগ্রাম বাচ্চা প্রিয় । সৈকত কে অনেক বেশি অনেক বেশি ভালোবাসে ও । গ্রামের যেকোনো বাচ্চা ওর নিকট অতি প্রিয় । সংগ্রামকেও খুব পছন্দ করে বাচ্চারা ।
ছাদের দিকে একদৃষ্টিতে অনেক টা মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো সংগ্রাম । আজান শেষ । শ্যামা টের পাচ্ছে না এখনো । না ডাকলে আলো না ফোটা অবধি টের ও পাবে না । সংগ্রাম চোখ নামিয়ে ওর বুকে গুটিয়ে থাকা শ্যামার পানে চাইলো । এক হাত শ্যামার গালে রেখে নিদারুণ কন্ঠে ডাকলো….
” ডালিয়া…?
একবার ডাকেই সাঁড়া পাওয়ার কথা নয় । সেটাই হলো । সাঁড়া এলো না । ফের ডাকলো সংগ্রাম । এবার একটু ঝাঁকিয়ে…
” বেগম , ওঠো…
শ্যামা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো । ঘুমের ঘোরে ঝট করে উঠলো । চোখ দুখানা মেললো টেনে টুনে । মাথা তুলে নিভু চোখে কাতুরে স্বরে জবাব করলো….
” হুম….
” উঠবে না ? আজান পড়েছে ! নামাজ পড়তে হবে তো…
ঘুম ভেঙ্গেছে শ্যামার । ও নড়েচড়ে উঠে বললো স্বজ্ঞানে….
” হুম । আমার নামাজ হবে না । আপনি পড়ে নিন…
বুঝলো সংগ্রাম । বেশি ঘাটলো না । শ্যামা ওর বুক থেকে আলগা হলো । শরীর টেনে উঠে বসলো । আলগা খোপাটা খুলে গেলো উঠে বসতেই । শ্যামা দূর্বল হাতে খোপাটা বাঁধলো ফের । পিছন না ফিরে খাট থেকে নেমে গোসল খানার দিকে এগোলো । সংগ্রাম আর ডাকলো না । শুয়ে থেকেই চেয়ে রইলো । মুহুর্ত কয়েক বাদ শ্যামা বেরোতেই উঠে বসলো সংগ্রাম । চোখ মুখ ডলে খাট থেকে নামলো । শ্যামা একবারও তাকাচ্ছে না ওর দিকে । এটা সহ্য হচ্ছে না । উদ্বিগ্নতা হীন নিরস নির্বিকার ভঙ্গি শ্যামার । মুখ মুছতে মুছতে আয়নার সামনে দাঁড়ালো ও । চোখ তুলে আয়নায় তাকাতেই সংগ্রাম কে দেখতে পেলো । সংগ্রাম ঠিক ওর কাছ ঘেঁষে পাশেই । শ্যামা ওর থেকে দৃষ্টি ফেরালো ।
শ্যামা কে নিজের দিকে ঘোরালো সংগ্রাম । নত মাথা চিবুক ধরে উঁচু করলো । শুধালো…
” কি হয়েছে, বেগম ?
” কিছু না ।
” মন খারাপ ?
” নাহ !
” তাহলে ?
তাকালো শ্যামা । চোখ দুখানা সজল । বললো ভেজা কন্ঠে…
” কিছু হয় নি । সরুন ।
শ্যামা নিজেকে ছাড়ালো । মাথা চক্কর কাটছে এখনো । বিছানা গোছানোর জন্য খাটের দিকে এগোলো শ্যামা ।
চাদর টা হাতে তুলতেই খপ করে ওর হাত ধরলো সংগ্রাম ।
” ছাড়ো , আমি গোছাচ্ছি !
” এসব আপনার কাজ নয় ।
” যা তোমার তা আমারও ।
ছেড়ে দিলো শ্যামা । কথা বাড়ানোর জোর হলো না । সংগ্রাম চাদরখানা ভাঁজ করে গুছিয়ে রাখলো । সোজা গোসল খানার দিকে এগিয়ে হাত মুখ ধুয়ে আসলো । শ্যামা নিচে নেমেছে বোধহয় চা বানাতে । সংগ্রাম আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো কিছুক্ষণ । মাথার চুল গুলো গুছিয়ে নিলো । এর মাঝেই শ্যামা হাজির । চায়ের কাপ টেবিলের উপর ঠক করে রাখলো ও । শ্যামা কে আয়নাতে দেখেই একটু হাসলো তার ছোট জমিদার সাহেব । গোঁফ পাকিয়ে হেলে দুলে এগোতে এগোতে বললো….
” সাহস যোগাতে বলেছিলাম , তা বলে এতো সাহস ? আমাকে রাগ দেখাচ্ছো ?
” রাগ দেখালাম কই ?
” খিটখিটে মেজাজ দেখিয়ে রাগ বোঝাচ্ছো না ? বাপের বাড়ি যেতে চাইছো , নিয়ে যাইনি বলে এতো অভিমান ?
কালকের ঘটনা শ্যামার মাথায় আছে কি না সন্দিহান সংগ্রাম । সন্দেহ কাটাতে বাপের বাড়ির প্রসঙ্গ তুললো সে । শ্যামার মুখখানা ভার । ভার মুখে অভিমান বাড়লো । গুরুগম্ভীর হলো কন্ঠ….
” অভিমান বুঝেছেন তো অভিমান ভাঙ্গান । নিয়ে যান বাপের বাড়িতে ।
সংগ্রাম বুঝলো যা বোঝার । ভার বুকটা হালকা হলো । ও চায়ের কাপে একটা টোকা মারলো । ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা ভাবলো । বাড়িতে এখনো কেউ ঘুম হতে উঠেনি হয়তো । সংগ্রাম এক মুহুর্তে কিছু একটার চিন্তা থেকে ঝট করে এগিয়ে আসলো । খপ করে শ্যামার হাত খানা ধরে বললো….
” চলো ।
বলেই নিয়ে যেতে লাগলো ওকে । শ্যামা পেছন পেছন পা মেলাতে হিমশিম খেয়ে তড়িতে শুধালো….
” আরে , কোথায় যাবো ? কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমায় ?
উত্তর করলো না সংগ্রাম । সোজা অন্দরের বাইরে এসে গাড়িতে চেপে বসলো । নিজে বসার আগে নিজ দায়িত্বে শ্যামা কে বসালো । গাড়ির ইঞ্জিন চালু করতে একটুও সময় পার করলো না ।
পুরোপুরি আলো ফোটেনি এখনো । আশপাশ নিস্তব্ধ । মসজিদে মুসল্লিরা নামাজ পড়ছে হয়তো । মসজিদের সামনে দিয়ে গাড়িটা চলে গেলো ছোট জমিদার সাহেবের । শ্যামা বিরক্তি নিয়ে বসে আছে । সংগ্রাম কে কিছু জিজ্ঞেস করবে না ও ! জিজ্ঞেস করলেও এই লোক কোনো উত্তর করে না । জিজ্ঞেস করে লাভটা কি ? মনে মনে ভেংচি কাটলো শ্যামা । ঠান্ডা নেই তেমন , তবে গাড়ি চলায় শা শা বাতাস লাগছে শরীরে । শিউরে উঠছে শ্যামা । শাড়ির আঁচল ঘাড় জড়িয়ে ভালোভাবে টেনে নিলো ও । সংগ্রাম বাঁকা চোখে তাকালো । আসার আগে শাল নেওয়ার কথা মাথায় ছিলো না ।
সংগ্রাম শ্যামা কে নিজের কাছে ডাকলো…
” আমার কাছে এসো বেগম….
উত্তর করা তো দূর , তাকালো ও না শ্যামা । মুখ বাঁকিয়ে চোখ ফেরালো । দুহাতে ঠান্ডা বাতাস নিবারণের চেষ্টা করছে বৃথা । চোখ মুখ ঠান্ডা হয়ে আসছে । শ্যামা শুনলো না দেখে সংগ্রাম আর ডাকলো না ।
এক হাতে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ ধরে অন্য হাতে শ্যামার বাহুতে হেঁচকা টান দিলো । ওকে এনে ফেললো নিজের বাহুডোরে । একেবারে কাছ ঘেঁষে কোমর জড়িয়ে বললো….
” ঠান্ডা নিবারণের জন্য আমি আছি তো । বৃথা চেষ্টা করছো কেনো ? আমার শরীরের ওমে উষ্ণ হও তুমি । গুটিয়ে থাকো আমার মাঝে..
গাড়িটা এসে থামলো বিশাল পাথারের মাঝে । জমিদার গ্রামের শেষ প্রান্তে । আঁকা বাঁকা গ্রামিন মেঠো পথ । পথের দুই ধারেই সারি সারি খেজুরের বিশাল বিশাল গাছ । গাছে আবার কলসি ও ঝুলছে । শ্যামা এক পলক তাকালো কলসির দিকে । রস ধরা হচ্ছে হয়তো । পাকা সরিষা মারার গন্ধ আসছে বাতাসে ভেসে । মেঠো পথের ধারে আটি আটি সরিষার খড় বেঁধে রাখা । জমিতেও অনেক । এখনো কোনো কোনো ক্ষেতে সরিষা কাঁটা হয় নি । কেমন বিষন্ন ভাব চারপাশে , রিক্ততার ছোঁয়া পরিবেশে । ভুট্টার আবাদ বেশি দক্ষিণের দিকটায় । সেদিকটা আবার সবুজে সবুজ । আউস ধানের চাষ করাও হচ্ছে ।
সংগ্রাম শ্যামা কে ছেড়ে গাড়ি থেকে নামলো । গাড়ি ঘুরে শ্যামার দিকে আসার আগেই নেমে পড়লো শ্যামা । মুখখানা এখনো ভার । ভেবেছিল সংগ্রাম ওকে বাড়িতে নিয়ে যাবে , কিন্তু না । নিয়ে তো গেলো না ।
সংগ্রামের আড়ালে ওর বুকে গুটিয়ে মুচকি হেসেছিল একবার , ভেবেছে সংগ্রাম দেখে নি । কিন্তু দেখেছে সংগ্রাম , চোখ এড়ায় নি ওর । সংগ্রামের সামনে ভার, অভিমানী হয়ে থাকতে বেশ ভালো লাগছে শ্যামার । নিজের প্রতি সংগ্রামের অধিক গুরুত্ব টুকু বেশ উপভোগ করছে সে ।
শ্যামা অদূরে তাকালো । ছোট্ট একটা পাঠশালা । ওদিক থেকে বাচ্চাদের স্বমস্বরে চেঁচানোর আওয়াজ ভেসে আসছে । চেঁচানো নয় , পড়ার আওয়াজ । জোরে জোরে গলা ফাটিয়ে পড়ছে তারা । পাঠশালা টা জমির মাঝে , খড়ের তৈরি । ফজরের পর পর এই শীতকে উপেক্ষা করে বাচ্চারা ছুটে যায় পড়তে । এই বয়সে ওরা পড়াশোনা টাকে দেখে না , বরং উপভোগ করে । মেঠো পথ পেরিয়ে গুটি গুটি পায়ে জমির আল বেয়ে নেমে ছুটে যায় পাঠশালায় । এটা শুধু ছোটদের জন্য ।
সংগ্রাম খুলে দিয়েছে এটা । সপ্তাহে একদিন না একদিন ও এখানে আসবেই সবার সাথে দেখা করতে । মাস্টার মশাই ও সংগ্রামের লোক । সংগ্রাম শ্যামা কে নিয়ে এগোতে গেলে আলতো করে বাঁধ সাধলো শ্যামা….
” ওদিকে কেনো নিয়ে যাচ্ছেন ? ওদিকে যাবো না আমি ।
” কেনো ?
খোলা পাথার একপাশে অন্য পাশেই জঙ্গল । শ্যামা একবার তাকালো জঙ্গলের দিকে । এভাবে এই অবস্থায় মেয়েদের বাড়ি থেকে বেরোতে নেই লোকে বলে । লোক বলতে কাকড়ি বুড়ি বলতো । শ্যামা তো বেরোতো না । ময়না ছোটাছুটি করতো , প্রত্যেক মাসে এই কটা দিন কাকড়ি বুড়ি বাড়ি থেকে বেরোতে দিতো না ওকে । ধরে বেঁধে রাখতো ।ভয় দেখাতো অনেক কথা বলে । অলকা বলতো না কিছু , তিনি বোধহয় কাকড়ি বুড়ির কথায় নীরবে সায় দিতেন । অপবিত্র শরীরে বাইরে বেরোলে নাকি দোষের হাওয়া লাগে । জঙ্গলে তো এসব দোষের অভাব নেই । তাদের আস্তানা সেখানেই ।
শ্যামা অবিশ্বাস্য মনেও বিশ্বাস করে এসব । ও দোনামোনা করে বললো….
” আমি অসুস্থ । এই অবস্থায় বাইরে নিয়ে এসেছেন । ওদিকে আর যাবো না ।
” তো কি হয়েছে । চলো তো…
” ভুত ধরবে,,ভুত । বুঝলেন ? পাশেই জঙ্গল ।
খানিক ভয় দেখানোর ভঙ্গিতে বললো শ্যামা । এক পলক তাকিয়ে থেকে হেসে ফেললো সংগ্রাম । বললো হাসি থামিয়ে….
” ভুতের কতো সাহস , আমি থাকতে আমার বেগমকে ধরবে । আমার বউকে ধরার অধিকার শুধু আমার । আসুক দেখি ভুত , ও কি তোমায় ধরবে , আমিই ওকে চেপে ধরবো । তোমার দিকে বাড়ানো হাত ওর কেটে ফেলবো আমি ।
” উহহহ…
” হুহহহহ
চলুন এখন বেগম । নতুন কিছু দেখাই আপনাকে ।
সবুজ ঘাসে আবৃত জমির মাঝে চিকন আল । শীত পড়ে ঘাসের পাপড়ি ভিজে গেছে । ভেজা দূর্বা ঘাসের উপর পা ফেললো শ্যামা । সংগ্রাম আগে আগে আর তার বেগম পিছু পিছু । শ্যামার হাত খানা শক্ত করে চেপে ধরে হাঁটছে সংগ্রাম । শ্যামা শাড়ি সামলে পায়ের দিকে তাকিয়ে হাঁটতে ব্যাস্ত । আলের একপাশের জমিতে আলুর চাষ , অন্যপাশে গমের । গমের গাছ গুলো কেমন খড়খড়ে হয়ে বিঁধছে । হাঁটতে অনেকটাই অসুবিধা হচ্ছে শ্যামার । সংগ্রাম বারবার পিছু ফিরছে ।
শ্যামার অসুবিধা বুঝে দাঁড়ালো ও । শরীর ঘুরিয়ে পুরোপুরি পিছনে ফিরলো । শ্যামার হাত ছেড়ে ঝট করে কোলে তুললো ওকে । আচমকা সংগ্রামের কান্ডে ভ্যাবাচ্যাকা খেলো শ্যামা । নিজেকে সামলে ধরে রাখতে গলা জড়িয়ে ধরলো সংগ্রামের ।
রাস্তা আর পাঠশালার মাঝামাঝি দূরত্বে দাঁড়িয়ে ওরা । শ্যামা কে কোলে করে সংগ্রাম হাঁটা ধরেছে আবার । রাস্তার দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে কৃষকরা আসছে । জমিতেই আসছে ওরা । হাতে কোদাল । আলুর ক্ষেতে আল বাঁধবে কৃষকের দল । ক্ষেতের মাঝে ছোট জমিদার কে দেখে তারা সকলেই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে এদিকে । তাদের ছোট জমিদারের সাথে তার বেগম ও আছে । শ্যামা কে কোলে নিতে দেখে খানিক লাজুকতায় হেসে ফেললো সকলে ।
শ্যামা মুখ লুকিয়ে বললো সংকোচে চোখ পিটপিট করে….
” কি করছেন । দেখছে তো সকলে ?
” দেখুক ।
লোকে দেখুক, সংগ্রাম জোয়ার্দার তার বেগমকে কতটা ভালোবাসে ।
দেখুক লোকে অবাক চোখে , কতটা ভালোবাসি তোমায় ।
” আমার প্রতি আপনার ভালোবাসা লোককে দেখানোর জন্য ?
ছাড়ুন তো , নামিয়ে দিন আমায় ।
লজ্জা নেই ?
” লজ্জা কিসের বেগম ?
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৩৪
সংগ্রাম কিছুতে কান দিলো না । সে এগিয়ে গেলো নিজের মতো । পিছনে একসাথে কয়েক জোড়া মুগ্ধ দৃষ্টি অবাক লোচনে তাকিয়ে তাদের ছোট জমিদারের দিকে । এই বুঝি তাদের ছোট জমিদারের বেগম ? তারা তো দেখে নি ! শুনেছে শুধু । শুনেছে ছোট জমিদার গিন্নি কালো । দূর থেকে তো দেখা যাচ্ছে না । আদৌ কি কালো ? কালোর প্রতি এতোটা ঝোঁক ছোট জমিদারের ? বলাবলি করলো সবাই , কালো হলে কি আর এভাবে ভালোবাসা দেখাতো নাকি ? ভালোবাসতো এভাবে ?
