প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৬
রাত্রি মনি
পেন্টহাউসের অন্দরমহলটা যেন আধুনিক স্থাপত্যের এক নির্মম আভিজাত্য। মেঝেতে বিছানো কুচকুচে কালো মার্বেল পাথর এতটাই মসৃণ যে, নিঃশব্দে হাঁটলেও সেখানে এক অদ্ভুত প্রতিধ্বনি হয়—ঠিক যেন কেউ আড়াল থেকে নজর রাখছে।
রিম একা পায়চারি করছিল। তার চোখে রাজ্যের ক্লান্তি, আর মনে অস্থিরতার তীব্র দাবদাহ। এই বিলাসী স্বর্ণখাঁচাটার প্রতিটি দেওয়াল যেন তাকে পিষে মারতে চাইছে। কিন্তু আজ ঘুরতে ঘুরতে সে পেন্টহাউসের একদম শেষ প্রান্তের নির্জন করিডরে চলে আসে। করিডরের শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশালাকার কালো দরজা। অদ্ভুত এর গড়ন, অদ্ভুত এর নিঃস্তব্ধতা। অন্য সব দরজার চেয়ে এটি সম্পূর্ণ আলাদা—নিস্পন্দ, গম্ভীর এবং রহস্যময়। রিমের মনে হলো, এই দরজাটি কেবল বন্ধ নয়, এটি যেন কোনো এক নিষিদ্ধ সত্যকে আড়াল করে তাকে ডাকছে।
সে যখন দরজার হাতলের দিকে হাত বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই এক তরুণী স্টাফ—সম্ভবত বাড়ির কোনো কেয়ারটেকার—একপ্রকার দৌড়ে এসে রিমের সামনে দাঁড়াল। মেয়েটির চোখমুখ আতঙ্কে সাদা হয়ে গেছে।
“এই ঘরের সামনে যাবেন না ম্যাম! প্লিজ, ফিরে চলুন!” মেয়েটির কণ্ঠস্বরে স্পষ্ট কাঁপুনি।
রিম ভ্রু কুঁচকে তাকাল। মেয়েটি ভয়ে ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছে। সে ফিসফিস করে বলল,
“এই ঘরের ভেতর প্রবেশ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। স্যার কাউকে… কাউকেই এখানে ঢুকতে দেন না। মানুষ তো দূরের কথা ম্যাম, একটা মাছিকেও যদি এই ঘরের চৌকাঠে দেখেন, তবে সেটাকেও তিনি মেরে ফেলেন। কাউকে রেহাই দেন না তিনি!”
রিম স্তব্ধ হয়ে রইল। মেয়েটি এবার প্রায় হাতজোড় করে কাতর স্বরে মিনতি করল,
“প্লিজ ম্যাম, চলুন এখান থেকে। স্যার যদি জানতে পারেন আপনি এখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তবে সব তছনছ করে দেবেন। আমাদের কাউকেই জ্যান্ত রাখবেন না!”
রিম কোনো উত্তর দিল না। তার স্থির দৃষ্টি তখনো সেই কালো দরজার ওপর নিবদ্ধ। মেয়েটির আকুতিতে সে ধীর পায়ে সেখান থেকে সরে এল ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতর এক নতুন কৌতূহল বিষাক্ত সাপের মতো ফণা তুলে দাঁড়াল।রিম মাথা নিচু করে নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু তার অবচেতন মন কেবল একটি কথাই আওড়াচ্ছিল,
‘কী আছে ওই ঘরের ভেতর? কেন এটা এতটা ভয়ঙ্কর? এই রহস্যের শেষ আমায় দেখতেই হবে। ওই জানোয়ারটা কী লুকিয়ে রেখেছে ওখানে? আমাকে জানতেই হবে। একদিন… একদিন ঠিক আমি ওই দরজাটা খুলবই!’
জেমেল্লি হাসপাতাল, রোম
হাসপাতালের করিডোরটা অদ্ভুত রকমের শান্ত, ধবধবে সাদা আলোয় মোড়ানো। মাঝে মাঝে নার্সদের ট্রলির চাকার শব্দ কিংবা দ্রুত পায়ে হেঁটে যাওয়ার আওয়াজ সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে। কাঁচের দেয়ালের ওপাশে ছোট্ট ছেলেটি এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তার কচি হাতে ঝুলে আছে স্যালাইনের নল।
বাইরের সোফায় পাশাপাশি বসে আছে রিশাব আর ক্যাথি। হাতে ধরা কফির কাগজের কাপ থেকে পাতলা ধোঁয়া উড়ছে। তাদের মাঝখানে এক বিষণ্ণ নীরবতা, যা হাজারো শব্দের চেয়েও ভারী।ক্যাথি জানালার ওপাশে ভাইয়ের নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
“আজ সত্যি মনে হচ্ছিল, আমার পৃথিবীটা বোধহয় এখানেই থমকে যাবে।”
রিশাব কফির কাপে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। গলার স্বর নিঃস্ব ও শান্ত।
“কিছু অনুভূতি মানুষ চিৎকার করেও বলতে পারে না… শুধু বোঝা যায় চোখ দেখে।”
ক্যাথি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর মনের ভেতর জমে থাকা কৌতূহলটা আর চেপে রাখতে পারল না। খুব সন্তর্পণে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি যাকে ভালোবাসেন… সেই রিম… সে এখন কোথায়?”
রিশাব দৃষ্টি সরিয়ে জানালার বাইরে রোমের রাতের আকাশের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠে নেমে এল এক বিষাদময় গাম্ভীর্য।
“পৃথিবীর কোথাও না কোথাও আছে। তবে কোথায় জানি না। শুধু জানি, সে বড় কোনো বিপদে আছে… আর আমি শুধু তাকে খুঁজতেই এসেছি, জানি না তাকে খুঁজে পাওয়ার পর আবারও তাকে হারানোর শক্তি আমার আছে কি না।”
ক্যাথি মুগ্ধ হয়ে শুনছিল। সে ফিসফিস করে জানতে চাইল,
“বারান্দায় যে গানটা গাইছিলেন… ওটাও কি ওর জন্যই?”
রিশাব ধীরে মাথা নাড়ল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি।
“আমার প্রতিটি সুর, প্রতিটি শব্দ—সবই শুধু ওর জন্য।”
এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে রিশাব যেন নিজের হৃদয়ের বন্ধ কপাটগুলো ধীরে ধীরে খুলে দিতে চাইল। ক্যাথি এবার আরও একটু সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করল,
“আপনাদের প্রথম দেখাটা ঠিক কীভাবে হয়েছিল?”
রিশাব কফির কাপটার দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল। পরক্ষণেই তার চোখের মণি উজ্জ্বল হয়ে উঠল পুরনো স্মৃতির জাদুকরী স্পর্শে। সে যেন বর্তমানে থেকেও নেই।
“সেদিন একটা অনুষ্ঠানে গান গাইছিলাম। স্টেজের তীব্র আলোর ঝিলিকের মাঝে হঠাৎ আমার নজর আটকে গেল গ্যালারির এক কোণে। একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে—পরনে গাঢ় নীল রঙের শাড়ি, চোখে এক আকাশ অভিমান। মনে হলো, আমি কোনো বাস্তব মঞ্চে নেই, বরং কোনো অপার্থিব স্বপ্নের ভেতর দাঁড়িয়ে আছি। আর সেই মেয়েটা… সেই নীল শাড়ি পরা মেয়েটা যেন আমার হৃদয়ের ঠিক মাঝখান দিয়ে হেঁটে চলে গেল।”
তার চোখে মুহূর্তেই ভেসে ওঠে পুরনো সেই স্মৃতি। ঠিক এক বছর তিন মাস আগে।
ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ
দোতলার একটা ছোট, ছিমছাম ঘর। দেয়ালে হালকা রঙ, জানালার পাশে হালকা নীল পর্দাটা বাতাসের ঝাপটায় মাঝে মাঝে উড়ছে। কাঠের শেলফে বইগুলো সারিবদ্ধভাবে সাজানো আর মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কয়েকটা জামাকাপড়।
ব্যালকনির গ্রিল গলে এক ফালি তপ্ত রোদের রেখা এসে সরাসরি রিমের মুখের ওপর পড়েছে। অবাধ্য কিছু চুল গালের ওপর লেপ্টে আছে। পাশে খোলা খাতা আর ছড়ানো-ছিটানো বই—হয়তো পড়তে পড়তেই ঘুমের দেশে তলিয়ে গিয়েছিল সে। ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা ভেঙে ফোনের কর্কশ আওয়াজটা বেজে উঠল।রিমের কপালে বিরক্তির সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। সে না তাকিয়েই হাত বাড়িয়ে বালিশটা টেনে মাথার ওপর চেপে ধরল। কিন্তু ফোনটা যেন আজ নাছোড়বান্দা; বিরতিহীনভাবে বেজেই চলেছে। শেষমেশ হার মেনে হাত বাড়িয়ে ফোনটা কানে ঠেকালো সে।চোখ না খুলেই ঘুম জড়ানো গলায় বিড়বিড় করে বলল,
“হ্যালো…?”
ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক চিলতে চিৎকার,
“কিরে পাগলি! তুই এখনো ঘুমাচ্ছিস? আজ আমাদের নবীনবরণ, ভার্সিটির প্রথম দিন! আর তুই এখনো বিছানায়?”
রিম পাশ ফিরে শুয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে বলল,
“তুই জানিস না আমি কতটা অ্যান্টি-সোশ্যাল! এই ভিড়ভাট্টা, হইচই—এসব আমার ভালো লাগে না। আমি বরং এসব ফাংশনে না গেলেই ভালো!”
“চুপ! আজ কোনো অজুহাত চলবে না। তোকে আসতেই হবে। আমি আর কিছু শুনতে চাই না। নইলে তোর সাথে আড়ি।”
রিম বাচ্চামো গলায়,
“ব্যাঙ! শরীরটা ভালো লাগছে না রে….. না গেলে হবে না?”
“না, হবে না! আর শোন আজকে তোকে একটু সাজতে হবে! শাড়ি পড়ে আসবি! নীল শাড়ি, বুঝলি? এই রংটায় তোকে মারাত্মক লাগে।”
লাইনটা কেটে গেল। রিম কিছুক্ষণ তব্দা মেরে বসে রইল।জানালার বাইরের আকাশটাও আজ অদ্ভুত নীল। হয়তো দিনটা খুব একটা খারাপ যাবে না।অলসতা ঝেড়ে সে বিছানা ছাড়ল।রিম বরাবরই ভীষণ চুপচাপ স্বভাবের, নিজে থেকে কারো সঙ্গে মিশতে পারে না। কলেজ লাইফে তাই তেমন বন্ধুও হয়নি। আশপাশের লোকেরা যেন সবসময় একটা অদৃশ্য দূরত্ব রেখে চলে, যেন সে কোনো ভয়ের উৎস। তবে এসব নিয়ে কখনো মাথা ঘামায়নি সে।
একমাত্র অদ্রিজাই তার বন্ধু ।কলেজের শুরু থেকেই একসঙ্গে। অদ্রিজা থেকেই প্রথম আলাপ, তারপর ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব। রিম যতই চুপচাপ হোক, একবার কারো সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠলে সে তার ভেতরের হাসিখুশি, দুষ্টু মেয়েটিকে মেলে ধরতে পারে। যাদের কাছে সে আপন হয়, তাদের কাছে রিম একেবারে অন্যরকম চঞ্চল, প্রাণবন্ত। কিন্তু বাইরের চোখে সে একজন ভদ্র, শান্তশিষ্ট মেয়ে। স্কুলের শিক্ষকরা তাকে আদর্শ হিসেবে তুলে ধরতেন, অথচ তার কাছের মানুষরা জানত এই ‘ভালো মেয়েটা’ কতটা দুষ্টুমি পেটের মধ্যে লুকিয়ে রাখে। তাই এমন প্রশংসা শুনে তারা মুখ চেপে হাসত।
রিম চট করে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে, অদ্রিজার কথা ফেলতে পারে না সে। ওয়াশরুমে ঢুকে ঝর্ণার নিচে দাঁড়াতেই এক পশলা ঠান্ডা জল তার শরীরে শিহরণ জাগিয়ে তুলল। মুহূর্তেই কাটল রাতের অবশ ঘুম। কিছুক্ষণ পর শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হয়, গায়ে শুধু সফেদ একটা টাওয়াল।
রিম ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার ওপর পড়ে আছে সেই নীল শাড়িটা। রিম ভ্রু কুঁচকে তাকাল সেদিকে। আঠারো বছরের জীবনে কত উৎসব গেল, কত আয়োজন, কিন্তু শাড়ি তাকে দিয়ে কেউ পরাতে পারেনি।অদ্রিজার অনুরোধেই আজ পরতে হচ্ছে। ওরা ঠিক করেছে নবীন বরণে একসঙ্গে নীল শাড়ি পরে যাবে।
টাওয়াল ছেড়ে পেটিকোট আর ব্লাউজ পরে ফেলে। শাড়ি পড়তে না পারলেও মোবাইলে ইউটিউব ভিডিও চালিয়ে কোনোমতে কয়েকবার প্যাঁচ ভুল করে, কিছুটা যুদ্ধ করেই শেষমেশ নীল রঙটা শরীরে জড়াল সে। মুখে হালকা পাউডার, ঠোঁটে নুড কালারের লিপস্টিক।ব্যস, এটুকুই তার সীমানা। সাজগোজে তেমন আগ্রহ নেই তার।
কাজলদানিটা হাতে নিয়েও সে থমকে গেল। কাজল লেপটে গিয়ে চোখের নিচে কালি পড়লে বড় বিচ্ছিরি দেখাবে, এই ভেবে সেটা সরিয়ে রাখল। চুলগুলো নিয়ে কিছুক্ষণ দ্বিধায় ভুগে শেষমেশ পিঠের ওপর অবাধ্যভাবেই ছেড়ে দিল।
সবশেষে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব চোখে পড়তেই থমকে গেল সে। নীল রঙের গভীরতা তার গায়ের ফর্সা রঙের সাথে মিশে এক অপার্থিব স্নিগ্ধতা তৈরি করেছে।নিজের অগোচরেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে লাজুক হাসি ফুটে উঠল তার। অদ্রিজা ভুল বলেনি নীল রঙটা সত্যিই অদ্ভুত।
চারপাশে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, শুধু দেয়ালজুড়ে থাকা শত শত হাই-টেক মনিটরের নীলচে আলোয় ঘরটা এক অদ্ভুত রূপ নিয়েছে। প্রতিটি স্ক্রিনে চলছে আলাদা আলাদা লাইভ ফুটেজ।কোনোটাতে বেডরুম, কোনোটা ড্রয়িং রুম, কোনোটা বারান্দা, কোনোটা কিচেন সাথে আরো ওয়াশ রুম! এমন আরো অনেক আনাচে কানাচে। যেন পুরো একটা বাড়িই একটি ঘরের কব্জায় বন্দী।
সবচেয়ে বড় স্ক্রিনটার সামনে স্থির হয়ে বসে আছে এক যুবক। তার মুখটা ঢাকা সোনালি রঙের এক ড্রাগন মুখোশে। মুখোশের সূক্ষ্ম কারুকাজে আলোর প্রতিফলন পড়তেই সেটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠছে। ঠোঁটের কোণে তার এক চিলতে বাঁকা হাসি।এতক্ষণ ধরে রিমের প্রতিটা নড়াচড়া সে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে শাড়ি পরা পর্যন্ত—কিছুই তার নজর এড়ায়নি। রিমের শাড়ি পরা শেষ হতেই যুবকটি বড় করে শ্বাস টেনে নিলো।তার হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি এখন কানে তালা লাগিয়ে দেওয়ার মতো তীব্র। সে এক তীব্র ঘোরের মধ্যে ডুবে আছে। অবচেতন মনেই নিজের ডান হাতের তর্জনীটা ঘুরিয়ে কামড়ে ধরল কনিষ্ঠা আঙুলের নিচে। দাঁতের চাপ ক্রমশ বাড়ছে, কিন্তু তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।রক্তের নোনতা স্বাদ জিহ্বায় অনুভব হতেই হাতটা সরিয়ে একটা মৃদু ঝারি দিল, তারপর অবহেলায় রক্তটুকু মুছে ফেলল।
একটি মাউস ক্লিকেই রিমের ফুটেজ সম্বলিত স্ক্রিনটা অন্ধকার হয়ে গেল।যুবকটি তার বিশাল রাজকীয় আসনে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে মাথাটা পেছনে হেলিয়ে দিল। তার ভারী শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ নিস্তব্ধ ঘরটাতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ছাদের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সে হিসহিস করে বলে উঠল,
“My girl… খুব শীঘ্রই… তুমি আমার কাছে থাকবে। শুধু আমার।…….”
রিম সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই তার মা ডেকে ওঠে।
“কিরে না খেয়েই চলে যাবি?”
“অদ্রিজা অপেক্ষা করছে মা। দেরি হয়ে যাবে। আমি গেলাম।”
ভদ্রমহিলার কথা বাড়ালেন না। তিনি জানেন তার মেয়েকে জোর করে কোন লাভ হবে না। কথা তো শুনবেই না উল্টো তর্ক বেধে যাবে।
নারায়ণগঞ্জের সরু রাস্তায় চলতে থাকা একটা রিকশার উপর বসে আছে দুই বন্ধু।রিম পাশে তাকিয়ে আছে অন্যমনস্ক হয়ে, কিছু যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে চোখে।
অদ্রিজা রিমের বাহুতে মৃদু চিমটি কেটে বললো,
“কিরে! আজকেও তোর মুখটা এমন শ্রাবণের মেঘের মতো গোমড়া কেন? নবীনবরণ বলে কথা একটু তো হাস!”
রিমের চোখের মণি দুটো স্থির হয়ে রইল দূর কোনো বিন্দুতে। সে ধীরে ভারী হয়ে আসা চাপা স্বরে বলল,
“জানি না রে অদ্রি… কেন জানি মনে হচ্ছে কেউ আমাকে সবসময় দেখছে। একটা অদ্ভুত অস্বস্তি হয়… যেন একজোড়া চোখ আমার ওপরেই আটকে আছে সবসময়। খুব অদ্ভুত অনুভূতি।”
রিমের কণ্ঠে মিশে থাকা কাঁপুনি অদ্রিজার কান এড়ালো না।তবে সে ব্যাপারটাকে হালকা করার জন্য এক গাল হেসে বলল,
“আরে গাধি, এগুলো তোর মনের ভুল। নতুন নতুন ভার্সিটি লাইফ, একটু টেনশন হচ্ছে সেটাই। কিছু না, রিল্যাক্স কর। আজকে তোর জন্য একটা বড় সারপ্রাইজ আছে। ভার্সিটি গেলেই দেখতে পাবি।”
রিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বাইরের দিকে তাকাল। তার অবচেতন মন বলছে কোথাও কিছু একটা ভুল হচ্ছে, কিন্তু যুক্তি দিয়ে সে তা ধরতে পারছে না।
তাদের রিকশাটা মোড় পার হতেই দূরে,একটা কালো গ্লাসের ভ্যান গাড়ি দেখা গেল রাস্তার ধারে। ভেতরে বসে থাকা একজন, কালো গ্লাভস পরা আঙুলে ঘুরিয়ে দেখছে হাই-রেজোলিউশন ক্যামেরার লেন্স।তার চোখের মণি স্থির, ক্যামেরার ভিউফাইন্ডারে তখনও রিমের প্রতিচ্ছবি ভাসছে।অথচ লোকটা সরাসরি তার দিকে একবারও তাকায়নি।হঠাৎ তার কানে লাগানো ব্লুটুথ হেডসেটে এক গম্ভীর কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে উঠল,
“Your work is done now. You can go.”
“okay boss.”
লোকটা ক্যামেরা রেখে, গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে যেতেই। ফোনে থাকা সেই ব্যক্তির ঠোঁটে ফুটে ওঠে রহস্যময়ী হাসি।সে নিজের ফোনের স্ক্রিনে রিমের ছবিটা জুম করে দেখল। ফিসফিস করে বলে,
“Don’t worry… Barbie doll . I’m watching you, always.”
ভার্সিটির গেটে রিকশাটা থামতেই রিম এক বুক নিশ্বাস নিল। অদ্রিজার সাথে ভাড়া মিটিয়ে নিচে নামল, চারপাশের দৃশ্য দেখে তার চোখ ধাঁধিয়ে গেল।
নবীনবরণ উপলক্ষে ক্যাম্পাসটি আজ যেন কোনো এক মায়াবী উৎসবের নগরী। তোরণ থেকে শুরু করে পুরো আঙিনা জুড়ে রঙিন ফেস্টুন, বেলুন আর নকশা করা কাগজের ঝালর। দুপুরের রোদে সেই সাজসজ্জা এক অদ্ভুত দ্যুতি ছড়াচ্ছে। করিডোর দিয়ে সিনিয়ররা হাসিমুখে হেঁটে যাচ্ছে, নবাগতদের হাতে তুলে দিচ্ছে শুভেচ্ছা কার্ড আর চকলেট। সেন্টার স্টেজে বিশাল করে লেখা— “স্বাগতম নবীনদের”। সাউন্ড সিস্টেমের মৃদু গুঞ্জন আর শিক্ষার্থীদের কলকাকলিতে পুরো বাতাস উৎসবের গন্ধে মউ মউ করছে।
এত কোলাহলের মাঝেও রিম নিজেকে গুটিয়ে রাখল। নীল শাড়ির আঁচলটা হাতে জড়িয়ে সে এক কোণে গিয়ে দাঁড়াল। ভিড় আর হইচই বরাবরই তার কাছে এক অদৃশ্য দেয়ালের মতো। ঠিক তখনই স্টেজ থেকে স্পিকারে ভেসে এলো এক গমগমে আওয়াজ—
“One… Two… Three… Let’s set the fire!”
কণ্ঠস্বরটা চেনা। রিমের হৃৎপিণ্ড যেন একটা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এ তো সাধারণ কোনো কণ্ঠ নয়, এ যে তার ধ্যানে-জ্ঞানে থাকা আইডল, জনপ্রিয় রকস্টার রিশাব জাওয়াদ—সবার প্রিয় ‘RJ’!
রিম বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে স্টেজের দিকে তাকাল। অদ্রিজা তখন কনুই দিয়ে তাকে একটা আলতো ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কিরে! বলেছিলাম না সারপ্রাইজ আছে? পছন্দ হয়েছে তো? আমাদের ভার্সিটির আজকের চিফ গেস্ট আর কেউ নয়, স্বয়ং রকস্টার আরজে!”
রিম যেন কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। কানে হেডফোন গুঁজে রোজ রাতে যার গান না শুনলে তার ঘুম আসে না, যাকে আদর্শ মেনে সে নিজেও বড় সিঙ্গার হওয়ার স্বপ্ন দেখে, সেই মানুষটা আজ তার চোখের সামনে! চারপাশের হাজারো মানুষ তখন চিৎকার করে ডাকছে— “RJ! RJ!”
রিশাব স্টেজে গিটার হাতে দাঁড়িয়ে, চুলে তারুণ্যের উদ্দামতা আর চোখে এক অদ্ভুত তেজ। কিন্তু গিটারে হাত ছোঁয়ানোর আগেই হঠাৎ তার দৃষ্টি ভিড়ের মধ্যে স্থির হয়ে গেল। দূর কোণে দাঁড়িয়ে থাকা এক শরতের আকাশের মতো নীল শাড়ি পরা মেয়েটির ওপর গিয়ে তার চোখ আটকে গেল।
রিশাবের সামনে যেন মুহূর্তের জন্য পুরো ক্যাম্পাস নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মনে হলো চারপাশের হাজার হাজার মানুষের ভিড়টা ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে, কেবল ওই মেয়েটিই ধ্রুবতারার মতো স্পষ্ট হয়ে ধরা দিচ্ছে তার চোখে। তার হৃদস্পন্দন থমকে গেল, গানের সুর যেন পথ হারিয়ে ফেলল। ঘোরের বশবর্তী হয়ে সে মাইকের সামনে বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“Blue fairy…!”
অস্ফুট স্বরে বলা সেই শব্দ দুটো মাইকের মাধ্যমে প্রতিধ্বনিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ল সবার কানে। উপস্থিত ছাত্রছাত্রীরা একে অপরের দিকে তাকাল। মুহূর্তে এক বিশাল উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। কাকে ব্লুফেইরি বললো রকস্টার রিশাব? সবাই একসাথে সমস্বরে চিৎকার করে উঠল,
“ব্লু ফেইরি! ব্লু ফেইরি! ব্লু ফেইরি!”
চিৎকারে সম্বিৎ ফিরে পেল রিশাব। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলেও রিমের দিক থেকে চোখ সরাতে পারল না সে। এক অদ্ভুত ঘোর আর মুগ্ধতা নিয়ে সে আবার গিটারের তারে আঙুল ছোঁয়াল। রিমের চোখের দিকে তাকিয়েই সরাসরি গানের কলি ধরল,
“তু বে-মিসাল হ্যায়… তেরি কেয়া মিসাল দু…
আসমা সে আয়ি তু, এহি কেহকে টাল দু…”🎶
গানের শেষ রেশটুকু যখন চারপাশের তুমুল করতালিতে মিশে যাচ্ছিল, রিশাবের দৃষ্টি তখনও রিমের ওপর স্থির। কিন্তু সেই মুগ্ধতা রিমের জন্য এক অসহ্য অস্বস্তি বয়ে আনল। হাজার হাজার মানুষের চোখের সামনে নিজেকে বড় বেশি অরক্ষিত মনে হতে লাগল তার। অনভ্যস্ত হাতে শাড়ি সামলাতে গিয়ে সে বারবার খেই হারিয়ে ফেলছে। অসাবধানে আঁচলটা একটু সরে যেতেই তার মেদহীন ফর্সা কোমরের কিঞ্চিৎ অংশ উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই সে অনুভব করল এক জোড়া লোলুপ দৃষ্টি তার ওপর বিঁধে আছে। ভার্সিটির এক সিনিয়র ভাই একটু দূরে দাঁড়িয়ে কুৎসিত অপলক চোখে তাকে মেপে নিচ্ছে। রিমের সমস্ত শরীর ঘেন্নায় রি রি করে উঠল। সে দ্রুত অদ্রিজার হাত টেনে ফিসফিস করে বলল,
“অদ্রি, ওয়াশরুমটা কোথায় রে? খুব দরকার।”
কিন্তু অদ্রিজা তখন উত্তেজনার তুঙ্গে। সে বাকি বন্ধুদের সাথে রিশাবের পারফরম্যান্স নিয়ে আড্ডায় এতই মশগুল যে রিমের কথা যেন তার কানেই পৌঁছাল না। নিরুপায় হয়ে রিম একাই ভিড় ঠেলে করিডোরের দিকে পা বাড়াল। অচেনা ভার্সিটির গোলকধাঁধায় সে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে এগোতে লাগল।হঠাৎ করেই পথ আটকে সামনে এসে দাঁড়াল সেই সিনিয়র ছেলেটি। রিম পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেই সে আবার তার পথ আগলে দাঁড়াল। মুখে এক চিলতে বিচ্ছিরি হাসি নিয়ে বলল,
“হেই সুইটি… হোয়াটসঅ্যাপ? নামটা কী তোমার?”
রিমের বিরক্তি এবার চরমে। অপরিচিত একজনের এমন ধৃষ্টতায় তার মাথা গরম হয়ে উঠল। সে কোনো উত্তর না দিয়ে সামনে এগোতে গেলেই ছেলেটা হঠাৎ খপ করে রিমের কবজি চেপে ধরল। রিমের কপাল কুঁচকে গেল, চোখ দুটো রাগে জ্বলজ্বল করে উঠল। সে হাত ছাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে চিৎকার করে বলল, “আশ্চর্য! হাত ধরছেন কেন? ছাড়ুন বলছি! নাহলে কিন্তু আমি লোক জড়ো করব!”
“আরেব্বাস! এ তো পুরো ফায়ার দেখছি!”
ছেলেটা নির্লজ্জের মতো রিমের আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখে টিটকারি দিল,
“তোমার ফি*গারটা কিন্তু হেব্বি হ*ট সুইটি!”
রিমের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। ছেলেটার কথায় যেন তার রক্তে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে।ঠাস!! এক মুহূর্ত দেরি না করে নিজের হাতটা ঝটকা মেরে ছাড়িয়ে নিয়েই কষে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল ছেলেটার গালে। করে সেই শব্দটা যেন করিডোরের নিস্তব্ধতাকে চিরে ফেলল।
ছেলেটা থতমত খেয়ে গাল চেপে ধরল। তার চোখের দৃষ্টি মুহূর্তে হিংস্র হয়ে উঠল, যেন সুযোগ পেলে সে রিমকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলবে। একটা ক্রুর শয়তানি হাসি দিয়ে সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“এত বড় সাহস! তোকে তো পরে দেখে নেব। ইউ স্লাট!”
কথাটা ছুড়ে দিয়ে সে দ্রুত সেখান থেকে সরে গেল। রিম ভয়ে আর রাগে কাঁপছে। তার শরীর ঘামছে, শ্বাসপ্রশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে সে শাড়িটা ঠিকঠাক করার জন্য হন্যে হয়ে ওয়াশরুম খুঁজতে লাগল। লম্বা করিডোর দিয়ে সে দ্রুত হাঁটছে, দুপাশে সার সার বন্ধ দরজা—কোনোটা ল্যাব, কোনোটা অফিস কক্ষ। কোনোটিতেই কোনো সাইনবোর্ড নেই।
অন্ধকার করিডোরের গোলকধাঁধায় দিশেহারা রিম হঠাৎ একটি দরজা সামান্য খোলা দেখে ভেতরে ঢুকে পড়ল। মুহূর্তেই চারপাশের কোলাহল নিভে গেল। ঘরটা নিস্তব্ধ। জানালার ঝাপসা কাঁচ গলে আসা বিকেলের ম্লান আলোয় ঘরের আসবাবগুলো দীর্ঘকায় ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে।রিম ধাতস্থ হওয়ার সুযোগও পেল না; তার আগেই একজোড়া বরফশীতল হাত সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরল তার উন্মুক্ত কোমর। রিম স্তব্ধ, পাথরের মতো জমে গেল সে।পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা ছায়াটা হুইস্কির মতো গাঢ় আর নেশাক্ত কণ্ঠে তার কানের ঠিক লতিতে ফিসফিসিয়ে উঠল,
“শাড়ি পরে খুব বড় ভুল করে ফেলেছো তুমি…”
রিমের বুকটা সজোরে ধক করে উঠল। তার নাসারন্ধ্রে এসে ধাক্কা দিল এক তীব্র পুরুষালি পারফিউমের সুঘ্রাণ—যা একই সাথে মাদকতাময় এবং ভয়ংকর। ঘাড়ের ওপর আছড়ে পড়ছে লোকটার তপ্ত নিঃশ্বাস, আর কোমরে চেপে বসা সেই হাতদুটোর হিমশীতল স্পর্শে রিমের শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। অন্ধকারের সেই ছায়াটা আরও নিবিড়ভাবে মিশে গেল তার পিঠের সাথে,
“আজ তুমি শাড়ি পরেছো বলেই সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে এতদূর আসতে হলো আমাকে…”
লোকটা তার ঠোঁট ছোঁয়ালো রিমের ঘাড়ের সেই স্পর্শকাতর ভাঁজে। রিম থরথর করে কেঁপে উঠল। তার মনে হলো সে কোনো এক অন্ধকার অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে। লোকটার স্পর্শে মনে হচ্ছে সে প্রচন্ড নেশার মধ্যে ডুবে আছে; যেন সে সুস্থ মস্তিষ্কে নেই, বরং এক অবদমিত কামনার চূড়ান্ত শিখরে দাঁড়িয়ে আছে।
রিমের শ্বাস-প্রশ্বাস আরো ভারী হয়ে যায়। তার হৃদপিণ্ডটা যেন এক্ষুনি বুক ফেটে বেরিয়ে যাবে।রিম চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে অন্ধকারে। খামচে ধরে শাড়ির দুপাশে।তার গলা শুকিয়ে কাঠ। সে কিছু বলতে পারে না। সে জানে না কে এই লোকটা? কোথা থেকে এলো? তার শরীর যেন বরফের মত জমে গেছে।
সেই ঠান্ডা হাতদুটো এবার কোমরের বাঁধন আলগা করে ধীরে ধীরে উপরে উঠে এলো। পেটের কোমল ত্বকের ওপর লোকটার হাতের আঙুলগুলো চেপে বসতেই, রিমের পায়ের পাতা পর্যন্ত অবশ হয়ে এলো। এক তীব্র শিরশিরানি বয়ে গেল মেরুদণ্ড দিয়ে।
“শাড়ি পরেছো ঠিক আছে… কিন্তু এটা তো সবাইকে দেখানোর জিনিস না, সোনা… তুমি জানো না আমি কেমন করে পুড়ছি…”
লোকটার কণ্ঠে এক প্রলয়ংকরী দহন—যেন হাজার বছরের জমে থাকা ঈর্ষা, তৃষ্ণা আর ক্ষুধা একসাথে আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ছে। রিম আর সহ্য করতে পারছিল না। ভীষণ অস্থির লাগছে তার। সেই লোকটার থেকে ছাড়া পেতে চায়। কিন্তু লোকটা এমন ভাবে চেপে ধরেছে ,সে এক চুলও নড়তে পারছে না।সে নড়ার চেষ্টা করতেই লোকটা এক ঝটকায় তার শাড়ির আঁচলটা টেনে ফেলে দিল কাঁধ থেকে।
রিমের শরীরটা যেন বরফের চাই হয়ে গেল। চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। মুখে আতঙ্ক।সে কাঁপা কণ্ঠে বলে,
“Please… ছাড়ুন কে আপনি? ছাড়ুন…..”
লোকটার কন্ঠ এবার আরো গারো হয়, সে হুইস্কির স্বরে ফিসফিস করে বলে,
“No. You belong to me. এই শরীরটা আমার মালিকানায় তৈরি। এই পেটের এক ইঞ্চিও কারো চোখে পড়লে আমি সহ্য করবো না। শাড়ির নিচে লুকানো রত্নগুলো আমি ছাড়া কেউ দেখলে কেবল তাকে ছিঁড়ে ফেলবো না,তোমাকেও ছিন্নভিন্ন করে নিজের করে রাখবো। যেন মৃত্যুর পরেও কেউ স্পর্শ করতে না পারে।
Because even your ashes… are mine.”
তার ঠান্ডা আঙুলগুলো এবার হিংস্রভাবে খামচে ধরল রিমের কোমর। যন্ত্রণায় রিম নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল, তার চোখের পাতা তিরতির করে কাঁপছে। লোকটা এখানেই থামল না; সে তার ধারালো দাঁত দিয়ে সজোরে কামড় বসিয়ে দিল রিমের কলারবোনের ঠিক ওপরে থাকা সেই পরিচিত কুচকুচে কালো তিলটার ওপর।
“আহহ্…!”
এক তীব্র ব্যথার চিৎকার বেরিয়ে এলো রিমের মুখ থেকে। ছায়াটা মাথা তুলে রিমের মুখের দিকে তাকিয়ে মাদকতাময় কণ্ঠে বললো,
“তোমার এই কালো বিউটি স্পটটা যেন কারো নজরে না পড়ে। নইলে এর পরের বার আরো ভয়ংকর শাস্তি পেতে হবে।”
রিম এবার সর্বশক্তি দিয়ে একটা ধাক্কা মারল, কিন্তু লোকটা যেন এক অটল পাহাড়। রিমের আঁচল মেঝেতে লুটিয়ে আছে, তার অনাবৃত পিঠ আর পেটে লেপ্টে আছে সেই ছায়ার অধিকার। লোকটা হঠাৎ তার নিজের গায়ের জ্যাকেটটা খুলে রিমের গায় জড়িয়ে দিল।
“পরের বার… যদি আবার শাড়ি পরার স্পর্ধা দেখাও, তাহলে এমন অবস্থা করব যে এই দেহটা আর নিজের বলতে পারবে না। Next time… don’t dare!”
লোকটার হাতের বাঁধন আলগা হতেই রিম এক মুহূর্ত দেরি না করে ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। করিডোর দিয়ে সে পাগলের মতো দৌড়াচ্ছে, তার চোখ ফেটে জল নামছে।
দরজার অন্ধকার কোণ থেকে এবার ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো সেই দীর্ঘকায় অবয়ব। মুখে সোনালি রঙের সেই ড্রাগন মুখোশ, মাথায় হুড তোলা। অন্ধকারে শুধু জ্বলজ্বল করছে তার দুই চোখ—আকাশি আর ধূসরের এক অদ্ভুত, হাড়হিম করা মিশেল।সে মেঝেতে পড়ে থাকা রিমের রেশমি আঁচলটা হাতে তুলে নিল। সেটা নাকের কাছে ধরে চোখ বন্ধ করে এক দীর্ঘ, গভীর শ্বাস নিল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক উন্মাদ তৃপ্তির হাসি।
“উমমম… smells nice!
উৎসবের আমেজ মুহূর্তেই ফিকে হয়ে গেল অদ্রিজার কাছে। রিমকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে সে পাগলের মতো হয়ে গেছে। করিডোর থেকে শুরু করে অডিটোরিয়াম—কোনো কোণই বাকি রাখেনি। বুকের ভেতর একটা অজানা আশঙ্কার মেঘ জমছে। রিম এমনিতেই মুখচোরা, তার ওপর এমন ভিড়ভাট্টায় মেয়েটা একা কোথায় হারিয়ে গেল? আন্টির কাছে সে কী জবাব দেবে?
ঠিক সেই মুহূর্তে করিডোরের শেষ প্রান্ত থেকে একজনকে ছুটে আসতে দেখে অদ্রিজার হৃৎপিণ্ড এক সেকেন্ডের জন্য থেমে গেল।এ কি রিম?সে দ্রুত দৌড়ে গিয়ে রিমকে জড়িয়ে ধরল।
“কি হয়েছে তোর? এভাবে ছুটছিস কেন? আর এই জ্যাকেট… তোর শাড়ি কোথায়? এ অবস্থাই বা কে করলো?”
রিম কিছু বলতে চাইল, কিন্তু তার কণ্ঠনালি যেন কেউ পাথরে চেপে ধরেছে। কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না, শুধু চোখের কোণ দিয়ে নোনতা জলের ধারা গড়িয়ে পড়ছে। সে হাঁপানির রোগীর মতো হাসফাঁস করছে, বুকটা কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। তার শরীরের প্রতিটি কোষ যেন ভয়ে কাঁপছে।
অদ্রিজা আতঙ্কিত হলেও নিজেকে সামলে নিল। দ্রুত ব্যাগ থেকে একটা জলের বোতল বের করে রিমের হাতে দিল।
“শান্ত হ! আগে পানিটা খা। বুক ভরে লম্বা শ্বাস নে।তারপর সব খুলে বল কি হয়েছে…..”
রিম কাঁপাকাঁপা হাতে বোতলটা নিয়ে এক ঢোকে পুরোটা জল শেষ করে ফেলল। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে সে অদ্রিজার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার নখগুলো অদ্রিজার ত্বকে বসে যাচ্ছে। কাঁপা গলায় রিম শুধু একটা কথাই বলতে পারল,
“আমি… আমি এখনই বাড়ি যাব। এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। প্লিজ অদ্রি, আমাকে এখান থেকে নিয়ে চল!”
অদ্রিজার মাথায় হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। সেই শাড়িটা কোথায় গেল? ওই জ্যাকেটটা কার? কিন্তু রিমের চোখের ওই শূন্য আর ভয়াবহ চাহনি দেখে সে আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না। এই মুহূর্তে রিমকে সুস্থ রাখাটাই সবচেয়ে বড় কাজ। পরে না হয় সব কথা তার কাছ থেকে জেনে নেয়া যাবে।সে কোনোমতে রিমকে আগলে ধরে ভিড় এড়িয়ে ভার্সিটির গেটের দিকে পা বাড়াল। একটা রিকশা ডেকে রিমকে নিয়ে রওনা দিল বাড়ির দিকে।
এতক্ষণ করিডোরে দাঁড়িয়ে এসব কিছুই খেয়াল করছিল সেই মুখোশ পরা ছায়া মানবটি। তাকে খুঁজতে খুঁজতে পেছন থেকে তার পাশে এসে দাঁড়ায় তার অ্যাসিস্ট্যান্ট।
“ভাই আপনি এখানে……. আর আমি আপনাকে কোথায় কোথায় না খুঁজছি!”
ছায়া মানুষ টির মুখে এক রহস্যময়ী হাসি। তার চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে।সে হাতের মুঠোয় ধরা রিমের নীল শাড়ির আঁচলটা পকেটে পুরে নিল।তারপর বজ্রকঠিন আর গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“গাড়ি বের করো। উই আর গোয়িং ব্যাক টু ইতালি।”
অ্যাসিস্ট্যান্ট হতভম্ব! যেন আকাশ থেকে পড়ল! তার বসকে সে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে চেনে, কিন্তু আজ তার বসের আচরণ আজ সম্পূর্ণ অজানা, অচেনা। আজকের মতো এমন উন্মাদ আচরণ সে কখনো দেখেনি। ঠিক চার ঘণ্টা আগে, বস ইতালিতে বসে হঠাৎ জানালেন, “আই অ্যাম গোয়িং টু বাংলাদেশ।” কথাটা শুনে অ্যাসিস্ট্যান্টের মনে যেন একটা বিস্ফোরণ হল! কারণ গত ১১ বছর ধরে বস ইতালিতে থেকেছেন, কিন্তু এই সময়ের মধ্যে একবারও বাংলাদেশে যাওয়ার কথা উচ্চারণ করেননি। হঠাৎ কী এমন হল যে এখনই, এই মুহূর্তে তাকে বাংলাদেশ যেতে হবে?
আর শুধু যাওয়াই নয় বস বললেন, তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছাতে হবে! এটা তো প্রায় অসম্ভব! সাধারণত প্রাইভেট জেটে করেও সাত থেকে আট ঘণ্টা তো লাগেই।তবু আর কি করা? বস যখন বলেন, তখন সেটা আদেশ নয়, যেন বিধান! তাই অ্যাসিস্ট্যান্ট সঙ্গে সঙ্গে ফোন করে তাদের পাইলটকে। বের করে আনে “Inferno-x” একটি মিলিটারি-স্পেক কাস্টম-বিল্ট প্রাইভেট জেট, যা একমাত্র তার বসের জন্যই তৈরি। বাজারদর? প্রায় ১২ কোটি মার্কিন ডলার!
তারা আর দেরি না করে ছুটে চলে বাংলাদেশ অভিমুখে।
কিন্তু যত ধাক্কা খাওয়ার ছিল, তার পরেও আরও একটি বাকি ছিল বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখতে না রাখতেই আবার ফিরে যাওয়ার হুকুম!অ্যাসিস্ট্যান্ট যেন মাথায় বাজ পড়লো! এত টাকা খরচ করে, এত জটিলতা পেরিয়ে এলেন… আর এখন আবার ফিরে যাবেন?
কিন্তু কিছুই বলার উপায় নেই। কারণ সে জানে তার বস সাইকো! তাই যখন যা বলবে, সেটা প্রশ্নহীনভাবে মানতেই হবে। নইলে… জান আর গর্দান দুটোই যাবে!
তারা আর দেরি না করে বেরিয়ে পড়ে গাড়িসহ।…….
প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ১৫
ওদিকে রিশাবের চোখ ভিড়ের মাঝে খুঁজে চলেছে সেই মায়াবী কন্যাকে। একবার দেখার পরেই মেয়েটি কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল?… সে মনে মনে ভেবে ফেলে যে করেই হোক মেয়েটিকে খুঁজে বের করবে। মেয়েটি তো এ কলেজেই পড়ে! তাহলে তাকে খুঁজে বের করা নিশ্চয়ই সহজ হবে। কিন্তু সে তো মেয়েটির নাম জানে না। যাইহোক কিছু না কিছু একটা উপায়ে সে মেয়েটাকে খুঁজে বের করবেই………….
