প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৬
ইনান হাওলাদার
আজ ছুটির দিন হওয়ায় আহি ভেবেছিল বেলা দশটা অবধি ঘুমিয়ে তবে উঠবে।কিন্তু ,সেটা আর হলো কই? সকাল সকাল মোবাইলটা কানের কাছে ক্যাক ক্যাক করে উঠেছে। সে এ্যালার্মটা বন্ধ করে ফের শুয়ে পড়ল।
একবার সাধের ঘুম নষ্ট হলে সেটা কি আর ঠিক হয়! তবুও সে চেষ্টা চালিয়ে গেল।দীর্ঘ আধ ঘন্টা চোখ বন্ধ করে পড়ে থেকেও ঘুম আসলো না।অগত্যা লা’শের মতো পড়ে না থেকে উঠে গেল। তাছাড়া যতই ছুটির দিন হোক আর এমনি দিন হোক ঘুম থেকে উঠতে একটু বেলা হলেই মারুফা বেগম খ্যাক খ্যাক করেন। তাই উঠে পড়াই ভালো।
ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলো সে। মা – চাচিরা রান্নার তোড়জোড় করছে। আহি গিয়ে কুঁচিয়ে রাখা গাজর তুলে খেতে খেতে বললো,
” গাজর খেতে তেমন ভালো লাগে না তাই না ,ছোট মা ? ”
” হ্যাঁ, মা।তবুও ছা’গলের মতো চিবুতে বেশ ভালো লাগে”
বলে হেসে দিলেন লতা বেগম। আহি বলল,
” যতই খোঁ’চা মা’রুন কাজ হবে না,আমি তো খাবোই।” তারপর একটু ভাবুক হয়ে বলল,
” কিছু কিছু জিনিস আছে যেগুলো মুখে ভালো লাগে না তবুও খেতে ইচ্ছা করে । তাই না বড় মা ? ”
পারভিন বেগম ‘ হ্যাঁ ‘ সূচক মাথা নেড়ে বললেন,
” হ্যাঁ,মাগো। তা তোর কি ভালো লাগে শুনি ! ”
আহি বিড়বিড় করে বলল,
” আপনার ছেলেকে !”
তবে তিন জা’ই স্পষ্ট শুনতে পেলেন।কিন্তু আহিকে বুঝতে দিলেন না । মুখ চেপে শুধু হাসলেন। মারুফা বেগম বিড়বিড় করে বললেন,
” শ’য়তানের বাচ্চা ! ”
আহি একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
” তোমার বাচ্চা!” তারপর আবার মারুফা বেগমকে কিছু বলতে না দিয়ে বলল,
” আপনারা জানেন? আমার ইচ্ছা ছিল একটু প্রেম – ভালোবাসা করে বিয়ে করার।কিন্তু বাড়ির সকলে সেটা জানবে।শুধু আব্বু ,বড় আব্বু আর ছোট আব্বু বাদে। ”
লতা বেগম খুঁচিয়ে জানতে চাইলেন,
” তা এখনও প্রেম – ভালোবাসা হয়েছে মা? নাকি শুধু ধমকা – ধমকিই চলে?” শেষ কথাটা বিড়বিড় করে বললেন তিনি।আহি বলল,
” এখনও প্রেম করছি না ,কিন্তু একজনকে ভালোবাসি ”
” ওওওওও” তিন জা’য়ে একসাথে লম্বা করে বললেন।
আহি বি’রক্ত হলো। কোথায় নাম জানতে চাইবে সেটা না করে ‘ ও ‘ ‘ ও ‘ গান শুরু করেছে। সে বলল,
” কি ও ,ও করছেন আপনারা ? নাম জানতে চাইবেন না ? সেটা আর কেউ না, আমাদের নান আদার দ্যান …..”
বাকিরা বলতে দিলেন না মারুফা বেগম। খুন্তি নিয়ে তেড়ে আসলেন।আহি হাসতে হাসতে এক দৌঁড় লাগালো।সে কি পা’গল? তূর্য ভাইয়ের নাম বলে দিতো ? একটু দু’ষ্টুমি করতে মন চাইছিল তাই এসব করলো। সে জীবনেও এসব ঝামেলায় জড়াবে না। বাড়িতে জানানোর দায়িত্ব না হয় তূর্য ভাই নিলেন।তিনি এগুলো করে বেড়াক,বো’মা ফাটাক।
তার অত মা’র খাওয়ার শখ নেই। সে পারলে আরো নিজের গা বাঁচাবে।কিন্তু একেবারে স্বীকার না গেলেও নয়।পরে আবার তূর্য ভাই পিঠে ভাদুরে তাল ফেলবেন।
আহি যেতেই মারুফা বেগম চিন্তিত হয়ে বললেন,
” বুবু? আহি কি বলতো? আমাদের নান আদার দ্যান তূর্য ভাই? তূর্যকে আমাদেরও ভাই বানিয়ে দিতো? না’উজুবিল্লাহ ! ” পারভিন বেগম হাসলেন।মারুফা বেগম ফের বললেন,
” শান্ত – প্রান্ত নির্বাচনের সময় যেমন স্লো গান দিতো
‘ তোমার ভাই ,আমার ভাই ,আসিফ ভাই ,আসিফ ভাই । আসিফ ভাইয়ের মার্কা ………. মার্কা ! ”
বলে তিন জায়ে অট্ট হাসিতে ফেঁটে পড়লেন।পারভিন বেগম বললেন,
” মা – মেয়ে দুটোই এক। তুইও বয়স কালে আহির মতো ছিলি তাই না রে?”
মারুফা বেগম হাসতে হাসতে দুই পাশে মাথা নাড়লেন।তারপর গম্ভীর হয়ে বললেন,
” এই মেয়ের বুদ্ধি হবে কবে? সারা জীবন এমন আধ ধামড়াই থেকে যাবে ? ”
লতা বেগম বললেন ,
” বুদ্ধি দেখানোর জায়গা এখনো আসলো কবে ,মেজো বুবু? ঠিক সময় বুদ্ধি আপনা আপনি চলে আসবে।একটু বেশি দু’ষ্টু তাই এমন করে।তোমার রুটি পুড়ে গেল,শিগগির দেখো ”
মারুফা বেগম রুটি উল্টে দিলেন।পারভিন বেগম বললেন,
” লতা ঠিক বলেছিস।” তারপর একটু কপট গম্ভীরতা দেখলেন তিনি,বললেন,” আর মেজো তোকে বলে রাখি ,এখন থেকে আমার একমাত্র পুত্রবধূকে এত গাল মন্দ করবি না। আমি কিন্তু সহ্য করবো না ”
” তোমার আধ ধা’মড়া পুত্র বধূকে একটু আদব কায়দা শিখিও,বুবু। ”
প্রতিটা ছেলেই আউটডোর খেলাধুলা প্রিয় হয়। কারো কম , কারো বা বেশি। আমাদের দেশে সাধারণত ক্রিকেট এবং ফুটবল খেলার জনপ্রিয়তা সব থেকে বেশি।আর ছেলে পেলে ওইসব খেলাই বেশি খেলে।তবে তূর্য তাদের থেকে ভিন্ন।তার ব্যাট মিন্টন খেলতে ভালো লাগে।আর অনেক এক্সপার্টও।আর শীত কাল হলো এই খেলার উপযুক্ত সময়। যে শুধু র’্যাকেট হাতে ধরা শিখেছে সেও খেলতে নামে। আর পুরো শীত কাল ধরে প্রতিদিন সকালে চৌধুরী বাড়ির ছাদে এক খেলা চলবে। এখনো চলছে ।
তূর্য একপাশে আর অন্য পাশে শান্ত আর প্রান্ত। তবুও তারা দুইজনে মিলে তূর্যের সাথে পেরে উঠছে না। কারো গায়েই গরম পোশাক নেই।খানিক আগে যদিও ছিল।গরম লাগায় খুলে রেখেছে।টিশার্ট – ট্রাউজার পরেই তিন ভাইয়ে খেলছে।
মায়েদের সাথে দুষ্টুমি করে আহিও ছাদে আসলো।শীতের সকালের রোদ খুব মিষ্টি লাগে। কিন্তু ওদের ব্যাট মিনটন খেলতে দেখে আহি উৎফুল্লতা সাথে বলল,
” আমিও খেলব ! ”
” তুই পারিস না আহিপু। বসে বসে খেলা দ্যাখ ”
এরা কখনো তাকে খেলায় নেই না। পরে শখ মেটাতে তাকে তাহির সাথে খেলতে হয়।তাহিও পারে না, সেও পারে না। দুইজনে মিলে এলোপাতাড়ি খেলা খেলে যখন মাজা পিঠ ধরে যায় তখন খেলা বন্ধ করে।আহি বুঝলো এদের বলে লাভ হবে না।সে তূর্যকে বলল,
” একটু নিন না তূর্য ভাই ! ”
তূর্য বাম হাতে কর্ক ক্যাচ করে আহিকে অপর দিকে ইশারা করে বললো,
” যা ”
শান্ত – প্রান্ত আর কথা বললো না।বড় ভাইয়ের উপরে আর কি বলবে। আহির সাথে তাদের খেলতে বলেনি এটাই যথেষ্ট।আ’ত্মাটা শান্তি পেয়েছে। কর্ক একবার উত্তর মেরুতে দেয় তো আরেকবার দক্ষিণ মেরুতে।খাটতে খাটতে জীবন শেষ। প্রান্ত ভদ্র ভাবে নিজের র ্যাকেটটা আহির হাতে দিলো । আহি তো মহা খুশি।মেঘ না চাইতেই জল।তূর্য ভাইয়ের সাথে খেলতে পারছে। আহা !
খেলোয়াড় তূর্য ভাই কি ড্যাশিং ! চোখ সরছে না তার।তূর্যকে ভালো করে পরখ করলো সে।
ঢোলা ঢালা টিশার্টটার বুক ও পিঠের দিকে ঘেমে ভিজে আছে। সামনের বড়বড় চুলগুলো ভিজে কপালের সাথে লেগে আছে। একটু খেললেই মানুষ এত ঘামে? তাছাড়া,ঘামলেও মানুষকে এত সুন্দর লাগে?
একটু হাসছেও না।কি লুক! এত সুন্দর কেন তূর্য ভাই? আহির কান্না করতে মন চাইছে।ছেলে মানুষের এত সুন্দর হতে আছে নাকি? মেয়েদের ন’জর লাগে যদি? অন্য মেয়েদের কথা কি বলবে তারই তো ন’জর লেগে যাচ্ছে। বিয়ের পর প্রতিদিন একটা করে শুকনো মরিচ পো’ড়া দিয়ে নজর কাটাতে হবে।
শান্ত – প্রান্ত ভ্রু কুঁচকে শুধু খেলা দেখে যাচ্ছে। তাদের সাথে তূর্য ভাইয়া কেমন খেলেছে? প্রতিটা বাড়িতে বাড়িতে চাপ! আর আহিপুর সাথে কেমন খেলছে? উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরুর বল গুলো এনে এনে একদম র্ ্যাকেটের উপরে দিচ্ছে।আহ র শুধু জায়গায় দাঁড়িয়ে একটু হাত নারালেই যথেষ্ট। তূর্য ভাইয়া তাদের সাথে পার্শিয়ালিটি করেছেন? তারা এক সাথে অ’ভিযোগের সুরে বলল,
” ভাইয়া,আপনি আহিপুর সাথে কি সুন্দর করে খেলছেন । তাহলে আমাদের সাথে কেন এমন খেললেন ? ”
আহি কর্কে বাড়ি মে’রে একটা হাসি দিয়ে বলল,
” জ্ব’লে? জ্ব’লে ? ”
তূর্য বলল,
” ও তো পারে না,তোরা তো পারিস ”
” পারেনা,তাহলে শিখিয়ে দিন ভাইয়া।তবুও ওর সাথে এত সুন্দর খেলবেন না ”
আহি বেসুরো গলায় গান ধরলো,
” তোমার কেনো জ্ব’লেরে বন্ধু ,তোমার কেনো জ্ব’লে? ”
” আচ্ছা, তুই শেখা ” বলে শান্তর কাছে র ্যাকেট দিয়ে ছাদের রেলিং ঘেঁষে দূরে সরে দাঁড়ালো তূর্য।কপালে ফোঁটা ফোঁটা হয়ে জমে থাকা ঘামগুলো বৃদ্ধা আঙুলের সাহায্যে ফেলল। কপালে জায়গা প্রাপ্ত চুলগুলো ব্যাক ব্রাশ করলো।
দূর থেকেই ওদের পর্যবেক্ষণ করছে সে। আহি ঠিক মতো খেলতে পারছে না দেখে সে ফের এগিয়ে গেল।পিছন থেকে আহির র ্যাকেট ধরে রাখা হাতের উপর নিজের হাত দিয়ে
র ্যাকেট ধরলো।তারপর বিপরীত পাশ থেকে আসা কর্কে বাড়ি মে’রে বলল,
” এভাবে খেলতে হয় ই’ডিয়ট ”
তূর্য এক হাত পকেটে গুজে রেখেছে আর আরেক হাত দিয়ে খেলছে। আহি পুরো তূর্যের বুকের সাথে সিটিয়ে আছে। আবার তূর্য ভাই এভাবে কাছে এসেছেন।সে শুধু অসাড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।তূর্য ডানে নিলে ডানে যাচ্ছে,বামে নিলে বামে যাচ্ছে। নিজ থেকে একটুও নড়ছে না।মুখে বি’রক্তির ভাব স্পষ্ট হলো তূর্যের ।এভাবে টেনে টেনে কত নেওয়া যায়? স্টু’পিডটা এগোতেও জানে না। সে পকেটে গুজে রাখা হাত বের করলো।সেটা আহির গায়ে জড়ানো শালের নিচ দিয়ে ওর পেটের মাঝ বরাবর রাখলো।সাথে সাথে আহি ধড়ফড়িয়ে উঠে চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিয়েছে। নিশ্বাস পুরো আটকে রেখেছে।তূর্য আগে পিছে না ভেবেই হাত রেখেছিল।কিন্তু শ্বাসের তালে আহির পেটের ওঠা নামা বন্ধ হয়ে গিয়েছে অনুভব করতে পেরে নিজের অবস্থান বুঝলো সে। তবে হাত সরালো না, আরো শক্ত করে চেপে ধরলো।সাথে সাথে আহি মৃদু আর্তনাদ করে বলল,
” তূ..তূর্য ভাই ! ”
বাঁকা হাসলো তূর্য।
” হুম ! বল ” এমন ভাবে বলল যেন কিছু জানে না সে। আহি আমতা আমতা করে বলল,
” ছেড়ে দিন ”
শুনেও না শুনার ভাব ধরলো তূর্য।উচ্চ কন্ঠে বললো,
” জো’রে বল,শুনতে পাই না ”
প্রান্ত ভাবলো হয়তো তাদের বলেছে।সে বললো,
” আমরা কিছু বলিনি তো ”
আহি ফের বললো,
” ছেড়ে দিন! ”
” ফার্স্ট নিঃশ্বাস ছাড় দ্যান দেখছি! ”
নিঃশ্বাস না ছাড়লে তো সে এমনিই ম’রে যাবে। নিঃশ্বাস তো নিচ্ছিলই। এখন বড় করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়লো আহি।কিন্তু তূর্যের কোনো হেলদোল নেই। সে খেলেই যাচ্ছে।ঠোঁটের কোনে বাঁকা হাসি।
শুধু মুখেই ফটর ফটর করতে জানে । একটু কাছে আসলেই হাওয়া ফুরুৎ! আহি মিনমিন করে পুনরায় ডাকলো,
” তূর্য ভাই ! আমি খেলা শিখব না ”
” হোয়াই ? ”
” এম ..এমনি !”
” ডাল ভাতই হজম করতে পারিস না,আবার মাংস ভাত খেতে চাস! ”
বলে আহিকে ছেরে দিলো তূর্য।রেলিংয়ের উপর রাখা জাকেটটা কাঁধে বাঁধিয়ে নিচে চলে গেল।
আহি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে । তূর্য ভাই মাংস ভাতের কাহিনী কিভাবে জানলেন? সে তো কাল মনে মনে বলেছিল। উনি কিভাবে শুনলেন? আহি একটু ভাবলো, আগে কি কখনো বলেছে এই কথা? কই তার তো মনে পড়ছে না ! তারপর হুট করে মাথায় আসলো কয়েকদিন আগের কথা !
কয়েকদিন আগে সে তূর্যের ঘর গোছাতে গিয়েছিল।তখন একটা শার্ট পেয়ে দুই হাতে সামনে তুলে বলেছিল,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৩৫ (২)
” প্রিয় ভর্তা ভাতওয়ালা তূর্য ভাই , ভাব না দেখিয়ে একটু মাংস ভাতও তো খাওয়াতে পারেন। খাওয়াবেন কিভাবে ? আপনি তো আমার স্পেশাল মাংস ভাত চিনেনও না। ” বলে তূর্যের শার্টে এলোপাতাড়ি কয়েকটা চুমু খেয়ে বলেছিল,”একে বলে মাংস ভাত। স্পেশাল মাংস ভাত! “তারপর ঘাড় ঘুরিয়েই তূর্যকে দেখতে পায়।সে রুমে ঢুকছে।আহি তো ভেবেছিল তূর্য ভাই কিচ্ছু শুনতে পাননি।শুনলে তো ধ’মক দিতেন। তাহলে সেদিন তিনি সবটা শুনতে পেয়েছিলেন? আর সেটা মনেও রেখে দিয়েছেন?
