আমির হাওলাদার পর্ব ২
ইলমা বেহরোজ
ঘণ্টা কয়েক আগে।
ওয়েটিং রুমে মজিদ হাওলাদার বসে ছিলেন সোফার একদম কিনারায়। চোখ দুটো তীক্ষ্ণ। বহু বছরের রাজনীতি আর অন্ধকারের ব্যবসা মানুষকে যে ধরনের চোখ দেয়, ঠিক সেরকম দুটি চোখ।
আমির ঢুকতেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন। দুজন মুখোমুখি বসল। প্রথম কিছুক্ষণ কাজের কথা হলো। চট্টগ্রাম বন্দরে নতুন চালানে জটিলতা তৈরি হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের একটি রুটে অপরিচিত উপস্থিতির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ময়মনসিংহ থেকে যে খবর এসেছে, তাও আশাব্যঞ্জক নয়। আমির শুনল, কখনো মাথা নাড়ল, কখনো দু-একটি কথা বলল। কোনো সমস্যাই তাকে স্পর্শ করল না।
একসময় ইতস্তত করে মজিদ হাওলাদার বললেন, ‘তোর বাড়িতে যেতে বলবি না আমাকে?’
আমির ঠান্ডা গলায় বলল, ‘বিজনেস পার্টনারদের বাড়িতে নিতে হলে প্রতিদিনই কাউকে না কাউকে নিতে হবে।’
মজিদ কণ্ঠ ভারী করে বললেন, ‘আমি কেবলই তোর বিজনেস পার্টনার? তোর বাবা না? তোর রক্ত না?’
আমির মাথা তুলে মজিদের চোখে চোখ রেখে বলল, ‘যেদিন আমার মেয়ে খুন হয়েছে, সেদিন আপনার ছেলেও মরে গেছে। আপনার সামনে এখন যে বসে আছে, সে কেবল আপনার ব্যবসার পার্টনার। তার বাইরে রক্তের টান খোঁজার চেষ্টা করবেন না।’
মজিদ হাওলাদার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘বড্ড বেশি আবেগ দিয়ে কথা বলছিস, বাপ।’
‘আবেগ নয়। হিসাব।’
‘হিসাব? পারিজা আমার রক্ত। আমার নাতনি। ওর জন্য আমার কলিজা কি পোড়েনি? কিন্তু নরকের ব্যবসায় নামলে মাঝেমধ্যে নিজের কলিজার টুকরো দিয়েই আগুনের উত্তাপ সইতে হয়। এই পথে হাঁটলে সেটা জেনেই হাঁটতে হয়। সেটা তুই ভালো করে জানিস। বিষ সবাই গিলতে পারে না। যারা হজম করতে পারে, তারাই টিকে থাকে। ক্ষমতার জন্য বলি দেয়াকে কোরবানি বলে। খুন হওয়া বলে না।’
আমির কথা বলল না। কথা বললেই ভেতরের আগুনটা বেরিয়ে আসবে। এখন আগুন দেখানোর সময় নয়। সময়ের আগে আগুন দেখালে শিকার সরে যায়। শিকার সরে গেলে সুযোগ যায়। সুযোগ গেলে প্রতিশোধ যায়।
মজিদ মোটামুটি নেত্রকোনার সব নেটওয়ার্ক..পুলিশ, পলিটিক্স, গুন্ডাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাকে এবং তার দুই হাত খলিল ও রিদওয়ানকে সরিয়ে দেওয়া মানে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারা। এই তিন স্তম্ভ সরে গেলে পুরো পাতালঘর আর সাপ্লাই চেইনের বিশাল ভার তাকে একাই বইতে হবে, যা এক প্রকার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।
তার সাম্রাজ্য কোনো ইটের দেয়াল নয়, যে একটা ইট খসলে শুধু সামান্য গর্ত হবে; তার সাম্রাজ্য মাকড়সার জালের মতো। জালের কেন্দ্রে আমির বসে থাকলেও এর প্রতিটি সুতো ধরে রেখেছে তার নিজের বাপ-চাচা, ভাইয়েরা আর দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা।
আমির যদি আজ ক্রোধের বশে জালের একটি সুতোও ছিঁড়ে ফেলে, তবে সেই কম্পন মুহূর্তেই পৌঁছে যাবে প্রতিপক্ষের কাছে। তারা বুঝে যাবে, জালের মালিক আজ দুর্বল। তখন তারা হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমির চায় না এই ক্ষমতার লড়াইয়ে শিকারি নিজেই শিকারে পরিণত হোক। তার সঙ্গে বিপদে পড়ুক পদ্মজাও। তার এক পা কাঁদায় পড়লে শত্রুরা দশ পা এগিয়ে যাবে পদ্মজার দিকে। তাই এই রক্তক্ষয়ী খেলায় তাকে অসীম ধৈর্য ধরতে হচ্ছে।
তাছাড়া তার আসল শত্রু নিজের রক্ত নয়, বরং পর্দার আড়ালের ক্ষমতাধররা, যাদের নীলনকশায় পারিজার হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। তার বাবা আর চাচা তো কেবল অস্ত্র। তুচ্ছ অস্ত্র ভেঙে কোনো লাভ নেই; কাটতে হবে সেই হাতকে, যে হাত এই অস্ত্র চালিয়েছে।
তাই তার বিষবৃক্ষের তিন শাণিত অস্ত্র মজিদ, খলিল আর রিদওয়ানকে সে এখনই নষ্ট করবে না। এদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পৌঁছাবে মূল খুনিদের উচ্চতায়। তাদের সমান ক্ষমতাধর হয়ে তবেই সে চূড়ান্ত আঘাত হানবে। সেটুকু ক্ষমতা পেতে যদি আরও এক যুগ অপেক্ষা করতে হয়, আমির তাতেও প্রস্তুত।
মজিদ হাওলাদার এদিক-ওদিক একবার তাকালেন। তারপর আলমগীরের দিকে ফিরলেন। বললেন, ‘রিদওয়ান কোথায়?’
আলমগীর অবাক হয়ে বলল, ‘এখানেই তো ছিল।’
আমিরের চোখ দুটো জ্বলে উঠল। রিদওয়ান এসেছে! সে চেয়ার ছেড়ে উঠল। কোনো কথা না বলে উল্টো ঘুরে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
মজিদ পেছন থেকে ডাকলেন, ‘আমির… বাবু।’
আমিরের দ্বিতীয় অফিসটি ছিল মগবাজারের এক নির্জন গলির পুরোনো আমলের এক বিশাল দালানে। দালানটির বয়স কম করে হলেও পঞ্চাশ ছাড়িয়ে গেছে। এখানেই বসে তার অবৈধ কার্যকলাপের সকল গোপন বৈঠক, এখানেই ফিসফিস করে রচিত হয় নানা ষড়যন্ত্রের নীলনকশা।
অফিস রুমের ঠিক গা ঘেঁষেই একটা ছোট্ট গোপন কক্ষ। বাইরের কোলাহল সেখানে পৌঁছায় না, রাস্তার ধুলো-গন্ধও না। কক্ষটি আমিরের একান্ত ব্যক্তিগত আশ্রয়। ঘরের একদিকের দেয়ালে টাঙানো পদ্মজার একটা বিশালাকার বাঁধানো ছবি।
রিদওয়ান সেই ছবিটির সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কামনার বিকৃত লালসা তার দৃষ্টিতে। সে ধীরে ধীরে হাত তুলল, আঙুলের ডগায় স্পর্শ করল ছবির মসৃণ কাচ, ঠিক পদ্মজার গালের ওপর। বিড়বিড় করে বলল, ‘কী করলে তোমাকে পাব?’
তখনই আমির ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল। রিদওয়ানের হাত তখনও ছবির গায়। আমির এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল। তার পুরো শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। তারপর গর্জে উঠল, ‘হাত সরা, বান্দির বাচ্চা!’
রিদওয়ান চমকে ঘুরে দাঁড়াল। আমির বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। ডান মুষ্টি শূন্যে ঘুরে এসে রিদওয়ানের চোয়ালে বজ্রপাতের মতো লাগল। রিদওয়ান ছিটকে গিয়ে পড়ল সোফায়, পুরো শরীর ঝাঁকুনি খেল। পরক্ষণেই সে উঠে দাঁড়াল। ঠোঁটের রক্ত মুছে বলল, ‘তুই আমার সাথে বেইমানি করেছিস, আমির। কথা ছিল ওকে আমার জন্য তুলে আনবি। অথচ দিনের পর দিন তুই নিজেই ওকে ভোগ করছিস! বেইমানের বেইমান। অনেক বেইমান দেখেছি জীবনে, কিন্তু তোর মতো বেইমান দেখি নাই।’
কথাগুলো বিষের মতো আমিরের কানে ঢুকল। তার চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে উঠল। সে এগিয়ে গিয়ে রিদওয়ানের বুকের পাঞ্জাবির মুঠো খাবলে ধরল, কিড়মিড় করে বলল, ‘মুখ সামলে কথা বল, শুয়ো*! পদ্মজা আমার বউ, আমার বউ। তোর মতো লম্পটের সাহস হয় কী করে ওর ছবিতে হাত দেয়ার?’
এরপর যা হলো, তাকে আর লড়াই বলা যায় না। ঝড় বললেই ঘটনাটির সঙ্গে ন্যায় হয়৷ দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হলো। টেবিলের ওপর রাখা ল্যাম্পটা হুড়মুড়িয়ে মেঝেতে পড়ল, কাচ ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে গেল। ফাইলের স্তূপ আছড়ে পড়ল, কাগজ উড়তে লাগল। আমির রিদওয়ানের কলার চেপে ধরে পুরো শরীরটা তুলে দেয়ালে আছড়ে ফেলল।
রিদওয়ান ব্যথায় মুখ বিকৃত করেও উঠে দাঁড়াল। শ্বাস ভাঙা গলায় বলল, ‘ঝামেলা করিস না। চার বছর তো ভোগ করেছিস। এইবার অন্তত আমাকে দিয়ে দে। ভাগাভাগি কর। আমরা আমরাই তো…’
শব্দগুলো শেষ হওয়ার আগেই আমির এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি চালাতে শুরু করল। বিশ্রী গালিগালাজ ছুটছিল তার মুখ থেকে, সেই সঙ্গে উত্তাল কণ্ঠে বলতে লাগল, ‘ওকে ছুঁতে যাওয়া তো দূরের কথা, ওর ছায়ার দিকে তাকালেও আমি তোর চোখ উপড়ে নেব!’
রিদওয়ান ফাটা ঠোঁটে হাসল। বলল, ‘চোখ নিবি? নে। পদ্মজা তোর বউ, মনে মনে আমারও বউ। এটা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আমার মনকে তো আর ছুঁতে পারবি না।’
আমিরের রাগ এইবার ভাষার সীমা ছাড়িয়ে গেল। সে রিদওয়ানের গলায় দুই হাত চেপে ধরল৷ বলল, ‘তাহলে তোর মনকে নিয়ে তুই কবরে যা।’
ঘরে মজিদ আর আলমগীর ঢুকল হুড়মুড়িয়ে।
মজিদ দৌড়ে এসে আমিরের হাতে ধরে বললেন, ‘আমির! ছাড় ওকে! ছাড় বলছি!’
আলমগীর অন্যদিক থেকে ধরার চেষ্টা করতে করতে বলল, ‘পাগল হলি নাকি? মরে যাবে তো! ছাড়!’
আমির দুজনকে এত সজোরে ঠেলে সরিয়ে দিল যে মজিদ হোঁচট খেয়ে পিছিয়ে গেলেন, আলমগীর দেয়ালে ধাক্কা খেল।
আমির গর্জে উঠল, ‘কেউ মাঝখানে আসবে না! আজ ওর রক্ত দিয়ে আমি এই ঘরের মেঝে ধোবো। ওর জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলব।’
রিদওয়ান টের পেল সে আর পারছে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে। মরিয়া হয়ে সে পকেটে হাত ঢোকাল। বের হলো একটা ছোট ফোল্ডিং ছুরি। নিজের সবটুকু শক্তি একত্রিত করে আমিরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ধারালো ফলাটা আমিরের পিঠে পোঁচ দিল, রক্ত চুইয়ে ভিজিয়ে দিল কাপড়।
আমির আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল। রিদওয়ানের চুলের মুঠি খাবলে ধরে সমস্ত শক্তি দিয়ে মেঝেতে আছাড় দিল। তারপর একের পর এক ঘুষি আসতে লাগল, মুখে, পাঁজরে, মুখে। রিদওয়ানের শরীর ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসতে লাগল।
আমির তার বুকের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে বলল, ‘অনেক শখ না তোর? পদ্মজাকে মনে মনে বউ ভাবিস? আমার বউকে? বান্দির বাচ্চা বল… চিৎকার করে বল, পদ্মজা তোর মা লাগে।’
রিদওয়ান রক্তমাখা মুখ নিয়ে, ঘড়ঘড়ে কণ্ঠে বলল, ‘কখনো বলব না।’
আমির আরও জোরে চেপে ধরল। বলল, ‘বলবি না? তোর জিভ আমি আজ ছিঁড়ে ফেলব। বল শুয়ো*, বল ও তোর মা!’
মরণপণ এই লড়াই দেখে মজিদ হাওলাদার আর ধৈর্য ধরতে পারলেন না। তিনি এগিয়ে এসে রিদওয়ানের মাথায় সজোরে একটা গাট্টা মারলেন। বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘গাধার বাচ্চা, জেদ করিস না। দেখছিস না আমির পাগল হয়ে গেছে? ও তোকে আজ সত্যি সত্যি কবরে পাঠাবে। জান বাঁচাতে চাইলে বলে ফেল যা বলছে!’
আলমগীর রিদওয়ানের দিকে ঝুঁকে বলল, ‘একটাবার বলে দে না ভাই, তাহলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। বল, পদ্মজা তোর মা হয়।’
কথাটা বলেই আলমগীর ঠোঁট কামড়ে ধরল, যাতে কোনোভাবেই হাসির শব্দটা বাইরে বেরিয়ে না আসে। আমিরের মতো মানুষ স্রেফ একটা সম্বোধন স্বীকার করানোর জন্য এমন পাগলামি করতে পারে, সেটা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। আর রিদওয়ানটাও যে কী…জেনেশুনে মৌমাছির চাকে ঢিল ছুঁড়বে। তারপর কাঁদবে কেন কামড়াল?
রিদওয়ান দেখল চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসছে। বুকের ভেতরটা টনটন করছে। বাঁচার আর পথ নেই। সে দাঁতে দাঁত চেপে, চোখে বিষের আগুন নিয়েই কোনোরকমে উচ্চারণ করল, ‘পদ্মজা… পদ্মজা আমার মা। তোর বউ আমার মা।’
ঘরে এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা নামল। পরপরই আমিরের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল হাসি। সে রিদওয়ানের ওপর থেকে উঠে দাঁড়াল, শার্টের হাতা ঠিক করল যেন কিছুই হয়নি। তারপর উঁচু গলায় বলল, ‘যেহেতু পদ্মজা তোর মা, সেহেতু সম্পর্কে আমি আজ থেকে তোর বাপ।’
আলমগীর কপাল চাপড়ে ডাক্তার ডাকতে গেল।
ডাক্তার এলেন কিছুক্ষণের মধ্যে। আমিরের পিঠের ক্ষততে হাত দিতে গেলে আমির ঝাঁকুনি দিয়ে সরে গেল।
রিদওয়ানকে শুইয়ে দেওয়া হলো লম্বা সোফায়। সে তখন আধা-অচেতন। চোখের পাতা ভারী। ঠোঁটের কোণে রক্ত জমাট বেঁধে কালচে হয়েছে, ডান গাল ফুলে কদমফুলের মতো হয়েছে, আর ভ্রুর কাছে থেকে তখনও সরু ধারায় রক্ত গড়াচ্ছে।
ডাক্তার ব্যাগ খুলে বসলেন। তুলা আর স্যালাইন বের করলেন। প্রথমে ক্ষতস্থানগুলো আলতো হাতে পরিষ্কার করলেন। তারপর বায়োডিন লাগালেন কাটা জায়গায়। রিদওয়ান যন্ত্রণায় কেঁপে উঠল। ডাক্তার ভ্রুর কাটাটা কাছ থেকে দেখলেন। আলমগীরকে বললেন, ‘আলোটা একটু এগিয়ে ধরুন।’
আলো এলে তিনি শান্ত গলায় বললেন, ‘দুইটা সেলাই দিতে হবে।’
অ্যানেস্থেটিক ইনজেকশন দেয়ার কিছুক্ষণ পরই ডাক্তার দ্রুত, দক্ষ হাতে দুটো সেলাই দিলেন। সুতো বেঁধে কাটলেন। এরপর দুই হাতে হালকা চাপ দিয়ে পাঁজর পরীক্ষা করলেন। রিদওয়ান কাতরাল। ভাঙেনি, তবে এক-দুটো হাড় মারাত্মক চোট পেয়েছে। বললেন, ‘এক্স-রে করলে নিশ্চিত হওয়া যেত, তবে আপাতত ভাঙার লক্ষণ নেই। বিশ্রামে রাখুন।’
ব্যথানাশক ইনজেকশন দেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই রিদওয়ানের পেশিগুলো ধীরে ধীরে শিথিল হতে শুরু করল। অ্যান্টিবায়োটিকের প্রেসক্রিপশন লিখে দিয়ে বললেন, ‘পাঁচ দিন নিয়মিত খাবেন, একটাও বাদ দেবেন না।’’
কাটা জায়গায় গজ রেখে ব্যান্ডেজ বাঁধলেন। ফাটা ঠোঁটে অ্যান্টিবায়োটিক মলম লাগালেন।
উঠে যাওয়ার আগে আমিরের দিকে ঘুরে বললেন, ‘পিঠের ক্ষতটা ঠিকমতো পরিষ্কার না করলে ইনফেকশন হবে।’
আমির শুনলই না। চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বসে রইল।
জানালার ওপাশে রাতের গাঢ় অন্ধকার। ঘরের ভেতর থমথমে নীরবতা। মেঝেতে তখনও রিদওয়ানের চাপচাপ রক্তের ছিটে। আমির তার ক্ষতবিক্ষত পিঠ নিয়ে কোনোমতে একটা শার্ট গলিয়ে গোল টেবিল মিটিংয়ে বসেছে। ব্যথায় চোয়াল শক্ত হয়ে আছে তার, অথচ চোখের মণি পাথরের মতো স্থির।
গম্ভীর গলায় বলল, ‘চট্টগ্রামের চালানটা আমি নিজেই সামলাব। কাল রাতেই বের হচ্ছি। অলন্দপুর থেকে সরাসরি সাগরের বুক পর্যন্ত ছক কাটা হয়ে গেছে।’
আলমগীর ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘এত মানুষ থাকতে তুই কেন যাবি? চার-পাঁচ দিনের মামলা। রিদওয়ানের যাওয়ার কথা ছিল, ও যখন অকেজো হয়ে পড়ে আছে, তখন আমিই যাই। না হয় কবির বা সুলতান যাক।’
‘না, আমিই যাব। ওখানে আরও একটা হিসেব চুকানোর আছে।’
আলমগীর আর কথা বাড়াল না। নিশ্চয়ই ওর যাওয়ার পেছনে বড় কোনো শিকার লুকিয়ে আছে। তাছাড়া নারীপাচারের চালানে আমিরের সতর্কতা সবসময়ই একটু উগ্র। যতক্ষণ না মেয়েগুলো গন্তব্যে পৌঁছায়, তার স্নায়ুগুলো তপ্ত সীসার মতো টানটান হয়ে থাকে।
মজিদ নীরবতা ভেঙে বললেন, ‘ঠিক আছে, তাহলে কাল রাতেই আমরা একসাথে গ্রামে রওনা দেব। কী বলিস রিদওয়ান?’
সোফায় আধশোয়া হয়ে থাকা রিদওয়ান কোনো জবাব দিল না। তার চোখ দেয়ালের দিকে নিবদ্ধ, মুখে একরাশ তিক্ততা। ঘরটা আবার গুমোট হয়ে আসছিল, তখনি অফিসের ভারি পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকল এক নারী ছায়ামূর্তি। আপাদমস্তক কালো বোরকায় ঢাকা। ঠিক মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে এক ঝটকায় বোরকাটা খুলে সোফায় ছুঁড়ে মারল। পরনে চওড়া লাল পাড়ের শাড়ি। নাম তার আসমানি।
আসমানির রূপ ধারালো ছুরির ফলার মতো। চোখের চাহনিতে চরম ঔদ্ধত্য। শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে কিছুটা আলগা থাকায় তার গায়ের ফরসা রঙের জৌলুসকে আরও উসকে দিচ্ছে। ঘরের গুমোট ভাব ছাপিয়ে হঠাত করেই মাদকতাময় সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।
আসমানি সবার মুখের ওপর নজর বুলিয়ে বলল, ‘এতগুলো বাঘা বাঘা মরদের মধ্যে আমার দায়িত্বটা কে নেবে শুনি?’
মজিদ আমিরের দিকে আড়চোখে চেয়ে গলাটা একটু ঝেড়ে নিলেন। ঘরের গুমোট ভাবটা কাটাতে চাইলেন কি না বোঝা গেল না। তবে গলায় মেকি করুণা মিশিয়ে বললেন, ‘আমির, মেয়েটা তোর মাজেদা দাদির নাতনি। রক্ত বলতে দুনিয়ায় আর কেউ নেই। মাসখানেক আগে মা-টাও মরে গিয়ে ওরে একেবারে অকূলে ভাসিয়ে দিয়ে গেছে। একা মেয়েমানুষ, এভাবে পথে পথে তো আর ঘুরতে দেওয়া যায় না। তোর অফিসে কোনো একটা হিল্লে করা যায় না?’
আমির তার চোখের পলকও তুলল না। টেবিলের ওপর রাখা ফাইলের পাতায় তার কলমটা খসখস শব্দে চলছে। সে পাথর-কঠিন কণ্ঠে জবাব দিল, ‘আমার অফিসে মেয়েমানুষের কোনো জায়গা নেই। ওকে সোজা গ্রামে পাঠিয়ে দাও। বাড়িতে ঝি-চাকর লাগে, সেখানে কোনো কাজে খাটানো যায় কি না দেখো।’
আমিরের অবহেলা আসমানির দর্প আরও বাড়িয়ে দিল। সে দমে যাওয়া তো দূর, বরং এক পা এগিয়ে টেবিলের ওপর দুই হাত রেখে খানিকটা ঝুঁকে দাঁড়াল। তার গায়ের কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ আমিরের নাকে গিয়ে ধাক্কা দিল।
আসমানি এমনভাবে আমিরকে দেখছে যেন চাউনি দিয়েই তার চামড়া ভেদ করে ভেতরে ঢুকে পড়বে। ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা কুটিল, সম্মোহনী হাসিটা আরও চওড়া করে বলল, ‘লোকমুখে তোমার নাম অনেক শুনছি। সামনাসামনি দেখার খুব শখ ছিল… দেখলাম। দেখার মতোই!’
বলেই শব্দ করে হাসল। তারপর কণ্ঠস্বরকে একটু খাদে নামিয়ে বলল, ‘এখনই গ্রামে পাঠিয়ে আমায় নির্বাসন দিয়ো না। কয়টা দিন আমার পাশে থাকো, আমায় একটু চেনো, আমার স্বভাব-চরিত্র জানো। আসমানিরে কাজে লাগানোর মতো হিম্মত তোমার আছে কি না সেটা তো আগে বোঝার দরকার। এরপর না হয় খেদিয়ে দিয়ো! চলে যাবনে।’
আমির এবার মুখ তুলল। আসমানির চাউনি দেখে মুহূর্তেই বুঝে নিল, এই মেয়ে আপাদমস্তক বিষে ভরা এক ‘ফিতনা’।
আসমানি সুযোগটা হাতছাড়া করল না। নিজের শাড়ির চওড়া লাল আঁচলটা কাঁধ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে খানিকটা আলগা করে দিল সে। উদ্ধত ভঙ্গিতে বুনো হাতছানি দিয়ে বলল, ‘আর কাজের কথা ? সে তো এখনো দেখোই নাই। একবার যদি আমার কেরামতি দেখো, ব্যবসা-বাণিজ্য সব চুলোয় দিয়া সারাদিন আমারেই পাহারা দিবা।’
মজিদ হাওলাদার ঘরের কোণ থেকে আসমানির কথার খেলাটা খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। আসমানি এখানে আচমকা উড়ে আসেনি; তাকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে মজিদ নিজেই চাল দিয়েছেন।
আমির পদ্মজার মায়ায় পুরোপুরি আচ্ছন্ন, প্রেমে বিভোর। তাই তিনি এমন কাউকে খুঁজছিলেন, যে আমিরের নিরেট, একঘেয়ে জীবনে নতুন উন্মাদনা নিয়ে আসবে।
মজিদ আড়চোখে আসমানিকে আবার পরখ করলেন। মেয়েটা সত্যিই আগুনের গোলা। পদ্মজার মধ্যে হয়তো স্বর্গীয়, শুদ্ধ স্নিগ্ধতা আছে, কিন্তু আসমানির ভেতরে আছে উগ্র, কামুক সৌন্দর্য। ওর টানাটানা চোখ আর চলনে-বলনে যে শরীরী টান আছে, ওইটুকুই যথেষ্ট যেকোনো শক্ত পুরুষের রক্তে অনায়াসে আগুন ধরিয়ে দেয়ার জন্য।
পদ্মজা যদি হয় ভোরের শীতল শিশির, তবে আসমানি হলো চৈত্র দুপুরের কড়া রোদ। আসমানি যদি একবার তার কামনার বিষ আমিরের মগজে ঢুকিয়ে দিতে পারে, তবেই কেল্লাফতে! পদ্মজার মায়ার বাঁধন ছিঁড়তে তখন এক পলক সময়ও লাগবে না৷
মজিদ পকেট থেকে পানের বাটা বের করতে করতে গলা ঝেড়ে কাশলেন। ধূর্ত চোখে আমিরের দিকে চেয়ে বললেন, ‘আমির, মেয়েটা যখন বলছে, দুই-চারদিন থাকুকই না। দেখ না কোনো কাজে আসে কি না। চট্টগ্রাম যাবি, দীর্ঘ পথ। দুই-তিন দিন লঞ্চে কাটাতে হবে। খাওয়াদাওয়া, তদারকির একটা ব্যাপার আছে। পাশে থাকলে একটু সেবা-যত্ন করতে পারবে। ফিরে এসে না হয় গ্রামে পাঠিয়ে দিস। কী বলিস আলমগীর?’
আলমগীর কোনো মন্তব্য করল না, কেবল অস্বস্তিতে জানলার বাইরের ঘুটঘুটে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।
আমিরের নীরবতাকে আসমানি তার রূপের কাছে নতিস্বীকার বলে ধরে নিল। দুনিয়ার সব পুরুষই তো এক ঘাটের জল খায়! এই পাথরকেও গলানো তার বাম হাতের খেল।
আমির নিস্পৃহ ভঙ্গিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে আসমানির নরম, মোলায়েম হাতটা নিজের শক্ত মুঠোয় নিল। গা ঘেঁষে দাঁড়াল। সঙ্গে আসমানির ঠোঁটের কোণে বিজয়ের হাসি ফুটে ওঠল৷
আমির হাতের বুড়ো আঙুল ও তর্জনীর সাহায্যে বৃত্ত ইশারা (👌🏿) করে প্রশংসার সুরে বলল, ‘একের নটী!’
মুহূর্তেই আসমানির উদ্ধত বিজয়ী হাসিটা পাথরের মতো জমাট বেঁধে গেল। অপমানে বিস্ময়ে তার শ্বাস রুদ্ধ হয়ে এলো। সে কিছু একটা বলতে ঠোঁট ফাঁক করেছিল, আমির তাকে সেই সুযোগটুকুও দিল না। তার হিমশীতল দৃষ্টি ততক্ষণে ঘুরে গেছে ঘরের কোণে ব্যান্ডেজ জড়িয়ে মুখ গোমড়া করে বসে থাকা রিদওয়ানের দিকে। যন্ত্রণায় রিদওয়ানের শরীর আর মন দুটোই তখন বিষিয়ে আছে।
আমির ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘যাও, তুমি বরং ওর কাছে গিয়ে বসো। তোমার উর্বর জমিতে চাষ করার জন্য ওর মতো আদর্শ কৃষক দ্বিতীয়টা হবে না।’
কথাটা শেষ করেই আমির আসমানিকে সজোরে এক ধাক্কা দিল। আসমানি নিজেকে সামলাতে পারল না; টাল খেয়ে সে আছড়ে পড়ল রিদওয়ানের রক্তাক্ত গায়ের ওপর।
আকস্মিক ধাক্কায় রিদওয়ান ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে গালি দিয়ে উঠল, ‘উহ্! শালার পুত… মারলি তো মারলি, এখন এই বান্দিরে আমার গায়ের ওপর…’
বলেই রিদওয়ান থেমে গেল। কথাগুলো আর শেষ হলো না। আসমানি তখনো তার বুকের ওপর আধশোয়া অবস্থায়। ধস্তাধস্তিতে আসমানির এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুলের গোছা রিদওয়ানের গালে আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছে। রিদওয়ান যখন যন্ত্রণাকাতর চোখতুলে তাকাল, তার রাগ আর শরীরের বিষ মুহূর্তেই কর্পূর হয়ে উড়ে গেল। চোখের সামনে কাকে দেখছে? এ তো অপ্সরী। আসমানির চওড়া লাল পাড়ের শাড়িটা কাঁধ থেকে অনেকটা সরে গেছে। ঘাড়ের খাঁজে আর বুকের ওপর বিন্দু বিন্দু ঘাম চিকচিক করছে। অপমানে তার মুখটা লাল হয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু চোখের কোণে এখনো কামুক বুনো হাতছানির রেখা।
মজিদ হাওলাদার আমিরের জন্য তুরুপের তাসই এনেছেন, কিন্তু তাসের মুখটা যে এতটা বিষাক্ত সুন্দর হতে পারে, তা তার কল্পনারও অতীত ছিল।
আসমানি রিদওয়ানের হতভম্ব চাউনি দেখে খুশি হয়ে গেল। হাওলাদার বাড়ির সিংহটা তাকে ফিরিয়ে দিলেও, শেয়ালটাকে বশ করা খুব কঠিন হবে না! সে তার আঙুল দিয়ে রিদওয়ানের রক্তমাখা কলারের ওপর ধীরলয়ে আঁকিবুঁকি করতে করতে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘তা আদর্শ কৃষক সাহেব, চোট কি খুব বেশি লাগছে? তোমার মালিক তো আমায় তোমার জিম্মায় দিয়ে গেল। দেখে রাখতে পারবা তো? আমি কিন্তু আনকোরা কুমারী।’
আমির পেছনে আর ফিরেও তাকাল না। তার কাছে আসমানির শরীরী প্রদর্শনী ছিল নিছক নর্দমার পঙ্কিলতা। গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে সে গাড়িতে গিয়ে উঠল। টায়ার ঘষে ধুলো উড়িয়ে গাড়ি ছুটল তার শহরের মূল অফিসের দিকে, যেখান থেকে তার বৈধ ব্যবসার সব কলকাঠি নাড়া হয়।
অফিসের গদিওয়ালা চেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিতেই কবির এসে সামনে দাঁড়াল। বলল, ‘ভাইজান, দুপুরে ভাবিজান আসছিল। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে গেল। মনে হয় জরুরি কোনো কথা ছিল।’
পদ্মজা নামটা কানে আসামাত্র আমিরের পাথুরে, হিমশীতল মুখভঙ্গি মুহূর্তেই কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কবিরকে একটা জুতসই গালি দিয়ে, আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। বেরিয়ে গেল। টেবিলের ওপরের জরুরি ফাইল, মিটিং সবকিছু পড়ে রইল।
পরদিন। সরকারি ছুটির দিন। মন্ত্রী সালাহউদ্দিন তারিকের ড্রয়িংরুমে পিনপতন নীরবতা। দরজার দিকে পিঠ দিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে আমির। পায়ের ওপর পা তোলা, হাতে ভাঁজ করা খবরের কাগজ। ঠোঁটের কোণে জ্বলন্ত চুরুট থেকে নীল ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে সিলিংয়ের দিকে।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘তোমার সাহস তো কম নয়। মন্ত্রীর বাড়িতে বসে চুরুট ফুঁকছো!’
আমির চমকাল না। এমনকি কাগজটাও নামাল না সঙ্গে সঙ্গে। বরং একটু থেমে, ধীরে ধীরে চুরুটটা অ্যাশট্রেতে রেখে উঠে দাঁড়াল। ঘুরে তাকাল। বিনয়ের সাথে সালাহউদ্দিনের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করল।
সালাহউদ্দিন তারিক সামনা-সামনি বসলেন। তার বয়স পঞ্চাশের কোঠায়, চুলে পাক ধরেছে। বললেন, ‘সরাসরি আলাপে যাই।’
বলেই থামলেন। কিছু ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘আমির, আমরা যখন কাউকে বিশ্বাস করি, তখন তার প্রতিদান হিসেবে আনুগত্য আশা করি। তুমি বিরোধী দলের হাতে অস্ত্রের চালান তুলে দিয়ে সেই বিশ্বাসটা ভেঙে দিলে। এটা কি তোমার মতো একজন দূরদর্শী ব্যবসায়ীর জন্য বোকামি হলো না?’
আমির সোফায় হেলান দিল। তার ভঙ্গিতে কোনো অপরাধবোধ নেই, কোনো ভয়ও নেই। বলল, ‘প্রশ্নটা ভুল করলেন মন্ত্রী সাহেব। আমি বিশ্বাস ভাঙিনি, আমি শুধু বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি। আপনি টানা চারটা চালানের টাকা আটকে রেখেছেন। কারণ হিসেবে বলছেন, ফান্ড রিলিজ হয়নি। কিন্তু আমি জানি সেই টাকা কোথায় গেছে, কোন খাতে ব্যয় হয়েছে, কার পকেটে পৌঁছেছে। আমার নীতিটা একদম সাদা কাগজের মতো পরিষ্কার, আগে পাওনা, তারপর পণ্য।’’
সালাহউদ্দিনের চোখে কিছু একটা খেলা করল। বললেন, ‘তুমি জানো এই মুহূর্তে দেশের ভেতরে যে অস্থিরতা চলছে, সেটা মেটাতে ওই চালানটা আমার জন্য কতটা জরুরি ছিল? তুমি চাইলে কি আর কদিন ধৈর্য ধরতে পারতে না? টাকাটা তো আজ হোক বা কাল, তুমি পেতে।’
‘আমি ব্যবসায়ী মন্ত্রী সাহেব। সমাজসেবক নই। ধৈর্য দিয়ে আমার ঘেরের চিংড়ি বড় হয়, আর সেই ধৈর্যেরও একটা সীমা থাকে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে অস্ত্রের চালান ঘোরে কেবল মুদ্রার বিনিময়ে, প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে নয়।’
তখনই দরজায় একটা সংকোচজড়ানো কাশির শব্দ হলো। মিরাজ ঢুকল। মন্ত্রীর পিএস, বয়স ত্রিশের কোঠায়, মুখে একটা চিরস্থায়ী বিনয়ের আবরণ, কিন্তু চোখে হিসাব আছে। এই মিরাজের সাথেই আমিরের সব লেনদেন হয়, সব ডিলের সুতো এই লোকের হাত দিয়ে গেছে।
তাকে দেখেই সালাহউদ্দিন বললেন, ‘মিরাজ হয়তো তোমাকে ঠিকমতো বোঝাতে পারেনি। সরকারি কিছু ফান্ডের জটিলতার কারণে পেমেন্টটা একটু আটকে আছে। আমরা তো আর রাস্তার খুচরা ব্যবসায়ী নই যে তোমাকে ঠকাবো। তুমি এই চালানটা ক্লিয়ার করো, আমি নিজে কথা দিচ্ছি পেছনের সব পাওনা মিটিয়ে দেওয়া হবে। চলো, একটা সমঝোতায় আসি।’
আমির মিরাজের দিকে একবার তাকাল। তারপর সালাহউদ্দিনের দিকে ফিরে বলল, ‘সমঝোতার সময় পার হয়ে গেছে। আমার বকেয়া টাকা দিয়ে আপনার পিএস নতুন গাড়ি কেনে। ফান্ডে ঝামেলা নেই, ঝামেলা আপনাদের নিয়তে। তাই শেষ অস্ত্রের চালানটা আমি ওই পক্ষকেই দিয়েছি, যারা নগদে বিশ্বাসী।’
মিরাজের মুখ মুহূর্তের জন্য শক্ত হয়ে গেল, তারপর আবার সেই বিনয়ের মুখোশে ঢেকে গেল।
সালাহউদ্দিনের মুখ থেকে নরম ভাবটা সরে গেল। কপালে একটা সরু রেখা ফুটে উঠল। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, ‘এটা তুমি ঠিক করোনি। তুমি জানো ওই অস্ত্রগুলো আমাদের জন্য কতটা ক্রুশিয়াল ছিল? তুমি আমাদের সাথে বেইমানি করলে! যে একবার বিশ্বাসঘাতকতা করে, সে বারবার করে। তোমার ওপর আমাদের যে ভরসা ছিল, সেটা আজ তুমি নিজ হাতে নষ্ট করলে।’
আমির একটু সামনে ঝুঁকল। গলা নামিয়ে, স্পষ্টভাবে বলল, ‘বিশ্বাসঘাতকতা তখন হয়, যখন অপর পক্ষ চুক্তি মানে। আপনারা চুক্তি ভেঙেছেন আগে, আমি শুধু হিসাব বরাবর পদক্ষেপ নিয়েছি।’
মিরাজ সম্পর্কে সালাহউদ্দিন তারিকের শালা। এই পরিচয়টুকুই তার সবচেয়ে বড় সম্পদ, এবং সে জানে সেটা। সেই সম্পর্কের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে মাঝে মাঝেই এমন কথা বলে, যা অন্য কেউ বলার সাহস দেখাত না। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ঝুলিয়ে সে ফোড়ন কাটল।
‘বিশ্বাসঘাতক একটা। নীতি নেই, সততা নেই।’
ঘরের বাতাস একটু ভারী হলো। সালাহউদ্দিন কিছু বললেন না, শুধু চোখ একটু সরু হয়ে গেল। তিনি উৎসুক হয়ে দেখছেন এরপর কী হয়।
আমির ঠান্ডা মাথায় হাসল। বলল, ‘রাতের অন্ধকারে আমার পাঠানো মেয়েদের সামনে যখন ন্যাংটা হোন, তখন আপনার ওই আদর্শ আর নীতি কোন নর্দমায় গিয়ে লুকায়? আপনার মতো মানুষের ইজ্জত তো আমার মেয়েদের বিছানায় রোজ নিলাম হয়।’
মিরাজের মুখ থেকে রক্ত সরে গেল।
সালাহউদ্দিন গর্জন করে উঠলেন, ‘তোমার স্পর্ধা অনেক বেড়ে গেছে আমির! তুমি ভুলে যাচ্ছ তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে আছো? আমার শালাকে তুমি আমার সামনেই…’
আমির একটুও টলল না। বরং সালাহউদ্দিনের দিকে সরাসরি তাকিয়ে কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘মন্ত্রী সাহেব, আমি আপনাকে সম্মান করি। কিন্তু মিরাজ আপনার শালা হলেও আমার কাছে সে স্রেফ একটা বাজারের দালাল।’
কথাটা ঘরের মধ্যে পাথরের মতো পড়ল।
মিরাজ এবার রাগে প্রায় জ্বলে উঠল। তার ভেতরে যে অপমান জমছিল, যে ক্রোধ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল সব একসাথে বেরিয়ে এলো।
‘আমি দালাল? তুই কী? এক পাল বে** মেয়েদের দালাল আর অস্ত্র পাচারকারী! নিজেকে কী ভাবিস তুই? কালই আমি তোর ফ্যাক্টরি, গোডাউন তছনছ করে দিতে পারি!’
আমির ঠান্ডা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইল। বলল, ‘যার পাওয়ারে এই কথা বলছিস, তার গোপন নথির কথাই তো অন্য পার্টির কাছে ফাঁস করেছিস! তুই তো সেই অধম, যে নিজের দুলাভাইয়ের ক্ষমতার দোহাই দিয়ে ফান্ড থেকে দুই কোটি টাকা সরিয়েছিস। বলব নাকি সব কথা?’
ঘরে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। সালাহউদ্দিন চমকে উঠলেন। তার চোখ মিরাজের দিকে ঘুরল।
মিরাজ হকচকিয়ে গেল। চিৎকার করে বলল৷ ‘মিথ্যা কথা! আমাদের মাঝে ঝামেলা লাগাতে এসব বলছে দুলাভাই! এই সাপটাকে আর পুষবেন না। এ আপনার পিঠে ছুরি মারবে।’
আমির তখন উঠে দাঁড়াল। মিরাজের একদম মুখোমুখি হলো সে। দুজনের মাঝে মাত্র কয়েক ইঞ্চির দূরত্ব। হিসহিসিয়ে বলল, ‘আমি পিঠে ছুরি মারি না মিরাজ। আমি বুক বরাবর বুলেট চালাই।’
সেকেন্ড খানেক নীরবতা। তারপর মিরাজের ভেতরে কোথাও কিছু একটা ভেঙে গেল।
সে চিৎকার করে কোমরের পিস্তল বের করল এবং সেটা আমিরের কপালে ঠেকিয়ে দিয়ে বলল, ‘মুখ বন্ধ কর, কুত্তার বাচ্চা!’
আমিরও যেন এই মুহূর্তের অপেক্ষা করছিল। আগে অস্ত্রটা মিরাজ বের করুক! বিদ্যুৎ গতিতে তার হাত কোমরে গেল, এবং পরের মুহূর্তেই তার রিভলবার মিরাজের কপালে ঠেকে গেল। দুটো অস্ত্র, দুটো কপাল, দুটো মানুষ.. মাঝখানে একটা ট্রিগারের দূরত্ব।
আমির হাওলাদার পর্ব ১
আমির গলা উঁচিয়ে বলল, ‘ট্রিগার চাপ মিরাজ! সাহস থাকলে চাপ! আমির যখন অস্ত্র হাতে নেয়, তখন সে তার প্রতিপক্ষকে মানুষ হিসেবেই গণ্য করে না। আর তুই তো স্রেফ একটা কীটপতঙ্গ। তোর আঙুল কাঁপার আগেই তোর মাথার মগজ পেছনের দেয়ালে লেপ্টে যাবে।’
মিরাজ হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সত্যি সত্যি ট্রিগার চেপে দিল। চমকে উঠলেন সালাহউদ্দিন তারিক।
