চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৫
ইশরাত জাহান জেরিন
রাত হয়েছে। শহরের আলো গুলো দূরের তারার মতো জ্বলছে। গাড়ির জানালা নামানো, বাইরে বাতাসে চিত্রার চুল উড়ছে। স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে ফারাজ একপাশে তাকিয়ে মুচকি হাসল।
চিত্রা ঠোঁট ফুলিয়ে বলল, “ফারাজ, প্লিজ… আইসক্রিম খেতে ইচ্ছা করছে খুব।”
ফারাজ ভুরু কুঁচকে তাকাল, “এই রাতে? তুমি কিন্তু তিন মাসের প্রেগন্যান্ট, চিত্রা। ঠান্ডা লাগলে?”
চিত্রা গাল ফোলাল, শিশুসুলভ অভিমান নিয়ে, “তাই কি হয়েছে? নিজের জন্য চাইছি নাকি? বাচ্চা খেতে চেয়েছে।”
ফারাজ হেসে ফেলল। এক হাত বাড়িয়ে আলতো করে চিত্রার পেটের উপর রাখল। “আমার বাবু যা চাইবে, বাবা সেটা এনে দেবে। কিন্তু তার মা’র শরীর আগে।”
চিত্রা ধীরে বলল, “একটু খেলে কিছু হবে না। খুব বেশি না… শুধু দুই স্কুপ।”
ফারাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “ঠিক আছে।”
চিত্রা খুশিতে হাততালি দিল। “ইয়েস! আপনি পৃথিবীর সেরা হাজব্যান্ড।”
ফারাজ হঠাৎ চিত্রাকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি মানুষটা এমন হাসতেও জানো?”
“ওমা ক্রিমিনালদের মন থাকলে, আবেগ থাকলে অফিসারদের থাকবে না? যাইহোক আজকে বাবা-মায়ের সাথে আমার কথা হয়েছে। তারা খুব জলদি বাংলাদেশ আসবে। বাবা কিন্তু এমনিতেই অনেক কষ্টে আমাদের সম্পর্ক-বিয়ে সব মেনে নিয়েছে। ভাবতেই তো পারছেন, এসেছিলাম আপনাকে গ্রেফতার করে ওপরে পাঠাতে। ওপরে পাঠাতে গিয়ে অপরাধীর প্রেমে পা পিছলে পড়ে গেলাম। তাও আমার মুখের দিকে চেয়ে বাবা-মা সব মেনে নিয়েছে।”
” আল্লাহ জানে কপালে আমার কেমন দজ্জাল শশুর-শাশুড়ি রেখেছে। তোমার মা বাংলা জানে।”
“আপনার থেকে তো ভালোই জানে।”
“কেন আমার বাংলা বলা কি খুব খারাপ?”
“না, তবে আপনি গালি দেন না। আপনার থেকে বেশি বাংলা গালি মনে হয় আমার মা জানেন।”
“তোমার মা কি খ্রিষ্টান।”
“তা কেন হতে যাবে। পাক্কা মুসলিম।”
“নাম কী?”
“নাম দিয়ে আপনার কাম কী?”
“আরে বলো না।”
“চৈতন্য কায়সার।”
“ওহ সব চ। চ দিয়ে কিন্তু আমার পছন্দের শব্দ একটা আছে।”
“ছিঃ আপনি ভালো হবেন না? মাথার মধ্যে খালি ওইসব ঘুরাঘুরি করে তাই না?”
“ইয়ে মানে আমি তো চ তে চিত্রার কথা বলেছি।”
চিত্রা এবার লজ্জায় পড়ে যেতেই ফারাজ পেছনের সিটে ইশারা করে বলল,”আমার গাড়িতে অনেক স্পেস আছে। তুমি চাইলে তোমার ভাবনায় আসা শব্দকে বাস্তবায়ন করতে পারি।”
চিত্রা লজ্জা পেয়ে বলল,”ইশ ফারাজ। যান গিয়ে আইসক্রিম আনুন।”
ফারাজ হেসে গাড়ি চালানো শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি থামল এক ছোট্ট আইসক্রিম শপের সামনে। ফারাজ আগে নেমে দরজা খুলে দিল।
“সাবধানে নামো।”
চিত্রা নামতেই ফারাজ তার কাঁধে শালটা ঠিক করে দিল। “হাওয়া লাগবে না বেশি।”
চিত্রা মিষ্টি হাসল। ফারাজ তাকে আইসক্রিম এনে দিতেই সে ধীরে ধীরে খাওয়া শুরু করল। মাঝেমধ্যে ফারাজ তাকিয়ে দেখছে। একটু পর পর বলছে,
“ধীরে, চিত্রা। ব্রেইন ফ্রিজ হয়ে যাবে তো। ঠান্ডাও লেগে যেতে পারে।”
চিত্রা হেসে বলল, “আপনি এত টেনশন করেন কেন?”
ফারাজ একটু কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “কারণ এখন তুমি একা নও।” কথাটা শুনে চিত্রা আলতো করে ফারাজের হাত চেপে ধরল। গাড়িতে ফেরার পর ফারাজ সিটবেল্ট ঠিক করে দিল, তারপর তার হাতটা নিজের হাতে নিল।
আইসক্রিম শপ থেকে বের হতেই রাতটা হঠাৎ আরও গভীর হয়ে উঠেছে। আকাশে আধখানা চাঁদ, চারপাশে নরম নরম আলো। চিত্রা ধীরে হাঁটছে। ফারাজ তার পাশে, এক হাত দিয়ে চিত্রার কাঁধ জড়িয়ে, আরেক হাত সবসময় প্রস্তুত, যদি হোঁচট খায়।
চিত্রা মৃদু হেসে বলল, “আমি কিন্তু ঠিক আছি, এত টেনশন করা লাগবে না।”
ফারাজ নিচু স্বরে বলল, “তুমি ঠিক আছো জানি… কিন্তু এখন তুমি একা না।” এই বলে সে আলতো করে চিত্রার পেটের দিকে তাকাল। চোখে এক অদ্ভুত মায়া।
রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট পার্ক। পরিবেশটা শান্ত। ফারাজ বলল, “দুই মিনিট বসবে? ক্লান্ত লাগছে না তো?”
চিত্রা মাথা নেড়ে হাসল, “আপনার সাথে থাকলে ক্লান্তি কই?”
বেঞ্চে বসতেই ফারাজ আগে নিজের রুমালটা পেতে দিল। “ঠান্ডা লাগবে না।”
চিত্রা একটু মজা করে বলল, “আপনি না, পুরো ওভারপ্রটেক্টিভ হয়ে যাচ্ছেন।”
ফারাজ হালকা হেসে তার হাতটা ধরল। “হতেই হবে। এখন আমার দুইটা হার্টবিট।”
চিত্রা চুপ করে গেল। চোখ ভিজে উঠল অল্প।
“আপনি সত্যি খুশি?”
ফারাজ তার দিকে পুরো শরীর ঘুরিয়ে বসল। “খুশি? আমি ভয় পাই, চিন্তা করি… কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভালোবাসি। তোমাকে… আর আমাদের ছোট্টটাকে।”
হঠাৎ বাতাসে চিত্রার চুল উড়ে মুখে পড়ল। ফারাজ খুব ধীরে চুল সরিয়ে দিল। চিত্রা ফিসফিস করে বলল,
“আমাকে এত ভালোবাসেন কেন?”
ফারাজ একটু ঝুঁকে কপালে আলতো চুমু দিল, “কারণ তুমি শুধু আমার স্ত্রী না… তুমি আমার দুনিয়া।”
চিত্রা তার কাঁধে মাথা রাখল। ফারাজ নিচু গলায় বলল,
“প্রমিজ করো, নিজের যত্ন নিতে দিবে।”
চিত্রা চোখ বন্ধ করে বলল,”এমন প্রমিজও কেউ করতে বলে? আমি বারণ করলেও তো আপনি নিষেধ অমান্য করবেন।”
গাড়িটা যখন বাসার গেটে ঢুকল, তখনো ফারাজের হাতটা চিত্রার হাত ছাড়েনি। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িটা আজ অন্যরকম লাগছে। শান্তিময় একটা জায়গা। চিত্রা অবাক হয়ে বলল, “এখান থেকেই শব্দ পাচ্ছি? কেউ এসেছে নাকি?”
ফারাজ মুচকি হেসে বলল, “মনে হচ্ছে আমাদের বাসায় আজ মেলা বসেছে।”
গাড়ি থামতেই ভেতর থেকে দরজা খুলে বেরিয়ে এলো পিয়াস। “এই যে অবশেষে হাজির! আমরা ভাবছিলাম তোমরা চাঁদের দেশে গেছো নাকি!” তার পেছনেই নিশিতা হাত নেড়ে বলল, “চিত্রা! সাবধানে নামো, আমরা কিন্তু সব জানি।” চিত্রা লজ্জা পেয়ে ফারাজের দিকে তাকাল। ফারাজ দরজা খুলে খুব সাবধানে তাকে নামাল। “ধীরে… পা রাখো।” ভেতরে ঢুকতেই দেখা গেল ড্রইংরুম একেবারে জমজমাট। আয়েশা আর অভ্র সোফায় বসে গল্প করছে। বজ্র মেঝেতে বসে নুড়ির সাথে খেলছে। রঙিন ব্লক সাজিয়ে বাড়ি বানাচ্ছে। নদী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে হাসল, “এই যে আমাদের চিত্রা আর ফারাজ চলে এসেছে!”
চিত্রা এগিয়ে গিয়ে নুড়িকে কোলে নিতেই ফারাজ সঙ্গে সঙ্গে বলল, “ওজন বেশি হলে কিন্তু বসে নাও।” সবাই একসাথে হেসে উঠল।
পিয়াস মজা করে বলল, “দেখছো? বাবা হওয়ার আগেই কেয়ারিং লেভেল একশো!”
নিশু বলল, “আমরা বাজি ধরছি, বাচ্চা হলে ফারাজ ভাই কাজে যাবে না, সারাদিন কোলে নিয়ে ঘুরবে।”
ফারাজ ভুরু তুলে বলল, “তোমরা কেউ চিন্তা করো না। আমার দায়িত্ব আমি বুঝি।” চিত্রা চুপচাপ দাঁড়িয়ে সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছিল। এতদিন পর এমন একসাথে আড্ডা। আয়েশা এগিয়ে এসে চিত্রার গালে হাত রাখল,
“তোমার মুখটা আজকে আরো বেশি গ্লো করছে।”
অভ্র হেসে বলল, “ওই গ্লো না, এটা হচ্ছে ‘আইসক্রিম গ্লো’!” আবারও হাসির রোল উঠল। হঠাৎ চিত্রা খেয়াল করল, রাজন নেই। “রাজন ভাই আজও বাইরে তাই না?”
নদী একটু থেমে বলল, “হুম।” ফারাজ চিত্রার দিকে তাকিয়ে বুঝল, সে একটু চুপ হয়ে গেছে। আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখল। “এসো, বসো। বেশি দাঁড়িয়ে থাকবে না।” সে সোফার কোণে একটা কুশন ঠিক করে দিল। তারপর নিজে পাশে বসে চিত্রার পায়ের নিচে ছোট্ট স্টুল টেনে দিল। “পা একটু উঁচু করে রাখো।”
আয়েশা ফিসফিস করে অভ্রকে বলল, “এই মানুষটাকে আমরা আগে চিনি নাই কেন?”
“কারণ ঘরনী তুমি একটা কানা।”
“শালার ভাই দিবো গুলি মেরে।”
” বন্দুক আমারো আছে আমিও মারতে জানি।”
সবাই সেই কথা শুনে ফিক করে হেসে দিতেই অভ্র আর আয়েশা লজ্জায় বিপাকে পড়ে গেল। বজ্র নুড়িকে নিয়ে এসে বলল, “নুড়ি জানো তোমার একটা ছোট্ট খেলার সাথী আসছে।”
নুড়ি সরল গলায় বলল, “সে কবে আসবে?”
চিত্রা হেসে বলল, “আর একটু সময় লাগবে মা।”
ফারাজ নুড়ির মাথায় হাত রেখে বলল, “তুমি কিন্তু আপু হবে, প্রস্তুত তো?”
নুড়ি গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলল, “আমি বেবিকে চকলেট দিব।”
সবাই আবার হেসে উঠল। রাত বাড়তে থাকল। গল্প, চা, হালকা নাস্তা পুরো বাড়ি ভরে গেল উষ্ণতায়। আয়েশা পুরোনো দিনের ঘটনা তুলল, পিয়াস বলতে লাগল কেমন করে নিশুর প্রেমে পড়ে গেছে সে। কট ম্যারেজ যে এত কাজে লাগবে কে জানত? হঠাৎ পিয়াস বজ্রকে বলল, “এই ভাই তোমার বউ কিন্তু কট খাওয়ার আগে আমার হওয়ার কথা ছিল।”
বজ্র ভ্রু কুঁচকে বলল,”আরে বাবা, আমার বউই কি আমার হওয়ার আগে, সবার হওয়ার কথা ছিল নাকি।” সবাই আবার হেসে উঠল। হঠাৎ নদী আয়েশা আর অভ্রকে বলে উঠল,”ফারাজ আর চিত্রা তো খুশির খবর দিলো, এবার কিন্তু তোমাদের পালা। কবে সংবাদ পাবো?”
অভ্র নিজের চুলে হাত বুলিয়ে বলল,”এটা আমাকে না বুঝিয়ে আপনাদের গুন্ডা মাস্তান গুওয়ালীকে বুঝান। আমি তো প্রতি রাতেই প্রস্তুত থাকি, এখন সে যদি ঘোড়া বেঁচে ঘুমায়, ফোকাস না দেয় তো আমার কী দোষ?”
সবাই হাসতেই আয়েশা অভ্রর পিছনে চিমটি কেটে বলল,”সরকার ভাইয়ের বাচ্চা আজকে তুমি খালি রুমে আসো। খবর আছে তোমার।”
এইসবের মাঝেও ফারাজের নজর বারবার চিত্রার দিকে। “পানি খেয়েছো?” “ক্লান্ত লাগছে?” “চলো, রুমে গিয়ে একটু রেস্ট নাও?”
চিত্রা মৃদু হেসে বলল, “আমি ঠিক আছি। এতদিন পর সবাই একসাথে… ভালো লাগছে।”
ফারাজ নিচু গলায় বলল, “ভালো লাগলে থাকো। তবে বেশি না।”
রাত যখন একটু গভীর হল, তখন নদী এসে চিত্রার পাশে বসল। “দেখেছো? ঘর ভরা মানুষ থাকলে কেমন লাগে?”
চিত্রা ধীরে বলল, “মনে হচ্ছে সত্যি একটা পরিবার আছে আমার।”
ফারাজ কথাটা শুনে চুপ করে তার হাতটা ধরল। “এই পরিবার, এই ঘর… সবকিছুর মাঝে তুমি আমার সবচেয়ে আপন।”
জুনায়েদ আর রুমানাও অন্দরমহলের আসরে উপস্থিত আজ। কিছু মানুষ শেষ মুহূর্তে এসে নিজেকে বদলে ফেলার চেষ্টা করে। তাই সুযোগ দেওয়া উচিত নয়ত খোদা নারাজ হন।
খেতে বসতে বসতে ১২ টার বেজে গেছে। খাবার টেবিল আজকে জমজমাট। নদী একবার রাজনের চেয়ারের দিকে তাকিয়ে নিশ্বাস ছেড়ে কড়াই নেড়ে বলল,
“দেখো কিন্তু, আজকের কলিজা ভুনা আমি নিজের হাতে করেছি।”
বজ্র হেসে বলল, “আপনি ভাবী রান্নায় ঝাল দেন বেশি।”
নদী চোখ রাঙাল, “ঝাল না হলে কলিজা ভুনা জমে?”
ডাইনিং টেবিলে আজ আলাদা এক আবহ। বড় টেবিলটা ভরা পোলাও, সালাদ, ডাল, আর মাঝখানে ধোঁয়া ওঠা কলিজা ভুনা। গরু, মুরগী, ইলিশ, চিংড়ি তো আছেই। আবার ডিম না হলে কারো চলে না। সবাই আজ হাতে হাতে কাজ করেছে। আয়েশা রায়তা বানিয়েছে, নিশু প্লেট সাজিয়েছে, অভ্র পানি ঢেলেছে, পিয়াস চেয়ার টেনে বসার ব্যবস্থা করেছে। রুমানা চুপচাপ সবার প্লেটে পরিবেশন করছে। তার চোখেমুখে আগের সেই কঠোরতা নেই। বরং অনুতপ্ত কোমলতা।
সে চিত্রার সামনে প্লেট রাখতে গিয়ে নরম গলায় বলল,
“তোমার জন্য ঝালটা একটু কম করে দিয়েছি। আর তেলটাও ঝরিয়ে দিয়েছি।”
চিত্রা অবাক হয়ে তাকাল। “আপনি এত কষ্ট করতে গেলেন কেন?”
রুমানা হালকা হাসল, “কষ্ট না মা… এখন যা বাকি আছে, ভালোটা করেই কাটাতে চাই। ভুল তো কম করিনি জীবনে। বাকিটা সময় খোদার কাছে মাফ চেয়ে কাটাতে পারলেই শান্তি।”
টেবিলে মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এলো। জুনায়েদ এলাহী গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, “মানুষ ভুল করবেই। কিন্তু বুঝতে পারাটাই বড় কথা। আল্লাহ সুযোগ দিলে, শেষটা ভালো করার চেষ্টা করা উচিত।”
ফারাজ তখন চিত্রার পাশে বসে তার প্লেট নিজের দিকে টেনে নিল। “এইটা আমি একটু মিক্স করে দেই।”
চিত্রা ভুরু কুঁচকে বলল, “আমি নিজেই পারব।”
ফারাজ শান্ত স্বরে বলল,
“জানি পারবে। তবু করতে দাও।” সে কলিজা থেকে বাড়তি মসলা আলাদা করে দিল, পোলাওটা একটু নরম করে মেখে দিল। “ধীরে খাবে। খুব গরম।”
নিশু মুখ টিপে হাসল,” এই লেভেলের ভালোবাসা সবার কপালে থাকে না।”
পিয়াস তা শুনে খাবার মেখে নোলা করে নিশুর মুখের সামনে তুলে ধরে বলল,”হা করো, আমরাও এমন ভাবে ভালো বাসতে জানি।”
নুড়ি নিজের ছোট্ট প্লেট নিয়ে বসে আছে। সে চিত্রার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ছোটআম্মু বেবি কি ঝাল খায়?”
সবাই হেসে উঠল। চিত্রা মজা করে বলল,
“না মা, বেবি এখন শুধু ভালোবাসা খায়।”
ফারাজ সঙ্গে সঙ্গে বলল, “হুম আমার প্রোডাক্ট বলে কথা।”
আয়েশা বলল, “দেখছো? বাবা হওয়ার আগেই মেডিকেল বই হয়ে গেছে! কত যত্ন।” তা শুনে অভ্র বলল,”কেউ যদি মা হতো, তাহলে আমিও এমন যত্ন করতাম।” আয়েশা তাকাতেই তার দিকে সে পুনরায় খাওয়ায় মন দিলো। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে গল্প জমে উঠল। পুরোনো স্মৃতি, ভুল বোঝাবুঝি, হাসির গল্প সব মিলিয়ে এক ধরনের পরিপূর্ণতা। রুমানা একসময় চুপ করে জুনায়েদের পাশে বসে বলল, “জীবনটা কত ছোট, তাই না? এতদিন বুঝিনি।”
জুনায়েদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “বুঝতে সময় লাগে। তবে যতদিন শ্বাস আছে, ততদিন সুযোগ আছে।”
ওই সময় চিত্রা একটু ধীরে হয়ে গেল। ফারাজ সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল করল। “ক্লান্ত?”
চিত্রা মাথা নেড়ে বলল,
“না… শুধু একটু ভার লাগছে।”
ফারাজ চেয়ারটা কাছে টেনে দিল।
“পিঠটা সোজা করে বসো। আর পানি খাও।”
সে গ্লাস এগিয়ে দিল। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল, “ও বেশি সময় বসবে না। খাওয়া শেষ হলেই রেস্ট।”
বজ্র মজা করে বলল, “আরে ভাই, আমরা তোর বউকে অপহরণ করছি না।”
ফারাজ হেসে বলল, “আমি জানি। তবু সাবধান থাকা উচিত।”
খাওয়া শেষে সবাই আবার ড্রইংরুমে বসল। কেউ চা নিয়ে, কেউ ফল কেটে। নুড়ি ঘুমে ঢুলছে, নদী তাকে কোলে নিয়ে দোলাচ্ছে। চিত্রা সোফায় হেলান দিয়ে বসতেই ফারাজ তার পায়ের নিচে আবার কুশন গুঁজে দিল।
“ফোলা লাগছে?”
“না।”
“তবুও রাখো।”
চিত্রা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“আপনি না থাকলে আমি বোধহয় নিজের যত্নই নিতে ভুলে যেতাম।”
ফারাজ নিচু স্বরে বলল,
“তাই তো আছি।”
রাত অনেকটাই গড়িয়ে গেছে। দেয়ালের ঘড়িতে প্রায় দেড়টা। আড্ডা এখনো চলছে। চায়ের শেষ কাপগুলো টেবিলে, নুড়ি নদীর কাঁধে ঘুমিয়ে পড়েছে।
অভ্র হাই তুলে বলল, “শোনো, আমরা কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে ‘ফ্যামিলি টাইম’ কাটালাম।”
পিয়াস সাথে সাথে যোগ করল,
“হ্যাঁ ভাই, এবার প্রত্যেকের নিজ নিজ রুমে যাওয়ার সময়। জামাই-বউদেরও তো আলাদা সময় লাগে!”
নিশু হেসে বলল, “নাউজুবিল্লাহ।”
চিত্রা লজ্জায় মাথা নিচু করল। “তোমরাও না…”
অভ্র নাটকীয় ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “ঘোষণা দিচ্ছি আজকের সভা এখানেই সমাপ্ত। সবাই নিজ নিজ সঙ্গীকে নিয়ে প্রস্থান করুন!”
সবাই হেসে উঠল। রুমানা নরম গলায় বলল,
“হ্যাঁ, অনেক রাত হয়েছে। চিত্রারও রেস্ট দরকার।”
ফারাজ এবার একেবারে সিরিয়াস হয়ে গেল।
“ঠিক কথা।” সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে চিত্রার দিকে হাত বাড়াল। “চলো?” চিত্রা হাত রাখতেই সে সাবধানে টেনে তুলল। “ধীরে… পা দেখো।”
নদী মুচকি হেসে বলল, “ওকে কিন্তু আজ বেশি রাত জাগাতে দিও না।”
ফারাজ শান্ত স্বরে বলল,
” আপনি আর কাটা গায়ে নুনের ছিটা দিয়েন না। আমি আছি বউয়ের সাথে। চিন্তা নাই।”
পিয়াস ফিসফিস করে বলল, “এই ‘আমি আছি’ ডায়লগটা ওর ট্রেডমার্ক হয়ে গেছে।”
সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় ফারাজ এক হাত দিয়ে রেলিং ধরল, আরেক হাত দিয়ে চিত্রার হাত শক্ত করে রাখল।
“পা ঠিক আছে তো?”
“হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি।”
রুমের দরজার সামনে এসে ফারাজ থামল। নিচে এখনো হাসির শব্দ ভেসে আসছে। সে একবার চিত্রার দিকে তাকাল। “ক্লান্ত?”
চিত্রা মৃদু হাসল। “না… আজ ভালো লাগছে।”
রুমে ঢুকেই ফারাজ আগে লাইট নরম করে দিল। তারপর বলল, “আগে ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি পানি গরম করে দিচ্ছি।”
চিত্রা হেসে বলল, “আপনি না, পুরো হসপিটাল সেটআপ বানিয়ে ফেলবেন।”
ফারাজ কাছে এসে খুব আলতো করে তার কপালে হাত রাখল। “কারণ তুমি এখন আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।”
চিত্রা তার দিকে তাকিয়ে ধীরে বলল, “সবাই বলে, নিজের মতো সময় কাটাতে… আপনি কিন্তু সেই সময়টাও কেয়ার দিয়ে ভরিয়ে দিচ্ছেন।”
ফারাজ মৃদু হাসল। চিত্রা এগিয়ে এসে তার বুকে মাথা রাখল। বাইরে বাড়ির ভেতরকার শব্দ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে। ফারাজ নিচু স্বরে বলল,
“আজ অনেক হাসলে। এখন রেস্ট। ঠিক আছে?”
চিত্রা চোখ বন্ধ করে মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক আছে।”
“আমি ততক্ষণে যাই ফ্রেশ হয়ে আসি। যদি ফ্রেশ না হলে ভাইরাজ, জীবানু আমার বাবুর শরীরে চলে গেলে সমস্যা। বলে সে চিত্রার পেটের দিকে চেয়ে বলল,” আব্বু আসছি সোনা, তুমি আপাতত একটু তোমার আম্মুর সাথে থাকো।”
ফারাজ কিছুক্ষণের মধ্যেই সাওয়ার শেষ করে বের হলো। পরনে তার কেবলমাত্র একটা সাদা তোয়ালে। শরীর উন্মুক্ত। টান টান পেশীবহুল শরীরটা এখন পুরোই স্পষ্ট। তার চুলগুলো কপালের সামনে পড়ে আছে। যা থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে। সে বের হতেই চমকে উঠে। চিত্রার গায়ে তার সাদা শার্ট। সে কী সত্যি দেখছে? ফারাজ আবার উপর থেকে নিচে একবার পরখ করে ঢোক গিলল। একপা-দুইপা করে এগিয়ে এসে চিত্রাকে কাছে টেনে নিলো। আলতো করে চিত্রার সামনে চলে আসা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে আচমকা চিত্রাকে একটানে নিজের খুব কাছে টেনে নিলো। গলায় চুমু খেয়ে বলল, “আমাকে ইচ্ছে করে জ্বালাতন করার জন্য এসব পড়েছো? তোমাকে না ঘুমাতে বলেছিলাম?
“কেন সুন্দর লাগছে না।”
“ঘুমাও।”
“শরীর ক্লান্ত না হলে ঘুম আসবে না। এখন বলুন কেমন লাগছে?”
“মারাত্মক। এই না হলে ফিনিক্সের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার।” চিত্রা এবার ফারাজের দিকে তাকিয়ে তার দিকে একবার চেয়ে বলল,”সারাজীবন আমার পাশে থাকবেন তো?”
ফারাজ চিত্রার ঠোঁটে গভীর চুমু একে দিয়ে নেশালো কণ্ঠস্বরে বলল,
~যতদিন প্রাণ আছে
আমি রবো যে কাছে
তোমাকে কথা দিলাম
ভালো আর লাগে না
এত কেন মায়া
যত কাছে আমি লাগে শুধু সান্ত্বনা
অবুঝ ভালোবাসা
জানি এ নয় খেলা
তবু এই মনে হয় ছাড়া তোমায় বাঁচবো না~
দু’জনের মধ্যকার উষ্ণতা আরো গভীর হতেই ফারাজ উত্তপ্ত গন নিঃশ্বাস ছেড়ে চিত্রার শার্টের বোতামে হাত রেখে জিজ্ঞেস করল, “শরীর এখন ঠিক আছে তো?
চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৪
“উঁহু।”
“তাহলে আমার তৈরি করা নিয়ম ভাঙার দুঃসাহস দেখাই চলো।”
ফারাজ বাঁকা হেসে রুমের বাতি বন্ধ করে চিত্রাকে কোলে তুলে বলল, “এত বড় অফিসার একজন ক্রিমিনালের শার্ট পড়ছে? এটা না খুললেই নয়। নইলে বিষয়টা টু মাচ ছোটলোকি হয়ে যায়।”

সব সময় ভয়ে থাকি, ❝এহন জানি কোন্ডা মরে❞
কিছু বলার নাই🙂💔
Ar jai Korean ending ta happy ending chai always uponnash ee dekhi ending sad ending diye akhane ontora happy end chai….pls pls pls😏😏