Home আনহেলদি অবসেশন আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৬

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৬

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৬
কায়নাত খান কবিতা

দরজায় পিং দেওয়ার ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসতেই অরিন নিজেকে সামলে নেয়। মুহূর্তের ভেতর এলোমেলো ভাবটা গুছিয়ে নিয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ে সে। কম্ফোর্টারের ভেতর গুটিসুটি মেরে নিজেকে মুড়ে ফেলে, নিঃশ্বাসটুকু পর্যন্ত যত্ন করে বেঁধে রেখে ঘুমের অভিনয়ে ডুবে যায়।
কিংশুক ঘরে ঢুকেই থমকে দাঁড়ায়। চারপাশে ধীর, তীক্ষ্ণ চোখ বুলিয়ে অরিনকে খুঁজতে থাকে। কোথাও না পেয়ে তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে যায় খাটের দিকে।

সেখানে একদম ছোট্ট বাচ্চার মতো।মুখসহ পুরো শরীর কম্ফোর্টারের ভেতর গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে অরিন।
ঠোঁটের কোণে একফোঁটা হাসি খেলে যায় কিংশুকের। নিঃশব্দে দরজা লক করে সে এগিয়ে আসে বিছানার কাছে। তারপর কোনো শব্দ না করে কম্ফোর্টারের ভেতরেই ঢুকে পড়ে।
কিংশুকের উপস্থিতি টের পেয়েই অরিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। মুহূর্তের জন্য সে যেন নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে যায়।চারপাশ হঠাৎ করে অদ্ভুত রকম ভারী হয়ে আসে।
কিংশুক একেবারে অরিনের শরীর ঘেঁষে শুয়ে পড়ে। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস এসে আলতো করে আছড়ে পড়ে অরিনের কাঁধে। সেই স্পর্শে অরিনের নিঃশ্বাসটা থমকে যায়।

চোখ মেলতে চেয়েও ভয়ে মেলতে পারে না অরিন। যদি কিংশুক বুঝে ফেলে অরিনজেগে আছে? যদি তখনই কোনো অঘটন ঘটে যায়? ভাবনাটুকুই অরিনের বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দেয়।
তাই সে নিঃশব্দে পড়ে থাকে। জড়বস্তুর মতোই শুয়ে থাকার ভান ধরে রাখে নিজেকে।নড়াচড়া নেই, প্রতিবাদ নেই।শুধু চাপা আতঙ্ক আর থমকে থাকা, তাই যদি নিজেকে বাঁচাতে পারে সে।
কিন্তু ধীরে ধীরে অরিন টের পায়,তার কণ্ঠদেশে নেমে এসেছে নরম ঠোঁটের ক্ষীণ ছোঁয়া।
শুকনো ঢোক গিলে নেয় অরিন। সেই নরম ছোঁয়ায় তার কণ্ঠদেশে অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে। কোনো রকম বিরতি ছাড়াই পরপর আদুরে পরশ পড়তে থাকে তার গলায়।
পাতলা চামড়াটা যেন ভিজে ওঠার উপক্রম হয়ে এসেছে , শরীরটা আরো শক্ত হয়ে আসে তার। কোনো রকমের নড়াচড়া করা যাবে না।

কিন্তু তলপেটের গভীরে কারও হাতের ছোঁয়া অনুভব করতেই অরিন থমকে যায়। মুহূর্তের মধ্যে শরীরটা যেন জমে আসে। ধীরে ধীরে হাতটির ছোঁয়া আরো বেসামাল হতে থাকে। অরিনের স্পর্শ কাতর স্থানে ও পৌঁছে যায় স্পর্শ গুলো।
হঠাৎ ধাক্কা মেরে কিংশুককে নিজের থেকে আলাদা করে উঠে বসে অরিন। তাড়াহুড়োয় শ্বাসটা এলোমেলো হয়ে যায়, বুকের ভেতরটা ধকধক করে ওঠে। সে বিছানার এক কোণে সরে গিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে।
কিংশুক অবশ্য নড়েনা। চুপচাপ আধকাত হয়ে শুয়ে থাকে।এক হাত মাথার পাশে ঠেকানো। নিস্তব্ধ চোখে সে অরিনের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন কিছু বলবে।অথচ কোনো শব্দই বের হয় না। নীরবতার ভেতরটা তখন আরও ভারী হয়ে ওঠে।

—- এ বউ কাছে আয় না।”
হঠাৎ অরিনের বাহু চেপে ধরে এক টানে নিজের দিকে টেনে নেয় কিংশুক। মুহূর্তের মধ্যেই তার পুরো শরীরটা কিংশুকের আয়ত্তে চলে আসে। অপ্রস্তুত টানে অরিনের দম আটকে যায়, ভারসাম্য হারিয়ে সে নড়াচড়া করতেও পারে না।চারপাশটা যেন হঠাৎ করে আরও সংকুচিত হয়ে পরে। কিংশুকের সম্পূর্ণ নিঃশ্বাস উপচে পরে অরিনের পুরো মুখে।
— কিং?”
অরিনের কোমল ওষ্ঠে আঙুল ছুঁইয়ে তার কথা থামিয়ে দেয় কিংশুক। তারপর ধীরে ধীরে মুখ ঝুঁকিয়ে নেয় অরিনের কর্ণমূলের কাছে, নিশ্বাসের উষ্ণতায় কাঁপন তুলে নীচু স্বরে বলে।
— আমায় আদর কর।”
কিংশুকের এই হেয়ালি কথায় চোখ কপালে উঠে যায় অরিনের। বিস্ময় আর অস্বস্তির মিশেলে সে এক মুহূর্ত কিংশুকের দিকে তাকিয়ে থাকে।যেন কথাটার ভেতরের অর্থ সে বুঝে ও বুঝতে চাইছে নাহ।

—- আই নিড স্যাম টাইমস কিং।”
—- দু-বছর তো পেয়েছো আর কত?”
অরিন বুঝে উঠতে পারে নাএই মুহূর্তে সে কী বলবে। কিংশুককে আটকানো তো দূরের কথা, তাকে থামানোর সাধ্যই নেই তার। পরিস্থিতির ভারে সে নির্বাক হয়ে শুয়ে থাকে, শ্বাসটুকু পর্যন্ত যেন নিজের নয়।সমস্তটাই দখল করে রেখেছে কিংশুক।
—- প্লিজ কিং। আজকের রাতটা…!”
সম্পূর্ণ কথা শেষ করার আগেই অরিনকে থামিয়ে দেয় কিংশুক। কপালে একটুখানি চুমু এঁকে দিয়ে ধীরে সরে পড়ে যায় সে।

—-শুধু আজকের রাতটাই।”
আর কোনো কথা না বলে সে নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
কিংশুকের প্রস্থানেই অরিন গভীরভাবে নিঃশ্বাস নেয়। মনে হয়, ঠিক যেন এক ভয়ংকর চাপের ভেতর থেকে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছে সে ।
পরক্ষণেই মনটা পাথরের মতো শক্ত করে নেয় অরিন। আর অপেক্ষা নয়। এবার পালানো ছাড়া কোনো পথ নেই।
আজই, এই রাতেই তাকে পালাতে হবে।
ঘড়ির কাঁটাটি যেন নিষ্ঠুরভাবে মনে করিয়ে দেয়।তার কাছে সময় আছে মাত্র বারোটা ঘণ্টা।
তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়িয়ে অরিন চারপাশটা খুঁজে দেখতে থাকে। কোথাও না কোথাও নিশ্চয়ই বের হওয়ার পথ পাওয়া যাবে ।পালানোর মতো কোনো সুযোগ সে পাবেই।
এই বিশাল বাড়ি থেকে বের হওয়ার অন্তত একটা পথ তো আছেই।

বেলকনিতে গিয়ে অরিন সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশটা পর্যবেক্ষণ করতে থাকে। যত দূর চোখ যায়, বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে একমাত্র দাঁড়িয়ে আছে কিংশুকের এই বাড়িটাই।নিঃসঙ্গ, অথচ ভয়ংকরভাবে প্রভাবশালী। সামনে খোলা আকাশ, আর পিছনদিকে গর্জনহীন গভীর সমুদ্র,ঢেউয়ের শব্দ যেন নীরবতাকে আরও ভারী করে তোলে।
বাড়িটা আধুনিক স্থাপত্যে গড়া।উঁচু দেয়াল, কাচের বড় বড় জানালা, চারদিকে ছড়িয়ে থাকা ব্যালকনি আর সাদা,ধূসর রঙের ঠান্ডা আভিজাত্য। দূরে দূরে কিছু লাইট জ্বলছে, কিন্তু কোথাও মানুষের উপস্থিতির চিহ্ন নেই।
কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে অরিনের।এত নিঃসঙ্গ জায়গা থেকে সে পালাবে কীভাবে? ঠিক তখনই তার চোখ গিয়ে আটকে যায় পাশের ঘন জঙ্গলের দিকে। অগোছালো গাছপালা আর অন্ধকার ছায়ার ভেতরেই কি লুকিয়ে আছে তার মুক্তির পথ?

রাত তখন ঠিক ১২টা ৪৫ মিনিট।
কিংস ম্যানশনের ফাঁকা সোফা রুমটা নীরবতায় ভরে আছে। চারপাশে ছড়িয়ে থাকা দামী আসবাব, বড় কাচের দেয়াল আর স্থির ঘড়ির টিকটিক শব্দ ছাড়া সেখানে কোনো নড়াচড়া নেই।
বড় টিভি স্ক্রিনজুড়ে অরিনের স্থির ছবি।
ঘরের আলো ম্লান, নীরবতা ভারী। ঠিক যেন দেয়ালগুলোও নিঃশ্বাস চেপে আছে।
কিংশুক সোফায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে না, বসেও থাকে না, এক অদ্ভুত অস্থিরতায়।
চোখ আটকে থাকে স্ক্রিনে, ঠোঁটে ভাসে এক অচেনা কোমলতা।
নিজের অজান্তেই গেয়ে উঠে কিং।

Hey… ae nasha, ae zehar…
Iss pyaar ko hum kya naam dein…
Kam se adhoori hai ek dastaan,
Aao isse aaj anjaam dein…
Tumhein bhooloon kaise main…
Yaara, iss mein jahaan tum ho…
Oh… main jo jee raha hoon, wajah tum ho…

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৫

টিভির স্ক্রিনের সামনে এসে দাড়ায় কিংশুক। বড় স্ক্রিনজুড়ে ভেসে থাকা অরিনের ছবিটার দিকে একমুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে। তারপর ধীরে, প্রায় ভক্তির মতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায় ছবিটার ওপর একটা নীরব চুমু।
আঙুলের ডগা দিয়ে স্ক্রিনে ভেসে থাকা মুখাবয়ব স্পর্শ করতে থাকে সে, যেন কাচের ওপার থেকেও অরিনের অস্তিত্ব ছুঁয়ে ধরতে চাইছে। চোখে তখন অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতি ভালোবাসা।
—- আমার না হলে, নিজের হাতে জানাজা দিতে ও দু-সেকেন্ড ভাবব না।”

আনহেলদি অবসেশন পর্ব ২৭