Home পৌষপার্বণ পৌষপার্বণ পর্ব ৪

পৌষপার্বণ পর্ব ৪

পৌষপার্বণ পর্ব ৪
Irfa Mahnaj

— আমার পিছু করা বন্ধ করো হেম।
বনচাপাঁর কথা শুনে লুকিয়ে পিছু করা হেমন্ত বেরিয়ে আসে।
বনচাপাঁর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে,
— দেখলে চাপাঁ তুমিও আমার উপস্থিতি বুঝতে পারছো। এটার মানে কি জানো?
— কি? আর তুমি এভাবে আমাকে ডাকবে না। আমি বড় হই তোমার। আপু বলবে আমাকে।
— আমি পারবো না। এখন শোনো আমি কি বলি। তোমার মনেও আমার জন্য কিছু আছে তাইতো বুঝে গেলে আমি তোমার পিছু নিয়েছি।
হতাশ হলো বনচাপাঁ। সেভাবেই বলল হেমন্তকে,

— তুমি বুঝছো না কেনো বলোতো? তুমি ছোট এখনো হেম। ভালোবাসা বোঝার মতো বয়স হয়নি।
— আমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে ভালোবাসা বোঝার মতো।
— এটা মোহ তোমার।
— না।
— আচ্ছা আমার কথা শোনো মন দিয়ে।
— আমিতো সর্বদা তৈরি থাকি তোমার কথা শুনতে।
— সিরিয়াস।
— হুম বলো।
— তুমি এখনো একটা বাচ্চা…
— সেটা তোমার কাছে।
— আমার কথা শেষ করতে দেও।
— আচ্ছা বলো।
— আমি নিজেও ছোট বলতে গেলে। ভাবো মানুষ পাগল ভাববে আমাদের। বলবে নাক টিপলে দুধ বের হয় সে আবার করছে প্রেম তাও কিনা সিনিয়রের সাথে।

— আমি মানুষের কথা পাত্তা দেইনা।
— কিন্তু আমি দেই। আমার পিছু করা বন্ধ করো। তুমি বিয়ে করলে বউ খাওয়াবে কি?
— পিছু করা বন্ধ করতে পারবো না। আমিতো এখনই বিয়ের কথা বলছি না। আমি নিজেও জানি আমি ছোট। বড় হয়ে নিজের দাড়াতে দাড়াতে তোমায় যদি হারিয়ে ফেলি তখন। গ্যারান্টিরও তো ব্যাপার আছে। তাই একবার প্রতিশ্রুতি নিয়ে নেই।
রাগ উঠে গেলো বনচাপাঁর। সে হেমন্তকে বলল,
— তোমাকে বুঝানো আমার কাজ নয়। আমার থেকে দূরে থাকো।
বলে হনহন করে হাটা দেয়। হেমন্তও বনচাপাঁর পিছু হাঁটতে হাঁটতে জানায়,
— দূরে থাকা অসম্ভব।

বনচাপাঁ পৌষের ফ্রেন্ড। ওরা একই ক্লাসের সাথে প্রতিবেশীও।
পৌষদের পাশের বাড়িটিই বনচাপাঁদের। মাঝে শুধু একটা বিশাল বাদাম গাছ আছে।
বনচাপাঁ আজকে এসেছে বসন্ত আর হেমন্ত দুই ভাইয়ের জন্মদিনের দাওয়াতে খেতে যা ওদের বাড়ি থেকে পাশে একটু দুরে ফাঁকা জায়গায় করা হয়েছে।
সেখান থেকেই বাড়ি ফিরছিলো বনচাপাঁ। তখনই উপলব্ধি করে কেউ তার পিছু নিয়েছে।
ফলো করা ব্যাক্তিটি কে তাও বুঝতে বাকি থাকে না। এরকম কাজ শুধু একজনই করে।
হেমন্ত মনে হয় হাজারবার বলে ফেলেছে সে বনচাপাঁকে ভালোবাসে আর বনচাপাঁও তাকে প্রত্যেকবার মানা করে দিয়েছে।
বনচাপাঁ এই ছেলেকে বুঝাতেই পারছে না এত ছোট বয়সে কিসের প্রেম ভালোবাসা। আগে বড় হোক তারপর।
আর হেমন্তও বুঝাতে পারছে না একে বনচাপাঁ তার বড় তার উপর মেয়ে। ইন্টারের পর বেশির ভাগ মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেয়। তাকেও যদি দিয়ে দেয়!
বনচাপাঁকে হারানোর ভয়ে বয়সের গুল্লি মেরে সে বলে দিয়েছে কথাটা। তার একটাই কথা বনচাপাঁ তার সাথে প্রতিশ্রুতিতে আসুক।

সকাল বেলা~
আজ শুক্রবার হওয়ায় সবাই দেরিতে উঠছে। তাছাড়া কালকে দেরি করেও ঘুমিয়েছে সকলে।
কাকরা দিয়ে চুলগুলো কোনোরকমে আটকে বেগুনি রঙ্গা একটা থ্রিপিস পড়ে সবেই এসে বসেছে পৌষ।
বড়কাকি মানে পার্বণের মা ফাল্গুন তাকে নাস্তা দিয়ে গেলে পৌষ জিজ্ঞেস করে,
— বড় আম্মু মা কোথায়?
— তোর মা তোর বাবাকে নিয়ে মার্কেট গেছে।
খাবার চিবোতে চিবোতেই জানতে চাইলো,
— হঠাৎ?
— ওর কেক তৈরির জিনিসপাতি নাকি কিনতে হবে তাই।

এ বাড়ির সবাই চাকরিজীবী। আজ শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় বাড়িতেই সবাই।
পার্বণের বাবা বৈশাখ কর্পোরেট অফিসে জব করেন। আর মা ফাল্গুন পপুলারে চাকরি করে।
পৌষের বাবা জৈষ্ঠ্য একজন ডাক্তার। পৌষের মা বর্ষার নিজস্ব পেইজ আছে কেক, মিষ্টি, স্ন্যাকস এসবের বিক্রি করেন। হোমডেলিভারির সার্ভিসও আছে।
হেমন্ত ও বসন্তের বাবা আষাঢ় একজন ব্যাংক কর্মকর্তা। আর তাদের মা মাঘ একজন শিক্ষিকা।
পৌষের বড় ভাই ভাদ্র আগে কিছু না করলেও বউয়ের দায়িত্ব ঘাড়ে পড়ায় একটা শো রুমে সেলস ম্যানেজারের কাজ নেয়।
ভাদ্র এখনো ভার্সিটি স্টুডেন্ট হওয়ায় এর থেকে ভালো কাজ পায়নি। তবে পরিবার থেকে সে সাপোর্ট পেয়েছে।
বলেছে কোনো কাজই ছোট নয়। চৈত্র নিজেও একটা পার্লারে কাজ করে। জামাই বউ দুজনের এতে দিব্যি চলে যায়।
পৌষ পার্বণ ও কিন্তু বসে থাকে না। মায়ের সব হোম ডেলিভারি গুলো পৌষই তো দেয়। সাথে সহযোগী পার্বণ।

খাওয়ার মাঝে পিছ দিয়ে মাথায় কেউ গাট্টা দিতেই “উহ” করে উঠে পৌষ।
পৌষের মাথায় মেরে অতি গর্বের সহিত এসে তারই পাশে চেয়ার টেনে ধপ করে বসে পড়ে পার্বণ।
খেঁকিয়ে উঠলো পৌষ,
— ওমাগো! পার্বণের বাচ্চাআআ তোকে তো।
বলে নিজেও পার্বণের পিঠে একটা কিল বসিয়ে দিলো পৌষ।
ব্যাথা না পেলেও নাটকীয় ভঙ্গিমায় পিঠে হাত ডলে পার্বণ বলে,
— কি জল্লাদরে আমার পিঠটা একদম শেষ করে দিলো।
মুখ মোচড় দিয়ে পৌষ বলে,

— বেশ করেছি।
— প্রেম করেছি
— কি?
— কিছু না তোর মাথা।
ওদের এই ঝগড়ার মাঝেই ফাল্গুন সেখানে আসে। বলে,
— এই তোরা আবার শুরু করলি?
— দেখো না এই খচ্চরটা আমার মাথায় মেরেছে।
— মা ও আমার পিঠে মেরেছে।
— আমার মাথায় আগে মেরেছে বলেই তো।
ফাল্গুন রেগে গিয়ে দুজনের উপরেই চিৎকার দিয়ে উঠে,
— এই চুপপপ!! দুটোতেই চুপচাপ খা।
কথা শেষ করে চলে গেলেন ফাল্গুন। ফাল্গুন চলে যেতেই পৌষ ভদ্র মেয়ের মতো খাওয়া শুরু করে। কিন্তু পার্বণ শয়তানি হাসি হাসে।
খেতে খেতেই খাবার গলায় আটকে গেলো পৌষের।হাত থেমে যায় তার। শরীর শিরশির করে উঠে।
কামিজের ফাঁক গলিয়ে নিজের খরখরে পুরুষালী হাত নিয়ে রাখে পৌষের কোমরে।
শুধু রাখেইনি খামচে ধরেছে কোমর। তোতলাতে তোতলাতে পৌষ জিজ্ঞেস করে,

— ক…কি করছিস?
— কি করছি? জানতে চাস?
বলে পৌষকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কোমরে আরেকটু জোরে চাপ দিয়ে ধরে। তারপর নিজের কাছে নিয়ে আসে।
তাতেও শান্ত হয় না পার্বণ। হঠাৎ পৌষকে নিজের উরুতে নিয়ে বসায়।
কোলে বসিয়ে পৌষকে পিছন থেকে সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরে পার্বণ। ঘাড়ে থুতনি ঠেকিয়ে কানের নিচে একটা ছোট চুমু আঁকে।
তারপর তমাটে পুরুষালী ঠোঁটটা নিয়ে ছোয়ায় কানের লতিতে। ধীরে ধীরে একদম লো ভয়েজে বলে,
— আদর করছি।
ঝটকা দিয়ে উঠে পৌষের শরীর। দু হাতে কামিজের দুই পাশ মুঠো করে চেপে ধরে চোখজোড়া খিঁচিয়ে বন্ধ করে রাখে।

পার্বণ এবার পিছনে পৌষের উন্মুক্ত পিঠের উপরের জায়গা টায় ঝড় তোলে।
নাক নিয়ে স্লাইড করে কিছুক্ষণ, কিছুক্ষণ ঘষতে থাকে। আর পৌষকে নিজের সাথে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
এর বেশি কিছু করার আগেই কলিংবেলটা বেজে উঠলে ছিটকে দুজন দুজনের থেকে দূরে সরে যায়।
পৌষতো মাথায় হাত দিয়ে কোনো রকমে খাবার গিলে দৌড়ে সেখান থেকে পালায়।
কিন্তু পার্বণ একদম চিল। কোনো ভাবান্তর নেই তার মাঝে।
উপরে ভাবান্তর না দেখা গেলেও ভিতরে ভিতরে নিজেকে ধিক্কার জানাচ্ছে।
সে করতে কি চেয়েছিল আর করছে টাকি? সে তো শুধু চিমটি কাটতে চেয়েছে বদলা নেয়ার জন্য।
কিন্তু ওই নরম ত্বক টা স্পর্শ করতেই সব গুলিয়ে ফেলে পার্বণ।
পার্বণ একটা হিসেব মিলাতেই পারে না পৌষকে কাছে পেলেই সব ভুলে যায়। আশ্চর্য! সে তো ওকে সহ্য করতে পারেনা।
তবুও ওর সান্নিধ্যে নেশা কাজ করে কেনো? ভুলে যায় সব। আর করে বসে একেকটা ভুলভাল কারবার।
হঠাৎই মনে পড়ে ও তো গতকাল রাতের জন্য সরি বলতে চেয়েছিল। সরি বলতে এসে আরেকটা সরির কাজ করে বসলো!
বিড়বিড় করে উঠলো,
— ওহ শিট!

এক পায়ে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে বসন্ত। সামনে আমের একটা চারা।
মুখ চোখ চূড়ান্ত পর্যায়ে অসহায় করে উপরের দিকে তাকিয়ে আছে সে।
বারান্দার রেলিং ধরে বসন্তের দিকেই তাকিয়ে আছে আম্রপালি।
বসন্ত বলে,
— জান সত্যি বলছি দাদাভাই যা বলেছে সব মিথ্যে ছিল।
তবুও বিপরীত পাশের হাওয়া ঠান্ডা হয়না। তখন জিভ দিয়ে নিজের ওষ্ঠ ভিজিয়ে বসন্ত বলে,
— দেখো বাবু তোমার জন্য আমের চারা নিয়ে এসেছি।
— ওই তোরে কতবার বলেছি আমাকে বাবু বলবি না। আমি কি তোর বাবু? আমি আমার বাপের বাবু।
জিভ কাটে বসন্ত। ইশরে ভূল হয়ে গেলো। কথা গুছিয়ে পুনরায় বলল,

— জান প্লিজ একবার শোনো আমার কথা।
আড়চোখে একবার বসন্তের দিকে তাকিয়ে আম্রপালি বলে,
— ঠিক আছে এক শর্তে মাফ করে দিবো।
চকচক করে উঠে বসন্তের চোখ। জিজ্ঞেস করে,
— কি শর্ত?
— তুমি যদি আমার ঘরে এসে ক্ষমা চাইতে পারো তবেই ক্ষমা করা হবে।
— অ্যা!
— অ্যা নয় হ্যাঁ।
— কিন্তু তোমার জল্লাদ বাপ তো ঢুকতেই দিবো না।
— সেটা তোমার ব্যাপার আমি জানিনা।
কথাটা বলেই আম্রপালি চলে যায়। আর সাথে বসন্তকে একটা বাশ ধরিয়ে দিয়ে যায়।

চৈত্রের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পৌষ ডাকে,
— চৈত্র আপা আসবো?
বেডের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে মোবাইল দেখছিলো চৈত্র।
পৌষের ডাক শুনলেই চৈত্র বলে,
— তোর আবার অনুমতি লাগে নাকি? আয় ভিতরে আয়।
ভিতরে গিয়ে চৈত্রের পাশের জায়গায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ে পৌষ।
— কি করছো তুমি?
পৌষের কথার জবাবে ফোনটা অফ করে সাইডে রেখে উঠে বসে। কোলে কোলবালিশটা নিয়ে উত্তর দেয় চৈত্র,
— রিলস দেখছিলাম।
— ওহ! ভাই কোথায়? আজ তো শুক্রবার।
— কোথায় আবার বন্ধ দেখে বন্ধুদের সাথে বাইরে গেছে ঘুরতে।
কাত হয়ে শোয় পৌষ। কনুই বিছানায় ঠেকিয়ে হাতের তালুর উপর মাথা দিয়ে বলে,

পৌষপার্বণ পর্ব ৩

— আপা ভাইকে নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছো না কেনো কোথাও?
— তোর ভাই বুঝি ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার লোক?
— আহা রাজি করাও।
— মতলব কি তোর?
— তোমাদের সাথে ঘুরতে যাবো। জানোই তো মা ছাড়তে চায়না।
— তাই বল। আচ্ছা দেখি।
— দেখি না পাক্কা কথা দেও।
— আচ্ছা যা।
খুশি হয়ে যায় পৌষ। তারপর লাফাতে লাফাতে চলে যায়। ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হেসে উঠে চৈত্র।
— পাগল একটা!

পৌষপার্বণ পর্ব ৫