শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৪
সুরভী আক্তার
সকালে আতিয়া বেগমের তপ্ত ঝাড়ি খেয়েছে সংগ্রাম । চটচটে রসকস হীন গলায় সংগ্রাম কে অনেক কথা শুনিয়ে দিয়েছেন আতিয়া বুড়ি । রাতে ঘুম হয় নি তার । বিছানা বদল হলে সহজে ঘুম আসে না ।
সারারাত এপাশ ওপাশ করেই কাটিয়ে দিয়েছেন । তার উপর কোমরের ব্যাথা । ভেবেছিলেন শোয়ার আগে শ্যামার থেকে ডলে ডলে মালিশ করে নেবেন একটু । কিন্তু, তা আর হলো কই ? সব সংগ্রামের দোষ ! দোষের সাজা হিসেবে গাদা গাদা কথা শুনতে হয়েছে আজ ওকে । আতিয়া বেগম কান ঝালাপালা করে দিয়েছেন বকে বকে । তবুও হেলদোল নেই সেই জমিদারের ! কোনো প্রকার অনুশোচনা নেই নিজের কাজের জন্য । বুড়ি টাকে রাতের বেলা অমন ঘর ছাড়া করলো , পরে আর খোঁজ নিলো কই ?
বউ কে নিয়ে আরাম আয়েশে বুকে জড়িয়ে রাত্রি কাবার করলো সে ! আর বুড়ি ?
আতিয়া বেগম ইচ্ছে মতো কথা শুনিয়েছেন । সংগ্রাম হাই তুলে কান চুলকে শুনেছে কথা গুলো । ভাবাবেগ নেই তার । সে তো তার বেগম কে জড়িয়ে আরামে ঘুমিয়েছে । তার আর কি চাই ?
সকালে শ্যামা দরজা খুলতেই আতিয়া বেগমের হুটপাটের সম্মুখীন হতে হয়েছে । এবার কথা শুনিয়ে ঘুমন্ত সংগ্রাম কে অর্ধচন্দ্র দিয়ে বের করে দিয়েছেন ঘর থেকে । শ্যামা কেও ওর সাথে বের করে দিয়েছেন । এদের মাঝে ঢুকে লাভ নেই, এটা বোঝা হয়ে গেছে ।
ঘরে এসে আবার ঘুমিয়েছিল সংগ্রাম । বেলা করে উঠে গ্রামে বেরিয়েছে ।
জমিদার বাড়ি আজ থেকেই সাজানো হচ্ছে । পরশু বিয়ে , পুরো জমিদার বাড়ি নতুন আলোক সজ্জায় সজ্জিত হবে । দুপুরের পর অনেকে এসেছেন ডেকরেটর থেকে । সংগ্রাম নিজেই নিয়ে এসেছে তাদের । অন্দরের ভিতরে ঢোকা বারন । বাইরে টা আপাতত সাজানো হচ্ছে । দেয়ালে দেয়ালে ঝোলানো হচ্ছে রঙ বেরঙের ফেইরি লাইট । বাগান ছাঁটাই করা হয়েছে । জায়গা বের করা হয়েছে বাগানে । সাতটা গ্রামের লোকের সমাগম ঘটবে , বিশাল জায়গার প্রয়োজন । জমিদার গন্ডিতে জায়গা কুলোবে না । সকলের খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হচ্ছে জমিদার বাড়ির পাশের বিশাল ফাঁকা মাঠে । মাঠ তো নয় , বাগান । দূরত্বে দূরত্বে দাঁড়িয়ে বিশাল বিশাল আম গাছ । এই বাগানের পাশেই ধরলা বহমান । মাঠের মাটি এখন ঠকঠকে । বসন্তে নিঃশব্দে ঝড়ে পড়েছে বিশাল বিশাল গাছের পুরনো পাতা গুলি । ঝড়া পাতার ভারী পরত ছিলো বাগানে , এখন সবটা পরিষ্কার । খসখসে শূন্যতা আশেপাশে । গাছে লালচে লালচে নতুন কুঁড়ি গজাচ্ছে সবে । সে মাঠেই আয়োজন করা হচ্ছে । জমিদারের গোয়ালে গরু ছাগল অগনিত । সেগুলো লতিফ জোয়ার্দারের খুব সখের । লতিফ জোয়ার্দার গোয়াল ফাঁকা করবেন না ।
বিকেলের দিকে বিশটা গরু এসেছে । বিরাট আকৃতির একেকটা । বড় বড় টিলারে করে আনা হয়েছে এগুলো । সব জবাই হবে বিয়ের আগের রাতে । সাত গ্রামের মানুষের খাবারের জন্য যাতে কমতি না পড়ে । কমতি পড়বেও না । গরুর সাথে ছাগল ও আছে একাধিক ।
জমিদার বাড়ির বাইরে টা কোথায় কিভাবে কি করা হবে না হবে সব দেখিয়ে দিয়েছে সংগ্রাম । সেই অনুযায়ী সবটা করা হচ্ছে । যেহেতু অন্দরে পুরুষ প্রবেশ নিষিদ্ধ । তাই গুটি কয়েক মহিলার দ্বারা সাজানো হচ্ছে অন্দর । সকাল থেকে পুনরায় পরিষ্কারের কাজে লেগে পড়েছিল সবাই । পরিষ্কার শেষে বিকেলের পর থেকে ভেতরটা সাজানোর আয়োজন চলছে ।
দুপুরে খেতে আসার পর সংগ্রাম শ্যামা কে বাইরে বেরোতে নিষেধ করে গেছিলো । তাই করেছে শ্যামা । বাইরে বেরোয়নি আর । দরজা খুলে ঘরেই ছিলো । পরিষ্কার আর সাজানোর জন্য আসা মহিলাদের উঁকি ঝুঁকি দেখে এক পর্যায়ে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে ।
সংগ্রাম দুপুরে খাওয়ার পর পরই ফের বেরিয়েছে । কাঁধে জমিদারের দায়িত্ব । উত্তরের জমি টা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে এখন । লতিফ জোয়ার্দার ঠিকি বলেছিলেন , কাঁধে দায়িত্ব পড়লে হাল ধরতে বাধ্য হবে সংগ্রাম,অলসতা আসবে না ।
সাত গ্রামের জমিদার এখন সংগ্রাম জোয়ার্দার । লতিফ জোয়ার্দারের সময় থেকে বিরোধ চলছিল সেই জমিটা নিয়ে । সাত গ্রামের বাইরে জমিদারের কোনো হস্তক্ষেপ নেই । পাশের গ্রাম বৈকুন্ঠপুর । সেখানকার মাতব্বর আশরাফ তালুকদার । লতিফ জোয়ার্দারের সাথে হিংসাত্মক সংঘর্ষ তার । লতিফ জোয়ার্দারের কাছে পুরো সাতটা গ্রামের মালিকানা রয়েছে, সাতটা গ্রাম তার অধীনে । আর এই সাতটা গ্রামের মানুষের ভরসা লতিফ জোয়ার্দার । গ্রামের মানুষ তাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করে । লতিফ জোয়ার্দারের আলাদা একটা সম্মান মর্যাদা রয়েছে সবার মাঝে । যেই মর্যাদা আশরাফ তালুকদারের তুলনায়
অধিক । এই মর্যাদার তফাতের জন্যই মূলত লতিফ জোয়ার্দারের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছেন আশরাফ তালুকদার । গ্রামের মানুষের কাছে জমিদার লতিফ জোয়ার্দার কে নানান অপদস্থ,হেয় , প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করছিলেন তিনি ।
কিন্তু বরাবর ব্যর্থ । তার এই ব্যর্থতাই তার মাঝের হিংসাত্মক সত্তাকে দ্বিগুণ করেছে । লতিফ জোয়ার্দারের পিছে কোনোভাবেই লাগতে না পেরে , অযৌক্তিক ভাবে ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা করছেন তিনি ।
উত্তরের জমি জমিদার গ্রামের শেষ সীমান্ত । যেখানে উন্মুক্ত কবরস্থান , গ্রামের জনসাধারণের কবরস্থান । একপাশে গোরস্থান অন্যপাশে বিশাল পতিত জমি । অনুর্বর জমি , তাই আবাদ কম হয় । সেই জমি দখলের চেষ্টায় রত আশরাফ তালুকদার ।
লতিফ জোয়ার্দারের সাথে এই নিয়ে নীরব বিবাদ তার । কেউই এখনো কঠোর ব্যবস্থা নেন নি । লতিফ জোয়ার্দার এখন মিইয়ে গেছেন । আশরাফ তালুকদার ও তাই । এখন সব দায়ভার তাদের ছেলেদের হাতে । সংগ্রাম আগে কখনো সেই জমি নিয়ে মাথা ঘামায় নি । তবে এবার মাথা ঘামাতে বাধ্য হচ্ছে । আশরাফ তালুকদারের পুত্র আরাকান তালুকদার বোধহয় বাড়াবাড়ি করছে একটু ।
পতিত জমি হওয়ায় গ্রামের মানুষ গরু ছাগল চড়ায় সেই জমিতে , ইদানিং আরাকান তালুকদার বিব্রত করছে গ্রামের মানুষদের । ছেড়ে রাখা গরু ছাগল ধরে নিয়ে যায় নিজের গ্রামে । সেগুলোর মাংস দিয়ে উল্লাস করে তারা ।
সংগ্রামের কানে এই নিয়ে অনেক অভিযোগ এসেছে । আজ অভিযোগ গায়ে ফেলে সেখানেই গেছে সংগ্রাম ।
সংগ্রামের সাথে সর্বদাই রহিম করিম আছেই । সংগ্রামের ডান হাত আর বাঁ হাত এরা । আজ আরো বেশ কজন আছে সংগ্রামের সাথে ।
শেষ সীমান্তে গিয়ে জিপ থেকে নামলো সংগ্রাম । গায়ে একখানা কালো চাদর আড়াআড়ি ভাবে জড়িয়ে নেওয়া । জিপ থেকে নেমেই ওর সুক্ষ্ম দৃষ্টির সম্মুখে পড়লো আরাকান তালুকদার । আলের অপর প্রান্তে একখানা ছাউনী দেওয়া টং বসানো । মাথার উপর বিশাল তেঁতুল গাছ । আরাকান তালুকদার তার সাঙদের সাথে বসে আড্ডায় মজেছে সেখানে । শুনশান গোরস্থান । তবুও ভয় নেই মনে । মাথায় একটা কারাকুল টুপি আরাকানের । শ্যামলা স্বাস্থ্যবান চেহারায় নীলচে পাঞ্জাবি । শরীরের তুলনায় মাথার আকৃতি একটু বেশি বড় , যাকে বলে মাথা মোটা । একে দেখলেই হাসি আসে সংগ্রামের ।
এবার ও হাসি আসলো । ঠোঁট চেপে হাসি সংবরন করলো সংগ্রাম । পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিলো । জিপের আওয়াজ কানে পৌঁছাতেই আরাকান সহ বাকিরা এদিকেই তাকিয়েছে । রহিম করিম, বাকিরা সংগ্রামের পিছে এসে দাঁড়ালো । রহিম ভ্রু গুটিয়ে বললো…
“ চলেন জমিদার সাহেব , আরেক’কানের একটু মজা দেখাই আসি!
“ ঐ টা আরেক কান না রে খাসি , ঐটা আরাকান হইবো !
করিমের খোটা দেওয়া কথায় ফুঁসে উঠলো রহিম । তিরিক্ষি হয়ে কটমটিয়ে তাকালো…
“ চুপ করবি ? আমি ওরে কি কমু হেইডা আমার ব্যাপার । তোরে আমার ভুল ধরতে কইছি ?
“ তুই ভুল কইলে দোষ নাই , আর আমি ভুল ধরলে দোষ ! তোর না বড় ভাই আমি , তোর ভুল শোধরাই দিমু না ?
ওদের থামাতে হাত উঁচালো সংগ্রাম । এ দুটোতে লাগলে আর সহজে থামবে না । এখন এদের ভুল ধরাধরি দেখার সময় নেই ।
সংগ্রামের সংকেত বুঝেই চুপ করলো দু’জনে ।
সংগ্রাম উদ্যমে সামনে এগোলো । আরাকান সহ বাকিরা দাঁড়িয়ে গেছে । সংগ্রাম আল পেরিয়ে সোজাসুজি গিয়ে বসলো টংয়ের উপর । একটু জিরিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে পায়ে পা তুললো । তা দেখে ভ্রু যুগল জড়ো করলো আরাকান । চোখ সরু করে তাকালো । সংগ্রামের পিছে দাঁড়ালো ওর সাগরেদ রা । সবার আগে মুখ খুললো সংগ্রাম…
“ জমিদার সংগ্রাম জোয়ার্দার কে দেখে, সম্মান প্রদর্শন করে দাঁড়িয়ে গেলি ! বসার জায়গা ফাঁকা করে দিলি । প্রসন্ন হলাম আমি !
আরাকান বাঁকা হাসলো । বললো কন্ঠ চিপে…
“ আচ্ছা ? তা , জমিদার সংগ্রাম জোয়ার্দারের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করি একটু ? বহুদিন পর দেখা , আমার দোরগোড়ায়, আমার গন্ডিতে নিজে থেকে এসেছে সংগ্রাম জোয়ার্দার , আতিথীয়তা না করলে চলে ?
ঐ মন্টু , একটু লাল পানির ব্যাবস্থা কর জমিদারের জন্য । নতুন জমিদার সাত গ্রামের । আমরা তার অধীনে না থাকলেও সে এখন আমাদের অধীনে । একটা মানবতা তো আছেই আমাদের ! জমিদার সংগ্রাম জোয়ার্দার , পান করবেন লাল পানি ? হেব্বি স্বাদ আছে….
দুই দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে সোজা হয়ে বসলো সংগ্রাম । সামনের দিকে হেলে বসলো…
“ উঁহু ,, ওসব হারাম ! হারাম জিনিস মুখে রোচে না আমার ! তোরা আবার হারাম খেয়ে খেয়ে অভ্যস্ত ! হারামের উপর বসবাস তোদের । এখনো দাঁড়িয়ে আছিস হারামের উপর । আমার গন্ডিতে দাঁড়িয়ে আমাকেই হারাম সাধছিস ? প্রশংসা করি তোর সাহসের …
“ উফফফ , ধন্য হলাম ! জমিদার সংগ্রাম জোয়ার্দার আমার সাহসের প্রশংসা করলো ! আর কি চাই ! এই প্রশংসা শুনে সাহস বেড়ে গেলো আরো !
“ স্পর্ধা কমা ! আর তবিল গুছিয়ে এসব নাটক শেষ কর ! ফোট এখান থেকে । অনেক দিন ধরেই সহ্য করছি , রাগাস না আমায় । আমাকে রাগানোর পরিনতি কি হতে পারে , তোর ধারনা আছে আশা করি ।
কানে এক আঙ্গুল ঢুকিয়ে সংগ্রাম কে উপেক্ষা করে ব্যাঙ্গাত্বক ভঙ্গিতে কান চুলাকালো আরাকান । মুখ খোলার আগে রহিম বলে উঠলো….
“ কি রে আরেক কান , কান চুলকাইতাছে ? চুলকাই দিমু ?
ঝলকানো ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকালো মন্টু , পিংকু, আর জসিম । আরাকানের চেলা এরা । পিংকু রগরগে গলায় ফোঁস করে উঠলো…
“ করিম্মা , তোর সাহস তো কম না ! আমার….
“ এ এ এ এএএএএ,, পিংকি মামনি , করিম্মা কি হ্যাঁ ? করিম ক করিম । আর ওরে কি করিম কইতাছোস , করিম আমি ! মুখ খুলছি আমি ? আমার নাম পচাইলি ক্যান তুই ? মারমু একখান থাবড়া ! চৌখের সাথে সাথে জবান ও ঠিক হইয়া যাইবো !
করিমের তৎক্ষণাৎ আক্রমনে নিজের কথা শেষ করতে পারলো না পিংকু । চোখ রাঙিয়ে তাকালো আরো বেশি । সংগ্রাম এসবে কান দিলো না , মাঝখান থেকে বললো চড়া গলায়…
“ দেখ আরাকান , আমার সাথে লাগতে আসিস না । জমি আমার, এটা তুই খুব ভালো করেই জানিস । আর এই জমি আমি এক ইঞ্চি ও ছাড়বো না , এটাও জানিস । বেকার বেকার নিজের সময় , আর মোটা মাথার আজাইরা ব্রেন নষ্ট করিস না । অন্য যে পথ বেছে নিয়েছিস , সেই পথেই চল । সেই পথেই তোর সাথে আমার পাঙ্গা হবে । যাকে পারিস , তার সাথেই হাত মিলিয়ে নিজের দল ভারী কর । তবুও এই পথ ছাড় । জমির ত্রিসীমানা থেকে দূরে সর । গ্রামের মানুষের যদি আর একটা ক্ষতি করেছিস , তাহলে দ্বিতীয় বার এভাবে শান্ত হয়ে তোর সামনে পাবি না আমাকে ।
নিজের পোঁটলা গুটিয়ে ফেল , টং তোল এখান থেকে । তোর নামে দ্বিতীয় কোনো অভিযোগ শুনতে চাই না আর ।
“ তোকে এভাবে শান্ত ভাবে দেখতে চাই না আমি । অশান্ত হ একটু । উন্মাদ সংগ্রাম জোয়ার্দার কে ভীষণ ভালো লাগে আমার । আমি উপভোগ করি তোর উন্মাদনা । তোর হাতে করা নিষিদ্ধ কাজ গুলোর সাক্ষী হওয়ার পর থেকে সেই কাজ গুলোর উপর ঝোঁক বেড়েছে আমার । তোকে আরো নিষিদ্ধ কাজে উদ্বুদ্ধ করতে ভালো লাগে ।
তাই তো তোর ভাইয়ের সাথে মিলে গ্রামে ডাকাতি করিয়েছিলাম । কিন্তু তুই যে ভালো মানুষ,এটা জানা ছিল না । আমাকেও ছাড়লি আর তোর ভাইকেও ছাড়লি ! শাস্তি দিলি কাদের ? যাদের আমরা কাজে লাগিয়েছি । কি হলো এতে , দুটো সাপ মরলো । কিন্তু সাপের রাজার তো গায়ে ঘাঁ ও পড়লো না । বেকার বেকার দুটো প্রাণ অকালি নাশ করলি ভাই । গোড়ার বিষ গোড়াতেই রইলো ।
“ তোর সাথে এসব প্যাচাল পাড়তে আসি নি আমি ।
নিজে নাশ হতে না চাইলে , এখান থেকে গুটিয়ে যা । বউ বাচ্চা আছে , সংসার কর ভালো মতো । দুটো বাচ্চার বাপ হয়েছিস সবে , বংশ বৃদ্ধি কর আরো । এতো তাড়াতাড়ি তোর পতন ঘটলে তোর বংশে লালবাতি জ্বলবে । তালুকদার বংশে সাদা বাতি জ্বালিয়ে দেখা এবার । অন্যের পিছে কাঠি না নেড়ে নিজের কথা ভাব । জমিদারের সাত গ্রাম , আর তোর এক গ্রাম । উচ্চ মর্যাদা নিজের গ্রামে হাসিল কর ।
এই মন্টু , তোর মনিব কে বলে দিস । এই জমির আশে পাশে যেন ওকে আর না দেখি আমি । তোদের ও না । নয়তো আর চারটে কবর খোঁড়া হবে এই গোরস্থানে । গোসল ছাড়া কবর হবে চারটে লাশ । ওপারেও শান্তি পাবি না নাপাক হয়ে কবরে শুলে….
দাঁত খিচলো আরাকান । সংগ্রামের গভীর নিরেট স্বরে মন্টু ঘন পলক ফেললো । আড়চোখে চাইলো আরাকানের দিকে । অতঃপর এক পলক করে পিংকু আর জসিমের দিকে । মন্টুর ন্যায় ওদের ও ভীত অবস্থা । চোখে ভয় প্রকাশ পাচ্ছে স্পষ্ট । ওরা স্বচোক্ষে সংগ্রাম জোয়ার্দারের ক্ষিপ্ত বর্বরতা দেখেছে । এক বার নয়, তিন তিন বার । এই গোরস্থান সাক্ষী অনেক কিছুর ।
আগের বার গ্রামে ডাকাত পড়ার পর আরো বেশি সতন্ত্র হয়ে গেছে ওরা । তবে ওরা সন্দিহান , একের পর এক অনেক বার আরাকান আর জুনাইদ কে ছেড়ে দিয়েছে সংগ্রাম । ছেড়ে দিলেও ছাড়ের খাতায় রাখে নি । এই ছাড়ের মানে জানা নেই ! কেনো ছাড়ে সংগ্রাম ওদের ?
ঢোক গিললো ওরা তিনজন । করিম টিটকারী মারলো ওদের অবস্থা দেখে…
“ পিংকি মামনি , মুতবি তুই ! চেহারা ঘামতাছে ক্যান এমনে ? এইহানে গোরস্থান , নাপাক করিস না ভাই , যা ,ঐ চিপায় গিয়া হালকা হইয়া আয় ।
আরকান দাঁত খিচলো । বললো পরমুহুর্তে কাঁধ ঝেড়ে…
“ আজকের দিনে এইসব সংঘর্ষ , মারামারির কথা বাদ দে । শুনলাম বিয়ে করছিস আবার ? দাওয়াত টাওয়াত দিবি তো ? নাকি তোর জমিদারি আওতাভুক্ত নই বলে বাদ দিবি আমাদের ? বউটা তো একি ! শুনেছি বউ কালা ! তা হাছা নাকি ? কালা তোর বউ ? এতো সুন্দর জমিদারের কালা বউ ! সত্যি টা বল দেখি , তোর মুখে না শুনলে বিশ্বাস হবে না ! আসলেই তোর বউ কালা ?
হাত মুঠো করলো সংগ্রাম । যথা সম্ভব সংযত করলো নিজেকে । হেসে বলল….
“ এতো সুন্দর জমিদারের যতো সুন্দর বউ হওয়ার কথা , আমার বউ তার থেকেও হাজার গুণ বেশি সুন্দর ।
ছোট্ট একটা বাক্য শেষে থামলো সংগ্রাম । রহিম করিম ঝট করে সংগ্রামের দিকে তাকালো । অতঃপর ঝট করেই চাওয়া চাওয়ি করলো একে অপরের দিকে । দুই ভাই দুজনের চোখে চোখ রেখে মুগ্ধতায় মুচকি হাসলো ।
এদিকে তিরষ্কার করে হাসলো আরাকান । দুই কদম এগিয়ে বললো চাপা কটাক্ষের স্বরে…
“ মাথায় নাকি সমস্যা তোর বউয়ের ? অর্ধ পাগল তোর বউ ? সংসার পেতেছিস কিভাবে ওর সাথে ?
এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে গেল সংগ্রাম । আকস্মিক ওর দাঁড়ানোতে খানিক ভড়কে তৎক্ষণাৎ তড়িতে পিছিয়ে গেল আরাকান । কলজে ধক্ করে উঠেছিল আচমকা ।
ওর চমকানো তে হেসে ফেলে সংগ্রাম । গা দুলিয়ে শব্দ করেই হাসলো ।
আরাকানের পিছন থেকে একটা শিশু সুলভ ডাক কানে আসে এবার । চকিতে সেদিকে মনোযোগ দেয় সবাই…
আব্বা, আব্বা বলে একটা ছোট্ট বাচ্চা ছুটে আসলো । বয়স হবে এই ছয়েক । জমির ধারের চিকন আল বেয়ে এক ছুটে এসে থামলো সকলের মাঝে । হাঁপিয়ে গেছে ছুটতে গিয়ে । বাচ্চা টা থেমেই হাঁসফাঁস করে দম টানলো । চোখ তুলে তাকিয়ে একই ভাবে হাঁসফাঁস করেই আরাকান তালুকদারের দিকে ঘুরে বললো ভাঙ্গা ভাঙ্গা শব্দে…
“ আম্মা তোমালে ডাকে আব্বা !
বিকেল হয়ে গেচে, বালিতে যাবে না ? দুপুলে খাও নাই , মুলগি জবাই কলচে আম্মা । গলম গলম খাইতে ডাকে । চলো চলো…
বলতে বলতে সংগ্রামের দিকে চোখ যেতেই চিকচিক করে উঠলো বাচ্চা টা । আরাকানের হাত ধরেছিল কথার মাঝে । এক ঝটকায় হাতটা ছাড়লো সে । সংগ্রামের দিকে ফিরে আদুরে হয়ে বললো আবার..
“ তুমি ভালো আচো ? আমালে চিনচো ?
সংগ্রাম হাঁটু মুড়ে বসলো বাচ্চাটার সম্মুখে । কন্ঠ খাদে নুইয়ে একই আদুরে করলো স্বর…
“ তোমারে চিনবো না ? কি যেন নাম বলেছিলে তোমার , শেহজাদ ? না ? আর , আমি ভালো আছি, তুমি কেমন আছো ?
খুশিতে হ্যাঁ বোধক ঘাড় ঝাঁকালো বাচ্চা টা ।
একবার এই জমির পাশেই এই বাচ্চাটার সাথে দেখা হয়েছিল সংগ্রামের । সেবার সংগ্রাম একা এসেছিল গোরস্থানে । বাচ্চা টা খেলতে এসেছিল আরো অনেক ছোট বাচ্চার সাথে । যেহেতু পতিত জমি, আর পাশেই তালুকদার নিবাস , এখানে আসা টা অকল্পনীয় কিছু নয় ।
এখানে জমিদার গ্রামের শেষ হলেও বৈকুন্ঠপুর গ্রাম শুরু । আর বৈকুন্ঠপুর গ্রাম শুরুই হয়েছে তালুকদার নিবাস দিয়ে । গোরস্থান থেকে তালুকদার নিবাস , আর তালুকদার নিবাস থেকে গোরস্থান , দুটোই মুখোমুখি ।
গোরস্থানের পাশে একটা বিরাট তেঁতুল গাছ , যেটা একপাশ থেকে একটু আড়াল করে রেখেছে তালুকদার নিবাস কে । আর এই আড়ালেই চলে অনেক কিছু । যা চলে, সব আঁধারে ।
সংগ্রাম হাঁটু মুড়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো । শেহজাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দাঁত চেপে বললো আরাকানের উদ্দেশ্যে…
“ ভাগ্যিস আগেই দুটো বাচ্চার জন্ম দিয়েছিস , নয়তো আজ বাচ্চা জন্ম দেওয়ার জন্য ধরনীতে থাকতি না । শুকরিয়া আদায় কর , তোর দুটো বাচ্চা আশির্বাদ বর্ষন করেছে তোর উপর । আশির্বাদ অভিশাপে বদলাতে যাস না , সাবধান !
সুযোগ বারবার আসে না , সংগ্রাম জোয়ার্দার কিন্তু ছাড় দেয় না । চললাম আজ… দ্বিতীয় বার যেন জমি সম্পর্কিত কোন বিরোধে তোর সামনে না আসতে হয় ।
কথা শেষ করে এক মুহুর্ত দাঁড়ালো না সংগ্রাম ।
গটগটিয়ে রওনা দিলো উল্টো পথে । পিছে বিষাক্ত সাপের ন্যায় গর্জন করে ফুসলো আরাকান । এই সংগ্রাম জোয়ার্দার নিজেকে ভাবে টা কি ? এতো গড়িমা ওর ? কেনো ? দাম্ভিকতা কিসের এতো ? এই দাম্ভিকতাই তো সহ্য
বিকেলের পর পর অনেক গাছ এনেছে অংকুর । বিভিন্ন ফুলের গাছ । ওদের বাড়ির বাইরে বাগানের জায়গা আছে , তবে বাগান করা নেই । অযত্ন হবে বলে কোনো গাছ লাগানো হয় নি । শায়লাও এসবে ধ্যান দেন নি ।
সুরবালার এক কথায় আজ গাছ এসেছে অনেক । গাড়ি থেকে লোক দিয়ে সব গাছ নামিয়ে বাগানের একপাশে রাখলো অংকুর । অতঃপর বাড়িতে ঢুকে সুরবালা কে বের করলো বাড়ি থেকে । বালা সেই যে প্রথমবার এসে বাড়িতে ঢুকেছে , তার পর একবার জমিদার বাড়িতে যাওয়ার সময় বাইরে বেরিয়েছিল । আবার ফিরে এসে ঢুকেছে , বেরোয়নি আর ।
অংকুরের পিছু পিছু বাইরে বেরিয়ে এতো গুলো গাছ দেখে তাজ্জব সুরবালা । শায়লা বেরিয়েছেন ওদের সাথে । তিনিও খানিক অবাকই হলেন । সুরবালা তাকেও একবার বলেছিল বাগানে গাছ লাগানোর কথা । তিনি অতটা গুরুত্ব দিয়ে শোনেন নি ।
অংকুর কে একবার বলার পরই যে অংকুর এতো গুলো গাছ নিয়ে আসবে,তা ভাবে নি সুরবালা । সেই সকালের পরই , দারোয়ান কে দিয়ে বাগানের মাটি খুঁড়ে রেখেছিল অংকুর । মাটি খুঁড়ে পানি দিয়ে উর্বর করেছে বাগানের ভূমি । এখন শুধু গাছ লাগানোর পালা ।
সারি সারি করে গাছ গুলো রাখা হয়েছে । বড় বড় টবে আগে থেকেই অনেক গুলো লাগানো । এগুলো ছাদে তোলা হবে হয়তো ।
সুরবালা হতভম্ব হয়ে অবিশ্বাস্য নয়নে তাকিয়ে দেখলো সব । ওর এক কথার পরিপ্রেক্ষিতে এক কথায় গুরুত্ব দিয়ে এসব আনালো অংকুর ? তাজ্জব হয়েই বললো মেয়েটা…
“ এতো এতো গাছ , সব আপনি আনিয়েছেন ?
জাহানারা আর দারোয়ান গাছ গুলো একে একে খোঁড়া গর্তে রেখে মাটি ঠেসে রোপন করছে । অংকুর হাত লাগাবে না এসব ময়লা আবর্জনায় । সে ওদিকে খেয়াল দিয়েই বেখেয়ালে উত্তর করলো…
‘’ আমি নয়তো আর কে ?
ফুল সমেত একখানা অলকানন্দা গাছ ও আছে । গাছটা নেতিয়ে পড়েছে রোদের উষ্ণ তাপে । ফুল গুলো ও তাই । সেটাকে মাটির গর্তে পুতে দিতেই অংকুর কথা শেষ করে এগিয়ে গিয়ে নেতিয়ে যাওয়া একটা ফুল ছিঁড়ে নিলো দুই আঙ্গুলে । ফুলটার দিকে গাঢ় দৃষ্টি পাত করে মুচকি হাসলো । মুচকি হাসি টুকু নিজের মাঝেই ছিল । প্রকাশ হলো না ঠোঁটে ।
নাক ডুবিয়ে গন্ধ টানার চেষ্টা করলো ফুলটার । নাহ , আলাদা কোনো গন্ধ নেই ! কেনো ? গন্ধ থাকা উচিত ছিল এই ফুলটার ।
অংকুর ফুল টা হাতে নিয়ে এসে আবার আগের জায়গায় দাঁড়ালো । মুহুর্তেই গাছে গাছে,ফুলে ফুলে সেজে উঠলো শখশখে পুরো বাগান । শূন্যতা থেকে পূর্ণ হলো ফুলে ফুলে । প্রত্যেক টা ফুলের গাছের একটা করে চারা নিয়ে এসেছে সে । কোনো গাছই বাদ পড়ে নি হয়তো । শায়লা খানিক দাঁড়িয়ে থেকে টব গুলো ইশারা করে বললেন..
“ এগুলো ছাদে উঠবে ?
“ হুম !
ছোট্ট উত্তর অংকুরের ।
শায়লা দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না । ভেতরে আসলেন তিনি । সুরবালা মূক প্রতিক্রিয়া হীন । এখনো হতবাক , বিমূঢ় সে । সব গাছের মাঝে একটা টকটকে জবা ফুলের গাছ ও আছে । সেটা এখনো লাগানো হয় নি । দারোয়ান সেটা রোপনের জন্য হাতে তুলতেই এবার সেটার দিকে মনযোগ পড়লো বালার ।
অমনি কপাল গুটিয়ে ফেললো সে । তৎক্ষণাৎ বাঁধা দিলো দারোয়ান কে…
“ দাঁড়ান চাচা !
দারোয়ান ঘুরে তাকালো । অংকুর ও তাকালো চকিতে । সুরবালা বাঁকা চোখে অংকুর কে দেখে মুখ বাঁকিয়ে বললো তপ্ত স্বরে…
“ ওটা গেটের বাইরে লাগাবেন । জবা ফুল আমার পছন্দ নয় । গেটের পাশে লাগান ওটার চারা !
দারোয়ান না বুঝে অংকুরের দিকে চাইলেন । কথাটা বোধগম্য হতে বাকি রইলো না অংকুরের । সরু চোখে তাকিয়ে একটু বাজিয়ে দেখলো সে…
“ জবা ফুল আমার পছন্দ ! বাগানেই লাগানো হোক ওটা ?
কটমটিয়ে তাকায় বালা । জোড়া ভ্রু কুঁচকায় নাকের ডগা অবধি । তিরিক্ষি স্বরে বলে তৎক্ষণাৎ…
“ পছন্দ তো বাগানে কেনো ? নিজের ঘরেই লাগান ! দারোয়ান চাচা , চারাটা টবে লাগিয়ে ওনার ঘরে গিয়ে রেখে আসুন ।
চোখ নামিয়ে মৃদু হাসে অংকুর । ইশারা করে বালার আদেশে সায় দিতে বলে দারোয়ান কে । ইশারা অনুযায়ী তাই করলেন তিনি । এগোলেন গেটের দিকে ।
তিনি সরে যেতেই অংকুর বালার দিকে অগ্রসর হলো । মুখোমুখি দাঁড়াতেই এক রাশ বিরক্তি নিয়ে মুখ বাঁকিয়ে চোখ সরালো বালা । অংকুর হাতে থাকা অলকানন্দা টা অতি আলগোছে বালার কানে গুঁজে দিতেই ফের ঝট করে চোখ তুললো মেয়েটা । বললো অংকুর..
“ আমার ঘরে আগে থেকেই একটা অলকানন্দার বসবাস আছে । দ্বিতীয় কোনো ফুলের প্রয়োজন নেই আমার । ফুল গাছের তো একেবারেই না ।
অলকানন্দা আমার প্রিয় ফুল । আর সেই ফুল রুপি মেয়েটাও ভীষণ প্রিয় । দুটো ফুলকে একসাথে মানিয়েছে বেশ । ফুলের কানে আরেক ফুল ।
বালার কুঁচকানো কপাল খানিক শিথিল হয় । তবে মুখ ভার । অংকুরের কথায় ভেংচি কেটে নিজের মাঝে কিছু একটা বিড়বিড় করলো সে । পিছিয়ে গেল অংকুরের সামনে থেকে । ছোট ছোট টব গুলোতে ছোট ছোট অনেক ফুলের চারা । দারোয়ান সবগুলো একে একে ছাদে তুললো । শেষে একটা বাকি , সেটা নিয়ে ছাদের দিকে পা বাড়ালো অংকুর ।
বেশ ভারী । বালা পিছু পিছু এই প্রথম ছাদে উঠলো । ছাদের লোহার রেলিং ঘেঁষে সবগুলো টব সারি বেঁধে বসানো হয়েছে । দারোয়ান সবগুলো বসিয়ে নিচে নেমেছেন বাগানে সদ্য রোপণ করা চারা গুলোতে পানি দিতে ।
একখানা সরু পাইপ দিয়ে অংকুর একে একে ছাদের সবগুলো টবে পানি দিলো । সন্ধ্যার আভা ফুটছে আকাশে । লালচে হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে পশ্চিম দিগন্ত ।
পাখিদের নীড়ে ফেরার কিচিরমিচির শব্দে মুখরিত আশপাশ । ছাদে দুজন থাকলেও কারোর মুখে কোনো কথা নেই । সুরবালা চুপটি করে অংকুরের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করলো এতোক্ষণ ।
পানি দেওয়া শেষে কল বন্ধ করে পাইপটা গুছিয়ে টবগুলোর একপাশে রাখলো । এগুলো রোজ কাজে আসবে । অংকুর হাত ঝেড়ে পিছন ফিরতেই সুরবালার সুক্ষ্ম দৃষ্টির সামনে পড়লো । প্রতিক্রিয়া দেখালো না সে । সুরবালা নিজে থেকেই বললো…
“ আমার কথায় ফুল গাছ নিয়ে এসেছেন ?
“ আর কেউ বলেনি গাছ আনতে ! একজনই বলেছে , তার কথাতেই নিয়ে এসেছি !
“ আমার কথার এতো গুরুত্ব ?
“ গুরুত্ব দিতে বারন করছো ?
“ উঁহু , বেশি বেশি গুরুত্ব দিতে বলছি । আমাকে কেউ গুরুত্ব দিলে আমার খুব ভালো লাগে জানেন ? আমাকে এভাবে গুরুত্ব দেবেন সবসময় ?
অংকুর উত্তর করলো না মুখে । একদৃষ্টে তাকিয়ে ঘাড় কাত করে অবলিলায় চোখ সরালো । মেয়েটা বেশ নজর কাড়ছে । কানের পাশে গুজে রাখা নেতিয়ে পড়া হলদে অলকানন্দা টা যেনো সতেজতা ফিরে পেয়েছে এখন ।
মৃদুমন্দ বাতাসে কাঁধ জড়িয়ে রাখা শাড়ির আঁচল পড়ে গেছে মেয়েটার । ছোট ছোট চুল গুলো উড়ছে হাওয়ায় ভেসে । ফর্সা কাঁধের উপরের ঢিলেঢালা খোপাটা খুলে যাবে এক্ষুনি । দৃষ্টি হারানোর আগেই চোখ সরিয়ে ফেলা উত্তম । তাই করলো অংকুর । একপাশে দাঁড়ালো গিয়ে । ছাদে ওঠা হয় না ওরো । জাহানারা কাপড় মেলতে ছাদে ওঠেন । এখন সন্ধ্যা নামবে । শায়লার কাপড় মেলে রাখা দড়িতে । জাহানারা তুলতে আসেন রোজ । তিনি হয়তো এখনো বাগানে । বালা এগিয়ে গিয়ে দড়ি থেকে কাপড় তুলতে আড়ম্ভ করলো । ছাদের এক কোনে দেয়ালে পেরেক ঠুকে দড়ির এক মাথা সেই পেরেকে বাধা । দড়ির অন্য মাথা বাঁধা , ছাদের অন্য পাশের দেয়ালে হেলান দিয়ে রাখা একটা মোটা বাঁশের সাথে । বাঁশটা দাঁড়িয়ে আছে নড়বড়ে হয়ে । সুরবালা দড়িতে হাত রাখতেই বাউন্স করে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো দড়িটা । অমনি নড়বড়ে বাঁশটা নড়ে চড়ে উঠলো কেঁপে কেঁপে । দু একটা কাপড় মেলার জন্য এই একটা দড়িই আছে ছাদে । সুরবালা একটা শাড়ি দড়ি থেকে তুলতে তুলতে ডাকলো….
“ শুনুন বাবড়ি ওয়ালা..?
অংকুরের নিঃশব্দতা দেখে একটু থেমে আবার ডাকলো…
“ কি হলো , শুনছেন ?
পিছু ফিরলো অংকুর । চোখ সরু করে উত্তর করলো..
“ শুনছি !
“ আমাকে ঘুরতে নিয়ে যেতে চেয়েছেন , কাল কিন্তু সত্যি সত্যিই ঘুরতে যাবো আমরা !
“ কাল না গেলে হয় না ? কাল কলেজ আছে আমার !
সুরবালা চকিতে চায় । হাতের কাজ থামিয়ে প্রশ্ন কলে সূচালো চোখে চেয়ে…
“ বয়স কতো আপনার ?
তব্দা খায় অংকুর । পাল্টা প্রশ্ন করে..
“ কেনো ?
“ বলুন আগে !
“ ২৬ !
বড় সড় দৃষ্টিতে চায় সুরবালা । বিশাল অবাক হয় সে । হা বনে হতবাক স্বরে বলে…
“ আপনার বয়স মাত্র ২৬ ? এতো ছোট আপনি ?
“ আমি ছোট ?
“ চেহারায় বড় , কিন্তু বয়সে তো একদম বাচ্চা !
“ বাচ্চা জন্ম দেওয়ার বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে ! আর এই বয়সটাকে বাচ্চা বয়স মনে হচ্ছে তোমার কাছে ?
ভিমড়ি খায় সুরবালা । ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে থতমত দৃষ্টি সরায় । পরমুহূর্তে কাঠ চড়া গলায় বলে ওঠে সে…
“ বাবড়ি ওয়ালা ! আপনাকে তো আরো বড় ভেবেছিলাম আমি । ভেবেছিলাম বুড়ো হয়ে গেছেন । তাইতো ভাবি , বুড়ো বয়সে এসে আপনি পড়াশোনা করেন ?
তাহলে আপনি আমার থেকে , উমম– ছয় বছরের বড় ! কদিন পর আমার বিশ বছর হবে , বুঝলেন ?
“ জন্মদিন কবে তোমার ?
“ বাংলায় চৈত্র মাসের ২৪ তারিখ ।
“ ওও ,
“ হুম ! কালকে কলেজে গিয়ে কি করবেন ?
“ কলেজ শেষ অনেক আগেই , কাল পূনর্মিলনি আছে !
“ সবাই যাবে ?
“ হুম !
“ আপনার বান্ধবী , ঐ জবা ফুল ও ?
দৃষ্টিতে দৃষ্টি স্থির করে অংকুর । উত্তর করে নির্লিপ্ত ক্ষিণ স্বরে…
“ হুম ।
তৎক্ষণাৎ মুখ কুঁচকায় সুরবালা ! মুখে এক রাশ আঁধার নামে । মুখ ফিরিয়ে নেয় সে । অংকুর নির্বিশেষে একি ভাবে চেয়ে ওর ভাবগতিক দেখলো । শায়লার একটা শাড়ি তুলে হাতে পেঁচালো সে । আরো একটা শাড়ি দড়িতে মেলে রাখা ।
শক্ত ঝটপট হাতে দড়ি থেকে এক টানে শাড়ি টা তুলতেই হেঁচকা টান পড়লো দড়িতে । দড়ির অপর মাথা যে বাশটায় বেঁধে রাখা , সেটাও দড়ির ঝাঁকুনিতে নড়ে উঠলো । হেলান দিয়ে রাখা মোটা বাশটা সমতা হারিয়ে হেলে পড়তে লাগলো সামনের দিকে । সুরবালার লক্ষ্য নেই সেদিকে । আনমনে বিড়বিড় করতে করতে হাতের শাড়ি টা এক স্থানে স্থির হয়ে গোছাচ্ছে সে । অংকুর আকস্মিক ভড়কালো । ধক্ করে উঠে চিৎকার করে উঠলো….
“ সুরবালা !
চিৎকারের সাথে সাথে সুরবালার তপ্ত মস্তিষ্ক কিছু বুঝে ওঠার আগেই আকস্মিক হামলা পড়লো ওর উপর । হুড়মুড়িয়ে ওকে এক টানে পিছু ফিরিয়ে নিজের সুঠাম বুকের আড়ালে আগলে নিলো অংকুর । দুহাতে জাপটে ধরে হাতের বাঁধন দৃঢ় করলো সে । ছোট্ট ছিপছিপে গড়নের মেয়েটাকে লুকিয়ে ফেললো নিজের সুঠাম দেহের বাহুডোরে । ভড়কালো মেয়েটা । ছলকানো দৃষ্টি খিচে নিতেই অংকুরের আহ্ সূচক মৃদু গোঙানির শব্দ কানে আসলো । সাথে ছাদের মেঝেতে ধপ করে কিছু পড়ার শব্দ । উক্ত শব্দে ফের চমকালো মেয়েটা । দাঁত চেপে চোখ বুজলো । কি ঘটলো, কি হলো, মস্তিষ্ক শূন্য । বুঝলো না সে । অংকুরের দীর্ঘ একটা শ্বাসের শব্দ কানে আসতেই চোখ খুললো তড়িতে । পুরুষালি বুকের ভাঁজ থেকে মাথা তুলে ছ্যাঁত করে তাকালো । চোখ বন্ধ অংকুরের । মাথার এলোমেলো ঝাঁকড়া চুলে অর্ধেক চোখ ঢেকে গেছে । মুখ খানা ফিকে কালচে এর মধ্যেই । শক্ত চোয়াল ।
সুরবালা দৃষ্টি নামিয়ে চকিতে তাকালো নিচে । মেঝেতে বড় শক্ত পোক্ত বাশটা পড়ে আছে ওদের পায়ের কাছে । সাপের ন্যায় দড়িটা এঁকে বেঁকে ছড়িয়ে ।
এখনো পুরোপুরি বোধগম্য হলো না । অংকুর ধীরে চোখ খুলে তাকালো বালার ভীত দূর্বোধ্য মুখখানার দিকে । গাঢ় দীর্ঘ শ্বাসে শুধালো ধীরে…..
শ্যামা সুন্দরী পর্ব ৪৩
“ ঠিক আছো ?
সুরবালা কান দিলো না । আঁতকে উঠলো সে । অংকুরের কাঁধ গড়িয়ে গলায় নেমেছে লাল টকটকে উষ্ণ তরল । দৃষ্টি ছলকে উঠলো মেয়েটার । কম্পিত হলো পুরো শরীর । অতর্কিতে হাত বাড়িয়ে দিলো সে । দুই আঙ্গুলে অংকুরের গলা বেয়ে নামা লাল তরল ছুঁইয়ে দিলো । কম্পিত গলায় হাঁসফাঁস করে অস্পষ্ট স্বরে উচ্চারণ করলো….
“ বাবড়ি ওয়ালা…
