হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৮
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
সূর্যের তেজষ্ক্রিয় রশ্মি জানালার কাঁচ ভেদ করে চোখে পড়তেই ঘুম ছুটে গেলো কৃশানের। চোখ জোড়া আলোর সংস্পর্শে আসতেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। হাত দিয়ে আলোটুকু আড়াল করে বিছানা ছেড়ে নেমে পড়লো সে। মাথাটা আজকে একটু বেশিই ঝিমঝিম করছে। রাতের কোনো কিছুই স্মরণে নেই। হাতে সাদা ব্যান্ডেজ দেখে কপাল কুঁচকে গেলো তার। চেয়েও কোনোকিছু মনে করতে পারলো না। তবে এখন মনটা একেবারে হালকা লাগছে। গতকালের রাগটা আর নেই। ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিনে টাইম লক্ষ্য করতেই সব চিন্তা মাথা থেকে ঝরে গেলো, বেলা নটা বেজে বিশ মিনিট। ভার্সিটি যাওয়ার টাইম হয়ে গেছে। অলরেডি অনেকগুলো কল দিয়ে ফেলেছে বন্ধুরা। তাই আর দেরী না করে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো।
মিঠুর জন্য ছোটো ছোটো করে দুটো গাজর কেটে বাটিতে নিলো হুমায়রা। কাজ শেষ হতেই ছু*রি টা জায়গামতো রেখে রুমের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। বারান্দায় টুকটুক করে পানি খাচ্ছিলো মিঠু। খাবার হাতে হুমায়রাকে ঢুকতে দেখে দৌঁড়ে এগিয়ে আসলো। যেন এতক্ষন এই অপেক্ষাতেই প্রহর গুনছিলো। তার কান্ড দেখে হাসি ফুটলো হুমায়রার মুখে। হাঁটু মুড়ে বসে মিঠুর দিকে খাবার বাড়িয়ে দিলো তৎক্ষণাৎ। খাওয়ার পুরোটা সময় তার দিকেই অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো মেয়েটা। ইকরার পরে এ বাড়িতে এই একটা প্রাণীই তার সবচেয়ে আপন। এমনকি যে কথাগুলো ইকরার নিকট বলতে সক্ষম হয় না সেই কথাগুলোও মিঠুর কাছে আপনমনে বলে হালকা হওয়া যায়। এক কথায় তার সকল সুখ দুঃখের নীরব শ্রোতা বললেই চলে। অর্ধেক খাবার খেয়েই মুখ ফিরিয়ে নিলো মিঠু। হুমায়রা আরেকটু খাওয়ানোর চেষ্টা করলেও মুখে নিলো না। অগ্যতা আর জোরাজোরি না করে উঠে দাঁড়ালো মেয়েটা।
দরজার সামনে আসতেই ওয়াশরুম থেকে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে বেরোতে দেখা গেলো কৃশানকে। মানুষটাকে দেখতেই পায়ের গতি বাড়িয়ে দিলো সে। দু’কদম এগোতেই হিজাবের মাথা দরজার লকে আটকে গেলো। টান খেয়ে হিজাবের প্রথম ভাঁজ খুলে গিয়ে দ্বিতীয় ভাঁজটাও আলগা হয়ে গেলো। মুহূর্তেই চন্দন রঙ্গা গলদেশ দৃশ্যমান হলো তার। কৃশান তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। যার দরুণ প্রথমেই তার চোখ পড়লো মেয়েটার গলার মসৃণ ত্বকে তৈরি হওয়া লালচে ক্ষতের দাগটায়। ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেলো ওমনিই। ফর্সা গলায় লম্বা হয়ে পড়া দাগটা দেখে যেন মনে হচ্ছে কেউ ছু*রি ঠেকিয়েছিলো সেথায়। মনের মধ্যে হাজারও প্রশ্ন উঁকি দিলো তার।
“ রাতে কী এই মেয়েকে মেরেছিলাম আমি? কিছুই তো মনে পড়ছে না! দাগটা দেখে তো মনে হচ্ছে ছু*রি ঠেকানোর ফলে ক্ষত হয়েছে। তাহলে কী মেয়েটার গলায় ছু*রি ধরেছিলাম? নিশ্চই এই মেয়ে কথা অমান্য করেছিলো নয়তো মাতাল অবস্থায় উল্টো পাল্টা কাজ করার স্বভাব আমার নেই। ”
তার ভাবনার মাঝেই তড়িঘড়ি করে হিজাব ছাড়িয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিলো হুমায়রা। ত্রস্ত পায়ে রুম ত্যাগ করতে নিবে এর আগেই কানে আসলো কৃশানের গম্ভীর স্বর,
“ এই দাঁড়া। ”
চলন্ত পা জোড়া থেমে গেলো হুমায়রার। সাথে সাথেই উল্টো ঘুরে উত্তর করলো,
“ জ্বি..? ”
“ রাতে কিছু হয়েছিলো? আমার হাতে ব্যান্ডেজ কেন? আর কে লাগিয়েছে এটা? ”
কী বলবে মেয়েটা? আপনি গ্লাস ভেঙে আমাকে মারতে চেয়েছিলেন আর সেই গ্লাসের কাঁচ দিয়েই হাত কেটেছে আপনার- এটা বলবে? যথাযথ উত্তর না পেয়ে নখ দিয়ে হাত খুঁটতে লাগলো।
” তোর কী কান খাটো? ”
“ পানির গ্লাস দিয়ে কেটেছে। ”
কৃশানের রাম ধমক খেয়ে কথা না বলে থাকা হলো না আর। উত্তরে কিছু বললো না সামনের ব্যাক্তি। হুমায়রার কথায় ঘটনার গভীরতা অনেকটাই আঁচ করতে পেরেছে সে। হয়তো মেয়েটা পানি দিতে এসেছিলো তার জন্যই ওঁকে মারতে গিয়েছিলো।
“ এবার যাহ এখান থেকে। ”
টিশার্টের উপর শার্ট জড়াতে জড়াতে অন্যদিক তাকিয়ে বলে উঠলো কৃশান। তার বলতে দেরী অথচ রুম ছাড়তে দেরী হলো না হুমায়রার। মেয়েটা যেন কোনোমতে কেটে পড়লেই বাঁচে।
ধূসর রঙের একটা শার্ট পড়ে ভার্সিটির জন্য বেরোলো কৃশান। ড্রয়িং রুমে আসতেই সামনে পড়লো ইয়াসমিন বেগম। তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে যেতে নিবে ওমনিই পথ আটকে ধরলেন তিনি। বিরক্তি নিয়ে চাইলো ছেলেটা। বলল,
“ কী চাই? ”
কোনো কথা বললেন না ভদ্রমহিলা। একটা হাজার টাকার নোট ছেলের হাতে গুঁজে দিতে লাগলেন। যতো যাই হোক, টাকা না থাকলে ছেলে তার না খেয়ে থাকবে- যেটা মা হয়ে কখনোই সহ্য করতে পারবেন না তিনি। সন্তান না খেয়ে থাকলে কোনো মায়ের গলা দিয়ে খাবার নামে? তিনি অনুনয় করে বললেন,
“ টাকা টা নিয়ে যা বাবা। ”
“ দরকার নেই। ”
যদিও মন গহীনে রাগের কোনো চিহ্ন টুকুও নেই তবুও মেকি রাগ দেখানোর চেষ্টা চালালো কৃশান। তবে মায়ের অনুনয়ের কাছে সেই রাগ টিকলো না বেশিক্ষণ। হার মেনে নিলো ছেলেটা। অতঃপর টাকা হাতে বেরিয়ে পড়লো ফুরফুরে মেজাজে।
নিত্যদিনের নিয়ম মাফিকই সময় কেটে গেলো। কোলাহল হীন নির্জন রাস্তা। গাড়ির হর্নের শব্দ ব্যাতিত তেমন কোনো আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে না। সকালের ব্যাস্ততা শেষ করে ধরণী তখন ঠাই নিয়েছে দুপুরের হালকা নির্জনতায়।
ভার্সিটি শেষ করে আজ আর বেশিক্ষন আড্ডায় মজে থাকতে পারেনি কৃশান। শরীরটা কেমন টনটন করছে। ভিতরের প্রতিটা রগ যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছে কেউ। মাথার ভিতরে যেন হাতুড়ি পেটানো হচ্ছে। সবকিছু একেবারে অসহ্য লাগছে ছেলেটার। তাই আর না পেরে সব ছেড়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। মিনিট দশেকের মধ্যেই বাড়ির দোর গোড়ায় চলে এলো। বড়ো বড়ো পায়ে মেইন গেইট অতিক্রম করে বাড়িতে প্রবেশ করলো। রুমে গিয়ে কোনোমতে কাধে থাকা ব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো। এতক্ষনে বোধ হয় একটু একটু শান্তি মিললো ছেলেটার।
যোহরের নামাজ শেষ করে আর রুমে যায়নি হুমায়রা। নামজঘর থেকে বেরিয়ে খাবার খেয়ে দুই বান্ধবী সোজা ইকরার রুমে চলে এসেছে। তাদের মাঝখানেই বিছানায় চুপটি করে বসে আছে মিঠু। ছোটো ছোটো লালিত চোখ জোড়া তাদের উপরই নিবদ্ধ। সেই তখন থেকেই আগত পরীক্ষার ব্যাপারে কথা বলে যাচ্ছে দুজন। দু’মাস পড়েই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে তাদের। হুমায়রা বলছে সে নাকি পরীক্ষা দেবেনা। যেখানে ইকরার পরিবারের তরফ থেকে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই সেখানে পরীক্ষা না দেওয়ার মানে কী? এই বিষয়েই তখন থেকে হুমায়রাকে বুঝিয়ে যাচ্ছে ইকরা। অথচ ঘুমে বারবার চোখ লেগে আসছে হুমায়রার। রাতেও ঠিক করে ঘুম হয়নি আবার দুপুরের ঘুমটাও মিস দেওয়ায় চোখ খুলে রাখা দায় হয়ে পড়েছে মেয়েটার জন্য। ইকরা ও ইকরাই! সে নিজের মতো বলেই যাচ্ছে।
হুমায়রা তো তার মামি কে বলেছিলো উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাটা একেবারে দিয়ে নাহয় বিয়েটা দিতে। এতে ইকরার পরিবারও কোনো বাধা দিতো না- তা ভালো করেই জানতো হুমায়রা। তবে রেখা বেগম তার কথার কোনো তোয়াক্কাই করে নি। তিনি তো কোনোমতে হুমায়রাকে বাড়ি থেকে বের করলেই যেন বাঁচে।
এসব নিয়ে এখন আর কোনো আফসোস নেই হুমায়রার। ভাগ্যে যা ছিলো তাই হয়েছে। আবার নতুন করে পড়ালেখা শুরু করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। অথচ সামনে থাকা ব্যাক্তি মানলে তো? উল্টো জেদ ধরে বসেছে হুমায়রা পরীক্ষা না দিলে সেও দিবে না। এক পর্যায়ে মানতে বাধ্য হলো মেয়েটা। বললো সে পরীক্ষা দেবে এখন পরীক্ষার টপিক বাদ দিতে। শুনে বিশ্বজয়ের হাসি ফুটলো ইকরার মুখে। বলল,
“ শুকরিয়া বান্ধবী আমার। এবার তুই ঘুমা। ”
সাথে সাথেই বিছানায় গা এলিয়ে দিলো মেয়েটা। নিজের রুমে যাওযারও প্রয়োজন বোধ করলো না। তার ঘুমন্ত মুখপানে চেয়ে হাসলো ইকরা। পরপর নিজেও শুয়ে পড়লো।
চতুর্দিকে আসরের আযান ধ্বনিত হতেই ঘুম ভাঙলো হুমায়রার। পাশ ফিরে ইকরাকে ডাকলো মৃদু স্বরে। গুনে গুনে তিনটা ডাকের মাথায় গিয়ে সাড়া এলো ইকারার তরফ থেকে।
“ নামাজ পড়বি চল। ”
চোখ খুলে তাকালো ইকরা। পরপর কোনো অলসতা ছাড়াই উঠে পড়লো দুই বান্ধবী। ওয়াশরুম থেকে ওযু সেরে হাঁটা দিলো নামাজঘরের দিক। অতঃপর নামাজ আদায় করে সতেজতা ফিরিয়ে আনলো শরীরে। তারপর নিত্যদিনের মতোই মিঠুকে নিয়ে চললো বাগানের দিক। সেখানে গিয়ে মিঠুকে ঘাস খাওয়ার জন্য ছেড়ে দিলো। সেই ফাঁকে দুজন ফুল গাছে পানি দেওয়ার কাজ শেষ করলো। এভাবেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো। এর মাঝে একবারও রুমে যায়নি হুমায়রা। একেবারে মাগরিবের নামাজ শেষ করে রুমের ভিতরে পা রাখলো সে। বিছানায় কাঁথা মোড়ানো অবস্থায় কৃশানের অবয়ব দেখতেই চারশ আশি ভোল্টের ঝটকা খেলো মেয়েটা। চোখ বড়ো বড়ো করে সেদিকে তাকিয়ে রইলো।
এ বাড়িতে আসার পর আজকে প্রথম দিনের বেলায় কৃশানকে শুয়ে থাকতে দেখলো। এমনিতে তো সারাদিন মাত্র একবার দর্শন পাওয়া যায় তার। তাও কোনোমতে ব্যাগটা রেখে, ফ্রেশ হয়ে আবারও বেরিয়ে পরে। আজকে হঠাৎ কী হলো? শরীর খারাপ করে নি তো মানুষটার? কাল বৃষ্টিতে ভেজার দরুণ জ্বর হলো নাতো?
হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ৭
সব বিশ্ময় ভাব ছুঁড়ে ফেলে ত্রস্ত পায়ে স্বামীর নিকট এগিয়ে গেলো সে। কৃশানের গায়ে হাত রাখতেই আরেকদফা ঝটকা খেলো। জ্বরে পুরো গা জ্বলে যাচ্ছে তার। হুমায়রার যেন মনে হলো কোনো উত্তপ্ত জিনিসে হাত রেখেছে। মুহূর্তেই চোখে, মুখে আতংক ছড়িয়ে পড়লো তার। কখন জ্বর আসলো মানুষটার? এতক্ষন কেন যে রুমে এলো না সে? চিন্তা ও অনুতপ্ততায় ডুবে গেলো রমনী। এখন নিজেকে নিজেরই বকতে মন চাচ্ছে।
