Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৩
রাত্রি মনি

শহরে নিখোঁজ হচ্ছে একের পর এক সুন্দরী রমণী। খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে তাদের নৃশংস লাশ! প্রতিটি লাশের বীভৎসতা দেখে অভ্যস্ত পুলিশ অফিসারদেরও কপালে ঘাম জমছে। এটি কেবল খুন নয়, এটি যেন কোনো এক উন্মাদ শিল্পীর নারকীয় ক্যানভাস।

শহরের ড্রেনেজ সিস্টেম বা পরিত্যক্ত গুদামে পাওয়া যাচ্ছে লাশগুলো। খুনি যেন এক বিকৃত মানসিকতার সার্জেন। কারো মাথার নিখুঁত সোনালি চুলগুলো উপড়ে নেওয়া হয়েছে মাথার চামড়াসহ, কারো কাজল কালো চোখ দুটো এখন স্রেফ দুটো শূন্য গর্ত। সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্যটি হলো যাদের মুখ সেলাই করা—মোটা নাইলনের সুতো দিয়ে ঠোঁট দুটো এমনভাবে আটকে দেওয়া হয়েছে যেন তারা মৃত্যুর ওপার থেকেও চিৎকার করতে না পারে।
এই নিখোঁজ তালিকায় বাদ পড়েনি কেউই।না গৃহবধূ,
না ছাত্রী,না কর্মজীবী নারী।সাধারণ মেয়েদের মৃত্যু যখন ফাইলবন্দি হয়ে ধুলো জমছিল, তখনই ঘটে সেই বজ্রপাত। সদ্য মুকুট জয়ী মিস ওয়ার্ল্ড মুনা তার বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট থেকে উধাও। কোনো ধস্তাধস্তি নেই, কোনো সিসিটিভি ফুটেজ নেই। শুধু ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় লিপস্টিক দিয়ে লেখা একটি বাক্য:
“When beauty is a curse, salvation is in my hands.”
আর সাধারণ মেয়েদের নিখোঁজ হওয়ার খবর ধামাচাপা পড়ে গেলেও মিস ওয়াল্ড এর নিখোঁজ হওয়ার খবর যেন তড়িৎ বেগে ছড়িয়ে পড়ল চারিপাশে। সকলে কানাঘুষা করছে, হঠাৎ করে কোথায় উধাও হয়ে গেল?

বোর্ডরুমে মিটিং বসেছে।এসি-র ঠান্ডা বাতাসও উপস্থিত অফিসারদের কপালের ঘাম রুখতে পারছে না। টেবিলের মাঝখানে রাখা বিশাল প্রজেক্টরে মিস ওয়ার্ল্ড মুনার হাস্যোজ্জ্বল ছবি, যার পাশে রাখা হয়েছে উদ্ধার হওয়া ভিক্টিমদের বীভৎস লাশের স্টিল শট।
আইজির সামনে বসে আছে কার্লো তার সহকারী বেনজি ও আরও সমস্ত কপ্স। কার্লো একজন বাঙালি অফিসার তার নাম কায়সার লোভেদ। কিন্তু ইতালিয়ানদের কাছে উচ্চারণ করা বড়ই কষ্টকর। সেজন্যই তো কায়সার লোভেদ থেকে ছোট করে হয়ে গেছে কার্লো। বর্তমানে চলমান কেসের দায়িত্বে আছে সে।

“তুমি আর কতদূর এগোতে পেরেছ কার্লো?”
আইজি সাহেব চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে ক্লান্ত স্বরে প্রশ্ন করলেন,
‘নতুন কোনো ক্লু? বারবার কেসটা ঘুরেফিরে একই জায়গায় থমকে যাচ্ছে। কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কি এভাবে একটা পর একটা খুন করতে পারে? মিডিয়া অলরেডি আমাদের ধুয়ে দিচ্ছে। আমাদের জানতে হবে, এই ‘ছেলেটার’ মোটিভ আসলে কী?ছেলে এমন নিশংস ভাবে হত্যা করেছে মেয়েগুলোকে সে নিশ্চয়ই কোন সুস্থ মস্তিষ্কের নয়।”
“ছেলে নয় মেয়ে….. শি ইজ আ গার্ল!”
টেবিলের দিকে দৃষ্টিতাক করে ঠান্ডা কন্ঠে বলে উঠলো কার্লো।মুহূর্তের মধ্যে পুরো রুমে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। আইজি ভুরু কুঁচকে বিস্ময় নিয়ে তাকালেন।

“হাউ ডু ইউ নো কার্লো? তুমি এত নিশ্চিত হয়ে কীভাবে বলছ?”
কার্লো তার আইপ্যাড থেকে কয়েকটা মাইক্রোস্কোপিক ইমেজ প্রজেক্টরে শেয়ার করল।
“ফরেনসিক ল্যাবে টেস্ট করে জানা গেছে, মৃত মেয়েগুলোর শরীরে যে নখের আঁচড় পাওয়া গেছে, তার প্যাটার্ন আর ডেপথ বলছে—এগুলো একজন মেয়ের। নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য ভিক্টিম যখন ধস্তাধস্তি করছিল, তখনই এই চিহ্নগুলো তৈরি হয়েছে। আর তার চেয়েও বড় কথা…”

কার্লো আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। লেজার পয়েন্টার দিয়ে একটা লাশের কপালের দিকে নির্দেশ করল।
“যাকেই সে মারছে, তার কপালে চাকু দিয়ে খোদাই করে লিখছে—ব্লাডি কুইন! এটা ওর সিগনেচার। আর লাশের পাশে সে রেখে যাচ্ছে টকটকে লাল রঙের একটা ব্যবহৃত লিপস্টিক। আমাদের ল্যাব কনফার্ম করেছে, এ পর্যন্ত যতগুলো লিপস্টিক পাওয়া গেছে, সবগুলো একই ব্র্যান্ডের এবং একই শেডের। এমনকি ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে, লিপস্টিকগুলোতে পাওয়া সলাইভা (লালা) ডিএনএ একই মেয়ের। সি ইজ আ পিওর সাইকোপ্যাথ, স্যার!”
বেনজি আর বাকি অফিসাররা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস শুরু করল। আইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে ভাবুক গলায় বললেন,

“তাহলে ওকে ট্র্যাক করার কোনো রাস্তা বের করেছ? মেয়েটিকে খুঁজে পাবে কী করে?”
কার্লোর ঠোঁটে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল।
“ক্লু ওই লিপস্টিকটাই দিয়েছে স্যার। এই স্পেসিফিক শেডের কাস্টম লিপস্টিকটি একটি নামী ফ্রেঞ্চ কোম্পানি তৈরি করে। আমাদের কাছে ইনফরমেশন আছে, শহরের একটি নির্দিষ্ট আউটলেট থেকে প্রতি সপ্তাহে একজন নারী এই লিপস্টিকগুলো কিনে নিয়ে যায়। আমরা অলরেডি তার ক্রেডিট কার্ড ট্রানজেকশন আর সিসিটিভি ফুটেজ থেকে ইনফরমেশন কালেক্ট করে নিয়েছি।”
কার্লো তার জ্যাকেটটা টেনে ঠিক করে নিল। তার চোখে এখন শিকারি বাজের মতো তীক্ষ্ণতা।
“খুব শীঘ্রই ‘ব্লাডি কুইন’ আমাদের সামনে হাতকড়া পরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকবে। তার হাতে এবার আর কোনো শিকার পৌঁছাবে না। খারাপ কিছু ঘটার আগেই আমরা মুনাকে উদ্ধার করতে পারব, দ্যাটস মাই প্রমিস!”

—-“শহরে একের পর এক মেয়ে নিখোঁজ হচ্ছে, অথচ আপনারা কোনো হদিস দিতে পারছেন না। প্রশাসনের ব্যর্থতা ঢাকতেই কি আগের কেসগুলো ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে? এ বিষয়ে আপনার জবাব কী?”
বোর্ডরুমের মিটিং শেষে বেরোতেই কার্লোর চোখে আছড়ে পড়ল ডজনখানেক ক্যামেরার ফ্ল্যাশগান। একজন সাংবাদিক চিৎকার করে প্রশ্নটা ছুড়ে দিল। প্রেস মিডিয়ার প্রতিনিধিরা শিকারি নেকড়ের মতো ঘিরে ধরল তাকে। মাইক্রোফোনগুলো প্রায় তার মুখের সামনে উদ্যত তলোয়ারের মতো ঠেকেছে।
কার্লোর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কিন্তু সে থামল না। দ্রুত পায়ে সে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পাশ থেকে আরেকজন নারী সাংবাদিক তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠলেন, “এবার তো খোদ ‘মিস ওয়ার্ল্ড’ মুনা নিখোঁজ! সাধারণ মেয়েদের পর এবার সেলেব্রিটি—শহর কি তবে এখন খুনিদের স্বর্গরাজ্য? মুনাকে কি আপনারা জীবিত উদ্ধার করতে পারবেন, নাকি তার নিথর দেহটা পাওয়ার জন্য আমরা অপেক্ষা করব?”
কার্লো এবার থমকে দাঁড়াল। পকেট থেকে তার সিগনেচার কালো রোদ চশমাটা বের করে চোখে পরল। চারপাশের শোরগোল এক মুহূর্তের জন্য স্তিমিত হয়ে এল। সে স্থির দৃষ্টিতে ক্যামেরার লেন্সের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা ও দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল,

“দেখুন, পুলিশ তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কাজ করছে। আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকার লোক নই। আমি শুধু এটুকুই বলব—খুব শীঘ্রই অপরাধী আপনাদের সামনে থাকবে। তদন্তের স্বার্থে এর চেয়ে বেশি তথ্য এই মুহূর্তে দেওয়া সম্ভব নয়। এক্সকিউজ মি!”
কথাটা শেষ করেই সে ভিড় ঠেলে নিজের কালো এসইউভি (SUV) গাড়িটির দিকে এগিয়ে গেল। ইঞ্জিনের গর্জন তুলে গাড়িটি হেডকোয়ার্টারের গেট পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল মুহূর্তেই।
পেছনে তখনো লাইভ টেলিকাস্ট চলছে। রিপোর্টার ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে অনবরত বলে চলেছেন,
“সন্দেহ আর আতঙ্ক এখন তুঙ্গে! কায়সার লোভেদ ওরফে কার্লো কি সত্যিই পারবেন সেই রহস্যময়ী কিলারকে আইনের আওতায় আনতে? নাকি সেই সেই রহস্যময়ী কিলারের খুনের নেশায় এবার বলি হবেন মিস ওয়ার্ল্ড মুনা? খুনি কি আবারও আড়াল থেকে জয়ী হবে? সব খবরের আপডেট পেতে চোখ রাখুন নিউজ টুয়েন্টিফোর-এ।”

বিলাসবহুল, আল্ট্রা-লাক্সারিয়াস বাথরুমের নরম আলোয় হাফ নেকেড অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে এজে।সুঠাম দেহের প্রতিটি পেশি নিখুঁতভাবে খোদাই করা। যেন কোনো দক্ষ ভাস্করের নিপুণ হাতের ছোঁয়া।জিম করা টানটান শরীরে ‘এইট প্যাক’ অ্যাবস আর নিখুঁত ‘ভি-শেপ’ অবয়ব তাকে দিয়েছে এক অদম্য পুরুষালি আভিজাত্য। উজ্জ্বল ফর্সা ত্বকে সেই গঠন আরও বেশি তীব্র, আরও বেশি বিপজ্জনকভাবে আকর্ষণীয়। যেকোনো নারীর চোখ থমকে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।

ট্রান্সপারেন্ট কাঁচের দেয়ালঘেরা শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে সে। শরীরে লেগে আছে জমাটবদ্ধ দূষিত রক্ত। অদ্ভুত এক নেশা তার এই রক্তের প্রতি; যেন কোনো নিষিদ্ধ দ্রব্যের তীব্র টান। শাওয়ারের নব ঘুরিয়ে দিতেই ঝরঝর করে নেমে এল জলরাশি। দুহাত দেয়ালের ওপর রেখে, মাথা কিছুটা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করল সে। পানির ধারাগুলো তার পিঠের খাঁজ বেয়ে মসৃণভাবে গড়িয়ে পড়ছে।
কিছু একটা মনে পড়তেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল রহস্যময়ী ক্রুর হাসি।

বেশ সময় নিয়ে শাওয়ার শেষ করল। শরীরে ঢিলেঢালা বাথরোব জড়িয়ে ধীরে পায়ে ফিরে এলো রুমে।সিক্ত চুল থেকে এখনো টপটপ করে পানি ঝরছে, কিন্তু তা মুছবার কোনো তাড়া নেই তার। ঘাড়ে হাত রেখে মাথা কাত করে দু’দিকে ঘোরাতেই ক্যারক্যার শব্দে খুলে গেল শক্ত হয়ে থাকা পেশি। শরীরটা কেমন যেন ম্যাজম্যাজ করছে—এখনই একটা ‘ডোজ’ প্রয়োজন।ডোজ নিলে শরীরে এনার্জি ফিরে আসে, মাথা হালকা হয়, বুকের ভেতরের অশান্তি কিছুটা হলেও স্তব্ধ হয়। আর তারপরেই আসে শান্তির ঘুম।
ড্রয়ার খুলে অনায়াস ভঙ্গিতে হাতে তুলে নিল একটি সিরিঞ্জ।এক হাত শক্ত করে মুঠো করতেই হাতের প্রতিটি শিরা-উপশিরা সর্পিল ভঙ্গিতে ভেসে উঠল। অন্য হাত দিয়ে নিখুঁত নিশানায় রগের ভেতর পুশ করল সিরিঞ্জটি। হালকা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল তার পুরো শরীর। মুহূর্তেই অবশ হয়ে আসা শরীরের সমস্ত ছেড়ে দিয়ে ঠাস করে ঢলে পড়ল বিছানায়। চোখ বুজতেই তলিয়ে গেল গভীর, অন্ধকার কোনো এক নিদ্রায়।……………

“স্যার, আপনি যে সমস্ত ইনফরমেশন কালেক্ট করতে বলেছিলেন, তার সবকিছুই এই ফাইলে আছে। কিন্তু একটা কথা মাথায় আসছে না—এই তথ্যের সাথে আমাদের বর্তমান কেসের কী সম্পর্ক? আমার তো মনে হচ্ছে এগুলোর কোনো যোগসূত্র নেই।”
গাড়ির পেছনের সিটে হেলান দিয়ে ফাইলটি হাতে নিল কার্লো। জানালার বাইরে দ্রুতবেগে শহরটা পেছনে সরে যাচ্ছে। বেনজি ড্রাইভিং সিট থেকে আড়চোখে একবার কার্লোর দিকে তাকিয়ে বললো কথাগুলো।
কার্লো ফাইলের পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“জানি। এই তথ্যগুলো আমি আমার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে জানতে চেয়েছি।”
বেনজি একটু ইতস্তত করে বলল,

“স্যার, আমি যতদূর জানি, মাফিয়া সাম্রাজ্যের শেষ ডন ছিল সালভাতোরে রিসো। তাকে কেউ কোনোদিন জীবন্ত ধরতে পারেনি। তার মৃত্যুটা আজও সবার কাছে একটা অমীমাংসিত রহস্য। তার পতনের পর মাফিয়া রাজত্ব তো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল। এখন তো শুধু ছোটখাটো কিছু গ্যাংস্টার আর পাতি মাস্তানদের আনাগোনা।”
কার্লো ফাইল থেকে চোখ না সরিয়েই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি ফোটালো।
“উঁহু। তোমার প্রথম কথাগুলো সত্য হলেও পরবর্তী ধারণাটা একদম ভুল, বেনজি। মাফিয়া সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়নি, বরং বিগত কয়েক বছরে তারা আরও নতুন এবং ভয়ংকর রূপে আধিপত্য বিস্তার করেছে। তাদের একজন নতুন ‘গডফাদার’ এসেছে। সে পুরো আন্ডারওয়ার্ল্ডকে এক সুতোয় বেঁধে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে এসেছে।”
কার্লোর কণ্ঠস্বর আরও গম্ভীর হয়ে এল।

“শুধু তাই নয়, বিশ্বের প্রতিটি কোনায় এখন তার অদৃশ্য প্রভাব। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে পুলিশ, প্রশাসন, এমনকি বড় বড় গ্যাংস্টাররাও তার নাম শুনলে কেঁপে ওঠে। শোনা যায়, সরকারও নাকি তার ইশারা ছাড়া এক কদম নড়ে না। তাকে কেউ দেখেনি—একমাত্র তারা ছাড়া, যারা মৃত্যুর খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। তার হিংস্রতা পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট। সে আসলে হিংস্রতাকেও শেখায় যে হিংস্রতা ঠিক কতখানি বীভৎস হতে পারে!”
বেনজি বিস্ময় চেপে রাখতে না পেরে শুধাল,
“কে সে স্যার? হু ইস দিস গায়?”
কার্লো জানালার বাইরে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে ধীরলয়ে উচ্চারণ করল,
“আরাত্রিক জেইন চৌধুরী…”
নামটা শোনা মাত্রই বেনজি যেন এক মুহূর্তের জন্য ব্রেক কষতে গিয়েও সামলে নিল। সে অস্ফুট স্বরে বলল,

“বাঙালি?!!!…..”
“উঁহু। তার বাবা ছিল ফ্রান্সের আদি অধিবাসী।”
বেনজি আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ল।
“কিন্তু স্যার, নামটা তো খাঁটি বাঙালির মতো শোনাচ্ছে। ফ্রেঞ্চ বংশোদ্ভূত কারো এমন নাম কেন হবে?”
কার্লো ফাইলটা সশব্দে বন্ধ করে দিল। তার চোখে কোনো অনুসন্ধানের ছায়া।
“সেই রহস্যটা উন্মোচন করাই এখন আমার আসল উদ্দেশ্য। অনেকদিন ধরে এই লোকটার ছায়া ধাওয়াকরে আমি এই সামান্য ইনফরমেশনগুলো জোগাড় করেছি। আই ওয়ান্ট টু নো—কে এই আরাত্রিক জেইন চৌধুরী? কী তার আসল পরিচয়?……..”

এ’জে…! রিমের কক্ষের বদ্ধ দরজার সামনে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে সে।শরীরজুড়ে এক তীব্র অস্থিরতা।শত চেষ্টার পরও ঘুম আসেনি তার।একটা সময় ছিল যখন সিরিঞ্জের এক ডোজ রক্তে মিশলেই দুনিয়ার সব বিষাদ ভুলে সে তলিয়ে যেত শান্তির অতল গহ্বরে। কিন্তু এখন? এখন ড্রাগসও তার রক্তে আর সেই মায়াবী নেশা ধরাতে পারে না। কোনো কিছুতেই শান্তি নেই। শান্তি চাই তার শারীরিক, মানসিক দুই দিক দিয়েই। কিন্তু কোথায় পাবে সে এই শান্তি?হঠাৎ হৃদয়ের কোনো এক অন্ধকার কোণ থেকে ভেসে এলো একটি নাম—
“ফায়ারফ্লাই……..”

নিজের মনেই নামটা আওড়ালো সে। হ্যাঁ, একমাত্র এই মেয়েটিই পারবে তাকে শান্তি এনে দিতে। তার সমস্ত অশান্তির মূল উৎস যে এই মেয়ে! তাই শান্তি যদি কেউ দিতে পারে তবে তা একমাত্র এই মেয়ের দ্বারাই সম্ভব।মেয়েটা ঘুমের মাঝেও স্বপ্নে এসে আগুনের লেলিহান শিখার মতো জ্বালিয়ে মারে তাকে।
আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর কাজ করতেই শব্দহীনভাবে খুলে গেল আধুনিক সিস্টেমের ভারী দরজা। রুমে পা বাড়িয়ে বিছানায় চোখ পড়তেই আটকে গেল স্বাস । স্থির মূর্তি বনে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। গভীর দৃষ্টিতে পরখ করছে তার ফায়ারফ্লাইকে।

বিছানায় অঘোরে ঘুমাচ্ছে রিম।তার পরনে ঢিলেঢালা প্লাজু আর টি-শার্ট। ঘুমের ঘোরে শরীরটা কী ভীষণ অবিন্যস্ত! গায়ের কমফোর্টারটা অর্ধেক বিছানায়, বাকিটা অযত্নে লুটিয়ে আছে মেঝেতে। প্লাজু এক পায়ের হাঁটু অব্দি উঠে গিয়ে উন্মুক্ত করে দিয়েছে শ্বেতশুভ্র ফর্সা পা। টিশার্টেরও এলোমেলো অবস্থা একপাশে ঘাড় ছেড়ে নেমে এসেছে।অন্যপাশে উন্মুক্ত হয়ে আছে মেদহীন উদরের কিছুটা অংশ। ফর্সা উদরের উপর নিঃশ্বাসের ওঠানামা স্পষ্ট।
এজের দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল সেই অনাবৃত ত্বকের ভাঁজে। ঘরের এসি-র হিমশীতল বাতাসেও তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে।ফুসফুস ভরে বড় বড় শ্বাস টেনে নিজেকে ধাতস্থ করার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে সে। কিন্তু বুকের ভেতর ধুকপুকানি থামার নাম নেই; নিঃশ্বাসের গতি অস্বাভাবিক—দ্রুত, অগোছালো। কেমন যেন হাঁপাচ্ছে সে, ঠিক যেন দম ফুরিয়ে আসছে।প্রতিবার শ্বাস নেওয়ার সময় তার গলার পুরুষালি ‘অ্যাডামস অ্যাপেল’ ওঠানামা করছে—যেন কোনো এক তৃষ্ণা গিলে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা।কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল।চোখ বন্ধ করে
গভীর শ্বাস টেনে… আবার ছাড়ল।কিন্তু পারল না।

নিজেকে বেঁধে রাখা আজ তার সাধ্যের বাইরে।
ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বিছানার সামনে।হাঁটু ভেঙে বসে পড়লো ফ্লোরে। বিছানায় দুই হাতের কনুই রেখে, দুহাতে গাল চেপে ধরে ছোট্ট বাচ্চার মত তাকিয়ে রইল তার ফায়ারফ্লাইয়ের দিকে।
নিথর হয়ে ঘুমিয়ে আছে রিম। নিঃশ্বাস ধীর। এক পাশের গাল ডুবে আছে বালিশে, আরেক পাশের গালে এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে পড়েছে রেশমের মতো সিল্কি চুলগুলো। এজে খুব যত্নে আলতো করে চুল গুলো গুজে দিল কানে। বালিশে ঠেস দিয়ে থাকা গালের কারণে ঠোঁট দুটো গোল হয়ে ফাঁক হয়ে আছে সামান্য। সেখান থেকে অল্প অল্প লালা গড়িয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে বালিশের এক কোণ ।

মখমলে নরম গোলাপি অধরের নিচে চকচক করছে কুচকুচে কালো তিল। এজের চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল সেখানে। এবারে নেশা হচ্ছে তার! মারাত্বক সেই নেশা।যা সহজে কাটবার নয়। নিজেকে কন্ট্রোল করা বড্ডো কষ্টকর। কেমন নেশালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। যেন ছোট্ট বাচ্চার সামনে ললিপপ রাখা হয়েছে অথচ তাকে খেতে দেয়া হচ্ছে না! এতো ভারী অন্যায়! ভীষণ যন্ত্রণার এই ফিলিংস।
নাহ্ শান্তি পাবার বদলে আরো অশান্ত হচ্ছে তার মন। চোখ দুটো কেমন রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। ঘন ঘন শ্বাস ফেলছ। মনের গভীরে নিষিদ্ধ ইচ্ছেগুলো মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে।ইচ্ছে করছে—এক্ষুনি এই মেয়েকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরতে। তারপর একটার পর একটা চুমু—ভাবনাতেই শরীর ঝাঁকুনি খাচ্ছে।

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২

এত্তো কিউট কেন এই মেয়ে! ঠিক যেন একটা বার্বিডল। নিজের ঠোট শক্ত করে কামড়ে ধরে আবারো শুষ্ক ঢোক গিললো সে। বারবার নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। হঠাৎ শক্ত করে খামচে ধরল বিছানার চাদর।কাপড়টা মুঠোর ভেতর কুঁচকে গেল।উন্মুক্ত ফর্সা ঘাড়ের কালো চিকন ফিতা স্পষ্ট দৃশ্যমান মেয়েটার। বেহায়া চোখ দুটো বারবার আটকে যাচ্ছে সেখানে।হাত বাড়ালো টিশার্ট খানা তুলে দিতে। দিল কি দেয়নি! অকস্মাৎ তড়িৎ বেগে গালে পড়লো এক চড়।…………

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪