প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৫
ইনান হাওলাদার
হলে সিট পেয়েছে শবনম ।সপ্তাহ খানেক আগেই খবর পেয়েছে মেয়েটা । বাড়ির তিন গিন্নি আর আহি জোর করে কয়েকদিন আটকে রেখেছিল তাকে।কিন্তু এখন হলে উঠতেই হবে। অথরিটি তো আর তার জন্যে সপ্তাহের পর সপ্তাহ সিট ফাঁকা রেখে অপেক্ষা করবে না।চৌধুরী বাড়ির সকলে বলেছিল তাকে এখানেই থেকে যেতে কিন্তু মেয়েটা রাজি হলো না।কয়েক মাস হলে থাকা যায় ,কিন্তু এভাবে বছরের পর বছর থাকাটা তার ভালো লাগছে না। চলেই যখন যাবে তাহলে আর কি করার!
ঝা’মেলার উপর ঝা’মেলা! মোবাইল হাতে নিয়ে বসে আছেন পারভিন বেগম।ভেবেছিলেন তূর্যকে দিয়ে মেয়েটাকে পাঠাবেন। ছেলেকে কথাটা বলার সাথে সে ‘ না ‘ করে দিয়েছে।পারবে না সে।এদিকে বিকালেই চলে যাবে শবনম।এখন মেয়েটাকে কাকে দিয়ে পাঠাবেন,কি করবেন কিছু বুঝতে পারছেন না তিনি।যদিও সে একাই যেতে পারবে । কিন্তু তারা তো আর একা ছাড়তে পারেন না।
এরমধ্যে কিছু একটা নিতে আহি তার রুমে আসলো।কিন্তু বড়মা’র চিন্তিত মুখ দেখে নিজের কথা রেখে তার চিন্তার কারণ জানতে চাইলো।পারভিন বেগম সবটা বললেন।আহিও চিন্তায় পড়লো।তাহলে শবনমকে কে দিয়ে আসবে? সে কি একবার তূর্যকে বলে দেখবে? দেখুক বলে!যদি কিছু করা যায়। ইদানিং সে কিছুর বায়না ধরলে তূর্য ‘ না ‘ ‘ না ‘ করতে করতে শেষে বাধ্য হয়ে ঠিকই মেনে নেই ।
সে বড়মাকে আশ্বাস দিয়ে নিজের রুমে গেল আহি।তূর্যের নম্বরে কল লাগলো।কয়েক বারের মাথায় রিসিভ হলো কল,সাথে ওপাশের ব্যক্তিটার ধ’মকমিশ্রিত কন্ঠস্বর ,
” কল রিসিভ করছি না, ব্যস্ত আছি বুঝছিস না? একাধারে কল দিয়ে যাচ্ছিস। তোর কমনসেন্স কবে কবে হবে আহি ? ”
তূর্যের পুরো কথাটা শুনে কল কাটলো আহি।
কিছুক্ষণ পর মাথা ঠান্ডা করে একটা ভয়েস ম্যাসেজ পাঠালো সে,
” রে’গে যাস না আবার। আইসক্রিম নিয়ে যেতে বলেছিস।খেয়াল আছে আমার।কল করে মনে করতে হবে না ”
তার বিপরীতে আহি ছোট্ট করে একটা টেক্সট করলো,
” অন্য কথা বলার আছে ”
এসএমএস’টা দেখে কল করলো তূর্য।রিসিভ হতেই বলল,
” হ্যাঁ,বল ”
” আপনি একটু শবনমকে দিয়ে আসবেন তূর্য ভাই ? ”
” না ! ” কাটকাট গলার সংক্ষিপ্ত উত্তর তূর্যের।
” কেনো?কি সমসা?আজকে বিকেলে তো আপনি ফ্রী থাকবেন ”
” ঘুরে ফিরে প্রবলেমটা ঠিক তোর-ই হবে ”
আহি এবার বুঝলো তূর্য কেন ‘ না ‘ ‘ না ‘ করছে।সেদিন তো সে শুধু একটা তুলনা দেওয়ার জন্যে শবনমের কথা বলেছিল।এর থেকে বেশি কিছু বোঝায়নি।আর তূর্য ভাই সেটাকে ধরে রেখেছেন? ছিঃ! সে মন ম’রা হয়ে বলল,
” আপনি যেসব ভাবছেন আমি ওসব কিছু মিন করে সেদিন ওই কথাগুলো বলিনি।আমি শুধু কম্পেয়ার করেছি।আর শবনমের বয়ফ্রেন্ড আছে সেটা তো আমি জানি । আপনাকে ও কোনোদিন ওসব চোখে দেখবেও না। তাই আমার কোনো ভ’য়ও নেই।আপনি….”
এই পর্যায়ে আহিকে থামালো তূর্য।ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই নিজের কথা ঢুকালো,
” ওয়েট আহি ! তুই শবনমের সাথে নিজেকে কমপেয়ার করছিস? কেন? এ্যান্ড কি বললি? ওর বয়ফ্রেন্ড আছে তাই তোর কোনো ভ’য় নেই? নাহলে থাকতো? ”
” সেসব বলিনি আমি! ”
” তাহলে কি বলেছিস তুই ? বোঝা আমাকে !” চেঁচিয়ে উঠে কথাটা বলে আবার নিজেকে শান্ত করলো তূর্য।স্বাভাবিক গলায় বলল,
” আচ্ছা ,বাদ দে ” বলে কল কাটলো সে। তারপর তার মুখোমুখি বসে থাকা মেয়েটার দিকে তাঁকালো।সে কিছু বলার আগেই মেয়েটা বলল,
” একজনের রা’গ অন্যজনকে দেখানো ঠিক না তূর্য ”
” তোর থেকে আমি এমন কিছু এক্সপেক্ট করিনি আলিয়া। আর ঠিক-বেঠিকের কথা তুই বলছিস? আহির বিষয়টা কেউ না জানলেও শুরু থেকে তোরা সবাই জানতিস ।তবুও….” বাক্য সম্পন্ন করলো না তূর্য।বিরক্তি নিয়ে পুনরায় বলল,
” পুরো বিষয়টা ডিজগাস্টিং লাগছে আমার।আন্টি না জানালে আমি আজও কিছু বুঝতে পারতাম না ”
” মনে কর তুই কিছু জানিস না তাহলেই তো হলো ”
আলিয়া স্বাভাবিক গলায় বলল।
” সবকিছু জানা সত্ত্বেও তুই কেন নিজের মনে ফিলিংস আসতে দিলি? ফিলিংস এসেছে মেনে নিলাম । এখনও মুভ অন কেন করছিস না? এসব মরীচিকা থেকে নিজেকে সামলা আলিয়া ”
” কে বলেছে আমি মুভ অন করছি না ? করছি ! এমনকি অনেকটা করে ফেলেছি। আর তুই জানিস এসব ফিলিংস থেকে বেরিয়ে আসা কতটা কঠিন।তুই নিজেও তো কম চেষ্টা করিসনি।পেরেছিস আহির মায়া কাটাতে ? নিজে তো পারিসনি আবার কায়দা করে মেয়েটাকে নিজের প্রেমে ফেলেছিস ”
মেহেদী ছেলেটা ভালোই আছে।এত বেশি ঘর এলোমেলো করে না।ব্যাপারটা তারিনের খুব ভালো লাগে। বিয়ে থেকে এই অবধি তাদের মধ্যে ঘটা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুহূর্ত গুলো কল্পনা করছে আর রুম গোছাচ্ছে সে ।কখনো আবার ঠোঁট প্রসারিত করছে।মেহেদী আগে যেমন সবসময় তার সাথে রু’ডলি কথা বলতো,কেমন যেন অস্বাভাবিক ব্যবহার করতো ,বিয়ের পর থেকে সেগুলো করে না। বিয়ের প্রথম এক মাস হালকা-পাতলা খারাপ ব্যবহার করলেও এখন মোটেও করে না।আবার মিষ্টি কথা বলে এমনও না।কিন্তু যেসব কথা বলে ইদানীং তারিনের খুব ভালো লাগে।
মেহেদীর আসার সময়ও প্রায় হয়ে এসেছে।তারিন একবার দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাঁকালো, এক্ষনি চলে আসবে।ভাবতে না ভাবতেই কলিং বেল বেজে উঠলো।সে ডাইনিং পরিষ্কার করছিলো।হাতের ছেঁ’ড়া কাপড়টা রেখে দ্রুত গিয়ে দরজা খুলল।মেহেদী ভিতরে প্রবেশ করতে করতে বরাবরের মতো ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল,
” কি অবস্থা? কি করছিলে? খেয়েছো? ”
এসব প্রশ্নের উত্তর কখনো করে না তারিন।আর করলেও হয়তো মেহেদী খেয়াল করতো না।সে প্রশ্নগুলো করে উত্তরের অপেক্ষা করে না।সোজা বেডরুমে চলে যায়।তবে আজ প্রতিউত্তর করলো তারিন।বলল,
” ভালো।কিছু করছিলাম না ”
তারিনের উত্তর পেয়ে বেডরুমের দরজার কাছে আপনা-আপনি পা ঠেকে গেল মেহেদীর।সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে প্রশ্ন করলো ,
” হঠাৎ?”
তারিন বুঝেও না বোঝার ভান ধরে বলল,
” কি ?”
” আনসার করতে মন চাইলো কেন তোমার?”
” আর করবো না আনসার ”
সাবলীল গলায় বলল তারিন।
” একবার যখন করেই ফেলেছ এখন থেকে নিয়মিত করো।আর,
লাস্ট আনসারটা?এখনো খাওনি?” বলে একটু সময় নিলো মেহেদী।তারিন উত্তর না দিয়ে খাবার গরম করতে ব্যস্ত হলো সে। যা বোঝার বুঝে গিয়েছে মেহেদী । সে চারিদিকটায় একবার চোখ বুলিয়ে বলল,
“দেখে মনে হচ্ছে ঘরদোর গোছাচ্ছিলে।বেশি চকচকে লাগছে ”
” ঘর পরিষ্কার করলে মানুষকে বেশি পরিষ্কার লাগে?”
” তোমার কথা বলিনি।রুমের কথা বলেছি।নিজেকে কখনো দেখতে দিয়েছো যে বুঝবো বেশি পরিষ্কার নাকি কম পরিষ্কার!” শেষ কথাটা বিড়বিড় করে বলতে বলতে রুমে ঢুকে গেল মেহেদী।তারিন কথাগুলো শুনে মুচকি হাসলো।লোকটা তো ভালোই আছে।স্বামী হিসাবে মন্দ নয়।সে তাড়াতাড়ি খাবারগুলো গরম করে ডাইনিংয়ে সাজালো।
কিছুক্ষণের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে খেতে আসলো মেহেদী।ডাইনিংয়ে হরেক রকমের খাবার। বিয়ে করে কোনো ফ্যাসিলিটিজ পাক বা না পাক তিন বেলা সুস্বাদু খাবার খাওয়ার ফ্যাসিলিটি পাচ্ছে।এতেই বেজায় সন্তুষ্ট মেহেদী।তাছাড়া মেয়েটার রান্নার হাত চমৎকার।যদিও এখনো পর্যন্ত তারিনের সামনা সামনি প্রশংসা করেনি সে।তবে মনে মনে হাজারবার করেছে। প্রশংসা করলে দেখা গেল কাল থেকে বেগারে রান্না করবে।সুতরাং,সার্টিফিকেট পেয়ে গেলে মুছিবত।তবু ,আজ সে বলেই ফেললো।সেটা ভিন্ন কায়দায়,
” ভালোই তো রান্না পারো।বিয়ের আগে বাবুর্চি গিরি করতে নাকি?”
চট জলদি উত্তর দিলো তারিন,
” হ্যাঁ!আপনি কিভাবে জানলেন? ওওও মনে পড়েছে! আমাদের টিম তো আপনিই লিড করতেন।”
” কথা সবসময় গোছানোই থাকে ।তাইনা?”
” তা থাকে একটু – আধটু ” বলে মুচকি হাসলো তারিন। মেহেদী বলল,
” শোনো, বিকালে আমরা বাইরে যাবো একটু ”
” আমরা কারা? ফ্রেন্ডের নিয়ে ?”
” না,তাদের ভাবিকে নিয়ে।” বেশি টাইম লাগলে খেয়েই রেইডি হবে।আর কম লাগল ঘন্টা খানেক পর । তারিন নিজের প্লেটে ভাত তুলতে তুলতে আস্তে করে বলল,
” বাবা কল করেছিল।বাড়ি যেতে বলেছে ”
” দুই দিন আগেই তো আসলে।আচ্ছা যেও,আমি যেতে পারবো না ”
” আরে..! বাবা , বাবা বলেছে বাড়িতে ফিরে যেতে।একেবারে ! ”
তারিনের কথায় প্লেটে হাত নাড়ানো বন্ধ করলো মেহেদী। কিছুক্ষণ থেমে থেকে রাগী গলায় বলল,
” একেবারে ফিরে যেতে বলেছে মানে? দুই দিন পর পর নাটক শুরু করেন?” বলেই প্লেট রেখে উঠে গেল সে।তারিন একাধারে চিৎ’কার করে যাচ্ছে,
” আরে ‘ বাবা ‘..! কথা না বুঝে রি’য়্যাক্ট করেন কেন? খাবারটা তো শেষ করে যান। আজব ! ”
চিল্লাচিল্লি করে না পেরে অগত্যা সেও খাবার রেখে উঠে গেল। ডাইনিং গুছিয়ে রেখে রুমে গেল।মেহেদী চোখ বন্ধ করে ডিভানে গা এলিয়ে রেখেছিল।তারিনের উপস্থিতি বুঝতে পেরে সেভাবে থেকেই বলল,
” কি ডিসিশান নিলে ? চলে যাবে ? ”
” হ্যাঁ ! ”
আস্তে করে চোখ খুললো মেহেদী।শান্ত চোখে কিছুক্ষণ তারিনের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
” ওকে, যাও।তবে রান্না করে খেতে পারবো না আমি। যাওয়ার আগে আমার সারা জীবনের রান্না করে রেখে যাবে। ”
” পারবো না ”
” তাহলে যাওয়ারও কোনো দরকার নেই। ”
ভাবলেশহীন জবাব মেহেদীর।
” দরকার আছে। বাবাকে আমি বলেছি আপনাকে বুঝিয়ে চলে যাবো ।”
মে’জাজ হারালো মেহেদী।চেঁ’চিয়ে উঠে বলল,
” যাবে মানে? উনি বলবেন আর আমি আমার বউকে যেতে দিবো? দুইদিন আগেও তো জামাই আদর করে পাঠালেন।সবটা ঠিক হলে গেল।এখন আবার কিসের নাটক শুরু করলেন ? ”
এতক্ষণে টনক নড়লো তারিনের। সে ধপ করে বিছানায় বসলো।হতাশ কন্ঠে বললো,
” আপনি কি ভেবেছেন আব্বুর কথা বলছি? আরে ‘ বাবা ‘ ,
‘ বাবা ‘ ! আপনার বাবা ,আমার শ্বশুর ! ”
” সেটা ক্লিয়ার করবে তো।যেভাবে ‘ বাবা’ ‘ বাবা ‘ করছো আমি নিজেও এভাবে ‘ বাবা ‘ ‘ বাবা ‘ করি না। ”
” তাহলে? কবে ফিরছেন বাড়ি?”
মেহেদি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলো।মনে মনে কিছু একটা ভেবে সাহেবী কায়দায় বলল,
” আগে কল করে জিজ্ঞেস করো বাড়ি ফিরলে উঠতে বসতে খোটা দিবে কিনা!”
” দিবে না বলেছে ”
উঠে দাঁড়ালো মেহেদী।বুক টানটান করে পকেটে হাত গুজে কয়েকবার গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
” তাহলে কালই যাওয়া যাক ”
তার কান্ডে মুখ লুকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসলো তারিন । মেহেদী এত মাস ধরে অপেক্ষা করছে । কারণ, যেদিন তার বাবা তাকে মুখ ফুটে যেতে বলবে সেদিন যাবে। কিন্তু ভদ্রলোক বলেননি।তার ফ্ল্যাটে এসে নতুন পুত্রবধূ দেখে গিয়েছেন তবুও একটা বারের জন্যে তাকে ফিরে যেতে বলেননি।বলেছেন ,তারিনকে! মেহেদীর তো সেটাতে হবে না।সে চায় তার বাবা তাকে বলুক।তারিনকে কেন বলবে ? কিন্তু সেটা আর হলো কই? দেখতে দেখতে ছয় – সাতটা মাস পার হয়ে গেছে ।আর কত ? নিজের রা’গটা কমিয়ে চলে যাওয়া-ই ভালো।তাছাড়া রা’গ তো তার কবেই পড়েছে।চক্ষু লজ্জায় যেতে পারছিল না।এবারে চক্ষু লজ্জাও ভাঙতে হবে।তাছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই।
আধ ঘন্টার মতো হয়েছে তূর্য বাড়ি ফিরেছে। যদিও এখন,এই সময়ে তার ফেরার কথা ছিল না। না ফিরলে তো আর চো’রকে হাতে নাতে ধরতে পারতো না।সে এসেছে ধরেই ওয়াশরুমে পানির কলকল শব্দ হচ্ছে। আহি ছাড়া অন্য কেউ হতে পারে না সে নিশ্চিত। তূর্যের একটা বিশেষ অভিজ্ঞতা আছে কেউ যদি ওর রুমে আসে বা রুমের যেকোনো একটা জিনিস ধরে সে বুঝতে পারে।
এইযে এখন যদি সে একটু আগে বাড়ি না ফিরতো তবুও বুঝতে পারতো ওর ওয়াশরুম কেউ ইউজ করেছে।আর সেটা আহি ব্যতীত অন্য কেউ হতে পারে না ,সেটাও বুঝত।কিন্তু যখন ওকে ব্যাপারটা নিয়ে জিজ্ঞেস করতো আহি অস্বীকার যেত।খু’ন স্বীকার,তবুও সে তূর্যের ওয়াশরুম ইউজ করেছে সেটা স্বীকার করতো না।
যদিও এখনকার বিষয় আলাদা।তূর্য তার জিনিসপত্র ধরা বা ব্যবহার করা নিয়ে আহিকে আর ব’কে না।দুই একটা কথা বলেই ছেড়ে দেয়।আর বললেও বা কি ! আহিও আর আগের মতো
ভ’য় – ডর পায় না। সে কয়েকবার হাতের ঘড়ির দিকে চেয়ে সময় পরখ করলো।তারপর উরুর উপর ল্যাপটপ নিয়ে ডিভানে বসলো।
দীর্ঘ চল্লিশ মিনিট পার করে কাঁপতে কাঁপতে বের হলো আহি। ঠান্ডার তোপে ফর্সা মুখশ্রী লাল হয়ে গেছে।আর ঠোঁট জোড়া আর র’ক্তিম নেয়।প্রায় তূর্যের মতোই লাগছে ,নীলচেভাব হয়ে আছে। যেন মাজা সোজা করেই দাঁড়াতে পারছে না মেয়েটা।সে পিঠ কুঁজো করে গুটিসুটি মেরে কয়েক সেকেন্ড ওয়াশরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে তূর্যকে দেখলো।তারপর কাঁপতে কাঁপতে কুঁজো বুড়ির মতো দৌঁড়ে বিছানায় উঠলো। কমফোর্টার গায়ে জড়িয়ে হাত-পা সব কোলের মধ্যে নিয়ে গুটিসুটি মে’রে বসলো। তূর্য সেদিকে না তাঁকিয়েই ল্যাপটপ আঙুল চালাতে চালাতে বলল,
” তোর ওয়াশরুমে কি প্রবলেম?”
” আমারটা থেকে গরম পানি আসছে না । ম’রে গেলাম গো..!এত শীত কেন তূর্য ভাই ? ”
” বাড়িতে আর ওয়াশরুম নেই ?”
” আছে! আপনি তো বাড়িতে ছিলেন না, তাই আপনারটাই এসেছি”
” কয় দিন পর শাওয়ার নিলি?”
” তিনদিন …! ”
এই পর্যায়ে তূর্য ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাঁকালো আহির দিকে। মুখের হাবভাব অস্বাভাবিক ভাবে বিকৃত করলো।সেটা খেয়াল করে আহি দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল,
” আরে নাহ! একদিন পর নিলাম। ”
” তোর রুমে যা ”
” শরীরটা একটু গরম করেই চলে যাচ্ছি ”
” এখন যা আহি।চুলের পানিতে বিছানা ভিজে যাচ্ছে । এত শীত তাহলে চুলগুলো এভাবে ভিজিয়েছিস কেন ,স্টু’পিড?”
” আজকে গোসল করলাম আর কবে করি তার কোনো ঠিক আছে? তাই শ্যাম্পু করে রাখলাম ”
তূর্য বিস্ময় নিয়ে আহির দিকে তাঁকিয়ে থেকে আরেকদফা নাক সিঁটকালো । তারপর আবার কাজে মন দিলো।আহি মিনিট পাঁচেক সেভাবেই বসে থাকলো। এখন একটু শুতে পারলে ভালো লাগতো।সে তূর্যের দিকে চাইলো।লোকটা তার কাজে খুব মনোযোগী।আহি তার দিকে আড় চোখে চেয়ে দেখতে দেখতে আস্তে করে শুয়ে পড়লো।কিছুক্ষন পর উপলব্ধি করলো চোখ জোড়া লেগে আসছে। কথায় বলে , ‘ বসতে দিলে খেয়ে চায়,খেতে দিলে ঘুমোতে চায় ‘ আহিরও তেমনটাই হলো।শুয়ে থাকতে থাকতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লো সে। এতে তূর্যের কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না।মেয়েটা তো সবসময়ই এমন করে,অবাক হওয়ার আর কিছুই নেই।আর এখন একটু বেশি বেশিই করবে ,এটাই স্বাভাবিক।সে তার হাতের কাজ সেরে শাওয়ার নিতে ঢুকলো।
কিছুক্ষণ বাদে শাওয়ার নিয়ে একেবারে চেইঞ্জ করে বের হলো।না চাইতেও বিছানায় চোখ দিলো।আহির হা করে ,হাত পা ছড়িয়ে উল্টা-পাল্টা শোয়া দেখে মুচকি হাসলো সে। দিনে-দুপুরে কিভাবে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে গাঁধাটা।সে একবার দরজার দিকে চাইলো।ভেজিয়ে রাখা আছে। এগিয়ে গিয়ে ভিতর থেকে লক করলো। এখনি খাবারের ডাক পড়বে। আর স্টু’পিডটা কিভাবে বেঘোরে ঘুমোচ্ছে। তার রুমে এভাবে ঘুমোতে দেখলেও বা বিষয়টা কেমন দেখাবে।ভাবতে ভাবতে আহির পাশে গিয়ে বসলো।বের করে রাখা হাত জোড়া কম্বলের নিচে ঢুকিয়ে দিলো।মুচকি হেসে নাকের মাথা ধরে একটু টেনেও দিলো।আহি চোখ মুখ কুঁচকে মুখে হালকা শব্দ করতেই তূর্য দ্রুত পাশ থেকে উঠে পড়লো।সটান হয়ে দাঁড়িয়ে মুখশ্রী গম্ভীর করলো। আহি মোচড়া-মুচড়ি করে আবার শান্ত হয়ে গেল। তূর্য সেটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। চুলে চিরুনি চালাতে চালাতে আয়নার মধ্যে দিয়ে দেখতে লাগলো প্রেয়সীকে।তারপর কিছু একটা ভেবে চোখ – মুখ গম্ভীর করে ভারি কন্ঠে
বললো,
প্রণয় ব্যাকুলতা পর্ব ৪৪
” ঘুমা!এরপর কি হতে চলেছে তুই ভাবতেও পারছিস না।ইভেন, আই হ্যাভ নো আইডিয়া। তুই আমাকে নিরাশ করবি না আই নো জা’ন। ”
ভাবনাটা শেষ করে আহির দিক হতে নজর ফেরানোর আগেই ড্রয়িং রুম হতে শোরগোল ভেসে আসলো।আসলাম চৌধুরীর গলার আওয়াজ ভেসে আসছে।চেঁ’চামেচি করছেন খুব।বাকিরা বোধ হয় তাকে শান্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।চি’ৎকার করার কারণ জানতে চাইছেন।তূর্য আরেক পলক আহির দিকে তাঁকালো।অতঃপর নিচে নামলো।বাড়ির সবাই সেখানে জড়ো হয়ে গিয়েছে।শুধু আকবর চৌধুরী ব্যতীত। তূর্যকে দেখে আরেক দফা ফুঁসে উঠলেন তিনি।
