মন পিঞ্জিরা পর্ব ১৯+২০
শ্যামলী রহমান
মধ্য রাত কেউ কোথাও জেগে নেই। চারদিক অন্ধকার।গ্রামের ভেতরে সরু রাস্তা অবধি কোনো আলো দেখা যাচ্ছে না।আকাশের পূর্ণ চাঁদের আলোয় কাছাকাছি দেখা যাচ্ছে। বসন্তের হাওয়া বইছে।সে হাওয়া কারো হৃদয়ে ঝড় তুলছে। তুফানের ন্যায় হৃদয়ের ভেতর লন্ডভন্ভ করে দিচ্ছে।প্রহর ছাঁদের সেই পুরোনো কাঁঠের চেয়ারটায় বসে আছে।ঘুমাতে চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হলো নিশ্চুপ দুজনের পাশ থেকে উঠে ছাঁদে এলো। তাদের কত কথা উপেক্ষা করেছে। সবই বুঝছে আবার বুঝছে না। তাদের কথা অনুযায়ী সেও ভাবছে।কিন্তু উত্তর অন্য আসছে।
“ভালোবাসলে প্রকাশ করতে হয় কিন্তু যদি সে অন্যের হওয়ার দলিলে রয়,তবে কেমন হবে প্রকাশিত অনুভূতি?
“পৃথিবী বলে ভালোবাসা প্রকাশ করো,
হৃদয় ও তাই বলে কিন্তু বিবেক বলে ভয়ংকর কিছু হতে পারে হলে প্রকাশিত অনুভূতির মূল্য।
প্রহর খানিকক্ষণ থেকে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।ভোর রাতে শুকতারার দেখা মিলে।যখন চারদিকে হাওয়া থেমে গেলো,চাঁদের পাশে শুকতারার দেখা মিললো। প্রহর চোখ খুলে তাকালো।চোখ দুটোতে শান্তির ঘুম প্রয়োজন কিন্তু তা আর হচ্ছে কই?সামনে যত এগোয় দুঃখরা আরো জেঁকে ধরছে।চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লো। চোখের চশমাটা খুলে হাতে নিলো। আকাশ পানে তাকিয়ে বলল,
“অবশেষে সময় আসলো,আমার শুকতারা অন্য আকাশ দেখা পেলো।
যে আকাশে নিজেকে উপলব্ধি করেছিলাম,
সেই আকাশ আজ অন্য কারো নামে হতে দেখলাম।
“সব মেনে নিয়েছিস,গুটিয়ে গেছিস আগেই,তবে ব্যর্থ প্রেমিকের ন্যায় নির্ঘুম রাত কাঁটিয়ে কি প্রমাণ করতে চাচ্ছিস?সালা তোরে দেখলে রাগ উঠছে। এতো ভালো মহান সেজে কি হবে?এক জীবনে প্রেম বারবার আসলেও ভালোবাসা একবারই আসে।একবার হারালে আর কোনোদিন পাবিনা। পাবি শুধু আফসোস আর তাকে না পাওয়ার যন্ত্রণা।তোর মতো মানুষদের ভালোবাসা উচিত নয়। নিজে বলবি না আমাদের ও বলতে দিবি না।
কথাগুলো বলেই পাভেল রেগেমেগে প্রহরের পাশে এসে দাঁড়ালো। যখন ওর অস্তিত্ব জানান পেয়েছিলো তখনই পিছনে তাকিয়েছিলো।প্রহর পাভেলের কাছে গেলো।ঘাড়ে হাত দিতেই পাভেল ঝটকায় সরিয়ে দিলো।প্রহর হেঁসে ওকে জড়িয়ে ধরলো।পাভেল ছড়াছড়ি করেও সরাতে পারলো না।তাকিয়ে রইলো বিষন্ন মুখের চমৎকার হাঁসির দিকে।আবেগের বয়স যার শেষ হয়েছে তার মধ্যে ভালোবাসার জন্ম নিশ্চয়ই মোহের জন্য নেয়নি।
“সামনে শুক্রবার মিথির বিয়ে আর তুই হাঁসছিস?
“কি করবো বল কাঁদবো?সারাজীবন তো কেঁদে আসলাম।এই চোখে জল ছাড়া কি মানায় বল?
পাভেল চোখ বন্ধ করে রাগ সংবরণ করছে।
একটু আগে ঘুম থেকে জাগনা পেয়ে যখন দেখলো প্রহর নেই। শুধু আসিফ পাশে শুয়ে আছে তখনই বুঝেছে মাঝরাতে সে কোথায় থাকতে পারে।
“কাল ত্রিশ মার্চ তোর জন্মদিন ভেবেছিলাম অন্য রকম কিছু প্ল্যান করবো কিন্তু তা আর হলো কই?
“হচ্ছে তো।সেরা উপহার হিসাবে বিয়ের দাওয়াত পাচ্ছি আর কি চাস?ত্রিশ মার্চ জন্মদিন তিন এপ্রিল শুকতারার বিয়ে। এসব জন্মদিন নিয়ে আমার মাথাব্যথা আগেও ছিলো না এখনে নেই।যেখানে আমার জন্ম অভিশপ্ত মনে হয়। আজকাল ভাবি না জন্মালেই বোধহয় ভালো হতো।নয়তো জীবনানন্দ দাসের মতো আবার আসিব ফিরে ধান সিঁড়ির তীরে হয়তো-বা শঙ্খচিল কিংবা শালিক বেশে।
যদি আসতাম তবুও ভালো হতো। তাহলে আর জীবনটা বেলাল খানের গানের মতো হতো না।
নির্ঘুম কেন কাটে রাত,কেন শুধু আর্তনাদ?
নির্ঘুম কেন কাটে রাত?কেন শুধু আর্তনাদ?
প্রতিদিন কেন তাকে ভেবে এই হৃদয়ক্ষরণ?
পাগল তোর জন্য রে পাগল এ মন,পাগল
পাগল,তোর জন্যে রে পাগল এ মন, পাগল..
এই গানটা আমার ভীষণ প্রিয়।হয়তো গানের লাইনের সঙ্গে মিলে আমার মূল্যহীন অনুভূতি তাই।
“সর কথা বলিস না। মনে ফুর্তি হলে গান গা,নাঁচ যা ইচ্ছে কর। এখন চল ঘুমাবি।
প্রহর তার কথা মেনে নিলো। নিজেকে স্বাভাবিক করা দরকার। চেয়ার ছেড়ে উঠলো। পাভেলের কাঁধে হাত রেখে বলল,
“কাল থেকে সব স্বাভাবিক থাকবে।ভাইয়ের বিয়ের দায়িত্ব দিয়েছে পালন করতে হবে না? কত দায়িত্ব বল।মেয়ের পক্ষের ও ভাই হই সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।চল ঘুমাই।
প্রহর পাভেল কে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছে। পাভেল তার মুখের দিকে চেয়ে আছে। এই হাঁসি কি আনন্দের নাকি দুঃখ ঢাকার মিথ্যে চেষ্টা?
মিথির ঘুম আসছে না কিছুতেই। কিছু কথা তাকে ঘুমোতে দিচ্ছে না। এপাশ ওপাশ করছে সেই থেকে। রিতিও এখন ওর সাথেই ঘুমোয়। তার দিকে চেয়ে দেখলো সে ঘুমিয়ে আছে। না ঘুম আসছে না। বিছানা থেকে উঠে সব সময় বন্ধ থাকা অন্য জানালাটি আজ খুলে দিলো।দমকা হাওয়া এসে চুল উড়িয়ে দিলো।শরীর মন শীতল হলো।জানালা দিয়ে দূরে টিমটিমে আলোর দেখা পেলো। অলিন্দ নীড়ে কেউ জেগে আছে।কার ঘর থেকে আলো আসছে?ওপাশে তিনটে ঘর আছে।হুট করে কিছু মনে পড়লো। পাশ থেকে লাইট টা জ্বালিয়ে কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি হাতে নিলো।এটাই তার রাত জাগার কারণ।দিনের আলোতে নিষিদ্ধ ন্যায় যে এই জিনিস।
আজ সোমবার।আকাশের কড়া রোদের তাপে টিকে থাকা মুসকিল।তাকালে যেন চোখ ঝলছে দুবে সূর্যের এমন রূপ।প্রহর নিজ ঘরে মাত্র গোসল সেরে বসেছে।
“প্রহর ভাই আসবো?
“হ্যাৃ আয়।প্রহরের অনুমতি পেতেই শার্লিন ঘরে প্রবেশ করলো।আশে পাশে তাকিয়ে বাকি দুজন কে দেখতে পোলো না।
“কাকে খুঁজছিস?হাতে কি?
শার্লিন পিছন থেকে হাতটা সামনে মেলে ধরে।প্রহর হাতের দিকে তাকালো।
“কি একা?
“খুলে দেখেন।শার্লিন হাতের প্যাকেটটা টেবিলের উপর রাখলো।প্রহর প্যাকেটটা খুললো। বেরিয়ে একটা ডাইরি আর একটা কলম।
“এসব কেন?
“আপনার জন্মদিনের গিফট। গ্রামে তো জন্মদিন পালন হয় না বা এসব পালন করা ঠিক না। কিন্তু গিফট তো দেওয়া মানা নাই।
ডাইরিতে আপনি কবিতা লিখবেন।
“কিসের কবিতা?প্রেমের নাকি বিষাদের?
“আপনি চাইলে সে প্রেমের কবিতা হিসাবে ধরা দিতেও পারতো,এখন তো কেবল বিষাদের কবিতা হয়ে রবে। আপনি এমন চুপ না থাকলেও প্রহর ভাই।সময় শেষ হয় ভাবতে পারেন।
“প্রহর? ডাকতে ডাকতে সোলাইমান দেওয়ান ঘরে আসলো।শার্লিন কে দেখে বলল,
“কোনো কথা বলছিলি?আসলে প্রহরের সাথে কিছু হিসাব নিয়ে দরকার ছিল। বিয়ের সময় তো নেই মাত্র মাঝে তিনটে দিন। এতোসব আয়োজন করতে হিমসিম খেতে হচ্ছে।
প্রহর ডাইরিটা আবার টেবিলে রেখে দিলো। সোলাইমান দেওয়ান কে বলল,
“চলুন।
তারা চলে গেলো ঘরে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো শার্লিন।প্রহর মিথিকে পছন্দ করে সে জেনেছিলো কিছু মাস আগে। সে বার প্রহর যখন আসলো। মিথিকে চুড়ি আর চিরকুট দেওয়ার পর মিথি ওকে দেখিয়েছিলো।হাতের লেখা চিনতে অসুবিধা হয়নি। প্রহরে কে ছাঁদে জিজ্ঞেস করলে প্রথমে শিকার করতে চায়নি পরে শিকার ঠিকই করেছে।কিন্তু এই বিয়ে শার্লিন ও মেনে নিতে পারছে না। ছোট থেকে প্রহর কে চুপচাপ গম্ভীর হয়ে থাকতে দেখেছে। মায়ের কাছ থেকে শুনেছে যেই বয়সে বাচ্চারা খেলতো সে বয়সে ঘরের কোনো একা থাকতো। খালামনির ছবি নিয়ে কাঁদতো।তখন তো আম্মা ছিলো বাবার বাড়ি।নানিমা আর মামির ভালোবাসা পেলেও মায়ের ভালোবাসার অভাব পূরণ হওয়া কি এতো সোঁজা?তার মধ্যে আবার অনেকের চোখে বিষ হয়ে উঠেছিলো।এখনো বিষ আছেই অথচ প্রহর ভাই কারো ক্ষতি দূর কখনো খারাপ ও চায়নি।
“এখানে কি করছে বদমাইস মেয়ে?
শার্লিন হঠাৎ কন্ঠে চমকে উঠলো। বুকপ থু থু দিয়ে পিছনে তাকালো। আসিফ আর পাভেল দাঁড়িয়ে ।পরনে লুঙ্গি তবে মজার ব্যাপার হলো আসিফ লুঙ্গি উল্টো করে পরেছে।শার্লিন ফিক করে হেঁসে ফেললো।ওরা দুজনে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। হাঁসছে কেন তা বুঝতে পারছে না।
পাভেল শার্লিনের দৃষ্টি অনুসরণ করে আসিফের দিকে তাকালো। ততক্ষণে শার্লিন ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো।
“তোর লুঙ্গি উল্টো কেন?এজন্য হাঁসছিলো মেয়েটা।
আসিফ চট করে নিচে তাকালো।দেখলো সত্যি লুঙ্গি উল্টো করে পরেছে।
“ভাগ্যিস লুঙ্গি খুলে যায়নি শুধু উল্টো হয়েছে।
নয়তো মান সম্মান গাছের আগায় উঠে যেতো।
পাভেলের ফোনে তখনই কল এলো। বিছানার উপর ফোনটা বাজছে।স্কিনে স্পষ্ট হিমি নামটা।পাভেল কলটা ধরলো না। অবহেলার বিছানায় পড়ে রইলো ফোনটা। সাথে অবহেলিত হলো ফোন কল দেওয়া মানুষটার মনটা।
“কল না ধরে কি হবে?প্রহর কে বলিস অথচ তুই নিজেও হিমি কে আজকাল ইগনোর করিস।
আসিফের জবাবে পাভেল বলল,
“অবহেলা কি মানুষ এমনি এমনি করে?
কেউ অবহেলা করে ইচ্ছে করে নতুন কারো দেখা পেলে,কেউ করে অনিচ্ছায়,অপরপ্রান্তে মানুষটার ভালোর কারণে।
হিমির বাবা কেমন জানিস তো।মানবে না আগে বলেছে।জানি হিমি এক কাপড়ে ঘর ছাড়তে রাজি হবে কিন্তু তার পর কি হবে? বড়লোক ঘরের মেয়ে আবেগে আসতে চাইবে,বলবে ডাল ভাতেও চলবে।
কিন্তু সেই ডাল ভাত গিলতে তার গলায় আটকাবে তখন নিজেকে অপরাধী মনে হবে।
আসিফ ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পড়লো।
“আমি ভালো করেছি কারো প্রেমে না পড়ে বেঁচে গেছি।তবে তুই আর প্রহর যে চাকরির পরীক্ষা দিলি, একটায় ইন্টারভিউ দিলি। যদি ভাগ্যে লেগে যেতো তবে একটা গতি হতো।
ফোনটা অনবরত বাজছে দেখে বোধ-হয় তার মায়া হলো। ছুড়ে দিলো পাভেলের দিকে।
“কথা বল।শোন কি বলে। এভাবে কিছু হয় না।
পাভেল ফোন রিসিভ করলো। কথা বলতে বলতে বাহিরে চলে গেলো।রুমে নেটওয়ার্ক সমস্যা করে মাঝে মাঝে। আসিফ দীর্ঘ শ্বাস ছাড়লো। মনে মনে ভাবলো,
“কেমন হবে তাদের শেষ পরিণতি?ভালোবাসায় এতো বিষাদ কেন?যতজনের ভালোবাসা দেখেছি বেশি অর্ধেকের হৃদয় ভাঙার গর্জন শুনেছি।কিন্তু প্রহরের টা মেনে নিতে কষ্ট বেশি লাগে।বেচারার কপালে সুখ বলে কোনো বস্তু যে অবশিষ্ট রইলো না।
শাহানা ঘরে বসে কার সাথে যেন রাগারাগি করে কথা।রাগে গিজগিজ করতে করতে ফোন রাখলো।
শার্লিন মা’কে রাগতে দেখে জানতে চাইলো,
“কি হয়েছে?
“তোর ছোট চাচা ফোন করেছিলো।
ভিটেমাটি তোর বাবার জায়গা সব তারা নিজেদের নামে নিয়েছে হয়নি এখন বাড়িটাও চাচ্ছে।
মানুষ এতোটা অমানুষ কিভাবে হয় সেটা তোর ছোএ চাচাকে না দেখলে বুঝতাম না। যে মানুষটা আজ নেই তার প্রতি একটু ভালোবাসা পর্যন্ত তাদের মনে নেই। অথচ এক সময় তোর বাবা সংসারের দায়িত্ব নিয়ে তাদের বড় করেছে। যা চেয়েছে দিয়েছে, নিজে না খেয়ে ভাইয়ের খাইয়েছে।সময়ের সাথে মানুষ সব ভুলে যায়।
হোক সে মায়ের পেটের ভাই।
শার্লিনের চোখে পানি চিকচিক করছে।শাহানার ভেতর কাঁদলেও শার্লিনের সামনে বুঝতে দিচ্ছে না।
বিকেলে প্রহর হাত ভর্তি বাজারে ব্যাগ নিয়ে ফিরলো। সঙ্গে সোলাইমান দেওয়ান ও সানোয়ার দেওয়ান ও রয়েছে। বিয়ের বাজার করতে গেছিলো। ভ্যান থেকে সব নামিয়ে আনছে।
তখনই নজর পড়লো মিথি আর রিতি বসে আছে।
পিয়াস ওদের কাছেই গেলো। পিয়াস কিছু একটা বলতেই মিথি আর রিতি দুজনে হেঁসে ফেললো।
সেই হাঁসি আনন্দের বদলে হৃদয়ে ব্যথা অনুভব করালো। কেউ মুগ্ধ হয়ে দেখলো।
পিছন থেকে রিদিতা এসে প্রহর কে বলল,
“প্রহর ভাই শুভ জন্মদিন। সরি ফর লেট উইস। আমি দুপুরে শুনলাম মিথি আর শার্লিন আপার থেকে।
“সমস্যা নেই। এসব নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ ছিলো না, নেই।
বাজারের আর দুটো ব্যাগ ভ্যান থেকে নামিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো। পাভেল আর আসিফ তখনই বাড়ি থেকে বেরোলো। সোলাইমানের ডাকে পিয়াস ছুটে আসলো।কাকে যেন ফোন করতে বলতে বাড়ির ভেতরে চলে গেলো।
“চল মিথির সাথে কথা বলা যাক।যদি কিছু হয়।
পাভেল মানা করলো।
“প্রহর নিষেধ করেছে।যদি বলি তাহলে ও আর আমাদের সাথে ফিরবে না।আসিফ দমে গেলো।
বাড়ানো পা পিছিয়ে নিলো।
“তবে সত্যি হারাতে চললো তার শুকতারা কে?
“ভাগ্য হারানো শেষ পর্যায়ে দাঁড় করিয়েছে দেখা যাক শেষটা কি হয়।
গাছের উঁচু ডালে বসে কুকিল ডাকছে। কুকিলের মধুর কন্ঠ আজ বিষাদ লাগছে।
প্রহর পুকুর পাড়ে বসে আছে। ভাবলো মিথি হয়তো আসবে।কিন্তু মিথি আজ আসলো না।অকারণে তার মন খারাপ হলো।অভ্যাস কি তাহলে পরিবর্তন হলো?হতেও পারে সময়ের সাথে কতকিছুই তো পরিবর্তন হয়। যেখানে মানুষটার থেকে পিছিয়ে এসেছি সেখানে তাকে দেখার প্রত্যাশা করছিই বা কেন?
শেষ সময়ে কি এসে মন অন্য কিছু চাইছে?
প্রহর পুকুর পাড় থেকে উঠে পড়লো। তাকালো মিথির ঘরের জানালার দিকে।বন্ধ জানালা আরো হতাশ করলো।উচাটন মন কেন যেন হঠাৎ দেখতে চাচ্ছে অথচ কিছু ঘন্টা আগেও তার মুখদর্শন হয়েছে।
উঠে সোজা গেলো মিথিদের বাড়ির দিকে। আজই প্রথম মনপর ডাকে সাঁড়া দিলো সে।এক নজর তাকে দেখা যেন বড্ড প্রয়োজন হয়ে উঠেছে।
প্রহর মিথিদের বাড়ির ভেতরে গেলো।মোহনিয়া বেগম মাটির চুলোয় রান্না বসিয়েছে। প্রহর কে দেখেই তিনি বসতে দিলেন।
“কিছু বলবি?
“না তেমন কিছু না। শার্লিন এসেছে নাকি মিথির কাছে?
“মিথি তো ওই বাড়ি গেলো।নবনী এসে ডেকে নিয়ে গেলো।সুচরিতা ভাবি নাকি জামার মাপ নিতে ডেকেছে।
এতটুকু কথায় প্রহর মনে মনে হাঁসলো।সে হাঁসি কি আনন্দের? না লোক দেখানো।
“ওহ।ঠিক আছে তবে আমি যাই।মোহনিয়া বেগম কে আর কিছু বলার সুযোগ দিলো না।
দরজা থেকে বেরোতেই মিথির দেখা পেলো। সে হন্তদন্ত পায়ে ছুটে আসছে। প্রহর কে দেখে থেমে গেলো। প্রহর ও দাঁড়ালো তার সামনে।
মিথি এক পলক তাকালো।চশমার আড়ালে লুকায়িত দৃষ্টিতে যে তৃষ্ণা তা কি আর সে দেখতে পেলো?চোখের তৃষ্ণা মিটলেও মনের তৃষ্ণা কি কখনো মিটবে?
“বিয়ে নিয়ে খুশি?
“আপনি খুশি?
প্রহর মিথির চটজলদি এমন উত্তর ঠিক বুঝলো না।
“আমার খুশি না হওয়ার কি আছে?
“তাহলে আমাকে জিজ্ঞেস করছেন?আমারো তো অখুশি হওয়ার কারণ নেই।
কি চমৎকার উত্তর।যেন সে তৈরি ছিলো উত্তর দেওয়ার জন্য।
প্রহর আশে পাশে তাকালো। কথা বাড়াবে না ভেবে পা চালালো।
“একটু দাঁড়ান তো।
প্রহর দাঁড়ালো।মিথি দৌঁড়ে ঘরে গেলো।
দুই মিনিটের মধ্যে আবার ফিরে আসলো।হাফাতে হাফাতে হাতের জিনিসটা বাড়িয়ে দিলো প্রহরের দিকে।
প্রহর বাড়ানো হাত খানা ফিরিয়ে না দিয়ে নিয়ে নিলো।গুছিয়ে রাখা জিনিসটা মেললো। সুন্দর একটা রুমাল।হাতে সুতোর কাজ করা রুমালের চারধারে।আর ঠিক মাঝখানে সাদা সুতোয় লেখা শুকতারা। কালো কাপড়ের উপর সাদা সুতোয় বেশ মানিয়েছে।যেন কালো আকাশে শুকতারা জ্বলছে।
“আপনার জন্য। আপনার শুকতারা কে তো পাবেন না তাই দিলাম।
“কি জন্য? উপহার নাকি স্মৃতি?
“আপনি যা ভেবে নিবেন।
“স্মৃতি হয়েই থাকুক না হয়।সব হারিয়ে গেলেও স্মৃতি কখনো হারিয়ে যায় না।থেকে যায় বিষাদ যন্ত্রণা কিংবা আনন্দ মূখর মুহূর্ত হিসাবে।
মন পিঞ্জিরা পর্ব ১৭+১৮
“আমি কোনটায় থাকবো প্রহর ভাই?
মিথির এমন প্রশ্নে প্রহর কিছুটা চমকালো।
“মানে?
মিথি হেঁসে বলল,
“চমকে উঠলেন কেন?আমি তো রুমালের কথা বললাম।
প্রহর এবার তিক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। তার চোখ অন্য কথা বলছে।মিথির দৃষ্টি এক ধ্যানে তারই দিকে।
এই দৃষ্টি শেষে সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে।
সে হন্তদন্ত পায়ে ছুটলো বাড়ির পথে। মিথি সেই পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। প্রহরের আর ফিরে তাকানো হলো না।
