প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১৬
Sadiya Jahan Simi
এহে,,,,,হে,,,,,হে,,,হে
আল্লাহ গোওও,
আমি এমন হয়ে গেলাম কেন…
আমার ডাগর ডাগর চোখ,,
ও মাগো মাআআ,,
একটা তিলা,একটা তিলা জন্ম নিছে এখানে,,
দেখছোস ? আল্লাহ গো!
আভিয়ানের কান্ডে সকলের প্রায় হুঁশ হারানোর উপক্রম। ঝামেলা থেকে ফিরে এসেই,ফোন নিয়ে কিছুক্ষণ ঘাঁটাঘাঁটি করে। তারপর উঠে রিংলাইট এর সাথে মোবাইল সেটআপ করে।হাত পা নাড়িয়ে ডায়লগ দেয়।পরের কাজ আগে করে এগিয়ে রাখবে।বিয়ের পর তো রাফসার সাথে ভিডিও করতে হবে। তখন না পারলে কি হবে;ওর বউ তো তখন লাথি মেরে চলে যাবে। বউ ধরে রাখার জন্যই আভিয়ানের এতো জল্পনা কল্পনা। প্রেমে পড়ে মানুষ কি না করতে পারে,তা যদি হয় আবার একতরফা! রাজনীতি করা লোকটাও আজ ট্রেন্ডিং ফলো করছে।
“ভাই, আপনি এসব কি করছেন! আমার তো মাথায় উপর দিয়ে যাচ্ছে সব।”
আভিয়ান মাএ করা ভিডিও টা সেভ করে। অপর ভিডিও বের করছে। রনির কথায় সিরিয়াস কন্ঠে শুধায়, “ভিডিও করছি,দেখতে পারছিস না।চোখে কি পট্টি বেঁধে রেখেছিস নাকি?”
রনি থমথমে গলায় বলে, “ভাই আপনার তো ফিহাজ ম্যান্ডেলায় যাওয়ার কথা।সব রেডি সেখানে। অলরেডি কল দিয়েছে ওনারা। কি বলব?”
“ক্যান্সেল করে দে সব। এখন ডিস্টার্ব করিস না। একটা ট্রেন্ডিং ফলো করব।দেখ কেমন হয়।”
সবাই কাঁচুমাচু মুখে তাকিয়ে রইল। কথা বলার সাহস পেল না কেউই। রনি আভিয়ানের সাথে একটু বেশি মিশুক। ও নিজেই চটপটে স্বরে আওড়ায়, “আপনি কি রাজনীতি ছেড়ে, এখন ব্লগ করবেন ভাই?”
আভিয়ান ব্যস্ত স্বরে বলে, “হুঁ। বুঝলি,তোর ভাবীর ইচ্ছে, বিয়ের পর জামাই নিয়ে ভিডিও করবে। তারপর ভাইরাল হবে ।”
“তাহলে তো ভাই আপনাকে দিয়ে,ভাবী জামাই ব্যবসা করবে।” মুখ ফসকে কথাটা বলতেই তড়িৎ গতিতে জিভ কাটে রনি। বাকিদের তুলনায় চক্ষু চড়কগাছ,চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে।আভিয়ানের ঠান্ডা দৃষ্টিতে শরীর হিম হয়ে আসে। “কাল্লু রনি, পুনরায় এ কথা শুনলে তোকে টাক্কু মাথা করে দেবো। তারপর গান গাইবি,
“টাক্কু মাথা চারআনা
চাবি দিলে ঘুরে না,
চাবি হলো নষ্ট, টাক্কু মাথার কষ্ট,,
আভিয়ানের ছড়া কাটা শুনে মুহুর্তেই হাসির রোল পড়ে ঘরে। রনি চোখ গরম করে তাকাতেই ঠোঁট চেপে হাসি নিবারণের প্রয়াস চালালো। এতো সহজে কি আর হাসি থামে; ঠোঁট কামড়ে হেসেই চলছে। রনি চোখ দিয়ে ইশারা করে বুঝালো,পরে দেখে নিবে।
আভিয়ান ফোনটা পুনরায় সেটআপ করে দাঁড়ালো। টাইমিং শুরু হতেই হাত তালি দিয়ে তাল মিলিয়ে বলে,
বাহ,মিসেস রাফসা,বাহ
যখন আপনি বলবেন বসো, আমি বসবো আপনি বলবেন উঠো আমি,,
আভিয়ানের ভিডিও করার মাঝেই রনি বাঁধ সাধলো, “ভাই, আপনার তো হইতেছে না ভিডিও করা।” রনির বাঁধা পেয়ে আভিয়ান দাঁড়িয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে শুধায়, “কেন? কি হয়েছে? হচ্ছে না!”
রনি দুপাশ মাথা নাড়িয়ে না বুঝালো। খানিক এগিয়ে এসে বলে, “ভাই,দেখেন আপনার ভিডিও হয় না। আপনি বসলে আপনারে দেখা যায় না তো। মোবাইল ধরে করে দিতে হবে এটা।”
“আচ্ছা,তাহলে তুই করে দে।” রনি ফোন হাতে নিয়ে রেডি হয়ে দাঁড়ায়। পুনরায় অভিনয় শুরু হলো
বাহ, মিসেস রাফসা, বাহ
যখন আপনি বলবেন বসো, আমি বসবো
আপনি বলবেন উঠো, আমি উঠবো
“ভাই শুয়ে পড়েন,শুয়ে পড়েন।” আভিয়ান কনসেপ্ট ভুলে যায়। তাই যদি স্মরণ করিয়ে বলে কথাটা।
আভিয়ান চোখ মুখ কুঁচকে বলে, “শুয়ে পড়বো মানে! তোর উপর শুয়ে পড়বো? আমাকে কি ‘গে’ ভেবেছিস কাল্লু রনি!”
আভিয়ানের কথায় বাজ পড়ল যেন। রনি আজ সকালে কার মুখ দেখে যেন ঘুম থেকে উঠেছে।এখন ওর অবস্থা,ছেড়ে দে বাপ কেঁদে মরি। কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, “আমি বিয়ে করিনি ঠিক আছে। কিন্তু আমার তো মানসম্মান আছে ভাই। একটা ছেলে হয়ে কেন আরেকটা ছেলেকে বলব শুয়ে পড়তে। ছিঃ ভাই ছিঃ,কি অশ্লীল।”
“তোর কাছে মেয়ে বিয়ে দিবে কে? দিনের বেলায় তো তোকে দেখা যায় না। ভূত ভেবে তো রাতে তোর বউ পালাবে। আচ্ছা সব বাদ,আগে ভিডিও করে দে।”
বাহ মিসেস রাফসা,বাহ
যখন আপনি বলবেন বসো, আমি বসবো
আপনি বলবেন উঠো, আমি উঠবো
আপনি বলবেন শুয়ে পড়ো, আমি শুয়ে পড়ব
কি ভেবেছেন আপনি , আমি আপনার ক্রীতদাস নই
আমারও ইজ্জত সম্মান আছে,,
পার্ফেক্ট ভাবেই ভিডিও করতে সক্ষম হয় ওরা।আভিয়ান মহা খুশি।এভাবেই আরো কিছু ভিডিও বানাতে লাগে রাফসার না জানা পাগল প্রেমিক।
“সকালে গিয়ে আমার রাফসা মামুনিকে নিয়ে আসবি।মেয়েটা এলো না! ঘরটা ওকে ছাড়া ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।আর এলেও বা মেয়েটা চুপচাপ থাকতো। কয়েকটা বছর ধরে দেখছি,মেয়েটা চাপা স্বভাবের হয়ে গেছে।আগে এ বাড়িতে আসার জন্য কত পাগল ছিল,আর এখন টেনে হেঁচড়ে আনা যায় না।কাল কিন্তু,গিয়ে কেউ একজন নিয়ে আসবি।”
উনার কথায় রোহান চটপটে স্বরে বলে, “রাফসা আসতে চেয়েছিল ফুফু। উদ্যান বকেছিল ওকে। সেজন্যই , রাফসা আসতে চেয়েও আসেনি।”
জোহরা মির্জা জুহুরি চোখে পরোখ করে উদ্যানকে। ডান হাতে কফির কাপ ধরা,অপর হাতে ফোন । চোখজোড়া ফোনের উপর। আশেপাশে কোন খেয়াল নেই। ক্ষণে ক্ষণে মুখের অভিব্যক্তি পাল্টাচ্ছে। কালো সিল্কি চুল গুলো কপালে কিছুটা এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। উদ্যান সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা সোডিয়ামের ম্লান আলো তার মুখের উপর নরম ছায়া ফেলেছে। শার্টের উপরের কয়েকটি বোতাম খোলা, সেখানে ফর্সা বুকের উপর হালকা পশমের রেখা দেখা যাচ্ছে।
চোখে এক ধরনের গভীরতা আছে। বাইরে থেকে শান্ত, কিন্তু ভেতরে ঢেউ খেলে যায়। কফির মগে ঠোঁট ছোঁয়ানোর আগে যখন সে একটু নিচের দিকে তাকায়, তখন তার চোখের পাপড়ির ছায়া গালে পড়ে।
“উদ্যান,তোর কারণেই রাফসা আসেনি। কাল সকালে গিয়ে ওকে নিয়ে আসবি।বুঝিনা তোদের কান্ড কারখানা;দশ বছরের ছোট দুজন সারাদিন টম এন্ড জেরির মতো লেগে থাকিস কেন? ভাই বোন সবসময় মিলে মিশে থাকবি।বোনকে বিয়ে দিলে,চলে যাবে পরের বাড়িতে।এখন তো বুঝিস না,ছোট বোনটা শ্বশুরবাড়ি গেলে বুঝবি।”
“সেরা ভাই – বোনের জুটি! ফুফু উদ্যান,রাফসাকে ছোট বোনের মতোই ভালোবাসে। শুধু মাঝে মাঝে শাসন করে। তাই না উদ্যান?”
উদ্যান এই যাবত ফোন হতে দৃষ্টি সরিয়ে আনল। ঠান্ডা শিথিল দৃষ্টিতে রোহানকে পরোখ করে। দুজনের মাঝে যেন চক্ষুদ্ধয়ের মাধ্যমে সংলাপ হচ্ছে। উদ্যান উষ্টদ্বয় মৃদু ফাঁক করে সূক্ষ্ম হাসে। ঠাট্টার ছলে বলে, “হুঁ, অবশ্যই।আই নো , সেরাআ জুটি।” কিছুটা টেনে বলল উদ্যান। রোহান হাসল। সংশোধন করার মতো করে বলল, “হুঁ, অবশ্যই।সেরাআআ ভাই-বোন জুটি।”
“হয়েছে,এখন সব শেষ করো। রাত তো কম হলো না। না খেয়ে শুয়ে পড়লাম আমি। তোমরা থাকো।গেলাম আমি।”
মাইশা সোফায় আধশোয়া হয়ে বসে আছে। ঘুমে চোখ দুটো বন্ধ হয়ে আসছে। টেনে খুলে রাখার আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ও। জোহরা মির্জা উঠে দাঁড়ালো। রাত প্রায় অনেক হয়েছে। “কেউ না খেয়ে শুয়ে পড়বি না। খাবার দিচ্ছি, ডাইনিংয়ে আয় সবাই।”
“আম্মুকে হেল্প করি গিয়ে। তোমরা এসো।”
“মিম আপু, শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সারাদিন তো কোনো কাজ করো না তুমি। হঠাৎ ফুফুর কাজে হেল্প করতে যাচ্ছো! বিষয়টা চিন্তার বিষয় কিন্তু।”
ঊষার কথায় মিম পিছনে ফিরে তাকালো।কাজ চোর মেয়েরা হঠাৎ কাজ করলে সবাই মিলে গসিপ করে। সেটা ছোট হক বা বড়।কথার জবাব না দিয়েই উল্টো ঘুরে চলে গেল। রোহান সোফার একপাশ থেকে উঠে মাইশার পাশে বসে। চুল ধরে টান দিতেই ধড়ফড় করে উঠে বসে। আধশোয়া হয়ে ঘুমিয়েই পড়েছিল। চুলে টান পড়াতে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে। মাইশা চেঁচিয়ে উঠলো। “এ্য্য্যহ,কেরে? আমার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে!”
“সরি ছোট বোন। ভুলে টান লেগেছে তোর চুলে। আমি ইচ্ছে করে করিনি।”
মাইশা বিরক্ত হয়ে শুধায়, “ভাইয়া ভালো লাগে না। আমার কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে দিলে তুমি।”
“আচ্ছা,তার বিনিময়ে ঘুরতে নিয়ে যাবো আগামীকাল। তাও রাগ করিস না বোন।” মাইশা ভ্রু কুঁচকালো খানিকটা। এমনি এমনি ঘুরতে নিয়ে যাবেনা সেটা জানা আছে। নির্দিষ্ট কোনো কারণে নিয়ে যাবে নিশ্চয়ই। এখন সেই কারণ উদঘাটন করতে হবে। “আসল ঘটনা খুলে বলো ভাইয়া।”
রোহান খানিকটা চেপে বসে মাইশার পানে। একনজরে পুরো ড্রয়িং রুম চোখ বুলিয়ে ফিসফিস করে বলে, “সন্ধ্যায় যে তোর বান্ধবী এসেছিল না? ওর সাথে সেটিং করিয়ে দে বোইন।”
এতক্ষণে কাহিনী বুঝতে পেরে হাসে মাইশা। সুযোগ পেয়েছে যেহেতু,একটু লুফে নেওয়া যাক।না বোঝার ভান করে বলে, “কোন বান্ধবী ভাইয়া! মনে পড়ছে না তো আমার।”রোহান চোখ ছোট ছোট করে তাকালো। ও ভালোই বুঝতে পারছে,বোন নামে এই শএু নাটক করছে ওর সাথে।
“ওই যে লামিয়া। ওর কথা বলছি।মনে নেই তোর?”
“ও আচ্ছা ,মনে পড়েছে। কিন্তু এমনি এমনি তো হবে না। আর তুমি কি বিয়ে করবে ওকে?”
রোহান তড়িৎ গতিতে বলে উঠলো, “অবশ্যই,ওকে আমার মনে প্রাণে সব দিক দিয়েই ধরেছে। আই লাভ হার।” মাইশা কিছুটা বিভ্রান্তি হলো। কয়েকঘণ্টার মধ্যে প্রেমে পড়ল। আর এখন বলছে আই লাভ হার! এসব বেডা মানুষের দ্বারা সম্ভব। তাদের এক জোড়া চোখে শত জোড়া নারী আটকায়। ভালোবাসি ভালোবাসি বলতে গলা ফাটিয়ে ফেলে। অথচ ঠিকই অন্যদিকে লাইন চলে।
“কিছু বলছিস না কেন? ওর আইডিটা এনে দে।”
“হুঁ,পারবো না। নিজের কাজ নিজে করে নাও। আমি যাই ডাইনিংয়ে।” মাইশা উঠে চলে যায়। রোহান হতাশ চোখে তাকিয়ে রইল। বিড়বিড় কন্ঠে বলে, হাতি কাঁদায় পড়লে চামচিকাও লাথি মারে।
সামনে বই খুলে বসে আছে রাফসা। পড়ায় মন নেই। অস্থির অস্থির লাগছে। নিত্যদিনের মতো সকাল সকাল উঠেই সব শেষ করে। কিছুক্ষণ পূর্বে নাস্তা সেরে রুমে ফিরে আসে। মন বিতৃষ্ণা হয়ে আছে। মেডিকেলের আর মাএ দেড় মাস বাকি। সব মোটামুটি কমপ্লিট। তবুও মনের মধ্যে সংকোচ করছে।ওর আকাশ পাতাল ভাবনার মাঝেই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে কেউ। আওয়াজ শুনে রাফসা ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো। উদ্যানকে নিজের ঘরে দেখে অবাক হলো খানিকটা। তবে মুখ ফুটে কিছু বলেনি। উদ্যান এগিয়ে আসে ওর পানে। রাফসা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। উদ্যান নিষ্প্রভ স্বরে বলে, “রেডি হয়ে নে। ফুফু যেতে বলেছে।”
“রেডি হবো মানে? আমি বলেছি নাকি কোথাও যাবো!” উদ্যান জানতো রাফসা ত্যাড়ামি করবেই। কিছু না বলে নিজেই আলমারি খুলে বোরকা বের করে আনে। রাফসার সামনে দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে শাণিত গলায় বলে,
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১৫
“কাল রাতে বোরকা ছাড়া বের হয়েছিলি কেন? সাথে গেলি না ঠিক আছে। কিন্তু এতো রংঢং করে নাচতে নাচতে রাতে বের হলি কেন?”
রাফসা চোখ মুখ শক্ত করে বলল, “কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন মনে করিনা।” উদ্যান হাসলো তাচ্ছিল্যের। রাফসার কথায় শক্ত কন্ঠে শুধায়,
“সেটা সময় হলে বোঝা যাবে। আর এভাবে বেরোতে দেখলে, ঠ্যাং ভেঙ্গে রেখে দেবো। দশ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে নে।”
হুকুম করেই হাওয়ার গতিতে মিলিয়ে যায়। রাফসা শক্ত চোখে চেয়ে রইল।
