Home শ্যামা সুন্দরী শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৩ (২)

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৩ (২)

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৩ (২)
সুরভী আক্তার

সরে আসলো সুরবালা । অংকুরের হাতের বাঁধন আলগাই ছিলো । সরে আসতে বাঁধা পড়লো না । গুটিয়ে বসলো সে । হাঁটু জড়িয়ে নিলো । আর তাকালো না অংকুরের দিকে । চোখের পানি গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অঝোর ধারায় । অংকুর নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে । চোখের চাহনি গুড় । সে অধীরে অপেক্ষায় উত্তরের । সুরবালার পাশে ঠাই নিয়ে বসলো সে ‌। একটু কাছ ঘেঁষেই বসলো । সুরবালার কান্নার শব্দ নেই আর । গুমড়ে গুমড়ে উঠছে সে । মেয়েটা হেঁচকি তুলে বললো ধরা রুদ্ধ গলায়….
” ভালোবাসার উপর থেকে মায়া উঠে গেছে । কিন্তু যাকে ভালোবাসলাম তার উপর থেকে মায়া উঠলো না এখনো ।

কি করবো আমি ?
তৎক্ষণাৎ অংকুর বলে উঠলো….
” তাহলে এখনো ভালোবাসো ! মুখে না বলছো যে ?
” ভালোবাসি না , কিন্তু ভালোবেসে ছিলাম এটা ভুলতে পারি না । নিজের অতি কাঙ্ক্ষিত মানুষ টা যখন অন্য কারোর হয় , তখন কতটা কষ্ট হয় জানেন ? আমার কাছে শুনবেন ? শুনুন..
ওনাকে দেখলে আমার খুব কষ্ট হয় ! আমি জানি না ওনার উপর আমার অনুভূতি গুলো কে ভালোবাসা বলে কি না ! জানি না আমি ওনাকে ভালোবাসি কি না ! কেনো ওনার প্রতি আমার এতো ঝোঁক । কেনো ভুলতে পারি না ওনাকে ! খুব তো চেষ্টা করি বিশ্বাস করুন , উনি যেদিন আমাকে বোঝালো , সেদিন ভেবেছিলাম সব ভুলে যাবো । উনি কেউ ছিলেন না আমার জীবনে । এটাই মানবো । কিন্তু পারলাম না । ওনার নাম শুনলে রুহ কাঁপে আমার । ওনার পাশে , ওনার নামের পাশে অন্য কেউ যুক্ত হয়েছে এটা মনে পড়ে । আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে দেয় এটা । ভীষণ পোড়ায় আমাকে ! কলিজা ছিঁড়ে যায় । কেনো মানতে পারি না আমি ? বলবেন আমায় ? কেনো সহ্য হয় না আমার ? এতো কষ্ট কেনো হয় ? উনি তো সুখে আছে বলুন , আমি কেনো এতোটা অসুখে পুড়ি ? আমার না মরে যেতে ইচ্ছে করে ।

” সুরবালা ??
” হ্যাঁ, হ্যাঁ ! মরে যেতে ইচ্ছে করে আমার ! আচ্ছা আমি কি সুন্দর নই ? ভালোবাসা যেতো না আমাকে ? আমার অতীত আছে বলে আমাকে ভালোবাসলো না ? আপনি তো বলেছিলেন , ওটাকে অতীত বলে না ! তাহলে ? কেনো ভালোবাসলো না আমায় ? ভালোবাসা না পাওয়ার কষ্ট টা খুব তীব্র হয় জানেন ? পুড়িয়ে দেয় অন্তর ! যাকে আপনি চাইবেন , সে যদি আপনার না হয় তাহলে ভীষণ যন্ত্রণা হয় । তার চেয়ে বেশি যন্ত্রণা হয় , যখন আপনার কাঙ্ক্ষিত মানুষ টার পাশে অন্য কাউকে দেখবেন । যখন আপনাকে ছেড়ে অন্য কাউকে গ্রহণ করবে সে । এই যন্ত্রনার ভীষণ পীড়াদায়ক হয় ! আমি ওনাকে খুব করে চেয়েছিলাম জানেন , যতটা উনি শ্যামা কে চেয়েছিলেন ঠিক ততটাই । উনি তো কদিনের চাহনার অবসান ঘটিয়ে শ্যামা কে পেয়ে গেলেন । আমার কি হলো ? বছরে বছরে পুষে রাখা স্বপ্ন গুলো ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল সব ? কেনো স্বপ্ন দেখতে গেছিলাম আমি ? কেনো, কেনো, কেনো ? যদি বৃথা আশা নিয়ে স্বপ্ন না দেখতাম, তাহলে আজ আমার এতো কষ্ট হতো না । এক পাক্ষিক ভালোবাসার পরিণতিতে পুড়ে মরতে হতো না আমাকে ।

কেনো আমি অভাগা হলাম ? অতীত নিয়ে জন্মালাম কেনো ? আজ যদি এই অতীত না থাকতো , তাহলে কি উনি আমাকে ভালোবাসতো না ? বলুন …
সুরবালার কন্ঠের তেজ কমলো । নুইয়ে আসলো সে ‌। অংকুর চুপচাপ শুনে গেলো কথা গুলো । কি অদ্ভুত ? এখনো সংগ্রাম জোয়ার্দার কে না পাওয়ার আফসোস নিয়ে বাঁচে মেয়েটা । আর সে ?
ভাবলো না অংকুর । ভাবতে গেলো না বেশি ।
বললো ধীর কন্ঠে…
” তোমার অতীত ছিলো না সুরবালা । আগেও বলেছি !
ঘাড় কাত করে চায় সুরবালা । শুধোয় কাতর স্বরে…
” আমার অতীত ছিলো না , এটা বলে নিজেকে শান্তনা দেন , না আমাকে ?
” সত্যে শান্তনা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না ।
” সত্যিই অতীত ছিলো না আমার ? ওটাকে অতীত বলে না ? ওটা যদি আরো ভয়াবহ হতো ? আমি যদি সেদিন…
থামলো মেয়েটা । দম টেনে বললো কাঁপা গলায়..
” তাহলে আপনিও নিশ্চয়ই আসতেন না আমার জীবনে ? এভাবে ধরে বেঁধে রাখতেন না আমায় । ছুড়ে ফেলতেন নিশ্চয়ই ?

” তোমাকে ছুড়ে ফেলার ক্ষমতা নেই আমার । আর বেঁধে রাখার অধিকার থেকেও নেই । যদি অধিকার থাকতো , তাহলে বেঁধে রেখে দেখাতাম । তুমি অভাগা নও !
মুখ ফিরিয়ে হাসে সুরবালা । আচমকা আরো একটু দুরত্ব ঘুচলো সে । কাছে এসে অংকুরের কাঁধে মাথা রাখলো । মেয়েটার এমন আচমকা হুটহাট অদ্ভুত ব্যাবহারে ভীষণ হতবাক হয় অংকুর । তবে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয় না । বালা কাঁধে মাথা গুজেই প্রশ্ন করলো….
” আমাকে বিয়ে করলেন কেনো ?
” জানি না !
” ভালোবাসেন ?
” ভালোবাসা কাকে বলে জানা নেই ! আগে কখনো কাউকে ভালোবাসি নি তো , তাই সঠিক সংঙ্গা দিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর করতে পারছি না ।

” আপনি খুব জটিল !
” তোমার থেকে কম !
” আমাকে এভাবে বিয়ে করে কি হলো ? যদি আমি আপনাকে কখনো ভালোবাসতে না পারি , তাহলে ?
” তোমার ভালোবাসা পাওয়ার প্রয়োজন নেই আমার । এভাবেই যদি থাকো , তাহলে এভাবেই তোমাকে নিয়ে এক জনম কাটিয়ে দিতে পারবো ।
” কাটাতে পারবেন ?
ক্ষিণ প্রশ্ন । অংকুর উত্তর করতে দ্বিধা করে না…
” পারবো । আচ্ছা এবার তোমাকে একটা প্রশ্ন করি ?
নিঃশব্দে সায় দেয় সুরবালা । অংকুর শুধায়…
” শ্যামা কে হিংসে করো ?

” নাহ । একটা সত্যি কি জানেন , শ্যামা কে দেখে আমার হিংসে হওয়ার কথা হলেও একটুও হিংসে হয় না ওকে । বরং সংগ্রাম জোয়ার্দারের মতো, না না সংগ্রাম জোয়ার্দার কে পেয়েছে ও , এটা দেখে খুশি লাগে আমার । ও খুব সুখী হোক , এটা চাই আমি । একেবারে মন থেকে চাই ।
” জবা কে হিংসে করলে কেনো তবে ?
” হিংসে করেছি ? জানতাম না তো !
আমার জিনিসের উপর কারোর নজর সহ্য হয় না আমার ! তাই হয়তো হিংসে এসেছিল ।
” আমি তোমার জিনিস ?
” আমার জীবনে আছেন মানে আমার !
” হঠাৎ কান্না থামালে যে ? কাঁদবে না আর ?
” আর কান্না আসছে না !
আপনার কাঁধে মাথা রেখে আরাম লাগছে একটু ! আমি যখন কাঁদব , তখন আমাকে একটু জড়িয়ে ধরবেন কেমন ? সবসময় আমার অনুমতির অপেক্ষায় থাকবেন না ।
অংকুর তাজ্জব বনে । স্বজ্ঞানে আছে তো এই মেয়ে ? অংকুরের নিঃশব্দ অবস্থা টুকু বুঝে বালা পরমুহূর্তে বললো একটু থেমে…

” আমি পাগল তাই না ?
” বাউড়ি (পাগলী অর্থে) তুমি !
” একই হলো ! পাগল আমি ! উল্টা পাল্টা বকি !
” এমন পাগলামো ভালো লাগছে আমার ।
” আচ্ছা , আমাকে একটু রং করা শেখাবেন ?
” আচ্ছা !
” আপনার সাথে আঁকি বুকি করবো আমি ।
” করো !
” আমরা কিন্তু যাবো না জমিদার বাড়িতে !
” যাবো না !
” কোনো দিন যাবো না ।
” হুম !

” আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবেন ? শহরের রাস্তায় ঘুরবো আমি ! রিকশা আছে তো অনেক , আমি টিভিতে দেখেছিলাম । শহরে অনেক রিকশা । আমি না রিকশায় উঠি নি কখনো ।
” নিয়ে যাবো !
” কবে ?
” যেদিন যেতে চাইবে ?
” কাল যাই ?
” আচ্ছা ?
” ঝালমুড়ি খাবো ! অনেক দিন খাই না…
” ঠিক আছে !
” বাগানে অনেক ফুল গাছ লাগাবেন । একটা গাছ ও নেই আপনাদের বাগানে । কেমন খসখসে শূন্য শূন্য লাগে সব । ফুলের মিষ্টতা নেই । ফুল গাছ নিয়ে আসবেন আজ !
” আচ্ছা !
” ছাদেও ফুলগাছ লাগাবো !
” আচ্ছা !

সুরবালার প্রত্যেকটা কথায় সায় দিচ্ছে অংকুর । কলের পুতুলের ন্যায় উত্তর করছে । বালা অবাক হয়ে বললো…
” এভাবে আমার কথায় তাল মেলাচ্ছেন যে ?
” ইচ্ছে করছে তাই !
” আমার সব কথা শুনবেন ?
” হুঁ !
সুরবালা মাথা তুলে তাকালো । সে নিজেও কেমন অদ্ভুত ব্যাবহার করছে, না ? অংকুরের চোখে রেখে বললো সে…
” আপনার চুল গুলো খুব সুন্দর । ছুঁয়ে দেই একটু ?
” হুঁ ! কেনো নয় ?
শীতল উত্তর অংকুরের । মাথাটা খানিক নিচু করে দিলো সে । বালা হাত বাড়িয়ে দিলো । ঝাঁকড়া চুলের ভাঁজে হাত ডুবিয়ে দিলো সে । ছেলেদের চুল এতোটা নরম হয় ? স্পর্শ করতেই গলে যাচ্ছে যেনো ! বালা হাত নামিয়ে বললো…

” চুল কাটলে আপনাকে কেমন লাগবে ?
” কাটি নি কখনো ! তাই জানি না ।
” আমি যদি কাটতে বলি , কাটবেন ?
চকিতে চায় অংকুর । সুরবালার কান্না ভেজা মুখটা মলিন । স্থির চোখে চেয়ে আছে সে । কান্না আটকাতে ভুলভাল বকছে হয়তো । অংকুর তৎক্ষণাৎ উত্তর করতে পারলো না । ঢোক গিলে সময় নিয়ে ক্ষিণ উত্তর করলো…
” হুম !
” সত্যিই ?
তাহলে কেটে ফেলুন ! মা তো সবসময় চুল কাটতে বলে আপনাকে !
সুচালো দৃষ্টি কম্পিত হলো অংকুরের । চোখ সরিয়ে নিল সে । বালা হাসলো একটু । একটু মশকরা করলো শুধু । অংকুর ওর চুল গুলো কে কতটা অগ্রাধিকার দেয় তা ওর অজানা নয় । বালাকে ছাড়িয়ে উঠলো অংকুর । গা ঝেড়ে বললো স্বাভাবিক কন্ঠে…

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৩

” ওঠো !
” আমি মজা করলাম শুধু ।
” ওঠো এখন !
” বাবড়ি চুলে আপনাকে খুব সুন্দর লাগে ,বাবড়ি ওয়ালা !

শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৪