Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৪

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৪

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৪
নওরিন কবির তিশা

প্রভাতের উজ্জ্বল আলোক শিখা ধরিত্রীর বুকে উদ্ভাসিত হতেই শুরু হলো ব্যস্ততা। একাধারে মমতা আর ব্যস্ততার ছাপ।তৃষারা উঠেছে কিছুক্ষণ আগে। নিজের হাত ভাঙা থাকলেও টুইংকেল কে নিয়ে মহাব্যস্ত সে। কিচেনে হামিদা বেগম দ্রুত হাঁতে পরোটা বৈলছেন।
সাবরিনা তার নীল রঙের সালোয়ার কামিজের ওড়না ঠিক করতে করতে ডাইনিংয়ের দিকে ছুটছে, তার কলেজের প্রথম পিরিয়ডটা আজ কোনোভাবেই মিস করা চলবে না। অন্যদিকে মৃত্তিকার স্কুলের বিশেষ বার্ষিক ফাংশন, তাই তার সাজগোজ আর ব্যাগ গোছানোর হুলুস্থুল কান্ডে বাড়ি মাথায় উঠেছে।

আদ্রিয়ান তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলের অবিন্যস্ত সেট ঠিক করতে ব্যস্ত, কারণ তাকেই আজ এই দুই কন্যেকে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে হাসপাতালে ছুটতে হবে তাকে।ঠিক সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে প্রায় নামতে নামতে আছাড় খাওয়ার উপক্রম হলো মেহসানার। তার আলুথালু চুল আর কাঁধের ঝোলানো ব্যাগটাই বলে দিচ্ছে সে কতটা অস্থির। মেহসানাকে দেখেই হামিদা বেগম রান্নাঘর থেকে বড় একখানা পরোটা নিয়ে এগিয়ে এলেন।
—‘ও মা মেহু! এত সকালে কোথায় দৌড় দিচ্ছো? এই যে গরম পরোটা আর ডিম ভাজি রেডি, লক্ষ্মী মেয়ের মতো চট করে খেয়ে নাও তো।
মেহসানা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দ্রুত জুতো পরতে পরতে বলল,
—‘আন্টি! একদম সময় নেই। আমার আজ খুব ইম্পর্ট্যান্ট একটা ক্লাস আছে। তার ওপর কাল যেভাবে হুট করে চলে এসেছি, আমার হোস্টেলের বড় আপু তো নির্ঘাত পুলিশে খবর দেওয়ার জোগাড় করেছে। ওনাকে না বলে আসাটা চরম বোকামি হয়েছে। এখন না গেলেই নয়!
হামিদা বেগম কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন,,

—‘সে কি কথা! খালি পেটে বাড়ি থেকে বের হওয়া আমাদের বংশের নিয়ম নেই। অন্তত এক গ্লাস দুধ খেয়ে যাও মা।
মেহসানা ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করতে করতে মাথা নাড়ল,,
—‘না আন্টি, জাস্ট ইম্পসিবল! এখন রিকশা পেতেও অনেক সময় লাগবে। আমি গেলাম!
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের কোণ থেকে আয়েশ করে কফি পান করতে করতে উদয় হলো আদ্রিয়ান। সে মেহসানার এই ঝড়ো গতিসম্পন্ন প্রস্থান দেখে কৌতুকের সুরে বলল,,
—‘ওহ! মিস মিমি তো দেখছি আজ অলিম্পিক দৌড়বিদের ট্রেনিং নিচ্ছেন। তা এভাবে না খেয়ে দৌড়ালে মাঝপথে যে আপনার ওই হাই-ভলিউম ইঞ্জিনটা বন্ধ হয়ে যাবে না, তার গ্যারান্টি কী?
মেহসানা আদ্রিয়ানের দিকে অগ্নিদৃষ্টি হেনে বলল,,

—‘মিস্টার সার্জেন্ট, আপনার এই ফালতু জোকস শোনার সময় আমার নেই। আমি রিকশা পাব কি না তাই নিয়ে টেনশনে আছি, আর আপনি কফি গিলছেন!
আদ্রিয়ান কফির মগটা টিপয়ে রেখে মেহসানার একদম সামনে এসে দাঁড়াল। সে পকেট থেকে গাড়ির চাবিটা বের করে আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে বেশ রসিকতার স্বরে বলল,,
—‘আরে বাবা, এত প্যানিক করার কী আছে? আপনার ওই হোস্টেলের বড় আপু তো আর আপনাকে ফাঁসি দেবে না। আর রিকশার কথা ভুলে যান, এই জ্যামের শহরে রিকশা দিয়ে ক্লাস ধরা মানে হচ্ছে ক্লাস শেষের পর কলেজে পৌঁছানো। মাদার ইন্ডিয়া যখন বলছে খেতে, তখন খেয়ে নিন। আমিই আপনাকে ড্রপ করে দেব।
মেহসানা এক মুহূর্ত থমকে গেল। আদ্রিয়ানের এই অযাচিত সাহায্যের প্রস্তাব তার কাছে কিছুটা অবিশ্বাস্য ঠেকল। সে সন্দিহান দৃষ্টিতে আড়চোখে আদ্রিয়ানকে নিরক্ষণ করে বলল,

—‘আপনি ড্রপ করবেন? মানে… কেন? আপনার তো আবার হসপিটালে আছে।দেরি হয়ে যাবে না?
আদ্রিয়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবলীলায় বলল,,
—‘দেরি তো হবেই। কিন্তু আপনার ওই মেজাজি হোস্টেল আপুর বকা খাওয়ার চেয়ে আমার অফিসের লেট মার্ক অনেক বেশি সেফ। তার ওপর আপনি যদি রাস্তায় ক্ষুধার চোটে জ্ঞান হারান, তবে রিকশাচালক তো ভয়ে দেশ ছেড়ে পালাবে। তাই দয়া করে এই অধমের গাড়িতে বসুন এবং মাদার ইন্ডিয়ার হাতে বানানো পরোটাটা অন্তত ব্যাগে ভরে নিন।
হামিদা বেগম হেসে উঠে মেহসানার হাতে একটা টিফিন বক্স গুঁজে দিলেন। মেহসানা আর না বলতে পারল না। আদ্রিয়ানের এই অদ্ভুত ধরনের যত্ন আর আড্ডার মেজাজ তাকে এক প্রকার শান্ত করল।মেহসানা বক্সটা ব্যাগে রাখতে রাখতে আদ্রিয়ানকে খোঁচা দিয়ে বলল,,
—‘ঠিক আছে। তবে গাড়িতে কিন্তু আপনার ওই অদ্ভুত গানগুলো বাজাতে পারবেন না। আমার মাথা এমনিতেই হ্যাং হয়ে আছে।
আদ্রিয়ান হাসতে হাসতে সদর দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বলল,,

—‘গাড়ি আমার, গানও আমার হবে মিস মিমি। তবে আপনার জন্য আজ স্পেশাল কোনো মেলোডি বাজানো যেতে পারে, যাতে আপনার ওই গম্ভীর হোস্টেল আপুর মুখটা মনে পড়লে অন্তত ভয় না লাগে! জলদি আসুন!
মৃত্তিকা আর সাবরিনা পেছন থেকে সমস্বরে চিল চিৎকার করে উঠল, —‘ভাইয়া, আমাদেরও কিন্তু দেরি হচ্ছে!
আদ্রিয়ান আঙ্গুলের চাবির রিং ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,,—‘আয় তোরাও আয়। ঘাড়ে চেপে বস আমার আয়।
সাবরিনা মুখ ভাঙ্গিয়ে বলল,,—‘তোমার মত বাঁদরের ঘাড়ে ঝোলার কোন ইচ্ছা নেই যাও তুমি যাও।
আদ্রিয়ান নির্বিকার ভঙ্গিমায় সম্মুখপানে এগিয়ে যেতে বলল,,—‘তোর মতন ব্রেন লেস গাধাকেও গাড়িতে নেওয়ার আমার কোন ইচ্ছে নেই যা দূর হ।
সাবরিনা ক্রোধিত হস্তে সোফায় পড়ে থাকা কুশনটা হাতে তুলে আদ্রিয়ানের দিকে ছুঁড়ে মারল। তবে ততক্ষণে আদ্রিয়ান বেরিয়ে গিয়েছে।

পিচঢালা রাস্তার ওপর আদ্রিয়ানের সাদা রঙের সেডান গাড়িটি মসৃণ গতিতে ছুটছে। আদ্রিয়ান যেমন দিলখোলা ভাবে গাড়ি চালাচ্ছে সে তুলনায় মেহসানার অবস্থা একেবারে ভিন্ন। সে আড়ষ্ট হয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, আর মাঝেমধ্যেই ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাচ্ছে। তার অস্থিরতা আদ্রিয়ানের তীক্ষ্ণ নজর এড়াল না।
আদ্রিয়ান এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতে মিউজিক প্লেয়ারের ভলিউমটা সামান্য বাড়িয়ে দিল। হঠাৎই গাড়ির স্পিকারে বেজে উঠল কিশোর কুমারের সেই কালজয়ী গান
🎶ও মেরে দিল কে চ্যয়েন…🎶
মেহসানা ভ্রু কুঁচকে আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বিরক্তিসূচক কন্ঠে বলল,,

—“মিস্টার সার্জেন্ট, আমি কি আপনাকে বলিনি অদ্ভুত সব গান বাজাবেন না? আমার অলরেডি লেট হয়ে যাচ্ছে, আর আপনি এই বিরহের গান ছেড়ে বসে আছেন?
আদ্রিয়ান গানটা একটুও না কমিয়ে বরং ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে বলল,
—“মিস মিমি, আপনার টেস্ট তো দেখছি একদম পাড়া-গাঁয়ের নব্য শিক্ষিতদের মতো। কিশোর কুমারের গানকে আপনি অদ্ভুত বলছেন? এই গানটা আপনার ওই টগবগে মেজাজটাকে কুল করার জন্য থেরাপি হিসেবে কাজ করবে। জাস্ট রিলেক্স অ্যান্ড এনজয়!
মেহসানা গাল ফুলিয়ে জানালার বাইরে মুখ ফিরিয়ে নিল। কিন্তু মিনিট খানেক যেতে না যেতেই সে লক্ষ্য করল, আদ্রিয়ানের ড্রাইভ করার ধরনটা বেশ সাবলীল। সে জ্যামের ফাঁকফোকর দিয়ে এমনভাবে গাড়ি বের করছে যে মেহসানার মনে হলো সে সত্যিই সময়মতো পৌঁছে যাবে।আদ্রিয়ান হঠাৎ আড়চোখে মেহসানার লাল হয়ে থাকা নাকটার দিকে তাকিয়ে বলল,

—‘আচ্ছা মিস মিমি, আপনার হোস্টেল আপু কি সত্যিই অতটা ডেঞ্জারাস? মানে ওনাকে দেখলে কি মানুষ ভয়ে পাথর হয়ে যায়? আপনার অবস্থা দেখে তো মনে হচ্ছে আপনি কোনো ড্রাগনের গুহায় ফিরছেন।
মেহসানা মুখ ঘুরিয়ে জবাব দিল,,
—‘উনি ড্রাগন না হলেও তার চেয়ে কম নন। নিয়ম আর ডিসিপ্লিনের বিষয়ে একদম আপনার আর্য ভাইয়ের ফিমেল ভার্সন। রাত বারোটার পর আমার রুমে লাইট জ্বললে উনি পুরো এক সপ্তাহ আমাকে করিডোরে দাঁড় করিয়ে রাখতে পারেন। এবার বুঝুন!
আদ্রিয়ান চোখে জলদি পাশ থেকে একটা পানির পট তুলে মেহসানার দিকে এগিয়ে দিয়ে নরম গলায় বলল,
—‘এই যে লিজেন্ডারি মিমি, পানিটা খেয়ে নিন। আর ওই ড্রাগন আপুকে বলবেন, আপনার গাড়ির চাকা পাংচার হয়েছিল আর মাঝপথে একজন হ্যান্ডসাম সার্জেন্ট আপনাকে রেসকিউ করেছে। আমার নাম বললে হয়তো উনি আপনার ওপর একটু দয়া করবেন।
মেহসানা পানিটা হাতে নিয়ে বিড়বিড় করল,
—‘সুদর্শন সার্জেন্ট! সেলফ-প্রেইজ তো আপনি ভালোই করেন। আর আপনার নাম বললে উনি তো আমাকে আরও আগে বের করে দেবেন। ভাববেন কোনো বেডার সাথে রাতভর আড্ডা দিয়েছি!
আদ্রিয়ান মিটিমিটি হেসে বলল,.

—‘নট বেডা সে ডক্টর। আই এম এ ডক্টর বাই প্রফেশন, অ্যান্ড এ সার্জেন্ট বাই নেচার। হসপিটালের সার্জারি টেবিলে যেমন আমি সিরিয়াস, এই স্টিয়ারিং হুইলেও আমি তেমনই প্রো। সো, জাস্ট ট্রাস্ট মি।
গাড়িটা যখন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে থামল, আদ্রিয়ান হঠাৎ মেহসানার দিকে ঝুঁকে এল। মেহসানা চমকে গিয়ে সিটের সাথে লেপ্টে গেল। আদ্রিয়ান তার কাঁধের বেল্টটা একটু ঢিলে করে দিয়ে বলল,
—‘এত ভয় পাবেন না। আমি জাস্ট বেল্টটা ঠিক করে দিচ্ছিলাম, আপনার গলায় ওটা চেপে বসছিল। আর হ্যাঁ, ওই ড্রাগন আপু যদি বেশি ঝামেলা করে, তবে আমাকে একটা কল দেবেন। আমি গিয়ে ওনাকে বুঝিয়ে আসব যে আপনি আমার খুব… মানে আমাদের তৃষা ভাবির বেস্ট ফ্রেন্ড।
মেহসানা আদ্রিয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবল অতঃপর গাড়ি থেকে নেমে শান্ত স্বরে বলল,,
—‘ধন্যবাদ। ভাড়াটা কিন্তু আমি কালই শোধ করে দেব।
আদ্রিয়ান গাড়ি স্টার্ট দিয়ে গুনগুন করে গানের সাথে তাল মিলিয়ে বলল,
—‘রিকশা ভাড়া, তেলের দাম আর আমার এই অমূল্য সাহচর্য—সব কিছুর সুদ কিন্তু একসাথে নেওয়া হবে মিস মিমি। রেডি থাকবেনা
মেহসানা কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই আদ্রিয়ান মৃদু হেসে গাড়ি স্টার্ট দিল ধীরে ধীরে সেটি মিলিয়ে গেল হাজারটা গাড়ির ভিড়ে। মেহেসানা আর দাঁড়ালো ন। চটজলদি ব্যাগটা ভালো করে কাঁধে তুলেই ছুট লাগালো হোস্টেলের দিকে।

তপ্ত দ্বিপ্রহর আজ সুখনীড়কে এক নিস্তব্ধ মায়াপুীরতে পরিণত করেছে। জানালার পর্দাগুলো ‌ঝিরিঝিরি বাতাসে দুলছে রোদ্দুরের লুকোচুরি সেথায়,হামিদা বেগমদের অনুপস্থিতিতে খাঁ খাঁ করছে প্রাঙ্গণ। টুইংকেলের ঘুমের আবহে পুরো বাড়ি যেন এক গভীর মৌনতায় নিমগ্ন, যেখানে কেবল দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দই নিথর সময়ের জানান দিচ্ছে। এই নির্জন দুপুরে শ্রান্ত তৃষা এখন ধীর পায়ে গোসলখানার স্নিগ্ধতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
বড্ড বড় ভুল হয়েছে তার অবশ্য ভুলের জন্য নিজেকে কতটা দায়ী করা দরকার সেটা অনুমান শক্তির বাইরে তৃষার কেননা হামিদা বেগম মৃত্তিকার সাথে বার্ষিক ক্রিড়া প্রতিযোগিতায় গিয়েছেন, আরে যাওয়াটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাবরিনা তো সেই সকালেই কলেজে গিয়েছে আর মেহেসানার তো তার সাথে দেখা করারও ফুসরত মেলেনি।
কালতো মেহেসানার সহায়যোগিতায় কোনমতে গোসলটা সেরেছিল সে কিন্তু আজকে কি হবে? তার উপর সকালবেলায় হামিদা বেগম চুপ চুপ করে তেল মালিশ করেছে তার মাথায়। এখন শ্যাম্পু না করতে পারলে সারাদিন অস্বস্তি লাগবে তার। এগুলো ভাবতে ভাবতেই গোসলখানায় প্রবেশ করলো তৃষা।
নিস্তব্ধ এই দ্বিপ্রহরে বাথরুমের শ্বেতপাথরের মেঝেতে পানির ঝিরঝির শব্দ এক অন্যরকম মা’দ’কতা তৈরি করছে। তৃষা অনেকক্ষণ ধরে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিল গোসলটা করবে কি না, কিন্তু মাথার চটচটে তেলের অস্বস্তি তাকে শেষমেশ শাওয়ারের নিচেই টেনে এনেছে। তার ডান হাতটি প্লাস্টিক দিয়ে মোড়ানো থাকলেও নড়াচড়া করাটা দুঃসাধ্য। সে কোনোমতে বাম হাত দিয়ে কামিজের বোতামগুলো খোলার চেষ্টা করছে, কিন্তু বারবার পিছলে যাচ্ছে ভিজে যাওয়া আঙুলগুলো।

শাওয়ারের ঝাপটা সরাসরি তার গায়ে পড়তেই আকাশী রঙের পাতলা কামিজটি শরীরের সাথে লেপ্টে গেল। পানির প্রতিটি কণা যেন তৃষার অবয়বকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
আর্য কিছু ফাইল নিতে ড্রয়িংরুমে এসেছিল, কিন্তু বাথরুম থেকে আসা পানির তোড় আর এক অদ্ভুত শব্দ শুনে তার কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। সে ভাবল তৃষা হয়তো আবার কোনো বিপদ ঘটিয়েছে। আর্য দ্রুত পায়ে তৃষার রুমের অ্যাটাচড বাথরুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। সে বেশ কয়েকবার নক করে গম্ভীর স্বরে ডাকল,,
—‘তৃষা? আর ইউ ওকে? ভেতরে অমন শব্দ হলো কেন?
তৃষা শাওয়ারের শব্দের কারণে ঠিকমতো শুনতে পায়নি। সে তখন নিজের ভিজে যাওয়া ওড়নাটা এক হাত দিয়ে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। আর্য উত্তর না পেয়ে কিছুটা শঙ্কিত হলো। সে দরজার নবটা ঘোরানোর চেষ্টা করতেই দেখল ওটা ঠিকমতো লক হয়নি। সামান্য চাপ দিতেই পাল্লাটা নিঃশব্দে খুলে গেল।
ভেতরে প্রবেশ করতেই আর্যর চোখের সামনে যেন এক অপার্থিব দৃশ্য উন্মোচিত হলো। শাওয়ারের রুপোলি পানির নিচে দাঁড়িয়ে আছে এক মায়াবী জলপরী। তৃষার ভিজে যাওয়া কামিজ তার শরীরের ভাঁজগুলোকে এক অদ্ভুত শৈল্পিক রূপ দিয়েছে। ভেজা চুলগুলো পিঠ বেয়ে কোমর পর্যন্ত নেমে এসেছে,যেখান থেকে মুক্তার দানার ন্যায় ঝরছে পানিরধারা।
তৃষা আর্যকে দেখতেই বিস্ফোরিত নয়নে তাকিয়ে রইল। থরথরিয়ে কেঁপে উঠল কায়া।তার হাত থেকে সাবানটা ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল। আর্যর মস্তিষ্ক মুহূর্তের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। তার সেই পেশাদারী চোখের মণিগুলো আজ এক অদ্ভুত অনুভূতির তাড়নায় স্থির হয়ে রইল। তৃষা অপ্রস্তুত হয়ে তড়িঘড়ি করে উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়াল।
আর্য মুহূর্তেই হিতাহিত জ্ঞান ফিরে পেয়ে দ্রুত পিছন ফিরে দাঁড়াল। তার বুকটা তখন অবাধ্যভাবে ধুকপুক করছে। সে কাঁপাকাঁপা স্বরে বলল,

—‘আই এম এক্সট্রিমলি সরি! আমি… আমি আসলে শব্দ শুনে প্যানিকড হয়ে গিয়েছিলাম। দরজাটা লক ছিল না… আই থট সামথিং ইজ রং।
তৃষা তখনও কাঁপছিল। সে বাম হাত দিয়ে নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করতে গিয়েই বিপত্তিটা ঘটল। মেঝের ওপর পড়ে থাকা পিচ্ছিল সাবান আর পানির স্রোতে তার ভারসাম্য হারালো। তৃষা চিৎকার করার সুযোগ পাওয়ার আগেই সজোরে পিছলে গেল।
—‘আআহ্!

আর্তনাদ সূচক শব্দটা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই আর্য তক্ষনাৎ জলদি পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল নীতি-নৈতিকতার সব দেওয়াল ভেঙে মুহূর্তেই তৃষাকে আগলে ধরল। তৃষা পড়ার ঠিক আগ-মুহূর্তে আর্যর বলিষ্ঠ দুই বাহুর বন্ধনে নিজেকে আবিষ্কার করল। আর্যর সাদা শার্টটা তৃষার ভেজা শরীরের সংস্পর্শে মুহূর্তেই ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে।
আর্য তৃষাকে একদম বুকের কাছে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে ধমকের সুরে বলল,
—‘আপনার এই ক্লামজি বিহেভিয়ার কি কোনোদিন থামবে না? এক হাত অকেজো নিয়ে একা গোসল করতে আসার মানে কী? আপনি কি সত্যিই নিজেকে সুপারওম্যান ভাবেন নাকি স্রেফ আমাকে পাগল করার শপথ নিয়েছেন?
তৃষা আর্যর বুকের ধুকপুকানি স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে। আর্যর গায়ের সেই কাষ্ঠল পারফিউমের সুবাস আর পানির স্নিগ্ধতা মিলে এক অদ্ভুত রসায়ন তৈরি করেছে। সে আর্যর দিকে তাকাতেই দেখল আর্যর চোখে কি যেন মিশে আছে,আর তার কপাল বেয়ে জল ঝরছে তৃষার ওপর।
তৃষা কুন্ঠিত কন্ঠে ম্লান স্বরে বলল,

—‘আমি তো জানতাম না আপনি এ সময়ে বাড়িতে আসবেন। আর আমার চুলগুলো খুব চটচট করছিল…
আর্য তৃষাকে খুব সাবধানে ছেড়ে দিয়ে তাকে বাথরুমের ছোট টুলটার ওপর বসিয়ে দিল। সে জানে এই অবস্থায় তৃষাকে একা ফেলে যাওয়া মানেই বড় কোনো দুর্ঘটনা। সে শাওয়ারের নবটা কমিয়ে দিয়ে ধীরস্থির পায়ে এগিয়ে এল,,
—‘লুক এট মি, তৃষা। দেয়ার ইজ নাথিং টু বি এ্যামব্যারাসড। আপনার এই জেদটা কমাতে হলে আমাকেই ইনভলভ হতে হবে। আপনি জাস্ট চোখ বন্ধ করে বসে থাকুন।
তৃষা থতমত খেয়ে বলল,,

—‘আপনি কী করছেন?
আর্য কোনো উত্তর না দিয়ে সেলফ থেকে শ্যাম্পুর বোতলটা হাতে নিল। সে অত্যন্ত কোমলতার সাথে তৃষার ভেজা চুলে শ্যাম্পু মাখাতে শুরু করল। আর্যর দীর্ঘ আঙুলগুলো যখন তৃষার মাথার তালুতে আলতো করে মেসেজ করছিল, তৃষার মনে হলো তার শরীরের সমস্ত ব্যথা এক নিমিষে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আর্যর মতো একজন রাশভারী ক্যাপ্টেন আজ তার চুলের সেবা করছে ভাবতেই তৃষার ক্ষীণ কায়ায় এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল।সে স্পষ্ট টের পাচ্ছে হৃদযন্ত্রের অস্থির নৃত্য।
আর্য অত্যন্ত সন্তর্পণে তৃষার চুলে লেগে থাকা শ্যাম্পুর শেষ অংশটুকু ধুয়ে দিয়ে শাওয়ারের নবটা ঘুরিয়ে দিল।ও শ্যাম্পুর ফেনাগুলো ধুয়ে দেওয়ার সময় ভীষণ সতর্ক ছিল যাতে তৃষার ব্যান্ডেজ করা হাতটি না ভিজে। তবে জলধার থামতেই মুহূর্তেই সেই ঝিরঝির শব্দ থেমে গিয়ে এক গভীর নিস্তব্ধতা নেমে এল, যেখানে কেবল দুজনের নিশ্বাসের শব্দই প্রধান। সে তোয়ালের এক প্রান্ত দিয়ে তৃষার মুখটা মুছে দিয়ে শান্ত স্বরে বলল,,

—‘আই নো ইটস্ বিট অকওয়ার্ড ফর ইউ।বাট আই হ্যাভ নোট আদর ওয়েজ।সো,ডোনট টেক ইট আদারওয়াইজ। তবে নেক্সট টাইম এমন পাগলামি করার আগে অন্তত আমাকে একটা ইনফর্ম করবেন। ইজ দ্যাট ক্লিয়ার?
তৃষা চোখ মেলে আর্যর ভিজে যাওয়া শার্টটার দিকে তাকাল। আর্যর সুঠাম দেহের পেশিগুলো সেই ভিজে কাপড়ের নিচে খেলা করছে। সে নিচু স্বরে বলল,

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৩

—‘থ্যাঙ্ক ইউ। বাট আপনার শার্টটা পুরো ভিজে গেছে আমার জন্য।
আর্য তৃষার দিকে না চেয়ে মৃদু স্বরে বলল,,
—‘শার্ট শুকিয়ে যাবে তৃষা, কিন্তু আপনার কোনো ক্ষতি হলে আমার ওই ড্যামেজ কন্ট্রোল করা কঠিন হবে। এখন চটপট বেরোন, ঠাণ্ডা লেগে যাবে।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ১৫