নীতিহীন রাজ শেষ পর্ব
আশিকা আক্তার সোহাগী
সোনাগলা রোদে ঝিকমিক করছে একটা নেম্পলেট ‘নভ’। শান্তির পায়রাগুলি উড়ে রোজ এখানেই বসে।চাঁদ সূর্যের পালাবদল হয়েছে অনেক।বর্ষপঞ্জিকা স্থির নেই।তবুও দুঃখ , সুখের বাতাস বয় নিয়ম করে প্রতিবেলা।
শান্তি আর সুখের নভের কাজ ট্যাবে দেখতে দেখতে মেহেদী রাফিনের কাধে হাত রেখে বলে,
কাজ শেষ করতে আর কতদিন লাগবে? ‘
‘আলমোষ্ট ডান।’
‘আজ অন্য একটা হিসেব করেছি।’
রাফিন জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকায়।মেহেদী বলে,
‘আমার একসাথে দুইটা লোডিং।তারমানে তিনটা হবে।কিন্তু তোর একটা।আমি এগিয়ে আছি।সো কল মি বস!”
রাফিন মেহেদীর বাহুতে পাঞ্চ করে বলে,’ ভণ্ডামিতে তুই সেরা।সেই হিসেবে ভন্ডবস ডাকাই যায়।’
সেই মুহূর্তে নিবিড় প্রবেশ করে ভেতরে। সাদা পাতলা শার্ট পেছনে চলে গেছে কারণ পিঠে আব্দুল্লাহ ঝুলছে,বুকে আয়েশা চিপকে ধরে আছে।ডানহাতে উৎসব,বাম হাতে হিমন আর দুইপা জড়িয়ে জ্যাক আর রোজী। সবারই বয়স তিন ,আড়াই করে।ছয়টাকে একসাথে নিয়ে টিপে টিপে হেটে আসছে নিবিড়।রাফিন মুচকি হাঁসে নিবিড়ের কান্ড দেখে।মেহেদী ঘাড় চুলকে বলে,
‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পাশ নিবিড় ।হা*লা সব সময় কেমনে কেমনে জানি খালি জিতে যায়।’
নিবিড় কাছে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করে ,
‘কি বদনাম করিস আমার নামে?’
‘দেখ তুই আর জিয়ানা যেহেতু যৌথপ্রযোজনায় বাচ্চার বাপ মা হোস নাই তাই তোরা এই প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহন করতে পারছিস না।
‘রিডিউকোলাস’
বলে নিবিড় বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘ভেতরে দেখে আসো তোমাদের মম রেডি কিনা?’
জ্যাক আর রোজী নিবিড়কে ছেড়ে বলে,
‘ওকে ড্যাড।’
তারপর দৌঁড়ে উপরে উঠে যায়।বাকিরা এখনো চিপকে ধরে আছে নিবিড়কে।নিবিড় চারজনকেই নিচে নামিয়ে বলে ,’আপনাদের কি আলাদা আলাদা নোটিশ দিতে হবে?’
আয়েশা ভাঙা বাংলায় বলে,
‘আব্বু তুমি তো আমালে বলুনি? আমি তো আম্মু ডাকি ,জিয়ু আম্মু!’
পেছন থেকে আব্দুল্লাহ বলে,
‘আব্বা!তুমি হামাকও তো কইলা না?হামি কি হেতেরে মম ডাহিনি?হামি হেরে ডাহি আম্মা।’
হিমন টুকু টুকু করে তাকিয়ে বলে,
‘বাবা বাবা? আমাকে আলাদা বলতে হবে না।কিন্তু আমি মা না তোমার কাছে থাকতে চাই প্লিইইজ?’
উৎসব হিমনকে ধমক দিয়ে বলে,
‘ওই ফুড়ি হারাদিন খালি হাউখাউ খরো ক্যা? হেতেরা অংগো সবার মাও বাফ না?’
মেহেদী কান চেপে ধরে বলে ,’তোরা যাবি না আমি যাদু করে একটা এনাকন্ডা বের করবো?’
ব্যাস বাচ্চারা সব দৌঁড়াদৌঁড়ি করে উপরে উঠে যায়। মেহেদী বলে,
‘আমার কানে মনে হচ্ছে কথার বিস্ফোরণ হচ্ছে।এদের এভাবে অদ্ভুত প্রাণীতে পরিনত করছে কে?’
নিবিড় শার্ট ঠিক করতে করতে সোফায় বসে বলে,
‘কে আবার জিয়ানা।’
‘উদ্দেশ্য কি তোর পাগল বউয়ের? এভাবে এক এক বাচ্চাকে এক এক ডাক আবার আলাদা আলাদা ল্যাংগুয়েজ শিখাচ্ছে কেন?’
‘ওর বাংলাদেশের চৌষট্টি জেলার চৌষট্টিটা বাচ্চা লাগবে এবং সবার আলাদা আলাদা স্বতন্ত্র ভাষা হবে।এই ছয়টাকে নিয়ে আমার নাভিশ্বাস ,বাকি আছে আরও আটান্নটা। ‘
রাফিন নিবিড়ের পাশে বসে জিজ্ঞেস করে ,
‘তোরা কি সত্যি প্ল্যান করেছিস নিজেদের বাচ্চা আনবি না?’
‘জিয়ানা চায় না।ওর মতে যারা ইতিমধ্যে দুনিয়াতে এসে গেছে কিন্তু তাদের বাবা মা নেই তাদেরকে সে আশ্রয় দিতে চায়।শখের জন্য আরও দুইটা মানুষকে এই রোগশোকের পৃথিবীতে সে আনতে চায় না।’
‘এটম বোম বরাবরই অদ্ভুত। তার কথা বাদ। তোরও কি ইচ্ছা হয় না?’
মেহেদী ব্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে। নিবিড় মুচকি হেঁসে বলে,
‘তোকে কেন বলবো? তুই কি ইচ্ছা দেবতা?’
মেহেদী পা বাড়িয়ে লাত্থি দিতে যায় নিবিড়কে।রাফিন থামিয়ে সিঁড়ির দিকে ইশারা করে। ফাইজার হাত ধরে ফারহানা নয় মাসের উঁচু পেট নিয়ে আস্তেধীরে নামছে। মেহেদী দ্রুত এগিয়ে যায় সেদিকে। ফাইজার কাছে থেকে ছাড়িয়ে নিজে ধরে নামিয়ে আনে।
এই তিনবছরে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়েছে।সম্পর্ক থেকে শুরু করে পারিবারিক সদস্য ,রাজনৈতিক থেকে সামাজিক মর্যাদা সবই ক্রমবর্ধমান ভাবে বেড়েছে।নিবিড় এখন সাভারের এমপি। কুলসুম রাজনীতিতে জড়াতে চায়নি।তাই নিবিড়ই জাতীয় নির্বাচন করেছে।এবং হাড্ডাহাড্ডি লড়ায়ে জয়ী হয়।জিয়ানা ক্রাইম রিপোর্টার সাথে অনেক গুলা নিউজ চ্যানেলের সিক্রেট ইনফরমারও।গ্রেজুয়েশন শেষ হয়েছে আরও বছর দুয়েক আগে।
জিয়ানা এখন আরও চতুর হয়েছে।এককথায় পাকা ঘুঘু। নিবিড়ের পাহারা টাহারায় কাজ হয় না।বরং নিবিড়ই জিয়ানার কাছে কট খেয়ে সুবোধ আচরণ করে।
মেহেদী আর ফারহানা এখন সুখী দম্পতি।রাফিন আর সাফাও ভালো আছে।তাদের ঘরেও এক পুত্র জন্মেছে।বয়স দুইবছর চলছে।ফিজানের বয়সন্ধিকাল শুরু হয়েছে।কন্ঠে একটা গড়গড় ভাব চলে এসেছে।দুই একটা দাঁড়ি-গোফ দেখা যায়।আর শরীরের পরিবর্তন দ্রুত হচ্ছে।বাবা চাচাদের মতো দীর্ঘদেহী হবে বুঝা যায়।পুরাতন নূর ম্যানসনের নাম এখন ‘নভ ‘। নভ মানে আকাশ।সেটাতে অরফানেজ চালু হবে। সেটার কাজ চলছে দ্রুত গতিতে।
নতুন নূর ম্যানসনের সব কিছু পরিবর্তন হয়েছে।শেফ থেকে বাড়তি স্টাফ সব ছাটাই করেছে জিয়ানা।খাওয়া দাওয়াতে এনেছে সিমপ্লিসিটি।বিলাসিতার নামে অহেতুক খরচ কমিয়েছে প্রচুর। এককথায় জিয়ানা কর্তৃ বনে গেছে। তবুও তার উল্টাপাল্টা কাজ থামেনি।
বিশেষ করে নিবিড়কে জ্বালিয়ে মারে।নিবিড়ও সেগুলোর শোধ করে অন্য উপায়ে।নিউবর্ণ বেবি তিনবছরে ছয়টা তারা এডপ্ট করেছে।প্রতিটা হাসপাতালে বলা আছে কোন নিউ বর্ণ বেবি অজ্ঞাত পরিচয়ে রেখে গেলে সবার স্থান হবে নভ তে।
আগামীকাল জিয়ানার কনভোকেশন। সে গোল্ড মেডেলিষ্ট।তাই শিক্ষামন্ত্রী তাকে গোল্ড মেডেল পড়িয়ে দিবে।পাঁচ বছর পর পর কনভোকেশন হয়।এই পাঁচ বছরে জিয়ানাদের ভার্সিটির গোল্ড মেডেলিষ্ট বারোজন।নিবিড়ের গর্ব হয়।আবার মাথাতেও আসে না জিয়ানা কিভাবে এর অল্প পড়ে সিজিপিএ ফোর আউট অফ ফোর উঠায়।এরপর ফাইনাল ডিফেন্সের সময় নিবিড় খেয়াল করে জিয়ানা খুব ছোট আন্সার দেয় তবে সেটা একেবারেই কারেক্ট আর অর্থবহ। এরপর কৌতুহল বসত জিয়ানার নোট খাতা ঘেটেছে।সুবিন্যস্ত সব নোট।
চমৎকার গুছিয়ে প্ল্যান করে জিয়ানা চললেও ঘরের মাঝে তার থেকে মেসি দ্বিতীয়টি কেউ নেই।এখানে সে গোল্ড মেডেলের থেকে বহুদূরে। নিবিড় দুইদিন শাস্তি হিসেবে রুম থেকে বের করে দিয়েছে।কারণ চিপস চকলেটের মোড়ক সব বিছানার নিচে ফেলেছে।সারাদিনের ছুটাছুটি আর সরকারি কাজ করে নিবিড় সন্ধ্যায় রুমে ঢুকে দেখে পুরো বিছানার জুড়ে চিপসের গুড়া ছিটিয়ে আছে।মোড়ক বিছনার নিচে।তেপায়ার উপরে এলোমেলো বই।
নিবিড়ের রাগী চেহারা দেখে জিয়ানা হাত দিয়ে ঝটপট ঝেড়ে বালিশের নিচে লুকিয়ে বোকা বোকা হাঁসি দেয় ।নিবিড় সেদিন রাগ সামলাতে পারেনি।তাই হাত ধরে টেনে রুমের বাহিরে বের করে দেয়।
জিয়ানার এতে মোটেও আত্মসম্মানে লাগেনি।তবে নিবিড়কে উচিত শিক্ষা দিয়েছে।যে অবস্থায় ছিলো সেই অবস্থাতেই বের হয়ে যায় ম্যানসন থেকে।রাস্তায় এসে দেখা হয় সাল্লু গুন্ডার সাথে।অনেক বছর পর জিয়ানাকে দেখে দাঁড়িয়ে যায় সে।গুন্ডামী ছেড়ে ব্যাংক লোন নিয়ে রট সিমেন্টের ব্যবসা শুরু করেছে।সমুদ্র যখন জিয়ানাকে কিডন্যাপ করে তার ডেরায় নিয়ে যায়,তখনই সাল্লু ভাইয়ের সাথে তার সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিলো।এরপর তিন/চার বার সাল্লুর দাদির কাছে জিয়ানা টাকা পাঠিয়েছিলো।তাই সাল্লুর কাছে জিয়ানা একটা আবেগ।কাচামাল কিনে শহর থেকে ফেরার পথে জিয়ানার সাথে দেখা।জিয়ানা এই সুযোগটাই কাজে লাগায়।তার বাইকে উঠে চলে যায় সাল্লুর গ্রামের বাড়ি।কোন প্রকার ডিভাইস সাথে ছিলো না।একেবারেই নেটওয়ার্কের বাহিরে চলে যায়।জিয়ানাকে না পেয়ে তিনদিনেই নিবিড়ের অবস্থা খাবি খাওয়ার মতো খারাপ হয়ে যায়।
নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে উন্মাদ হওয়ার পথে যখন তখন পার্টির এক ছেলে এসে খবর দেয় বনগাঁওয়ে একমাঠে জিয়ানকে বয়স্কদের শাড়ি পড়ে বাচ্চাদের সাথে মারবেল খেলতে দেখেছে সে।নিবিড় আর দেরি করেনি। সেখানে পৌঁছে দেখে বাচ্চাদের সাথে কাদা ছুড়াছুঁড়ি খেলছে।নিবিড়কে দেখে আঙুল নাচিয়ে বলেছিলো,’হাই ব্রো। হোয়াটস আপ?’
তারপর একদলা নরম কাঁদা পড়ে নিবিড়ের মুখে।
এরপর থেকে নিবিড়ের কঠিন শিক্ষা হয়েছে।এই পাগল অদ্ভুত মেয়েটা তার হরক্রাক্স। তার মাঝেই লুকিয়ে আছে নিবিড়ের প্রাণভোমরা।
উদ্ভট কাজ আরও আছে বহু ,সব বলে শেষ করা যাবে না।তবে আজ নূর ম্যানসনে ফ্রেন্ড এন্ড ফ্যামিলির নিয়ে একটা প্রোগ্রাম হবে। জিয়ানার জন্য মুলত নিবিড় এরেঞ্জ করেছে।সাথে একটা গেট টুগেদার হয়ে যাবে। হলরুমে সব তদারকি করে বাচ্চাদের নিয়ে ড্রয়িংরুমে এসে বসেছিলো নিবিড়।
রেবেকা এসে নিবিড়কে বলে জিয়ানাকে ডেকে আনতে।সে নাকি রেডি না হয়ে বাচ্চাদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে।ফস করে নাক দিয়ে একটা শ্বাস ছেড়ে উঠে যায় উপরে।রেবেকার কথায় ঠিক। সব বাচ্চার মাঝখানে বসে গল্প বলছে জিয়ানা।দরজায় হেলান দিয়ে নিবিড় তাকিয়ে থাকে জিয়ানার দিকে।হাত নেড়ে নেড়ে চোখ ছোট বড় করে কাহিনী বলছে,
‘টুনার অনেএএএক পিঠা খেতে ইচ্ছা হলো।তাই বাজারে গিয়ে তেল,চাল,নুন ,গুড় যাবতীয় জিনিস কিনে আনে।’
আব্দুল্লাহ হাত উঠিয়ে প্রশ্ন করে ,’আম্মা এডা প্রশ্ন হরি? এদ্দুন পাহি সোগ গইল হানে কিত্তে?’
জিয়ানা আব্দুল্লার মাথায় টোকা দিয়ে বলে,’কোন প্রশ্ন হরা যাইতো ন।’
তারপর আবার শুরু করে ,’বাসায় এসে টুনিকে সব দেয়।টুনি সব দেখে বলে,”লাকড়ি কোথায়? রান্না করতে লাগবে সেটা। যাও জঙ্গল থেকে লাকড়ি নিয়ে আসো।”
‘ওহ নো দেয়ারস আ টাইগার ওভার দেয়ার রাইট মম? আ’ম স্কেয়ার্ড।’
বলে রোজি জিয়ানার দিকে চেপে বসে।উৎসব কপালে হাত চাপড়ে বলে,’ ইগুলা ঢংজ্ঞি ফুড়ি নিয়া গপ্প হোননের মজা আছেনি? ‘
জিয়ানা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ দেখিয়ে আবার বলে,’ লাকড়ি নিয়ে ফেরার সময় বাঘমামার সামনে পড়ে যায় টুনা।হালুম!হালুম।এবার ছোট্ট টোনা ভয়ে কাপাকাপি শুরু করে। বাঘমামা তো রেগে মেগে আগুন।খপ করে টুনাকে চেপে ধরে বলে,’ইউ লিটিট পাঙ্ক ,হাউ ডিয়ার ইউ?আই উইল ইট ইউ নাও।’
টুনা কাপতে কাপতে বুদ্ধি করে বলে,’ইউর ম্যাজিস্ট্রি প্লিজ ফর গিভ মি।আমার বাসায় আপনার পিঠার দাওয়াত দিতে এসেছি।’
বাঘমামা তখন ছেড়ে দিয়ে বোকা হেঁসে বলে,’ওহো মাই ব্যাড।আই উইল ডেফিনেটলি কাম।’
জ্যাক বলে,’বাঘমামা ইজ টু মাচ সেল্ফিস। রাইট মম?’
জিয়ানা মাথা নাড়িয়ে বাকিটুকু বলে,’ পিঠা তো অনেক ইয়ামি হয়েছে তাই টুনা সব একাই খেয়ে ফেলে।খাওয়ার পর বাঘমামা আসে হালুম হালুম করে। তখন টুনার মনে পড়ে দাওয়াতের কথা।এরপর ভয়ে টুনিকে সব খুলে বলে।টুনি আর টুনা তখন তাড়াতাড়ি একটা মাটির বড় হাড়িতে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে।কিন্তু টুনা এত বেশি পিঠা খেয়েছে যে তার পেটে সব ডিসুম ডিসুম করে ফাইটিং শুরু করেছে।টুনা টুনির কানে কানে বলে,’আমার প্রচন্ড পুত পেয়েছে।কি করি?’
টুনি বলে চেপে চেপে আস্তে করে দাও।টুনা তাই করে।একটু পর আবার গুডুমুডু শুরু হয়।এবারও আস্তে করে দিতে বলে।কিন্তু বামে তো আর টিথ নেই।এন্ড অলসো দেয়ার ওয়াজ নো ব্রেক।ঠাস করে জোরে একটা ছাড়ে টুনা।মাটির হাড়ি বো*মের মতো বিস্ফোরণ হয়।আর বাঘমামা ভয়ে ওরে বাবারে বলে পালিয়ে যায়।’
বাচ্চারা সব একসাথে হেঁসে গড়াগড়ি শুরু করে।
একই কক্ষে যে নিবিড় এতক্ষন থেকে আছে এদের সেটা স্মরণে নাই।হাস্যরত বাচ্চাদের এবার কাতুকুতু দিচ্ছে জিয়ানা।
নিজের বাচ্চা চাই এই কথাটা নিবিড় আর বলতে পারে না। পারে না ঠিক তানা না। জিয়ানার একটা কথা একেবারে বলা বন্ধ করে দিয়েছে।
“নিজেদের শরীরের সাময়িক আনন্দে যে ভ্রুনের জন্ম তাকে বড় করা অতি সাধারণ প্রাকৃতিক ঘটনা। কিন্তু অন্যের আনন্দের অনাকাঙ্ক্ষিত ফলকে নিজের পরিচয়ে বড় করা অপ্রাকৃতিক ঘটনা। আমি মনে করি আপনি বা আমি সাধারণের নিয়মে চলি না।”
নিবিড় জিয়ানার দিকে তাকায়।এই মেয়েটা কখনো কাউকে কেয়ার করে চলে না।কিন্তু ওর মাঝে উদ্ধৃত ভাব নেই।কোন অহংকার কিংবা নিজেকে জাহির করার প্রবণতাও নেই।পটেনশিয়াল এই মেয়েটা গতানুগতিক নিয়মে চলে না।দুঃখ ওকে ছুলে দুঃখ নিজেই সুখে পরিনত হয়। অথচ নিবিড়ের সম্পুর্ন অপজিট। আস্তে ধীরে জিয়ানার কাছ থেকে শিখেছে কিভাবে অল্পে তুষ্ট আর দুঃখকে ভুলে থাকা যায়।
একসাথে নীলুফা ইয়াসমীন আর সাগর হকের হৃদয়বিদারক ঘটনায় জিয়ানা একেবারেই ভেঙে পড়ে।কিছুদিন সময় লেগেছে সবকিছু কাটিয়ে উঠতে।নীলয়ের জন্য সেটা দ্রুত সম্ভব হয়েছে।
নীলয় দীর্ঘদিন সূর্যের আলো থেকে দূরে থাকায় সে ভিটামিন ডি ডেফিসিয়েন্সি এর কারণে ডিপ্রেশনে ছিলো। মানসিক অবসাদ থেকে স্মরণশক্তি হ্রাস পায় অনেক।ডাক্তারের পরামর্শে নির্দিষ্ট সাপ্লিমেন্ট নিয়ে এখন সুস্থ। এইচএসসি দিয়ে গুম হয়েছিলো তাই লেখাপড়া আবার শুরু করে।স্থানীয় ন্যাশনাল কলেজে অনার্সে এডমিট হয়েছে।এখন থার্ড ইয়ার চলে।
সকল ভাবনা ঠেলে নিবিড় ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।গোসল সেড়ে টাওয়াল জড়িয়ে বের হয় রুম থেকে।তেপায়ার সামনে গিয়ে চুল সেট করে। জিয়ানা বারান্দা থেকে এসে দেখে নিবিড়ের রুপচর্চা। সে মেয়ে হয়েও এত পরিপাটি আর স্কিন কেয়ার কিচ্ছু করে না।
কাটকাট শরীরে সোল্ডারের আঘাতটা জ্বলজ্বল করছে।এই ক্ষতটা আকাশকে ভুলতে দিবে না আজীবন।বড় করে শ্বাস ছেড়ে দুঃখকে বাষ্পীভূত করে নিবিড়ের দিকে এগিয়ে যায়। নিবিড়ের নিতম্বে একটা চ*ড় দিয়ে বলে,’হাই সে*ক্সু?’
নিবিড় ঘুরে দাড়ায়।জিয়ানা বলে ‘একটা ম্যাজিক দেখবেন?’
নিবিড় ব্রু নাচায়।জিয়ানা কায়দা করে টাওয়ালের গিটে আঙুল দিয়ে ফট করে খুলে দিয়ে বলে,’খুল যা ছিমছিম,চিচিংফাঁক।’
নিবিড় মোটেও বিচলিত না হয়ে বলে,’এবার কেমন বোধ করছো?’
‘সুপার হট।’
নিবিড় জিয়ানার একেবারে কাছে দাঁড়িয়ে হাগ করে বলে,’এখন?’
‘ত্রিশ সেকেন্ড সময় আছে, মান ইজ্জত বাঁচানোর ইচ্ছা থাকলে আপনার গর্বিত জিনিস ঢেকে ফেলুন।’
নিবিড় ফট করে ফ্লোর থেকে টাওয়াল উঠিয়ে আবার জড়িয়ে ধরার সাথে সাথেই বারান্দার দোলনা থেকে আয়েশা আর উৎসব নেমে আসে রুমে। জিয়ানা ঠা ঠা করে হেঁসে উঠে বলে,
‘এঁভাড়?’
নিবিড় তাকিয়ে থাকে জিয়ানার হাঁসির দিকে। এই মেয়েকে দেখার সাধ তার মিটে না।অথচ প্রথম প্রথম দেখলে একদমই স্পার্ক বোধ করতো না।উফ রাফিনের সাথে জেদ না করলে লাইফ টাইম লস খেয়ে যেতো।নিবিড়ের মুচকি হাঁসা দেখে জিয়ানা হাঁসি বন্ধ করে বলে,
‘আপনি ইদানীং বিরক্ত হোন না কেন?’
‘শান্তির মেডিসিন খাই প্রতিদিন তাই।’
বলে জিয়ানার কপালে চুমু দেয়।আয়েশা আর উৎসব এসে জড়িয়ে ধরে দুইজনকে একসাথে।
‘টাইট করে বেঁধেছেন নাকি আবার চিচিংফাঁক হয়ে যাবে?’
বলে খিলখিলিয়ে হাঁসা শুরু করে জিয়ানা।
কিছু কিছু মানুষ বয়সের ভাড়ে কুজো হয়ে যায় না। প্রতিটা বছর অতিক্রমের সাথে সাথে চেহারায় দাগ ফেলে গেলেও ব্যাক্তিত্বে দাগ ফেলতে পারে না।কিন্তু বার্ধক্যে রোগের বাসা বাধবেই। শরীর থাকলে অসুখও থাকবে।সেটুকু ছাড়া উম্মে কুলসুম বেশ সচল।পোশাক আশাকে উনি বরাবরই সুরুচি খান।আজও একটা ক্রিম কালারের সাফোরা সিল্কের শাড়ি পড়ে হলরুমে এসেছেন।চকচক করছেন সবার মাঝে।সবার সাথে কুশল বিনিময় করছেন।
একসাইটে ফারহানাকে বসিয়ে এটা সেটা খাওয়াচ্ছে মেহেদী।তাদের সম্পর্ক ঠিক করেছে জিয়ানা।ফেইক ডিভোর্স পেপার নিয়ে ফারহানার হাতে দিয়ে বলেছে,’সাইন করে মেহেদীর রুমে রেখে আপনি লাপাতা লেডিস হয়ে যান।’
ফারহানা সেটাই করে।মেহেদী প্রথমে সেটাকে তোয়াক্কা না করলেও এক সপ্তাহ পর উদবাস্তু রুপে এদিক সেদিক ঘুরাফেরা করেছে শুধু। তার গার্লফ্রেন্ডদের খোঁজে বের করে,ফেইক পরিচয়ে মেহেদীর বর্তমান অবস্থা আর মসলা মিসিয়ে জানিয়ে দিয়েছে জিয়ানা।
ফলে মেহেদী যখন সরে আসার যোগাড় তারাও আর আগাইনি।আগে একবার মেহেদী ড্রাংক না হয়েও ড্রাংকের ভাব ধরে বাসায় আসে।সেরাতে ফারহানার সেবা যত্ন সে অনুভব করেছে।তখন থেকেই অনুতপ্ত ছিলো।রেবেকাও কথা কমিয়ে দেয়। ফলে মেহেদী বাপ্পারাজের মতো লনলি হয়ে ফারহানার কাছে গিয়ে ধরে বেঁধে নিয়ে এসেছে।কিন্তু ম্যান ইগো ছাড়েনি।নিজের ভুল স্বীকার সে করবে না কভুও।জিয়ানা মনে মনে হাসে এদের ম্যান ইগো দেখে। মচকাবে তবুও ভাঙ্গবে না।জিয়ানার সাথে নিয়ম করে তিনিবেলা ঝগড়া করবে মেহেদী।সে এখন বাংলাদেশ পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্রে একটা গবেষণা করছে।যদিও নামে পারমাণবিক কেন্দ্র কিন্তু সেখানে বাতাবি লেবুর বাম্পার ফলনের মতো গবেষণা হয়।তাই মেহেদী খুব হতাশ।
নিবিড় জিয়ানা আর তাদের ছয় ছানা এক রকম ড্রেস পড়ে হাজির হয় হলরুমে।তারা সবাই আজ জিয়ানা সেজেছে।ওভার সাইজ কালো ট্রি-শার্ট ,কার্গো প্যান্ট ,সানক্যাপ। এদের পোশাক দেখে সবাই একচোট প্রশংসা করলেও মেহেদী এসেই জিয়ানাকে পিঞ্চ করা শুরু করে। নিবিড় বাঁধা দিয়ে বলে,
‘দেখ ভাই ওকে যেহেতু পরিবর্তন করার সাধ্য আমার নাই তাই ওর মতো আমারই হয়ে গেছি।ঝামেলা করিস না। পরে পাজামা সেট পড়ে আসবে।’
এরমাঝে সেখানে হাজির হয় জেনি মক্কু আর তাদের তিনিছানা।
জিয়ানা সেদিকে তাকিয়ে হারিয়ে যায় সেই খারাপ সময়ে।মক্কুর স্মরণশক্তি একেবারে ছিলো না।কথা বলতেও পারতো না।প্রেগ্নেন্সির ধকল সামলিয়ে জেনি যেভাবে মক্কুকে কাউন্সিলিং করেছে সাক্ষাৎ শরৎচন্দ্রের নায়িকা।
এক্সিডেন্টের কয়েকদিন পরেই সবাই নীলুফা ইয়াসমিনের কথা জানতে পারে। তবে সেটা একেবারেই গোপন রাখে।নিবিড় খুব গোপনে সব সরিয়ে ফেলে।খুবই রিস্কের ছিলো পুরো ব্যাপারটা। সংগোপনে নীলুফা ,সাগর হক আর মামুনের শেষকার্য করা হয়।আর বাকি স্যাটানিজমদের কি করেছে সেটা জিয়ানা জানে না।মাসখানেক সে শয্যাশায়ী ছিলো।
জেনি জিয়ানার কাছে এসে হাত ধরে হাউমাউ করে কেঁদে মাফ চেয়েছে।জিয়ানা মনেই রাখেনি ওইসব।তবে দুরত্ব রেখে চলে।সে আর কারো সুখে বাগড়া দিতে চায় না।আত্মীয়তা রক্ষা করার জন্য যা করতে হয় সব করে।জেনি বুঝতে পারে জিয়ানা এখন আর আগের মতো অধিকার দেখায় না।তাই নিজে থেকে জোর করে সবসময় জিয়ানাকে কাছে টানে।কথায় আছে বন্ধুকের গুলি আর কথা একবার বেরিয়ে গেলে সেটা আর ফেরত নেয়া যায় না।
জেনির যখন পাঁচ মাস চলে,এনামেলিস্ক্যানের সময় ঘটে এক অঘটন।ডাক্তার জানায় বেবি খুব কুৎসিত হবে।অনেকগুলা হাত পা হবে।ইনভেলিড হয়ে জন্ম নিবে।জিয়ানা তারাহুরো করে সেখানে যায়।গিয়ে দেখে এক অদ্ভুতদর্শন। জেনির কথায় সেদিন জিয়ানা একটা চমৎকার দিক রিয়ালাইজড করেছে।আঞ্জুমান বুঝাচ্ছিলো এমন বাচ্চা জন্ম হলে সবার জন্য অভিশাপ সেটা।এবরসন করে ফেলায় ভালো হবে।জেনি কাটকাট গলায় বলেছে,
‘আল্লাহ যদি এমন সন্তানের জন্য আমাকে নির্বাচন করে থাকেন তবে তাকে আমি জন্ম দিবোই আম্মু।সে যেমনই হোক আমার অংশ ,আমার সন্তান। ‘
এরপর আর ডাক্তারের দিকে মুখ করেনি জেনি।নামাজের বসে অকুল হয়ে কেঁদেছে স্বামী সন্তানের জন্য।যত অভিযোগ আর কষ্ট সব জানিয়েছে আরশের মালিকের কাছে।
এরপর ঘটনা অবশ্য মিরাক্কেলিও চমৎকার। ডেলিভারির সময় মক্কু হাটাচলা অল্প করতে পারে। যদিও কথা এখনো জড়িয়ে আসে।মুখ অল্প বেকে যায়।সবাইকে ততদিনে চিনে ফেলেছে।প্রথম যেদিন বুঝতে পারে তাদের সন্তান আসবে সেকি কান্না তার।জিয়ানার কাছে পৃথিবীতে সবচেয়ে খারাপ জিনিস লাগে পুরুষের চোখের জল।নীলুফার লাশ নিয়ে নিবিড়ের কান্নায় সেদিন সেটা সে বুঝেছে।এরা সব করতে পারে তবে কাঁদলে দুনিয়া নড়েচড়ে উঠে।পুরুষের কান্নার চেয়ে করুন কোন দৃশ্য হতেই পারে না।
ওটি থেকে নার্স সাদা তোয়ালে জড়িয়ে একটা পুতুল এনে দেয় মক্কুর কোলে।এরপর আরেকটা আনে।সবাই অবাক।এবার যখন আরেকটা বের হলো সবার চোখ সপ্তম আকাশে।দুইটা ছেলে একটা মেয়ে ট্রিপলেট বেবি জন্ম দেয় জেনি।এইজন্যই ডাক্তার বলেছিলো অনেক গুলা হাত পা। একদম ছোট থাকায় শরীর পরস্পরের সাথে লেগেছিলো বিধায় মনে হয়েছে এক বডি।
জিয়ানা এগিয়ে যায় জেনিদের দিকে।জিয়ানা এই ট্রিপলেট বেবিদের ডাকে ‘চেরিস’। ছেলেরা মক্কুর মতো হয়েছে কিন্তু মেয়েটা জেনির ফটোকপি।তারাও জিয়ানা বলতে অজ্ঞান।
জেনি এসেই জিয়ানার বাহুতে চ*ড় দিয়ে বলে,’আজকেও এমন ড্রেস পড়েছিস কেন?আক্কেল….
জেনির চোয়াল ঝুলে যায় নিবিড় আর তাদের বাহিনীকেও একই পোশাকে দেখে।মক্কু সালাম দিয়ে হেঁসে বলে,
‘এমপি সাহেব আগামি নির্বাচনে তো আর অন্য ভোটারের দরকার পড়বে না।নিজের বাহিনীই যথেষ্ট। ‘
নিবিড় মক্কুর পিঠে চাপড় দিয়ে বলে,’আর তোর যে একবারেই বাম্পার ফলন।’
‘আল্লাহর রহমত ভাই।’
এরমাঝে এসে হাজির হয় মিম, আকাশের বাবা মা আর আকাশের অংশ তোয়জ।বয়স দুইবছর পাড় হয়েছে।তোয়জ মানে হচ্ছে মেঘ।আকাশের বুকে ভেসে থাকা শুভ্র সাদা তোয়জ।মিম আর আকাশের কম্বিনেশনে একটা তুলুতুলু বেবিগার্ল।প্রচন্ড দুরন্ত বাচ্চাটা।মিমের বুক জড়িয়ে থাকে সবসময়। সবাই বলে স্বভাব আকাশের মতো হয়েছে। আকাশের বাবা মা এই এক টুকরা মেঘকে আগলিয়েই বেঁচে আছে।তবে উনারা মিমের বিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে।তারা নিশ্চয়ই নিজের স্বার্থে একটা অল্পবয়সী মেয়েকে আটকে রাখতে পারে না।কিন্তু এই ভালো চাওয়াতে হিতের বিপরীত হয়েছে। মিম রাগ করে তোয়জকে নিয়ে বাসা থেকে বেড়িয়ে যায়।এরপর আকাশের বাবা মা আর বিয়ের নাম মুখে নেয়নি।
নিবিড় মিমের দিকে যাওয়ার আগে ছু করে একজন মাঝখানে এসে তোয়জকে কোলে নিয়ে নেয়।সে আর কেউ না ইয়াসির নীলয়।সাদা পাঞ্জাবি পড়া মেইল জিয়ানা।চেহারা থেকে সব একই রকম।তবে স্বভাব একেবারে জিয়ানার বিপরীত। ধীর ,স্থীর ,নম্র ,ভদ্র। কথা তেমন বলে না।নিবিড়,মেহেদী আর এই তোয়জের সাথেই তার সকল খাতির।সুস্থ হয়ে জিয়ানাকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলো নীলয়।সে কি জানতো তার কেউ আছে?সারাজীবন নিজেকে এতিম আর একা ভাবা নীলয় কি ঘুনাক্ষরেও জানতো ,একই উদরে নয়মাস কেউ তার সাথে ছিলো?তারই মতো একজন অতি আপনজন একই আকাশের নিচে আছে? জীবন শুধু নেয় না , কখনো কখনো কাউকে দুহাত ভরেও দেয়।এই যে বিশ বছর অতিক্রম করার পর জানতে পারে তার টুইন সিস্টারের কথা।
নীলয় একবার আড়চোখে মিমের দিকে তাকায়।আজও গোমড়া মুখে নিষ্পল ভাবে তাকিয়ে আছে মেয়েটা।টেনে হাত খোপা করা। সবসময় মহিলাদের মতো এমন পেচিয়ে চুল আটকিয়ে রাখে কেন এই মেয়ে?নীলয়ের খুব শখ মিমকে হাঁসতে দেখা।যেমন করে তোয়জ সবসময় ছটফট করে হাঁসতেই থাকে তেমন না হোক কখনো মুচকি তো হাসতে পারে?
‘পাপা? পাপা?’
তোয়জ কোল থেকে ডেকে উঠে নীলয়কে। মিম ধমকে উঠে তোয়জকে কড়া গলায়।ধমক খেয়ে ঠোঁট ভেঙে কেঁদে দেয় বাচ্চাটা।নীলয় রাগী চোখে তাকিয়ে মিমকে বলে,
‘বাচ্চারা কি বুঝে কিছু? ফারদার ওকে ধমকাবেন না। ‘
বলেই তোয়জকে নিয়ে সেখান থেকে অন্যদিকে চলে যায়।আকাশের বাবা মা পেছন থেকে মুচকি হাঁসে। নীলয়কে তাদের পছন্দ বেশ।তার নানা আকার ইঙ্গিতে সবাই বুঝতে পারে। বুঝে না শুধু মিম।
দূর থেকে জিয়ানা সবটা দেখে মুচকি হাঁসে। তার ভাই গেছে।গেছে তো গেছে এমন জায়গা ,যেখানে আগ্নেয়গিরি গলিত লার্ভা উর্বর জমিকে পাথুরে বানিয়ে দিয়েছে।
জিয়ানা নীলয়ের দিকে এগিয়ে গিয়ে তোয়জের গালে টেপ করে বলে,’ব্রো তোর আর আমার লাইফ সিমিলার ফ্লেবার পাচ্ছি।আমাদের কোন কিছুই সহজে হয় না।তোয়জ বেবি পাপাকে কেমন লাগে? পাপা তোমাকে আদুল কলে?’
জিয়ানাই তোয়জকে শিখিয়ে দিয়েছে পাপা ডাকতে।প্রথম থেকেই নীলয়ের ভাবমূর্তি সে ধরতে পেরেছিলো।নীলয় জিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে,
‘জিয়ানা ওইসব ফাজলামি আর করিস না।উনি মনে হয় খুব বিরক্ত হয়।’
‘রাখ তোর বিরক্ত। আমাকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থা*প্পরও খেতে হয়েছে জানিস? এখন সেই থা*প্পড় ওয়ালা দেখ আমার সাথে মেচিং ড্রেস পড়ে স্কোয়াড নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।শুরুটা যত কঠিন শেষটা ততটাই সরল আর সুন্দর। একটা দুঃখী মেয়ের মন পাওয়া আর বিনা খরচে ইউনিভার্স ট্রাবেল করা একই কথা।তুই এগিয়ে যা জিয়ানা আছে তোর চারপাশে।বার্ষিক উষ্ণতা যখন বাড়বে বরফ আপনা আপনি গলবেই।ফিকার নট ব্রো।সব ব্যাথারই মলম আছে।টাইম হিলস এভ্রিথিং। সময়টা আগে আসুক।
খাওয়া দাওয়ার সময় জিয়ানা আঞ্জুমান আর জিয়াউলের পাশে বসে খাচ্ছে।বরাবরের মতোই মুখ ভরে ভরে খাচ্ছে।নিবিড় চোখ দিয়ে শাসিয়েছে। কিন্তু ওইসব জিয়ানা কোন কালেই গায়ে মাখেনি।ন্যাকাদের মতো সামনের দুইদাঁত দিয়ে ভঙ্গ করে খাওয়া তার পোষাবে না।আঞ্জুমান জিয়ানাকে বলে,
‘এতিমখানা করছিস ভালো কথা তাই বলে নিজেদের বাচ্চা লাগবে না? ‘
‘না আম্মু।’
‘কেনো?নিবিড়েরও তো একটা ইচ্ছা থাকতে পারে? ‘
‘যদি তাদের ভাগ্য আমার কিংবা নিবিড়ের মতো হয়? আমি ঘরপোড়া গরু সিঁদুরের মেঘ দেখে ভয় পাই।’
নিবিড় থেমে যায় জিয়ানার পাশে। উঠে এসেছিলো জিয়ানাকে বকবে বলে।কিন্তু এটা কি শুনলো? জিয়ানা বুঝতে পারে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে তাই স্বাভাবিক করতে বলে,
‘বাচ্চা নিবো এক শর্তে।আমি পেটে ধরবো কিন্তু ব্রেষ্ট ফিডিং যদি তোমাদের জামাই করাতে পারে তবেই।একা আমি সব করবো আর সে আমার বাচ্চা আমার বাচ্চা বলে বেড়াবে। সেটা হবে না।’
জিয়াউলের হিচকি শুরু হয় জিয়ানার কথা শুনে।নিবিড় দ্রুত প্রস্থান করে সেখান থেকে।জিয়ানা জিয়াউলের পিঠে চাপড় দিয়ে বলে,’তাছাড়া তোমাদের মতো তো আর ভালো বাবা মা হতে পারবো না।নিজের আর ধার করা ছেলে মেয়েদের মাঝে যদি বায়াসাড হয়ে যায়? থাক বাদ দাও।এমনি দিব্বি আছি।এত রিস্কি কে নেয়?’
জিয়াউল আর আঞ্জুমান মুখ চাওয়া চাওয়ি করে।
খাওয়া দাওয়া শেষে মেহেদী নিবিড় আর রাফিনের গানের পাল্লাপাল্লি শুরু হয়।
সাফা তার ছেলেকে নিয়ে নাস্তানাবুদ। রাফিন আর সাফা দুইজনই ধীরস্থির মানুষ।অথচ তাদের বাচ্চা হয়েছে সাইক্লোন।সাফা দুইমিনিট কোথাও বসতে পারে না এই বাচ্চাকে নিয়ে।সাফার ছুটোছুটির পেছনে দুইজন মানুষ এসে দাঁড়ায়।
জিয়ানা পকেট থেকে ফটাফট রুমাল বের করে নিবিড়ের চোখ বেঁধে দেয়।হাত ধরে টেনে এনে সামনে নিয়ে দাঁড়ায়।নিবিড়কে বলে দুইহাত মেলে দেন।নিবিড় কেনো জিজ্ঞেস করলে বলে ,’আপনার বাহুতে আজ আপনার জান্নাত ঢুকবে তাই।প্লিজ ডু ইট?’
নিবিড় হাত দুইদিকে মেলে দেয়।আগন্তুক একজন এগিয়ে আসে।প্রতি কদমে স্মৃতি ,কষ্ট,আক্ষেপ,শূন্যতা আর একবুক হাহাকার পৃষ্ঠ হচ্ছে।
সাফার যখন লিভার পেইন উঠে বাসায় সেদিন উম্মে কুলসুম ,রেবেকা ,নিবিড় আর জিয়ানাই ছিলো। নিবিড় সাফাকে পাজাকোলে করে গাড়িতে করে হাসপাতালে যায়।সেদিন সে ক্লিনিকের বাচ্চা প্রসবের একটা চার্টের ছবি দেখে রিয়ালাইজড করে , বাচ্চা প্রসবের সময় ৫৭ ডেল ব্যাথা অনুভূত হয়। যা বিশটি হাড় ভাঙার সমান। নিবিড়ের সামান্য মাংসে গুলি লাগায় যদি মরণ যন্ত্রণা হয় তবে তাকে জন্ম দিতে তার মায়ের কি রকম অসহনীয় ব্যাথা সহ্য করতে হয়েছে? মাথা চেপে ধরে বসে পড়েছিলো নিবিড়।অন্যকিছুর জন্য না হোক শুধু মাত্র পেটে রাখার ঋণটা কি নিবিড় কোনভাবেই শোধ করতে পারবে?
সেদিন প্রথম নিবিড়ের ভেতরে তার মায়ের জন্য প্রচন্ড ছটফটানি অনুভব করে।
এরপর জিয়ানার খাতিরে শেহনাজ স্বপ্নার সাথে কথা বলেছে বেশ কয়েকবার।অনভ্যাস কিংবা জড়তায় নিবিড় শুধু হুম হা করে গেছে।
একদিন জিয়ানকে নিবিড় শাসায় যাকে তাকে হাগ কেনো করে জিয়ানা? বাচ্চা বুড়া মেয়ে হোক বা মহিলা নিবিড়কে ছাড়া কাউকেই হাগ করা যাবে না।সেদিন জিয়ানা জিজ্ঞেস করেছিলো,’আপনি কাউকে জড়িয়ে ধরেন না?’
‘না। আমি এই জীবনে শুধু মাত্র আমার বউকেই ধরি।’
‘আপনার মাকেও ধরেননি?’
‘আমাদের কি সে সম্পর্ক ছিলো?’
জিয়ানা সেদিনই ঠিক করে এই মা ছেলের মনের হাহাকার দূর করবে।
শেহনাজ স্বপ্না নিবিড়ের বুকে ঢুকে যায়।পেছনে শফিক আহমেদকে দেখে জিয়ানা বলে,’বেটার লেট অলয়েজ লেট?’
জবাবে শফিক আহমেদ আট্টহাসি দিয়ে একটা খাম দেয় জিয়ানার হাতে।
নিবিড় নিজের চোখের কাপড় সরিয়ে স্বপ্নাকে দেখে থমকে যায়।কি সুন্দর হয়েছে তার মা।শরীর থেকে মিষ্টি একটা গন্ধ বের হচ্ছে।মনে হচ্ছে জন্মজন্মান্তরে চেনা সে গন্ধ।নিবিড় জড়তায় দুইহাতে ধরতে পারে না স্বপ্নাকে।
জিয়ানা সেটা দেখে পেছন থেকে নিবিড়ের হাত বন্ধ করে দেয় স্বপ্নার পিঠে।নিবিড় স্বপ্নার মাথায় ঠোঁট ছুয়ে নরম সুরে ডাকে,’আম্মু?কেমন আছো?’
স্বপ্না শরীর কেঁপে হো হো করে কেঁদে উঠে। সেই কাপনে ত্রিশ বছর ধরে মা আর ছেলের মাঝে গড়ে উঠা প্রাচীর ভেঙে পড়ে হুড়মুড় করে।উপস্থিত সকলের মুখে হাঁসি আর ভেজা চোখ নিয়ে দেখে এই দৃশ্য।
স্বপ্না নিবিড়ের বুকে হাত বুলিয়ে বলে,’তুই কবে এত বড় হলি আব্বু? দেখ আমি তোর বুক পর্যন্ত?’
নিবিড় মুচকি হাঁসে। সেই সাথে মুচকি হাঁসে ফেলে আসা বিষাদের শৈশব।
শফিক আহমেদ জিয়ানাকে খামটার দিকে ইশারা করে খুলে দেখতে।জিয়ানা সেটা খুলে অবাক নেত্রে তাকায়।মোটা এমাউন্টের একটা ব্যাংক চেক।
স্বপ্না নিবিড়কে ধরেই বলে,ওইটা নাও জিয়ানা।অরফানের জন্য আমাদের পক্ষ্য হতে একটা ফান্ড।’
আকাশের বাবা এগিয়ে এসে বলে,’আমরাও একটা ঘোষণা দিতে চাই?আমাদের একটা ক্লিনিকের নাম হবে ‘নভ’ যার সকল আয় ব্যায় হবে নভের বাচ্চাদের জন্য।এবং সেখানে বাচ্চাদের যাবতীয় ট্রিটমেন্ট ফ্রি।’
উপস্থিত সবাই হাত তালি দিয়ে উঠে।জিয়ানা নিবিড়ের দিকে তাকায়।উম্মে কুলসুম এসেও বলে,’আমার অল্প কিছু সেভিংক্স আছে।যেগুলা কখনোই আমার কাজে আসবে না।তাই সেগুলো আমি বাচ্চাদের দিতে চাই।’
মাইমুনার হাজবেন্ড তাশজিদ এগিয়ে এসে বলে,’বাচ্চাদের যাবতীয় পরিধেয় সব যাবে আমার গার্মেন্টস থেকে।’
জিয়ানার চোখে পানি জমা শুরু করে।মক্কু বলে,’আমি গরীব তাই প্রতি শুক্রবার বাচ্চাদের খাওয়ানোর দ্বায়িত্ব আমার।’
মেহেদী জিয়ানার ভেজা নেত্র দেখে এগিয়ে এসে জিয়ানার মাথায় টোকা দিয়ে বলে,’আমি ওদের গবেষণা মূলক শিক্ষা দিবো।রাফি দাও সাহায্য করবে।’
জিয়ানা চোখ মুছে বলে,’আপনার মতো গরুবেষক যদি বাচ্চাদের পড়ায় তবে তারা আস্ত মানুষের বাচ্চা থেকে গরুর বাচ্চাই পরিনত হবে।’
মেহেদী নিবিড়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘দেখলি কেমন অকৃতজ্ঞ? ‘
নিবিড় মাথা নাড়িয়ে বলে,’তোর বোন যে এইজন্য।’
জিয়ানা আর মেহেদী একসাথে তেড়ে যায় নিবিড়ের দিকে।বাচ্চারাও ছুটোছুটি শুরু করে ওদের সাথে।আয়েশাকে চ্যাংদোলা করে নিবিড় ছুটতে থাকে।উপস্থিত সবাই দেখে এক নতুন নিবিড়কে। যাকে কোন ফ্যামিলি প্রোগ্রামে পাওয়া যেতো না।সেই নিবিড় এখন হাস্যজ্বল মুখে সবার সাথে কথা বলে।
সময়ে সবই সম্ভব। শুধু সম্ভবকে টেনে সময়ে আনতে হয়।একটু ধৈর্য্য ধরতে হয়।মন মতো হচ্ছে না দেখে ছেড়ে যাওয়ার চেয়ে ,ধরে রেখে নিজের মতো গড়ে নেয়ার জন্য সৃষ্টিকর্তা মানুষকে তিন পাউন্ডের একটা মস্তিস্ক দিয়েছে।যেটার ব্যবহার জিয়ানা করেছে।গোমড়া মুখো, মারদাঙ্গা আর স্যাডিস্ট এপ্রোচ একজনকে প্রানবন্ত হাস্যজ্বল মানুষে পরিনত করেছে।না ,প্যাম্পার করে না।যখন যেটা উপযুক্ত সেটা করে। জিয়ানার নিজস্বতা দিয়ে।
সারাদিনের ধকলে জিয়ানা চার হাত পা চারদিকে দিয়ে বিছানায় উবু হয়ে শুয়ে আছে।বাচ্চারা থেকে থেকে ডেকে গেছে।জিয়ানা হুংকার ছেড়ে বলেছে,’ যে আমার ঘুমে বিরক্ত করবে তাকে টুনার পুত খাওয়ানো হবে।এরপর আর একটাও এই রুমের ধারে কাছে আসেনি।
নিবিড় বিকেলে বের হয়ে যায়।এখন আবার এসে দেখে ড্রেস চেঞ্জ না করেই সেভাবেই জিয়ানা বিছানায় শুয়ে আছে।
নিবিড়কে যেমন জিয়ানা হেনস্তা করতে পারে তেমনই নিবিড়ও পারে।ফটাফট জামা কাপড় ছেড়ে জিয়ানার উপর নিজের শরীর ছেড়ে দেয়।জিয়ানা ক্যাক করে উঠে বলে,
‘আল্লাহ আমার উপর আকাশ ভেঙে পড়েছে না ডায়নোসর? ‘
নিবিড় সেই অবস্থাতেই জিয়ানার ঘাড়ে নাক দিয়ে সুড়সুড়ি দেয়।জিয়ানা কাচুমাচু করে বলে,’সুখ দেখুন ছয় বাচ্চার বাবা হয়েও আপনার অসভ্যতা কমে না? ‘
‘ছয় লাখের হলেও কমবে না জিয়নকাঠি। ‘
‘আঃ সরুন। ভর্তা হয়ে গেলাম বাবা গো।’
বলে উল্টে গিয়ে নিবিড়কে সরায়।নিবিড় জিয়ানাকে টেনে বুকে নিয়ে শুয়ে বলে,
‘কখন প্রোগ্রাম শেষ হয়েছে এখনো ড্রেস না ছেড়ে এভাবে পড়ে আছো কেনো?’
‘একটু আগে শুয়েছি।কাজ করছিলাম একটা।গুরুত্বপূর্ণ কাজ।’
‘কি কাজ বলে নিবিড় উঠতে চায়।জিয়ানা জিজ্ঞাসা দৃষ্টিতে তাকালে নিবিড় কনিষ্ঠ আঙুল দেখালে জিয়ানা সাইড থেকে একটা পানির বোতল এনে নিবিড়ের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
‘এখানে কাজ সারেন।আমি ছেলে হলে কষ্ট করে জীবনেও বাথরুমে প্রস্রাব করতে যেতাম না।বোতলেই কাম তামাম।’
নিবিড় বোতলটা হাতে নিয়ে বিনে ছুড়ে মে*রে বলে,’ এত দুষ্টুবুদ্ধি কোত্থেকে উৎপন্ন হয়?’
জিয়ানা নিচের ঠোঁট উল্টিয়ে বুঝায় কি জানি।নিবিড় আচম্বিতে সেই ঠোঁট নিজের ঠোঁটের দখলে নিয়ে নেয়।জিয়ানা মোচড়ামুচড়ি শুরু করে। নিবিড় আরও জোরে চেপে ধরে।এরমাঝে দরজায় ধুপধাপ শব্দ হয়।প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে নিবিড় দরজা খুলে দেখে রোজী ,আব্দুল্লাহ আর হেমন নিজের বালিশ বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিবিড় হাটু গেরে বসে জিজ্ঞেস করে ,’সমস্যা কি? এখনো কেউ ঘুমান নাই কেন?’
নিবিড়ের হাতের নিচ দিয়ে আব্দুল্লাহ ঢুকে বিছানায় জিয়ানার পাশে শুতে শুতে বলে,’ভূতের স্বপন দেহিছি।অলা ঘুম হইতো না নে।’
নিবিড় আব্দুল্লাহর ভাষা বেশিরভাগ সময় বুঝে না।জিয়ানা ট্রান্সলেট করে দেয়।নোয়াখালির একটা পরিবার তাকে জিয়ানার হাতে তুলে দেয়।বিয়ের আগের বাচ্চা হওয়াই বাচ্চার মা হাসপাতালে রেখে চলে যেতে নিলে কর্তৃপক্ষ আটকায়।এরপর জিয়ানা সেখানে গিয়ে নিয়ে আসে।
হেমন সোজা নিবিড়ের বুকে ঢুকে যায়।এই মেয়ে নিবিড়ের নেওটা।পিতা অন্তপ্রাণ টাইপ।নিবিড়কে চিপকে ধরে থাকে।খুবই নাখরা তার।নিবিড়ের মতোই রুচি।অন্য কারো কোলে যাবে না এমন কি কাউকে ধরতেও দিবে না।
রোজী কিছুটা জিয়ানার মতো। বিন্দাস থাকে।নিবিড় হেমনকে কোলে নিয়ে বিছানায় রাখে।তারপর তিনজনের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘কাল আমরা তোমাদের মমের ভার্সিটি যাবো। সো আজ তোমাদের ভালো মতো ঘুমের দরকার।এখানে এত জনের তো জায়গা হবে না রাইট?’
‘রাইট ড্যাড।ইউ মে লিভ। ‘বলে রোজী জিয়ানাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে।নিবিড় করুন চোখে জিয়ানার দিকে তাকায়।জিয়ানা বাঁকা হেঁসে তাকিয়ে আছে। তার যে নিবিড়ের কাতর চেহারা খুব ভালো লাগছে সেটা বুঝা শেষ। নিবিড় ওয়াশরুমে ঢুকতে ঢুকতে বলে,
‘আমি বের হয়ে যেনো দেখি তোমরা সবাই নিজেদের বেডে ফিরে গেছো।তানাহলে ড্যাড রেগে ডায়নোসর হয়ে যাবে। ‘
নিবিড়ের কথাতে মুখ গোমড়া করে আয়েশা আর হেমন ফিরে গেলেও আব্দুল্লাহ এখনো জিয়ানাকে ধরে রেখেছে।নিবিড় বের হয়ে দেখে একজন এখনো তার বউকে দখল করে রেখেছে।জিয়ানার দিকে তাকিয়ে বলে,’কিছু করো?’
জিয়ানা বড় করে নিশ্বাস নেয়।আব্দুল্লাহ নিজের রুমে ফিরে গেলে কি হতে পারে তার জানা আছে।ভন্ড নেতা পুরা মুডে।সরি নেতা না এমপি।
জিয়ানা আব্দুল্লাহর পিঠে ট্যাপ করে ঘুম পাড়ায়।তারপর তাকে নিয়ে রেখে আসে বাচ্চাদের রুমে।
রুমে এসে নিবিড়ের সামনে নিজের লেপটপ ওপেন করে বলে,’প্রফোশনালি আমি কিন্তু আপনার স্ত্রী না সুখ? এটাই লাষ্ট ওয়ার্নিং। আপনার দলের এই লোকগুলার বিরুদ্ধে যদি কড়া স্টেপ না নেন তবে আমি এসব নিউজ পাবলিশ করতে বাধ্য হবো।’
একটা ডকুমেন্টস দেখায় জিয়ানা যেখানে ব্ল্যাক লিষ্টটেড ব্যাক্তিদের নাম তারপাশে তাদের কৃত অপরাধের জরিপ।
নিবিড় কপাল চেপে ধরে। সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় কেন্দ্র থেকে। কেন্দ্রীয় কমিটি টাকা ছাড়া কিচ্ছু বুঝে না।টাকা দিলে এরা কুমির গিলে ফেলে।ডেমোক্রেসির নূন্যতম সেন্স এদের নেই।নিবিড়ের মতবাদ এদের সাথে কোনভাবেই মিলে না।এদের সবার বিরুদ্ধে কমপ্লেইন করেও লাভ হয়নি।উল্টা নিবিড়ের সাথে শত্রুতা বেড়েছে।
জিয়ানা নিবিড়ের মুখ দেখে বলে,’ সোসাল সাইটে একটা কোয়ার্টস দেখেছিলাম “মনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে অন্যের দোষ ধরার সময় থাকে না।মনের এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসুন।না হয় যুদ্ধ ঠিক ভাবে পরিচালনা করুন।’
নিবিড় মাথা তুলে তাকায় জিয়ানার চোখের দিকে।কি সুন্দর সহজ সমাধান দিতে পারে এই মেয়ে।
সূর্যের অপ্রতিরোধ্য রশ্মি বসুন্ধরায় ছড়িয়েছে অনেক আগে।জিয়ানা ক্যাম্পাসের প্যান্ডেলে বসে আছে মিম মৌসুমী ,জেনি তামান্না সহ বাকিদের সাথে।শিক্ষামন্ত্রী বক্তব্য দিচ্ছেন।পাশে সাদা পাঞ্জাবি পড়ে শক্তমুখে নিবিড় বসা।জিয়ানার দিকে একবার তাকালে জিয়ানা চোখ টিপ দিয়েছে।তাই আর তার দিকে তাকাচ্ছে না।
জিয়ানার নাম এলে এনাউন্সার পরিচয় দিচ্ছে আমাদের কৃতি শিক্ষার্থীর জিয়ানা হকের কিন্তু আরও একটা পরিচয় আছে।সে মাননীয় সাংসদের সুযোগ্যা স্ত্রী।
সবাই করতালি দিয়ে মুখরিত করে তুলে চারপাশ।শিক্ষামন্ত্রী সরে এসে বলে তবে এমপি সাহবে আপনারই উচিত এই এওয়ার্ডটা দেয়া।নিবিড় মুচকি হেঁসে গোল্ড মেডেল জিয়ানার গলায় পড়িয়ে দেয়।
এরপর নিবিড়কে ডাকে কিছু বলার জন্য।নিবিড় স্পিকারের সামনে গিয়েই বলে,
‘এখানে একটা ভুল হয়েছে।জিয়ানা হকের পরিচয় শুধু আমার স্ত্রী না।
আমি একজন গোল্ড মেডেলিষ্ট ,মেধাবী এবং সফল রিপোর্টার ও জার্নালিস্ট জিয়ানা হকের স্বামী।আমার পরিচয় তার দরকার নেই।সে নিজ গড়িমায় উজ্জীবিত। যার আলোয় আলোকিত আমার এবং আমার পরিবারের জীবন।’
জিয়ানা মাথা নিচু করে নিবিড়ের পাশে দাঁড়িয়ে কথা গুলো শুনে।একসময় মেয়েদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা ইগোয়িষ্ট লোকটা ভরা মজলিসে বউয়ের গুনগান গাইছে।এরচেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে? পরবর্তী কথাতে জিয়ানা চড়াক করে মাথা উঠায়।
‘আমি পদত্যাগ পত্র জমা দিয়েছি।তাই আর এমপি নই।’
উপস্থিত দর্শক সহ জিয়ানা অবাক নেত্রে তাকায় নিবিড়ের দিকে।তারপর মাথা আবার ঝুঁকিয়ে অল্প হেঁসে বলে,
‘মনে হলো আপনি আমাকে আইলাভ ইউ বললেন?’
হো হো করে হেঁসে উঠে নিবিড়।সামনে উৎসুক জনতা আরও উৎসুক হয় মাননীয় সংসদের এমন দিলখোলা হাঁসি দেখে।জিয়ানা একজন প্রফেশনাল রিপোর্টার আর ঘরের একজন স্ত্রী হিসেবে মিলিয়ে প্রশ্ন করে ,
‘স্যার যদি বলতেন? ডেমোক্রেসির এই পলিটিক্স হঠাৎ শিকেয় উঠলো কেনো?’
‘বাঁধা পেলে নদীও নিজের পথ পরিবর্তন করে।সেখানে আমি তো মানুষ। ‘
‘পাবলিক ডিপ্লোমেটিক উত্তর বুঝে না। দয়া করে যদি সরাসরি জানাতেন।’
জিয়ানা চোখ ছোট ছোট করে বলে।
নিবিড় মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে মুখের চোয়াল শক্ত করে বলে,
‘নটোরিয়াস ক্রিমিনাল যখন আমার পাশে বসে আমাকেই ডেমোক্রেসি নিয়ে জ্ঞান দেয় তখন আমার রুচি সপ্তম আকাশে উঠে যায়।মেধাবী একটা ছেলে দেশের কথা চিন্তা করে কিছু বললে যখন প্রাণ দিতে হয়। তখন আমার ডেমোক্রেসি নামের প্রহসনের উপর ঘৃণা আসে।নিজ দলের নেতাকর্মী দ্বারা যখন সিনিয়র নেতারা অপদস্ত হোন তখন আমি পলিটিশিয়ানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শংকিত হয়।বিদেশি অনুদান যখন নেতার সুইচ ব্যাংকে ঢুকে আমি হতবাক।এই গতানুগতিক রাজনীতি আমার মনোভাবের সাথে মিলছে না।রাজাদের নীতিই যদি রাজনীতি হয় ,তবে আমি নীতিহীন রাজ।
নীতিহীন রাজ পর্ব ৭৬
সর্বপরি ,আমি বোধ করি একজন নুরুলদীনের অভাব।সেই সতেরোশ ত্রিশ সালের দিনাজপুর রংপুরের কৃষক বিদ্রোহের নায়ক নুরুলদীন।যিনি কৃষকদের র*ক্তচোষা দেবী লাল সিংহের মতো হায়ানারের উচ্ছেদকারী।ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঘুম হারাম করে দেয়া নুরুলদীন।যদিও একজন নুরুলদীন হওয়া সহজ নয়।কিন্তু তার যোগ্য উত্তরসূরী হতে চাই।এগিয়ে যেতে চাই তার দেখানো পথেই।সাহারা হতে চাই সমাজের দুস্ত ,অসহায় আর পিছিয়ে পড়া মানুষদের।তাই স্পষ্ট এবং দ্বিধাহীনভাবে বলি,
সমস্ত নদীর অশ্রু অবশেষে ব্রক্ষ্মপুত্র মেশে।
নূরলদীনের কথা যেন সারা দেশে
পাহাড়ি ঢলের মত নেমে এসে সমস্ত ভাসায়,
অভাগা মানুষ যেন জেগে উঠে আবার এ আশায় যে,
আবার নূরলদীন একদিন আসিবে বাংলায়,
আবার নূরলদীন একদিন কাল পূর্ণিমায়
দিবে ডাক ,’জাগো বাহে ,কোনঠে সবায়?’
আর চলবে না।
