Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৫

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৫

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৫
রাত্রি মনি

চারদিক নিস্তব্ধ। একটা পিন পড়লেও শব্দ হবে এমন গুমোট স্তব্ধতা। এয়ারপোর্টের সেই প্রাইভেট জোনটা রক্তে স্নান করেছে মাত্র কিছুক্ষণ আগে।
আকাশে ভোরের মলিন আলো, কিন্তু মাটিতে ছায়া শুধু লাশের। যাত্রীরা আগেই ছুটে পালিয়েছে কেউ জুতাও পড়তে পারেনি, কেউ চোখের চশমা রেখেই দৌড়েছে।
এখন, চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে শুধু রক্তাক্ত দেহ… আর পোড়া বারুদের গন্ধ। রক্তে মাখা কংক্রিট যেন ঠান্ডা মৃত্যুর নিচে চাপা পড়ে আছে।

এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে মাত্তেও। গলার নিচ থেকে ঘামের বিন্দু গড়িয়ে পড়ছে শার্টের কলার ভিজে গেছে ততক্ষণে। চোখে তীক্ষ্ণ সতর্কতা, একটুও দৃষ্টি সরাচ্ছে না সে।
অন্যদিকে দেখা যায় দুজন গার্ড ধরে রেখেছে মাঝবয়সী লোকটাকে। তার দু’হাতের বাহু শক্ত করে চেপে ধরা। লোকটার মাথা নিচু, ঘাড় ঝুঁকে আছে। কপাল ফেটে রক্ত জমে আছে ভুরু বরাবর, আর নাক দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে টকটকে লাল স্রোত। তার শ্বাস ভারী, শরীর যেন আর দাঁড়াতে পারছে না, কিন্তু গার্ডদের দৃঢ় গ্রিপে সে এখনও দাঁড়িয়ে আছে।

ওপাশে, কালো এসইউভির পাশে দাঁড়িয়ে ইয়াশ আর এলেনা। কিছুক্ষণ আগেই গাড়িতে চেপে পৌঁছেছে তারা। গাড়ির ইঞ্জিনের গরম বাতাস তখনও বাতাসে মিশে আছে। কিন্তু চারপাশে ছড়িয়ে থাকা লাশের স্তূপ, ভাঙা কাঁচ, ধোঁয়া আর থমথমে নিস্তব্ধতা দেখে ওরা বুঝে গেছে তারা এক ধ্বংসস্তূপের মাঝে এসে পৌঁছেছে।
তাদের ঠোঁট সিল করে রাখা, কেউ একটা শব্দও করেনি। কারণ, এই মুহূর্তে নিঃশব্দ থাকাটাই সবচেয়ে নিরাপদ। কারণ, এখানে যেটুকু শান্তি আছে, সেটা আসলে ঝড়ের পর শকুনের অপেক্ষা।
আরেকদিকে, রিশাব শক্ত করে ধরে আছে রিমের হাত। মেয়েটার মুখ রক্তশূন্য, ঠোঁট কেঁপে উঠছে বারবার। চারপাশের রক্তের গন্ধে মাথা ঘুরছে তার, চোখের সামনে অন্ধকার দোল খাচ্ছে। পা দুটো যেন মাটিতে ভরসা হারিয়েছে এক মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে যেতে পারে সে। তবুও দাঁড়িয়ে আছে। বুক ভরে নিশ্বাস নিচ্ছে একবার, আবার ছাড়ছে। নিজেকে শক্ত করে রেখেছে জোর করে। কারণ, আজ আর জ্ঞান হারালে চলবে না। আজ ভেঙে পড়া মানে হেরে যাওয়া।

এই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু যে, মাঝখানে পোড়া ছাইয়ের মতো চুপচাপ বসে আছে জেইন।মাটিতে এক পা ছড়িয়ে অন্য পা ভাঁজ করে বসে আছে।এক হাত অলসভাবে ঝুলে আছে হাঁটুর ওপরে। অন্য হাতে কপালের একটা পয়েন্ট থেকে অন্য পয়েন্টে স্লাইড করছে। কিন্তু সেই স্লাইডের নিচে কি আছে কেউ জানে না। তার মাথা নিচু, কিন্তু ভিতরের আগুন পুরো শহরটা পুড়িয়ে দিতে প্রস্তুত।
নৈঃশব্দ্যের বুক চিরে হঠাৎ ভেসে আসে এক গলা
ভারী, ঠান্ডা, রক্ত জমাট বাঁধানো গলা।
“মাত্তেও…..”
তারপর এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস।

“তিয়াত্তুর ঘণ্টা!!”
আশপাশটা স্তব্ধ। শুধু সেই কণ্ঠস্বরেই যেন দম বন্ধ করে আছে আকাশ-বাতাস।
“মানে কত জানিস?
“চার হাজার… তিনশো… আশি মিনিট!”
“মিনস দুই লক্ষ… বাষট্টি হাজার… আটশো সেকেন্ড!”
সে থামে এক মুহূর্ত। কণ্ঠ যেন কাঁপছে, অথচ ভয়ানকভাবে স্থির।
“এই প্রতিটা সেকেন্ড… প্রতিটা সেকেন্ড মরেছি আমি।
শ্বাস নেওয়াটাও torture ছিল। ফুসফুস ছিঁড়ে নিচ্ছিল আমার নিঃশ্বাস… I was Fu*cking whole time bleeding inside.”
তার চোখ যায় রিম আর রিশাবের দিকে যেখানে রিশাব শক্ত করে ধরে আছে রিমের হাত। চোখে লাল রক্তের হিংস্র ঝিলিক।

“ছ্যাহ! এই ছিল জীবন? দেখ, কিভাবে হাত ধরে রেখেছে! আমার ভেতরটা জ্বলছে……”
হঠাৎ সে নিজের চুল এক হাতে টেনে ধরে পাগলের মতো।
“এইটাকে কি jealousy বলে, বল না! Am I jealous? উফ্… নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে আমার… ভেতরে কিছু একটা দাউদাউ করে পুড়ছে। ছাড়তে বল! ছাড়তে বল ওই গুঁইসাপটাকে!”
হঠাৎ সে ফেটে চিৎকার করে ওঠে
“ছাড়তে বল হারামির বাচ্চা!!!!!”
তার সেই হিংস্র আর্তনাদে যেন কেঁপে ওঠে চারপাশের বাতাস। নিস্তব্ধতা যেন হঠাৎ মৃত্যুর মতো থমকে যায়।
“এই কুত্তার বাচ্চা, বুচ্ছিস না তুই? আমার কষ্ট হচ্ছে! আমি কিন্তু… আমি কিন্তু মেরে ফেলবো!”
মাত্তেও গলা শুকিয়ে ঢোক গিলে। তার হাতে ঘাম জমে।
অন্যদিকে, রিশাব দাঁতে দাঁত চেপে রিমকে আরও শক্ত করে ধরে রাখে, চোখে আগুন।

“দেখুন….”
তার গলা শান্ত, কিন্তু কণ্ঠে পাথরের মতো ওজন,
“ও আর আপনার সঙ্গে থাকতে চায় না। আমাদের যেতে দিন ‌। এভাবে কাউকে জোর করে আটকে রাখা যায় না। You have no rights.”
হঠাৎ জেইন উঠে দাঁড়ায়। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই তুফানের মতো এসে সোজা এক ঘুসি বসিয়ে দেয় রিশাবের নাক বরাবর। হাড় ভাঙার শব্দ হয়, নাকে ছিটকে পড়ে রক্ত,
“Rights huh….আমাকে জ্ঞান দিতে এসেছিস? You fu*cking di*ck . She is mine. She belongs to me. ও চাক বা না চাক ওকে আমার সাথেই থাকতে হবে।”
রিশাবের মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। চারপাশ ঝাপসা হয়ে যায়, দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য অন্ধকারে ডুবে যায়।
সামলে ওঠার আগেই জেইন আবার হাত তোলে আঘাতের জন্য, কিন্তু তখনই রিম ছুটে এসে ওর সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। দুই হাত জোড় করে, কাঁদতে কাঁদতে কাতর গলায় বলে,
“ওনাকে মারবেন না প্লিজ। ওনার কোনো দোষ নেই। আমি পালিয়েছি তো আপনার যা শাস্তি দেওয়ার আমাকে দিন। ওনাকে ছেড়ে দিন… প্লিজ!”

জেইনের চোখজোড়া এখন দাবানল। সে ঠান্ডা অথচ বিষাক্ত কণ্ঠে রিমের গলা চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বলে,
“শাস্তি তো তুমিও পাবে, সোনা। তবে আঘাত করে একেবারে শেষ করে ফেলবো না তোমাকে। কী বলোতো তো? তোমাকে আঘাত করলে তার প্রতিটা চিন্থ এসে লাগে আমার গায়ে। বুকে জ্বলে ওঠে।যন্ত্রনায় ছটফট করি আমি। কিন্তু তাই বলে এতটা সহজ রেহাই পেতে দিব না তোমাকে।‌তোমার শরীরটাকে ধীরে ধীরে ভাঙবো আমি…প্রতিদিন, একটু একটু করে। প্রতিটা কোষ, প্রতিটা শ্বাসে ঢুকিয়ে দেবো আমার ছায়া… যতক্ষণ না তুমি নিজেই আয়নায় তাকিয়ে চিৎকার করে উঠো। তোমার শরীরটাকে এমনভাবে গড়ে তুলবো যেটা তুমি নিজেই চিনতে পারবে না। তোমার চোখে তখন ভয় থাকবে, নিজের দেহ দেখেও আতঙ্ক ছড়াবে… তোমার সুন্দর শরীরটাই হবে তোমার শাস্তি…..।

কিন্তু তার আগে এই গুইসাপকে শাস্তি পেতে হবে। ওর সাহস কিভাবে হলো আমার জিনিসে হাত দেওয়ার। যেখানে তোমার পাশে দাঁড়িয়ে কেউ নিঃশ্বাস নিলেও সহ্য করতে পারি না আমি। সেখানে ও তো তোমাকে ছুঁয়েছে তাহলে বুঝতে পারছো, কি পরিমান যন্ত্রনায় ছটফট করেছি আমি।”
রিম অসহায় গলায় কান্নায় ভেঙে পড়ে,
“আমি তো বলছি আর পালাবো না। প্লিজ ওনাকে ছেড়ে দিন। যা শাস্তি দেয়ার আমাকে দিন।”
জেইন তার গলাটা আরও একটু জোরে চেপে ফিসফিস করে ওঠে,

“কাঁদবে না বলছি, একদম না। তুমি আমার সাথে হাইড অ্যান্ড সিক খেলতে চেয়েছিলে, তাই না? আমি কি বাধা দিয়েছি? না তো! তুমি খেলতে চাইলে খেলবে…আমার সাথে যা ইচ্ছে করবে। তুমি কি ভেবেছিলে… তুমি সত্যিই প্রতিবার আমার চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছো? উহুম, তোমাকে আমি ইচ্ছে করেই সুযোগ দিয়েছি প্রত্যেকবার just to see how far my little wildcat can run. তুমি হাউজের বাইরে একটা পা রাখলেই… সেই মুহূর্তে আমার ফোনে নোটিফিকেশন আসে।
তবুও ছাড় দিয়েছি। কারণ তোমার সাথে লুকোচুরি খেলতে, ছোট্ট এই দৌড়গুলো দেখতে আমার ভালো লাগে। And honestly, I was proud of you. But—but—but… এইবার তুমি একটু বেশিই চালাকির চেষ্টা করলে না? এইবার তুমি লুকালে… ওর কাছে? এই গুঁইসাপের পাশে গিয়ে দাঁড়ালে? ওর ছায়ায় নিজেকে আড়াল করো তুমি?
উফ্, এটাই না ঠিক করোনি তুমি। এইখানে তুমি আমার শিকল ছিঁড়ে একটু বেশিই দূরে গিয়েছো। তোমার গায়ে অন্য কারো নিরাপত্তার গন্ধ আমি সহ্য করি না। So now, দ্যাখো তোমার প্রিয় গুঁইসাপটার জন্য কেমন শাস্তি বরাদ্দ হচ্ছে।”

সে আবার বাঘের মত রিশাবের দিকে তেড়ে যায়, ঘুসি তোলেই, কিন্তু রিম এবার ওর পায়ে পড়ে যায়। দুহাতে আঁকড়ে ধরে ওর উরু, কাঁদতে কাঁদতে অনুনয় করে,
“ওনাকে ছেড়ে দিন প্লিজ! ওনাকে মারবেন না! আমি আর পালাবো না, কক্ষনো না! আমি আপনার সব কথা শুনব, সব করবো। প্লিজ… প্লিজ, ওনাকে ছেড়ে দিন!”
জেইন থেমে যায়। রিমের চুলের মুঠি ধরে টেনে তুলে আনে নিজের মুখোমুখি। চোখে চোখ রেখে গর্জে ওঠে,
“এই কাঁদতে মানা করেছি না? তুই কাঁদছিস কেন হ্যাঁ? ঐ গুঁইসাপটার জন্য? মঞ্চে দাঁড়িয়ে কখনো পাগলা কুত্তা আবার কখনো উদাস বাউলের মতো গলা ফাটায়! তার জন্য এত মায়া তোর? কই, আমার জন্য তো কখনো কষ্ট পেতে দেখলাম না তোকে! আমি প্রতিটা সেকেন্ডে মরেছি তোর জন্য!দেখিসনি? বুঝিসনি? আমি ভেতরে ভেতরে পুড়ছি, দাউদাউ করে! চোখে পড়ে না তোর?”

তারপর হঠাৎ রিমের গাল চেপে ধরে জেইন গর্জন করে ওঠে,
“অ্যাই বলল!!!!!! কাঁদছিস কেন হ্যাঁ? চোখের জল মোছ! মোছ!!! অন্য কারো জন্য এই মূল্যবান চোখের পানি ফেললে তোকে সোজা স্বর্গে পাঠাবো আমি । আর ঐ গুঁইসাপটা? ও তো সোজা নরকে যাবে, আমার গ্যারান্টি।”
রিম ভয়ে, আতঙ্কে, ফোপাতে ফোপাতে চোখের জল মুছে বলে,
“এই যে… এএএই দেখুন কাঁদছি না আমি। কাঁদবো না আর কখনো। আপনার অনুমতি ছাড়া আর একফোঁটা জলও পড়বে না আমার চোখ থেকে। প্লিজ, ওনাকে ছেড়ে দিন…”
জেইনের চোখ রক্তিম হয়ে ওঠে। সে ধীরে ধীরে বলে,

“ওর জন্য এত মায়া? তাহলে বুঝ, আমি কেমন জ্বালায় পুড়েছি! ওর মধ্যে কী আছে হ্যাঁ, যা আমার মধ্যে নেই? কী যাদু করেছে তোকে? এক রাতেই কী এমন সুখ দিয়ে ফেলেছে সে? আমি পারতাম না দিতে? শরীরে এত জ্বালা? আমি মেটাতে পারতাম না হ্যাঁ? তাহলে ওর কাছে গেলি কেন? বল!”
এইবার আর থেমে থাকে না রিম। জোড়ালো এক চড় বসিয়ে দেয় জেইনের গালে। মুখে ছুড়ে দেয় একদলা থুথু।
“জানোয়ার! তুই একটা জানোয়ার! রাস্তার কুত্তার চেয়েও নীচ! তোকে ঘৃণা করি আমি। তোর মতো মানুষ থাকলে জাহান্নামের দরকারই নেই।”

জেইনের বলা কথাগুলো যেন রিমের শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। আত্মসম্মানে আঘাত করায় শরীর থরথর কাঁপছে।সে ওর বুক লক্ষ্য করে ঘুষি ছুঁড়তে থাকে, বারবার কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে ওঠে,
“আই হেইট ইউ! আই হেইট ইউ! আই হেইট ইউ!!!”
শেষে ভেঙে পড়ে মাটিতে। হাঁটু জড়িয়ে কাঁপতে থাকে।
জেইন ধীরে ধীরে নেমে আসে তার কাছে, গালের থুতুটা না মুছেই বলে,
“ঘৃণা কর… কর যত পারিস। কিন্তু আমাকে ঘৃণা করে মুক্তি পাবি ভাবিস না। তুই আমার। তুই আমারই থাকবি।”
সে হাত ইশারায় গার্ডদের ডাক দেয়। গার্ডরা সামনে এসে রিশাবকে টেনে নিয়ে যায়, শুরু হয় নির্মম প্রহার। একেকটা ঘুষি, একেকটা লাথি… রিশাবের নাক মুখ ছিটকে রক্ত ঝরতে থাকে। আর রিম পাগলের মতো ছটফট করতে থাকে।

“থামাও ওদের! থামতে বল ওদের! আমি কিন্তু… আমি কিন্তু…”
হঠাৎই তার দৃষ্টি যায় জেইনের পাশে পড়ে থাকা বন্দুকটার দিকে। আর দেরি করে না, ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে সরাসরি তাক করে জেইনের বুক বরাবর।
“আমি কিন্তু মেরে ফেলবো! থামা ওদের!!”
জেইনের ঠোঁটে চেনা সেই বিকৃত হাসি। ঠোঁট কামড়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
“বাচ্চাদের হাতে খেলনা মানায়। এটা না।”
সে এগিয়ে এসে বন্দুকটা এক টানে ছিনিয়ে নিয়ে রিমকে জড়িয়ে ফেলে বুকের সাথে। ঠোঁট কানের কাছে নিয়ে বলে,
“King-এর Queen হয়েও এতটুকু জানো না?

কিভাবে বন্দুক চালাতে হয়! উফ্… unacceptable.
চলো, বাড়ি ফিরে… তোমাকে শেখাতে হবে সবকিছু, ধীরে ধীরে… ছুঁয়ে ছুঁয়ে…কিভাবে টার্গেট ঠিক করতে হয়…কিভাবে ট্রিগারে আঙুল রাখতে হয়…আর কিভাবে ছেড়ে দিতে হয়… একেবারে নিখুঁত এক ঘূর্ণিতে। তবে না, এসব সবাইকে দেখিয়ে শেখানো যায় না। এগুলো একান্ত… ব্যক্তিগত… শুধু আমাদের দু’জনের খেলা।
রুমে… দরজা বন্ধ করে… ওকে সোনা?”
তারপর আবার গার্ডদের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,
“এই… থেমে আছিস কেন? শেষ করে দে ওটাকে।”
রিম ওর বুকের শার্ট আঁকড়ে ধরে কাঁপতে কাঁপতে অনুনয় করে ওঠে
“না,না… না প্লিজ!”

জেইন তার কানের কাছে ঠোঁট ঘেঁষে গাঢ় হুইস্কির কন্ঠে ফিসফিস করে ওঠে,
“উফ্ কতবার বলবো কাঁদবে না। কাদার খুব শখ না? একবার রুমে চলো তারপর তোমাকে বোঝাবো,কতটা ব্যথা নিলে কতটা গভীরে গেলে সত্যি কান্না আসে… সব শেখাবো সোনা। তবে এখন না, এখন আমাকে চুপচাপ আমার কাজ করতে দাও। ওকে কিউটি পাই? এই শুরু কর তোরা।”
আতঙ্কে জমে যায় রিমের শরীরটা। কান্নার তোরে বুকটা কেঁপে উঠছে বারবার। সে চোখের জল মুছে, হিচকি টেনে টেনে বলে,

“আর কাঁদবো না আমি। পালাবোও না। আমি করবো সব! আপনি যা বলবেন সব শুনবো… প্লিজ ছেড়ে দিন ওনাকে! কক্ষনো আপনার কথার অবাধ্য হব না।”
জেইন প্রথমে তাকে ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে দেখে। তারপর এক ভ্রু নাড়িয়ে বলে,
“ভেবে বলছো তো? আমি যা বলবো সব করবে?”
রিমের ভেতরটা যেন হিম শীতল হয়ে যায়। বুকটা হেঁচকে ওঠে ভয়ে। সে শুষ্ক গলায় ফিসফিস করে,
“হ্যাঁ…আ.. আপনি যা বলবেন তাই করবো।”
সে ভেঙে পড়ে মেঝেতে, মাথা নিচু করে বসে পড়ে যেন আত্মসমর্পণ করেও শান্তি পাচ্ছে না। জেইন এবার গার্ডদের দিকে তাকিয়ে হালকা মাথা নাড়ে।
“ব্যাস। আজকের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট। ওটাকে গাড়িতে তোল।”

জেইন মাটিতে নামামাত্রই যেন তার ছায়াও মৃত্যু টেনে আনে। তার ইউনিট ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। স্নাইপার পজিশনে দুজন, বাকিরা অর্ধবৃত্তে ঘিরে ফেলে অপরিচিত SUV গুলোকে। শুধু একবার ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
“Execute.”
তার নির্দেশের এক সেকেন্ডের মধ্যেই….
TCHAK-TCHAK-TCHAK!!
সাইলেন্সড রাইফেল থেকে বেরিয়ে আসে একের পর এক গুলি। একজন, দুইজন, তিনজন…গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সশস্ত্র লোকগুলো একে একে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে। রিমকে যারা ধরে রেখেছিল, তাদের কাঁধে আর ঘাড়ে গুলি ঢুকে যায় এমনভাবে যেন রিমের এক চুলও ক্ষতি না হয়। একজন গার্ড রিমকে টেনে গাড়িতে তুলতে যাচ্ছিল জেইন চোখ তুলে তাকায়। তার আঙুল ট্রিগারে… “Bang.”

এক নিঃশব্দ শট। মাথা ফেটে ছিটকে পড়ে লোকটা।
রিমের গায়ে উষ্ণ রক্তের ছিটে। সে চুপ নিঃশব্দে, ছোট ছোট কাঁপন বেয়ে যাচ্ছে তার গোটা শরীরে। রিশাব উঠে এসে শক্ত করে আকড়ে ধরে তার হাত।
অন্যদিকে সেই মধ্যবয়সী লোক থরথর করে পিছিয়ে যায় কয়েক কদম। তার মুখ ফ্যাকাশে, ঠোঁট শুকিয়ে এসেছে।
“A-AJ…আমি ওকে তোর কাছেই…. আমি তো….’
জেইনের চোখদুটি এখন নরকের আগুন। তার গলা বরফ ঠান্ডা, নিখুঁত নিয়ন্ত্রিত রাগে মোড়া।
“আন-তো-নিও। I hate liars. Swindlers. Hypocrites. কি ভেবেছিস তুই মিথ্যে বলবি আর আমি বিশ্বাস করবো Fu*CK of. ভুল করেছিস। আর ভুলের দাম দিতে হয় রক্তে।”
সে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে আসে। আন্তোনিও হোঁচট খেয়ে হাঁটু গেড়ে পড়ে যায়। জেইনের ছায়া তার মুখের উপর পড়ছে ঠিক যেন শ্মশান ছায়া।

“দয়া কর AJ… আমি তো শুধু… আমি….”
ঠাস্!! জেইন ঠাণ্ডা মুখে বন্দুকটা উল্টো ঘুরিয়ে তার নাকের ঠিক মাঝখানে সজোরে বসিয়ে দেয়। একটা ভাঙার শব্দ যেন হাড়ের সঙ্গে আত্মাও চূর্ণ হয়ে গেল।
জেইন মাথা কাত করে দেখে।
“আমার Firefly এর শরীরে হাত দিবি আর ভাবছিস বেঁচে যাবি!”
সে আবার আঘাত করে, এবার চোখে। তারপর গালে, কপালে, চোয়ালে। একটার পর একটা বিভৎস শট, যেন প্রতিটা আঘাতে সে গিলে নিচ্ছে তারই রাগ। আন্তোনিওর মুখ চেনার অযোগ্য হয়ে যায়। চোখের নিচে পাঁজরের মতো ফেটে গেছে চামড়া, কপালের পাশ দিয়ে গাঢ় রক্ত ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ছে ঘন, কালচে, জমাট রক্ত। জেইন থামে না। কারণ তার রাগ কমছে না।

“তোকে এত সহজে মারবো না। মৃত্যু হবে না তোর। তুই মরতে চাইলেও মৃত্যু তোকে স্পর্শ করবে না। তুই ঘামে, রক্তে, আর নিজের চিৎকারে পঁচে যাবি। And when you’re nothing but a crawling piece of flesh… তখন আমি তোর শেষ শ্বাসটাও কেড়ে নেব।
Only then.”
সে হঠাৎ থেমে যায়। রক্তে ভিজে যাওয়া আঙুলে শ্বাস নিতে নিতে একটা নিঃসীম ক্লান্তি নিয়ে বসে পড়ে মাটির মধ্যে ঘাসের ওপর। দুজন গার্ড এসে বাহু ধরে দাঁড়ায় আন্তোনিওকে।
ঠিক তখন, একটা Black Mercedes এসে দাঁড়ায় এয়ারপোর্টের মৃতপ্রান্তে। গাড়ির দরজা খুলে ইয়াশ আর এলেনা বেরিয়ে আসে। তারা চারপাশ দেখে থমকে যায়। লাশ। রক্ত। ভাঙা দেহ। পোড়া গন্ধ।

জেইন রিমের ছোট্ট দেহটা তুলে নেয় নিজের কাঁধে। সে হাতে ইশারা করা মাত্রই কয়েকজন গার্ড মিলে আন্তোনিও আর রিশাবের আহত দেহটা গাড়িতে তুলে। জেইন হেলিকপ্টারে লাফিয়ে ওঠে পড়ে। সিটে হেলান দিয়ে বসে রিম’কে নিজের উরুর উপর কোলে বসিয়ে রাখে। ঘৃণায় শিরশির করে কেঁপে কেঁপে উঠছে রিমের ছোট্ট শরীরটা।
জেইন সিটে মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে দেয়। তার এক হাত ধীরে ধীরে ঢুকে যায় রিমের শার্টের নিচে। মসৃণ পেটের ভেতর চাপ ফেলে ঢাক্কা দেয় নিজের দিকে। ঠান্ডা হাতের স্পর্শে রিমের শরীরে শিরশিরানি অনুভূত হয়। পায়ের পাতায় কম্পন সৃষ্টি হয়। তার শ্বাস প্রশ্বাস ভারী হয়ে আসে। এই লোকের কাছে এলেই হার্টবিট অসহ্যভাবে বেড়ে যায় তার । সে নিজের দম বন্ধ করে রাখে যেন জানোয়ারটা তার হৃদস্পন্দন শুনতে না পায়। জেইন তাকে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে।

“নিঃশ্বাস ছাড়ো।”
জেইনের গলা গভীর, ভারী, নরম রুক্ষতায় মোড়া।
“নইলে দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে। তোমাকে তো এত সহজে মরতে দিতে পারি না। এখনো শাস্তি পাওয়া বাকি। আর, এতো কাপাকাপি করছো কেন? আমি কি এখনো কাঁপাকাঁপির মতো কিছু করেছি?”
রাগে রিমের দাঁত কিরমির করে ওঠে। সে নিজের বড়বড় নখগুলো দিয়ে আঁচড় কাটে জেইনের প্রশস্ত বুকে। জেইন বুক ফুলিয়ে শ্বাস টেনে নেয়।

“দেখো এখন নেগেটিভ ফিল, একদম দিবে না। এখনো বিয়ে হয়নি। বিয়ের আগে এসব করতে পারবো না আমি। এমনিতেই কোলে বসে অনেক কিছু ভিজিয়ে দিচ্ছ। ছোটাভিম কিন্তু নিয়ন্ত্রণে নেই। যেকোনো কিছুই হতে পারে। তাই চুপচাপ বসে থাকো। একটু শান্তি চাই আমি। অনেক দৌড় ঝাঁপ করিয়েছ তিনদিন। দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি একটুও। তোমার সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে ক্লান্ত। তোমাকে বুকে জড়িয়ে একটু ঘুমাতে চাই। একদম নড়াচড়া করবে না। নয়তো বিয়ের আগেই বাসর সেরে ফেলব।”

রিম ছটফট করে না,শান্ত হয়ে যায়। কেন জানি আজ আর লোকটা’কে জ্বালাতে ইচ্ছে করছে না। সেও এই তিনদিন ঘুমাতে পারে নি। শরীরটাও ভেঙে পড়েছে , এই কয়দিন দৌড় ঝাঁপ, খাওয়া হয়নি ঠিক মতো। তার চোখে ঘুম টেনে আসে। একসময় ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় দুচোখের পাতা। জেইনের শরীরের ঘ্রাণ তার উষ্ণ আশ্রয়ে ঘুমটা যেন আরামের হচ্ছে তার। তার শ্বাস প্রশ্বাস ভারী হতেই চোখ খুলে তাকায় জেইন বুঝতে পারে মেয়েটা গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। সে তাকে আরও একটু নিজের সাথে মিশিয়ে দুহাতে জড়িয়ে ধরে ছোট্ট শরীরটা। যেন হারিয়ে না যায়। কপালে এঁকে দেয় দীর্ঘ এক ভেজা চুম্বন। শুষ্ক একটা ঢোক গিলে আঠালো গলায় বিড়বিড় করে বলে,
“কই ভাবলাম আমি একটু শান্তি মতো ঘুমাবো! নাহ, এ মহারানী দেখি আমার ঘুম হারাম করে নিজেই কি সুন্দর আরামে ঘুমাচ্ছে। উফফ্ তুমি কি আমাকে সারাজীবন এভাবেই পোড়াতে চাও? এই নিয়ন্ত্রণ যে বড্ড যন্ত্রণার। কবে বুঝবে তুমি আমায় বলোতো?”

এভাবে দেখতে দেখতে ঘন্টা খানিক সময় পেরোয়। রিম এখনো গভীর ঘুমে। তার শ্বাস প্রশ্বাস জেইনের ইস্পাতের মতো শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে। সে শক্ত করে কামড়ে রাখে নিজের কনিষ্ঠা আঙ্গুল। তখনি মাত্তেও হেলিকপ্টারের দরজায় এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,
“ভাই সব রেডি। নিয়ে এসেছি আপনি যেমনটা বলেছিলেন।’
মুহূর্তেই জেইনের চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করে। সে ঠোঁটে আঙুল রেখে সতর্ক ভাবে বলে,
“Shhhh….. আস্তে Don’t make a sound. দেখতে পাচ্ছিস না ও ঘুমাচ্ছে!”
মাত্তেও মুখে আঙুল দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,

“ওকে ভাই। কিন্তু কাজটা কখন হবে! আমার যে আর তর সইছে না।”
জেইন ভ্রু কুঁচকে বলে,
“What?”
মাত্তেও শুষ্ক ঢোক গিলে বলে,
“না মানে বলছিলাম কি, ওই আর কি উনি তো অপেক্ষা করছে।”
জেইন রিমের গালে আলতো স্পর্শ করে,
“করুক ওর যখন ঘুম ভাঙবে তখনি কাজ শুরু হবে। নয়তো না। তুই যা এখন। আমার প্রাইভেসি লাগবে।”
মাত্তেও আর কথা না বলে চুপচাপ চলে আসে। তার মুখে একটা চাপা হাসি। এই দৃশ্যটাই সে দেখতে চেয়েছিল। সে চায় তার ভাই খুশি থাকুক। আর সেই একমাত্র খুশির নাম রিম। এই তিনদিন ভাইয়ের পাগলামি দেখে সে এতটুকু বুঝে গেছে রিম কোনো সাধারণ মেয়ে না তার ভাইয়ের নিঃশ্বাস, তার সত্তা, ‘প্রাণ সঞ্জীবনী’ তার। তার আত্মার বসবাস ঐ একটা মেয়ের মাঝেই।

সন্ধ্যার আকাশে বেগুনি আর কমলার মিশ্র ছায়া, মেঘগুলো যেন রঙ তুলিতে আঁকা। এয়ারপোর্টের চারপাশে কাঁচের দেয়ালে ছড়িয়ে পড়েছে সোনালি আলোর ছটা। হালকা ঠান্ডা বাতাস, নিঃশব্দ রাস্তা আর একটুকরো থমকে থাকা সময় সব মিলিয়ে এক নিঃশব্দ মায়া।
আড়মোড়া ভাঙতেই রিমের নাকে এসে লাগে একধরনের গভীর, ঝাঁঝালো পুরুষালি ঘ্রাণ। চেনা, কিন্তু অস্বস্তিকর রকমের চেনা। সে অবচেতনেই বুক ভরে শ্বাস নিয়ে ঘ্রাণ টা টেনে নেয়। আরও একটু গুটিয়ে নেয় নিজেকে। পাশে থাকা কোলবালিশটা আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। যেন নিজের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলবে। কিন্তু কোলবালিশটা আজ একটু বেশিই বড় আর শক্ত মনে হচ্ছে। ভ্রু জোড়া কুঁচকে যায় তার। ঘুমের জন্য শ্বাস ফুস ফুস করছে। চোখ টেনে খোলা দায়। সে হাতের তালু দিয়ে মুছে নেয় ঠোঁটের কোনায় গড়িয়ে পড়া লালা টুকু।
তখনি তার কানে ভেসে আসে একটা রুক্ষ নরম গাঢ় হুইস্কির কন্ঠ,

“ঘুম হয়েছে সোনা?”
জেইন তার মুখের সামনে এলোমেলোভাবে পড়ে থাকা চুলগুলো কানে গুজে দেয়।রিম তার বুকে নাক ঘেঁষে ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলে,
“উমম্।”
একটা মুহূর্ত নীরব। তবু শরীর টের পায় কিছু একটা অস্বাভাবিক। তারপর হঠাৎ চোখ দুটো ধড়াস করে খুলে যায়! সে চমকে ওঠে, ছিটকে পড়ে একপাশে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে মুহূর্তের জন্য। এতক্ষণ কোলবালিশ ভেবে যাকে জরিয়ে ধরেছিল সেটা আসলে সেই মনস্টারটা! সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সে মনস্টারটা’র কোলেই ঘুমিয়ে ছিল। তীব্র লজ্জায় তার গাল দুটো লাল টমেটোর মতো হয়ে ওঠে। মাথা নিচু করে ফেলে। তাকাতে পারছে না। বুক ধড়ফড় করছে।

তারপর…
“গুড়গুড়… গুড়গুড়…”
তার পেট থেকে ভেসে আসে ক্ষুধার শব্দ।
সে লজ্জায় চোখ বড়বড় তাকায় জেইনের দিকে। জেইন ঘোর লাগা চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকেই। তার চোখে একপ্রকার মাদকতা। যেন রিমকে ছেড়ে কোথাও তাকাতে পারছে না। সে রিমের গালে আলতো হাত রেখে নরম সুরে বলে,

“খিদে পেয়েছে সোনা?’
লজ্জায় নুইয়ে যায় রিম। জেইন হাত বাড়িয়ে পেছনের সিট থেকে তুলে আনে একটা খাবারের প্যাকেট আর জুসের বোতল। সে মাত্তেওকে দিয়ে আগেই আনিয়ে রেখেছিল সব। সে প্যাকেটটা খুলে একটা ছোট্ট বাটিতে ঢেলে নেয় কিছু ওটস, নাটস আর দুধ। হালকা নেড়ে এক চামচ তুলে রিমের মুখের সামনে ধরে।
রিম নাক সিঁটকে ওঠে, চোখ মুখ কুঁচকে বলে,
“খাবো না এসব।”
জেইন একদম ঠান্ডা কিন্তু দৃঢ় গলায় বলে,
“এখন থেকে এগুলোই খেতে হবে তোমায়। নয়তো শরীরে এনার্জি পাবে না। তোমাকে নিয়ে বড্ড চিন্তায় আছি আমি। হা করো তারাতাড়ি। আমি চাই না তুমি আবার দূর্বল হয়ে পড়ো।”
রিম চোখ ছোট করে তাকায়, বিরক্ত হয়ে বলে,

“খাবো না বলালাম তো।”
জেইন তার নাক টেনে বলে,
“এটা ছাড়া এখন খাবারের আর কিছুই নেই। আমি জানি তোমার খিদে পেয়েছে। তাই চুপচাপ এটাই খেয়ে নাও। বাড়ি ফিরে যা খেতে চাইবে তাই খাওয়াবো।”
রিম সত্যিই খুব ক্ষুধার্ত। একটু হোঁচট খেলেও শেষমেশ চুপচাপ অনিচ্ছাসত্ত্বেও মুখ খুলে নেয় খাবারটা। জেইন নীরবে এক চামচ এক চামচ করে খাইয়ে যাচ্ছে রিমকে। তখনি সেখানে হাজির হয় মাত্তেও। তার সাথে ফাইল হাতে একজন লইয়ার আর একজন মধ্যবয়স্ক টুপি পাঞ্জাবি পরা লোক। তারা ভেতরে আসতেই হেলিকপ্টারের দরজা বন্ধ হয়ে যায়।
পাইলট হেলিকপ্টার স্টার্ট করতেই হঠাৎ নিস্তব্ধ আকাশ কেঁপে ওঠে। হেলিকপ্টারের ব্লেড ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করে প্রথমে একটা ভারী গুঞ্জন, তারপর ক্রমশ বাড়তে থাকা গর্জন যেন বাতাস চিরে ছুটে আসছে কিছু। চারপাশের বাতাস চুল আর কাপড় উড়িয়ে দিয়ে এক অদৃশ্য ঝড় তোলে। আলো ঝাপসা হয়ে যায়, কাঁচ কেঁপে ওঠে আর সেই শব্দ… যেন আকাশ ফাটানোর ঘোষণা।
রিমকে কোল নিয়েই হঠাৎ জেইনের গলা ধীরে, গভীর স্বরে ফাটে,

“বিয়ে পড়ানো শুরু করুন।”
রিম এক ঝটকায় মাথা তোলে, চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়।
“কি… কি বললেন আপনি? বিয়ে মানেহ্!… কার বিয়ে?”
জেইনের ঠোঁটে একটুকরো নির্মম হাসি, নির্বিকার কণ্ঠে সে বলে
“আমাদের।”
রিম কেঁপে ওঠে।
“না! কিছুতেই না। আমি করবো না! আমি আপনাকে বিয়ে করবো না!”
জেইনের ঠান্ডা চোখে আগুন জ্বলে ওঠে।
“তুমি সম্ভবত সকালের কথা ভুলে গেছো। তুমি নিজেই বলেছিলে, আমি যা বলবো তুমি তাই করবে।”
এই কথা শুনে রিমের বুক ধক করে ওঠে। হঠাৎই রিশাবের কথা মনে পড়ে যায় তার। আতঙ্কে তার গলা কেঁপে ওঠে।
“রিশাব কোথায়?”

জেইনের চোখে এখন ঘূর্ণিঝড়।
“এই নামটা আর একবার আমার সামনে উচ্চারণ করবে না বলে দিলাম। ও যেখানেই আছে, ভালো আছে। চুপচাপ লক্ষ্মী মেয়ের মতো বিয়েটা করে নাও। আমাকে আর রাগিও না। এমনিতেই অনেক রাগ জমে আছে তোমার ওপর।”
রিম হাল ছাড়ে না। কণ্ঠে কেঁপে কেঁপে উঠে তার দরদভরা জেদ
“না! আগে বলুন রিশাব কোথায়? ওনি তো আহত! ওনাকে হসপিটালে নিতে হবে। প্লিজ…”
এক মুহূর্তেই জেইনের রাগ ধূমায়িত আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। সে ঝাঁপিয়ে পড়ে রিমের গলা চেপে ধরে।
“এই বলেছি না! এই নামটা মুখে নিবি না আর। ওর জন্য এত দরদ? আর একবার বললে জানে মেরে দেব তাকে। চুপচাপ আমি যা বলছি তাই কর।”

রিম ফুসে ওঠে। আর সহ্য হয় না তার। সে দুহাতে জেইনের চুল মুঠো করে ধরে জোরে টেনে বলে
“না! কক্ষনো না। করবো না আমি তোকে বিয়ে! মরে গেলেও না! তুই একটা জানোয়ার!!!!”
জেইনের ঠোঁটে খেলে যায় এক শয়তানি হাসি।
“তোমাকে মরতে হবে না সোনা। তোমার মা আর বোন আছে না… কী করতে হবে বুঝে নিই?”
এই বাক্যে রিমের বুক থেমে যায়। সে মুহূর্তে কাঁপতে কাঁপতে জেইনের বুকে কিল ঘুষি দিতে থাকে। কান্না গলায় বলে,

“জানোয়ার!!!! তুই একটা জানোয়ার! মেরে ফেলবে তোকে। আমার জীবনটা নরক বানিয়ে দিয়েছিস! কি ক্ষতি করেছিলাম আমি তোর? কেন এমন করছিস? কোন জন্মের শত্রুতা ছিল আমার সাথে? বল! বল আমাকে!”
জেইন রিমের হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে বলে
“জন্ম জন্মান্তরের শত্রুতা বুঝতে পেরেছ এখন।”
তারপর সে একবার মাথা ঘুরিয়ে চোখের ইশারায় ইঙ্গিত করে। মাত্তেও ল্যাপটপ খুলে রিমের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। স্ক্রিনে ফুটে ওঠে একটা লাইভ ভিডিও।
রিমের মা সেলাই করছে নিঃশব্দে, পাশে রাহি বসে টিভি দেখছে। ক্যামেরার অন্যপাশে একটা ছাদে কালো মুখোশ পরা লোক হাতে গান নিয়ে তাক করে আছে তাদের দিকে।
জেইনের কণ্ঠ এবার ঠান্ডা নিঃশব্দ কিন্তু চারপাশে ফেটে পড়ে

“একটা ইশারা… আর তোমার মা-বোন সোজা ওপরে। ভালো করে ভেবে নাও।”
রিম মুহূর্তে নিজের সমস্ত শক্তি একত্র করে ঠাস করে একটা চড় কষায় জেইনের গালে।
“জানোয়ার! তুই একটা অমানুষ! পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করি তোকে আমি! একজন মাকে মারতে চাস তুই? মায়ের গুরুত্ব কিভাবে বুঝবি তুই? তোর তো মা’ই নেই! এজন্যই তো মায়ের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত!”
এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় জেইন। তার মুখ শক্ত হয়ে যায়, চোখের ভাষা পড়া যায় না। বাইরের হিমশীতলতা যেন ভেতরের অন্ধকারকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। মাত্তেও ভয়ে মুখ নামিয়ে ফেলে। সে জানে এই মুহূর্তটা বিপজ্জনক। মা সম্পর্কে কোনো কথা পছন্দ করে না জেইন। জেইন নিচু গলায় বলে,

“ঠিক বলেছ। মায়ের গুরুত্ব জানি না। জানতে চাইও না। আর এখন যদি আমার কথা না শুনো…
তাহলে তোমার মা আর পৃথিবীর আলো দেখবে না।”
রিম ভেঙে পড়ে। হেলিকপ্টারের ঝাঁকুনিতে তার চোখের পানি মুছে যায় বাতাসে। কিছু না বলেই মাথা নিচু করে বসে পড়ে। জেইনের ঠোঁট বাঁকা হাসিতে বেঁকে যায়। সে চোখ সরিয়ে বলে
“কাজী সাহেব, পড়ান বিয়েটা।”
কাজী গলা খাঁকারি দিয়ে বিয়ে পড়ানো শুরু করে।
“পাত্রের নাম আরাত্রিক জেইন চৌধুরী… বয়স ২৯।
পাত্রীর নাম রাত্রিয়ানা সিদ্দিকী রিম… বয়স ১৯।
মেয়ে তুমি কি আরাত্রিক জেইন চৌধুরীকে… কবুল বলছো?”

কোলাহলহীন নিস্তব্ধতা। রিম কোনো উত্তর দেয় না। তার মাথা নিচু। সে কি পাত্রের নামটা শুনতে পেল? হয়তো না। কারণ যদি নামটা শুনতে পেত তাহলে হয়তো তার জীবনের মোড় টাই ঘুরে যেত। সে শূণ্য অনুভূতিহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যেন পৃথিবী থেকে তার অস্তিত্বই হারিয়ে গেছে।
কাজী অস্বস্তিতে পড়ে যান। তিনি জেইনের দিকে তাকিয়ে বলেন
“মেয়েটিকে দেখে তো মনেই হচ্ছে না ওর মত আছে। এমনটা হলে তো আমি……..”
চমৎকারভাবে থেমে যায় বাক্য। কারণ জেইনের চোখ দুটো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে। সে ঠান্ডা গলায় বলে
“মাত্তেও… এটাকে কোত্থেকে আনলি তুই? মনে হচ্ছে এখনও আমাকে ঠিক চিনে উঠতে পারেনি। খুব বেশি বকবক করছে। এক কাজ কর, জালনা খুলে সরাসরি নিচে ফেলে দে এক্ষুনি।”
এক মুহূর্তের জন্য পুরো হেলিকপ্টারটা হিমশীতল হয়ে যায়।কাজী ভয়ে গলা শুকিয়ে ফেলে। সে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে তাড়াতাড়ি বলে ওঠে,

“না না! তার প্রয়োজন নেই! আমি… আমি বিয়ে পড়ানো শুরু করছি। এখনই করছি…”
বিয়ে পড়ানোর রীতি শুরু হয়। সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে। রিম তখনো চুপ। অবশেষে…কাজীর জিজ্ঞাসায় তার ঠোঁট কাঁপে। সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে
“ক…কবুল।” কবুল কবুল……..”
জেইনের ঠোঁটে বাঁকা হাসি। তার চোখে যেন যুদ্ধ জিতে ফেলার রঙ। তারপর আসে কাবিননামার পালা। কাজী জিজ্ঞাসা করেন,
“পাত্র, আপনি কাবিননামায় কি পরিমাণ মোহর রাখতে চান?”
জেইনের দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে রিমের দিকে । তার চোখে একধরনের ঘোর। কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই,
“আমার সব লিখে দিন ওর নামে।”
কাজী থমকে যায়।

“জি… মানে সব?”
জেইন গাঢ় আঠালো কণ্ঠে বলে,
“হ্যাঁ সব। আমার পুরো জীবনটাই ওর নামে লিখে দিন।আমার সবকিছু জীবন, মৃত্যু, ব্যাংক ব্যালেন্স, জমিজমা, ব্যবসা, গাড়ি, আমার শরীর…
এমনকি…… আমার নিঃশ্বাস অবধি লিখে দিন ওর নামে। আমি আমার অস্তিত্বের প্রতিটি ইঞ্চি এই মেয়ের মালিকানায় দিলাম। ও যদি কোনোদিন বলে আমি মরবো, আমি প্রশ্ন ছাড়াই মরবো।”
কাজী চুপ। লইয়ার থমকে যায়। মাত্তেও মাথা নিচু করে অভিভূতের মতো দাঁড়িয়ে। রিম নিঃশব্দে কাঁপছে এটা প্রেম না বন্দিত্ব, সে বুঝে উঠতে পারছে না।
জেইন এবার ধীরে ধীরে বলে

“আর শুনুন…এই কাবিননামায় স্পেশাল ক্লজ দিন
এই মেয়েটি, রাত্রিয়ানা সিদ্দিকী রিম,
এই জনমে কখনো… ডিভোর্স চাইতে পারবে না।
যদি চায়ও… সেই দিনই হবে ওর জীবনের শেষ দিন।”
কাজী চোখ বড় বড় করে তাকায়। কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। কলমের ঢাকনা খুলে রাখলেও, হাত কাঁপছে তার।
জেইন চোখ সরিয়ে নেয় না।
“লিখুন।”
কাজী ধীরে ধীরে মাথা ঝুঁকিয়ে লেখে
‘পাত্র তার সম্পূর্ণ জীবনের সমস্ত সম্পত্তি, ব্যাংক ব্যালেন্স, জীবন ও মৃত্যুর অধিকার পাত্রীর নামে লিখে দিলেন। সাথে এটাও লিখিত থাকলো,
এই পাত্রীর যদি কখনো বিবাহ বিচ্ছেদের ইচ্ছা হয়, তবে সেটা পাত্রের কাছে হবে মৃত্যুদণ্ড স্বরূপ।’
কাজী আতঙ্কে সাইন করতে বলেন। কলম এগিয়ে দেয়া হয় জেইনের হাতে। সে সাইন করতে যাবে তখনই,
“টচ্…”

কলমের কালি শেষ। পুরো গায়ে টান পড়ে মুহূর্তটাতে।
কাজী কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
“জি… কালি শেষ… অন্য কলম আছে কি?”
কিন্তু জেইনের চোখ অদ্ভুতভাবে শান্ত। চোয়াল টানটান। সে নিজের বাম হাতটা তুলে,
“No need.”
চট করে কোমরে থাকা ছোট ব্লেডটা বের করে।
আঙুলে হালকা কাট, প্লাশ করে রক্ত বেরিয়ে আসে।
রিম বিস্ফারিত চোখে চেয়ে থাকে। তার কানের পাশ দিয়ে ভোঁ করে শব্দ করে কেটে যায় একটা শীতলতা।
গলার কাছটা শুকিয়ে আসে, মাথার ভেতর যেন হালকা ঝাঁকুনি।
জেইন রক্তের ফোঁটাগুলো নিজের নামের জায়গায় টেনে সই করে ফেলে। রক্তে ভেজা আঙুলটায় তখনো রিমের চোখ আটকে আছে। সে কাঁপছে। ভিতরে ভিতরে।মুখ সাদা হয়ে গেছে। চোখ স্থির।
ঠিক তখনই জেইন মুখ ঘুরিয়ে ফিসফিস করে বলে,

“মাত্তেও… ওকে বল, ও যদি এখন জ্ঞান হারায়, ওর এমন অবস্থা করবো পুরো একমাস বেড থেকে উঠে দাঁড়াতে পারবে না। ও জানে না আমি কি কি করতে পারি, কতভাবে পোড়াতে পারি।”
রিম শ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে থাকে। জেইন এবার কাজীর হাত থেকে ফাইলটা নিয়ে ওর চোখের সামনে রাখে।
ফাইলের নিচে কলমটা রক্তে ভেজা। রিমের চোখে জল এসে গেছে। সে খুব আস্তে, ধীরে হাত বাড়ায়।
রক্তে ভেজা কলমটা তুলে কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের নামের জায়গায় সই করে দেয়,
‘রাত্রিয়ানা সিদ্দিকী রিম।’
এক ফোঁটা রক্ত কলম থেকে গড়িয়ে পড়ে কাগজের উপর। ঠিক নিজের নামে। জেইন গভীরভাবে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তৃপ্ত, সন্তুষ্ট… আর বিপজ্জনক শান্ত।

“আলহামদুলিল্লাহ, বিয়ে পড়ানো শেষ।”
কাজীর কণ্ঠে প্রশান্ত ঘোষণা।
“এবার বর-কনে একে অপরকে মিষ্টি মুখ করান।”
এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা।
“শিট! ভাই… আমি তো মিষ্টি আনতেই ভুলে গেছি!”
মাত্তেও মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। কপালে ঘাম।
জেইনের চোখ সরু হয়। মাথা ধীরে ধীরে ঘোরে তার দিকে। একটা ঠান্ডা শ্বাস বেরিয়ে আসে ঠোঁট ফাঁক করে।
“আমার বিয়ে আর তুই মিষ্টির কথা ভুলে গেলি?”
মাত্তেও জবাব দেওয়ার আগেই,
ঠাস!
এক দলা থুতু ছিটকে এসে জেইনের গালে লাগে। রিমের চোখে আগুন। ঠোঁট কাঁপছে রাগে।

“মিষ্টি মুখ করার শখ খুব? এই নে তোর মিষ্টি!”
চারপাশ থমকে যায়। কাজী শকড। মাত্তেও হাঁ করে।
কিন্তু জেইন…সে এক চুলও রাগে না।বরং তার ঠোঁট বাঁকা হয়ে ওঠে। চোখ জ্বলজ্বল করছে এক অদ্ভুত তৃপ্ততায়।
সে ধীরে ধীরে নিজের গালের পাশ থেকে কনিষ্ঠা আঙুলে ক্রীমের মত মেখে নেয় থুতুটা। হালকা গোলাপি আভা, কেমন যেন রিমের ঠোঁটের স্বাদ মিশে আছে তাতে।
কনিষ্ঠ আঙুলটা মুখে তুলে জিভ ছুঁইয়ে চেটে খায় সে।
একটা ভিজে স্লো লিক। ঠোঁটে কেমন শিরশিরে হাসি।
“Although… মিষ্টি আমি একদম পছন্দ করি না।
But this….”
সে আঙুলটা ঠোঁটে টোকা দিয়ে থেমে যায়। চোখ রিমের গায়ে গিয়ে গাঁথে।

“This is the best sweet I ever had in my life.”
রিম থরথর করে কেঁপে ওঠে। তার শরীরে যেন একসাথে রাগ, ঘৃণা, লজ্জা, আর একটা গভীর অজানা শিহরণ খেলে যায়। তার ঠোঁট কাঁপে কিছু বলার জন্য, কিন্তু শব্দ আটকে যায় গলার কাছে। শরীরের প্রতিটা স্নায়ু টানটান।
আর জেইন? সে হেলান দিয়ে বসে… রিমকে এভাবে দেখতে দেখতে ধীরে বলে,
“Welcome to your forever, Firefly. Now… you belong to me.
Legally.
Spiritually.
Eternally.”

হেলিকপ্টারটা নামছে এক বিশাল, ধূসর ছাদে।
সামনে বিশাল পেন্টহাউজ কালো কাচে ঘেরা, ছাদের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিষণ্ণ অট্টালিকা।
আকাশে তখন কুয়াশার আস্তরণ, বাতাস ভারী। যেন কোনো শিকারকে গিলে ফেলতে চলেছে অন্ধকার।
জেইন নিচে নামামাত্রই কাঁধে তুলে নেয় রিমকে।
রিম ক্ষিপ্ত হয়ে কিল-ঘুষি মারতে থাকে তার পিঠে।
“আমাকে নামান বলছি! নামান! আপনি একটা শয়তান!”
জেইন তাচ্ছিল্য করে, হাঁটতে থাকে বড় বড় পা ফেলে। ঠান্ডা গলায় বলে,
“চুপ…. আর একটাও কথা বলবে না।”

পালানোর খুব শখ না?এবার এমন জায়গায় আটকে রাখবো যেখানে বাইরের আলো ঢুকবে না… শুধু আমার নিঃশ্বাস পড়বে তোমার গায়ে, বাকি পৃথিবী থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন!
তোমার নরকরাজ্য এখন শুরু হচ্ছে, Firefly.
এলিভেটরের দরজা খোলে। ভিতরে ঢোকে দুজন।
রিম ছটফট করে,
“আমাকে নামান বলছি! আপনার সব কথা শুনেছি… বিয়ে করলাম! আর কী চাই?”
জেইন বাঁকা হাসে। ঠোঁট কামড়ে চোখ সরু করে বলে
“এখন তো চাওয়ার সবে মাত্র শুরু, সোনা… এতো অধৈর্য হলে চলবে?”
সে নিচু গলায় ঠোঁট কামড়ে বলে, যেন প্রতিটা শব্দে লুকিয়ে আছে হুমকি আর খেলা।রিমের মনে শঙ্কা জন্মে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলে

“আগে বলুন, রিশাব কোথায়?”
এতক্ষণ ঠাণ্ডা থাকা জেইন মুহূর্তেই রাগে অগ্নিমূর্তি ধারণ করে। তার মুখ কালো হয়ে যায়, চোখ লাল। সে রিমকে নামিয়ে বলে,
“তোমাকে কতবার বলবো? আমার সামনে ওই গুঁইসাপটার নাম নিবে না! Don’t you understand?”
রিম পিছিয়ে যায় এক পা, কিন্তু থামে না।
“বলবো। একশোবার বলবো, বারবার বলবো, হাজারবার বলবো! কি করবেন আপনি? মারবেন? ভয় দেখাবেন? আমি জানি আপনি আমার ক্ষতি করতে পারবেন না। আপনার সেই সাহস নেই।

আমি বলবই
রিশাব!
রিশাব!
রিশাব!
রিশাব আপনার চেয়ে হাজারগুণ ভালো!”
জেইনের চোখ দুটো মুহূর্তে পাথরের মতো ঠান্ডা হয়ে যায়। ঠোঁটের কোনা কেঁপে ওঠে।
“আমি খারাপ এটা আমি জানি। কাউকে ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দিতে আসিনি। But remember one thing…….. I’m your legal husband. তুমি আমার সামনে অন্য কোনো পুরুষের নাম উচ্চারণ করতে পারবে না। কখনও না।”
রিমও থামে না। চিৎকার করে বলে,

“বলবই রিশাব!
রিশাব!
রি……….”
মুহূর্তেই থেমে যায় তার ঠোঁট জোড়া।
কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে, জেইনের পাতলা, রক্তজবা ঠোঁট পিষ্ট করে ধরে রিমের নরম মখমলে গোলাপি ঠোঁট দুটো। কিন্তু স্পর্শটা আদরের নয়—রক্তগরম, হিংস্র, প্রলয় ঘনানো ক্ষুধার মতো। যেন রিমের ঠোঁটে নিজের সমস্ত রাগ, জেদ, ছুঁড়ে ফেলছে জেইন।
রিমের চোখের কোনা বেয়ে গড়িয়ে পড়ে নোনা জল। ব্যাথায় তার চোখ কুঁচকে যায়। বুকের ভেতরে ছটফট করতে থাকা একটা পাখি যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ছে।

কিন্তু জেইন থামে না। মিনিটের পর মিনিট কেটে যায়, তবুও সে ঠোঁটে চেপে ধরে আছে রিমকে। ঠোঁটের কোণায় দাঁত দিয়ে কুটকুট করে কামড় বসিয়ে দেয় বারবার তীব্র, নির্মম, আগুন ছুঁইয়ে দেওয়ার মতো।
রিম ছটফট করে… ঠোঁট ছিঁড়ে যাওয়ার মতো ব্যথা অনুভব করে। সে দুহাতে ঠেলছে জেইনের বুক, কিন্তু যেন একটা দেয়াল ঠেলে ফেলতে চাচ্ছে সে। হিমালয় নড়ে, কিন্তু জেইন নড়ে না। সে পুরোপুরি জানোয়ার হয়ে গেছে।
একসময় সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়। শেষে উপায়‌ না পেয়ে রিম হঠাৎ কষিয়ে একটা কামড় বসিয়ে দেয় জেইনের ঠোঁটে। জেইন ছিটকে সরে যায়। তার ঠোঁট থেকে রক্তের সরু ধারা গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু চোখে সেই পাগলাটে উন্মাদনা। সে জীভ দিয়ে ঠোঁট চেটে একটা বাঁকা, শয়তানি হাসি হাসে,
“Wow… love bite! I eat.”

রিম থরথর করে কাঁপছে। তার মাথা ঘুরছে, চোখে ঝাপসা মনে হচ্ছে আর কিছুক্ষণ পরেই অজ্ঞান হয়ে যাবে। সে শরীরটা ছেড়ে দিয়ে দেওয়ালে হেলান দেয়। তার ঠোঁট ফুলে উঠেছে, লালচে-নীলচে ছোপ পড়েছে। যেন একপাল ভ্রোমর হিংস্রভাবে কামড় বসিয়েছে সেখানে।
জেইনের দৃষ্টি আটকে যায় সেই ঠোঁটের ওপর। যেন তাজা কামড় খাওয়া গোলাপ। তার ঠোঁটে রক্ত জমাট। চোখ দুটো ক্রমেই গভীর হয়ে ওঠে এক অদ্ভুত নেশা, ক্ষুধা, না-পাওয়ার দাহ।
সে এক গ্লাস ঠান্ডা জলের মতো শুষে নেয় রিমকে চোখে।
তারপর আরেকবার, আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে। এবার আর কামড় নয় তার ঠোঁটে ঠোঁট রাখে নরম, গভীর, দাবানলের মতো এক আদিম চুম্বনে।

রিমের মুখে তার গরম নিঃশ্বাস ছড়িয়ে পড়ে , চেপে বসে আগুনের মতো। তার জিভ ছুঁয়ে যায় রিমের ঠোঁটের প্রতিটি কাঁপুনি। সেই চুমুতে লেপ্টে আছে অধিকার, জেদ, ভালবাসার ছদ্মবেশে দহন।
দুজনের শ্বাস মিশে এক হয়ে যায়। আঠালো লালায় মুখ জড়িয়ে পড়ে অনিচ্ছায় এক বাধ্য চুম্বনে।
জেইন খুব আস্তে আস্তে ঠোঁট চু-ষতে থাকে যেন সে রিমের সমস্ত যন্ত্রণা কান্না, সমস্ত অভিযোগ টেনে নিচ্ছে নিজের শরীরে। রিম আর লড়াই করতে পারে না। তার দেহ অসাড়, দুর্বল। চোখে অন্ধকার নামছে।
জেইন তাকে একচুলও ছাড় দিচ্ছে না। সে আরও গভীরভাবে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরে, যেন একজীবনের তৃষ্ণা মেটাতে চায় এখনি। যেন রিম হলো সেই অমৃত, যার স্বাদ একবার পেলে আর কেউ থামতে পারে না।
একসময় রিমের সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। তার চোখ বুজে আসে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে পড়ে। সে জেইনের বাহুতে ঢলে পড়ে নিঃশব্দে, নিঃশেষে।
জেইন তখন তার ঠোঁট ছেড়ে তাকে বুকের মাঝে শক্ত করে ধরে হাঁপাতে থাকে। তার বুক ওঠানামা করছে অস্বস্তিকর গতিতে। চোখে এক অদ্ভুত তৃপ্তি আর পাগলামির ছায়া। সে ঠোঁটের তরল টুকু গিলে বলে,

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৪

“ইয়াম্মি…. Delicious.”
তারপর সে রিমের নিস্তেজ দেহটা কোলে তুলে নিচু গলায় ফিসফিস করে বলে,
“এতটুকুতেই এই অবস্থা? এ তো সবে শুরু,
এখনো তো আরও অনেক কিছু বাকি সোনা…….”

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ২৬