কিশোরী কন্যা পর্ব ২৭
হামিদা আক্তার ইভা
সুতিপাড়া গ্রামটা একটু ভেতর মুখো বললে ভুল হবে না।গ্রামটা ভেতর মুখো বলেই হয়তো গ্রামের কালো আঁধারে ঢাকা অনৈ’তিক কাজ গুলো কারোর চোখে পড়ে না।কাজ গুলো এমন ভাবে করা হয় যেন কারোর নজরেই না আসে।কিংবা চোখের সামনে দিয়েই কাজ চালিয়ে গেলেও কেউ ধরতে পারে না।গোয়েন্দা বিভাগের ৭জন কাজ করছে সুতিপাড়া গ্রাম নিয়ে।গত একমাসে ৩টা কেস সমাধান হয়েছে।
সুতিপাড়া গ্রামের বাতাসেও যেন এক ধরনের অজানা ভয় মিশে যাচ্ছে দিন-দিন।দিনের বেলায় চারদিক যতই শান্ত দেখাক,রাত নামলেই গ্রামটা বদলে যায়।গোয়েন্দা বিভাগের সাতজন সদস্য ছদ্মবেশে আছে গ্রামজুড়ে।এক একজন এক এক ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।এদের কেউই কাউকে চেনে বলে মনে হয় না।কিন্তু প্রতিদিন রাতে একই বাড়ির সামনে এসে ফাইল মিলিয়ে যায়।গত এক মাসে তিনটি কেস সমাধান হলেও সবচেয়ে বড় রহস্য এখনো অমীমাংসিত।ইতোমধ্যে গত ৪ মাসে তিন কিশোরীর নিখোঁজ হওয়া,তারপর দক্ষিণ পাড়ার বড় নদীর পাড়ে থেকে পাওয়া অর্ধেক পো’ড়া ওড়না—সবই যেন ইঙ্গিত দিচ্ছে আসল অপরাধী এখনো ছাঁয়ার মধ্যে।
গোয়েন্দা বাহিনীর প্রধান আজ গ্রামের উত্তর প্রান্তের শিমুলতলায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
“যে-ই হোক, আ’গুন দিয়ে প্রমাণ মুছতে চেয়েছে।”
তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা তরুণ গোয়েন্দা অরিন্দম বলল,
“স্যার,লোকজন ভয় পাচ্ছে।বলে রাত হলেই কিছু একটা মাঠের দিকে হাঁটে।মানুষের মতো আবার মানুষের মতো নয়।”
অফিসার ঠোঁট চেপে ধরে চারদিক দেখলেন।
হাওয়া আজ অতিরিক্ত ঠান্ডা,শীতের জন্য নয়, অজানা আতঙ্কের জন্য।অদ্ভুত হাঁটার শব্দ,হঠাৎ গৃহপালিত পশুর চিৎকার,নদীর দিকে জোছনায় কিছু ছাঁয়া সব কথাই যেন জট পাকানো ধাঁধার মতো।এদিকে দূরের মাথাভাঙা নদীর কাছে
তিনি বিরক্ত হয়ে হাতের ঘড়ি দেখে বললেন,
“নওমান দিন-দিন কেয়ারলেস হয়ে যাচ্ছে।ওরা দুই ভাই একটা কাজও সময় মতো করে না।”
অরিন্দম বলল,
“নওমান একটু ব্যস্ত স্যার।”
“আগে ডিউটি করতে হবে তারপর সব কিছু।একজন SB অফার হয়েছে এত হেয়ালি করলে চলে না।যাক,ওয়াহিদের কী খবর?কাজ করছে ঠিক মতো?”
“জি স্যার।তিনি তার কাজ ঠিক মতোই করছেন।উনার জন্যই লাস্ট কেসটা তাড়াতাড়ি সমাধান করতে পেরেছি।”
“গুড।” অফিসার ইমতিয়াজ চোখ সরু করে সামনে তাকালেন।ঠিক তখনই শিমুলতলার বাঁ দিকের সরু পথ ধরে ধীর পায়ে একটি ছাঁয়া এগিয়ে এলো।অরিন্দম হালকা ঘাড় উঁচু করে বলল,
“স্যার,মনে হচ্ছে নওমান।”
অফিসার বিরক্ত মুখে মোচড় দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
মিনিট দুয়েক পর নওমান এসে দাঁড়াল দুই অফিসারের সামনে।হাতে ধুলো,শার্টের কলার বেঁকে গেছে,মাথার চুল এলোমেলো।
“স্যার! দেরি হয়ে গেছে জানি।” নওমান কপাল মুছল।
অফিসার ঠাণ্ডা গলায় বললেন,
“কাজের সময় কাজ করবে।ব্যস্ততা দেখানোর কোনো দরকার নেই।”
“স্যার, ব্যস্ততা দেখাইনি। সত্যিই জরুরি ছিল।”
অরিন্দম ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কীসের জরুরি?”
নওমান ঠোঁট টিপে বলল,
“স্বপ্নে হবু বউয়ের সাথে ঘুরতে গিয়েছিলাম অরিন্দম।তোমার ভাবি ভীষণ দুষ্টু,ছাড়তেই চাচ্ছিল না আমাকে।”
অরিন্দম ভোঁতা মুখে নাক ছিঁটকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিল।অফিসার বিরক্ত হয়ে বললেন,
“তোমার নাটক বন্ধ করো।গ্রামের খবর রাখো নাকি সারাদিন বউ বউ করতেই দিন যায়?”
“আপনাকে কত করে বলেছি আমাকে বিয়ের পারমিশনটা দিয়ে দিন।বিয়ে করে ফেললে কী আর বউয়ের জন্য এত পরাণ কাঁদবে,বলুন তো?”
“ফালতু কথা ছাড়ো।সেইদিন গোডাউন থেকে যেই লোকটাকে ধরলে,তাকে আ’ঘাত করেছো কেন?লোকটা এখন কথাই বলতে পারছে না।”
“কথা বলতে এমনিতেও পারে না।এমন হতচ্ছাড়া কাজে কে রাখে উপর ওয়ালা ভালো জানেন।”
নওমানের এহেন খাম-খেয়ালি কথা-বার্তা শুনে অফার দাঁত চাপলেন।
“আর একটা বাজে কথা বললে তোমার চাকরি খাব আমি।”
নওমান সিরিয়াস হলো।সঙ্গে সঙ্গে ঘাড় নিচু করল।কিছুক্ষণ আগে যেই চঞ্চলতা,ঢং-ঢং করে কথা বলা-তা মিলিয়ে গেল।শিমুলতলায় বাতাস হঠাৎ থেমে গেল বলে মনে হলো।অফিসার গম্ভীর গলায় বললেন,
“এখন যা পেয়েছ,ওটা তোমার শেষ সুযোগ ধরে নাও।আর কোনো ভুল চাই না।এক চুল এদিক-ওদিক করা চলবে না!বুঝলে?”
নওমান মাথা নাড়ল।
“জি স্যার।”
অরিন্দম ব্যাগ খুলে একটা ছোট খাম বের করল।
“স্যার,রিপোর্টটা এসেছে।”
নওমান ঘাড় তুলে জিজ্ঞেস করল,
“কার রিপোর্ট এটা?যে মেয়েটা গত বছর নিখোঁজ হয়েছিল, সেই মেয়েটার?”
অরিন্দম নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“হ্যাঁ।ফরেনসিকে তারই চুলের কণা মিলেছে।কিন্তু সমস্যা হলো ওড়নাটা ইচ্ছা করে পো’ড়ানো হয়েছে।৫০% এর বেশি ডিটেইলস নষ্ট।”
অফিসার চোখ বন্ধ করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইলেন।মেয়েটার বয়স আনমানিক ১৬-১৭ হবে।সুতিপাড়া গ্রামের এক গরিব বাবার কন্যা সন্তান।প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল মেয়েটা হয়তো কারোর হাত ধরে গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছে।কিন্তু আস্তে আস্তে একই কাহিনী ঘটায় ঘটনা সন্দেহজনক হয়ে ওঠে।মেয়েটার নাম বন্যা।বন্যা নিখোঁজ হওয়ার পর তার পুড়ে যাওয়া ব’ডি মিলেছেল প্রায় দু’মাস পর।গ্রামে তখন হইহুল্লোড় লেগে গিয়েছিল সেই মেয়ের পু’ড়ে যাওয়া ব’ডি দেখে।
অফিসার গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে চোখ খুললেন।
তিনি নিচু গলায় বললেন,
“বন্যার কেসটা যেভাবে শেষ হয়েছে সেটা দেখেই বুঝেছিলাম এর পেছনে কারোর বড় হাত আছে।শুধু যে এই তিনজন মেয়েই নিখোঁজ হয়েছে তা নয়।এর আগেও গত ৯ বছরে কম হলেও ২০০-৩০০ মেয়ে নিখোঁ’জ হয়েছে।”
অরিন্দম বলল,
“স্যার,বন্যার মৃ’ত্যু’টা অ্যাক্সি’ডেন্ট ছিল না,তাই তো?”
অফিসার তীব্র চোখে তাকালেন,
“একটা ১৬ বছরের মেয়ের পুরো শ রীর পো ড়া অবস্থায় নদীর পাড়ে পড়ে থাকা কখনোই অ্যাক্সি’ডেন্ট হতে পারে না।বোকার মতো কথা বলবে না।”
নওমান গম্ভীর গলায় বলল,
“বন্যার পরিবারের সাথে আমার কথা হয়েছে।মেয়েটার বাবা মা’রা গেছে কয়েক মাস আগে।ওর মা জানিয়েছেন বন্যা ইচ্ছে করেই নিজের শরীরে…”
অফিসার থামিয়ে দিলেন।
“লোকজন ভয়ে ঝামেলায় যেতে চায় না।তারা যা দেখে তার অর্ধেকই বলে,আর যা বোঝে তার কিছুই মুখে আনে না।”
চারদিকে অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে এলো।
দূরে শিমুল গাছের পাতায় হাওয়ার মৃদু শব্দ শোনা যাচ্ছিল।নওমান ঠোঁট চেপে খানিকক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“আমার সিক্স সেন্স বলছে এই কাজটা এই গ্রামেরই কোনো প্রভাবশালী লোকের।”
অফিসার এবার কোনো উত্তর দিলেন না।
নিঃশব্দে পকেট থেকে গ্লাভস পরলেন,তারপর অরিন্দমের হাতে থাকা খামটা নিয়ে আবার পড়লেন।তার গলা কঠিন হয়ে উঠল।
“কারও কারও রুচি খুব অদ্ভুত।এ ধরনের অপরাধী সাধারণ অপরাধী নয়।মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি থাকে, আবার ক্ষমতা থাকে।এমন কেউ,যে গ্রামের লোকদের এতটাই চেনে যে চারদিকে চোখ রেখেও কেউ তাকে দেখে না।”
অরিন্দম কণ্ঠ নামিয়ে বলল,
“স্যার,কারও নাম সন্দেহে আছে?”
অফিসার ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।তার চোখে এক ধরনের শীতল নিশ্চয়তা।
“হ্যাঁ!একজন আছে।”
নওমান ও অরিন্দম দু’জনেই সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“কিন্তু..” অফিসার থেমে গেলেন।
“প্রমাণ ছাড়া বললে গ্রামের অর্ধেক মানুষই আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।”
নওমান গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“তার নামটা বলুন স্যার।”
অফিসার হালকা হাসলেন।হাসিটা ভয়ের মতো শোনাল।
“নাম তো বলবই।কিন্তু তার আগে তোমরা কিছু দেখবে।”
তিনি ধীরে পকেট থেকে একটা ছোট সাদা কাগজ বের করলেন, খুলে দেখালেন।কাগজটিতে আঁকা।একটা অদ্ভুত প্রতীক।তিন রকম আঁকাবাঁকা চিহ্ন
আর মাঝখানে লাল কালির দাগ।অরিন্দম বিস্ময়ে বলল,
“স্যার,এটা কি সেই চিহ্ন? যেটা বন্যার ব’ডির পাশে পাওয়া গিয়েছিল?”
অফিসার মাথা নাড়লেন।ধীরে বললেন,
“বন্যার নয়,এটা আরো দুই মৃ’ত দেহের পাশে পাওয়া গিয়েছিল।যাদের কথা স্বাভাবিক মৃ ত্যু বলে চাপা দেয়া হয়েছিল।”
নওমান হকচকিয়ে গেল।
“মানে?”
অফিসার ঠাণ্ডা কণ্ঠে বললেন,
“মানে, সুতিপাড়ায় সিরিয়াল অপরাধ শুরু হয়েছে অনেক আগেই। শুধু কেউ জানত না।”
তখন চারপাশে ভরদুপুর।তাহসিন অন্যমনস্ক হয়ে সওদাগর বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকছিল।হঠাৎ বাড়ির বাগান পেরিয়ে পুতুল দৌঁড়ে এলো বাবার নিকটে।তাহসিন হাত বাড়িয়ে মেয়েকে কোলে তুলে নিতেই পুতুল বাবার গালে ছোট্ট চুমু খেয়ে বলল,
“বাবা,জানো আজ কী হয়েছে?”
বাবাকে কিছু বলতে না দিয়েই সে বাবার কানে কানে বলল,
“মা আজ বড় ফুপিকে থাপ্পড় মেরেছে।”
তাহসিন মেয়ের কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে বলল,
“কনককে তোমার মা মেরেছে?”
“হ্যা।”
“কেন?”
“মায়ের সাথে ফুপি চিৎকার করছিল তো।ফুপি প্রথমে মাকে গালি দিয়েছে,তারপর মা ফুপিকে মেরেছে।”
তাহসিন ব্যস্ত হয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।বাড়ি ভর্তি মানুষ।সে চোখ ঘুরিয়ে ময়ূরীকে খুঁজল।ময়ূরী গিন্নিদের মতো রান্না ঘরের সামনে কিছু একটা করছে।তাহসিন এগিয়ে গেল নিকটে।সে সেখানে উপস্থিত হতেই রান্না ঘরের ভেতর থেকে আফিয়া ঠোঁট টিপে বলল,
“এসে গেছে আমার দেবর বাবু।বউয়ের আঁচল এখন ছাড়বে না সে।”
কিছু মানুষ হেসে ফেলল আফিয়ার কথা শুনে।ময়ূরী একটু লজ্জা পেল।তাহসিন গম্ভীর হয়ে ময়ূরীর হাত আঁকড়ে ধরতেই মেয়েটা চমকে উঠল।
“করছেন কী?”
“ঘরে আসো একটু।”
“আমার কাজ আছে এখানে।দাদি দেখলে ভীষণ বকবেন।”
“রাখো তোমার কাজ।আগে জামাই তারপর সব কিছু।”
তাহসিনের গলার স্বর এতটাই উচ্চস্বর ছিল যে সেখানে সবাই শব্দ করে হেসে উঠল।অনেক বড়রাও ছিলেন সেখানে।ময়ূরী লাজে আঁচল চাপল মুখে।ভেতর থেকে অরুণিমা বেগম ধমক দিয়ে বললেন,
“বেহায়াপোনা ছাড়ো।ময়ূরীর কাজ আছে এখানে।তুমি ঘরে যাও।”
মায়ের ধমক খেয়ে তাহসিনের কিছুই হলো না।আফিয়ার ভাষায় বউ পাগল পুরুষদের লজ্জা-শরম কম থাকে।তাহসিনের ক্ষেত্রেও তাই।সে পুতুলকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে ময়ূরীর শরীর ঘেঁষে দাঁড়াতেই মেয়েটা আঁতকে উঠল।এত এত মানুষের সামনে লোকটা কী শুরু করেছে!তাহসিন কিছু বলার আগেই পেছন থেকে রজনী বেগম পান চিবিয়ে আসতে আসতে বললেন,
“এমনে বউয়ের আঁচল ধুইরা দাঁড়ায় আছো কেন?বউ আজকে মেলা ব্যস্ত।রাইতেও কাছে পাইবা না।তুমি ঘরে যাও ভাই।”
তাহসিন চোখ ছোট ছোট করে বলল,
“বউকে বিয়ে করেছি কেন?কাছে কাছে রাখব বলেই তো,তাই না?আমার বউকে আমি নিয়ে যাচ্ছি।”
সে ময়ূরীর হাত ধরে টানতেই রজনী বেগম বললেন,
“তোমার বউরে আমার এহন লাগব ভাই।তুমি যাও,একটু পর পাঠাইতাছি ওরে।”
তাহসিন হার মানল।শেষে ময়ূরীর হাত ছেড়ে কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“আমার কথা না শুনলে আজ রাতে আমিও তোমার কথা শুনব না।”
সে হনহন করে সিঁড়ির দিকে হাঁটা ধরল।তাহসিনের বলা শেষ কথা খানা শুনে মেয়েটার গাল গরম হয়ে এলো।লোকটার মুখে লাগাম বলতে কিছু নেই।আফিয়া চোখের ইশারায় তাকে লজ্জা দিচ্ছে।ময়ূরী চোখ রাঙিয়ে দৌঁড়ে ঢুকল রান্না-ঘরে।অরুণিমা বেগম ময়ূরীকে রান্না-ঘরে রেখে বের হলেন বাইরে।বাড়িতে এত লোক-জন দেখে সে পুতুলকে বলেছিল হিমির কাছে গিয়ে থাকতে।মেয়েটা কথাই শোনে না।তিনি চম্পাকে খুঁজলেন।মেয়েটা কাজের সময় ফাঁকিবাজি করে।নেহাত ছোট দেবর এনেছিল তাকে,নাহলে তিনি শুরুতেই চম্পাকে বাড়ি থেকে বের করতেন।মেয়েটার কথা-বার্তা,চলা-ফেরা কোনো কিছুই তার পছন্দ নয়।
তিনি চারপাশে চোখ বুলিয়ে শান্তাকে খুঁজলেন।বাড়ির সব বউ,মেয়েরা যেখানে কাজে ব্যস্ত,সেখানে শান্তা বাড়ির বড় ছেলের বউ হয়ে আজ সারাদিন একটা কাজেও হাত লাগায়নি।তিনি বিরক্ত হয়ে পিছু ফিরলেন।রজনী বেগমকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
“শান্তাকে দেখছি না কেন আম্মা?বাড়িতে এত কাজ আর তার কোনো খবর নেই।কখনো তো কাজ করে না,আজ অন্তত এখানে থাকা দরকার নয় কী?”
রজনী বেগম বললেন,
“ওই মাইয়ার কথা আমারে জিগায়ও না মেজ বউ।মাইয়ার চেহারা দেখলেই আমার রাগ উঠে।”
“রাগ উঠলেই তো হবে না আম্মা।তাকে এখানে ডাকার ব্যবস্থা করুণ।”
রমজান সওদাগরের স্ত্রীও ঠেস দিয়ে বললেন,
“মাইয়া নাকি উচ্চবংশের।জীবনে তো দেখলাম না বাপের বাড়ি থিকা একটা মানুষ আইছে।মাহতাব কী ধুইরা বিয়া করল আল্লাহ জানে।”
আফিয়া তখন নীরবে নিজের কাজ করছিল।শান্ত পাথরের মতো।তার কিছুই বলার নেই।কিংবা করারও নেই।ময়ূরী ভেতর থেকে সবার কথা শুনছিল এতক্ষণ।সে জানে শান্তা কোথায়।তখন কনকের সাথে ঝামেলাটা মূলত শান্তাই বাঁধিয়েছিল।তারপর যখন ময়ূরী চওড়া গলায় চার’টে কথা শুনিয়ে দিল,তখন রেগে-মেগে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়েছে।মেয়েটা বিয়ে না হলে জানতই না সংসারে এত ঝামেলা হয়।
ঘণ্টা দুয়েক পেরোনোর পর ময়ূরী ব্যস্ত পায়ে উপরে ছুটল।ইতোমধ্যে গরুর মতো হাজার বার গলা ছেড়ে ডেকেছে তাহসিন।ময়ূরী ঘরে ঢুকতেই চমকে উঠল তাহসিনের হাতে লাল রঙা র’ক্ত দেখে।দু’দিন আগে যেখানে আ’ঘাত পেয়েছিল,সেই জায়গা থেকেই গলগল করে র’ক্ত ঝরছে।মেয়েটা দৌঁড়ে এলো।বিচলিত হয়ে বলল,
“এই হাত দিয়ে আবার কী করতে যাচ্ছিলেন?”
তাহসিন দাঁত চেপে র’ক্ত পরিষ্কার করে ময়ূরীকে বলল হাত বেঁধে দিতে।ময়ূরী হাত বাঁধতে বাঁধতে বিরক্ত হয়ে বলল,
“আবার একই জায়গায় লাগল কী করে?”
“দেয়ালের সাথে বারি লেগেছে।তোমায় কখন থেকে ডাকছি?কানে শুনতে পাও না?”
“বাড়ি ভর্তি মানুষের সামনে দিয়ে এভাবে আসা যায়?”
“কেন যায় না?”
“আপনি কথা কম বলুন।মাথা ব্যথা করছে আমার।”
তাহসিন শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে নিল।
“তুমি নাকি কনককে মেরেছ?”
ময়ূরী মাথা নাড়ল।এমন ভাবে মাথা নাড়ল যেন এটা তার কাছে ভীষণ স্বাভাবিক।
“কেন মেরেছ?কনক তোমার থেকে বয়সে বড়।”
“সম্পর্কে আমি তার বড় হই।সে আমাকে ভাইয়ের বউ বলে মনে করলে আমি কখনো এই দুঃসাহস দেখাতাম না।”
“কী করেছে ও?”
ময়ূরী সোজা হয়ে বসল এই পর্যায়ে।তাহসিনের চোখে চোখ রেখে দৃঢ় গলায় বলল,
“আপনার লজ্জা লাগবে শুনলে।”
“লাগবে না।তুমি বলো।”
“সে আমাকে বাজে ভাষায় গালা-গালি করেছে।আমি তার বড় ভাইয়ের বউ,এইটুকু অব্দি মনে রাখেনি।আমার মেজাজ খারাপ হয়েছে বলে থাপ্পড় মেরেছি।”
“গালি কেন দিয়েছে?”
“আমি আপনার বউ বলে।”
“আশ্চর্য!”
ময়ূরী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।শুকনো ঢোক গিলল আবার।বলল,
“কনক আপনাকে পছন্দ করে।এটা আপনি জানেন?”
তাহসিন হতবাক এহেন কথা শুনে।সে আশ্চর্য হয়ে বিস্মিত গলায় বলল,
“কী যা-তা বলছো?মাথা খারাপ হয়েছে তোমার?”
“আমার কাছে এসে যখন আমার স্বামীকে নিয়েই যদি কেউ টানাটানি করে তাহলে আমার কী করা উচিত?দু’টো কথা শোনাব না?আমি ওকে সাবধান করতেই সে আমাকে গালা-গালি শুরু করল।আমার গায়ে হাত অব্দি দেয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিল সে।”
কিশোরী কন্যা পর্ব ২৬
ময়ূরীর শক্ত গলার কথা শুনে তাহসিন মাথা নত করে ঠোঁট কামড়ে ধরল।কনকের ব্যবহারে মাথায় ধবধব করে আগুন জ্বলছে।সে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।ময়ূরী বলল,
“কী হলো?”
তাহসিন ঘরের দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বলল,
“কনকের সাথে কথা বলে আসি।”
“কী দরকারে?”
তাহসিন ময়ূরীর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ময়ূরীর হাত ধরে ঘর থেকে বের হলো।উদ্দেশ্য কনকের ঘরে যাওয়া।কী করবে তাহসিন?তার পরবর্তী কাজ সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই ময়ূরীর।সে চুপচাপ তাহসিনের সাথে চলল।
