Home মন পিঞ্জিরা মন পিঞ্জিরা পর্ব ৮+৯

মন পিঞ্জিরা পর্ব ৮+৯

মন পিঞ্জিরা পর্ব ৮+৯
শ্যামলী রহমান

সূর্য ডুবছে এখনি। আঁধার নেমে আসার আগেই সকলের ছোটাছুটি কাজ শেষ করতে হবে। আজ কড়া রোদ হওয়ার কারণে মাটি অনেকটা শক্ত হয়েছে,কাঁদা কমেছে অনেক জায়গায়। অলিন্দ নীড় আজ রঙীন হয়েছে,সেঁজেছে নব বঁধু রুপে।
আজ শ্রাবণীর গায়ে হলুদ কাল বিয়ে।গ্রামের মানুষের ভীড় জমেছে দেওয়ান বাড়ির নাতনীর গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান দেখতে। পুরো বাড়ি ছোট রঙীন ঝিকিমিকি বাতি দিয়ে সাঁজানো হয়েছে। সন্ধ্যে নামতেই লাল নীল সবুজ বাতির আলোয় রঙিন হলো চারপাশ।বাচ্চারা আনন্দে দৌঁড়াচ্ছে, খেলছে। গ্রামে এর আগে এতো আয়োজনের বিয়ে আগে কখনো হয়নি। আর হবেই বা কি করে?দেওয়ান বাড়ির মানুষদের থেকে প্রভাবশালী আর কেউ নেই বললেই চলে। আর যারা আছে তাদের ছেলে মেয়ের বিয়ে হলেও এতো আয়োজনে হয়নি।

“মিথি তোদের হলো?
মিথি মায়ের ডাক ঘর থেকে দৌঁড়ে আসলো। মোহনিয়া বেগম মেয়ের দিকে তাকালো। শাড়ি পরেছে কিন্তু ভালো করে গোছাতে পারেনি। শার্লিন ও বেরুলো তার ও একই অবস্থা।
“তোরা এটা কি পরেছিস? শাড়ি পরেছিস নাকি পেঁচিয়েছিস?
শার্লিন মুখ কালো করে বলল,
“মামি তুমি পরিয়ে দাও না। আমরা তো পারছি না। বাড়িতে সবাই কাজে ব্যস্ত। সেঝো মামি সুন্দর শাড়ি পরাতে পারে কিন্তু সে শ্রাবণী আপা আর নবনী আপাকে পরিয়ে দিচ্ছে। তার পর দিবে উনার মেয়েকে। সিরিয়াল ধরে থাকলে দেখা যাবে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যাবে তবুও আমাদের শাড়ি পরা হবে না।
মোহনিয়া বেগম কাজের তাড়া দিয়ে বলল,

“ভাবি যেতে বলল তাড়াতাড়ি। শাহানা কোথাই?
“আম্মা তো ব্যস্ত আছে।কাজের সময় বলতে গেলে দিবে ধমক। তুমি পরিয়ে দাও না মামি।
মোহনিয়া বেগম দম ছাড়লো।উপায় না পেয়ে বলল,
“ঠিক আছে তাড়াতাড়ি চল। তোদের পরিয়ে দিয়ে যেতে হবে।
মোহনিয়া বেগম দুজন কে সুন্দর করে ঢালা শাড়ি পরিয়ে দিলো।গ্রামে যেভাবে পরে ঠিক সেভাবে। কুঁচি ছাড়া শাড়িতে দুজন কে সুন্দর লাগছে। মোহনিয়া বেগমের কাজ শেষ হতেই উঠে পড়লো। বলল,
“আমার কাজ শেষ এখন যা সাঁজ বাকি আছে গোরা একাই করে নে।বলেই চলে গেলো।
বাকি সাঁজগোঁজ শার্লিন ভালো পারে।মিথি শাড়ির পাড়ের সাথে মিলিয়ে লাল চুড়ি পরলো। আজ ভোরে জানালায় রেখে যাওয়া চুড়ি গুলো। ঢালা
হলুদ শাড়িতে লাল পাড়,মিলিয়ে লাল কাঁচের চুড়ি আর চোখে সামান্য কাজল পরলো। এবার বাকি লাল আলতা পরা। মিথি আলতা পরতে গেলেই লেপ্টে ফেলে। শার্লিন চোখে কাজল দিচ্ছিলো তার আলতা হাতে বসে থাকতে দেখে বুঝতে পারলো। কাজল দেওয়া শেষ করে বলল,

“আমি পরিয়ে দিচ্ছি দে।
আলতা একটা বাটিতে ঢেলে নিলো। ছোট তুলিতে করে লাল পাড় আঁকলো সুন্দর পায়ে। দুধে আলতা পায় যেন ফুঁটে উঠেছে আলতা। শার্লিন হেসে বলল,
“হলুদের সাথে লাল পাড় ওয়ালা শাড়ি পরেছে, সাথে পরেছে লাল কাঁচের চুড়ি, টানা চোখে কাজল এঁকেছ,পায়ে দিয়েছে আলতা,রূপবতী থেকে এবার লাগছে স্নিগ্ধ মায়াবী কন্যা।
মিথি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করলো। বলল,
“কি যে বলো আপা আমার থেকেও তুমি বেশি সুন্দর। তোমার চোখ আমার কাছে বেশি সুন্দর লাগে। শার্লিন নিজেও পায়ে আলতা দিতে লাগলো।মিথিকে বলল,

“আলতা শুকিয়ে গেলে রিতিলে ডাক দিস। ও আলতা পরতে চেয়েছিলো। ছোট মন না দিয়ে দিলে আবার মন খারাপ করবে। মিথি পায়ের দিকে তাকালো আলতা শুকিয়ে গেছে। বিছানা থেকে উঠে পড়লো। ঘর থেকে বেরিয়ে সামনের দরজার কাছে যেতেই দেখলো অনেক মানুষ এসেছে। কিছু ছেলেও আছে। এই এক সমস্যা যেখানে বেশি ছেলেরা থাকে সেখান দিয়ে হেঁটে যেতেও কেমন লাগে। দরজা সামান্য ভিড়িয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না। কেউ একজন দূর থেকে লাল আলতা পরা হাত দেখতে পেলো।বাহিরে আলো থাকার কারণে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে লাল আলতা হাতে সামান্য হলুদ শাড়ির অংশ ও দেখা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো। মিথি শুনতে পাচ্ছে কেউ এদিকে আসছে। কে আসছে দেখার জন্য দরজাটা আরেকটু ফাঁকা করে উঁকি দিতেই খুব সম্মুখে দুটো চোখ নজরে আসলো। পুরো মুখখানা দেখতে পেয়ে সটান হয়ে দাঁড়ালো। দরজার ওপাশে প্রহর ভাই দাঁড়িয়ে। এপাশে মিথি, দুজনের দূরত্ব সামান্য চোখে যেন চোখ পড়েছে আর সরতে চাইছে না।কাজল চোখে আঁটকে গেছে যে আঁকি,কষ্টসাধ্য ফেরানো সে পলকের দৃষ্টি।

মিথি এবার সরে দাঁড়ালো।দরজাটা পুরো খোলার আগেই প্রহর বাড়ির ভেতরে আসলো। তার দৃষ্টি এখনো মিথির দিকে। চোখ থেকে এবার পুরো মিথিকে দেখে নিলো। হলুদ শাড়িতে হলুদ পরী লাগছে। কাঁটা হাতে আঙ্গুলে আলতা পরেছে, লাল চুড়িও রয়েছে। সেদিকে চেয়ে থেকে বলে উঠলো,
“কাজল চোখে না দিয়ে নজর টিকা দিবি,
এমন রুপে কে ঘায়েল হয় বলা তো যায় না।
মিথি চোখ টিপিটিপি করে তাকালো। প্রহর ভাইয়ের থেকে এমন কথা সে প্রথম শুনলো। তাই বলল,
“আমাকে কি বেশি সুন্দর লাগছে?

“শুধু সুন্দর না অসম্ভব সুন্দর লাগছে। ঠিক যেন অপরুপা।
মিথি প্রশংসা শুনে আনন্দ হলো। তখনই শার্লিন ঘর থেকে বলে উঠলো মিথি রিতিকে ডেকে নিয়ে আসছিস নাকি?মিথি কানে সে ডাক পৌঁছালো তখন প্রহরের কি হলো কে জানে তড়িৎ গতিতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। মিথি অবাক চাহনিতে তাকিয়ে রইলো। প্রহর গিয়েও আবার ফিরে আসলো দরজা থেকে বলল,
“আমি রিতি কে ডাক দিচ্ছি। তৈরি হয়ে একসাথে আসবি।মিথি উত্তর দেওয়ার আগেই আবার প্রহর চলে গেলো। মিথি ভাবতে ভাবতে ঘরের দিকে গেলো। মিথিকে একা আসতে দেখে জিজ্ঞেস করলো,
“রিতি কোথাই?
“আসছে। ঠিক তখনই রিতি দৌঁড়ে আসলো।

পিছনে রুহেল ও আছে সাথে রিনিতা এসেছে। রিনিতা হলো সানোয়ার দেওয়ান এর মেয়ে শহর থেকে আজ ভোরেই এসেছে। সে মিথির সমবয়সী ভারি মিষ্টি দেখতে। মিথি কে দেখেই বলল,
“আপু আমাকেও আলতা দিয়ে দাও।
“আমি পারিনা রিনিতা। শার্লিন আপা দিয়ে দিবে বসো। শার্লিন দুজনকে আলতা পরিয়ে দিলো।
রুহেল তাদের দেখে বলল,
“মাইয়া মানুষের কত সাঁজ বাপ রে।
ছেলেদের একটা শার্ট আর প্যান্ট বা লুঙ্গি পরলেই সাঁজ শেষ। আর তোদের সাঁজের শেষ নেই।
“রাস্তা ঘাটে অনিমা কে দেখলে বলো কানে দুল,পায়ে নুপুর পরে সুন্দর লাগছে,সাঁজলে পরী লাগে আর এখানে এসে জ্ঞান দেও?যাও এখান থেকে।

মিথির কথায় রুহেলের মুখখানা চুপসে গেলো। বেচারা ফেঁসে গেলো সবার সামনে। শার্লিন এর মধ্যে প্রশ্ন তুললো,
“রুহেল ভাই আপনি এসব করে বেড়ান?মেয়েদের পিছনে ঘোরা মোটেও ভালো কাজ নয়।
“আমি মেয়েদের পিছনে ঘুরিনা শুধু একটা মেয়ের পিছনে ঘুরি তবুও পাত্তা দেয় না। দিবে কি করে?ঘরে যে শত্রু রয়েছে সারাক্ষণ আমার নামে বদনাম করে বদমাইস টা।
বলেই মিথির দিকে রেগে তাকালো।মিথি হি হি করে হেঁসে উঠলো। তখনই বাহির থেকে পিয়াসের কন্ঠ ভেসে আসলো।

“তোদের জন্য অনুষ্ঠান থেমে আছে তাড়াতাড়ি আসবি নাকি শেষ হলে যাবি। শার্লিন…
এতটুকু বলেই থেমে গেলো ঘরের দোর মাড়িয়ে চোখ পড়লো মধ্যমনি হয়ে বসে থাকা মেয়েটির উপর।
“মিথি কে তো বউ বউ লাগছে। চল তোদের সব গুলোকে একসাথে বিয়ে দিয়ে দেই।
পিয়াসের কথায় রিতি দাঁত বাহির করে বলল,
“মিথির আপার সাথে তোমার বিয়ে দিবো।
মিথি চোখ পাকালো।বাকি সবাই মজা ভেবে হেঁসে উড়িয়ে দিলো। পিয়াড শুধু বলল,
“তোকে আগে বিয়ে দিতে হবে। সারাদিন বিয়ে বিয়ে করিস পড়াশোনা নাকি ভালো লাগে না বলিস।
রিতি হেসে বলল,

“ঠিক আছে দাও। এখন চলো নয়তো অনুষ্ঠান শুরু হবে। সকলে একসাথে বেরোলো।
গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। বাড়ির বড়রা আগে হলুদ দিয়েছে এখন দিচ্ছে বাকিরা।
স্টেজে শ্রাবনীর পাশে বসে আছে নবনী,শার্লিন, রিনিতা আর মিথি। রিতি একটু আগে উঠে গেছে।
চারদিক নাচ গানে মুখরিত হয়ে আছে। আনন্দে মেতে উঠছে অলিন্দ নীড়। সবাই হলুদ মাখাতে আসলে বউয়ের সাথে থাকা সবাই কে মিষ্টি, ফল খাওয়াচ্ছে। খেতে খেতে মিথির আর খেতে ইচ্ছে করছে না। তখনই পিয়াস আসলো পরণে হলুদ পাঞ্জাবি।মেয়েরা সব একই রকমের শাড়ি আর ছেলেরা একই রকমের পাঞ্জাবি পরেছে।
পিয়াস এসে শ্রাবণী কে হলুদ মাখালো সাথে মজা করে বাকিদের মাখালো। মিথিকে মিষ্টি খাওয়াতে গেলে সে খেতে চায় না। পিয়াস জোর করাতে চামিচ মুখে নেয়। তখনই চোখ পড়ে হলুদ পাঞ্জাবি পরে দূরে দাঁড়িয়ে আছে প্রহর। দৃষ্টি তাদের দিকে। দৃষ্টি বড় করুণ লাগছে। তখনই মনে পড়লো শ্রাবণীর কথা। নিজ মনে ভাবা শ্রাবণীকে প্রহর পছন্দ করে এজন্য হয়তো কষ্ট পাচ্ছে। মিথির খারাপ লাগলো। সবাই কে আসছি বলে উঠে পড়লো। প্রহর ততক্ষণে সেখান থেকে অন্য পাশে চলে দিয়েছে।গায়ে হলুদের স্টেজ মুলত বাড়ির বাহিরে করা হয়েছে জায়গা কমতির কারণে।
মিথি বাহিরে এসে প্রহর কে কোথাও দেখতে পেলো না। আশে পাশে উঁকিঝুঁকি দিলো আরেকবার।

“এখানে উঁকি দিয়ে কাকে খুঁজছিস?
মিথি আচমকা কন্ঠে চমকে উঠে।পিয়াস ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। মিথি আমতা আমতা করে বলল,
“ওই রিতিকে খুঁজছিলাম। বাড়িতে গেলো এখনো এলো না।
পিয়াস শুনলো কিছু বলতে গিয়ে নজর পড়লো মিথির হাতের দিকে।
“চুড়ি কই পাইলি?কাল না ভেঙে গেলো?
মিথি অবাক হলো। সে তো ভেবেছিলো পিয়াস ভাই দিয়েছে। এখন তিনি এমন বলছেন কেন?
“কেন আপনি আনেননি?
পিয়াসের সরল উত্তর,
“না।ভেবেছিলাম আজ আনবো কিন্তু ব্যস্ততায় ভুলে গেছিলাম। তাহলে কে এনেছে?
“ওহ তাহলে হয়তো আব্বা এনেছে। ঠিক তখনই মানিক সাহেব সেখানে উপস্থিত হলেন। মেয়েকে টেনে নিয়ে গেলেন এক লোকের সামনে।
মিথি পিয়াস আনেনি শুনেই মিছেমিছি বললো তার আব্বা এনেছে।সে বাহির করবে কে রেখেছে? কেউবা এমন চিরকুট লিখেছে?

আজ শুক্রবার। সন্ধ্যে হতেই পাত্রপক্ষ এসে হাজির হয়েছে। পাশের গ্রাম হওয়াতে দেরিতে এসেছে।জামাই দেখার জন্য মানুষের ভীড় লেগেছে। গ্রামের রীতি নিতি অন্য রকম।জামাই কে গাড়ি থেকে নামিয়ে গেইটে গিয়ে ঘটলো বিপত্তি। জামাই নেমে আসলো গেইট ধরে দাঁড়িয়ে আছে নবনী,শার্লিন মিথি আর রিনিতা। পাত্র পক্ষের একজন ছেলে হয়তো জামাইয়ের কাজিন হবে।

গেইটর ফিতে কাঁটতে কাঁচি বাহির করতে হবে ফুলের স্তুপ থেকে। যে পাবে সে ফিতে কাঁটবে এমনই নিয়ম।ছেলের কাজিন খুঁজে পায়। পাত্র আর তার কাজিন ফিতে কেঁটে কাঁচি মিথির দিকে বাড়িয়ে দিলো।কাঁচি নেওয়ার জন্য মিথি হাত পাততেই হাত ছুৃয়ে দিলো সবার আড়ালে। সবাই তখন জামাই নিয়ে যেতে ব্যস্ত। মিথি প্রথমে ভুল করে মনে করলেও পরে বুঝতে পারলো যখন পানির গ্লাস চাইলো।মিথি গ্লাস এগিয়ে দিলে মিথির আঙ্গুলের উপর আঙ্গুল রেখে ধরে ইচ্ছে করে ধরেছে। এবং নজর ও তার ভালো না।মিথি হাত ঝটকায় সরিয়ে আনলো।প্রহর সবে কোথা থেকে যেন আসলো তখনই ছেলেটি সেখান থেকে চলে গেলো। হাত একটু পরই ছেড়ে দিয়েছিলো। প্রহর তিক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। মনে হলো তাকে দেখে ছেলেটি কেমন করে পালালো। মিথি ভয় পেয়েছিলো। দূরে প্রহর কে আসতে দেখে বুঝতে পারলো তাকে দেখে পালিয়েছে। প্রহর মিথির চোখ মুখ দেখে জিজ্ঞেস করলো,

“কোনো সমস্যা?ছেলেটা কিছু বলেছিলো নাকি?
মিথি তাকালো, স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে মাথা নাড়িয়ে না বললো। প্রহরের মন খারাপ, ব্যথিত হৃদয় এজন্য আর বললো না। তবে ছেলেটাকে সায়েস্তা করবে বলে ভাবলো।প্রহরের সাথে বাড়ির ভেতরে আসতে পা চালালো। মিথির কিছু প্রশ্ন করতে মন চাইলেও এতো মানুষের ভীড়ে আর হলো না। প্রহর যাওয়ার আগে শুধু বলল,
“সবাই কিন্তু ভালো না।আশে পাশে অনেক ছেলে আছে দূরে থাকবি। মিথি মাথা নাড়িয়ে চলে গেলো।
স্টেজে জামাই কে বসানো হয়েছে খাবার পরিবেশন করতে হবে সালিকাদের। মিথি সেখানে উপস্থিত হলো কিন্তু সেই ছেলেটা তারই দিকে তাকিয়ে আছে। সে তাকানো তাকে অসস্থি দিচ্ছে। মিথি রাগ করে সেখান থেকে চলে আসলো। তখনই তার বিনু ফুফু সামনে আসলো কোলে তার পাঁচ বছরের মেয়ে বিন্দিয়া।

“ফুফু এতো দেরি করে আসলে কেন?
সব আনন্দ তো শেষ হয়ে গেছে।
বিনু নিঃশ্বাস ছেড়ে উত্তর দিলো,
“আর বলিস না তোর ফুপার একজন চাচা কাল সন্ধ্যায় মারা যায় মাটি হলো আজ দুপুরে। এতো লোকজন সব রেখে তো আসা যায়না তাই দেরি হলো। শ্রাবনী কোন ঘরে?
মিথি ইশারায় দেখিয়ে দিয়ে একসাথে চললো। বাড়ির ভেতরে যেতেই সুচরিতা আর অরুণার সাথে দেখা। তারাও জানতে চাইলো এতো দেরিতে কেন আসলো। শাহানা তাকে জড়িয়ে ধরলো। কাজিন বলে কথা। ছোটবেলার কত স্মৃতি জমে আছে। সময়ের সাথে সব পরিবর্তন হয়েছে। সবাই স্বামী সংসার নিয়ে ব্যস্ত। বিনু দেখলো আরেক পাশে মেরিনা দাঁড়িয়ে আছে। বিনু ধীরে তার সামনে গেলো তখনই আবার সেলিম হাজির হলো। স্ত্রী কে কিছু বলার জন্য উদ্বত হতেই…

“কেমন আছেন ভাবি?
মেরিনা উত্তর দিলো না। সেলিম তাকালো বিনু কে দেখলে তার নিজেকে স্বার্থপর মনে হয়।
“আপনি কেমন আছেন সেলিম ভাই?
“ভালো আছি।তুই কেমন আছিস?
বিনু মেয়েকে জড়িয়ে ধরে হেঁসে বলল,
“স্বামী,সংসার,সন্তান সব নিয়ে ভালো আছি।
ব্যাস এতটুকু কথা সেলিমের হৃদয় কম্পিত করলো।বিনু কি তাকে খোঁটা দিতে বললো?
মেরিনা চুপচাপ সেখান থেকে চলে গেলো। পিছু নিলো সেলিম। বিনু আর মিথি গেলো শ্রাবনীর ঘরে।
বিয়ে কিছুক্ষণ আগেই শেষ হয়েছে। রাত নয়টা বাজতেই প্রায় সকলে চলে গেলো। সারাদিনের মতো এখন আর ভীড় নেই। বাড়ির মানুষ আর কিছু আত্মীয়স্বজন যারা আছে। মিথির মা ওই বাড়িতে আছে তাদের গত চার পাঁচ দিনের জন্য বাড়িতে রান্না বন্ধ।বিয়ে তার পর আঠারায় জামাই আসবে সে পর্যন্ত এই বাড়িতেই খাবে। এই নির্দেশ শমসের দেওয়ানের। মিথির গরম লাগছে ঘরে এসে ফ্যান ছাড়লো।দরজা বন্ধ করে শরীরে জড়ানো জর্জেট ঘাগরাটা পাল্টে একটা সুতি জামা পরলো।

হাতের চুড়িগুলো খুলে রাখতে চেয়েও রাখলো না।
চুড়িগুলো ভীষণ সুন্দর চিকচিক করছে। বাড়িতে শুধু মানিক সাহেব আছেন বাকি সবাই ওই বাড়িতে। মিথিও যাবে দুপুরে খেয়েছিলো তার পর আর খায়নি। মিথি সোঁজা শার্লিনের ঘরে গেলো দুজনে একসাথে খাবে বলে। গিয়ে দেখলো শার্লিন নেই শুধু শাহানা আছে।
“ফুফু শার্লিন আপা কোথায়?
“ছাঁদে গেলো মনে হয় তখন দেখলাম। দেখদিনি ছাঁদে আছে নাকি নবনীর ঘরে।
মিথি ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো। পথে দেখা হলো শমসের দেওয়ানের সঙ্গে তিনি বললেন,
“কই যাস?আয় খেতে আয় সকলে বসেছে।
মিথি তাড়া নিয়ে যেতে যেতে বলল,
“এখনু আসছি দাদু তুমি যাও।
ছাঁদে যাওয়ার আগে একটি ঘরের সামনে এসে থমকে গেলো। দরজা অর্ধ খোলা। সে ফাঁক উঁকি দিলো কিন্তু ঘরে কেউ নেই। মনে মনে ভাবলো হয়তো কষ্টে দুঃখে মন খারাপ করে কোথাও বসে আছে। ইসস মানুষটার জন্য খারাপ লাগছে। আগে জানতে পারলে শ্রাবণী আপার সাথে কথা বলতাম।
দুঃখ প্রকাশ করে ছাঁদে গেলো। পুরো অন্ধকার ছাঁদ কিছু দেখা যাচ্ছে না। মিথি ছাঁদের দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকলো, “শার্লিন আপা আছো?

কোনো সাড়া নেই। মিথির এবার ভয় লাগলো সে আবার প্রচন্ড ভূতে ভয় পায়। গ্রামের ভূতের উপদ্রব বেশি।মিথি আরেকবার ডাকলো,“ আপা আছো?
এবারো সাড়া না পেয়ে আসতে নিলো তখনই কারো পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলো। চমকে তাকালো মিথি। ছাঁদের শেষ প্রান্ত হতে কেউ হেঁটে আসছে। অন্ধকারে শুধু ছায়ামূর্তির মতো দেখা যাচ্ছে। মিথির গা শিউরে উঠলো,ভয়ে শরীর কাঁপছে। এই রাতে ছাঁদে একা ভূত যদি তার ঘাড় মটকে দেয় তবে?মিথি আবার ভয়ে ভয়ে উচ্চারণ করলো,
“ক ক কে?
“আমি।
রাশভারি কন্ঠ শুনে মিথি চমকালো। এটা তো প্রহর ভাইয়ের কন্ঠ। ততক্ষণে প্রহর তার সামনে এসে দাঁড়ালো। এবার আফছা মুখখানা দেখা যাচ্ছে।
মিথির ভয়ার্ত চেহারা দেখে বলল
“ভূত ভেবে এতো ভয় পাচ্ছিলি?জানিস ভূতের চেয়েও ভয়ংকর হলো কিছু মানুষ। তাদের মতো হিংস্র জানোয়ার কেউ না।

“আমার তো মানুষে ভয় করে না ভূতে ভয় করে।
“মানুষের ভয়ংকর রূপের সাথে পরিচয় হয়নি তাই ভয়ও পাসনি। আজকে সন্ধ্যায় কেমন ভয় লাগছিলো?
মিথি বিস্মিত চোখে তাকালো, জিজ্ঞেস করলো,
“ক কি কিসের ভয়?
“ওই ছেলেটার দৃষ্টি,অনুমতি বিহীন অসস্থিকর হাতের ছোঁয়া?
মিথি অনেকটাই চমকে উঠলো। এ কথা প্রহর ভাই কি করে জানলো?সে তো কেবল একজনকেই বলেছিলো। প্রহরের আবার প্রশ্ন এলো।
“সেখানে থাপ্পড় মারিসনি কেন?ইচ্ছে করছিলো হাত ভেঙে দিই।
মিথি মাথা নিচু করে উত্তর দিলো,
“ বলার মতো সুযোগ পাইনি। প্রথমে বুঝিনি আর পরে যখন বুঝলাম তখন আপনি আসাতে পালিয়ে গেলো।
প্রহর আর কিছু বললো না। ধীর পায়ে ছাঁদের কিনারার দিকে গেলো। মিথির কিছু প্রশ্ন ছিলো তা জানতে সেও পিছু নিলো। দাঁড়ালো প্রহরের ঠিক পাশে। প্রথমে জিজ্ঞেস করলো,

“এই অন্ধকারে কি করছিলেন?”
“অন্ধকার আমার ভীষণ প্রিয়, তার থেকেও বেশি প্রিয় আমার শুকতারা।
তাই-তো অন্ধকার আকাশে শুকতারা কে দেখছি আর উপলব্ধি করছি সে আমার হৃদয় আকাশে বাঁধন ছাড়া ঘুড়ি হয়ে উড়ে, কোনো এক আকাশ তাকে সুতোর বাঁধনে বাঁধার চেষ্টা করছে।
“আপনি কি শ্রাবণী আপা কে পছন্দ করতেন?
মিথির এমন প্রশ্নে প্রহর তাকালো। মুখের আদল স্বাভাবিক তবে কপালে গাঢ় ভাঁজ। একটুখানি ভেবে বলল,
“কেন এমন মনে হলো?
মিথি প্রহরের দিকে চেয়ে বলল,

“সেদিন বললেন যাকে চান তাকে পাওয়া হবে না। কাল গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে দেখলাম আপনি দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন বিষন্ন মন নিয়ে। তাই…
প্রহর ঝঙ্কার তুলে হেঁসে ফেললো,মিথির পানে চেয়ে বলল,
“এতটুকু দেখেই এই ধারণা? দূর থেকে তো অন্য কাউকেও দেখতে পারি।তাছাড়া আমার বিষন্ন মন প্রায় সময় থাকে,কেবল তার মুখ দেখলেই হাঁসি আসে।
“তাহলে কে আছে আপনার মনে?
মিথির প্রবল আগ্রহ জানার। সে আগ্রহ যদি সে বুঝতো তবে কি আর এতো মন খারাপ হতো?
প্রহর আকাশ পানে তাকিয়ে রইলো। খানিক বাদে মুখ খুললো,বলল,
“সে আমার কাছে দূর আকাশের শুকতারার মতো,দূর থেকে দেখলেই সুখ সুখ অনুভব হয়,না দেখলেই আমাবস্যায় ছেঁয়ে যায় হৃদয়।

“কিসের এতো বাঁধ্য বাধকতা প্রহর ভাই?আপনি চাইলে তাকে নিজের করতে পারেন না?সে কি আপনায় ভালোবাসে না?
প্রহর মিথির বোকা প্রশ্নে হাঁসলো।আনমনে উত্তর দিলো,
“সে তো জানে না ভালোবাসবে কি করে? বাঁধ্য বাধকতা আমার নিজের মধ্যে।কি আছে আমার?কেন হবে সে আমার?আর কেনই বা দিবে তাকে আমার নিঃস্ব ঘরে?তার জন্য সুখ অপেক্ষা করছে,পারিবারিক,আর্থিক,জীবনসঙ্গী ভিত্তিক।
“অর্থ দিয়ে কি সুখ হয় প্রহর ভাই?
যদি হতো,তবে আপনার মা কেন আত্নহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলো?
প্রহর এবার তিক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। মেয়েটা এতো কথা জানলো কিভাবে?গুছিয়ে বলছে কিভাবে?সে একটু অবাক হলো।চোখ বন্ধ করে কিছু স্মরণ করে উত্তরে বলল,
“অর্থ সুখ না দিলেও বিলাসিতা দেয়,আজকাল মানুষ সুখ বলতে অর্থই বুঝায়।”
“ক’জন বাবা ভালোবাসা দেখে মেয়েকে তুলে দেয়?”
মিথি ভাবলো।সত্যিই তো তাই, ক’জন বা দেয়?এই অর্থ আর বংশ মর্যাদা না থাকার কারণে তো প্রীতি আপা আজও এই বাড়িতে আসতে পারেনা।অন্ধকারে প্রহরের পানে চেয়ে আবার জানতে চাইলো,

“সে মেয়ে কি আমাদের পরিচিত?
“সেটা না হয় অজানা থাকুক।
কিছু অনুভূতি প্রকাশ করতে নেই,যদি এক পক্ষিক ভালোবাসা তাহলে তো আরো প্রকাশ করতে নেই।
এতটুকু বলে থামলো প্রহর। হঠাৎ একটা প্রশ্ন জাগতেই আবার জিজ্ঞেস করলো,
“তোর কাছে কে বেশি পছন্দের?আমি নাকি পিয়াস ভাই?সত্যি বলবি।
মিথি প্রথমে একটু ভাবলো। স্বাভাবিক ভাবে সত্যিটাই উত্তরে জানালো।
“আপনি দূরে থাকেন আপনার সাথে দূরত্বটাই বেশি।তেমনভাবে কখনো মেশা হয়নি। আর পিয়াস ভাইয়ের সাথে সম্পর্কটা অন্য রকম। কোনো আবদার করলে না করে না,আম্মা দৌঁড়ানি দিলে বাঁচায়। এমন অনেক কিছু আছে।সেজন্য পিয়াস ভাই একটু বেশি পছন্দের। তাই বলে ভাববেন না আপনি অপছন্দের।দুজনে পছন্দের।
প্রহর মনোযোগ দিয়ে শুনলো। কিছু অনুভূতি আড়াল হলো। নিরস মুখে হাসি মাড়িয়ে বলল,
“ঠিক আছে এখন যা। নিজ থেকে মনে হয় ডাকছে।শার্লিন ছাঁদে এসেছিলো কিন্তু তুই আসার একটু আগেই নেমে গেলো।

মিথির প্রবল আগ্রহ ব্যর্থিত হলো। বুঝতে পারলো প্রহর বলবে না। তাই পা বাড়ালো ছাঁদ থেকে আর মনে মনে ভাবলো,“ কার জন্য এতো অনুভূতি? সে কি আসলেই ভাগ্যবতী?কিন্তু তাকে তো পাবে না প্রহর ভাই। যদি জানতাম কে সে তবে এনে দেওয়ার চেষ্টা করতাম। তার বিষাদময় জীবনে আরো বিষাদ সহ্য হয় না। দুঃখের মধ্যে মানুষটার বাস,আবার সেই দুঃখ হবে তার হৃদয়ের আবাসস্থল।এটা ভাবতেও কষ্ট লাগে নিজেরই, সেখানে মানুষটা সব সহ্য করে।
প্রহর পিছন ফিরে তাকালো।ততক্ষণে মিথি সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেছে। তার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঠোঁটের কোনোর হাঁসি বর্জন করে বলল,

মন পিঞ্জিরা পর্ব ৭

“যার জন্য মন পিঞ্জিরা’য় ভালোবাসা পুষি।
সেই বলে ভালোবাসি কোন সে পাখি?
সে আমার মন পিঞ্জিরার একান্ত সুখপাখি,
একদিন সে পাখি উড়াল দিলে মিলবে কেবল পিঞ্জিরা খালি জল ভরা আঁখি।”

মন পিঞ্জিরা পর্ব ১০