Home অস্তরাগের রঙ অস্তরাগের রঙ পর্ব ৮

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৮

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৮
তেজরিন উম্মীদ

প্যান্ডেলের আলোকসজ্জা আর মানুষের শোরগোল থেকে দূরে, রিসোর্টের এক কোণে ঘাসে ঢাকা খোলা মাঠটায় শেরকে নিয়ে পায়চারি করছিল শান। মাথার ওপর অগণিত নক্ষত্রখচিত আকাশ, আর চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। শের প্রতিদিন তার বাবার বুকের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে অভ্যস্ত, কিন্তু আজকের রাতটা যে অন্যরকম, তা এই অবুঝ শিশুটিকে কে বোঝাবে? আজ তো আর ফারাজের সাথে শেরের ঘুমানো চলবে না।তাই শান শের কে নিজের সাথে রেখেছে।
শের শানের আঙুল ধরে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় দাঁড়াল। ছোট্ট কপালে তার রাজ্যের বিরক্তি। সে শানের হাতটা মৃদু ঝামটা দিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলল,

“উফ চাচু! আমি মম এর সাথে গল্প করব বলেছি না? তুমি আমাকে মশার কামড় খাওয়াতে এই অন্ধকার মাঠে নিয়ে আসলে কেন? চলো, আমি এখন মম এর কাছে যাব।”
শান এক মুহূর্তের জন্য মহাবিপদে পড়ে গেল। এই সাড়ে চার বছরের বাচ্চার মনে কী চলছে তা যেমন সে জানে, তেমনি বড়দের জগতের ব্যাপার-স্যাপার তো তাকে এখন বোঝানো সম্ভব নয়। শান মাঠের ঘাসের ওপর হাঁটু গেড়ে বসল, যাতে সে সরাসরি শেরের চোখের দিকে তাকাতে পারে। শেরের কাঁধে দু-হাত রেখে অত্যন্ত নরম গলায় সে বলল,

“শের, আজকে তুমি তোমার মম এর সাথে গল্প করতে পারবে না সোনা। আজকের রাতটা একটু আলাদা।”
শানের কথা শুনে শেরের ছোট চোখ দুটো রাগে লাল হয়ে উঠল। তার প্রিয় রুশদী মম এখন হাতের নাগালে, অথচ তাকে কেন দূরে থাকতে হবে? সে হাত-পা ছুড়ে প্রতিবাদী সুরে বলল, “কেন? আমি কেন কথা বলতে পারব না? মম কি আমার ওপর রাগ করেছে?”
শান এবার দোটানায় পড়ে গেল। কীভাবে সে এই প্রশ্নের উত্তর দিবে? খানিকটা সময় নিয়ে সে ভাবলো শের কে কি বলা যায়। এরপর শেরকে আলতো করে নিজের কাছে টেনে নিয়ে শান জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা শের, বলো তো ভাইয়া দুনিয়াতে সবচেয়ে বেশি কাকে ভালোবাসে?”
শের এক মুহূর্তও দেরি না করে চট করে জবাব দিল, “আমাকে! পাপা আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে।”
“একদম ঠিক! আচ্ছা, ভাইয়া কি তোমার মমকে ভালোবাসে?”

প্রশ্নটা শুনে শেরের হাসিখুশি মুখটা মুহূর্তেই কালো মেঘে ঢাকা পড়ল। সে মাথা নিচু করে করুণ সুরে জবাব দিল, “উঁহু, বাসে না। ওদের তো দেখা হলেই ঝগড়া শুরু হয়। পাপা সবসময় মম এর সাথে রাগ করে কথা বলে।”
শান এবার সুযোগটা লুফে নিল। সে শেরের থুতনিটা ধরে মুখটা উঁচিয়ে বলল, “হুম, ঠিক ধরেছ। দেখো, আজকে ওদের বিয়ে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওরা তো কেউ কাউকে ভালোমতো চেনে না, তাই না? এখন তুমিই বলো, যদি কেউ কাউকে নাই চেনে, তবে ভালোবাসবে কী করে? আর চেনার জন্য, ভালোবাসার জন্য তো ওদের একান্তে অনেকটা সময় কথা বলতে হবে। এখন তুমি যদি সারাক্ষণ ওদের মাঝখানে থাকো, ওরা কি মন খুলে কথা বলতে পারবে? পারবে না তো!”

শের ভ্রু কুঁচকে শানের কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করল। শান আরও বুঝিয়ে বলল, “যদি ওরা কথা না বলে, তবে ওরা একে অপরকে চিনবেও না, ভালোবাসবেও না। আর তোমার পাপা যদি তোমার মমকে ভালো না বাসে, তবে তোমার রুশদী মম একদিন তোমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে যাবে। তুমি কি চাও মম চলে যাক?”
শের এবার আঁতকে উঠে জোরে জোরে মাথা নাড়ল, “না! আমি চাই না মম চলে যাক!মম চলে গেল আমি অনেক কষ্ট পাব।”

“তাহলে শোনো, যে তোমাকে বেশি আদর করে, তুমি তাকে বেশি ভালোবাসো না? তোমার পাপা যদি মমকে অনেক আদর আর ভালোবাসা দেয়, তবেই তো মম খুশি থাকবে। আর ওরা সারাদিন ঝগড়া না করে মিলেমিশে থাকবে। সেজন্য রাতে ওদের দুজনকে একটু একা থাকতে দিতে হবে। তুমি সারাদিন মমের সাথে গল্প করবে, খেলা করবে,তাতে কোনো মানা নেই। কিন্তু রাতে তুমি আমার সাথে ঘুমোবে, ঠিক আছে? তাহলে ওরা একে অপরকে অনেক ভালোবাসবে। আর তোমার জন্য ছোট্ট একটা ভাইয়া বা বোনু নিয়ে আসবে পাপা। তখন তোমার তো আর একা একা লাগবে না, তুমি ওদের সাথে খেলতে পারবে। রাজি তো?”
শেরের সরল মনে শানের এই লজিকটা একদম গেঁথে গেল। একটা ছোট ভাই বা বোনের লোভে আর মমকে হারানোর ভয়ে সে নিমেষেই শান্ত হয়ে গেল। সে উজ্জ্বল মুখে হাসল এবং বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দারুণ এক ভঙ্গিতে বলল, “ওক্কে চাচু! ডিল ডান! আমি তোমার সাথেই ঘুমোবো আজ থেকে।”

শানের বুক থেকে যেন বিশাল এক পাথর নেমে গেল। যাক,বাঁচা গেল এই পুচকির প্রশ্ন থেকে।
রিসোর্টের পেছনের এই মাঠে মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে। দূর থেকে ভেসে আসা সাউন্ডবক্সের ধুপধাপ শব্দ এখানে এসে ক্ষীণ হয়ে মিশে যাচ্ছে রাতের নিস্তব্ধতায়। শান আরও কিছুক্ষণ শেরকে নিয়ে পায়চারি করল। হঠাৎ শের যেন আর হাঁটতে চাইল না, সে ধপ করে ঘাসের ওপর আসন গেঁড়ে বসে পড়ল। তার ছোট ছোট হাত দুটো হাঁটুতে ঠেকিয়ে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল।
শেরকে ওভাবে বসে পড়তে দেখে শানও আর দাঁড়িয়ে থাকল না। সেও ওর পাশে ধুলোবালি উপেক্ষা করে বসে পড়ল। শান একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“কী হলো শের? হঠাৎ এভাবে বসে পড়লে কেন? পা ব্যথা করছে?”
শের মাথা নেড়ে না বলল। তারপর একটা অদ্ভুত আবদার করে বসল, “চাচু, একটা কবিতা শোনাও তো!”
শান আকাশ থেকে পড়ল।হ্যাঠ সে কবিতা শুনতে চাচ্ছে কেন? তাছাড়া,শান তো কবিতার ‘ক’ টাও পারে না। ছোটবেলায় আতা গাছে তোতা পাখি, আমাদের ছোট নদী এসব পড়েছিল।এসব ভুলে খেয়েছে সেই কবে। কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“কবিতা? আরে শের, আমি তো ভাই কবিতা-টবিতা একদম পারি না,আমাকে চাইলে আমি একটা র‍্যাপ সং বা ইংলিশ সং শোনাতে পারি। শুনবে?”
শের তো কবিতাই শোনবে, গান টানে তার হবে না। সে মুখটা বাঁকিয়ে,শানকে এক প্রকার ব্ল্যাকমেইল করে বলল ,
“তুমি না পারলে নেই। আমি এখন পাপার কাছে যাচ্ছি, পাপা আমাকে সুন্দর একটা কবিতা পারে। আমি যাচ্ছি টা টা!”

বলেই শের যখন উঠে দাঁড়াতে চাইল, শানের হৃৎপিণ্ড যেন গলার কাছে চলে এল। এখন এই অসময়ে শের যদি গিয়ে বাসর ঘরের দরজায় টোকা দেয়, তবে আম্মি (রাইমা খান) তাকে চিবিয়ে খাবে।তিনি শেরকে দেখে রাখতে বলেছেন। শান তড়িঘড়ি করে শেরের হাতটা টেনে ধরে আবার ঘাসের ওপর বসাল।
“আরে আরে, আমি শোনাচ্ছি।কবিতাই তো?তোমাকে এমন কবিতা শোনাবো তুমি, তুমি মুগ্ধ হয়ে হাতে তালি দিবে।এই কবিতার জন্য কবিগুরুর পরে গিনিস বুকে আমার নাম উঠবে। ”
শান গলা খাঁকারি দিয়ে চারপাশটা একবার দেখে নিল। তারপর হাত পা নাড়িয়ে, চোখ বন্ধ করে, কণ্ঠস্বরে একটু নাটুকে ভাব এনে বলতে শুরু করল,

“পড়ালেখা চাঙ্গে, আমি ভাসি গাঙ্গে,
গাঙ্গে নাই পানি, কপালে আছে শনি।
কপালে নাই কেউ, কবে জুটবে বউ?
পাদে নাই গন্ধ, বউয়ের মন বন্ধ!
কবে আমি পাব তারে? মনটা আমি দিব যারে!
মনের কথা বলতে গিয়ে, গলাটা যায় শুকিয়ে,
বউয়ের কথা ভাবলে পরে, মনটা যায় জুড়িয়ে।
রাতে মশা গান গায়, দিনে মাছি ডাকে,
পকেট ফাঁকা দেখে, প্রেমিকা ব্লক করে রাখে!
রাতে ঘুম আসে না, ভাবি শুধু একটা কথা,
কবে যে খাব আমি, বউয়ের হাতের রান্না!
ঘরে থাকি একা, মশা কামড়ায় রাতে,
বউ কবে আসবে, গল্প করতে সাথে!
পড়াশোনা চুলোয় যাক, বইয়ে লেগেছে ছাতা,
বউ না পেলে কে শুনবে, আমার মনের কথা!”

শানের এই চরম উদ্ভট আর হাস্যকর কবিতা শুনে শেরের অবস্থা করুণ হয়ে পড়ল। সে হাসতে হাসতে ঘাসের ওপর গড়াগড়ি খেতে শুরু করল। দুই হাত দিয়ে পেট চেপে ধরে সে খিলখিল করে এমনভাবে হাসতে লাগল যে, তার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে আসার উপক্রম। শেরের হাসির তোড়ে শানের কবি কবি ভাবটা মুহূর্তেই উড়ে গেল।সে চোখ খুলে গম্ভীর হয়ে তাকলে শের এর দিকে।
শান কিছুটা বিরক্ত হওয়ার ভান করে মুখ কুঁচকে বলল,
“এই যে মিস্টার শেহরান খান শের! আমার মতো এমন বিশ্বমানের কবি তুমি বর্তমান দুনিয়ায় আর দ্বিতীয়টি কোথাও পাবে না। তোমার উচিত ছিল আবেগাপ্লুত হওয়া, তা না করে তুমি হাসছ? যাও, আমার এই কালজয়ী কবিতার জন্য এখনই একটা নোবেল দেওয়ার ব্যবস্থা করো!”
শের কোনোমতে হাসি থামিয়ে পেটে হাত দিয়ে বলল,

“চাচু! এটা কি কবিতা ছিল নাকি মশার সাথে তোমার বউ এর কথা?তুমি যে বউ নিয়ে এমন কবিতা লিখেছ, পাপা শুনলে তো তোমাকে ঘর থেকেই বের করে দিবে।”
শান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হতাশ গলায় বলল, “আরে হিংস, আমি বাস্তব কথা বলেছি। তোমার পাপা তো বউ পেয়ে গেছে, পোড়া কপাল আমার।আমার কথা কেউ ভাবলো না। ভাবলো শানটা একা একা কি করে থাকে, তাকে একটা বউ এনে দেওয়া উচিত। হাহ!’পড়াশোনা তো এমনিতেই রসাতলে গেছে, এখন একটা বউ পেলে অন্তত এই মশার কামড়গুলো তো একসাথে ভাগ করে নেওয়া যেত!”
শের আবার হোহো করে হেসে উঠে বলল, “চিন্তা করো না চাচু, আমি মমকে বলব তোমার জন্য একটা বউ খুঁজে দিতে। তখন তুমি চাচিকল সারারাত এই কবিতা শুনিয়ো!”
শের কথা শুনে শান হেসে বলল,
“এই তো পুরো আমার ভাতিজার মতো কথা বলেছ।তোমাকে উম্মাহ!লাভ ইউ শের।

তিথি একদিন রাতে রুশদীর সাথে ঘুমিয়েছে, কিন্তু আজ রুশদ নেই। একা ঘরে ঘুম আসছিল না তার, তাই নাহিদকে ডেকে এনে, দু’জনে মিলে অনেকটা সময় লুডু খেলল। এক সময় নাহিদের চোখেও ঘুম নেমে এল, সে হাই তুলে নিজের রুমে চলে গেল। কিন্তু তিথির কিছুতেই ঘুম আসছে।এক তো তার একা একা লাগছে, তার উপর পারিবারিক সমস্যা টা তাকে একদম বিষিয়ে তুলেছে।
রুমে টিকতে না পেরে সে ধীরপায়ে প্যান্ডেলের দিকে এগিয়ে এল। এখনো খান বাড়ির বেশ কয়েকজন আত্মীয় আড্ডা দিচ্ছে, হাসাহাসি করছে। তিথি কাউকে চেনে না, তাই সেখানে না গিয়ে সে একটু নির্জনতার খোঁজে সুইমিং পুলের দিকে পা বাড়াল। নীলচে পানির ওপর রাতের চাঁদের আলো পড়ে,পুলের পানি ঝিকিমিকি করছে। তিথি পুলে নিজের ছায়া দেখতে দেখতে হাঁটছে, কিন্তু সে ঘুণাক্ষরেও টের পেল না যে এক জোড়া চোখ অনেকক্ষণ ধরে তার পিছু নিয়েছে। সেই ভ্রমর তিতির একদম কাছে এসে, একহাত দূরত্ব রেখে পিছু পিছু হাঁটতে লাগলো।এবং শিষ বাজিয়ে একটি গানের সুর তুলল,

“আরে তুমি রাজি জামাই সাজি কেয়া কারেগা কাজি?”
তিথির ভয়ে শরীরের প্রতিটি লোম খাড়া হয়ে উঠল তার।এক ঝটকায় পেছনে ঘুরতেই দেখল অন্ধকারে কেউ একজন দাঁড়িয়ে। ভয় আর কৌতূহল মেশানো হাতে ফোনের ফ্ল্যাশলাইটটা জ্বালাতেই শানের সেই ৩২ পাটি দাঁত বের করা হাসিটা নজরে এল। তিথির ভ্রু কুঁচকে গেল। বিরক্তির সুর মিশিয়ে সে বলল,
“আপনি? আপনি এই মাঝরাতে এখানে কী করছেন?”
শান একদম সাবলীলভাবে দাঁত কেলিয়ে হাসল। পকেটে হাত গুঁজে দু-পা এগিয়ে এসে বলল,
“কেন? তোমাকে পাহারা দিতে এসেছি!”

তিথি অবাক হয়ে নিজের দিকে ইশারা করল, “আমাকে?”
“হ্যাঁ, তোমাকেই। এই রাত-বিরেতে একা একা নীল পরীর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছ, যদি কেউ চুরি করে নিয়ে যায়? তাই নিজের হবু বউকে পাহারা দিতে এলাম আর কী!”
‘বউ’ শব্দটা কানে আসতেই তিথির মাথায় যেন রক্ত চড়ে গেল। লোকটা বলে কী? পাগলামির একটা সীমা থাকে! সে কড়া গলায় ধমক দিয়ে বলল,
“ওয়েট ওয়েট! আপনি কাকে বউ বলে ডাকছেন মিস্টার?”
শান যেন একদম অবাক হওয়ার ভান করল। নির্বিকার গলায় উত্তর দিল, “কেন? আমার বউকে!”
“আপনার বউকে?”
তিথি আবার প্রশ্ন করল।
“হ্যাঁ, কেন তুমি নও?”
শানের সোজাসাপ্টা উত্তর।
তিথির মাথাটা এবার আসলেও ঘুরতে লাগল। রাগে আর বিস্ময়ে তোতলাতে শুরু করল সে, “মানে কী আপনার? কী বলতে চান আপনি?”

“মানে তুমি আমার হবু বউ। আজ হোক বা কাল, বউ আমার হতেই হবে তোমাকে।”
“ আজব তো! আপনার মাথার চিকিৎসার আসলেও খুব দরকার।বিরক্ত না করে জান তো এখান থেকে।”
তিথি আর তর্কে না গিয়ে সুইমিং পুলের কিনারে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ল। তার পায়ের ছোঁয়ায় স্থির পানিতে ছোট ছোট ঢেউ খেলতে লাগল।
শান চলে না গিয়ে, তিথির পাশে এসে দাঁড়াল। তিথির শান্ত মুখটার দিকে একবার তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা যাব, কিন্তু তুমি এত রাতে অন্ধকারে একা বাইরে কী করছ? ভয় করে না তোমার?”
তিথি ফোনের আলোটা নিভিয়ে দিয়ে আকাশের রূপালি চাঁদের দিকে তাকাল। রাতের শীতল হাওয়া তার চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছে। শান্ত স্বরে সে উত্তর দিল, “যার বেড়ে ওঠাই অন্ধকারে, সে অন্ধকারকে ভয় পায় না।”
তিথির এই কথাটি শানের হাসিখুশি মনে এক অজানা নাড়া দিয়ে গেল।তার কেন জেন মনে হলো মেয়েটা কোন প্রবলেম ফেস করছে।

সুইমিং পুলটি এখন এক শান্ত আয়নার মতো স্থির হয়ে আছে। মাথার ওপরে থাকা রূপালি চাঁদ যেন সিক্ত পানির গহীনে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে ব্যস্ত। চারপাশের বাগান থেকে শিউলি আর হাসনাহেনার মিশ্র সুবাস রাতের শীতল হাওয়ায় ভেসে আসছে।তিথির থেকে কয়েক হাত দূরে গিয়ে শান পুলে পা ডুবিয়ে বসল। আশেপাশে জোনাকিরা ছোট ছোট আলোর বিন্দু হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক রাতের নিস্তব্ধতাকে ভাঙছে। শান পানির দিকে তাকিয়ে তিথির উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ল,
“আচ্ছা, আম্মির কাছ থেকে জানলাম ভাবির নাকি আপন কোনো বোন নেই। তুমি কি তবে ভাবির কাজিন হও?”
তিথি পানির ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। অতি মৃদু স্বরে জবাব দিল, “নাহ্।”

“তাহলে? সৎ বোন?” শান একটু ইতস্তত করে নিচু গলায় শুধাল।
“না। আমি রুশদীর রক্তের সম্পর্কেরই কেউ না।”
“ওহ! তার মানে তোমরা কাজিনও নও?”
এরপর কিছুক্ষণ সেখানে কেবল পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আর রাতের স্তব্ধতা বিরাজ করল। হঠাৎ তিথির মুখের সামনে একটা জোনাকি পোকা এসে স্থির হলো। তিথি তার আঙুলের ডগা দিয়ে খুব আলতো করে সেই আলোর বিন্দুটাকে স্পর্শ করল। তারপর বিষণ্ণ হেসে বলল, “আসলে রুশদী আমার সম্পর্কের কেউ না, ও আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।”
শান একটু অবাক হয়ে বলল, “বলো কী! তোমাদের বন্ডিংটা তো একদম আপন বোনের মতো। যে কেউ তোমাদের দেখলে বলবে তোমরা একই মায়ের পেটের বোন।”

তিথি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।ধর্ম মস্তিষ্কে হানা দিকে পুরনো কিছু অতীত, কিছু স্মৃতি। সে নিস্পৃহ গলায় বলল,
“আসলে আপন মানুষদের আর ভালো লাগে । তাই পরকেই আপন করে নিচ্ছি। পরের কাছে যদি বুক ভরে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা যায়, তবে সেই বিষাক্ত আপনদের দরকার কী?”
তিথির কণ্ঠের একটা চাপা অভিমান ও কষ্ট মিশে ছিল। তিথির মনটা যেন মলিন হয়ে যাচ্ছে দেখে শান নিজে প্রশ্ন ধরেন পাল্টে ফেলল। সে আবার সেই চিরচেনা দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল,
“আচ্ছা, সব না হয় বুঝলাম। কিন্তু তোমাকে এখন কোন নামে ডাকব? বউ নাকি বিয়াইন?”
তিথির মেজাজটা আবার চট করে চড়ে গেল। সে কপাল কুঁচকে বলল, “মানে কী আপনার? কী আজেবাজে বকছেন?”

“আরে আজেবাজে হবে কেন? লজিক্যালি তুমি আমার বউ আবার সম্পর্কে ‘বিয়াইন। এখন আমি কনফিউজড যে কোনটা বলে ডাকলে তুমি বেশি খুশি হবে!”
তিথি চটা গলায় বলল “আমি আপনার বউ লাগি?
শান দুই হাত পেছনে দিয়ে হেলান দিয়ে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “লাগো তো বটেই! তবে বউয়ের আগে একটা হবু আছে। তুমি হলে আমার হবু বউ’!”
তিথির বুকের ভেতর চেপে থাকা পারিবারিক বিষাদটা হঠাৎ করেই বড় ভারী লাগছিল। কিন্তু সে চাচ্ছিল না পারিবারিক বিষাদটা ধরে রাখতে, সেই তিতকুটে অনুভূতিগুলো কাউকে বুঝতে দিতে। তাই মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে সে শানের সাথে মজার ছলে মেতে উঠল।

তিথি মুখে একটা দুষ্টুমিভরা হাসি টেনে বলল, “বিয়াই তো দেখি বেশ ভালোই মজা করতে পারেন!”
তিথির মুখে বিয়াই শব্দটা শোনামাত্র শান যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে হঠাৎ নাটকীয় ভঙ্গিতে বুকের বাঁ পাশে হাত চেপে ধরল। চোখ-মুখ কুঁচকে যন্ত্রণার এক নিখুঁত অভিনয় করে আর্তনাদ করে উঠল,
“উফ বিয়াইন! এই বিয়াই ডাকটা একদম কলিজার লেগেছে। এখানে বড্ড লাগছে আমার!”
তিথি খিলখিল করে হেসে উঠল।শানের এমন পাগলামো কথাবার্তা শুনে তার মনের মেঘ গুলো উড়ে যেতে শুরু করল। সে আরেকটু খোঁচা দিয়ে আদুরে কিন্তু বিদ্রুপের সুরে বলল, “ওমা, সত্যিই বিয়াই?”
শানের অবস্থা তখন নাজেহাল। সে যেন হার্ট অ্যাটাক করার জোগাড়! দাঁত চেপে কাঁপা গলায় বলল,
“উপস! উপস! দয়া করে আর বিয়াই বইলেন না বিয়ান। কলিজাটা একদম ফালি ফালি হয়ে যাচ্ছে!”
তিথি এবার মজা পেয়ে আরও সুর টেনে ডাকল, “ওও বিয়াই!”

“উপস কলিজাই লাগছেরে….আর তর সইছে না চলো নিকাহ করে ফেলি? ”
তিথি বাঁকা হেসে বলল, “বিয়ে করবেন? তা পকেটে কি টাকা আছে? বিয়ের খরচ সামলাবেন কীভাবে?”
শান একদম নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল, “আমার পকেটে নেই তো কী হয়েছে? বাপের পকেটে তো গিজগিজ করছে!”
তিথি এবার হোহো করে হেসে ফেলল।
“বড় চমৎকার কথা তো! তা বিয়ের পর নিজে খাবেন কী, আর বউকেই বা খাওয়াবেন কী?”
শানের উত্তর দিতে এক সেকেন্ডও দেরি হলো না। সে একদম উদার প্রেমিকের মতো বুক ফুলিয়ে বলল,
“তুমি কি খুব বেশি খাও?কোনো সমস্যা নেই।আমি আমার ভাগের টুকু তোমাকে দিয়ে দিব।”
তিথির বিস্ময়ের সীমা নেই। লোকটা এত সুন্দর করে বাজে কথা বলতে পারে কীভাবে?
“আচ্ছা, খাওয়ার ঝামেলা তো না হয় মিটলো। তা ফিউচার প্ল্যান কী শুনি?”
শান এবার আকাশের দিকে তাকিয়ে জীবনের দর্শন শোনাল, “ফিউচার প্ল্যান আর কী! আমি বাপের হোটেলে খাব, আর তুমি শ্বশুরের হোটেলে খাবে। ব্যস, লাইফ জিংগালালা!”

তিথি আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হাসতে হাসতে সে পুলের পাড় থেকে উঠে দাঁড়াল। পরনের জামা একটু ঝেড়ে নিয়ে প্যান্ডেলের দিকে হাঁটা ধরল সে। যাওয়ার আগে ঘাড় ঘুরিয়ে শানকে বলে গেল,
“শুনুন মিস্টার শান, টাকা থাকলে পকেটে, আমার মতো শত বিয়ান আসবে রকেটে! তাই ফালতু ঘোরাঘুরি ছেড়ে আগে পকেটে টাকা ভরুন।”
শান হো হো করে হেসে উঠে তিথির যাওয়ার পানে তাকিয়ে বেসুরে গলায় গান ধরল,
“আরে ধুর! তুমি রাজি জামাই সাজি
কেয়া করেগা কাজী?বিয়ের পর
দুজন মিলে ভাজবো ডিম ভাজি।
পটলা পটলি নিয়ে চলো গ্রাম ছেড়ে
পালাই! তোমায় নিয়ে থাকবো সুখে
যদি থাকি ঢালায়!!

রাত তখন তিনটের কাছাকাছি। রুশদীর চোখের ঘুম যেন কর্পূরের মতো উবে গেছে। কিছুক্ষণ আগে যখন তার ঘুম ভাঙল, সে অনুভব করল তার পেটের ভেতরটা যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র।রুশদীর একটা আজব রোগ আছে,পেটে খিদে নিয়ে সে মরে গেলেও ঘুমাতে পারে না। আজ সারাদিন বিয়ের হ্যাপা আর উত্তেজনায় পেটে দানাপানি পরেনি বললেই চলে। দুপুরের সেই রাজকীয় ‘সাগরানা’র টেবিলে ফারাজের কাজিনদের টিটকারি আর লজ্জার চোটে এক গ্লাস পানি ঠিকমতো গিলতে পারেনি। তখন মনে হয়েছিল লজ্জাটাই বড়, কিন্তু এখন মাঝরাতে পেট যখন বিদ্রোহ শুরু করেছে, তখন রুশদী হাড়েমাসলে টের পাচ্ছে,”খিদের জ্বালা যে কী জ্বালা, তা বোঝে না লজ্জাশীলা!”
পাশে ফারাজ অঘোরে ঘুমুচ্ছে।খাম্বা একদম খাম্বার মতো সোজা হয়ে ঘুমুচ্ছে। রুশদী অনেকক্ষণ এপাশ-ওপাশ করল। বালিশে মুখ গুঁজে পেটের ডাইনোসরগুলোকে শান্ত করার চেষ্টা করল, কিন্তু লাভ হলো না। খিদের চোটে পেটের ভেতর এখন হাতি-ঘোড়া না, আস্ত একটা ডাইনোসর ফ্যামিলি ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলছে! পেটের ভেতর থেকে গুড়গুড় শব্দটা রুশদীর কানের ডাইনামাইটের মত শোনাচ্ছে।রুশদী লজ্জা পেল,ভাবল তার পেটের শব্দে আবার ফারাজের খুব না ভেঙে যায়।

অবশেষে খিদের কাছে তরা লজ্জা মাথা নত করল। রুশদী উঠে বসল। বেডসাইড টেবিলের ল্যাম্পটা জ্বালাতেই ঘরের হলদেটে আলোয় সে দেখল ফারাজ পরম শান্তিতে একপাশে হাত ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে। রুশদী বড় এক সংকটে পড়ল। এখন কী করা যায়? তিথিকে ফোন করবে? কিন্তু এই অসময়ে মেয়েটা নির্ঘাত নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে, তাছাড়া সে এই মাঝরাতে খাবার জোগাড় করবেই বা কোত্থেকে?
নাহ! শেষমেশ ফারাজকেই ডাকতে হবে। কিন্তু ডাকবে কী বলে? নাম ধরে ডাকলে যদি আবার সেই ঝগড়া শুরু করে? নাকি “ওগো শুনছেন” বলে ডাকবে?ভাবতে ভাবতেই রুশদীর কান গরম হয়ে উঠল। ধুর! এখন কি রোমান্টিক হওয়ার সময়? পেটে যেখানে খিদের জ্বালায় পেট মোচড় দিয়ে উঠছে, সেখানে লজ্জা পাওয়া মানেই নিজের পেটের ওপর জুলুম করা। রুশদী নিজেকেই নিজে বলল,”এত লজ্জা পাওয়ার কি আছে? তারই তো হাসবেন্ড। ”
রুশদী কয়েকবার গলা পরিষ্কার করার চেষ্টা করল। হাত বাড়িয়ে ফারাজের গায়ের ব্ল্যাঙ্কেটটা একটু টান দিল। মনে মনে সে নিজেকে শক্ত করল।
রুশদী নিচু স্বরে কাঁপাকাঁপা গলায় ডাকল,

“এই যে… শুনছেন?”
ফারাজ নড়ল না। রুশদী আবার ডাকল,
“হ্যালে মিস্টার খাম্বা!ইয়ে মানে, ফারাজ সাহেব! উঠুন না প্লিজ… আমার পেটে ডাইনোসরগুলো বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে!”
“এই যে হ্যালো! একটু উঠুন তো।”
ফারাজের কোনো সাড়াশব্দ নেই। নিরুপায় হয়ে রুশদী তার গায়ে হাত দিয়ে মৃদু ধাক্কা দিল, “এই, উঠুন না একটু! ওহ হ্যালো, শুনছেন আপনি?”
ফারাজ কেবল একটু নড়েচড়ে উঠল। আলস্যে আড়মোড়া ভেঙে পাশ ফিরে শুয়ে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বিড়বিড় করল, “শের, ডিস্টার্ব করো না পাপা…”
“আমি শের না, রুশদী।”
ততক্ষণে ফারাজ ফের ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গিয়েছে। রুশদী এবার বেশ জোর দিয়েই ডাকল, “এই যে, শুনছেন আপনি?”
ধড়ফড়িয়ে ঘুম ভেঙে গেল ফারাজের। উঠে বসে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল। তারপর বিরক্তি নিয়ে শুধাল, “কী হয়েছে?”
“ক্ষুধা লেগেছে।”
“তো আমি কী করব?”
রুশদী এবার সত্যি সত্যি রেগে গেল। গলার স্বর চড়িয়ে বলল, “তো আমি কী করব মানে? খাবারের ব্যবস্থা করুন!”
“এত রাতে আমি খাবার কোথায় পাব?”
“রিসোর্টের রেস্টুরেন্ট থেকে আনুন অথবা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টে যারা আছে তাদের বলুন ব্যবস্থা করে দিতে।”
“পারব না আমি এত কিছু করতে,”
সোজাসাপ্টা নাকচ করে দিয়ে ফারাজ।

“আপনি না বললেন স্ত্রীর সকল হক আপনি পূরণ করবেন? এখন আমার খিদে পেয়েছে, খাবারের ব্যবস্থা করুন।”
ফারাজ এবার তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। রুশদীর দিকে তাকিয়ে রাগে ফোঁস করে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,
“হক আদায়ের আর সময় পেলে না?এই মাঝ রাতে তোমার হক আদায় করতে হবে?”
এই বলে ফারাজ যখন আবার পাশ ফিরে অঘোরে ঘুমানোর চেষ্টা করল, তখন রুশদীর ধৈর্যের বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে গেল। সে এক ঝটকায় ফারাজের গায়ের ব্ল্যাঙ্কেটটা টেনে ছুড়ে মারল। ফারাজ এবার আসলেও চটে গিয়ে বিছানায় ধপাস করে উঠে বসল। । সে রাগে ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে প্রায় গর্জে উঠে বলল,
“কী শুরু করেছ তুমি? একটা মানুষ শান্তিতে একটু ঘুমাতেও পারবে না? ডাকাতের মত ছো মেরে ব্ল্যাঙ্কেট কেড়ে নিলে কেন?
রুশদী কোমরে হাত দিয়ে তড়িৎ জবাব দিল,

“আমার পেটে এখন ডাইনোসরগুলো বিশ্বযুদ্ধ শুরু করেছে।একটু আগেই না নফল নামাজ পড়ে কবুল করলেন যে,আমার সব হক আদায় করবেন? পেটের খিদে মেটানো কি হকের মধ্যে পড়ে না মিস্টার শারফারাজ খান?”
ফারাজ মেঝের দিকে তাকিয়ে নিজের রাগ দমায়
তারপর হাই তুলতে তুলতে চরম বিরক্তির সাথে বলল, “হক মানে কি এই যে রাত তিনটের সময় রেসর্টের ম্যানেজারকে কলার ধরে জাগিয়ে তুলে আমি পিৎজা আর বার্গার অর্ডার করব? এই মাঝরাতে কোন শেওলা গাছের পেত্নী ছাড়া কেউ খাবার চায় না, তাহলে তোমার বসবাস কোন গাছে? একটা মরা মানুষও তো খাবার চাবে এত রাতে।”

“মরা মানুষ চায় না কারণ তাদের মেটাবলিজম বন্ধ হয়ে যায়! আমি তো জ্যান্ত মানুষ! আপনি কি চান বাসর রাতে আপনার বউ খিদের চোটে ফিট হয়ে পড়ে থাকুক? তখন যখন পুলিশ এসে আপনাকে ধরবে,সকালবেলা নিউজ হবে,বসর ঘরে মন্ত্রী শেহজাদ খান এর পুত্রবধূ খাবার না পেয়ে ইন্তেকাল করিয়াছে। এর দায়ভার কার? ”
ফারাজ এবার আর সহ্য করতে পারল না। সে বিছানা ছেড়ে রাগে তড়পাতে তড়পাতে উঠে দাঁড়াল। তার চোখেমুখের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সে রুশদীকে এখনই বাসর ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে ছুড়ে ফেলে দেবে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল

“অদ্ভুত এক মেয়ে তুমি!আল্লাহ আমার কপালে এমন মেয়ে মানুষ রেখেছিল? ”
“খাবার আনবেন কি না সেটা বলুন, না হলে আমি একাই বাইরে যাব!”
রুশদী জেদ ধরে বিছানা ছেড়ে দরজার দিকে এগোতে চাইল।ফারাজ বুঝল,এই মেয়েকে শান্ত করার একমাত্র উপায় হলো ওর মুখে কিছু খাবার গুঁজে দেওয়া। সে অগত্যা সে রাগে গজগজ করতে করতে দরজার দিকে পা বাড়াল। বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “বাসর ঘরে মহারানীর ক্ষুধা পেয়েছে, তার জন্য আমি খাবার খুঁজতে যাচ্ছি এটা শুনলে কাজিনরা হাসতে হাসতে আমার মান-সম্মান এর চাটনি বানিয়ে দিবে।”
রুশদী পেছন থেকে একটা বিজয়ের হাসি দিয়ে টিটকারি ছুড়ল, “আপনার মান-সম্মানে চাটনি বানানো হয়ে গেলে আমার জন্য নিয়ে আসবেন, আমার চাটনি খুব পছন্দ ”

ফারাজ আর পেছনে ফিরে তাকাল না। ঝড়ের বেগে রুম থেকে বের হয়ে গেল খাবার জোগাড় করতে।
ফারাজ রিসোর্ট ম্যানেজমেন্টের লোকজনকে ঘুম থেকে জাগিয়ে কোনোমতে এক ট্রে খাবার ম্যানেজ করল। সেখানে চিকেন রোস্ট, গরম পরোটা আর কিছু কাবাব ধোঁয়া ছাড়ছে। রুমে যাওয়ার সে একবার শানকে ফোন করে শের এর খবর নিল, শের তার দাদির সাথে ঘুমিয়ে পড়েছে।এরপর ফারাজ যখন সেই খাবারের ট্রে হাতে নিয়ে করিডোর দিয়ে নিজের রুমের দিকে এগোচ্ছিল, তখন তার কপালে চিন্তার ভাঁজ,যদি কেউ দেখে ফেলে!
তার আশঙ্কাই সত্যি হলো।লবির এক কোণে তখনো আড্ডা দিচ্ছিল সেই কুটনি ভাবি আর তার দলবল। ফারাজকে খাবারের ট্রে হাতে আসতে দেখেই ভাবির চোখ দুটো চকমক করে উঠল। তিনি সরু গলায় টিটকারি দিয়ে বলে উঠলেন, “কী গো ফারাজ! হাতে খাবারের ট্রে নিয়ে কই যাওয়া হচ্ছে? বাসর ঘরে খাবার নিয়ে যাও দেখি! বলি,বসর ঘরে খিদে লাগল। খিদেটা তোমার নাকি তোমার বউ এর লেগেছে?”
ভাবির এমন ধারালো কথায় আশেপাশের কাজিনরা হো হো করে হেসে উঠল। লজ্জায় ফারাজের কান গরম হয়ে উঠেছে, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিল। সে জানত এখন যদি সে বলে রুশদীর খিদে লেগেছে বলে তবে এই ভাবি কাল পুরো বিয়ে বাড়িতে ঢোল পিটিয়ে বেড়াবে। ফারাজ শুকনো একটা হাসি দিয়ে বলল, “না ভাবি, আসলে আমারই খুব খিদে পেয়েছে। সারা দিন তো দৌড়ঝাঁপের ওপর ছিলাম, ঠিকমতো খাওয়া হয়নি।”
ভাবি ছাড়ার পাত্রী নন। তিনি ঠোঁট উল্টে পাশের একজনকে শুনিয়ে বললেন, “শোনো কথা! নিজের জন্য নাকি! আমরা কি আর বুঝি না? বউয়ের আঁচল ধরা স্বামী হতে খুব একটা সময় লাগেনি দেখছি।এরাতেই বউয়ের গোলাম হয়ে গিয়েছে।”

ফারাজ এবার আর চুপ থাকল না। ভাবির হাসব্যান্ড অর্থাৎ তার বড় ভাই পাশেই বসে ঝিমুচ্ছিলেন। ফারাজ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বেশ গম্ভীর কিন্তু রসিক গলায় বলল, “ভাইয়া, আপনাকে একটা টিপস দিয়ে যাই,কাল থেকে ভাবির কথা একদম শুনবেন না। শুনলেই কিন্তু আমার মতো বউয়ের গোলাম খেতাব পেয়ে যাবেন! তখন কিন্তু এই আড্ডায় আপনার নামেও এমন রসালো গল্প হবে।”
ভাইয়া অপ্রস্তুত হয়ে আমতা আমতা করতে লাগলেন, আর ভাবির মুখটা মুহূর্তেই তিতা করলার মতো হয়ে গেল। আড্ডার বাকিরা এবার ফারাজের বদলে ভাবিকে নিয়েই হাসাহাসি শুরু করল। ফারাজ সেই সুযোগে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে গটগট করে নিজের রুমের দিকে হাঁটা দিল।
রুমে ঢুকে সে ট্রে-টা বিছানার উপরওপর রাখল। রুশদী তখনো বিছানায় খিদের চোটে কুঁকড়ে বসে ছিল। ফারাজ রাগে ফোঁস করে বলল, “এই নাও তোমার খাবার! তোমার এই মাঝরাতের খিদের জন্য আমাকে হাসির পাত্র হতে হল। ”

রুশদী খাবারের সুবাস পেয়ে, ফারাজ এর কথা তার কানে ঢুকলো না। সে চোখ বড় বড় করে খাবারের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল, “বাহ! আপনি তো দেখি কাজের লোক! খাম্বা হলেও আপনার স্পিড আছে।”
ফারাজ খাবারের ট্রে-টা বিছানায় রেখে একপাশে ধপ করে বসে পড়ল। তার চোখেমুখে তখন রাগ স্পষ্ট।রুশদী খিদের চোটে সব ভুলে চিকেন রোস্টের লেগ পিসটা টেনে নিয়ে কামড় বসাল।
ফারাজ আড়চোখে চেয়ে থেকে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “আস্তে খাও, হাড়টা চিবিয়ে আবার গলায় আটকে ফেলো না যেন!পরে আরেক জালা।তোমার এই খিদের জন্য আমার মান-সম্মান সব ওই কুটনি ভাবি ভর্তা বানিয়ল ফেলেছে।”
রুশদী এক মুখ খাবার নিয়ে অস্পষ্ট গলায় বলল, “মান-সম্মান তো আপনার এমনিও নেই মিস্টার খাম্বা! আপনি কি খাবেন? এক টুকরো দেব?”

ফারাজ একবার ভাবল না বলবে, কিন্তু পরক্ষণেই পেটের ভেতরটাও একটু মোচড় দিয়ে উঠল। সে অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাত বাড়িয়ে এক টুকরো কাবাব ছিঁড়ল। ঠিক সেই মুহূর্তেই,চট করে পুরো ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে গেল! কারেন্ট চলে গেছে বোধহয়। কিছুক্ষণ পার হলেও রিসোর্টের ব্যাকআপ জেনারেটর
চালু দিচ্ছে না।
“জেনারেটর অন করছে না কেন?” রুশদী অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে চেঁচিয়ে উঠল।
ফারাজ অন্ধকারের মাঝেই দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “চুপ করে মোবাইলটা বের করো।”
রুশদী অন্ধকারে কোনোমতে বিছানা হাতড়ে নিজের ফোনটা পেল না। সে মিনমিন করে বলল, “আমার ফোন চার্জে, খুঁজে পাচ্ছি না। আপনারটা জ্বালান না!”

ফারাজপকেট থেকে নিজের ফোন বের করে ফ্ল্যাশলাইটটা অন করল। ফোনের সেই তীব্র সাদা হঠাৎ চোখে পড়তেই রুশদী চোখ মুখ কুচকে ফেলল। ফারাজ এক হাতে ফোনটা উঁচু করে ধরে রাখল যাতে রুশদী খেতে পারে। তার এই পোজ দেখে রুশদী ফিক করে হেসে দিল।
“হাসছ কেন?” ফারাজ ভ্রু কুঁচকাল।
“আপনাকে একদম ওই স্ট্যাচু অফ লিবার্টির মতো লাগছে! এক হাতে মশাল ধরে আছেন।”
রুশদী হাসতে হাসতে খাবার চিবুচ্ছে।
ফারাজ এবার আসলেও নরম হয়ে এল। তার ফোনের আলোয় রুশদীর মায়াবী মুখটার দিকে তাকিয়ে সে নিচু স্বরে বলল, “জানো রুশদী তোমার মত আধ পাগল মেয়ে আমি দুটো দেখিন। ”

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৭

ফারাজ এর মুখ থেকে এত সুন্দর প্রশংসা শুনে রুশদী অল্প হাসল। সে এক টুকরো পরোটা ফারাজের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “আপনার ভাগ্য ভালো আমি আধ পাগল, ফুল পাগল না।নাহলে আপনার কপালে বিরাট দুঃখ ছিল!”
ফারাজ চুপ করে রইল।রুশদীর বাড়িয়ে দেওয়া পরোটা মুখে তুলে নিয়ে বলল,
“পুরোপুরি পাগল হলে তাও মানা যেত। এই হাফ মেন্টাল মানতে পারছি না। ”

অস্তরাগের রঙ পর্ব ৯