Naar e Ishq part 24
তুরঙ্গনা
“ওহ! আমার তো বউ আছে।”
মূহুর্তেই কেকে যেন নিজের কাঙ্খিত আরামদায়ক উষ্ণতার আমুদকে খুঁজে পেল। দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো। গুনগুনিয়ে শিষ বাজিয়ে গাইল,একটি গানের নির্দিষ্ট কিছু পঙক্তি,
‘Talab hai tu, tu hai nasha
Ghulam hai dil ye tera
Khulke zara jee loon tujhe
Aaja meri saanson mein aa____
Mareez-e-Ishq hoon, main kar de dawa
Haath rakh de tu dil pe zara_____’
সুহিনকে নিয়ে তার বেশি একটা ভাবা হয়না। ভাবতে গেলেই অদ্ভুত এক দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে যায়। মেয়েটাকে বিয়ে করেছিল, এক পরিকল্পিত উদ্দেশ্যে। এবং একজন বিশেষ মানুষের বিশেষ ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে।
কিন্তু বিষয়টা আর এই পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকেনি। যতই সে বলুক, সে ভালোবাসায় বিশ্বাসী নয়। যদি তাই হতো,তবে তার মা-কে এই পৃথিবী ছাড়তে হতো না। ভালোবাসাটা তার কাছে কখনো সস্তা মনে হয় তো কখনো বা রূপকথার কল্পকাহিনী।
কিন্তু সুহিনের মাঝে সে ভিন্নকিছু অনুভব করে। শুরুতে তাকে বিয়ে করে কেবল নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ ভেবেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে অনুভব করল, তার বোকা হ্যামস্টারের মাঝে এমন কিছু রয়েছে যা তাকে প্রতিনিয়ত টানছে। যদিও সে নিজের নিয়ন্ত্রণে যথাসাধ্য কঠোরতা বজায় রাখে। নয়তো এতোদিনে বউ থাকার সুবাদে একটা না একটা হেস্তনেস্ত হয়েই যেতো।
কিন্তু মেয়েটার বয়স হলেও,বোকা বোকা হাবভাবটা এখনোও কাটেনি। সে হয়তো জোর করতেই পারত, কিন্তু সেরকম নিচু চিন্তাও তার মাথায় আসেনি। যে কারণে বারবার ইচ্ছে করেই ভাবনা হতে সুহিনকে দূরে রাখতে চেয়েছে।
কিন্তু আজ আর নয়। গতরাতে সুহিনের সম্মতি সে খুব ভালোমতোই পেয়েছিল। যে কারণে অঘটন ঘটার আগেই সে সুহিনকে দূরে সরিয়েছে। তবে আজ আর কোনো ছাড়াছাড়ির ইচ্ছে নেই। কার ড্রাইভ করতে করতেই, সে একমুহূর্তে জন্য চোখ বুঁজে নিল।
সে কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে দেখল, সুহিনের নীলচে চোখজোড়া তাকে যতট না টানে,তার চেয়েও বেশি ঐ গাঢ় বাদামী চুলগুলো তাকে অধিকপরিমানে আকৃষ্ট করে। আজ সুহিনকে শক্ত করে জড়িয়ে, সেই চুলে মুখ ডুবিয়ে ঘুমানোর নেশা জাগল তার। আচ্ছা মেয়েটাকি তার এই চাওয়াকে প্রশ্রয় দেবে নাকি দূরে সরিয়ে দেবে? সে যা ইচ্ছে তাই করুক, আজ ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেলেও সে সুহিনকে ছাড়বে না।
এমনই জোড়ালো চিন্তা-ভাবনায় কেকে ক্ষীণ তির্যক হাসল। ধীর গলায় হাস্কিস্বরে আওড়াল,
“পুসি ক্যাট! ইউর স্নাইপার ইজ কামিং!”
কাহসান কুঞ্জের ফটক পেরিয়ে কেকের নিকষ কালো ফেরারিটা অন্দরমহলে এসে থামল। ততক্ষণে রাতের নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘনীভূত হয়েছে। গাড়ি থেকে নেমে কেকে একবার নিজের অবিন্যস্ত পোশাক আর ক্লান্ত দেহটা টেনে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
শিরদাঁড়া সোজা রেখে, চোয়াল শক্ত করে সে বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। আশেপাশের দায়িত্বরত গার্ডরা তার এই রণক্লান্ত অথচ বিধ্বংসী ভাবমূর্তি দেখে ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেল। মানুষটা এমন রহস্যময় ও অদ্ভুত কেনো কে জানে।
কিন্তু বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতেই কেকের পায়ের গতি মুহূর্তেই রুদ্ধ হলো। ড্রইংরুমে উজ্জ্বল আলোয় সুহিনকে ঘিরে বসে আছে দুজন—দানিয়েল আরহাম আর নিমরা হুরাইন। নিমরা ও দানিয়েল আজ বিকেলেই ফিরেছে। এখানে এসেছে কিছুক্ষণ আগে।যথারীতি সুহিনের সাথে বিশেষ কোনো কথাবার্তা হয়নি তাদের। সেদিনকার দুর্ঘটনার রেশ দানিয়েলের কপালে সাদা ব্যান্ডেজ হয়ে লেগে আছে। আর এখন বউপাখিকে মলিন মুখে বসে থাকতে দেখে,তার চোখেমুখে স্পষ্টত উৎকণ্ঠার ছাপ।
ম্লান মুখে বসে থাকতে দেখে দানিয়েল হয়তো সুহিনকে সান্ত্বনা দিতেই নিজের হাতটা তার হাতের ওপর রেখেছিল। কিন্তু দৃশ্যটা কেকের ধূসর কালো চোখের মণিকে বিষিয়ে তুলল। তার ভেতরের হিংস্র সত্তাটা যেন মুহূর্তে ফুঁসে উঠল। সে ভারী নিরেট কণ্ঠে গুমগুমিয়ে ডেকে উঠল,
”হানি!”
সুহিনসহ বাকি দুজন চমকে কেকের দিকে তাকায়। দানিয়েল কিছু একটা আঁচ করার চেষ্টা করলেও কেকের নিরেট চাউনি ভেদ করা অসম্ভব মনে হলো। কেকে দ্বিতীয়বার কোনো ভূমিকা ছাড়াই আবারও ডাকল,
“হানি!”
সুহিন স্থির হয়ে বসে রইল। তৎক্ষনাৎ উত্তর দেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করল না। তার ভেতরে তখন ঝড় বইছে। দানিয়েল পরিস্থিতি বেগতিক দেখে উঠে দাঁড়াল।
সুহিন ইচ্ছেকৃত ভাবেই নিরুত্তর রয়। দানিয়েল সুহিনের দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করে। পরক্ষণেই নিমরা সহ দুজনে চলে যাবার উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“আ…আজ যথেষ্ট রাত হয়েছে। আমরা দুজন পরে না হয় কখনো আসব। নিজের খেয়াল রেখো।”
এই বলেই দানিয়েল আলতোকরে সুহিনের কাঁধ চাপরে দিয়ে,চলে যেতে পা বাড়াল। সুহিনও আর আজ তাদের আটকায় না। এই মূহুর্তে তাকে একমাত্র কেকেই ঠিক করতে পারে। যতক্ষণ না মাথায় ঘুরপাক করতে থাকা উত্তরগুলো খুঁজে পাচ্ছে ততক্ষণ সে স্বস্তি পাবে না।
নিমরা আর দানিয়েল বাড়ি হতে বেড়িয়ে গেল৷ যদিও রগচটা নিমরা কেকের এই অতিরিক্ত ভাবগাম্ভীর্য দেখে কিছুটা বিরক্ত হয়ে মনে মনে আওড়াল,
“অদ্ভুত সব লোকজন, বাঘ-ভাল্লুকের মতো চালচলন যখন, তখন চিরিয়াখানায় গিয়ে থাকলেই পারে।”
তারা চলে যেতেই ড্রইংরুমে কেবল কেকে আর সুহিন। আশেপাশে পরিচারিকাদের ব্যস্ততা থাকলেও কেকে সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করল না। সে সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়ে, গম্ভীর স্বরে আদেশ করল,
“উপরে আয়, তোর সাথে দরকারি কথা আছে।”
কেকে’ও কিছু বলতে চায়? তবে কি এই বিষয়েই? সুহিন এখনও আশ্বস্ত যে, কেকে ঐ পেপার্সে যা লেখা আছে তার সবই অস্বীকার করবে। বলবে,এসব মিথ্যে। এই ভাবনাতেই নিজেকে শান্ত করে, সুহিন কেকের পেছন পেছন এগিয়ে যায়।
কেকে সুহিনের ঘরে ঢুকে যেতেই, সুহিনও তার সাথে সাথে ভেতরে প্রবেশ করে। কিন্তু ঘরে প্রবেশ মাত্রই কেকের হাবভাব যেন পুরোপুরি বদলে যায়৷ দরজাটা সরাসরি বন্ধ করে দিয়ে,গা থেকে জ্যাকেটটা খুলে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে।
সুহিন ভেবেছিল কেকে হয়তো এখন তাকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলবে। অথচ সে তেমন কিছু না করেই, একদম তার নিকটে গা ঘেঁসে দাঁড়াল।তার হাবভাবে সুহিন কিছুটা ভড়কে গেলেও, নিজেকে তটস্থ রেখে আওড়াল,
“আপনি কিছু দরকারী কথা বলতে চাচ্ছিলেন।”
—“কথা নয়, আমার তোকে চাই।”,কেকের হাস্কিস্বর তখন নিগূঢ় নেশায় বুঁদ হয়ে আছে।
কেকে একমুহূর্তও দেরি করল না। হাত বাড়িয়ে সুহিনের কোমড় পেঁচিয়ে ধরল। হেঁচকা টানে নিজের প্রশস্ত নিরেট বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে,সুহিনের বাদামীচুলগুলো আঙুলের ডগায় পেঁচিয়ে খেলতে লাগল। বারংবার সে চুল নাকের ডগায় এনে,অদ্ভুত এক নেশার খেলায় মত্ত হলো। সুহিন তার হাবভাবে কিছু বিচলিত হলেও, তৎক্ষনাৎ নিজের মাথায় চলতে থাকা প্রশ্ন গুলো করতে পারল না।
ততক্ষণে কেকে তার চুল ও গলার ভাজে মুখ ডুবিয়ে,দুবার গালটা ঘসে দিল। খোঁচা খোঁচা চাপ দাঁড়ির তীক্ষ্ণ ছোয়ায় সুহিনের সর্বাঙ্গ শিউরে উঠল। কেকে হাস্কি স্বরে তার কানের কাছে ফিসফিস করে ডেকে উঠল,
“বউউউউউ!
সুহিন থমকে যায়। কাঠখোট্টা গলায় শুষ্ক ঢোক গেলে দুবার। এই প্রথম কেকের মুখ থেকে এই ডাকটা শুনল। খুব সাধারণ দুটো অক্ষরের শব্দ এটি। অথচ এই শব্দেই যেন কেকে নিজের মালিকানা তার উপর জাহির করেছে।
কেকে তাকে আরেকটু নিবিড় ভাবে নিজের সাথে জড়িয়ে নেয়। আবারও সুহিনের উদ্দেশ্যে ফিসফিস করে হাস্কি স্বরে আওড়ায়,
“ওয়াইফিইইইই! প্রচন্ড ক্লান্ত আমি। এই অভদ্র, অসভ্য, জানোয়ারটাকে তোর মাঝে একটু ঠাই দিবি? শুধু আজকের রাতটার জন্যই, প্লিজজজজ।”
অত্যন্ত ক্ষীণ কন্ঠস্বর। সুহিন নিজেও টের পেলো, কেকে বেশ ক্লান্ত। গায়ের তাপমাত্রাটাও কিঞ্চিৎ বেশি। গা হতে আসা পুরুষালী ঘ্রাণ ও ক্লোরাল পারফিউমের সুগন্ধিতে তাকে অদ্ভুত এক মোহের আচ্ছন্নে ঠেলে দিচ্ছে।
সুহিন কেকের অভিব্যক্তিতে কোনো জবাব দেওয়ার মতো কিছু খুঁজে পেল না। তার গলা বারবার কাঠ হয়ে শুকিয়ে আসছে। কেকে তার গলায় আবারও নাক-মুখ ঘসে দেয়। সুহিনের সাড়া পেতে ব্যকুল হয়ে ওঠে।
“ব্লু-বেরি!”
“হানি!”
“হেই চশমিশ!
“লিটিল হ্যামস্টার!
“মাই পুসি ক্যাট!”
একের পর এক নামে ফিসফিসিয়ে সম্মোধন করে। অনবরত সুহিনের গলা হতে কলার-বোনে নাক-মুখ-গাল ঘসতে থাকে। যেন এখনই উম্মাদ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সুহিন তো পাথর হয়ে জমে যাচ্ছে। কেকে যে কেবল তার গলা-ঘাড়ে মুখ গুঁজে পাগলামি করছে,বিষয়টা তা নয়। অভদ্র পুরুষের মতো তার হাতটা, সুহিনের লংশার্টের নিচ দিয়ে উঠে গিয়ে উন্মুক্ত পিঠে বিচরণ করছে।
সুহিন এতোক্ষণেও কোনো সাড়াশব্দ না দেওয়ায়, কেকে হুট করেই শার্টের নিচে সুহিনের কোমড়ে জোরে চাপ দিয়ে, চাপা ভগ্ন স্বরে আওড়ায়,
“হেই পার্সিয়ান! প্লিজ সে সামথিং!”
কেকে মুখ তুলে তার দিকে তাকায়৷ সুহিন স্তব্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে থাকে। তার জন্ম হয়েছিল পারস্যের নগরীতে। আশরিয়ার গর্ভকালীন সময় তারা এদেশে ছিল না। তাই বাবা বাংলাদেশী হলেও, সে পার্সিয়ান কিংবা বাংলাদেশী উভই।কেকের মুখে এই সম্মোধন নতুন নয়, অনেক ছোট থাকতে ব্যাঙ্গাত্নক ‘চশমিশ’ নামটার মতোই কেকে তাকে পার্সিয়ান কিংবা পুসি ক্যাট বলে ডাকত।
কেকে’র পাগলামি সুহিনের কাছে বোধগম্য। লোকটা যখনই তার কাছে আসে তখনই সে অদ্ভুত এক নেশার ঘোরে পড়ে যায়৷ কিন্তু আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। রাতের মতো চেয়েও কেকে’কে এই মূহুর্তে প্রস্রয় দিতে পারছে না। আগে মাথা থেকে কনফিউশান গুলো সরাতে হবে।
সে কেকের বুকে হাত রেখে,তাকে কিছুটা দূরে সরাতে চায়। কেকে বিষয়টা বুঝতে পেরে,ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। কেকে কিছু বলার আগেই, সুহিন বলে,
“আমার কিছু জানার আছে।”
কেকে ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“হুম,বল। কি জানতে চাস।”
সুহিন কেকের বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।অতঃপর এগিয়ে যায় নিজের টেবিলের দিকে। ঘরের কোণে খাঁচায় বন্দী তখন দূর হতে দুজনকে দেখছে। সুহিন টেবিলের উপর থেকে খামের ভেতরের পেপার্স বের করে,কেকের কাছে নিয়ে আসে। কেকেও নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তার হাবভাব পরখ করে।
সুহিন কাগজগুলো কেকের দিয়ে এগিয়ে দেয়।কেকে সেগুলো হাতে নিয়ে আওড়ায়,
“এগুলো কিসের পেপার্স?”
সুহিন কোনো উত্তর দেয়না। কেকে তার মলিন মুখটার দিকে চেয়ে, পেপার্স মেলে দেখতে লাগে। মূহুর্তেই তার চোখ-মুখ ও চোয়াল শক্ত হয়। পেপার্সে স্পষ্ট করে কেকে ও আরশিয়ার বিয়ের বৈধতা লেখা রয়েছে। যেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, আরশিয়া মেহের শাহমীর পুত্র কাশিফ কাহসান চৌধুরীর বিয়ে করা স্ত্রী। এছাড়া এতে কাহসান ইন্ডাস্ট্রি ও প্রোপার্টি নিয়েও কিছু মালিকানাধীন তথ্য দেওয়া রয়েছে।
কেকে জিহ্বার অগ্রভাগ দিয়ে, মুখের অভ্যন্তরে দন্ত স্পর্শ করল। পেপার্স থেকে নজর সরিয়ে সুহিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এটা কোথায় পেয়েছিস?”
কেকের কথার পিঠে সুহিন উল্টো প্রশ্ন করল,
“আগে বলুন এগুলো সব মিথ্যে!”
কেকে নির্বিকার ভঙ্গিতে আওড়ায়,
“হানি! আমরা এসব নিয়ে বরং পরে কথা বলি?”
সুহিন যেন এক মূহুর্তের জন্য থমকে গেল। কেকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইছে, কিন্তু কেনো? এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। তার মানে কি এসব সত্যি? কিন্তু কিভাবে? এতো বড় খেলাটা কেনো খেলল কেকে? শুধুই কি নিজের স্বার্থের জন্য?
সুহিনের কান্না পেয়ে গেল। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে, চোয়াল শক্ত করে, ভারী স্বরে আওড়ায়,
“না, আগে আমি জানতে চাই এসব সত্যি কিনা। হ্যা কিংবা না, যে কোনো একটা বলুন।”
কেকে সুহিনের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে, নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
“হ্যাঁ,এটা সত্যি।”
সুহিন যেন এক বিশাল শূন্যতায় আছড়ে পড়ল। তার মা, যাকে সে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছে, তাকে এই লোকটা বিয়ে করেছিল? তার মা আর কেকে-র সম্পর্ক তবে সত্যিই ছিল? তবে কি সমাজ যা বলত তাই সত্যি? না,না, এসব হতে পারে না। কিসব বিদঘুটে ভাবনা ভাবছে সে! কিন্তু কেকে এতো বড় একটা বিষয়কেও এতো সহজে কিভাবে কাটিয়ে দিতে চাইছে? সুহিনের পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে গেল। তার অঝোরে ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো।
কেকে ততক্ষণে নির্বিকার ভঙ্গিতে ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ায়। এবং সুহিনের দিকে চেয়ে বলে,
“ফ্রেশ হয়ে আসছি, রেডি থাক।”
কেকের কথার উদ্দেশ্য সুহিন বুঝল না। আর বোঝার চেষ্টাও করল না। সে কেকের হাতটা ধরে তাকে থামিয়ে, তার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। চোয়াল শক্ত করে,নিজের কান্নার উপক্রম থামিয়ে আওড়াল,
“আমি পুরো সত্যিটা জানতে চাই! আপনারা এসব কিসের তামাশা করে রেখেছেন? এসবের মানেই বা কি? ওসব পেপার্সে যা লেখা আছে সব সত্যি? কিন্তু কিভাবে?”
কেকে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে, নিজের কপালে বৃদ্ধাঙ্গুলি স্লাইড করে বলল,
“বললাম তো, এসব নিয়ে বরং পরে কথা বলবো।”
—“না, আমি এখনোই জানতে চাই।”
সুহিনের সোজাসাপ্টা অভিব্যক্তি। কেকে ভারী শ্বাস ফেলে,তাকে তীক্ষ্ণ নজরে একবার পরখ করে নেয়। গত দুদিনে যা ঘটেছে,তা এই মেয়ে’কে সারাজীবনেও বলা সম্ভব কিনা তা কেকে’র জানা নেই। সুহিন যতটা না বোকা তার চেয়েও মানসিক দিক হতে অনেক বেশি দুর্বল। এটা তার ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যের চেয়ে জন্মগত কিছু ত্রুটিই বলা চলে। যখন সে জন্মেছিল, তখন নানান কিছু সমস্যার কারণে তার বাঁচাই মুশকিল হয়ে পড়ে। সেসব ঘটনা কেকে ভালো করেই জানে। তাই নিজের রাগ-ক্ষোভ কিংবা ভেতরকার হিং*স্র সত্তাটিকে সে কখনোই সুহিনের সামনে উন্মোচন করতে চায় না।
কেকে নিজেকে তটস্থ করে, সুহিনের উদ্দেশ্য কড়া স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“তা তুই-ই বল, তুই কি ভাবছিস?”
সুহিন থমকে যায়। দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে যায়; আদতে সে কি বলবে? কেকে আবারও শুধায়,
“আমার কথা না হয় বাদ দে! তুই কি এসব দেখে নিজের মাকেও সন্দেহ করছিস?”
সুহিন থতমত খেয়ে যায়। চোখ-মুখ শুকিয়ে যায় নানান উল্টোপাল্টা চিন্তায়। নিজেকে দ্রুততর সামলে নিয়ে, চাপা স্বরে আওড়ায়,
“না,না, আমি জানি ওসব সত্যি না। কিন্তু এখানে কেনো এইসব লেখা আছে আমি তাও জানি না।… আমি…আমি জানিনা, কেনো এখানে বলা আছে আপনাদের বাড়ি-প্রোপার্টি সবকিছুই আমার নামে। আরো কি কিসব বলা আছে। কিন্তু… আপনি…আপনি কাজটা ঠিক করেনি, একদমই ঠিক করেননি।”
সুহিনের কন্ঠস্বর ভেজা,বারবার থেমে যাচ্ছে। কেকে ভ্রুকুটি করে তার কথার উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করে বলল,
“কি বলতে চাইছিস তুই?”
কেকের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে,নজর মিলিয়ে সুহিন প্রায় কেঁদে ফেলে। তার মাঝে রাগ-ক্ষোভ ও সংশয়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়া ঘটছে।সুহিন ঠোঁট চেপে নিজেকে সামলে নিয়ে আওড়ায়,
“আপনি তো আমায় ভালোবাসেন না। শুধু আমাকে নিজের খেলার গুটি বানিয়ে, ব্যবহার করেছেন। এইজন্যই তো বিয়ে করেছেন। আমি ওইসব সম্পর্ক নিয়ে সত্য-মিথ্যে কিছু জানিনা। জানতেও চাই না। কিন্তু…কিন্তু ওখানে যা লেখা আছে, আর তা যদি সত্যি হয়…এর মানে এটাই বোঝায় যে, আপনি আমাকে…আমাকে…”
সুহিনের এমন কথাবার্তা শুনে, কেকে’র চেপে রাখা মেজাজটা খানিক বিগড়ে গেল। এমনিতেই মাথাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে, কোথায় শান্তিতে বউ নিয়ে ঘুমাবে—কিন্তু সেখানে এই মেয়ে-ই কাহিনি শুরু করে দিয়েছি।
কেকে নিজেকে যথাসাধ্য নিয়ন্ত্রণ করে, সুহিনের কাছ ঘেঁষে দাঁড়ায়। তার হাতের পিঠ সুহিনের গালে রেখে, হালকা স্লাইড করে বলল,
“হানি! এসব নিয়ে এখন কথা বলার সময় নয়। আমি বলছি তো, পরে আমি…”
সুহিন তৎক্ষনাৎ জোর গলায় বলে উঠল,
“মিথ্যে! আপনি আবারও ছলনা করছেন। সবার মতো আপনিও আমাকে পুতুল বানিয়ে রেখেছেন। কারণ আপনারা সবাই ভাবেন আমি বোকা, আমি একা তাই হয়তো আমাকে দিয়ে যা ইচ্ছে তাই করা যেতে পারে। আর যদি এমনটা না-ই হয় তাহলে এখনই বলছেন না কেনো, আমি যা জানতে চাই!”
কেকে দাঁতে দাঁত চেপে ভারী শ্বাস ফেলল। মনে মনে বিরক্তির সাথে আওড়াল,‘এইজন্যই বোধহয় বাচ্চাকাচ্চা টাইপের মেয়েদের বিয়ে করতে নেই!’
পুনরায় নিজের ভাবগাম্ভীর্য দৃঢ় রাখল কেকে।যা ভেবে বাড়ি এসেছিল, তা যে হবে না বোঝাই যাচ্ছে। সে সুহিনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট গলায় জিজ্ঞেস করে,
“হ্যা,বল তুই কি জানতে চাস। এই পেপার্সে যা যা বলা আছে সবই সত্য। কিন্তু… ”
—“তাহলে এটাই তো যে আপনি আমায় নিজের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করেছেন। আর এখন আমার কাছে আসার নাটক করছেন!”
এতক্ষণ সুহিনের কথাবার্তাকে বিশেষ গুরুত্ব না দিলেও, এবার কেকে ভ্রু-জোড়া কুঁচকে চড়া গলায় জিজ্ঞেস করল,
“এ্যাই তুই বারবার এসব বলে কি বোঝাতে চাইছিস,ঠিক করে বলতো!”
—“এটাই যে আপনি আমাকে ভালোবাসেন না ঠিকই, কিন্তু বিয়ে করেছেন কেবল নিজের প্রোপার্টিগুলো নিজের নামে করে নিতে। বোকা নই আমি, ওখানে এসব স্পষ্ট করে লেখা আছে। যদিও আমি জানিনা, আপনাদের প্রোপার্টি কবে বা কিভাবে আমার হলো,কিন্তু আমার কাছ থেকে এসব নিজের করার একটামাত্রই উপায় ছিল। আর যা আপনি সুকৌশলে কাজে লাগিয়েছেন।
বিশ্বাস করুন, এতোকিছু করার প্রয়োজন ছিল না। আমার সাথে ছলনা করার দরকার পরতো না। আপনি যদি আমায় একবার বলতেন, আমি এমনিতেই সবকিছু আপনাকে দিয়ে দিতাম। আমার কখনোই এসবের প্রয়োজন ছিল না। আমি চলে যেতাম এই বাড়ি থেকে। অথচ আপনি…আপনি ধোঁকা দিয়েছেন…কাজটা একদমই ঠিক করেননি।”
সুহিন এসব বলতে বলতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। কেকে কাঁধটা কিঞ্চিৎ কাত করে,তাকে আপাদমস্তক পরখ করল।
‘মেয়েটা কাঁদলেও দেখতে বেশ সুন্দর লাগে। সবকিছুই ইউনিক। নীলচে চোখ-সরু নাক,বোকা বোকা হাবভাব; আপেলের মতো দুটো গাল,কিংবা টসটসে ঠোঁটদুটো সবটাই পারফেক্ট। তাছাড়া বাদামী চুল হতে কোমড়,কিংবা হোক তা সুক্ষ কলার বোনের খাঁজ—সবটাই কত নিখুঁত। আশ্চর্য! মেয়েটা কাঁদছে! কিসব ভাবনা গবর মাথায় ঢুকিয়ে রেখেছে,অথচ তুই হাসছিস? ইট’স নট ফেরায়, কেকে! তোর মেয়েটার প্রতি একটু কেয়ারিং হওয়া উচিত।”
নিজের সাথে কথপোকথন শেষে, কেকে ভ্রু উঁচিয়ে ক্ষীণ বিদ্রুপাত্মক হেসে বলল,
“তার মানে, তুই আমাদের এই সম্পর্কটাকে নিয়ে এমন কিছুই ভাবিস তাই তো?”
—“তো আর কি বলব? আপনি তো আর আমায় ভালোবাসেন না! এটা আপনি নিজেই বলেছেন, আমাকে নিজের হাতের পুতুল মনে করেন। তাহলে আমি আর কোনটা বিশ্বাস করব?”
কেকে এবার নিজের স্বাভাবিক ভাবগাম্ভীর্য থেকে বেরিয়ে এলো। অকস্মাৎ সুহিনের বাহু শক্ত করে চেপে নিজের কাছে মিশিয়ে নিল,
“মিসেস উম্মে হানি কাহসান চৌধুরী! এইটুকুই কি যথেষ্ট নয়?”
সুহিন কচকচ যায়। কেকে আবারও চাপা স্বরে আওড়ায়,
“আপনার এইসব ড্রামা শেষ হলে, আজ একটা কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছি।”
কেকে থামল, সুহিনের নীলচে চোখজোড়ার দিকে চোখ মিলিয়ে চাপা স্বরে বলল,
“হ্যাঁ, আমি তোকে ভালোবাসি না। বিশ্বাস কর,একটুও না! কারণ এসব ভালোবাসা নামক সস্তা জিনিসের কোনো প্রয়োজন নেই আমার। তোকে বিয়ে করেছি, তোকে চিরতরে আমার কাছে বন্দী করেছি। তুই বাঁচলেও আমার, মরলেও শুধুই আমার।কেবল এইটুকুই জেনে রাখ।”
কেকের স্পষ্টত এইসকল কথাগুলোই যেন, এবার সহসাই সুহিনের নারীসত্তায় আঘাত হানল। সে চোখ-মুখ শক্ত করে, দু’হাতে সজোরে কেকে’কে ধাক্কা দিয়ে তার কাছ থেকে সরে এলো। চেঁচিয়ে বলে উঠল,
“না! কখনোই না। আমি কারো কাছে বন্দী নই। নিজের এইসব সো-কল্ড এ্যাটিটিউট-ইগো নিজের কাছেই রাখুন।…আর তার মানে আমি ভুল ছিলাম। আসলেই তো,আমি সত্যিই একটা বোকা, গাধা আমি। যে সামান্য ঘনিষ্ঠতাকেই ভালোবাসা ভেবে বসে আছে।
হোয়াট এভার, আপনার তো স্বার্থ হাসিল হয়ে গিয়েছে তাই না? প্লান সাকসেসফুলি ডান! তবে আমায় মুক্তি দিন। আমি কোনো পিছুটান রাখতে চাই না। ভালো যখন বাসেন না, তখন এই সম্পর্ক রেখেও কোনো লাভ নেই। আবারও সমাজে আমাদের দুজনের সম্পর্কের নামে নোংরামো ছড়ানো হোক, আমি তা চাই না। সমাজ নিয়ে আপনার কোনো পরোয়া না থাকলেও, আমার আছে। আপনি আমায় এসব ঝঞ্জাট থেকে মুক্তি দিন, আমি চিরতরে আপনাদের বাড়ি ও আপনার জীবন থেকে চলে যাবো। আমি আর আপনার পাগলামি-নোং*রামি সহ্য করতে পারব না।”, সুহিনের কন্ঠস্বর কাঁপছে তবু্ও ক্ষো”ভ-তেজ কমছে না। বোকা সুহিনের ভীতু মাফিনটাও তখন দূর হতে দুজনের কারবার দেখে চলেছে।
কেকে’র মেজাজ এবার পুরোদমে বিগড়ে গেল। চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে আওড়াল,
“এবার একটু বেশিই হয়ে যাচ্ছে না?”
—“একদমই না,বেশি বেশি তো শুরু থেকে আপনিই করছেন। সব ঝামেলার মূলে আপনার নাম। নিজে কোনোকিছুর তোয়াক্কা করেন না দেখে, আমিও আপনার মতো পাগলামি করবো? বিয়ে করেছেন ভালো কথা, ডিভোর্স দিবেন আমায়। এসব কাহিনি জানাজানির আগেই মিটিয়ে নেওয়া ভালো। আমি একাই ঠিক আছি!”
সুহিনের কথা শেষ হওয়ারই যেন অপেক্ষায় ছিল কেকে। সে থামতেই কেকে একপ্রকার থাবা দিয়ে তার গাল চেপে ধরে দেওয়ালে সাথে ঠেসে দাঁড় করার। অকস্মাৎ এহেন পদক্ষেপ সুহিন শুরুতেই যেন দুমড়েমুচড়ে ভঙ্গুরে পরিণত হয়। তার শ্বাস নেওয়া তো দূরের কথা, গালের হাড়হাড্ডিই যেন ভেঙে যাচ্ছে।
—“এবার বল, কি চাইছিলি? ডিভোর্স, তাই তো? মেরে কবর দিয়ে দেবো,তবুও তোকে মুক্তি দেবো না। একবার যখন বলেছি, তুই আমার; মানে তুই শুধুই আমার।”
ব্যাথার চোটে সুহিনের দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। অথচ জেদ তার কমছে না। সে-ও কেকের প্রত্যুত্তরে অস্ফুটে আওড়াল,
“মেরে ফেলুন,তবুও আপনার মতো সাইকোর হবো না আমি। বোকা হতে, গাধা হতে পারি, কিন্তু কারো হাতের পুতুল নই আমি।”
—“ওহ রিয়েলি? দ্যাটস্ গুড। কিন্তু হঠাৎ এতো সেল্ফ রেসপেক্টের উদয় হলো কোত্থেকে?”
—“মানে?কি বলতে চাচ্ছেন আপনি?”
সুহিন অস্পষ্ট স্বরে আওড়ায়। কেকে তার মুখের কাছে মুখ এনে, দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“ঐ ইডিয়টটা এখানে এসেছিল কেনো?”
—“কার কথা বলছেন?”
—“তুইও খুব ভালো করে জানিস,আমি কার কথা বলছি।”
সুহিন দমে গিয়ে, কেকের ভাবমূর্তি বোঝার চেষ্টা করে। পরক্ষণেই কড়া গলায় বলে ওঠে,
“খবরদার, আরহাম ভাইকে নিয়ে কিছু বলবেন না। উনি আপনার মতো অসভ্য নয়!”
—“ও আচ্ছা, আমি খারাপ, আমি অসভ্য, আর ও ভালো? তা ও কি রকম ভালো? এক্সট্রা কোনো ফ্যাসিলিটস্ এসেছে নিশ্চয়।”
কেকের ইঙ্গিত সুহিনের কাছে স্পষ্ট। সে ব্যাথার চোট ভুলে, হিসহিসিয়ে আওড়াতে লাগল,
“আপনি…আপনি কিন্তু এবার বাজে বকছেন। উনি আমায় যথেষ্ট সম্মান করে। মানুষ উনি, আপনার মতো অমা’নুষ-জানো”য়ার নয়।… অবশ্য যার মা ওমন ছিল তার তো সব মেয়ে’কে নিয়েই এমন চিন্তাভাবনা আসবে এটাই স্বাভাবিক।”
কেকে অকস্মাৎ সুহিনকে ছেড়ে দিল। যেন সে একমুহূর্তের জন্য থমকে গিয়েছে। ভ্রুকুটি করে অকপটে বলল,
“হোয়াট ডু ইউ মিন?”
সুহিন যেন বেশ অপ্রস্তুত হলো। কিন্তু মেজাজ তো তার ঠিকই বিগড়ে দিয়েছে। সে ভণিতা না করেই বলে ফেলল,
“আ…ভুল কি বলেছি, সবাই জানে আপনার মা একজন…”
সুহিনের কথা সম্পূর্ণ হলো না। এক শক্ত-পোক্ত মুষ্টিবদ্ধ ঘুষি এসে তার গাল বরাবর আছড়ে পড়ল। অকস্মাৎ এহেন ঘটনায়,সে আর নিজেকে সামলাতে পারল না৷ ভারসাম্য হারিয়ে ছিটকে পড়ল পাশে। মাথাটা টেবিলের কোণার সাথে লেগে, কপালের একপাশ ফেটে র’ক্ত বের হলো। ঠোঁটের একটাপাশও কেটে র*ক্তাক্ত হলো। চশমটাও খুলে পড়ে গিয়ে ভেঙে গেল। খাঁচার ভেতর মাফিন চেঁচামেচি শুরু করে দিল। সুহিন যখন তীব্র ব্যাথা ও বিস্ময়ে হতভম্ব, ঠিক তৎক্ষনাৎ কেকে আবারও তার দিকে ধেয়ে এলো।
নিজের সর্বশক্তি দিয়ে,বাম হাতে সুহিনের লন-শার্টের কলার চেপে টেনে ধরল। ডান হাতটা উঁচিয়ে যেই না তার মুখ বরাবর ঘুষি মারতে উদ্যত,ওমনি সুহিন তীব্র ভয়ে চোখ-মুখ খিঁচে নিল। কেকে-র এতোটাও র*ক্তিম হিং*স্রতার সাথে পরিচিত নয় সে। ভেবেই নিল আজ সে শেষ। কিন্তু না! যখন দেখল কেকে নতুন করে তাকে আর কোনো আঘাত করেনি, তৎক্ষনাৎ সে ভীতু চোখজোড়া মেলে তাকাল।
কেকে থমকে গিয়েছে। তার মুষ্টিবদ্ধ হাতটা তার মুখবরাবর এনেও থেমে গিয়েছে। সুহিন তখনও বুঝে উঠতে পারেনি,সে বলতে বলতে কি বলে ফেলছে।
এমনই রুদ্ধশ্বাস মূহুর্তে, কেকে সুহিনের জামার কলার আরেকটু শক্ত করে চেপে,নিজের কাছে টানল। সুহিনের ক্ষত-গুলোর দিকে একবার চোখ বুলিয়ে,তার নীলচে চোখে চোখ রেখে আওড়াল,
“সুহিন! আজ যা বলতে চেয়েছিস, তা ভুলেও আর কখনো বলার চেষ্টাও করিস না। আই ডোন্ট টলারেট দিস।”
কেকের কন্ঠস্বর কাঁপছে। সুহিন তা স্পষ্টত টের পেলো। হুমকি বা শাসানোর চেয়ে সেই কন্ঠস্বরে অসহায়ত্বই যেন বেশি ফুটে উঠল। তার চেয়েও বেশি অবাক হলো, এই প্রথমবার তাকে আর সবার মতো ‘সুহিন’ বলে সম্মোধন করায়। কেনো জানিনা,কেকের দেওয়া আঘাতের ব্যাথার চেয়ে সবচেয়ে বেশি কষ্ট তার এই কারণেই হলো।
সুহিন তার চোখজোড়ার দিকে আরেকটু অবাক হলো। মৃতপ্রায় এক আত্মার হিং*স্র দৃষ্টিতে জলের সিক্ততা৷ এটা কি করেছে সে? এতোটা অবোধ কি করে হলো সে? কার সম্পর্কে কি বলতে চেয়েছে, তা তো একটু বোঝার প্রয়োজন ছিল!
সুহিন তৎক্ষনাৎ আর কিছুই বলতে পারল না৷ তার গলায় কাঁটার মতো কিছু বিঁধছে। সুহিন কিছু বলার চেষ্টা করার আগেই, কেকে তাকে ছেড়ে দিল। হাতের কব্জি দিয়ে মুখ মুছে নিয়ে;কোনোপ্রকার ভণিতা না করে,সে সরাসরি রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
পরদিন সকাল বেলা। সুহিন নিজের বিছানায় বেশ বেলা হয়ে যাওয়া অব্দিও ঘুমিয়ে চলেছে। মাথাটা প্রচন্ড ব্যাথা করছে। যেন ভেতরের সবকিছু ছিঁড়ে যাচ্ছে। চেষ্টা করেও চোখ তুলতে পারছে না। হুট করে শরীর এতো ক্লান্ত, নিস্তেজ কি করে হলো তা তার বোধগম্য নয়।
আধোঘুমে আচ্ছন্ন সুহিন, হঠাৎ গতরাতের ঘটনাগুলো মনে করার চেষ্টা করল। কিছুটা মনে পড়তেই সে ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়ল। ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখল সকাল এগারোটা বাজে। মরণের ঘুম ঘুমিয়েছিল নাকি যে এতো বেলা হয়ে গেল?
নিজের প্রতি বিরক্ত হয়েই, সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। গা যেন ঢুলছে। কিন্তু আয়নার দিকে নজর পড়তেই সে কিছুটা অবাক হলো। তার মাথায় সাদা ব্যন্ডেজ করা৷ ঠোঁটের কোণে কেটে যাওয়া অংশে মেডিসিন লাগানো। কই,সে তো গতরাতে এসব কিছুই করেনি। উল্টো বোকার মতো কান্নাকাটি করে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কেকে’র কাছে গিয়ে মাফ চাইবে,সেই সাহসটুকুও হয়নি।
তার মানে সে ঘুমিয়ে পড়লে,কেকেই আবার এসে এসব করে গিয়েছে? সুহিন দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হয়। চশমাটা ভেঙে গিয়েছে, ও আর পড়া সম্ভব নয়। গতরাতে যা হওয়ার হয়েছে, অন্তত শেষমুহুর্তে যে ভুল করেছে এজন্য কেকের পা ধরে মাফ চাইতে হলে সে তাই করবে। এতো বড় আহাম্মকের মতো কাজ কি করে করল কে জানে!
সুহিন দ্রুত কেকের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু গিয়ে দেখে তার রুম ফাঁকা। সেখানে কেকে কিংবা টমিও নেই। সে দ্রুত নিচে নামে। সার্ভেন্টগুলো নিজেদের মতো কাজ করছে। সুহিন চারপাশে নজর বুলিয়ে নেয়। আশেপাশে কেকে’র বন্ধুগুলোও নেই। অবশ্য দুদিন ধরে এরা তো বাড়িই ফেরেনি। জাভিয়ান আঙ্কেলেরও খোঁজখবর নেই। কোথায় গিয়েছে সব, কে জানে!
কিন্তু এই মূহুর্তে তো তার কেকে’কে প্রয়োজন। নিশ্চয় সকাল সকাল কোথাও চলে গিয়েছে। বেলা তো আর কম হয়নি।
তবুও সুহিন বাড়ির প্রধান সার্ভেন্টের কাছে গিয়ে জানতে চাইল,
“আ…উনারা সব কোথায় গিয়েছে? আপনি কি কিছু জানেন? বলে গিয়েছে কিছু?”
—“ছোট সাহেব আর তার বন্ধুরা? তারা তো সবাই চলে গিয়েছে। আজ নাকি তাদের ফ্লাইট ছিল। তুমি কিছু জানো না?… আমাদেরও তো আগে কিছু বলেনি, আমরাও একটু অবাকই হয়েছি।”, নারীটির সোজাসাপ্টা জবাব। কিন্তু সুহিন যেন হতভম্ব হয়ে গেল। সে আবারও উদ্বিগ্ন হয়ে আওড়াল,
“ফ্লাইট মানে? কোথায় যাচ্ছে তারা?”
নারীটি ক্ষীণ হেসে বলল,
“উনারা তো বিদেশ থাকে না? ওখানেই ফিরে যাচ্ছে। আজ সকালে সবাই এসে নিজেদের ব্যাগ গুছিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। এরচেয়ে তো বেশি কিছু জানিনা। জাভিয়ান বাবুও বাড়িতে নেই, সেও তো আগে কিছু বলেনি আমাদের।”
সুহিন সম্পূর্ণ স্তম্ভিত হয়ে গেল। মাথাটা যেন ধরে এলো তার। নারীটির তার মাথার চোটের দিকে খেয়াল করে বলল,
“মাথায় ব্যাথা পেয়েছো কিভাবে? কালকেও তো তোমায় ঠিকঠাক দেখলাম।”
এই বলেই তিনি হঠাৎ সুহিনের কাছে এসে, ফিসফিস করে আবারও বলল,
“শুনলাম, রাতে ছোট সাহেব তোমার ঘর থেকে রাগ করে বেরিয়েছে। কি হয়েছে বলো তো? তোমাকে বকাবকি করেছে? এইজন্য মনমরা দেখাচ্ছে তোমায়?”
নারীটির সহজ অভিব্যক্তি। সুহিন-কেকে সম্পর্কে সমাজ যা জানে, তিনিও সেই অনুপাতে প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করেছে। সুহিন ক্ষীণ স্বরে জবাব দিল,
“না, তেমন কিছু না।”
সুহিন এই বলেই, পুনরায় নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল। এদিকে তার যাওয়ার পানে নারীটি কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পর,ভারী শ্বাস ফেলে মনে মনে আওড়াল,
“মেয়েটাকে সেই ছোটবেলা থেকেই দেখছি৷ মানুষেরও কপাল, এমনিতেও তো দুনিয়ায় কেউ নাই। আর বাপ বলতে যা আছে, সে তো থেকেও নেই।”
এরূপ নানান মন্তব্য করে,তিনি আবারও নিজের কাজে মনোযোগী হলো।
সুহিন ঢলতে ঢলতে নিজের ঘরে এলো। এবার তার ইচ্ছে মতো কান্না পাচ্ছে। সে দ্রুত নিজের ফোনটা বের করে,অনবরত কয়েকবার কেকে’র নাম্বারে ফোন করল। প্রতিবারই সুইচঅফ দেখাচ্ছে। সে ফোনটা বিছানায় আছড়ে ফেলে,নিজের কান্না থামিয়ে আওড়াল,
“কেনো করলেন এমনটা! একবার তো সুযোগ দিতেন।”
সে মাথা চেপে বিছানায় ধপ করে বসে পড়ল। সবকিছু ঝাপসা দেখছে এখন। এরিমধ্যে তার নজর পড়ল, সাইড টেবিলে। একটা ছোট্ট কাগজ অত্যন্ত যত্নের সাথে ভাজ করে রাখা। সুহিন দ্রুত কাগজটি হাতে তুলে নেয়। ভাজগুলো মেলতেই দেখা মেলে দুটো তিক্ত পঙক্তি,
Naar e Ishq part 23
‘সরি ফর এভরিথিং। সময় মতো ডিভোর্স লেটার পেয়ে যাবি।’
সুহিন বাক্যদুটো পড়ে সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে গেল। চোখ বেঁয়ে অচিরেই দুফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। আক্রোশে হাতের কাগজটুকু মুঠো বন্দী করে, দাঁতে দাঁত পিষে আওড়াল,
“অসভ্য,অমানুষ, জানোয়ার একটা! ঘৃণা করি আপনাকে!”
প্রথম খণ্ড সমাপ্ত

, আপু দ্বিতীয় খণ্ড কবে থেকে দিবা