সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২১
jannatul firdaus mithila
অপেক্ষার পালা না-কি সহজে ফুরায় না? কথাটা যে খুব একটা ভুল নয়, তা ইদানীং বেশ টের পাচ্ছেন এহসান বাড়ির মানুষজন। সপ্তাহখানেক কেটে গেলেও সে দূর্ঘটনার রেশ যেন আজও বেশ তাজা প্রত্যেকের হৃদয়ে। রেহান এখন বেশ সুস্থ! পা খুঁড়িয়ে চলাফেরা করলেও শরীরের অবস্থা আগে থেকে বেশ উন্নত। তবে ঘটনা ঘটেছে আরেকটা! এইতো গত দু’দিন আগের খবর। এনআইসিউ-তে শিফট করে রাখা রুহি-রেহান দম্পত্তির নবজাতকের হার্টবিট হুট করেই থেমে গিয়েছিল কেমন! গোটা হসপিটালে তখন জুবাইদা বেগমের করুণ আত্মচিৎকার ভাসছিল।
সায়মা খাতুন জীবনে প্রথমবারের মতো জ্ঞান হারিয়েছিলেন সেদিন। ভাবা যায়? যে-ই মানুষটা নিজের ছেলের ওমন করুণ অবস্থাতেও কোনরকম দাঁড়িয়ে ছিলেন দু’পায়ে অথচ নাতির এহেন খবর পাওয়া মাত্রই তিনি কি-না জ্ঞান হারিয়ে সাতঘন্টা পড়েছিলেন! রৌদ্র সেদিন নির্বাক ছিলো কেবল। তার চোখ বেয়ে নিঃশব্দে গড়িয়েছিল নোনাজল, যদিওবা তা সকলের অলক্ষ্যে! ওদিকে রেহান হয়ে গিয়েছিল বদ্ধ উম্মাদ! বেচারা ছেলের শোকে তখনি এনআইসিউ-তে ছুটে গিয়ে, কাপড়ে মোড়ানো ছোট্ট প্রাণটাকে প্রথমবারের মতো বুকে চেপে ধরেছিল।বুক ফাঁটা আর্তনাদে কেবল বলছিল,
“ আব্বু তোমায় চাইনি বাবা! আব্বু খারাপ! আব্বু অভিশপ্ত! আব্বু তখন সবার সামনে বলেছিলাম আমার প্রাণেশ্বরীকে বাঁচাতে! আব্বু খারাপ, খুউব খারাপ। তা নাহলে কেউ তার ছোট্ট অংশকে পৃথিবীতে আসার আগেই না বলে দেয়? বলে না তো বাবা। তবে আমি বলেছি! আমি তোমাকে বাদ দিয়ে আমার শ্যামবতীকে চেয়েছি বাবা। আমি আজ সারাজীবনের জন্য দোষী হলাম! খুনী হয়ে গেলাম তোমার। হাশরের ময়দানে আব্বুর জন্য মোটেও সুপারিশ করোনা বাবা। আব্বু খারাপ!”
সেদিন এক পিতার ভঙ্গুর হৃদয়ের আর্তনাদে এনআইসিউ-তে উপস্থিত সকল ডাক্তার – নার্সের চোখের পানিতে যার যার বুক ভেসেছিল। আগ বাড়িয়ে আর্তনাদে মত্ত থাকা রেহানের কাছ থেকে নবজাতককে নিতে চাইলেই রেহান তাদের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। নার্সসহ বাদবাকি ডাক্তাররা বহু চেষ্টা করেও নবজাতককে রেহানের কাছ থেকে নিতে সক্ষম হয়নি। তখন উপায়ন্তর না পেয়ে এগিয়ে এসেছিল রৌদ্র। রেহানকে বহুকষ্টে সামলে নিয়ে,একহাতে বাচ্চাটাকে কোলে নিতেই আচমকা সে টের পেলো বাচ্চাটা বোধহয় পা নাড়ালো। পাশ থেকে ডাক্তার এগিয়ে আসতে চাইলেই হাত উঁচিয়ে তাকে থামায় রৌদ্র। অবিশ্বাস্য চোখে একদৃষ্টিতে নবজাতকের দিকে তাকিয়ে থেকেই সে তৎক্ষনাৎ একহাতে হালকা চাপড় দিলো নবজাতকের তুলার ন্যায় মোলায়েম গালে।মুহূর্তেই মিরাকেল ঘটলো!
যে-ই বাচ্চাটার কিছুক্ষণ আগ অব্ধি হার্টবিট চলছিল না,সে বাচ্চাটাই রৌদ্রের শক্তপোক্ত দু’হাতের আগলে যেতেই নড়েচড়ে ওঠলো। গালে মৃদু চাপড় খেতেই ঠোঁট উল্টে সশব্দে চিৎকার করে ওঠলো! আশেপাশের মানুষজন এহেন কান্ড দেখে রীতিমতো হতভম্ব! তাদের এই ক্ষুদ্র জীবদ্দশায়ও যে এমন মিরাকেল ঘটবে তা যেন ঘুনাক্ষরেও ভাবেননি তারা। ওদিকে বাচ্চার কান্নার শব্দ কানে পৌঁছাতেই রৌদ্র থমকে দাঁড়িয়ে রয় একমুহূর্তের জন্য। নবজাতক শিশুটি মোড়াচ্ছে, তার লালচে বাদামী ঠোঁটজোড়া তিরতির করে কাঁপছে! চোখদুটো কেমন কুঁচকে রাখা। মুখটা এইটুকুন! সম্পূর্ণ শরীর মুড়িয়ে রাখা মোটা তোয়ালেতে। রৌদ্রের তখন কে জানে কী হয়েছিল! ছেলেটা কেবল ছলছল চোখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো নবজাতকের পানে। সময় নিয়ে নিজের মুখটা খানিক নামিয়ে এনে আলতো স্পর্শে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয় নবজাতকের নরম ললাটে। পরক্ষণে ভেঁজা চোখে হালকা হেসে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলেছিল,
“ ইউ নো হোয়াট বেবি? ইউ আর আ ফাইটার! আর আমি কে জানো? আমি হলাম তোমার মামা! মা মা…”
পরিশেষে ভালো খবর হচ্ছে, রেহানের বাচ্চাটা তবে বেঁচে আছে। কিন্তু রুহির অবস্থা করুণ এখনও। ৭২ঘন্টা পর মেয়েটার শরীরে খানিক রেসপন্স ফিরলেও, ফিরেনি তার জ্ঞান। ডাক্তারদের ভাষ্যমতে, মেয়েটা এখন কোমায় আছে। সেখান থেকে সে ঠিক কবে উঠবে তার নিশ্চয়তা কারো কাছে নেই।কোমা নামক দীর্ঘমেয়াদী ঘুম থেকে সে হয়তো মাসখানেক পর,অথবা বছরখানেক পর অথবা এমনও হতে পারে, সারাটাজীবন এভাবেই নির্জীব হয়ে পড়ে থাকবে। এমন খবরে রেহান ছেলেটা তখন হুট করেই কেমন গম্ভীর হয়ে গেলো।
যে কি-না কাল অব্ধি বউয়ের দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে পেরেশান ছিল, আজ সে কেমন গম্ভীর সেজেছে দেখো! নিজের ছোট্ট অংশকে বুকে চেপে সেদিন-ই হসপিটাল থেকে চলে গিয়েছে বাড়িতে। যাওয়ার আগে একটিবারের জন্যও এহসান বাড়ির কোনো লোকের সাথে টুঁ-শব্দটিও করেনি সে।না করেছে রৌদ্রের সাথে। তার গম্ভীর মুখ নিজে থেকে কিছু না বললেও আগুন চোখদুটো যেন চিৎকার দিয়ে বলছিল — এহসান পরিবারের প্রতিটি মানুষ দায়ী তার শ্যামবতীর এ অবস্থার পেছনে। তারা দায়িত্বহীন! নিষ্ঠুর! রেহানের এহেন চিন্তা কেউ টের না পেলেও রৌদ্র ঠিকই আন্দাজ করেছে।তবুও যেচে পড়ে রেহানকে বলেনি কিছু। ঠিকই তো! রেহানের জায়গায় যদি সে নিজে থাকতো, সে কি তবে মাফ করতে পারতো নিজের পরিবারকে?
রুহিকে শিফট করা হয়েছে সিকদার বাড়িতে। তার সে-ই পুরনো কামরায়। আশ্চর্য হলেও সত্যি! রেহান সেদিন অভিমান করে হসপিটাল থেকে চলে গেলেও পরে ঠিকই ফিরে এসেছে বউয়ের কাছে। নিজ দায়িত্বে বউকে শিফট করেছে নিজেদের পুরনো ঘরে। তার আদেশানুসারে মেয়েটার জন্য রাখা হয়নি কোনো নার্স। রেহান নিজেই সর্বক্ষণ তৎপর থাকে বউ-বাচ্চার খেদমতে।সারাদিন বউয়ের সেবাযত্ন করে,এদিকে দুধের বাচ্চাটা দিনের বেলা থাকে সায়মা খাতুনের কাছে। রাতের সময় থাকে রেহানের কাছে! বাচ্চাটা আবার কলিক বেবি। সারারাত ঘুমায়না কুট্টুস টা। বিরিংয়ের ন্যায় চোখদুটো মেলে রেখে চেয়ে থাকে এদিক-ওদিক। রেহান ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম থেকে প্যারেন্টিংয়ের বিভিন্ন ভিডিওস দেখেছে। সে অনুযায়ী প্রতি দু-ঘন্টা পরপর বাচ্চাকে ফিড করায় আদর্শ ছেলে। সায়মা খাতুন ছলছল চোখে দেখে যান সবটা। মুখ ফুটে বলেন না কিছু। মাঝেমধ্যে নিজেই নিজের পেটের ওপর হাত বুলিয়ে ভাবেন — তার গর্ভটা নিশ্চয়ই ধন্য রেহানের মতো ছেলে পেটে ধরার জন্য।
কেটেছে আরও ১০দিন! এহসান বাড়ির পরিবেশ ইদানিং বেশ গম্ভীর! কেউ তেমন কথা বলেনা। হাসে না আগের মতো। প্রত্যেকেের চোখেমুখে এক অদ্ভুত বিষাদের ছাপ স্পষ্ট! রুহিকে ও বাড়িতে শিফট করার প্রস্তাবে সকলেই ভিন্নমত প্রকাশ করেছিলেন তবে রেহান সেদিন সকলের সামনে কঠিন গলায় বলেছিল,
“ মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন আমার কাছে! যেদিন থেকে ও আমার স্ত্রী হয়েছে, সেদিন থেকে ও আমার গুরু দায়িত্বে রুপান্তরিত হয়েছে। আমাকে আমার দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করতে দিন। আমার বউ আমার কাছে থাকবে।ও বাঁচলেই আমার সঙ্গে বাঁচবে। মরলেও আমার কাছেই মরবে!”
অগত্যা ওমন কথায় আর কিছু বলার মতো সাহস করেনি এহসান বাড়ির লোকজন। বলেই বা কী লাভ? রেহান কি আর আদৌও শুনবে কারো কথা? যে ছেলের মুখ থেকে কখনো হাসি সরেনি, সারাক্ষণ মেতে থাকতো হৈ-হল্লা, হাসিঠাট্টায়! সে-ই ছেলেই সেদিন কেমন কঠিন গলায় কথাগুলো বলেছে। এহসান বাড়ির সদস্যরা কেবল মাথা নত রেখে শুনেছেন সব। দিন পেরিয়েছে এভাবেই। কবির সাহেবসহ বাকিরাও বেশ কয়েকবার রুহিকে দেখতে গিয়েছিল সিকদার বাড়িতে। তবে রেহান অনুমতি দেয়নি তাদের। উল্টো কিছু কঠিন বাক্য শুনিয়েছে এই বলে,
“ আপনাদের অবহেলায় আজ আমার শ্যামবতীর এ হাল! কোন মুখে এসেছেন ওকে দেখতে? আমার দেয়া আমানতকে ঠিকমতো দেখে রাখতে পারেননি সেটা আপনাদের ব্যর্থতা। আর আমি ব্যর্থদের কখনো ক্ষমা করিনা। কান খুলে শুনে রাখুন সবাই — এহসান বাড়ির প্রতিটি সদস্য এখন থেকে আমার জন্য অচেনা হলো। আমার চোখে আজও আপনারা দোষী আর বাদবাকি জীবনটাতেও দোষীই থাকবেন।”
এই রেহানকে চেনে না কেউ। রুঢ়, কঠিন!যার মুখ দিয়ে বরাবরের মতো দুষ্টমিষ্টি কথা বেরুনোর বদলে বেরিয়েছে তীরের ফলার ন্যায় তীক্ষ্ণ বাক্য। ওসমান সিকদার গম্ভীর ছিলেন সেদিন। ছেলের বিপক্ষে যাবার সাহস নেই তার। তাইতো সবটা মুখ বুঁজে দেখেছেন কেবল। সায়মা খাতুন সেদিনও নাতি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। জুবাইদা বেগম ছলছল চোখে নাতিকে একটু ধরতে নিলেই পেছন থেকে রেহান সিঁড়ির কোণায় দাঁড়িয়ে গমগমে গলায় বলেছিল,
“ ধরবেন না আমার ছেলেকে! আপনাদের স্পর্শ ওর গায়ে লাগলেই আমার শরীর জ্বলে ওঠবে। বারবার মনে পড়বে, আমার স্ত্রীর করুণ পরিস্থিতির কথা। আমি হয়তো নিজের বাদবাকি ভদ্রতাটুকুও ভুলে যাবো তখন। তাই কেউ আমার সন্তানকে ছোঁয়ার সাহস করবেন না। কেউ না!”
এহেন কাঠকাঠ কথায় ভঙ্গুর সকলের হৃদয়। রৌদ্র সেদিন আসেনি সিকদার বাড়িতে। কেন যেন রেহানের সাথে চোখজোড়া দেওয়ার মতো সাধ্য হচ্ছিল না তার। কেননা সেদিন তো তার উপস্থিতিতেই বোনটার অতবড় এক্সিডেন্ট হলো! এ দায় গা থেকে কিভাবে মুছবে সে? কিভাবে ভুলবে — বোনের র*ক্তমাখা ঐটুকুন শরীরটা!
দিনটা আজ রবিবার। কার্যদিবস হওয়ায় এহসান বাড়ির সকলে যে যার মতো ছুটে গিয়েছে কর্মক্ষেত্রে। রৌদ্র আজ সকাল সকাল হসপিটাল গিয়েছে। একদিনে আজ দু’দুটো অপারেশন ! এ নিয়েই বেচারার ব্যস্ততা ফুরচ্ছে না।ওদিকে অনিকও ছুটেছে অফিসে। ইকরা এহসান বাড়িতে নেই। বাবার বাড়ি গেছে আজ ৫দিন। শোনা গেলো, মেয়েটা না-কি ক’দিন যাবত ভীষণ অসুস্থ। সারাক্ষণ বিছানায় পিঠ লাগিয়ে রাখে। খানিকটা উঠতে গেলেই না-কি মাথা ঘোরায়। মুখে অরুচি দেখা দিয়েছে। ভাত দেখলে নাক সিটকায়, মাছ দেখলে নাক সিটকায়! কাঁচা আদা-রসুনের ঘ্রাণ নাকে গেলেই না-কি গা গুলিয়ে ওঠে তার। বউয়ের এরূপ পরিস্থিতির কথা কানে আসতেই বড্ড পেরেশান অনিক। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে — আজই অফিস সেরে বউয়ের কাছে ছুটবে সে।
এদিকে কবির সাহেব ইদানিং অফিসে বসেন না। লোকটার কাঁধদুটো যেন হুট করেই দু-মণ ভারি হয়ে গিয়েছে। মধ্যবয়স্ক দেহটায় জমেছে বয়স্ক ছাপ। গালের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি গুলো ইদানীং বেশ বড় হয়েছে। যার দরুন লোকটার গাল ঢেকে গিয়েছে পাকাঁ চাপ দাঁড়িতে। কবির সাহেব সেদিনকার পর থেকে কথা বলা খুব কমিয়ে দিয়েছেন। এমনকি জুবাইদা বেগমের সাথেও হা,হু ছাড়া কথা বলেননা বাড়তি! শুধু কি তিনিই এমন ভাব ধরেছেন? জুবাইদা বেগমও যে দূর্বল হয়ে গিয়েছেন মেয়ের শোকে। মানুষটা ইদানিং সংসার ধর্মে ভীষণ অমনোযোগী। যিনি প্রতিদিন ফজর নামাজটা আদায় করেই ছুটতেন রসুইঘরে, তিনি এখন রোজ দেরি করে ঘুম থেকে ওঠেন।কখনো বেলা ১০টায়, তো আবার কখনো বেলা ১১টায়। স্বাভাবিক! সারারাত জায়নামাজ বিছিয়ে মেয়ের জন্য কাঁদতে থাকলে সকাল সকাল থোড়াই জেগে থাকবেন তিনি!
ওদিকে জুবাইদা বেগমের এহেন দূর্বল হয়ে যাওয়ায় বাকিরা যতটা না কষ্ট পেয়েছেন তারচেয়ে দ্বিগুণ কষ্ট পেয়েছেন রাফিয়া বেগম। রোজ রোজ এখন আর আগের মতো বান্ধবীর সাথে খোশগল্পে মাতেন না তিনি। দেখেন না বান্ধবীকে মন খুলে একটু হাসতে। দৈনিক রান্নাবান্না সেরে জোর করে জুবাইদা বেগমকে এক-দু মুঠো ভাত মুখে তুলে দিলে তবেই একটু-আধটু খাবার গিলেন জুবাইদা বেগম। তা নাহলে সারাদিন খাবার খাওয়ার কথা মনে পড়ে না মানুষটার। রাফিয়া বেগমের কাঁধে এখন বেশ দায়িত্ব।
কথায় বলে, বিপদ না-কি যখন আসার হয় তখন সকল দিক থেকে একবারে আসে। এই যেমনটা ইদানীং এহসান বাড়ির মানুষজনদের সাথে হচ্ছে। তায়েফ সাহেব চাকরি হারিয়েছেন — কথাটা প্রথম প্রথম কেউ আচঁ না পেলেও গত চারদিন আগে তায়েফ সাহেব নিজে থেকেই বড় ভাইদের বলে দিয়েছেন কথাটা। তা শুনে কবির সাহেব প্রতিক্রিয়াহীন থাকলেও সাব্বির সাহেব বেশ চমকেছেন। তায়েফ সাহেবকে একাধারে জেরা করে পরিশেষে যা বুঝলেন — দেশে এখন সৎ মানুষের মূল্য নেই। সাব্বির সাহেব সেদিনই তায়েফ সাহেবকে অফিসে বসিয়েছেন। একদিকে কবির সাহেব দিনদুনিয়া ভুলে ঘর ধরেছেন, আরেকদিকে তায়েফ সাহেব জয়েন করেছেন অফিসে।
গোধূলির পড়ন্ত লগ্ন! ঢাকা শহরের ব্যস্ত আমেজে এ ক’দিন ধরে কেমন শীত শীত ভাব জমেছে। সামনেই শীতকাল! পরিবেশে ইতোমধ্যেই শীতের আগমনী বার্তা প্রকাশ পেয়েছে বেশ। মির্জা বাড়ির সুবিশাল লিভিং রুমের সোফাগুলোয় গোল হয়ে বসে আছেন মির্জা বাড়ির মানুষজন।তৌকির মির্জা আয়েশে বিস্কুট ডুবচ্ছেন চায়ের কাপে। মাঝেমধ্যে তুলে তুলে মুখেও পুরছেন আরামসে। তৌসিফ মির্জা গুরুগম্ভীর মুখে দু-হাত সোফার দু হাতলে রেখে বসে আছেন। সামনেই ট্রাক সমিতির ইলেকশন। বেশ কয়েক বছর ধরে তিনিই জিতে এসেছেন এহেন নির্বাচনে। জনসাধারণের ভোটে নয়, টাকার জোরে। তবে এবারের ইলেকশনের ব্যাপারটা একদম ভিন্ন। অপজিট পার্টিতে দাঁড়িয়েছে যুবক নেতা। ব্যাটা মাঠে কম কাজ করলেও সোস্যাল মিডিয়ায় কাজ করছে বেশ।যার দরুন তার জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। তার সম্মুখে টিকে থাকাটা একপ্রকার চ্যালেন্জ বৈকি তৌসিফ মির্জার জন্য। বেচারা এ নিয়েই বড্ড চিন্তিত। ছেলে আকাশ তাকে সবদিক দিয়ে সহায়তা করবে কি! সে উল্টো নাম ডুবচ্ছে তার। সেদিন দেখা গেল, কোন পরিষ্কারকর্মীর সাথে হুদাই তর্ক-বিতর্কের জের ধরে পরিষ্কারকর্মীর গায়ে ভুলবশত হাত তুলে ফেলেছিল। এরপর আরকি! বর্তমানে সকলের হাতে মোবাইল থাকে। ঘটনা ঘটতে দেরি, মিডিয়ায় ভাইরাল হতে দেরি নেই। তৌসিফ মির্জার যাও একটু-আধটু নাম ছিল, ছেলের এহেন বোকামিতে তাও গেলো! এ নিয়ে কম কষ্ট বেচারার বুকে?
এদিকে শারমিন বেগম রান্নাঘরে ব্যস্ত। বড় জায়ের সাথে টুকটাক কাজ করছেন তিনি। তৈরি করছেন বিকেলের নাস্তা। এরইমধ্যে লিভিং রুম থেকে হাঁক ছেড়ে ডেকে ওঠেন তৌকির সাহেব!
“ কই গো শুনছো? আরেক কাপ চা দিয়ে যাও তো আমায়।”
শারমিন বেগম শুনলেন। প্রতিত্তোরে তেমন কিছু না বলে চুপচাপ কাপে চা ঢেলে পা বাড়ালেন লিভিং রুমের দিকে। গুনে গুনে দুপা এগোতেই হঠাৎ তার চোখ পরলো দোতলার সিঁড়ির দিকে। ধুপধাপ পা ফেলে নামছে মুগ্ধ! গায়ে নেভি ব্লু রঙা ট্রেঞ্চ কোট। বাহাতে চকচকে সিলভার রঙা ঘড়ি! পায়ে ব্যুট। মাথার এলোমেলো চুলগুলো আজ বেশ পরিপাটি। চোখের ওপর শোভা পাচ্ছে নীল রঙা রোদচশমা। গায়ে কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ। শারমিন বেগম কেমন হা করে তাকিয়ে রইলেন ছেলেটার দিকে। হাতে ধরে রাখা চা-টা যে ঠান্ডা হচ্ছে সেদিকে কোনরূপ ভ্রুক্ষেপ নেই তার! মুগ্ধ শক্ত চোয়ালে লিভিংয়ে এসে দাঁড়াতেই সকলের নত দৃষ্টি তক্ষুনি উঠলো ছেলেটার দিকে। তৌসিফ মির্জা কেমন ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইলেন। মনে মনে বলেই বসলেন,
“ এমন জামাই সেজে যায় কই?”
মনে আওড়ানো বাক্যটা ঠোঁটের আগায় আনার সাধ্যি নেই তৌসিফ মির্জার। এদিকে তৌকির সাহেব তৎক্ষনাৎ ছেলেকে আপাদমস্তক পরোখ করে সন্দিহান গলায় জিজ্ঞেস করে ওঠেন,
“ এতো সুন্দর করে রেডি হয়ে যাচ্ছো কোথায়?”
মুগ্ধ কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখলো। বাবার করা প্রশ্নের উত্তর দিতে মোটেও তাড়া দেখায়না গম্ভীর পুরুষ। উল্টো গমগমে গলায় তক্ষুনি বলে,
“ চলো!”
ভড়কায় তৌকির সাহেব। আমতাআমতা করে ফের বলে ওঠে,
“ কোথায়?”
“ বিয়ের পাকাঁ কথা বলতে!”
এরূপ প্রতিত্তোরে হকচকিয়ে ওঠেন তৌকির সাহেব। ত্বরিত দু’ধারে মাথা নাড়িয়ে জানায়,
“ ছিহঃ ছিহঃ কি বলো! আমার কি এখন বয়স আছে আবারও বিয়ে করার? নেহাৎ দেখতে আমি বেশ হ্যান্ডসাম তাই বলে ছেলের বদলে নিজে….”
কথাটা শেষ হবার আগেই মুগ্ধ কেমন দাঁত চিড়বিড়িয়ে ওঠে। কঠিন গলায় বলে,
“ আমি তোমার কথা নয়,নিজের কথা বলছি!”
প্রথম প্রথম কথাটা ধরতে পারেননি তৌকির সাহেব। ঠোঁট গোল করে যেইনা একটু শব্দ তুলবে ওমনি তার টনক নড়লো যেন! তক্ষুনি বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালেন ছেলের দিকে। মুহূর্তেই সটান হয়ে দাঁড়িয়ে অপ্রস্তুত কন্ঠে বলে ওঠেন,
“ কিহ? কি বললে তুমি? আমার কেন যেন মনে হচ্ছে কানে ভুল শুনছি!”
মুগ্ধের মেজাজ চটলো এবার। ফর্সা মসৃণ ললাটে মুহূর্তেই বিরক্তির ভাঁজ পরলো বেশ কয়েকটা। সে কেমন চোয়াল শক্ত করে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে। তৌকির সাহেব তৎক্ষনাৎ ছুটলেন ছেলের পিছুপিছু। বাড়ির সদরদরজা পেরিয়ে ড্রাইভওয়েতে পা রাখতেই তিনি গলা উঁচিয়ে ছেলেকে ডেকে বললেন,
“ গার্জিয়ান ছাড়া কেউ মেয়ে দিবেনা!”
থামলো মুগ্ধ! ঘাড় বাকিয়ে সানগ্লাসের আড়ালেই চাইলো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। পরমুহুর্তেই ঠোঁটের কোণে রহস্যময় বাঁকা হাসির রেশ টেনে অদ্ভুত শান্ত কন্ঠে বলল,
“ কন্ট্রাক্ট মেরেজের জন্য আবার গার্জিয়ানদের লাগবে না-কি?”
মুহুর্তেই হাসি হাসি মুখটা কেমন থমথমে হয়ে গেলো তৌকির সাহেবের। কপালে পরলো গোটাকতক ভাঁজ।তিনি পা বাড়িয়ে এসে দাঁড়ালেন ছেলের মুখোমুখি। অবোধ স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“ কন্ট্রাক্ট মেরেজ মানে?”
এপর্যায়ে হাত বাড়িয়ে চোখ থেকে চশমাটা খুলে নেয় মুগ্ধ। নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দেয়,
“ শর্ত মোতাবেক বিয়ে! অনলি ছ’মাসের জন্য। এরপর মেয়ে যাবে মেয়ের রাস্তায়, আর আমিতো বরাবরই আমার রাস্তায় থাকি!”
থমকায় তৌকির সাহেব। হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইলো কেমন। হতবাক কন্ঠে থেমে থেমে বললেন,
“ এটা বিদেশ নয় সায়ান! এটা বাংলাদেশ। এখানে বিদেশের মতো এসব কন্ট্রাক্ট মেরেজ, ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড চলেনা।”
বাঁকা হাসে মুগ্ধ! বাদামী চোখদুটো কেমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র করে নিয়ে কন্ঠ নামালো খাদে। গায়ের কোটটা একটু নাড়িয়ে চাড়িয়ে ভাবলেশহীন গলায় বললো,
“ বাংলাদেশ বলেই বিয়ে করতে চাইছি! নাহলে এতক্ষণে ঐ মেয়েকে কাঁধে করে তুলে নিয়ে আসতাম। এন্ড ইউ নো ড্যাড! আমি এসবে ভীষণ এক্সপার্ট।”
সন্ধ্যা পরেছে মাত্রই! এহসান বাড়িতে এখন আর আগের মতো সন্ধ্যা নাগাদ চায়ের আড্ডা বসে না। এতবড় বাড়ি এখন কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে দেখো! সাব্বির সাহেব এবং তায়েফ সাহেব মাত্রই এলেন অফিস সেরে। ড্রয়িং রুমের বড় সোফায় গা এলিয়ে বসতেই মাইমুনা বেগম পানি নিয়ে এলেন মানুষ দু’টোর জন্য। এগিয়ে এসে তায়েফ সাহেবকে একগ্লাস পানি এগিয়ে দিতেই মানুষটা কেমন মুচকি হাসলেন। বিনিময়ে মাইমুনা বেগমও হাসলেন একটুখানি। সরে এসে সাব্বির সাহেবকে পানি এগিয়ে দিতেই, বাড়ির সদর দরজা দিয়ে হৈ-হৈ করে কতক অপরিচিত মানুষজন ঢুকে পড়লেন। প্রত্যেকের হাতে বড় বড় ফলের কার্টুন! তারা একে একে ভেতরে ঢুকে কার্টুন গুলো ড্রয়িংয়ে রেখে চলে যাচ্ছেন উল্টো পথে। পেছন পেছন আরও আসছে কি যেন।এদিকে এহেন কান্ডে হতবাক বাড়ির সকলে। সাব্বির সাহেব তৎক্ষনাৎ দাঁড়িয়ে পড়েন বসা ছেড়ে। গম্ভীর মুখে আওয়াজ তুলে বলেন,
“ কি হচ্ছেটা কী? কারা আপনারা? আর এসব কোত্থেকে আনছেন?”
লোকগুলো জবাব দিচ্ছেনা। নিজেদের কাজে মত্ত থেকে বেজায় গরিমা দেখাচ্ছেন যেন। তায়েফ সাহেব এপর্যায়ে এগিয়ে আসেন। সদ্য কাঁধ থেকে কার্টুন নামানো ব্যক্তির হাত টেনে কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“ কি বলছি আপনাদের? কথা কানে যাচ্ছে না? এত ফলমূল কে পাঠিয়েছে?”
“ আমি!”
সদর দরজা থেকে ভেসে আসা গমগমে গলায় সেদিকে চোখ ফেললেন সকলে। সাব্বির সাহেব অদূরের বলিষ্ঠদেহী যুবককে না চিনলেও তায়েফ সাহেব ঠিক চিনলেন। তিনি তৎক্ষনাৎ তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে কঠিন গলায় বলতে লাগলেন,
“ হোয়াট দা হেল আর ইউ ডুয়িং হেয়ার? কোন সাহসে আমার বাড়িতে পা রাখলে তুমি?”
দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ ঠোঁট পিষে হাসলো। নিজের চিরচেনা স্বভাবে তক্ষুনি গটগট পায়ে চলে এলো ভেতরে। ওদিকে বাড়ির বাদবাকি মানুষজন ইতোমধ্যেই তায়েফ সাহেবের চেঁচানোতে ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়ালেন।আহি-অরিন তড়িঘড়ি করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলেও মাহি মেয়েটা সিঁড়ির আগায় গা লুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কেমন! লুকিয়ে লুকিয়ে ড্রয়িং রুমে মুগ্ধকে দেখে কেমন বিরবির করে বলল,
“ এই লোক এখানে কেনো এসেছে?”
ওদিকে বেপরোয়া মুগ্ধ! নিজের বরাবরের বেয়াদবি স্বভাব চরিত্র বজায় রেখে ড্রয়িং রুমের একপাশের সোফায় বসে পড়লো বিনাবাক্যে। তারপর পায়ের ওপর পা তুলে এমনভাবে নাড়াতে লাগলো — যেন এটা তার বাপের বাড়ি! এদিকে তায়েফ সাহেব রীতিমতো ফুঁসছেন। তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে এসে মুগ্ধের উদ্দেশ্যে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলতে লাগলেন,
“ বেয়াদব! নিজের এসব অভদ্রতা এ বাড়ির বাইরে গিয়ে দেখাও। আমার বাড়িতে কোন সাহসে ঢুকলে তুমি? এক্ষুণি বের হও, নাহলে পুলিশ ফোর্স ডাকিয়ে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করব।”
এহেন হুমকিতে মুগ্ধ কেমন শ্লেষাত্মক হাসলো দেখো! একহাতে রয়েসয়ে চোখ থেকে চশমাটা খুলে নিয়ে তাচ্ছিল্য ভরা দৃষ্টিতে তাকালো তায়েফ সাহেবের পানে। শান্ত কন্ঠে বললো,
“ এক্সকিউজ মি! আই থিংক আপনার বয়স বাড়ার সাথে সাথে আপনার স্মৃতিশক্তিটা কমে যাচ্ছে! আপনি বোধহয় ভুলে যাচ্ছেন, আপনি এখন আর ডিসি নন। আর পাঁচটা সাধারণ জনগনের মতোই একজন। সো এসব ফোকলা ধমক নিজের পকেটে রাখুন। সময় এলে কাজে লাগবে!”
অপরিচিত ছেলের এহেন চরম বেয়াদবিতে হতবাক সকলে। সাব্বির সাহেব তখনি তায়েফ সাহেবের পানে চোখ তুলে তাকালেন। সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করেন,
“ তায়েফ! কে এই ছেলে?”
তায়েফ সাহেব দাঁত কিড়মিড় করছেন। নাক ফুলিয়ে নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে কেবল বললেন,
“ দা মোস্ট ওয়ান্টেড মাফিয়া মনস্টার।”
ভড়কায় সবাই। ত্বরিত বুকের মাঝে ভিন্ন এক ভয় জাগ্রত হয় সবার। এসব কালো জগতের মানুষ তাদের বাড়িতে কেনো এলো হঠাৎ? কি উদ্দেশ্যে এলো? এ নিয়েই যত ভাবনা সবার। ওদিকে মুগ্ধ এবার গম্ভীর মুখে বলে ওঠে,
“ আহা! আপনিই তো দেখছি আমার ইন্ট্রো দিয়ে দিচ্ছেন। এভাবে বললে হয় বলুন? ইন্ট্রো দিলে ঠিক মতো দিবেন। কিভাবে দিবেন, দেখাচ্ছি দাঁড়ান।”
বলেই মুগ্ধ নিজের কোমরের পেছন থেকে রাশিয়ান মডেলের পি*স্তলটা বের করে এনে রাখলো সামনের টেবিলের ওপর। পরক্ষণে ফের পায়ের ওপর পা তুলে নাচাতে নাচাতে ভারি কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ মে আই ইন্ট্রডিউস মাইসেল্ফ! মিট দা মোস্ট পাওয়ারফুল আন্ডারওয়ার্ল্ড কিং — মনস্টার।যাকে দেখার সুযোগ কেবলমাত্র মৃত মানুষদের হয়! ভাবছেন হয়তো, মৃত মানুষ আবার দেখে কিভাবে? একচুয়েলি ব্যাপারটা হচ্ছে কি! আমাকে যারা একবার স্বচক্ষে দেখে ফেলে, তারা সর্বোচ্চ পরবর্তী পাঁচ মিনিট বেঁচে থাকে।এরপর? এরপর তারা আমার এই সুন্দর হাতদুটোতে জবাই হয়! সত্যি বলছি।বিশ্বাস নাহলে ডিসি সাহেব… ওপস সরি! প্রাক্তন ডিসি সাহেবকে জিজ্ঞেস করুন।”
হতভম্ব সবাই! কেউ কেউ ভয়ার্ত ঢোক গিলছেন। কবির সাহেব সময় নিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠেন,
“ এখানে কি কাজে এসেছো?”
মুগ্ধ এবার চোখ তুলে তাকায়। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি টেনে ধরে বলে,
“ তেমন কিছু না! ডিসি সাহেবের এক মেয়েকে নিজের বউ বানানোর প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।”
এহেন কথা কর্ণকুহরে পৌঁছান মাত্রই একমুহূর্তের জন্য নিশ্বাস ফেলতে ভুলে গেলো সবাই। তায়েফ সাহেবের মাথায় বুঝি আকাশ ভেঙে পড়ল। লোকটা নিজের উপচে পড়া রাগ গুলো আর সংবরণ করে রাখতে পারলেন না। তিনি তৎক্ষনাৎ গর্জন তুলে বলতে লাগলেন,
“ ইউ স্কাউন্ড্রেল! আরেকবার আমার মেয়ের কথা মুখে আনলে তোমার ঐ জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলব আমি।”
মুগ্ধ কাঁধ ঝাকায়। বামহাতের নখ দেখতে দেখতে বলে,
“ এতো সহজ? জামাই আদর করেই কুল পাবেন না, সেখানে আবার জিভ টেনে ছিঁড়বেন! বাহ…”
তায়েফ সাহেব আরেক কদম এগিয়ে আসেন। হুংকার ছুঁড়ে বলেই বসলেন,
“ দরকার পরলে মেয়েকে নিজ হাতে কে*টে টুকরো টুকরো করে ফেলব, তারপরও তোমার মতো অমানুষের কাছে মেয়ে বিয়ে দিবো না! নাও গেট লস্ট!”
তায়েফ সাহেবের এহেন ভয়ংকর হুংকারে আঁতকে উঠল বাড়ির লোকজন। অথচ যার উদ্দেশ্যে এরূপ ভয়ংকর উক্তি বেরুলো সে কেমন নির্বিকার ভঙ্গিতে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে এখনো। ভাব এমন, এ হুংকার যেন কিছুই না তারজন্য। মুগ্ধ নিজের পা-টাও কেমন নাচাচ্ছে অভদ্রের ন্যায়। তার চোখেমুখে নেই বিন্দুমাত্র হেলদোল! তবে ঠোঁটের কোণে স্পষ্ট বিদ্যমান বাঁকা হাসির রেশ। মুগ্ধ ঘাড় কাত করলো সামান্য। সম্মুখেই ফুঁসতে থাকা তায়েফ সাহেবের দিকে কিয়তক্ষন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে পরক্ষণেই পায়ের ওপর থেকে পা নামিয়ে, সটান হয়ে দাঁড়ালো। অতঃপর গম্ভীর পুরুষ প্যান্টের পকেটে দু’হাত গুঁজে ভাবলেশহীন কন্ঠে বললো,
“ তাই সই! আপনার ঐ টুকরো টুকরো করা মেয়েকেই নাহয় নিয়ে যাবো নিজের সাথে করে।”
তায়েফ সাহেবের শুভ্র মুখখানা মুহুর্তেই রক্তবর্ণ ধারণ করেছে যেন।তিনি কেমন সাপের ন্যায় ফুসছেন রীতিমতো। মানুষটা অতিরিক্ত রাগের চোটে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য! তিনি তক্ষুনি মুগ্ধের দিকে তেড়ে এলেন।দাঁতে দাঁত চেপে হাত উঁচিয়ে মুগ্ধের গালে সপাটে এক ঘা বসাতে গেলেই সে হাতখানা চট চেপে ধরে মুগ্ধ। ওদিকে বাড়ির সবাই হতভম্ব। সাব্বির সাহেব তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসেছেন ভাইয়ের নিকট।এদিকে মুগ্ধ নামক সুদর্শন যুবক পরমুহূর্তেই নিজের রং পাল্টালো।মুখাবয়ব থেকে এতক্ষনের ভাবলেশহীন কায়দার মুখোশ সরিয়ে তৎক্ষনাৎ চলে এলো নিজের চিরচেনা ভয়ংকর রুপে। দৃঢ় চোয়ালখানা ব্লেডের ন্যায় ধারালো যেন। সে কেমন দাঁতে দাঁত চেপে সবেগে হাতটা ছুঁড়ে ফেলল তায়েফ সাহেবের। হঠাৎ আক্রমণের তাল সামলাতে না পেরে অদূরের মেঝেতে ছিটঁকে পড়লেন তায়েফ সাহেব।
ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব সকলে। ভাগ্যিস সাব্বির সাহেব পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি তক্ষুনি ছুটে গিয়ে ভাইকে আগলে ধরলেন। মুহুর্তেই লিভিং রুমজুড়ে একপ্রকার হৈ-হুল্লোড় পড়ে গেলো। এদিকে মুগ্ধের চোয়াল শক্ত। অতিরিক্ত রাগের ফলে সুদর্শন যুবকের কপাল এবং ঘাড়ের রগগুলোও কেমন ফুটে উঠেছে আচমকা! বাদামী চোখদুটোয় ছেঁয়ে গেছে এক রক্তাভ আভা! সে এগিয়ে আসে এক-কদম। তায়েফ সাহেবের পানে শক্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে পাশের টি-টেবিলটার গায়ে সজোরে বসায় লাথি।মুহুর্তেই চুর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেলো কাঁচের টেবিলটা! আতঙ্কে জড়সড় সবাই। টেবিলের চূর্ণ একটুকরো গিয়ে আচমকা লাগলো অরিনের ঠোঁটের কোণে। ফলাফল স্বরুপ মেয়েটার ঠোঁটের কোণ কেটে গিয়ে রক্ত পড়ছে অবহেলায়।পাশ থেকে আহি তৎক্ষনাৎ নিজের গায়ের ওড়নার একাংশ চেপে ধরে অরিনের ঠোঁট বরাবর। ওদিকে মুগ্ধ এবার দাঁত কিড়মিড় করছে। শক্ত চোখে তায়েফ সাহেবের দিকে তাকিয়ে থেকে ঝুঁকে দাঁড়াল খানিকটা। হুংকার ছুঁড়ে কটমটিয়ে বলতে লাগলো,
“ ইউ আর লাকি জাস্ট বিকজ অফ চাশমিস ইজ ইউর ডটার। আদারওয়াইজ যে হাত একবার আমার জন্য ওঠে,সে হাত আর দ্বিতীয়বার জায়গায় থাকেনা। হয় সেটা শরীর থেকে আলাদা করে ফেলি নয়তো ভেঙে গুড়িয়ে ফেলি!”
শক্ত মুখে তাকিয়ে আছেন তায়েফ সাহেব। তারচেয়েও দ্বিগুণ শক্ত মুগ্ধের মুখ! চোখের কোণে আগুন লেপ্টে ভীষণ কঠোর গলায় পরমুহূর্তেই বলল,
“ আপনার মেয়েকে আমি নিয়ে যাবোই যাবো।তাও আবার আপনাদের সবার চোখের সামনে দিয়ে।পারলে আমার একটা চুল ছিড়ে দেখান। এন্ড ভুলেও ভাববেন না, আমি আপনার কাছ থেকে অনুমতি চাইছি।উঁহু! ঐসব অনুমতি এন্ড অল দা ফা*কিং ক্রাইটেরিয়া ডাজেন্ট স্যুট অন মি।যেখানে আমি আমার বাপের-ই শুনিনা,সেখানে আপনি কোন ক্ষেতের মূলা? জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ! আপনার সুস্থ মেয়ে আমার সাথে না গেলেও আপনার মেয়ের লা*শ আমার সাথে যাবে,তাও যাবেই! এন্ড মার্ক মাই ওয়ার্ড।”
সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২০
এহেন হুমকিতে কেঁপে ওঠে মাহির ক্ষুদ্র বদনখানি। মেয়েটা তৎক্ষনাৎ সরে গেলো সেখান থেকে। করিডরে আরেকপা বাড়াতেই যাবে তখনি শোনা গেলো মুগ্ধের আরেকদফা হুমকি!
“ আগামী ১৫ দিন পর আমি কোরিয়া ব্যাক করব। ঠিক সেই টাইমে আপনার মেয়ে আমার সাথে যাবে। ও যদি আমার সাথে না যায়, তাহলে কান খুলে রাখুন, এ বাড়িতে অগণিত লাশ পড়বে। পুরো এহসান বাড়িকে আমি ধূলোয় মিশিয়ে ফেলব। কোনো বাপের ব্যাটার কলিজা থাকলে আমায় আঁটকে দেখাক।”
