অস্তরাগের রঙ পর্ব ৬
তেজরিন উম্মীদ
রুশদীর গায়ে হলুদের প্রগ্রাম বাড়ির পিছনে পড়ে থাকা প্লট টাতে করেছেন আনাস হক।আনাস হকে আগে বেশ গরম ব্যবসা ছিল।তখন ঢাকা শহরে বড়ো একটা পল্ট কিনে নিজেরা থাকার জন্য দু’তলার একটা দালান করেন।বাড়ির পিছনের জায়গা টুকু ফাকা পড়ে থাকতে থাকতে জঙ্গল হয়ে গিয়েছিল।জয়গাটা পরিষ্কার করেই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
রুশদীর কথা মতো তিথি বস্তা কাপড় গুছিয়ে সেদিন’ই চলে এসেছিল।সে আসায় রুশদী সময়টা আনন্দের সাথে পার হচ্ছে।রুশদীর বিয়ের জন্য বাড়ি ভর্তি মানুষ, আত্মীয়-স্বজনের অভাব নেই।এদের মাঝেও রুশদী একাকীত্ব বোধ করতো কারণ,তার বিয়েতে তার কাজিনরা নেই।রুশদীর কানিজ বলতে আছে শুধু মামাতো ভাই-বোনেরা তবে তার বিয়েতে নানি বাড়ির কেউ আসবে না।কারন তারা রুশদীর এই বিয়েতে রাজি না।কেননা তার নানা আগে থেকে তার বিয়ে ঠিক করে রেখেছে, কিন্তু তাদের অমতে গিয়ে আনাস হক মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন।আচ্ছা যাকগে সেসব।
হলুদে রুশদী মুখে মেকআপ ছোয়ায় না । গ্রাম বাংলার মেয়েদের মতো নিজেকে খুব সিম্পল রাখল সে।হাতে, গলার কাচা ফুলের গয়না পড়ল।হলুদের শাড়িটাও গ্রাম বাংলার মেয়েদের মতো করে পড়েছে। ফর্সা গায়ে হলুদ শাড়িটা দারুন ভাবে ফুটে উঠেছে।
এদিকে সেজেগুজে বসে আছে তিথি।তার আনন্দের শেষ নেয়, যেন নিজের বোনের বিয়ে হচ্ছে,এতটা খুশি সে।তিথি এতিম, মামা-মামির কাছে থাকে। কাজেই অবহেলিত সে। কিছুটা রুশদীর মতোই তার অবস্থা। কোথাও পড়েছিলাম তুমি যেমন তোমার বন্ধুত্ব তেমন মানুষের সাথেই হবে। তাদের ব্যাপারটাও ঠিক তেমন।
সেজেগুজে মনের মতো কিছু ছবি তুলবে বলে রুশদীর ফোনটা নিয়ে ছাদে গিয়েছিল তিথি। কিন্তু কেল্লা ফতে! এক মুহূর্ত শান্তিতে একটা ছবি তুলতে দিচ্ছে না এই’Mp’। ‘Mp’ নাম দিয়ে সেভ করা একটা নম্বর থেকে বারবার কল আসছে। তিথি বিরক্ত হয়ে কয়েকবার কেটে দিলেও ওপাশ থেকে নাছোড়বান্দার মতো ফোন দিয়েই যাচ্ছে কেউ।
বিরক্তি নিয়ে তিথি রুশদীর রুমে ফিরে এল। রুশদী তখন মন দিয়ে একটা ছোট বাচ্চাকে সাজিয়ে দিচ্ছে। তিথি ফোনটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ঝাঝালো গলায় বলল, “এই Mp নামের গর্ধবটা কে রে? ফোন কেটে দেওয়ার পরও সমানে কল করে যাচ্ছে। বোধহয় খুব জরুরি কিছু, কথা বলে দেখ।”
রুশদী বাচ্চারটির চুলে ক্লিপ আটকাতে আটকাতে বলল, “আবার কাট। রিসিভ করলে আমার মাথাটা বিগড়ে দিবে।”
“আরে অনেকবার কেটেছি, তাও দিয়ে যাচ্ছে তো!”
তিথির কণ্ঠে বিরক্তির রেশ।
রুশদী এবার শান্ত গলায় সমাধান দিল, “এক কাজ কর, ফোনটা এরোপ্লেন মোড করে রাখ আর ওয়াইফাইটা অফ করে দে। ঝামেলা শেষ।”
তিথিও আর কথা না বাড়িয়ে রুশদীর কথামতো ফোনটরা নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করে দিল। এর মধ্যেই পিচ্চি মেয়েটার সাজ শেষ, সে ফুরফুরে মনে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রুমে এখন ওরা দুজন একা। তিথি হঠাৎ অপলক দৃষ্টিতে রুশদীর দিকে তাকিয়ে রইল, যেন দেখছে প্রথমবার।
রুশদী আড়চোখে তাকিয়ে হেসে ফেলল। মশকরা করে বলল, “কিরে, ওভাবে হা করে কী দেখছিস? মুখে তো মশা ঢুকে যাবে!”
তিথি ঘোর লাগা গলায় বলল, “তোকে যে আজ কী দারুণ লাগছে রে! পুরাই একটা অপ্সরা!”
হঠাৎ তিথির এই প্রশংসায় রুশদী কিছুটা লজ্জা পেল। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “অপ্সরা? একটু বেশিই বলে ফেললি না? এতটাও না।”
তিথি বলল, “উমম, লজ্জা পাওয়া হচ্ছে! সত্যি বলছি রে,তোকে মারাত্মক সুন্দর লাগছে।”
রুশদী মৃদু হেসে তিথির দিকে তাকাল। ধীরস্থির কণ্ঠে বলল, “শোন সবাই সবার মত সুন্দর, যাদের মন মানসিকতা ভালো তারা সেই সৌন্দর্য টা দেখতে পায় আর যাদের ভালো না তারা দেখতে পায় না।আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রতিটি বান্দাকেই কোনো না কোনো রূপ বা গুণ দিয়ে পাঠিয়েছেন। তাই তাঁর সৃষ্টিকে রেটিং দেওয়ার আমরা কেউ না। বুঝলি?”
তিথি এক গাল হেসে মাথা দোলাল, “ইয়েস,বুঝলাম মিস অপ্সরা!”
দুপুরের তপ্ত রোদটা যখন খানিকটা ম্লান হয়ে বিকেল গড়াচ্ছে , তখনই আনাস হকের বাড়ির সামনে শুরু হলো এক এলাহি কাণ্ড। খান বাড়ি থেকে শান, সিফাত আর একঝাঁক আত্মীয়স্বজন বিয়ের তত্ত্ব নিয়ে হাজির হয়েছে। তাদের সাথে আছে বাড়ির ছোট নবাব, পুচকি শের। প্রায় ১০-১৫টি বড় বড় ভ্যান বোঝাই করে পাঠানো হয়েছে ডালাভর্তি ফল, সুগন্ধি ফুল, কনের শাড়ি আর গয়না। রাস্তার ওপর ভ্যানগুলোর এমন সারি লেগেছে যে মুহূর্তেই জ্যাম তৈরি হয়ে গেল। আশেপাশের কৌতূহলী প্রতিবেশীরা বাড়ির বারান্দায় আর গেটে ভিড় জমিয়ে, খান বাড়ির এই রাজকীয় তত্ত্বের বহর দেখচ্ছে।
শানরা তত্ত্ব নিয়ে বাড়িতে পা রাখতেই আনাস হক কোনো কথা না শুনেই তাদের সোজা খাবারের টেবিলে বসিয়ে দিলেন। আতিথেয়তায় তিনি কোনো ত্রুটি রাখতে চান না। মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজন বলে কথা! তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব তদারকি করে তাদের আপ্যায়ন করালেন। শানরা প্রথমেই রুশদীর সাথে দেখা করতে চেয়েছিল, কিন্তু আনাস হক মৃদু হেসে বললেন, “আগে পেটপুজো, তারপর দেখা-সাক্ষাৎ।” তবে ছোট শেরের তর সইলে তো! সে ফুরুত করে গিয়ে তার হবু মম এর সাথে দেখা করে আবার চপল পায়ে ফিরেও এসেছে।
খাওয়া-দাওয়া শেষে শান, সিফাত আর শের রুশদীর খোঁজে। ততক্ষণে রুশদীকে হলুদের আসরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।বাড়ির পেছনে সেই পরিত্যক্ত প্লটটিতে যে প্যান্ডেল করা হয়েছে,সেখানে। আনাস হক তাদের প্যান্ডেলের পথ দেখিয়ে দিয়ে নিজের কাজে সরে গেলেন।
ওরা গিয়ে দেখল, প্যান্ডেলের মাঝখানে একটি কাঠের নকশাকাটা পিঁড়ির ওপর রুশদী বসে আছে।আগত অতিথিরা একে একে এসে তার গালে হলুদের ছোঁয়া দিয়ে যাচ্ছে। শান আর শের ভিড় ঠেলে রুশদীর একদম কাছে চলে গেল। কিন্তু সিফাত একটু দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে রইল। রুশদীর চারপাশে তখন মেয়েদের ভিড়। সিফাত বরাবরই একটু শান্ত আর ভিড় এড়িয়ে চলা মানুষ, তাই সে জটলা কমার অপেক্ষায় খানিক দূরেই পায়চারি করতে লাগল।
শান ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে রুশদীর সামনে এক পায়ের উপর ভর দিয়ে বসল। রুশদীকে বড় করে একটা সালাম ঠুকে,এক গাল হাসি নিয়ে বলল, “খবর কী ভাবিসাব? ”
রুশদী শানকে দেখে লাজুক হাসল। বয়সে বড় শান যখন ওকে ভাবি বলে সম্বোধন করে, তখন লজ্জা ঘিরে ধরে রুশদীকে। রুশদী নরম সুরে বলল, “ভাইয়া, আপনি আমার বড়। আমাকে নাম ধরে ডাকলে কি খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যাবে?”
শান হলুদের বাটি থেকে এক আঙুল হলুদ তুলে রুশদীর গালে মাখিয়ে দিতে দিতে ওর প্রস্তাবটি তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল। বেশ রসিয়ে বলল, “আরে ভাবি আমার মাত্র এক পিস! তাকে এই দুনিয়ায় নাম ধরে ডাকলে বিষয়টা সেন্টি খাওয়ার মত হয়ে যায় না? আর ভাবিকে যদি ভাবি না ডাকি, তবে দেবর দেবট ভাইব আসবে না ? সো, ভাবি ডাকটাই পারফেক্ট!”
রুশদীও এবার মজা করে উত্তর দিল, “ঠিক আছে দেবরভাই, আপনার কথাই রইল।”
শান যেন হাতে চাঁদ পেল। খুশিতে গদগদ হয়ে বলল, “দ্যাটস লাইক মাই ভাবি! এবার ভাবি, তোমাকে একটা ভীষণ জরুরি কথা বলে রাখি । গত চব্বিশটা বছর ধরে আমি হন্যে হয়ে আমার বউকে খুঁজছি, কিন্তু সেই মহীয়সী নারী কোথায় যে লুকিয়ে আছে, কোনো হদিস পাচ্ছি না। বিয়ের পর তোমার প্রধান আর প্রথম কাজ হবে,তোমার এই দেবরের জন্য তার হারিয়ে যাওয়া বউকে খুঁজে বের করা। ওকে?”
রুশদী খানিকক্ষণ গম্ভীর হওয়ার ভান করে ভাবল। তারপর হাসি দিয়ে বলল, “উম! আমি তো জানি আপনার বউ আসলে কোথায় আছে।”
মুহূর্তেই শানের মুখটা প্রদীপের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“সত্যি বলছো ভাবি? কোথায় সে? আমাকে শুধু ঠিকানাটা বলো, আমি এক্ষুনি ঘোড়া ছুটিয়ে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসছি!”
রুশদী খুব শান্ত গলায় উত্তর দিল, “সে আপনার শ্বশুরবাড়িতেই আছে।”
শুনেই শানের উজ্জ্বল মুখটা মুহূর্তেই বেলুনের মতো চুপসে গেল। শুকনো মুখে বিড়বিড় করে বলল, “আরে, সে যে শ্বশুরবাড়িতে আছে, এটা তো আমিও জানি ভাবি! কিন্তু আমার সেই শ্বশুরবাড়িটা দুনিয়ার কোন মানচিত্রে, সেটাই তো উদ্ধার করতে পারছি না। রাস্তাটা জানলে কি আর একা বসে থাকতাম? আচ্ছা, আজ অবলা পেয়ে আপনিও মজা নিয়ে নিলেন, সমস্যা নেই। এই দিন দিন না, আরও দিন আছে।এই দিনকে নিয়ে যাব ওই দিনের কাছে তখন বুঝবেন শানান খান কী জিনিস!”
রুশদী হেসে ফেলে বলল, “ভাইয়া, আপনি কি সেন্টি খেলেন নাকি?”
শানের সপাট জবাব, “বউ ছাড়া এতিম মানুষের আবার সেন্টি কিসের!”
ঠিক তখনই পুচকি শেরের আর ধৈর্য রইল না। সে বিরক্তি নিয়ে শানকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। গাল ফুলিয়ে বলল,
“উফ চাচু, সরো তো! আমার মমকে শুধু তুমিই হলুদ দেবে? আমি কি বাদ যাব?”
শের তার ছোট্ট দু’হাত ভর্তি হলুদ নিয়ে একদম ঝাঁপিয়ে পড়ল রুশদীর ওপর। রুশদীর গালে, কপালে, নাকে হলুদ লেপে দিয়ে একগাল হেসে বলল,
“ইউ নো মম, আই অ্যাম সো লাকি!”
রুশদী ওকে আদর করে কাছে টেনে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন? ”
শের হি হি করে হেসে বলল, “কজ, আমি আমার মম আর পাপার বিয়ে নিজের চোখে দেখতে পাচ্ছি।”
রুশদীর বুকটা এক অজানা মায়ায় ভরে উঠল। সে হলুদের বাটি থেকে এক চিমটি হলুদ নিয়ে শেরের নাকে আর গালে ছুঁইয়ে দিল। বলল, “তাহলে তো আমিও তোমার চেয়ে অনেক বেশি লাকি।”
শের অবাক হয়ে জানতে চাইল, “কেন?”
রুশদী ওর কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, “কারণ, আমি বিয়ের সাথে সাথেই তোমার মতো এমন একটা কিউট আর রেডিমেড শের পেয়ে যাচ্ছি!”
কথাটা শুনেই শেরের সেই ভুবনজয়ী হাসিটা আবার ফুটে উঠল। শের যখন মন খুলে হাসে, তখন ওর সেই ছোট ছোট গুটি গুটি দাঁতগুলো সব বেরিয়ে আসে।ঠিক যেন একরাশ মুক্তো ঝরে পড়ছে।
শানের ফোনে হঠাৎ একটা কল আসায় সে হলুদের আসর থেকে উঠে সিফাতকে যেখানে দাঁড় করিয়ে রেখে গিয়েছিল সেখানে আসে। কিন্তু যেখানে সিফাতকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল, সেখানে খাঁ খাঁ শূন্যতা।এই সিফু টাগেল কোথায়? শান মনে মনে ভাবল, আশেপাশে কোথাও হয়তো আছে, কচি খোকা তো আর না যে পথ হারাবে! সিফাতের চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে সে ফারাজের ভয়েস কল কেটে দিয়ে সরাসরি ভিডিও কল করে বসল। ফারাজ কল রিসিভ করেই একনাগাড়ে একগুচ্ছ প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “কোথায় তোরা? এখনও ঐ বাড়িতেই পড়ে আছিস? বেরোবি কখন? আর শের কোথায়?”
শানের ঠোঁটে এক চিলতে শয়তানি হাসি ফুটে উঠল। সে ফোনের ব্যাক ক্যামেরা অন করে দূর থেকে শেরকে দেখালো এবং রসিয়ে বলল, “ঐ যে দেখো তোমার রাজপুত্র, তোমার হবু রানীর সাথে বসে আছি। কেমন হি হি করছে দু’জন দেখেছ?”
ফারাজ ওপাশ থেকে গম্ভীর গলায় বলল, “একটু সামনে যা, ভালোমতো দেখা যাচ্ছে না।”
ফারাজের এই কৌতূহল শানের জন্য এক মোক্ষম অস্ত্র হয়ে দাঁড়ালো। সে ফারাজকে খোঁচা দেওয়ার এমন সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইল না। পা টিপে টিপে সামনে এগোতে এগোতে ফিসফিসিয়ে বলল, “ছেলেকে দেখতে চাচ্ছ নাকি ভাবিকে? বুঝি বুঝি ভাই, সব বুঝি! এই নাও, এখন দেখা যাচ্ছে তো? নাকি ভাবিকে আরও একটু জুম করে দেখাব?”
ফারাজ ওপাশ থেকে রাগে ফুঁসে উঠল। সে কি তবে ওই ইডিয়ট মেয়েটাকে দেখতে চেয়েছে? কক্ষনো না! সে কড়া গলায় বলল, “তুই বাসায় আয়, তারপর তোকে মজা বোঝাচ্ছি।”
শানের তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই। সে একগাল বেহায়া হাসি দিয়ে বলল, “ঠিক আছে ভাই সাহেব আমাকে মজা দেখানোর জন্য আপনি রেডি হন। ”
কথাটি শেষ হতে না হতেই হঠাৎ ঝড়ের বেগে শানের হাত থেকে ফোনটি ছিনতাই হয়ে গেল! শান কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পাশে তাকাতেই দেখল, এক সুন্দরী রমণী তার ফোনটি কেড়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।শান এর পৃথিবী যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
মেয়েটির চেহারা গোলগাল, যেন পূর্ণিমার চাঁদ নেমে এসেছে মাটিতক। গায়ের রঙ উজ্জ্বল ফর্সা, পরনে হলুদ সিল্ক শাড়িটা কুচি দিয়ে জড়িয়ে আছে অঙ্গে। রোদে আর ভিড়ে মেয়েটি ঘামছে, আর সেই ঘামের সাথে ঘাড়ের কাছে ছোট্ট ছোট্ট চুলগুলো লেপটে আছে অবাধ্যভাবে।যা তাকে করে তুলেছে আরও বেশি আকর্ষণীয়। তার চোখের মণি দুটো যেন চকমকে কৃষ্ণচূড়া, চাহনিতে এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণতা।
শান ক্ষণিকের জন্য পাথরের মতো জমে গেল। তার হৃদপিণ্ডের স্পন্দন যেন ছন্দ হারালো। গত চব্বিশ বছর ধরে যাকে খুঁজে ফিরেছে, এ কি তবে সেই? প্রথম দেখাতেই মেয়েটি তার মনের মণিকোঠায় এক স্থায়ী ছাপ ফেলে দিল। কিন্তু মেয়েটি কেন তার দিকে এমন কটমট করে তাকিয়ে আছে? শানের ভ্রু কুঁচকে গেল ঠিকই, কিন্তু মুগ্ধতা তাকে ছেড়ে গেল না। সে ঘোর লাগা চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে বলে উঠল,
“কে তুমি নন্দিনী? আগে তো দেখিনি!”
তিথি তখন রাগে ফুঁসছে। তার দুচোখ দিয়ে যেন আগুনের ফুলকি বেরোচ্ছে। সে শানের দিকে এক কদম এগিয়ে এসে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল, “স্পর্ধা তো আপনার কম নয়! আপনি ভিডিও করছিলেন কেন?”
শান যেন আকাশ থেকে পড়ল। পরিস্থিতি সামলাতে সে অত্যন্ত সহজ হওয়ার ভান করে বলল, “আরে আপনি ভুল বুঝছেন! আমি ভিডিও করছিলাম না, বরং ভিডিও কলে কাউকে দেখাচ্ছিলাম।”
এ কথা শুনে তিথি আরও ফেটে পড়ল। একে তো চুরি তার উপর শিনা জুরি! সে রাগে তোতলামি করে বলল, ” যাইহোক আপনি, ভিডিও কলে কাউকে দেখাবেন আমার পারমিশন নিবেন না? ”
শান বুঝিনা এতে পারমিশন নেয়ার কে আছে? সে বলল, ” পারমিশন নিব কেন? ”
তিথি বিস্ময় আর রাগে হতবাক হয়ে বলল, “পারমিশন কেন নেবেন মানে? আপনি ভিডিও কলে কাউকে আমাকে দেখাচ্ছেন, আর আপনি বলছেন পারমিশন কেন নেবেন?”
শান যখন ফারাজকে রুশদীকে দেখাচ্ছিল, ঠিক তখনই তিথি হুট করে ফ্রেমে চলে এসেছিল। তাই সে মনে করছে যে শান তাকেই কাউকে দেখাচ্ছে। শান এবার বুঝতে পারল প্যাচটা ঠিক কোথায় হয়েছে। সে তিথির ভুল ভাঙানোর জন্য একগাল হেসে বলল, “আরে নন্দিনী, শান্ত হোন! আমি আপনাকে না, আমার হবু ভাবি অর্থাৎ যার বিয়ে হচ্ছে, তাকে তার হবু বরের কে দেখাচ্ছিলাম।”
তিথি এবার কিছুটা দমেগেল। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখ দুটো সরু হয়ে এল।সে কিছুটা লজ্জাও পেল। শান এর দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে সংক্ষিপ্ত জবাব দিল, “ওহ!”
শানের কৌতূহল তখন তুঙ্গে। সে নরম গলায় শুধাল, “আচ্ছা, আপনার নামটা কি জানা যাবে?”
তিথি গম্ভীর মুখে উত্তর দিল, “তিথি।”
শানের পরবর্তী প্রশ্ন, “আপনি ভাবির কী হন?”
তিথি ঝটপট বলল, “বোন।”
শানের মুখে এবার এক জাদুকরী হাসি ফুটে উঠল। সে দুষ্টুমি করে বলল, “আরে, তাহলে তো আমাদের সম্পর্কটা একদম পারফেক্ট ! আমি ভাবির দেবর আর আপনি বোন সম্পর্কে আমরা তো সাচ্চা বিয়াই-বিয়ান! তা কেমন আছেন বিয়ানসাব?”
তিথি শানের এই আগ বাড়িয়ে কথা বলা একদমই পছন্দ করল না। সে আড়চোখে একবার শানকে দেখে নিয়ে কোনো জবাব না দিয়েই দ্রুত পা চালিয়ে আসর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। শানও কম যায় না, সে পিছু পিছু কিছুটা এগিয়ে গিয়ে ডাক দিল, “আরে বিয়ান, এভাবে না বলেই চলে যাচ্ছেন যে?”
তিথি পাত্তাই দিল না। ভিড়ের মাঝে দ্রুত হেঁটে গিয়ে সে চোখের আড়ালে চলে গেল। শান ভিড়ের মাঝে এদিক-সেদিক তাকাতে লাগল, কিন্তু সেই নন্দিনীর আর কোনো হদিস মিলল না। বিরক্তি আর আফসোসে শান নিজের ঘাড়ে হাত দিয়ে বিড়বিড় করতে লাগল। মনচোর এভাবে ধরা না দিয়ে পালিয়ে গেলে কার ভালো লাগে? শান তো মানা করেনি চুরি করতে, চুরি করো বাপু, কিন্তু অন্তত একটু প্রশ্রয় তো দাও!
শান ভিড়ের মাঝে একপা একপা করে এগোতে লাগল। তার ঠোঁটের কোণে তখন এক চমৎলার সুন্দর হাসি। চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে সে আনমনে বলে উঠল,
“আগার তু খো যায়ে তো ম্যায় তুঝে ঢুন্ড লাউঙ্গা,
নাড়াজ হো আগার, তো তুঝে মানা লুঙ্গা।”
সকাল থেকে যার সাথেই দেখা হচ্ছে, তক্কাতক্কি যেন ছায়ার মতো পিছু নিয়েছে তার। তিথি বুঝে উঠতে পারছে না সে নিজে গিয়ে ঝগড়ায় জড়িয়ে পড়ছে, নাকি ঝগড়াই উড়ে এসে জুড়ে বসছে তার উপর। এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগেই তৃতীয় দফার ঝগড়া তার ওপর এসে আছড়ে পড়ল।
হাঁটতে হাঁটতে তিথি যখন এক মুহূর্তের জন্য আনমনা হয়েছিল, তখনই যেন কোনো এক চলন্ত পাহাড়ের সাথে তার সজোর ধাক্কা লাগলো। ব্যথায় মুহূর্তেই তিথির সুন্দর মুখটা কুঁচকে ছোট হয়ে এল। বাম হাতটার ওপর দিয়ে যেন কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেছে।তিথির মনে হলো হাড়গোড় বুঝি সব মড়মড় করে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কোন গণ্ডারের সাথে তার এই ধাক্কা লাগলো, তা দেখার জন্য যখন সে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাল, দেখল এক যুবক ধুলোবালিতপ মেখে যাওয়া নিজের ফোনটা তুলছে।
তিথি তার তর্জনী উঁচিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“এই যে মিস্টার! আপনি কি চোখে কম দেখেন? চোখ দুটো কি নিজের দামী আলমারিতে তুলে রেখে পথে নেমেছেন নাকি? যার-তার সাথে এভাবে ধাক্কা খেয়ে বেড়ানোটা কি আপনার নেশা? অন্ধ নাকি আপনি? হাঁটতে পারেন না তো রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? আমার হাতটা বোধহয় আপনি ভেঙেই ফেললেন!”
বলেই ব্যথায় কাতর হয়ে নিজের কাঁধ আর সোল্ডারে হাত ডলতে লাগল তিথি। সিফাত তখন তার চুরমার হয়ে যাওয়া ফোনটার দিকে তাকিয়ে ছিল। ফোনের ডিসপ্লেটা যে ভেঙে চুরমার হয়ে ভববে বাড়ি চলে গেছে, তা দেখে সিফাতের মেজাজটা সপ্তম আসমানে চড়ে বসল। ধাক্কা খেল মেয়েটা, অথচ গলার জোর দেখিয়ে দোষারোপ করছে তাকে! সিফাত শান্ত অথচ ধারালো গলায় ফুঁসে উঠে বলল,
“এই মেয়ে! গলা নামাও। কার সাথে কথা বলছো আনো? জানো আমি কে?”
তিথি মোটেও দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে দুই হাত বগলে গুজে, ভ্রু কুঁচকে তাচ্ছিল্যের সুরে জবাব দিল,”আচ্ছা! তাই না কি? তা কেঠা গো আপনে? লাট সাহেব আইছে! বড় বড় কথা বাদ দিয়া নামটা কইলেই তো হয়।”
সিফাত এবার নিজের ফোনটা তিথির চোখের সামনে এনে ঝাকিয়ে বলল,”আমার পরিচয় পরে জানলেও চলবে, কিন্তু তুমি যে আমার সাধের ফোনটা অক্কা পাওয়াইলা, এটার জরিমানাটা কে দিবে? দুই লাখ চল্লিশ হাজার টাকার ফোন আমি কত শখ করে বাপের পকেট মেরক কিনেছিলাম, আর তুমি এক ধাক্কায় এটার দাফন সম্পন্ন করে দিলা! এখন টাকা বের করো বলছি। জরিমানা না দিয়া এক কদমও নড়তে পারবা না!”
সিফাতের হাতে থাকা ফোনটির দশা দেখে তিথির গলা শুকিয়ে এলো। ফোনটি আক্ষরিক অর্থেই দুই টুকরো হয়ে গিয়েছে,পেছনের অংশ আর সামনের ডিসপ্লে এখন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এত দামী একটা জিনিসের এমন দাফন সম্পন্ন হতে দেখে তিথি মনে মনে কিছুটা দমে গেলেও মুখে তার ছিটেফোঁটাও প্রকাশ পেতে দিল না। বরং থুতনি উঁচিয়ে দ্বিগুণ তেজ নিয়ে বলল,
“আমি কেন জরিমানা দিতে যাব শুনি? ফোনটা কি আমি ভেঙেছি? আপনার ফোন আপনার হাত থেকে পড়েছে, জরিমানা দিলে আপনিই দেবেন। আপনার জিনিস আপনি সামলাতে পারেন না, সেটা কি আমার দোষ? আর কে বলেছিল আড়াই লাখ টাকার ফোন এভাবে হাতে নিয়ে ঢং করে ঘুরতে? ভালোই হয়েছে ভেঙেছে, উটকো আপদ বিদায় হলো!”
সিফাত অপমানে আর রাগে তোতলাতে শুরু করল, “তুমি… তুমি তো আস্ত একটা বেয়াদব।”
“আপনি কোন পক্ষ শুনি?”
সিফাত হকচকিয়ে গিয়ে বলল, “কিহ?”
তিথি আবার প্রশ্ন করল, “জিজ্ঞেস করছি আপনি ছেলে পক্ষ নাকি মেয়ে পক্ষ?”
সিফাত বিরক্তি নিয়ে উত্তর দিল, “ছেলে পক্ষ।”
“তা বরের কী হন আপনি?”
সিফাত জানালো, “ভাই হই আমি।”
শোনামাত্রই তিথির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তার মানে এই ‘গণ্ডার বেটা তার সম্পর্কে বিয়াই লাগে! তিথি মনে মনে বড় একটা স্বপ্ন সাজিয়েছিল,বিয়ের হুল্লোড়ে সব বিয়াইদের সাথে চুটিয়ে টাংকি মারবে। অথচ কপাল এমনই খারাপ যে, প্রথম দেখাতেই প্রত্যেকটা বিয়াইয়ের সাথে তার ঝগড়া লেগে যাচ্ছে। সে বিড়বিড় করে নিজেকেই শোনাল,এসব ঝগড়াটে অসভ্য বিয়াইদের সাথে টাংকি মারার চেয়ে ঝগড়া করাই ঢের ভালো।
তিথি এবার মুখটা এক বিচিত্র ভঙ্গিতে বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল, “আপনারা সবগুলা কি একই রকম ?”
সিফাতকে আর কোনো পাল্টা জবাব দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই তিথি দ্রুত পায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করল। সিফাত দাতে দাঁতে আেওে দাঁড়িয়ে রইল। একে তো ফোনটা গেল, তারপর মেয়েটা কি সব ভুলে গেল। সে রাগে ফুঁসে উঠে চিৎকার করে তিথির উদ্দেশ্যে বলল,
“এই মেয়ে! জরিমানা দিয়ে যাও। আড়াই লাখ টাকার ফোনটা ভবের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে এখন বিড়ালছানার মতো মিনমিন করে কেটে পড়ছো কেন? তোমার কিডনি বেঁচেও আমি আমার ফোনের টাকা গোসল করবে মনে রেখো। ”
-পরদিন সকাল-
ভোরের নরম আলোটা যখন আনাস হকের পুরনো দালানের কার্নিশে এসে পড়ল, তখনই চারদিকে বিয়ের উৎসবের শোরগোল পড়ে গিয়েছে। আত্মীয়স্বজনদের ভিড়ে পা রাখার জায়গা নেই। সকাল নয়টা বাজতেই রিসোর্টে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। আনাস হক আর নাহিদা অতিথিদের সামলে নিয়ে বাসে উঠে পড়লেন। গন্তব্য শহর থেকে কিছুটা দূরে সবুজ ঘেরা এক মনোরম রিসোর্ট।
অন্যদিকে, খান বাড়ি থেকে পাঠানো সাদা রঙের চকচকে গাড়িটা গেটে এসে দাঁড়িয়েছে। রুশদী, নাহিদ, তিথি আর রুশদীর সেই প্রিয় সৎ নানি এই চারজন মিলে গাড়িতে যাবে।
আজ পবিত্র শুক্রবার, জুম্মার দিন। এই পবিত্র দিনে রুশদী তার জীবনের এক নতুন আর পবিত্র অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। প্রতিটি মেয়ের জীবনেই এই দিনটি আসে একরাশ স্বপ্ন আর পাহাড় সমান ভয় নিয়ে। ফেলে আসা শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিগুলো পেছনে ফেলে এক অজানা ঠিকানায় নিজের অস্তিত্ব গেঁথে দেওয়ার নামই তো বিয়ে।
সময় গড়িয়ে তখন দুপুর বারোটা। রিসোর্টের সুসজ্জিত কক্ষে রুশদীকে সাজাতে বসেছেন মেকআপ আর্টিস্ট। জুম্মার নামাজের পরপরই নিকাহ্ পড়ানো হবে। তিথি নিজে ঝটপট সেজে নিয়ে এখন রুশদীর পাশে ছায়ার মতো লেগে আছে। তার উৎসাহ যেন বাঁধ ভেঙেছে। আর্টিস্ট যেই না রুশদীর চোখে আইশ্যাডো ছোঁয়াতে গেল, অমনি তিথি কপাল কুঁচকে বলে উঠল,
“আরে আপু, এটা এভাবে না, একটু স্মোকি করে দিন না! রুশদীর চোখ দুটো এমনিতে হরিণীর মতো, বেশি গাঢ় করলে মানাবে না।”
মেকআপ আর্টিস্ট বেচারি একবার তিথির দিকে তাকায়, আবার মেকআপ ব্রাশের দিকে। খানিক বাদে ঠোঁটে লিপস্টিক ছোঁয়াতেই তিথি আবার ফোঁড়ন কাটল, “উঁহু! এই শেডটা বড্ড ফ্যাকাশে লাগছে। রুশদীর গায়ের রঙের সাথে একটু ডার্ক শেড না হলে কি জমে?”
মেকআপ আর্টিস্ট এবার ধৈর্য হারিয়ে হাতের ব্রাশটা এগিয়ে দিয়ে ঝঝলানো কণ্ঠে বলল, “নিন আপনিই বরং সাজান। আমার চেয়ে তো আপনিই বেশি বুঝছেন!”
তিথি একগাল হেসে দিয়ে নির্লজ্জের মতো হাত বাড়িয়ে বলল, “দিন তবে, আমিই সাজিয়ে দিই। আমার বন্ধুর সাজে কোনো কমতি আমি সইব না।”
রুশদী আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখছিল। ও জানে তিথি এমনও। ওর প্রতি ভালোবাসার আধিক্যেই তিথি এমন পাগলুমি করে। রুশদী মুচকি হেসে তিথির হাতটা টেনে ধরে মৃদু শাসন মাখা গলায় বলল, “থাম তো তিথি! একদম পাগলামি করবি না। আপু, আপনি আপনার মতো সাজান। আর তিথি, তুই চুপচাপ সোফায় গিয়ে বস। কোন কথা বলবি না। ”
রুশদীর শান্ত ধনক শুনে তিথি ঠোঁট উল্টে এক কোণে গিয়ে বসল। তবে তার উৎসুক চোখ দুটো সারাক্ষণ রুশদীর ওপরই নিবদ্ধ রইল।
রুশদীর মনের কোণে তখন এক অদ্ভুত শিহরণ। একটু পরেই নীল নদে নৌকা ভাসানোর মতো সে ভেসে যাবে এক নতুন সংসারে।
রিসোর্টের সবুজ গাছের উপর সকল পুরুষ একসঙ্গে জুম্মার নামাজ আদায় করল।সকলের সাথে শেরও ছিল। ফারাজ নিয়ম করে প্রায় প্রতি শুক্রবারেই শেরকে মসজিদে নিয়ে যায়।ছোট থেকেই ওকে এই পবিত্র অভ্যাসে গড়ে তুলতে চায় সে।
নামাজ শেষে শুরু হলো প্রস্তুতির পালা। ফারাজ ধবধবে সাদা শেরওয়ানি পরে একদম তৈরি। এখন চলছে খুদে নবাব শেরের সাজগোজ। বেডের ওপর শেরকে দাঁড় করিয়ে ফারাজ খুব যত্ন করে ওর অবাধ্য চুলগুলো আঁচড়ে দিচ্ছিল। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে দেখতে শের হুট করে বলে উঠল, “পাপা, আই হ্যাব আ কোশ্চেন।”
ফারাজ ওর নরম গালে হালকা করে ক্রিম ঘষতে ঘষতে শান্ত গলায় সুধালো, “কী কোশ্চেন?”
শের ওর বড় বড় চোখজোড়া পাপার দিকে স্থির রেখে জিজ্ঞেস করল, “তুমি দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি কাকে ভালোবাসো?”
ফারাজ এক মুহূর্তও দেরি না করে শেরের কপালে একটা চুমু খেয়ে বলল, “অবশ্যই তোমাকে! কিন্তু হঠাৎ এমন প্রশ্ন কেন, জান?”
শের শুধু কাঁধ উঁচিয়ে বলল, “এমনি!”
ওর সেই ‘এমনি’র আড়ালে যে কত শত শিশুসুলভ কৌতূহল লুকিয়ে ছিল, তা কেবল ওই প্রাণটাই জানে।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরে প্রবেশ করলেন রাইমা খান। নাতি আর ছেলের এমন সুন্দর মুহূর্ত দেখে ওনার চোখে প্রশান্তি খেলে গেল। জিজ্ঞেস করলেন, “তোমাদের সাজগোজ শেষ হলো?”
ফারাজ হাসিমুখে উত্তর দিল, “হ্যাঁ আম্মি, শেষ।”
রাইমা খান শেরের দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বললেন, “শের সোনা, তুমি একটু শান চাচ্চুর রুমে যাও তো ভাইয়া। তোমার পাপার সাথে আমার জরুরি কিছু কথা আছে।”
শের লক্ষ্মী ছেলের মতো মাথা নেড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রাইমা খান ফারাজের কাছে এগিয়ে এসে ওর শেরওয়ানির বোতামগুলো ঠিক করে দিতে দিতে নিচু স্বরে বললেন, “ফারাজ, কাবিন দেনমোহর কত রাখব? ”
ফারাজ কিছুটা উদাসীনভাবে জবাব দিল, “ড্যাডকে জিজ্ঞেস করো। ড্যাড যা বলে তা-ই।”
“তোমার ড্যাড তো আমাকেই পাঠালো তোকে জিজ্ঞেস করতে।”
ফারাজ এবার জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে তোমার যা ভালো লাগে রাখো। অথবা রুশদীর আব্বুকে জিজ্ঞেস করে দেখো।”
রাইমা খান কিছুটা আক্ষেপের সুরে বললেন, “আমি পারব না বাবা। রুশদীর আব্বুর স্বভাব তো জানিসই, তাকে কিছু জিজ্ঞেস করা বৃথা। তুই বরং এক কাজ কর, রুশদীকে একটা কল করে ওর মতামতটা জেনে নে।”
ফারাজ এবার সরাসরি নাকচ করে দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “পারব না। কাজী সাহেব যখন বিয়ে পড়াবেন, তখন যা হওয়ার হবে।”
রাইমা খান ছেলের একগুঁয়েমি দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তোর এই জেদটা কোনোদিন গেল না ফারাজ! তুই আর বদলাবি না।”
হঠাৎ ফারাজ বেশ বিরক্ত হয়ে নিজের গায়ের শেরওয়ানিটা টেনে বলল, “উফ আম্মি! এসব খুলে আমি বরং একটা শার্ট পরি? গা কেমন চুলকাচ্ছে।”
ছেলের কথা শুনে রাইমা খান রাঙিয়ে তাকালেন, “খবরদার! এটা খুললে কিন্তু খবর আছে তোর!”
ফারাজ এবার সেই পরিচিত বেহায়া হাসিটা দিয়ে বলল, “কয়টার খবর আম্মি? আমিও একটু দেখি খবরগুলো কেমন!”
রাইমা খান দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, “ফারাজ!”
ফারাজ তখনো হাসছে।
রুশদী রুমে রুশদী তখন একা। মেকআপের সরঞ্জাম আর ফুলের সাজ সব পড়ে আছে একপাশে। তিথি কোনো প্রয়োজনে বাইরে গিয়েছে। রুশদী একা বসে আছে বড় বিছানাটার ঠিক মাঝখানে। পরনে লাল লেহেঙ্গা, দুহাত ভর্তি স্বর্ণের চুড়ি আর ঝুমকা। গয়নার ভারে ঘাড় নুইয়ে আসছে তার। ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করল নাহিদ।
নাহিদ ধীরপায়ে এগিয়ে এসে রুশদীর পাশে বসল। ওর মাথাটা নিচু, দৃষ্টি মাটির দিকে স্থির। বড় বোনের বিয়ের দিনে ভাইয়ের বুক ফাটা হাহাকার করছে। রুশদী বুঝল, তার কলিজার টুকরো ভাইটার আজ মন ভালো নেই। যে বোনটার সাথে সারাদিন দুষ্টুমিতে মেতে থাকতো, একটু পরেই সে অন্যের ঘরের লক্ষ্মী হয়ে চলে যাবে।এই শূন্যতা নাহিদ সইবে কী করে?
রুশদী আলতো করে নিজের এক হাত নাহিদের কাঁধের ওপর রাখল। ভারী কাজের শাড়ি আর কবজিতে ঝুমকো দেওয়া চুরির ঝনঝনানি কানে বাজছে ওর। হাতের নড়াতে বেশ অসুবিধে হচ্ছে, তবু ভাইয়ের প্রতি মমতাটুকু আড়াল করতে পারল না সে। রুশদী নাহিদের চোখের দিকে তাকাল না, তাকালে হয়তো নিজের বাঁধও ভেঙে যাবে। শূন্য দৃষ্টিতে জানালার ওপাশে তাকিয় ধরা গলায় বলল,
“কিরে, আমার পালোয়ান ভাইটার চোখে কি তবে শ্রাবণের মেঘ জমেছে? মুখটা ওভাবে নিচু করে রেখেছিস কেন? বোনটাকে কি একবারও বিদায়-বেলায় প্রাণভরে দেখে নিবি না?”
রুশদী নাহিদের কাঁধে রাখা হাতটায় একটু চাপ দিয়ে নড়েচড়ে বসলো।বলতে শুরু করল,
“নাহিদ, শোন। এখন যে তোর খুব খারাপ লাগছে, বুকটা হাহাকার করছে,এটা আমি জানি। এই খারাপ লাগাটা খুব তীব্র, ঠিক যেন বুকে ধারালো কোনো ছুরির মতো বিঁধছে। কিন্তু বিশ্বাস কর, এই অনুভূতিটা খুব বেশিদিন টিকবে না। মানুষ বড় অদ্ভুত জীব রে নাহিদ! আজ আমি চলে যাচ্ছি বলে হয়তো তুই আজ আর কাল ডুকরে কাঁদবি।ছেলে মানুষ বলে হয়তো মুখ লুকিয়ে চোখের জল মুছবি। দু-তিনটে দিন তোর পৃথিবীটা বড় বেশি বিষণ্ণ মনে হবে। তারপর? তারপর দেখবি সময়ের প্রলেপে এই মোহটা আস্তে আস্তে ফিকে হয়ে আসছে।একটা খুব কঠিন ধ্রুব সত্য কথা বলি,মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোও কি সারা জীবন কাঁদে? না, কাঁদে না। বড়জোর তিন দিন তারা বিলাপ করে। চতুর্থ দিনে গিয়ে নিজের মনকে শক্ত করে নেয়। পনেরো দিন পর পরিবেশ শান্ত হয়, আর মাস খানেক গেলে জীবন আবার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরে। দু-তিন মাস পর বিশেষ কোনো উপলক্ষ ছাড়া কেউ সেই মৃত মানুষটাকে মনেও করে না। সেখানে আমি তো আর মরে যাচ্ছি না নাহিদ! আমি কেবল এই বাড়ি থেকে অন্য একটা বাড়িতে যাচ্ছি। আমি তো এই শহরেই থাকব। তুই চাইলেই আমার সাথে দেখা করতে পারবি, ফোনে আড্ডা হবে, আমরা আগের মতো ঘুরতেও যাব। শুধু আমাদের ঠিকানাটা বদলে যাবে, এই তো!
তুই তো জানিস আমাদের এই যান্ত্রিক শহরে আবেগ দিয়ে টিকে থাকা যায় না। যারা বাস্তবতা মানতে পারে না, তারা রোজ ভেতরে ভেতরে নীল হয়ে মরে। জীবনের ধ্রুব সত্যটা হলো, পরিস্থিতি আর সময়ের সাথে সাথে মানুষের পছন্দ যেমন পাল্টায়, মানুষের আবেগও তেমনি রূপ বদলায়। আজ যে বিচ্ছেদকে তোর পাহাড়সম মনে হচ্ছে, কাল সেটাকেই তোর খুব তুচ্ছ মনে হবে। তাই মিছে মায়ায় চোখের জল না ফেলে বাস্তবতা মেনে নিতে শেখ। যেদিন তুই জীবনকে তার নিজস্ব রূপে গ্রহণ করতে পারবি, সেদিন থেকেই তুই ভালো থাকতে শুরু করবি।আর একটা কথা শোন, তোকে আমি চিনি। তোর মনে কোথাও যেন একটা অপরাধবোধ কাজ করছে। তুই ভাবছিস, তোর মায়ের আচরণের জন্য আমার জীবনটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বলে আমাকে এই সময়ে আমি বিয়ে করে নিচ্ছি। একদম না! একদম এই গিলটি ফিলিং মনে পুষবি না। আমাদের সমাজে এই বয়সে মেয়েদের বিয়ে হওয়াটা খুবই সাধারণ একটা ব্যাপার। বরং আমি তো বলব, তোর মায়ের কারণে নয়, পরিস্থিতির খাতিরে আমি আরও ভালো একটা জীবনের দিকে পা বাড়াচ্ছি। সেখানে আমার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত, আমি শান্তিতে থাকতে পারব। তাই নিজের মনে বিষাদ পুষে রাখিস না।আর ভাই, এবার একটু থাম তো! আমি মেয়ে , যার বিয়ে হচ্ছে,সে-ই কাঁদছি না, আর তুই ছেলে হয়ে এমন ফ্যানফ্যান করে কাঁদছিস কেন? তোর এই কান্না দেখে আমার সত্যি খুব হাসি পাচ্ছে। নিজেকে একটু সামলা, এবার অন্তত একটা চওড়া হাসি দিয়ে তোর আপুকে বিদায় জানা!”
কার কথা কে শোনে! নাহিদ যেন আজ পৃথিবীর সমস্ত বিষাদ একাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে। রুশদীর এতশত যুক্তি, জীবনের কঠিন বাস্তবতা আর সান্ত্বনার বাণী,সবই যেন অরণ্যে রোদন হয়ে ফিরে এল। নাহিদ তখন হেঁচকি তুলে কেঁদেই চলেছে। ওর এই কান্না থামার কোনো লক্ষণ নেই। ছেলেটা বড্ড বেশি আবেগপ্রবণ, একদম ফেত কান্দনে যাকে বলে! ছোটবেলা থেকেই ও এমন,মেয়েদের মতো কথায় কথায় ওর দুচোখের পাতা নোনা জলে ভিজে ওঠে। আর ওর স্বভাবের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, অন্যের যেকোনো দোষ নিজের ঘাড়ে টেনে নেওয়া। এই যেমন এখন ও হন্যে হয়ে ভাবছে, ওর মায়ের করা যাবতীয় অন্যায়ের কারণেই হয়তো রুশদী রাগে-অভিমানে এই অসময়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসছে। এই কাল্পনিক অপরাধবোধই ওকে ভেতর থেকে দুমড়ে-মুচড়ে দিচ্ছে।
রুশদী একরাশ বিরক্তি আর গভীর হতাশা মেশানো চোখে ওর ভাইটার দিকে তাকিয়ে রইল। ছেলেটা সত্যিই বড্ড কাঁদতে পারে! আজকালকার মেয়েরাও হয়তো ব এত কান্নাকাটি করে না, নাহিদ যতটা করছে। একে তো ভারী শাড়ির অস্বস্তি, তার ওপর ভাইয়ের এই হাহাকার,রুশদীর ধৈর্য যেন এবার বাঁধ ভাঙল। সে কিছুটা ধমকের সুরে, বিরক্তিমাখা কণ্ঠে বলে উঠল,
“কান্না থামা নাহিদ, নাহলে এক চটকা মেরে তোর গালের সবগুলো দাঁত আমি আজ ফেলে দিব! বেয়াদব ছেলে কোথাকার! তোর এই ফ্যানফ্যানানির জন্য আমার বিয়ের ফিলটাই উড়ে যাচ্ছে। এটা কি বিয়ের বাড়ি না কি শ্মশানঘাট? কান্না থামা বলছি!”
নাহিদ বোনের ধমক খেয়ে থমকে গেল ঠিকই, কিন্তু কান্নার তোড় কি আর এত সহজে থামে? সে হেঁচকি তুলে অস্পষ্ট স্বরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,”আ…আ…আইম সরি আপু। আমি আসলে… আমি চাইলেও পারছি না।”
রুশদী এবার একটু নরম হলো, কিন্তু গলার কাঠিন্য বজায় রেখেই বলল,”হপ বেটা! কিসের সরি রে? তোর ওই মেকি সরি-ঠরি আমার লাগবে না। তুই যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসিস, আর যদি সত্যি আমায় সরি বলতে চাস,তবে আগে এই প্যাঁকপ্যাঁকানি থামিয়ে একটু হাস। তোর এই মুখভরা হাসিটা দেখার জন্য আমার কলিজাটা পুড়ছে। দেখি, চোখ মুছ তো আগে!”
বলেই রুশদী পাশেই থাকা টিস্যু বক্সটা টেনে নিয়ে নাহিদের দিকে এগিয়ে দিল। নাহিদ বাধ্য ছেলের মতো টিস্যু নিয়ে চোখ-মুখ মুছে নিল। বোনের জোরাজুরিতে সে এক চিলতে মিথ্যে হাসার চেষ্টা করল। সেই হাসির মাঝেও এক অদ্ভুত বিষাদ জড়িয়ে ছিল। চোখের কোণে টলমল করছে জল, আর ঠোঁটে এক চিলতে ম হাসি। ওর এই অবুঝ মুখটা দেখে রুশদীর বুকের ভেতরটা যেন হাহাকার করে উঠল। ওর প্রতি ভালোবাসার টানটা যেন সহসা শতগুণ বেড়ে গেল।
রুশদীর নিজের চোখের কোণেও তখন আষাঢ়ের মেঘ জমেছিল। মনে হচ্ছিল, এখনই বৃষ্টি নামবে তার দুচোখ বেয়ে। কিন্তু সে তো বড় বোন, তাকে যে আজ শক্ত হতেই হবে। নিজের সমস্ত আবেগ নিংড়ে নিয়ে সে চোখের সেই নোনা জলকে চোখের ভেতরেই বন্দি করে ফেলল
রিসোর্টের বিশাল উন্মুক্ত মাঠে বিয়ের প্যান্ডেল করা হয়েছে। আজ শুধু নিকট আত্মীয়া উপস্থিত আছে, তবুও কোলাহলের কমতি নেই। প্রায় দুই-তিনশ মানুষের গুঞ্জনে বাতাস ভারী হয়ে আছে। আগামীকালকের রিসেপশন পার্টিতে রাজনৈতিক ব্যক্তি, বড় বড় বিজনেসম্যানরা থাকবেন
স্টেজের উপর গম্ভীর্য নিয়ে সোফায় বসে আছে ফারাজ। তার পরনে জমকালো শেরওয়ানি, চোখে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। ফারাজের পাশেই বসে আছে ছোট্ট শের। তার খুশির যেন সীমা নেই! দুহাত ভরে তালি দিচ্ছে সে, হাসলে মুখভরা সবকটি দাঁত বেরিয়ে পড়ছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে, এই বিশাল ধরণীর বুকে সেই বুঝি আজ সবচেয়ে সুখী মানুষ।
ঠিক তখনই মেহমানদের ভিড় চিরে ধীরলয়ে হেঁটে আসতে দেখা গেল রুশদীকে। পরনে তার রক্তরাঙা লেহেঙ্গা, যাতে সূক্ষ্ কাজগুলো আলোয় ঝিকমিক করছে। মাথায় ভারি কারুকাজ করা দোপাট্টা। ফারাজ খেয়াল করল, রুশদী অন্য কোথাও তাকাচ্ছে না,তার সেই দুই জোড়া চোখের স্থির দৃষ্টি সরাসরি ফারাজের ওপর নিবদ্ধ। ফারাজও পলকহীন তাকিয়ে রইল। রুশদীর সেই দৃষ্টিতে কোনো অনুভূতিই নেই। একদম স্থির, স্বচ্ছ অনুভূতিহীন এক দৃষ্টি।তাদের চার চোখের এই নীরব কথোপকথন চলল দীর্ঘক্ষণ, কেউ দৃষ্টি সরাল না।যেন এই দৃষ্টিবিনিময়ের মাধ্যমেই তারা একে অপরের অস্তিত্বের গভীরতা মেপে নিচ্ছে।
রুশদী যখন স্টেজের ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল, তখন ফারাজ বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।ওপর থেকে ঝরঝর করে ঝরতে শুরু করল তাজা গোলাপের পাপড়ি।ফারাজ হাত বাড়িয়ে দিল রুশদীর দিকে। কোনো দ্বিধা বা আপত্তি ছাড়াই রুশদী তার কোমল হাতটি ফারাজের প্রশস্ত হাতের ওপর রাখল।
এই সেই প্রথম স্পর্শ! প্রথম অনুভব। রুশদীর হাতের আঙুল যখন ফারাজের হাতের তালু স্পর্শ করল, তখন মুহূর্তের জন্য যেন পুরো পৃথিবীটা থমকে গেল। এক অজানা বিদ্যুৎ খেলে গেল দুজনেই রক্তকণিকায়। এই প্রথম স্পর্শের শিহরণে রুশদীর পা যেন কিছুটা টলে উঠল, আর ফারাজ শক্ত করে সেই হাতটি আগলে ধরল।
স্টেজে বর ও কনের জন্য বসার সোফা আলাদা। দুজনের মুখোমুখি বসেছে। মাঝখানে ঝুলছে একটি ফুলের পর্দা,সুগন্ধি রজনীগন্ধা আর গোলাপের সেই বুনন ভেদ করে অপর পাশের মানুষটিকে আবছা দেখা যাচ্ছে,। ফারাজ কিছুটা নড়েচড়ে বসল। তার দৃষ্টি স্থির হলো সামনে বসে থাকা রুশদীর ওপর। রুশদীর পরনে আজ ‘আনজারা’ ব্র্যান্ডের সেই বিখ্যাত লাল লেহেঙ্গা। কানে, গলায় আর দুহাতে চকচক করছে ভারি স্বর্ণালঙ্কার। তবে রুশদীর হাতের চুরির দিকে তাকাতেই ফারাজ, ভ্রু কুচকালো। বিশাল ঝুমকো দেওয়া সেই চুরিগুলো সম্ভবত স্বর্ণের নয়।
ফারাজ রুশদীর মুখচ্ছবির দিকে তাকাল। ঘোমটাটা কপাল অবধি টানা, মাথা নুইয়ে বসে আছে। লাল রঙটা রুশদীর দুধে-আলতা গায়ের রঙে যেন আগুনের মতো জ্বলছে। অথচ আশ্চর্য! মেয়েটা এত নিখুঁত সুন্দর হওয়ার পরেও ফারাজের মনের গহীনে কোনো ঢেউ উঠছে না। ফারাজের মনে তার জন্য বিশেষ কোন জায়গা তৈরি হচ্ছে না। মেয়াটার দিকে তাকালে তার অদ্ভুত কোন অনুভূতি হচ্ছে না — এর কারণ কি তাদের ভেতর কোন সম্পর্ক নেই এটাই?
হঠাৎ কাজী সাহেবের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ফারাজের চিন্তার সুতো ছিঁড়ে দিল
“দেনমোহর কত ধার্য করব?”
ফারাজ কোনো উত্তর দিল না। সে নির্বাক চোখে স্টেজের সামনে বসে থাকা রাইমা খানের দিকে তাকাল। রাইমা খান ধীরপায়ে স্টেজে উঠে রুশদীর পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। একই প্রশ্ন যখন রুশদীকে করা হলো, সে কোনো টাকা বা গয়নার অংকের দিকে গেল না।ফুলের পর্দা ভেদ করে ফারাজের অস্পষ্ট অবয়বের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ধীর সুরে বলল,
“দেনমোহর হিসেবে আমি ওনার কাছ থেকে শুধু সুন্দর একটি জীবন চাই…!”
রুশদীর কণ্ঠস্বর এতটাই নিচু ছিল যে, স্টেজে থাকা গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া আর কেউ তা শুনতে পেল না। ফারাজ স্তব্ধ হয়ে গেল। আধুনিক এই যুগে, যেখানে দেনমোহরের অংক নিয়ে দরদাম চলে, সেখানে এই মেয়েটি স্রেফ একটা সুন্দর জীবন দাবি করছে? কোনো চাহিদা নে!
রাইমা খান নিজেও আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি রুশদীর কানের কাছে ঝুঁকে পড়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, “টাকা, গয়না বা জমির কোনো একটা দাবি বলো। এটা তোমার অধিকার।”
রুশদী ম্লান হেসে রাইমা খানের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্তভাবে উত্তর দিল, “আমার টাকা বা গয়না লাগবে না মা। যার কাছে জীবন সঁপে দিচ্ছি, তার কাছে সামান্য কাগজের নোটের দাবি করে কী হবে?”
খুতবা শেষে,কাজী সাহেব রুশদীর দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করলেন,
“পিতা আনাস হকের কন্যা রুমাইসা হক রুশদী, আপনাকে শারফারাজ খান, পিতা শেহজাদ খান-এর সাথে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা দেনমোহর ধার্য করে বিবাহে আবদ্ধ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আপনি কি এই বিয়েতে রাজি? রাজি থাকলে বলুন, কবুল।”
রুশদীর এক কাঁধে রাইমা খানের মমতাময়ী হাতের স্পর্শ, অন্যপাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে তিথি। অথচ এই ভিড়ের মাঝেও রুশদীর তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো হন্যে হয়ে কাউকে খুঁজে ফিরছিল। সে তাকিয়ে দেখল স্টেজের কিছুটা দূরে আনাস হক আর নাহিদা দাঁড়িয়ে আলাপ করছেন। আনাস হককে দেখে মনে হচ্ছে তিনি বড্ড ব্যস্ত, যেন এই বিয়ের আসরের চেয়ে অন্য কোনো আলোচনা তাঁর কাছে বেশি জরুরি। নিজের মেয়ের জীবনের সবচেয়ে বড় মুহূর্তটি চলছে, অথচ বাবার ধ্যান এদিকে নেই!
মুহূর্তেই রুশদীর দুচোখ জ্বলে উঠল। বুক ফাটা অভিমানে চোখ দিয়ে বেরিয়ে এল তপ্ত নোনা জল। প্রতিটি মেয়ে তার জীবনের এই সন্ধিক্ষণে বাবার হাতের একটু ভরসা চায়, মাথার ওপর বটবৃক্ষের মতো এক ফালি ছায়া চায়। কিন্তু রুশদীর পাশে তার আপন কেউ নেই! বাবা কি পারতেন না ফরমালিটির জন্য হলেও আজ মেয়ের পাশে এসে তার সাহস হয়ে দাঁড়াতে? রুশদীর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে মাথা নিচু করে নীরবে অশ্রু বিসর্জন দিল।
তাকে ওভাবে চুপ করে থাকতে দেখে রাইমা খান নিচু স্বরে তাগাদা দিলেন, “কবুল বলো রুশদী।” পাশ থেকে তিথিও ভা বলল, “রুশদী, আর দেরি করিস না, কবুল বল।”
রুশদী হাতের মুঠোয় থাকা টিস্যু দিয়ে দ্রুত চোখ দুটো মুছে নিল। কান্নার তোড়ে গলার কাছে একরাশ কষ্ট দলা পাকিয়ে আছে, কোনো শব্দ যেন বেরোতে চাইছে না। সে দুচোখ বন্ধ করে তার মায়ের মুখটা মনে করার চেষ্টা করল। এক বুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁপা কাঁপা গলায় অস্ফুট স্বরে বলল
“আ… আলহামদুলিল্লাহ, ক… ক… কবুল।”
কাজী সাহেব বললেন, “আরেকবার বলুন মা, কবুল।”
রুশদী এবার কণ্ঠকে একটু শক্ত করে দুবার উচ্চারণ করল, “কবুল, কবুল।”
এরপর কাজী সাহেব মুখ ফেরালেন ফারাজের দিকে।
“রুমাইসা হক রুশদীকে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা মোহরানায় আপনার স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে; আপনি কি কবুল করলেন?”
ফারাজের স্পষ্ট স্বরে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ, কবুল করলাম।”
“আলহামদুলিল্লাহ কবুল করলাম “ফরাজের একথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গে নব দম্পতি হৃদয়ে এক অদ্ভুত তরঙ্গ বয়ে গেল । রুশদীর সর্বাঙ্গ এক অজানা শিহরণে থরথর করে কেঁপে উঠল। এই একটি মাত্র শব্দ কবুল বদলে দিল তার পরিচয়, তার অস্তিত্ব।সে কারো অর্ধাঙ্গিনী হয়ে গেল। তার নবজীবনের সূচনা ঘটল।
তাদের মাঝের সেই সাদা ফুলের পর্দাটি ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়া হলে,ফারাজের দৃষ্টি গিয়ে স্থির হলো তার বিবাহিত স্ত্রী রুমাইসা হক রুশদী ওপর। নিজের অজান্তে লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিল ফারাজ।এই লজ্জার কারণ খুঁজে পেলোনা ফারাজ।
ফারাজ আবারও সাহস সঞ্চয় করে তাকাল রুশদীর মুখপানে। চাপা কান্নার ফলে রুশদীর নাক,গাল রক্তিম হয়ে উঠেছে। হাতের মুঠোর টিস্যু দিয়ে সে বারবার চোখ মুছছে। রুশদীর এই রূপের দিকে তাকিয়ে ফারাজের হৃদয়ে এক ভিন্ন অনুভূতি জেগে উঠলো। কিছুক্ষণ আগেও এই একই মেয়েকে দেখছিল সে, তখন এমন কোনো ঝড় ওঠেনি মনে। কিন্তু এখন কেন এই অনিন্দ্য রূপ তাকে মোহাচ্ছন্ন করছে? কেন তার হৃদস্পন্দন আজ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে? উত্তরটা হয়তো ওই একটি শব্দের মাঝেই লুকিয়ে আছে…’কবুল’। সম্পর্কের একটি বৈধ নাম পাওয়ার সাথে সাথেই কি তবে হৃদয়ের বন্ধনগুলো এভাবে আলগা হয়ে যায়?
কাজী সাহেব তখন হাত তুলে মোনাজাত ধরলেন,
“বারাকাল্লাহু লাকা, ওয়া বারাকা আলাইকা, ওয়া জামাআ বাইনাকুমা ফী খাইরিন…”(অর্থ: আল্লাহ তোমাদের বরকত দিন এবং তোমাদের কল্যাণের সাথে একত্রে রাখুন।)
অস্তরাগের রঙ পর্ব ৫
মোনাজাতে ফাকে রুশদী আড়চোখে একপলক ফারাজকে দেখে নিল। পরক্ষণেই বিদ্যুৎবেগে দৃষ্টি নামিয়ে ফেলল সে। মনের ভেতর তখন এক অবিশ্বাস্য বিস্ময়! খানিক আগেও যে পুরুষটি তার কাছে সম্পূর্ণ অচেনা কেউ ছিল, এক নিমেষে সে-ই হয়ে গেল তার ইহকালের পরম আশ্রয়, তার জীবনসঙ্গী। আজ থেকে তার নামের শেষে যুক্ত হলো এক নতুন পরিচয় শারফারাজ খানের অর্ধাঙ্গিনী। কথাটি মনে হতেই রুশদীর সারা শরীর এক মৃদু কম্পনে শিউরে উঠল।
কবুল পরার পর অপর মানুষটির জন্য যে শিহরণের তরঙ্গ তাদের অঙ্গ দিয়ে বয়ে গেল এটাই প্রকৃত, ফাস্ট লাভ।
