Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪২

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪২

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪২
সুরভী আক্তার

সকালের পাপমুক্ত স্নিগ্ধ কোমল আবহাওয়া । পুরো জমিদার রাজ্যে এর মধ্যেই রোল পড়েছে সংগ্রাম জোয়ার্দারের পুনরায় বিয়ের বিষয় নিয়ে । বিয়ে পুনরায় , তবে বউ এক । এক বউকেই আবার বিয়ে করছেন সবার ছোট জমিদার সাহেব । সংগ্রামের জমিদার হওয়ার ঘোষনাও পড়েছে সকাল হতে না হতেই । ঢাক ঢোল পেটাতে হয় নি , এর আগেই হইহই পড়ে গেছে গ্রামে । আগামী শুক্রবার আসতে হাতে তিন দিন বাকি ‌। লতিফ জোয়ার্দার এই শরীরেই গ্রামে বেরিয়েছিলেন সকাল সকাল । গ্রামের পাঁচ রাস্তার মোড়ে বড় বট গাছটার নিচে তার সভা বসে , আজও বসেছিল । সেখানেই গুটি কয়েকের মাঝে সংগ্রামের জমিদার হওয়ার কথা পেড়েছিলেন । মুহুর্তেই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে সবার মাঝে ‌।

সাত গ্রামের প্রতিটা কোণায় ছড়িয়ে পড়েছে এই কথাটা ‌। সংগ্রাম জোয়ার্দার আজ থেকে তাদের জমিদার । এটা এক খুশির খবর , তার থেকেও বড় খুশির খবর তিন দিন বাদ তাদের জমিদারের বিয়ে । বিয়ের আমন্ত্রণ পুরো গ্রামে । সংগ্রাম লতিফ জোয়ার্দারের সাথে বেরোয় নি । সে বেরিয়েছে দেরি করে ‌। গ্রামে যার সামনেই পড়েছে , সেই আজ ওকে জমিদার বলে সম্বোধন করেছে । সে এখন জমিদার সাত গ্রামের ।

পাঁচ রাস্তার মোড়ের সভা উঠে গেছে ‌। সংগ্রাম যেতে পারে নি সেখানে । সে আজ মাধবপুরের দিকে রওনা দিয়েছে একটু । সাথে মোটা তাজা দুজন আছে সংগ্রামের । সংগ্রাম একেই সুঠাম, ওরা সংগ্রাম কেও ছাড়িয়ে । এরা রহিম,করিম । দুই ভাই । সংগ্রামের সাথে অধিক সময় দেখা যায় এদের । সেদিন জঙ্গলেও এরাই ছিলো সংগ্রামের সাথে । এরা ব্যাতিত শ্যামা কে আর দেখে নি কেউ । প্রথমে বাজারে গেছিলো সংগ্রাম । কয়েকটা ব্যাগ ভর্তি বাজার করেছে ‌। চাল ডাল থেকে শুরু করে আনাজ পাতি সবকিছুই । বাজার থেকে জিপ উড়িয়ে সোজা মাধবপুরে গিয়ে থেমেছে । নদীর একদম পাড়ের ছোট্ট কুঁড়েঘর টার সামনে । একটাই বড়সড় ঘর । পাশেই ছাউনি দেওয়া রান্নার জায়গা । ঘরটা কাঁচা বাঁশের কারবারি বেড়া দিয়ে ঘেরাও করা । দু একদিন হবে হয়তো ঘেরাও করার । ঘরের ছাউনী ও নতুন । আগে খসে পড়া নুড়বুড়ে ছিল এই ঘর খানা । সংগ্রামের আদেশ মোতাবেক দুদিন আগে একেবারে পাকা পোক্ত করে ঘরটা নতুন করে তোলা হয়েছে আবার । ছাউনী পরিবর্তন করা হয়েছে ।
জিপ থামিয়ে সেখানে নামলো সংগ্রাম । ব্যাগ গুলো ইশারা করে রহিম করিম কে বললো….

” এগুলো ভেতরে নিয়ে যাও …
তৎক্ষণাৎ আদেশ তামিল করলো ওরা । বাজার ভর্তি ভারী ভারী ব্যাগ গুলো নিয়ে গিয়ে রান্নার জায়গার পাশে রাখলো । সংগ্রাম পেছনে হাত গুটিয়ে এক পা দু’পা করে এগিয়ে গিয়ে দেখলো ঘরের দরজা বাইরে থেকে আটকে দেওয়া । কলপাড় বাড়ির পেছনে । সেখান থেকে জিপের আওয়াজ পেয়েই ছুটে আসলো রোগা পাতলা ছিমছাম মেয়েটা । অল্প নোংরা ওরনায় হাত মুছে ডাকলো নিভু স্বরে…
” ছোট জমিদার ! আপনি ?
তড়িতে চাইলো সংগ্রাম । ফুলি কে দেখে মুচকি হাসলো । বললো প্রগাঢ় স্বরে…
” কোথায় গেছিলে ?
” কলপাড়ে !
” রান্না হয়েছে ?
” হুঁ !
” বাজার নিয়ে এসেছি , তুলে রাখো ওগুলো ।
ফুলি নজর ঘুরিয়ে ব্যাগ গুলোর দিকে তাকালো । বড় বড় চারটে ব্যাগ । ফুলি অসহায় চোখে ফের তাকালো সংগ্রামের দিকে । বললো হুতাশ হয়ে…

” এগুলা আনার দরকার আছিল না ছোট জমিদার । আগের বাজার আছে এহনো…
” কি দরকার , কি দরকার নয় তোমাকে বুঝতে হবে না । যা বলছি তাই করো । আম্মা কোথায় তোমার ?
ফুলি মাথা নোয়ালো । বললো ধীরে…
” ঘরে !
” দরজা খুলে দাও , দেখা করবো ওনার সাথে !
ফুলি কথা না বাড়িয়ে দরজা খুলে দিল । সংগ্রাম সটান হয়েই ঢুকলো ঘরে । মেঝেতে একখানা পাতলা পুরনো কাঁথা মুড়িয়ে নিথর হয়ে শুয়ে আছে ফরিদা বেগম । ফুলির আম্মা । শরীরে কিচ্ছু নেই তার হাড় ব্যাতীত । চোয়ালে মাংস নেই । চুপসে দেবে গেছে । ঝুলে গেছে চামড়া ‌। চোখ বুজে মুখ অন্যপাশ করে শুয়ে আছেন অবলিলায় । গন্ধ ছড়িয়েছে ঘরে । সংগ্রাম আগে ঢুকেছে , ফুলি পিছনে ঢুকতেই ধক্ করে গন্ধ বিধলো নাকে ‌।

ফরিদা অচল । নড়া চড়া করতে পারেন না । মল মূত্র বিছানাতেই ত্যাগ করেন তিনি । প্রস্রাবের গন্ধ ছড়াচ্ছে । তারমানে প্রস্রাব করেছেন হয়তো । ফুলি সঙ্কিত হলো । সংগ্রাম এই মুহূর্তে ঘরে , নিশ্চয়ই ওর বুঝতে বাকি নেই । অস্বস্তিতে পড়লো ফুলি । চোরা চোখে সংগ্রামের দিকে তাকালো , সংগ্রামের মুখে প্রতিক্রিয়া নেই কোনো । নাক সিঁটকালো না সে । স্বাভাবিক চোখেই দেখছে ফরিদা কে । ফুলি বিচলিত ইতস্তত স্বরে বলল কন্ঠ খাদে নামিয়ে..
” আপনি বাইরে যান ছোট জমিদার , আমি আম্মারে পরিষ্কার করাই দিতাছি । গন্ধ আসতাছে..
” একবার ডেকেই চলে যাবো । সময় নেই আমার , তুমি পরে পরিষ্কার করে দিও ।
সংগ্রাম ফরিদার সামনে একটা ছোট্ট পিঁড়ি টেনে বসলো । ভেজা চোখ ফরিদার । মুখখানা খানিক বাঁকা । আধো চোখ খুলেই ঘুমাচ্ছেন হয়তো । সংগ্রাম ডাকলো তবুও, ধীর শীতল কন্ঠে…

” আম্মা !
প্রথমে সাঁড়া পেলো না । আরো একবার ডাকতেই ধীরে ঘাড় ঘোরালো ফরিদা । প্রতিক্রিয়া হীন ভাবে আধো দৃষ্টি পাত করলো সংগ্রামের পানে । কিছু বুঝলো কি না কে জানে । চিনলো না হয়তো । সংগ্রাম শুধালো…
” আমাকে চিনতে পেরেছেন ?
কোনো সাঁড়া নেই । ফরিদা চেয়ে নিগুড় স্থির চোখে । ফুলি কেই চেনে না মাঝে মাঝে , সংগ্রাম তো অনেক দূর । সংগ্রাম পকেট থেকে একখানা সুগন্ধি বের করলো । ছিপি খুলে ফরিদার গায়ে মাখিয়ে দিল তা । হাত বাড়িয়ে অযথা খুলে রাখা চোখ দুটো বন্ধ করে দিলো । তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো ফুলির উদ্দেশ্যে….
” শ্যামা কে বলো নি কিছু , তাই না ?
ফুলির ক্ষিণ অবস উত্তর …
” না ! কোই নাই….
হাসলো সংগ্রাম । বললো….
” তোমার সইকে আবার বিয়ে করছি, দাওয়াত দিতে আসলাম তোমায় !
ফুলি এক মুহুর্তে চিকচিক করে উঠলো । নত মাথা তুলল তড়িতে । উজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় ঝিলিক বয়ে গেল দু চোখে । ও বললো সহসা…

” বিয়া ?
” হুম ! শুক্রবার আবার বিয়ে হবে আমাদের ! আয়োজন হবে । তোমার আসা চাই কিন্তু ।
” শ্যামা রে আবার বিয়া করবেন ?
” তোমার সইয়ের বিয়ে করার সখ জেগেছে আবার !
হাসলো ফুলি । সংগ্রাম উঠে দাঁড়ালো । ফুলির সামনে এসে বললো গলা নামিয়ে..
” আমাকে ভাই মানো ?
ধীরে চাইলো ফুলি । চোখের চাহনি শীতল । সংগ্রাম বলতে লাগলো….
” শ্যামার সাথে তোমার সম্পর্কটা না হয় বাদই দিলাম । তোমাকে বোন বলেছি তো আমি ? আমার বোনের জীবন গুছিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব আমার । যে চলে গেছে তার জন্য নিজেকে ক্ষুইয়ে ফেলো না । সে আর আসবে না , যে নিজে থেকে যায়,সে ফিরে আসার জন্য যায় না । তোমাকে যতদূর আগে থেকে দেখেছি , তুমি শক্ত । ইদানিং নরম হয়ে পড়ছো । যার জন্য নরম হয়ে পড়ছো, সে তোমাকে ফেলে রেখে চলে গেছে অন্যের কাছে । অন্যকে বেছে নিয়েছে , ঘর বেঁধেছে , সংসার সাজিয়েছে । বুঝতে পারছো সেটা ? শুধু যে আম্মার জন্য তোমার অবস্থা এমন হয়েছে , তা কিন্তু নয় । তোমার অবস্থা এমন কেনো হয়েছে তুমি জানো ! তুমি অবুঝ নও ফুলি ! তোমার জীবনে এখন তোমার আম্মা ব্যাতীত আর কেউ নেই । আর কারোর গুরুত্ব বুঝতে হবে না তোমায় । নিজেকে সামলাও আগে , নয়তো আম্মাকে সামলাবে কে ?
ফুলি চেয়ে থাকতেই চোখ জ্বলে উঠলো । পানি জমলো অক্ষিপটে । বিষাদ ঘিরে ধরলো ওকে । বুক খানা উঠলো মোচড় দিয়ে ।

গলা কাঁপল কিছু উচ্চারণ করতে । তবুও কম্পিত কন্ঠে কোনো রকমে বললো মেয়েটা….
” আচ্ছা ছোট জমিদার , মানুষরে দেখলে চেনা যায় না ক্যান কইতে পারেন । মানুষ এমন মুখোশ পইরা থাকে ক্যান ? আশা জাগায় ক্যান মানুষ ?
” মানুষের মুখোশ পড়ার প্রয়োজন হয় না । অমানুষের প্রয়োজন হয় । যারা মুখোশ পড়ে , তারা অমানুষ ।
” উনি অমানুষ আছিলো ? আমি তো ভালো ভাবছিলাম । সেই ছোট্ট কাল থাইকা এইটাই মাইনা আইছি !
” যেটা ভেবে এসেছো , তাকে যেমন ভেবে এসেছো , সে কি শেষমেশ তেমন রইলো ?
ঠোঁট ভেঙে আসলো ফুলির । এ পর্যায়ে চোখ থেকে পানি গড়ালো । চোখ নামিয়ে এক হাত দিয়ে অন্য হাত চেপে ধরলো । উচ্চারণ করলো অস্ফুটে অবিশ্বাসে…
” রইলো না তো ।
” তাহলে ?

” আমি না হয় বোকা , ঘিলু নাই আমার মাথায় , বুদ্ধ বানাইছে আমারে । কিন্তু আপনি তো হুঁশিয়ার , আপনিও চিনলেন না মানুষ ? সে যে এমন বুঝলেন না ?
” সে তো আমার সাথে অবিচার করে নি । আমি তাকে যেমন দেখেছি,তেমনই ভেবেছি ‌। আমার সামনে ওর স্বত্ত্বা এক ছিলো । তোমার সামনে ছিল দুটো…
ফুলি ঠোঁট কামড়ে ধরলো । শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসা কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করলো বৃথা । কিন্তু পারলো না । দম বন্ধ হয়ে আসতেই ফুঁপিয়ে উঠলো জোরে ।

মানুষটা অমানুষ , এটা মানতে কষ্ট হচ্ছে । মনের ভেতর যেটুকু আশা বেঁচে আছে , সেটুকুতে আর ছাই চাপা দিতে ইচ্ছে করছে না । আহাদের সম্পর্কে সবটা জানা স্বত্বেও এখনও নিজের মনকে আশ্বাস দিচ্ছে সে , যে সবটা মিথ্যে ! যদি অন্তত মিথ্যে হয় ! কিন্তু বললেই কি আর হয়‌ ? সত্যিটা মিথ্যে হয় ? সবটা তো সত্যি । সে যে দেখেছে নিজের চোখে । দেখেছে আহাদ কে সংসার করতে । বউ নিয়ে বাড়িতে ঢুকতে । আহাদ তো সম্পর্কে ওর ফুফাতো ভাই । ফুফু এখনো বেঁচে আছেন । পাশাপাশি ঘর ছিল ওদের । তবে ওর ফুফু মোটেও সহ্য করতে পারতো না ওদের । বাড়ি এক হলেও, দুই ঘরের মাঝে বেড়া দিয়ে দুটো আলাদা চত্তর করা ছিলো । একঘরে করে রেখেছিল ফুলি ওর আম্মা কে । তবুও কোনো অভিযোগ ছিল না মেয়েটার । আহাদ তো পাশে ছিল । অভিযোগ করার প্রয়োজনই হয় নি । কিন্তু কি হলো শেষে ? যাকে পাশে ভাবলো , সেই বেরোলো সবচেয়ে দূরের জন । বাপ মরেছে সেই ছোট্ট কালে , মাও অসুস্থ । ফুলির বাঁচার আশা ওর মা । আহাদ সবসময় ওর পাশে থাকতো ।

নিজের মায়ের অগোচরে চুপিসারে সব ভার বহন করতো ফুলি আর ফরিদার । টানাটানির সংসারে ফুলি চলতো কোনো রকমে । ফরিদার পেছনে খরচ হতো যা । ঔষধ পত্র এখন আর খেতে হয় না , এখন সেটুকু খরচ ও নেই ‌। সংগ্রাম জোয়ার্দার আগে থেকেই ফুলিকে চিনতো । অনেক বার অনেক ভাবে ফুলিদের সহায়ক হয়ে দাঁড়িয়েছে সে । আহাদ শহর ছেড়ে গ্রামে আসার পর ফুলির কথা ভেবেই নিজের দায়িত্বে আহাদ কে নিজের সাথে রেখেছিল সে ‌। কাজ দিয়েছিল গাড়ির চালক হিসেবে । বেতন দিতো হিসেবের তুলনায় দ্বিগুণ । যাতে ফুলিদের চলতে অসুবিধা না হয় । দেখে খারাপ মনে হয় নি ছেলেটাকে । বেশ নরম শরম আহাদ । ফুলির দিক থেকেই ওকে চেনা সংগ্রামের । ফুলি কে যে আহাদ ভালোবাসে , এটা ধারনায় ছিল সংগ্রামের । হাবভাবে অনুমান করেছিল সে । ফুলিও সারা জীবন স্বপ্ন বুনে এসেছে , আহাদ ভাইয়ের বউ হবে সে । আহাদ ভাই, আহাদ ভাই করে মুখে ফেনা তুলতো শ্যামার কাছে । লজ্জাও পেতো নিজের মাঝে ‌। কালচে শ্যামলা চেহারা খানা আহাদের কথা উঠলে রাঙা হয়ে উঠতো ।
সেই আহাদ কি করলো ? বিয়ে করলো ! আচমকা একদিন বউ তুললো ঘরে । ফুলির সামনে বউকে পরিচয় করিয়েও দিল হেসে হেসে । বললো দ্বিধা হীন সোজাসাপ্টা..

” এই দেখ ফুলি , এইটা তোর ভাবি ! তোর আহাদ ভাইয়ের বউ ! কেমন কও দেখি ? পছন্দ হয়েছে তোর ভাবিকে ?
ফুলি নির্বাক ছিলো সেই দিন সেই মুহূর্তে । নতুন বউয়ের সাথে কি সুন্দর হাসছে ওর আহাদ ভাই !
এটা আদৌ সত্যি ? সত্যিই দেখছে ফুলি ? সজল ঝাঁপসা চোখে নির্বোধের ন্যায় চেয়ে ছিল সেদিন মেয়েটা । এটা তো দুঃস্বপ্ন ! ফুলিটা আসলেই বোকা , বাস্তব কে স্বপ্ন বলে চালাতে চেয়েছিল ! কিন্তু পারলো না চালাতে । বাস্তব তো বাস্তবই !
ফুলির হতবাকের ন্যায় চেয়ে থাকার মাঝে আহাদ আবার প্রশ্ন করেছিলো…
” কি রে , বল ? পছন্দ হয়েছে ভাবি কে ?
ফুলি উত্তর করে নি ‌। স্থান ত্যাগ করেছিল নীরবে । আহাদ ভাইয়ের এনে দেওয়া শাড়ি,চুড়ি, আলতার কৌটা , খুব সযত্নে আগলে রেখেছিল মেয়েটা । দ্বিতীয় বার এগুলো পড়ে নি পুরনো হয়ে যাবে বলে । কি হলো ? ওগুলো তো নতুনই রইলো । পুরনো হলো স্মৃতি , কল্পনা গুলো ।

আহাদ হঠাৎ কেনো বিয়ে করেছে জানা নেই ! জানতেও চায় নি ফুলি । দ্বিতীয় বার চোখ তুলেও তাকায় নি আহাদের দিকে । দুটো দিন গুমড়ে গুমড়ে ওভাবেই কাটিয়ে ছিলো । আহাদের বউটা ভালো । মিশুক বেশ । ফুলির সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিল । ফরিদা কেও নিস্বংকোচে ঘৃনা হীন দেখেছিলো দুবার ‌। মাঝের বেড়া পেরিয়ে চুপিচুপি কয়েকবার ফুলির কাছে এসেছিলো কথা বলার সুযোগে । ফুলি কথা বলে নি । সংগ্রাম যখন জানলো এসব , তখন সে ফুলিদের বাড়িতে গেছিলো ‌। এমনিতেও যাওয়া আসা চলতো ফুলির মাকে দেখার জন্য । আহাদ কে শুধু প্রশ্ন করেছিল সংগ্রাম , যে সে ফুলিকে ভালোবাসতো কি না ? আহাদ উত্তর করেছিল সোজাসুজি , সে ফুলিকে কখনো ভালোবাসেনি । অসহায়ত্বে করুনা দেখিয়েছিল সে ‌। এর বেশি কিচ্ছু না । উত্তরটা ছিলো ফুলির সম্মুখে । শুনেছে ফুলি । উত্তর করতে একটুও বাঁধে নি আহাদের মুখে । কেমন টানটান হয়ে উত্তর করেছে । সংগ্রামের সামনে অন্যসময় মাথা নুইয়ে কথা বলতো । কিন্তু সেদিন ওর মাথা নোয়ানো ছিল না ।
সেদিনের পর ফুলি কে ওবাড়ি থেকে বের করিয়ে এনেছে সংগ্রাম ‌। মনে মনে ভেবেছে , সেও এক রকম আহাদ । অন্তত বালার দিক থেকে । সেও তো আহাদের অনুরূপ । নয় কি ? ও যা করেছে , তাই করেছে আহাদ ও । ওর বেলায় ফুলির জায়গায় ছিল সুরবালা । এক চিলতে ভালোবাসার জন্য নিজের মাঝে দীর্ঘ দিন স্বপ্ন বুনেছিল দুই রমনী , স্বপ্ন ভেঙ্গেছে দুই যুবক ।

সংগ্রাম আর আহাদ কে কি বলতো । নিজের দিক থেকে বিবেচনায় সে কিছুই বলে নি আহাদ কে । হয়তো বলা উচিত ছিলো । আহাদ কে কিছু বললে অপরাধী হিসেবে গণ্য হতো আহাদ , সেক্ষেত্রে সংগ্রাম ও গন্য হওয়ার কথা ।
আজ যে ওকে অমানুষ বললো , এটা বলতে একটু জড়িয়ে যাচ্ছিল জিভে । কিন্তু ফুলিকে শান্তনার ভাষা বোঝানোর জন্য বলতে হয়েছে । ফুলিটা ভালো , সহজ সরল ।
মেয়েটা কে এই মুহূর্তে অমন করে কাঁদতে দেখে ভালো লাগলো না সংগ্রামের কাছে । শ্যামা এসব জানে না । এসব তো এখনকার ঘটনা নয় । অনেক দিন হচ্ছে এসবের । শ্যামা কে এবার মাধবপুরে রেখে যাওয়ার পর সংগ্রাম ভেবেছিল ফুলি হয়তো জানিয়ে দেবে ওকে । কিন্তু পরবর্তীতে শ্যামার নীরব ভাবমূর্তি দেখে বুঝেছিল ফুলি কিছুই বলে নি ।
ফুলি ঠোঁট কামড়ে কান্না সংবরন করলো । সংগ্রাম বললো শ্বাস ফেলে…

” আম্মা আর নিজের খেয়াল রেখো । এখানে কিন্তু আশেপাশে তোমাদের কেউ নেই , বাড়ি থেকে বেরোবে না কোথাও । ঠিক ঠাক খাবে , আম্মাকে ও দেখবে । শুক্রবার তোমাকে এসে নিয়ে যাবো তোমার সইয়ের কাছে । কেমন ?
ঘাড় কাত করে সম্মতি দিলো ফুলি । সংগ্রাম ঘর থেকে বেরিয়ে আসলো । দরজা পর্যন্ত এসে আর বেরোলো না ফুলি । রহিম,করিম, সংগ্রাম জিপে উঠেই কালো ধোঁয়া উড়িয়ে শব্দ তুলে চলে গেল নিমিষেই ।
নীরব সংগ্রাম । গাড়ির শব্দ শুধু । রহিম গাড়ি চালাচ্ছে । পিছনে করিম বসে । সে একটু সামনের দিকে ঝুঁকে বললো গলা ঝেড়ে….

” ছোট জমিদার , আপনি…
কথা শুরুই করতে পারলো না । এর আগে ঝাড়ি মারলো রহিম..
” চাপকে ছাল তুলবো । ছোট জমিদার কি ? জমিদার ক ! জানোস না , উনি এখন ছোট জমিদার নাই ! জমিদার হইছে আমাগো…
পথের দিকে তাকিয়ে ওদের কথায় হাসলো সংগ্রাম । করিম নিজেকে শুধরে আমতা আমতা করে আবারো বললো….
” আচ্ছা , জমিদার সাহেব.. একখান কথা কোই ?
” হুম !
” আপনি আহাদ রে কিছু কইলেন না যে , ছাইড়া দিলেন এমনে সহজে ?
” হুম ।
” কেন ?
” সংসার পেতেছে ও‌, নতুন সংসারে নতুন বউয়ের জীবন টা নষ্ট করতে ইচ্ছে হয় নি ।
” অয় যে একখান মাইয়ার জীবন নষ্ট করলো ! তার বেলা ?
” নষ্ট আর কোথায় করলো ?
” করলো না ? ফুলি মাইয়া টা তো ওরে পছন্দ করতো , এইটা জাইনাও বিয়া করলো যে ?
” হয়তো ও কখনো সে চোখে দেখে নি ফুলি কে ! তাই ফুলির পছন্দ টাও গুরুত্ব দেয় নি ..
এবার কটাক্ষ করলো রহিম । বললো…
” এহহহ্,,, দেখে নাই । ব্যাডারে কয়দিনে চিনছি আমি । সুন্দর মাইয়া দেইখা মইজা গেছে । ফুলি তো একনা কালা , এই লাইগা ছাড়ছে, মত পাল্টাইছে….
করিম কপাল গুটিয়ে বলে উঠলো…

” আহাদের বউরে দেখছোস তুই ?
” হ !
” ক্যামনে ?
” চৌখ দিয়া ।
” মারমু একটা কিল , মাইনষের বউরে চৌখ দিয়া দেখতে লজ্জা করে না ?
” চৌখ দিয়া দেখমু না তো কি দিয়া দেখমু ? আল্লাহ’য় দুই খান চৌখ দিছে দেখার লাইগা !
তুই কি মাইনষের বউরে নাক দিয়া দেখোস ?
” চুপ কর , আমি কার বউরে দেখছি ?
” ক্যান , আমগো পাশের বাড়ির জলিল বুইড়ার নয়া বউটারে দেখোস নাই ? তুই তো দেইখা আইসা কইলি , বুইড়ার কপালে কচি বউ । আমরা একখান বিয়া করবার পাই না মাইয়ার অভাবে , আর বুইড়া ব্যাটা কচি বউ কোত্থেকে জোগায় কেডায় জানে !!
” ঐ কচি বউ টারে দাদির চৌখে দেখছি আমি , হেয় দাদি আমগো । দাদি কইয়া ডাকছিও আমি ! আর মাইয়াগো দিকে ভুল কইরা একবার তাকাইলে গোনাহ নাই । আমার গোনাহ হয় নাই বাপু….
” আমিও ভুল কইরা চুপ কইরা আহাদের বউরে দেখতে গেইছিলাম , এক পলক দেখছি আমার ও গোনাহ হয় নাই ।
” ওরে কালা পাঠা , তুই মাইনষের বউরে দেখার লাইগা উদ্দেশ্য কইরা গেছিলি ? খাড়া , আইজ বাড়ি যাই , আম্মারে কইতাছি খাড়া !
অমনি ব্রেক কষলো রহিম । কটমটিয়ে তাকালো পিছনে । ঝাঁজিয়ে উঠলো….

” তুই আমারে কালা পাঠা কইলি ক্যান ? আমি পাঠা..?
” ওও থুক্কু , কালা পাঠা না , কালা খাসি হইবো । তোর তো মোসলমানি হইছে , আমি ভুইলাই গেছিলাম !
রহিম তেলে বেগুনে গিজগিজ করে জ্বলে উঠলো । কথা শেষ করেই পেট চেপে হো হো করে হেসে উঠলো করিম । হাসলো সংগ্রাম ও । ক্ষিণ হাসি ওর । এ দুটোতে সারাক্ষণ এভাবে লেগে থাকে একে অপরের পিছে । শরীরে আর বয়সেই বেড়েছে এরা । বুদ্ধি এখনো হাঁটুর নিচে । এদের শরীরের চওড়া গঠন দেখলে যে কেউ ভয় পাবে । কিন্তু কথা শুনলে টাস্কি খাবে । সংগ্রাম এদের কে ভালো করেই চেনে ।
সহজ সরল এরা । কোন প্রকার কাঠিন্যতা নেই এদের মাঝে । সেই বছর সাতেক থেকে এরা সংগ্রামের সঙ্গি । একেবারে সঙ্গের সাথী ‌। এদের কে বেশ উপভোগ করে সংগ্রাম । সংগ্রামের যেকোনো কর্মকাণ্ড , পদক্ষেপ,সব এদের নখদর্পণে থাকে । সংগ্রাম বলার আগেই সবটা হয়ে যায় । এদিক থেকে বেশ চতুর ওরা । কঠিন কাজেও হাত কাঁপে না । কারন সে কাজ সংগ্রাম করতে বলেছে , সংগ্রাম কে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে এরা । নিজে ভুল হতে পারে কিন্তু সংগ্রাম ভুল হবে না কখনোই । এটাই মানে এরা ।
রহিম কে ক্ষেপে যেতে দেখে সংগ্রাম বলে উঠলো এবার….

” থামবে তোমরা ? বাড়ি যাবো , বাড়িতে চলো…
রহিম সামন ফিরে দাঁত চেপে বললো করিমের উদ্দেশ্যে….
” তোরে তো পরে দেইখা নিমু ।
” হ দেখিস , আমারে চৌখ দিয়া ভালো কইরা দেখিস । গোনাহ হইবো না এতে । তাও মাইনষের বউরে দেখিস না , কব্বরে গেইলে নাইলে আমারে সাক্ষী দিতে হইবো তোর উলুক ভুলুক কাজ কামের লাইগা ।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল । আজ ক্ষেতে গেছে আফতাব । ওর বাবার সাথে হাল ধরেছে আজ । দুপুরে এসে দুই বাপ ছেলে খেয়ে আবার বেরিয়েছে । এখনই রাতের রান্না বসিয়েছেন খালেদা ‌। ময়না চুলার পাড়ে আঁচে বসে আছে হাতে একখানা বই নিয়ে । এক হাত মাথায় রেখে অন্য হাতে বই ধরে ঝিমুচ্ছে বসে বসে । বইয়ের দিকে তাকালে রাজ্যের ঘুম সব ঘিরে ধরে চোখে । অন্যসময় তো ঘুম আসে না । পড়ার সাথে ঘুমের বিরোধটা কোথায় ? পড়তে বসলেই কেনো ঘুম পেতে হবে ?
বারবার হাই উঠছে আবার । খালেদা পলকে পলকে দেখছেন আর মিটিমিটি হাসছেন । দুপুরে খেতে এসে ময়নার দায়িত্ব খালেদার হাতে দিয়ে গেছে আফতাব । যেন ফাঁকিবাজি করতে না পারে এই মেয়ে । এর মধ্যেই খালেদার সাথে নামাজ শুরু করেছে ময়না । সেই দুপুরে নামাজের পর থেকেই বই হাতে নিয়েছে । হাত থেকে বই নামায় নি আর । এই হেঁটে হেঁটে পড়ছে , আবার বসে বসে । কি পড়ছে ওই ভালো জানে । মুখ না নাড়িয়ে বইয়ের পানে চেয়ে দেখতে দেখা যাচ্ছে ওকে । খালেদা অবুঝ , তিনি বুঝছেন পড়ছে তার বউমা ।
ময়না হাই তুলে তুলে বিরক্ত । অবশেষে ঠাস করে বই খানা বন্ধ করলো ও । খালেদার দিকে তাকিয়ে কাঁচুমাচু মুখে বললো…

” আর না পড়ি আম্মা ? মেলাক্ষন থাইকা পড়তাছি ! ভালো লাগতাছে না আর !
খালেদা একটু বিরতি দিলেন । স্বস্তি দিয়ে বললেন…
” আইচ্ছা আরাম নেও একটু !
” আপনের পোলারে কইবেন না তো ?
” নাহ , কমু না ! তুমি দম নেও একনা ।
দীর্ঘ শ্বাস ফেললো ময়না । কি শান্তি! কি শান্তি ! এতক্ষণে দম নিতে পারছে সে । খালেদা ভাত বসিয়েছেন । আসরের আছান পড়ে গেছে । ভাত হয়ে এসেছে প্রায় । ভাত নামিয়ে চুলায় জ্বাল বাড়িয়ে তরকারি চাপালেন তিনি । শিং মাছ রান্না হবে । আফতাবের অপছন্দ এটা । তার জন্য আলাদা করে বড় মাছ ভাজা হবে ।
দুটো জোড়া চুলো । একটা তে মাছ বসিয়েছে, অন্যটায় কড়াই চাপিয়েছেন মাছ ভাজার জন্য । তেল ঢেলে দিয়েছেন, তেল গরম হয় নি । এদিকে নামাজের ওয়াক্ত চলে যাচ্ছে । ময়না তড়িতে বললো….

” আম্মা , আপনি গিয়া নামাজ পাইড়া লন । আমি এইহানে আছি । আপনের পর আমি পড়মু ।
” পারবা তো , হাত পাত পুড়াইবা না ?
” নাহ , পারমু আমি ! আপনি যান….
খালেদা কথা বাড়ালেন না বেশি । সময় চলে যাচ্ছে । ময়না টুকটাক কাজ কাম পারে এটা অজানা নয় । এখানে তো আর কিছুই করতে হবে না তেমন । তেল‌ গরম হয়ে আসলে মাছ ছেড়ে দিতে হবে শুধু ।
কথা না বাড়িয়ে উঠে গেলেন খালেদা । ময়না এসে বসলো তার জায়গায় । কলপাড় থেকে ওযু করে এসে সতর্কিত নজরে ময়নার দিকে চাইলেন খালেদা । বললেন আবার…
” হাত টাত পুড়াইয়ো না আবার । তেল গরম হইয়া আইলে মাছ দিও । না আমি দিমু ‌?
” আমি দিমু আম্মা , আপনি যান ।

পাশের চুলায় আগুনের তাপ কম । তেল গরম হতে দেরি আছে । খালেদা নামাজে ঢুকলেন । ময়না গুনগুন করতে করতে চুলায় জ্বাল দিচ্ছে । এদিকে তেল গরম হয়ে এসেছে , সেদিকে খেয়াল নেই । খেয়াল দিতেই তড়িঘড়ি করে মশলা মাখানো মাছ খানা ঠাস করে তেলের মধ্যে ফেললো ময়না । ছনছনিয়ে উঠলো অমনি । সাথে সাথে ময়নার ব্যাথা তুর আহ্ সূচক চিৎকার । চোখের নিচে গালের পাশ চেপে ‘আম্মা’ বলে চিৎকার দিয়ে উঠলো মেয়েটা । খালেদা সিজদায় পড়েছেন , আঁতকে উঠলেন সেই অবস্থাতেই । বুক খানা ধড়ফড়িয়ে উঠলেও নামাজ ছেড়ে উঠলেন না তিনি ।
ময়না ডুকরে উঠলো । চোখ মুখ খিচে কেঁদে উঠলো মেয়েটা । ফুটন্ত গরম তেল ছিটকে এসে পড়েছে ডান চোখের পাশে । তৎক্ষণাৎ নিজেকে সামলে নিতে পারলো না ময়না । চেপে ধরেছে সেখানটায় ।
চিনচিন করে ঝাঁজালো ব্যাথার তীব্রতা গাঢ় হতেই ফিকড়ে উঠলো মেয়েটা ‌। বাড়লো কান্নার বেগ । খালেদা পারছেন না নামাজ ছেড়ে উঠতে । আনচান করছেন তিনি । মুখে আয়াত জড়িয়ে যাচ্ছে ।
যথা সময় উপস্থিত আফতাব আর ওর বাবা । মাঠের কাজ শেষ । গায়ে পায়ে কাঁদা, ময়লা দু’জনের । ময়নার কান্নার শব্দ বাইরে থেকে অনুমান করেই তড়িঘড়ি করে বড় বড় ধাপে বাড়িতে ঢুকলেন তারা ‌। চুলার সামনে ময়না কে মুখ চেপে ধরে মাথা নুইয়ে শরীর খিচে ছটফট করতে দেখে আঁতকে উঠলো উভয়েই । হাতের কোদাল ধাম করে ছুঁড়ে ফেললো আফতাব । চেঁচিয়ে উঠলো…

” ময়না ?
সাথে ওর বাবাও…
” বউমা…
শোনার মতো অবস্থায় নেই ময়না । তেড়ে আসলো আফতাব । হেঁচকা টানে তুলে দাঁড় করালো ময়না কে । বুঝতে বাকি নেই কি হয়েছে । তপ্ত ঝাড়ি মারলো আফতাব…
” এই মেয়ে , কি হয়েছে এভাবে ? কি করে হলো ?
ব্যাথার সাথে সাথে ধমক । ঠোঁট উল্টে কান্না ভেজা সজল নয়ন জোড়া তুললো ময়না । ফের তপ্ত ধমকে উঠলো আফতাব…

” হাত সরাও ।
চমকে হাত সরালো মেয়েটা । কেঁপে উঠলো সর্বাঙ্গ । ফর্সা গালের পাশটা এর মধ্যেই লাল টকটকে বর্ন ধারন করেছে । কালচে হয়ে আসছে ধীরে ধীরে ‌। ফোস্কা পড়বে এক্ষুনি । আফতাব বড় সড় সঙ্কিত নজরে চাইলো । মুহুর্তেই ময়নার শাড়ির আঁচলটা টেনে জগের পানিতে চুবিয়ে ভিজে আঁচল খানা চেপে ধরলো পোড়া স্থানে । চিনচিন করে উঠতেই ঠোঁট কামড়ে কুকিয়ে উঠলো ময়না । খালেদা তড়িৎ বেগে ঘর থেকে নামাজ সেরে ছুটে এসেছেন । ধড়ফড়িয়ে উঠলেন তিনি । চুলার পাড়ে ঘন কালো ধোঁয়া উঠছে । কড়াইয়ের তেল পুড়ে একাকার , মাছটাও পুড়ে ছাই এতক্ষণে । খালেদা চুলা থেকে কড়াই নামালেন । আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন…
” কি হইছে বউমা ? আমি কইলাম হাত টাত পুড়াই ফেলবা ! হুনো আমার কথা ? তেল ছিটকাই পড়লো তো মুখে .. কেমন একখান কান্ড কও দেখি । দেখি দেখি , খুব জ্বালা করতাছে বউমা ? জখম হইছে …
আফতাব শাড়ির ভেজা আঁচল সরালো । চামড়া ছুলে গেছে । ফর্সা চামড়া গলে ভেতরের লালচে মাংস স্পষ্ট । ফুঁপিয়ে উঠলো ময়না । আফতাবের বাবা সঙ্কিত হয়ে শুধালেন…

” তুমি রান্ধতাছো ক্যান বউমা ? তেল ছিটকাই পড়লো ক্যামনে মুখে…?
ময়না কোনো রকমে ফুঁপিয়ে বললো…
” মাছ দিতে গেছিলাম… গরম তেল ছুইটা আইছে !
” চুপপপ , একটা থাপ্পর মারবো । কথা বলছো আবার ? তোমাকে কে রান্নার কাজে হাত দিতে বলেছে ? যা পারো না তা করতে যাও কেনো, হ্যাঁ ? বেশি মাতব্বরি ? পড়াশোনা নেই ? বলেছিলাম তো বই হাত থেকে না ফেলতে ! কথা কানে যায় নি ! আমার কথার অবাধ্য হওয়া পছন্দ করি না, বলেছিলাম কি না ? মনে নেই….
চড়া গলার শক্ত ধমকে কেঁপে উঠে পিছিয়ে দাঁড়ালো ময়না । তড়িতে ভয়ার্ত নয়নে চাইলো আফতাবের দিকে । চোখ মুখ টাটানো আফতাবের । ক্ষোভে ফুঁসছে সে । তামাটে বর্ন ধারন করেছে চেহারা খানা । কপালে কাঁদা লেগে শুকিয়ে গেছে ।
শুকনো ঢোক গিললো ময়না । মুখশ্রীতে ফুটে ওঠা ব্যাথার ছাপ ভয়ে পরিনত হলো ।
খালেদা ছেলের রাগান্বিত অবস্থা ঠাহরে বললেন ….

” আহ্ , ধমকাইতাছোস ক্যান ? মাইয়া টা একেই ব্যাথা পাইছে..
” পাক ব্যাথা ! আমার কথার অবাধ্য হতে কে বলেছে ওকে ?
দাঁত পিষে শক্ত নিরেট কন্ঠ আফতাবের ।
ময়না চোখ মুখ নামিয়ে সিটিয়ে গেলো আরো । আফতাবের বাবা বললেন এবার….
” আর কথা বাড়াইয়ো না । পোড়া জায়গায় ঔষধ লাগাইয়া দেও । জ্বলন কমবো তাইলে..
খালেদা ময়না কে সাথে করে আফতাব কে পাশ কাটিয়ে ঘরে গেলেন । নিজেকে ধাতস্থ করে পিছু নিলো আফতাব । আফতাবের দৃষ্টির অগোচর হয়ে ঘরে ঢুকতেই শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠলো ময়না । ঠোঁট উল্টে নিজের ভেজা আঁচল দিয়ে ফের চেপে ধরলো পোড়া জায়গাটা । খালেদা তড়িঘড়ি করে টেবিলের ড্রয়ার খুঁজে মলম বের করলেন । অসহায় চোখে তাকিয়ে ময়না কে কাঁদতে দেখে বললেন…

” খুব কষ্ট হইতাছে বউমা ? খাঁড়াও ঔষধ লাগাই দিতাছি । কইমা যাইবো জ্বলন । তোমারে কইলাম তুমি পারবা না । হুনো আমার কথা ! দেখো তো চেহারা খানার কি অবস্থা হইলো । কাইন্দো না , ঔষধ লাগাইলে ঠিক হইয়া যাইবো…
মলমের ঢাকনা খুলতেই ঘরে ঢুকলো আফতাব । চোখে মুখে একই ক্ষিপ্ততা । ওকে দেখে একটু থামলেন খালেদা । আফতাবের বাবা বাইরে থেকে ডাকছেন । খালেদা পরিস্থিতি বুঝে আফতাবের হাতে মলমটা ধরিয়ে দিয়ে বললেন…
” বউ মারে ঔষধ লাগায় দে তো বাপ ! তোর আব্বায় ডাকতাছে । আমি দেইখা আহি ।
বলেই বেরিয়ে গেলেন তিনি । আফতাব কিছুক্ষণ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল । ময়না ওকে দেখে ফের কান্না চেপেছে কোনো রকমে । তবুও ফিকড়ে উঠছে । আফতাব শক্ত চোয়াল আরো শক্ত করলো । ধমকালো আবার…
” কাঁদছো কেনো এখন ! কর্ম করেছো ফল পাবে না ?
গুটিয়ে গেলো ময়না । আফতাব এগিয়ে সামনে দাঁড়ালো । চিবুক গলায় ঠেকিয়েও শত কষ্টে নিজেকে সামলে নিতে পারলো না মেয়েটা ‌। দম আটকে ফিকড়ে উঠলো আবার !

” চুপপপ , একটা থাপ্পর মারবো, যদি আর একবার কান্নার আওয়াজ আমার কানে আসে !
চমকে ভড়কে দুহাতে মুখ চেপে ধরলো ময়না ‌। চোখ বন্ধ করে নিলো খিচে । আফতাব ক্ষিয় কাল তাকিয়ে থেকে শক্ত চোয়াল নরম করলো । বললো তবুও নিরেট আদেশে…
” মুখ তোলো !
ময়না শুনলো না প্রথমে । ফের বললো আফতাব…
” মুখ তুলতে বলেছি , তোলো…
ঝট করে মুখ তুললো ময়না । চোখের নোনা জল পোড়া স্থানে মিশতেই জ্বলন বেড়েছে । দাঁত চেপে সহ্য করছে ময়না । আফতাব আর কিছু বললো না । মলম এক আঙুলের ডগায় নিয়ে হাত এগিয়ে দিতেই পিছিয়ে গেল ময়না ‌। ভড়কানো কাঁপা গলায় বুলি ফুটালো…
” জ্বলবো !
” জ্বলবে না । জ্বলন কমবে !

এবার নরম স্বর । ময়না এরাব ভেজা চোখে চাইলো আফতাবের দিকে ‌। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই আফতাব সামন থেকে সরে পাশে বসলো । ধীরে ওর দিকে ফিরলো ময়না ‌। আফতাব হাত বাড়িয়ে পোড়া ছেলা স্থানে মলম লাগাতেই চিনচিনে ব্যাথায় চোখ খিচে মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো ময়না । খামচে ধরলো বিছানার চাদর । কামড়ে ধরলো নিচের অধর । আফতাব কোনো দিকে খেয়াল না দিয়ে আলতো স্পর্শে খুব সাবধানি হয়ে ক্ষতস্থানে মলম লাগালো । অতঃপর হাত সরিয়ে বললো…
” আর জ্বলবে না , ঠান্ডা হয়ে যাবে একটু পর ।
চোখ খুললো ময়না । ঝিনঝিন করছে পুরো শরীর । আফতাব উঠে মলম টা আগের জায়গায় রাখলো । শরীরের হাল বেহাল । ময়লা শরীর । কাঁদা লেগে হাঁটু পর্যন্ত । ময়না নাক টানতেই ফের চকিতে চাইলো । বললো তড়িতে…
” আবার কাঁদছো ?
” কোই , কাঁদি নাই তো…
” ব্যথা হচ্ছে ?
হ্যাঁ বোধক মাথা ঝাঁকায় ময়না ।
” দেখি !
হাত বাড়িয়ে দিতেই ছলকে পিছিয়ে গেলো ময়না ।
” লাগবো !
” লাগবে না !

ভীত আড়ষ্ট হয়ে বসলো ময়না । আফতাব একটু ঝুঁকে ক্ষতস্থানে ভালো ভাবে নজর বোলালো । সাথে সাথে নজর বুলিয়ে নিলো মেয়েটার পুরো মুখশ্রীতে । চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ার ছাপ স্পষ্ট । ওষ্ঠ জোড়া ফুলে গেছে ‌। কেঁপে কেঁপে নিঃশব্দে ফিকড়ে উঠছে এখনো । ভেজা চোখের পাপড়ি । আফতাব সেভাবে তাকিয়েই বললো আচমকা…
” খুব ব্যাথা পেয়েছিলে ?
আদুরে হয়ে আবারো হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ালো ময়না ‌। আফতাব বললো ঠোঁট চেপে…
” পোড়া জায়গায় একটা থাপ্পর মারি ?
আঁতকে বৃহৎ নয়নে চাইলো ময়না । আফতাব হাসলো আলতো । চোখে আবেশ নিয়ে একই ভাবে তাকিয়ে আবার বললো , যেনো অনুমতি চাইছে..
” মারবো ?

ওষ্ঠ উল্টালো ময়না । চাইলো করুন চোখে । আফতাব চোখে চোখ রেখে মৃদু হাসলো । আচমকা হুট করে ওষ্ঠ বাড়িয়ে ফিকড়ে ওঠা ময়নার চোখের পাশের পোড়া ক্ষতস্থানে উষ্ণ পরশ আকলো । গাঢ় স্থায়ী ছিল পরশ টুকু । ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো ময়না । পেছাতে চাইলেও পারলো না । শ্বাস আটকে নিলো কন্ঠ নালিতে । খানিক সময় পেরোলে আফতাব ঠোঁট সরিয়ে ফের চোখে চোখ রেখে হিসহিসিয়ে উঠলো…
” তোমার অঙ্গে এটাই যেন শেষ ক্ষত হয় । এরপর আমার অবাধ্যতায় যদি ভুল করেও কোনো ক্ষতের সৃষ্টি করেছো নিজের শরীরে , তাহলে ভালো হবে না । এটাকে হিংসে হচ্ছে আমার , বুঝলে ?

আমার দেওয়া আঘাতের স্পর্শ তো দূর , আমার ভালোবাসার স্পর্শেও তোমার শরীরে কখনো ক্ষতের সৃষ্টি হবে না ‌। আমার স্পর্শেই যদি ক্ষতের সৃষ্টি না হয়, তাহলে অন্য কোনো কারনেও হতে দেবো না আমি ।
যদি হয় তাহলে সহ্য করবো না । কথাটা যেন মাথায় থাকে , পরের বার নিজেকে সামলে রাখবে । শরীরে যেন এক টুকরো ক্ষতের দাগ ও না থাকে…
কথা শেষ করেই এক মুহুর্ত অপেক্ষা করলো না । গটগটিয়ে ঘর ছাড়লো আফতাব । ময়না হতবাক হয়ে মূক বনে রইলো । কি ঘটলো আচমকা ? বন্ধ করে রাখা শ্বাস বুক চিরে বেরিয়ে আসলো ময়নার । চোখে অবিশ্বাস । দৃষ্টিতে ঘোর । থম মেরে রুদ্ধ গলায় ঢোক গিললো মেয়েটা ।

তখন সংগ্রাম বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলেও সোজা বাড়িতে আসা হয় নি আর । সারাটা দিন পেরিয়ে সন্ধ্যার আগ মুহূর্তে ক্লান্ত অবিসন্ন হয়ে বাড়ি ফিরেছে । মুকুন্দপুরে গেছিলো একবার । ওদের সুখের নীড়ে । তিন তলা ভবনের নাম সুখের নীড় । শ্যাওলা জমেছে দেয়ালে । সেখানে আজকাল যাওয়াই হয় না । প্রায় এক শতক আগে বানানো সেই সুখের নীড় । এখনো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অঢেল । টলে নি একটুও , ফাটল ধরে নি দেয়ালে । সংগ্রাম প্রায়শই যেতো আগে , এখন আর যাওয়া হয়না । একটা পরিবার আছে সেখানে , মুকুন্দপুরের মাতব্বর দৌলত গাজির পরিবার । স্ত্রী, সন্তান নিয়ে সেই সুখের নীড়ে বসবাস তার । মাতব্বর ভালো লোক । মধ্য বয়স্ক হলেও সংগ্রামের সাথে বেশ গলায় গলায় ভাব তার ‌।

তাদের মাথার উপর ছাদ দিয়ে ঐ বাড়ির দেখা শুনার দায়িত্বে রেখেছে সংগ্রাম । বাড়ি আসার পথে আজ খবর পেয়েছে দৌলত গাজি অসুস্থ , বেশ কদিন ধরে অসুস্থ হলেও আজ বেড়েছে অসুস্থতা । তাই সংগ্রাম দেখতে গেছিলো তাকে । আটকে পড়েছিল সেখানে । ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যার আগ মুহূর্ত । বাড়িতে এসে শ্যামা কে ঘরে পায় নি সংগ্রাম । কপাল কুঁচকে এসেছে অমনি । এই বেগম আবার কোথায় ? শ্যামার খোঁজ আগে নিলো সে । গায়ের শালটা খুলে খাটের পাশে রেখে, বেরিয়েছে ঘর থেকে । শ্যামা ঘরে নেই , তার মানে নিশ্চয়ই আতিয়া বেগমের ঘরে আছে ‌। তাছাড়া আর যাওয়ার জায়গা নেই । সংগ্রাম সোজাসুজি আতিয়া বেগমের ঘরে হানা দিলো । অনুমতি হীন ঘরে ঢুকলো সে । খাটের উপর গল্পের আসর বসেছে । শ্যামা, শবনম, আতিয়া বেগম, সৈকতও আছে শ্যামার কোলে । শ্যামার সাথে চোখাচোখি হতেই তৃপ্ত শ্বাস ফেললো সংগ্রাম । শ্যামাঙ্গিণীর মুখখানা দেখলো কতক্ষন পর । যেনো দম বন্ধ হয়ে আসছিলো না দেখতে পেরে ।

সংগ্রাম কে দেখে আতিয়া বেগম কপালে ভাঁজ ফেলে তপ্ত স্বরে বিদ্রুপ করলেন…
” এ আবার কেমন ধারা আচার গো দাদু ভাই ? এমনে মাইয়া মাইনষের ঘরে কেউ না বইলা কইয়া ঢোকে ?
সংগ্রাম এগিয়ে বললো রসিক স্বরে…
” মেয়ে মানুষ কই ? এটা তো আতিয়া বুড়ির ঘর । এই ঘরে আসতে আবার অনুমতি লাগবে ?
” লাগবো না ? বুড়ির ঘরে যে একখান জোয়ান মাইয়া আছে , হেইডা কেডায় কইবো ?
সংগ্রাম কপাল গুটিয়ে একে একে তিন জনকে দেখে বললো…
” এই ঘরে আবার জোয়ান কে ?
” ক্যান ? আমার হবু নাত বৌ !
” হবু নাত বৌ টা কে ?
” শ্যামা !
সংগ্রাম সুক্ষ্ম নেত্রে তাকালো । বললো….

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪১

” শ্যামা জোয়ান ?
” জোয়ান নয় ?
মাইয়াটার তিন দিন পর বিয়া পাশের ঘরের জমিদারের লগে ।
শব্দ করে হেসে উঠলো শবনম । শ্যামা হাসলো চোখ নামিয়ে । সংগ্রাম হতভম্ব হয়ে বললো…
” ঐ মেয়েটার সাথে কতগুলো মাস সংসার করলাম ! এখনো জোয়ান আছে সে ?
” সেটা আগের কথা । এখন সেইসব বাদ । তিন দিন পর মাইয়া টার বিয়া । এমনে হুটহাট মাইয়াটার সামনে আইবি না ।

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৩