কিশোরী কন্যা পর্ব ২৬
হামিদা আক্তার ইভা
আজ সকল দ্বিধা পেরিয়ে কিশোরী কন্যা স্বামীর চুলের ভাজে হাত রাখল।গলায় কেমন বিষণ্ণ স্বর ছিল তার।স্বামী যে কোলে মাথা রেখে উত্তরের আশায় বসে আছে এখনো।ময়ূরী খানিক্ষণ পর নিচু স্বরে বলল,
“ভুল মানুষ মাত্রই হয়।”
“এখনো রেগে আছো?”
“উহুম!রেগে নেই তো।শুধু নিজেকে একটু সময় দিচ্ছিলাম।এই মান-অভিমান আর ভালো লাগছে না আমার।আজ নাহয় কাল মৃ’ত্যু হলে মাটির নিচে রেখে দিয়ে আসা হবে।এত জেদ,এত অভিমান পুষে রেখে লাভটা কী বলুন তো?”
তাহসিন চোখ তুলে তাকাল।কিশোরীর শান্ত মুখ খানা বড্ড বিষণ্ণময় ঠেকল তার কাছে।শ্যামবর্ণের পুরুষ হাত বাড়িয়ে ময়ূরীর খালি হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।
“কী ভাবছ এত?”
“কেমন যেন লাগছে।অদ্ভুত ভাবে সব এলোমেলো হয়ে গেছে।”
“যেমন?”
“বুঝতে পারছি না আমি কী করছি,আগামীতে কী করব কিংবা কী হবে।সব কিছু কেমন ঘোলাটে মনে হচ্ছে।”
“শোনো!যা হওয়ার হয়ে গেছে।চাইলেই আমরা অতীত ঠিক করতে পারব না।সব কিছু ছেড়ে তোমার পড়াশোনায় মন দাও।সামনে সপ্তায় না তোমার পরীক্ষা?”
“বাড়িতে এত কাজ রেখে পড়ায় মন দেই কী করে?”
তাহসিন কপাল কুঁচকে ফেলল।আশ্চর্য হয়ে বলল,
“বাড়ির কাজ তোমায় কে করতে বলেছে?”
ময়ূরী শান্ত গলায় বলল,
“বিয়ে বাড়ি এটা।কাজ তো থাকবেই কম-বেশি।বাড়ির বউ হিসেবে আমারও কিছু দায়িত্ব আছে।সে আমি পড়াশোনা করি কিংবা না করি।”
“তোমায় আমি বাড়ির কাজ করার জন্য বিয়ে করে ঘরে আনিনি।যদি তোমার ধারণা এমনই হয়ে থাকে তাহলে আর এই বাড়িতে তোমাদের রাখব না আমি।তোমার টেস্ট শেষ হলে ঢাকায় ফিরে যাব।”
ময়ূরী আশ্চর্য হয়ে বলল,
“আপনি কী পাগল হয়েছেন?পরিবার রেখে যাব কোথায়?”
“পরিবার ছেড়েই তো থেকেছি এতদিন।তুমি আর আমাদের মেয়ে মিলেই নাহয় ছোট একটা পরিবার বানাব আমরা।”
“সেটা হয় না।”
“কেন হয় না?”
ময়ূরী চাপা শ্বাস ফেলে তাহসিনের দিকে ফিরে চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল,
“পরিবার ছেড়ে থাকতে বুঝি আপনার খারাপ লাগে না?শহরে কে আছে বলুন তো?গ্রামে কী কেউ থাকে না?কেউ কি শিক্ষিত হয়ে গ্রামে কাজ করছে না?পরিবারের সাথে জীবন কাটিয়ে যদি মৃত্যুও হয়,তবু আপনি বলতে পারবেন সারাটাজীবন আপনি পরিবারের সাথে কাটিয়েছেন।সুখে,দুঃখে একসাথে থেকেছেন।”
তাহসিন মৃদু হাসল।হেসে বলল,
“আমি চাইলেই এখানে থাকতে পারি না।আমার অনেক দায়িত্ব।”
“কীসের এত দায়িত্ব আপনার?”
তাহসিন উত্তর না দিয়ে ময়ূরীকে টেনে নিচে নামিয়ে পাশে বসালো।তার কোলে মাথা রেখে সেখানে টান-টান হয়ে শুয়ে রাতের আপছা আলোয় ময়ূরীর ছোট মুখটা দেখে বলল,
“আমি যেখানেই যাই না কেন,তুমি কী আমার সঙ্গে যাবে না?থাকবে না আমার পাশে?”
ময়ূরী বলল,
“যেতে তো আমি বাধ্য।”
“তাহলে এত কথা বলো কেন?আমাদের ছোট্ট একটা সংসার আছে।সেই সংসারে তুমি,আমি আর আমাদের ছোট্ট একটা সন্তান আছে।আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখলে ভবিষ্যতে আরও ছাও হবে।সংসার বড় হবে।”
লজ্জায় মেয়েটা মুখ ফিরিয়ে নিল।তাহসিন কিশোরীর লাজ দেখে আশ্চর্য হয়ে বলল,
“লজ্জার কিছু বলেছি আমি?আমাদের কী ছানা-পোনা হবে না?”
“বাজে কথা!”
“বাজে কথা কী বলেছি?”
“আপনি সরুন তো।আমার কাজ আছে।”
তাহসিন উঠল না,আর না সরে বসল।উল্টো বউয়ের মন হালকা করার জন্য উঠে বসে তাকে কাছে টেনে নিল।মেয়েটার সাথে অনেক অন্যায় করেছে সে।যেটা করা উচিত হয়নি তার।চাইলেই তো আর ভুল গুলো শুধরে নেয়া যাবে না,কিন্তু অতীত ভুলে নতুন করে জীবন শুরু করা যাবে।আল্লাহ না করুক,কাল যদি তার কিছু হয়ে যায়,তাহলে আজীবন সে ময়ূরীর কাছে প্রতারক হয়েই থেকে যাবে।একজন স্বামী হিসেবে এটা বয়ে চলা তার পক্ষে সম্ভব নয়।ময়ূরী তার স্ত্রী।তাহসিনের ব্যপারে সব কিছু জানার অধিকার তার আছে।তাহসিন ভাবল আজ ময়ূরীকে কিছু কথা জানাবে সে।যা সওদাগর বাড়ির কেউই জানে না।পুতুল অব্দি নয়।
আফিয়ার ছোট্ট একটা ঘর।সেই ঘর বিয়ের পর খুব যত্ন করে সাজিয়েছিল।এই ঘরে আগে মাহতাব মত্ত থাকত তার সাথে।কত মিষ্টি স্মৃতি লেগে আছে সেই ঘরটায়।আজও যখন মাহতাব কাছে আসে,তখন তার কোনো স্পর্শ মধুর মতো মিষ্টি লাগে না।কেমন বিষের মতো বিষাক্ত মনে হয়।আজ-কাল বুকে ভীষণ ব্যথা হয় মেয়েটার।এত ব্যথা জন্মের পর সে কখনো পেয়েছে কিনা জানা নেই।
তখন মধ্যরাত।বাইরে শীতল বাতাসে মুখরিত চারপাশ।মাহতাব নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে আফিয়ার পাশে।শরীর ঘেঁষে।লোকটার শরীর থেকে সিগারেটের কড়া গন্ধ ভেসে আসছে এখনো।খানিকক্ষণ আগেও এই লোকটা আফিয়াতে মত্ত ছিল।গভীর ঘনিষ্ঠতা ছিল দু’জনের মধ্যে।আফিয়া চাইলেই তাকে বারণ করতে পারে না।পারে না মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিতে।
আজ সে কত কিছু জানতে চেয়েছে মাহতাবের কাছে।মাহতাব নীরব ছিল।নিশ্চুপ থেকে নীরবতা পালন করছিল।মাহতাব যখন চুপ থাকে,তখন মেয়েটার যন্ত্রণা হয় ভীষণ।আগে তো মাহতাব এমন ছিল না।মাহতাব কখনো আফিয়ার কোনো কথাকে এভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করত না।তাহলে আজ কেন লোকটা এমন করছে?দ্বিতীয় স্ত্রীর কাছেও যাবে না আবার মুখ ফুটে কিছু বলবেও না।
ভোর সকালে আফিয়া গোসল সেরে বের হয়েছে সবে।মাহতাব আড়মোড় ভেঙে বিছানায় বসতেই আফিয়ার গম্ভীর মুখ দেখে গম্ভীর গলায় বলল,
“কড়া করে এককাপ রং চা দিয়ো আফি।”
আফিয়া ভেজা চুল মুছতে মুছতে বলল,
“মাহতাব,আপনার এই খাম-খেয়ালি স্বভাব আমার ভালো লাগছে না।”
“আমি আবার কী করলাম?”
“আমি হাজারবার জিজ্ঞেস করেছি শান্তার সাথে চম্পার সম্পর্ক কী?আপনি জানেন নিশ্চই?”
“শান্তাকে গিয়েই জিজ্ঞেস করো।”
“তার সাথে আমি কথা বলি না।”
“তাহলে আমার কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান কোরো না।তোমার আমার ব্যপারে কথা বলার থাকলে বলো নাহলে বাদ দাও।এখন চা এনে দিবে নাকি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাব এখন?”
আফিয়া রেগে ঘর থেকে বের হলো।নিচে কিছু লোক-জন রুহুলের সাথে ডেকোরেশন নিয়ে আলোচনা করছে।আফিয়া মাথায় লম্বা কাপড় দিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতেই ছেলে গুলো সালাম দিল তাকে।আফিয়া সালামের উত্তর নিয়ে মাহতাবের একজন কাছের ছেলেকে বলল,
“তুমি ভাই আজ সন্ধ্যায় এসে কিছু জিনিসের লিস্ট নিয়ে যেয়ো।হলুদ তো কাল হবে,তাই জিনিস গুলো আগেই আনতে হবে।”
ছেলেটা মাথা নাড়ল।আফিয়া রান্না ঘরের দিকে যেতে চাইলে রুহুল তাকে থামিয়ে দিয়ে ছেলে গুলোকে বিদায় দিয়ে বলল,
“বড় ভাবি,বড় ভাই কী উঠেছে?”
“হ্যা ভাই,উনি বোধহয় ফ্রেশ হবেন এখন।”
“ভাইকে একটু বলবেন দুপুরে একটু উপজেলায় যেতে হবে।”
“উপজেলায় কেন?উনি না বললেন বিয়ের এইকয়েকদিন আর কাজে যাবেন না।”
রুহুল হেসে বলল,
“রাজনীতি করে ভাই।ঘরে বসে থাকলে কী কাজ হবে ভাবি?”
আফিয়া গম্ভীর হলো।রান্না ঘরে গিয়ে চা বানিয়ে এলো ঘরে।মাহতাব গোসল সেরে বিছানায় বসে বসে ফোন ঘাটছিল।আফিয়া ফিরতেই দৃষ্টি সামনে রেখে ফোন রেখে দিল।চা হাতে নিয়ে সেখানে চুমুক দিতেই সে বলল,
“রুহুল বলছিল আজ আপনাকে নাকি উপজেলায় যেতে হবে।”
“যাব।”
হঠাৎ বাইরে থেকে ময়ূরীর কণ্ঠস্বর শুনে আফিয়া দৌঁড়ে গেল দরজার কাছে।দরজা খুলে দিতেই ময়ূরীর হাস্যজ্বল মুখ দেখে মেয়েটা অবাক হলো।ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা চাপিয়ে দিয়ে বলল,
“আয়হায়,আজ নতুন বউয়ের হলো কী?এমা,দেখি দেখি!তুমি আজ সকালে গোসল করেছ?”
একসাথে এত প্রশ্ন শুনে ময়ূরী হতভম্ব হয়ে বলল,
“তুমি কী শুরু করলে ভাবি?”
“ব্যাপার কী?স্বামীর সোহাগ পেয়ে আজ মনটা বুঝি খুব ফুরফুরে?”
ময়ূরী লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে বলল,
“বাজে কথা বলবে না।তেমন কিছু নয়।বড় আম্মা সকালে ঘরে গিয়ে জানালেন আজ বরপক্ষের কিছু লোকজন আসবেন বাড়িতে মেয়ের জিনিস দিতে।”
“হ্যা,আসবে।তারা আমাদের আত্মীয় হয়।চিন্তার কিছু নেই।”
“আমি তো কাউকে চিনি না।”
“চিনে যাবে।এখন বলো আমার দেবর গেছে কোথায়?”
“উনি তো ফাহাদকে নিয়ে ভোর বেলা বাড়ি থেকে বের হয়েছেন।কোথায় গেছে জানি না।যাওয়ার আগে বলে গেল ফিরতে একটু দেরি হবে।”
আফিয়া আর ঘাটল না।ময়ূরীকে নিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ানোর সময় মেয়েটার শরীর খালি দেখে বলল,
“তোমার গয়না কই?দাদি দেখলে কিন্তু রাগ করবেন।বাজে কথাও শোনাবেন।”
ময়ূরী আফিয়াকে নিয়ে তাহসিনের ঘরে গেল।আলমারি খুলে গয়নার বাক্স থেকে পাতলা কিছু গয়না গায়ে জড়িয়ে নিল।আফিয়া পুরো ঘরটা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বলল,
“ফাহাদকে তোমার কাছে রাখো কেন?”
“তাতে কী হয়েছে?ও তো জ্বালায় না।”
“বোকা মেয়ে!মেজ আম্মা কেন পুতুলকে নিজের কাছে রাখেন, বুঝো না?”
ময়ূরী মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বোঝাল।আফিয়া বিছানায় পা উঠিয়ে বসে ময়ূরীকে পাশে বসতে বলল।ময়ূরী পাশে এসে বসতেই সে বলল,
“ফাহাদ তোমাদের মাঝে থাকলে তাহসিন বিরক্ত হতে পারে।”
ময়ূরী আশ্চর্য হয়ে বলল,
“বিরক্ত হবেন কেন?উনি নিজেই তো জোর করে ফাহাদকে নিয়ে এলেন।”
“আরে বাবা,ফাহাদকে নিয়ে এসেছে তাতে কী হয়েছে?সে তার বোনের শ্বশুর বাড়ি এসেছে তাতে দোষের কিছু নেই।আমি ওই কথা বলিনি।বলতে চাইছি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একটু প্রাইভেসি দরকার আছে না?”
“আছে নাকি?”
ময়ূরীর কথা শুনে আফিয়া একচোট চোখ পাকিয়ে বলল,
“বোকা! স্বামী–স্ত্রী বলতে শুধু একটা ঘর ভাগাভাগি করে থাকা না নয়।তাদের নিজের মতো একটা জায়গা থাকে,নিজের মতো কথা, নিজের মতো সময়। ফাহাদ থাকলে কী আর সেসব হবে?”
ময়ূরী লজ্জা আর অস্বস্তিতে নিচে তাকিয়ে গয়নার বাক্সটা টেনে বন্ধ করল।
“তোমরা সবাই আজ-কাল অদ্ভুত কথা বলো।”
“অদ্ভুত কী?একটা মারলে সব এমনিতেই বুঝে যাবে।কাজের কাজ করো,নাহলে আজীবন কাঁদতে হবে।”
ময়ূরী দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিল।
“লজ্জা লাগে ভাবি।”
“এহ! লজ্জা তো তোমার স্থায়ী বাসিন্দা।”
আফিয়া হেসে উঠে দাঁড়াল।
“চলো, নিচে যাই। মেজ আম্মা গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিচে।নতুন বউ দেরিতে গেলে আবার আমার ওপরই দোষ চাপাবে।”
নিচে নামতেই ওরা দেখল সওদাগর বাড়ির ড্রয়িংরুম ভরে গেছে মানুষে। বউ-ঝিরা এদিক–ওদিক ছুটোছুটি করছে, বড় খালাদের কয়েকজন হাতা গুটিয়ে রান্নাঘরের সামনে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দিচ্ছে।মাটির হাঁড়িতে মিষ্টির গন্ধ উঠছে।ময়ূরী নিচে এসে দাঁড়াতেই কয়েক জোড়া চোখ তার দিকে তাকাল।নতুন বউ হলে কী হয়—ঘর থেকে বেরোলেই কথার ঝড় বইবে।অথচ বিয়ে হয়েছে অনেকদিন হয়ে গেছে।সওদাগর বাড়ি বাইরের মানুষ তেমন আসে না উৎসব ছাড়া।এইযে অনুষ্ঠান শুরু হবে,এখন থেকেই শুরু হবে তাহসিনের বউয়ের উপর নজরদারী।
কিন্তু আজ মেয়েটার মন অদ্ভুত শান্ত।
তাহসিনের কথাগুলো যেন মাথার ভেতর উষ্ণতা ছড়িয়ে রেখেছে।মেয়েটা আজ সকালেই ঠিক করেছে,সে আর ছোট ছোট ব্যাপারে রাগ জমাবে না।
এমন সময় দূর থেকে পুতুল দৌঁড়ে এসে বলল,
“মা! নানির শাশুড়ি ডাকে তোমাকে।”
আফিয়া পুতুলের কথা শুনে হেসে ফেলল।ময়ূরী হাঁটতে শুরু করতেই আফিয়া কানে কানে বলল,
“দেখো, দাদি যেন আজ রেগে না যায়। চোখ রাঙালে কিছু বলো না যেন।শুধু মাথা নাড়বে।তোমার এই ঠোঁট বেঁকানোর অভ্যাসটা বাদ দিয়ো।”
ময়ূরী বিরক্ত হয়ে বলল,
“আমি কী ঠোঁট বেঁকাই ?”
“হ্যাঁ,তুমি জানো না।”
রজনী বেগমের ঘরে তখন কেউ নেই তিনি ছাড়া।আফিয়া আর ময়ূরী প্রবেশ করতেই রজনী বেগম ঠাণ্ডা কণ্ঠে বললেন,
“আইছ?আসো!কিছু কথা ছিল তোমার সঙ্গে।”
পেছনে থাকা আফিয়া হঠাৎ চুপ হয়ে গেল।ময়ূরী ভয় পেল।কী হয়েছে আবার?
“তোমার স্বামী কই?”
ময়ূরী বলল,
“সকালেই বের হয়েছেন । সঙ্গে ফাহাদও আছে।”
রজনী বেগমের রুক্ষ মুখ খানিক নরম হলো।
“ভালোই করছে। কাল রাইতে সে তোমার ব্যাপারে অনেক কথা কইছে আমার লগে।”
ময়ূরী চমকে তাকাল।বলল,
“আমার ব্যাপারে?”
“হু।”
“তাহসিন পোলা মানুষ হইলেও তার মনে অনেক কথা জইমা থাকে। তোমার লাইগা সে কেমন অস্থির থাকে,তুমি হয়তো বুঝতে পারো না।”
ময়ূরী আর কথা বলতে পারল না। চোখ নামিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল।তিনি ফের বললেন,
“নাতবউ,সংসার আঁকড়ে ধরতে শিখো। তাহসিন তোমারে খুব ভালোবাসে। তোমাগো মধ্যে যা ভুল বোঝাবুঝি আছিল আর জানি না বাড়ে।সংসার ভাঙতে সময় লাগে না,কিন্তু গড়তে সময় লাগে অনেক।”
ময়ূরীর বলল,
“জি,আমি চেষ্টা করব।”
“এহন যাও,আজকে অনেকে আইব। তোমার পাশে থাকার দরকার।”
ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে এলো।জানা গেল ছেলের বাড়ির মানুষ দুপুরের আগ দিয়ে আসবেন।বাড়িতে সেই হিসেবেই রান্নার ব্যবস্থা শুরু হলো।হিমি মুখ কালো করে বসে আছে নিজের ঘরে।তাহসিনের সাথে একচোট ঝগড়া হয়েছে তার।সে গ্রামে থাকতে চাচ্ছে না আর।এখানে তার কাজ শেষ।সকালে বর্ষা হিমির যাওয়ার খবর শুনে তার ঘরে এলো।হিমি বর্ষাকে বসতে দিল।বর্ষা হাসি-মুখে বলল,
“তুমি চলে যেতে চাইছ যে?কাল বাদে পরশু বিয়ে আর এখন গেলে হয়?”
হিমি বলল,
“আমার ঢাকায় ফিরতে হবে বর্ষা।ছোট ভাই-বোনদের একা বাসায় রেখে এসেছি।”
“তোমার মা-বাবা সেখানে থাকে না?”
“না!আব্বু-আম্মু বাংলদেশের বাইরে থাকে।আমরা তিন ভাই-বোন বাংলাদেশে থাকি।”
“ওহ।তাহলে তাদেরও আসতে বলো?”
হিমি মুচকি হেসে বলল,
“ওরা আসবে না এখানে।বাদ দাও।তোমার আর আদনানের নাকি বিয়ের ব্যাপারটা আগাচ্ছে?”
বর্ষা ফোঁস করে চাপা নিঃশ্বাস ফেলে হিমির হাত দু’টো মুঠোয় নিয়ে বলল,
“আমায় তোমার এত খারাপ মনে হয় আপু?আদনান ভাইয়ার সাথে আমার বিয়ের কথা উঠেছিল ঠিকই,কিন্তু আমরা বিয়ে করছি না।সে যে এক সিনিয়র আপুর প্রেমে হাবু-ডুবু খাচ্ছে।এ কথা জানার পর তাকে বিয়ে করি কিভাবে?”
হিমি আশ্চর্যও হলো আবার লজ্জাও পেল।বুকের উপর থেকে যেন বড় একটা পাথর নেমে গেল।সে শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“আদনান তোমায় এসব বলেছে।”
“জি।আরও কী বলেছে জানো?”
“কী বলেছে?”
“খুব শীঘ্রই তোমাকে বিয়ে করবে।”
“ইশ,বাজে কথা বলবে না।আচ্ছা যাও তুমি,আমি খানিকক্ষণ পর আসছি।”
সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো।ছেলের বাড়ির মানুষ এসে গেছে।সবাই ব্যস্ত মেহমান নিয়ে।বাড়ির বাইরে লাইটিং এর কাজ চলছে।ময়ূরী ব্যস্ত পুতুলকে নিয়ে।পুতুল ভাত খাচ্ছে মায়ের হাতে।বাচ্চাটা আজ ভীষণ জ্বালাচ্ছে খাবার নিয়ে।মাছ খাবে না বলে মাংস নিয়েছিল,এখন বলছে মাংস খাবে না।ময়ূরী চোখ রাঙিয়ে বলল,
“তোমার বাবা এলে কিন্তু ভীষণ বকবে।চুপচাপ খেয়ে নাও।আমার আরও কাজ আছে।”
পুতুল খাওয়ার সময় চম্পা পানি নিয়ে এলো।চম্পাকে দেখে পুতুল ভয়ে ময়ূরীর এটো হাত সরিয়ে বুকের সাথে লেপ্টে এলো।ময়ূরী ভ্রু-কুঁচকে পুতুলের কাণ্ড দেখে বলল,
“হলো কী তোমার?খাওয়ার সময় দুষ্টুমি করছো কেন?”
পুতুল মিনমিন করে বলল,
“খুব মারে।”
“কে মারে?পুতুল?কী বলছো মা?”
পুতুল ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল চম্পা চলে গেছে।মেয়েটা মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ঘাড়ে মুখ রেখে ফিসফিস করে বলল,
“আমার শরীরে কী ব্যথা।”
ময়ূরী আঁতকে উঠে পুতুলকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“কোথায় ব্যথা মা?শরীরে ব্যথা পেলে কী করে?”
পুতুল ঠোঁট উল্টে শব্দ করে কেঁদে উঠল।ড্রয়িংরুমে তখন অনেক মানুষ।মেহমান,বাড়ির মানুষ,কাজের লোক সব মিলিয়ে বেশ অনেকেই।পুতুলের কান্না দেখে অরুণিমা বেগম ছুটে এলেন কাছে।ছেলের বাড়ির লোক যেহেতু এই বাড়ির আত্মীয় তাই পুতুলকে তারা ভালো করেই চেনেন।নুপুরের হবু শাশুড়ি এগিয়ে এসে বললেন,
“পুতুল কাঁদছে কেন?”
ময়ূরী বলল,
“বুঝতে পারছি না।হঠাৎ করেই কেঁদে উঠল।”
পেছন থেকে কনক বিরক্ত গলায় বলল,
“হুট করেই কেঁদে উঠেছে নাকি কিছু বলেছ ওকে?”
ময়ূরী পিছু ঘুরে আশ্চর্য হয়ে বলল,
“আমি কী বলব?”
“সেটা তুমিই ভালো জানো।”
“ভালো ভাবে কথা বলো।কী ইঙ্গিত করছো তুমি?”
“সেটা ভাবছ সেটাই বলছি।ভুল কিছু বলেছি?”
ময়ূরীর চোয়াল শক্ত হলো।নেহাত বাড়ি ভর্তি মানুষ দেখে চুপ করে রইল সে।ছেলের বাড়ির মানুষ ফিসফিস করছে।কেউ বলছে সৎ মা বলে হয়তো আদর,যত্ন করে না।আবার কেউ কেউ বলছে অত্যাচারও করতে পারে।পুতুল এত এত মানুষ দেখে গুটি গুটি পায়ে মায়ের নিকটে এসে কোমর জড়িয়ে ধরল।ময়ূরী হাত ধুইয়ে পুতুলকে নিয়ে উপরে উঠে এলো।আজ প্রথম কেউ তাকে এভাবে অপমান করল শ্বশুর বাড়ি পুতুলের আপন মা নয় বলে।কনকের কথার মানে ধরতে পেরেই তার মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে।এমনিতেই কনকের স্বভাব তার পছন্দ নয়।তাহসিনের পাশে একটু বেশি ঘুরঘুর করে মেয়েটা।
ময়ূরী দরজা লাগিয়ে খাটের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।রাগ,অপমান আর অস্থিরতার ঝড় বুকের ভেতর তাণ্ডব চালাচ্ছে।পুতুল চুপ করে কোণে বসে কাঠের খেলনা ঘুরাচ্ছে।মুখ গম্ভীর,চোখ লাল টকটকে।মেয়েটা খেলছে ঠিকই,কিন্তু তার খেলায় সেই স্বাভাবিক উচ্ছ্বাস নেই।দরজার বাইরে পায়ের শব্দ।তারপর কড়া নাড়ার বদলে সরাসরি কপাট ঠেলে ভেতরে ঢুকল তাহসিন।ঘরে ঢুকেই প্রথমে পুতুলের দিকে তাকাল,তারপর চোখ গিয়ে থামল ময়ূরীর কাঁপতে থাকা মুখে।
“কি হয়েছে?”
ময়ূরী ঘুরে দাঁড়াল।তাহসিনকে দেখে কিছু বলার আগেই তাহসিন দরজা চাপিয়ে দিয়ে বলল,
“কনকের সাথে নাকি ঝগড়া করেছ বাড়ি ভর্তি মানুষের সামনে?”
ময়ূরী হতবাক।সে অবাকের চরম পর্যায়।
“আমি ঝগড়া করতে যাব কেন?”
“কনকই তো বলল।”
“আর আপনি বিশ্বাস করে নিলেন?”
তাহসিন শান্ত পায়ে এগিয়ে এসে ময়ূরীর পাশে বসল।হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিচু স্বরে বলল,
“যেটা চোখে দেখিনি,সেটা বিশ্বাস করব কেন?আমায় বলো তো,কী হয়েছে?”
ময়ূরী ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল,পুতুল খেলতে খেলতে বিছানার মাঝখানেই ঘুমিয়ে গেছে।সে দৃষ্টি ফিরিয়ে বলল,
“কনকের কথা-বার্তা আমার পছন্দ হচ্ছে না।ও খোঁচা মেরে কথা বলে।”
“কী বলেছে?”
ময়ূরী সব খুলে বলল তাকে।তাহসিন সব কিছু শুনে একটু রাগ করেছে।কনকের থেকে এসব আশা করেনি সে।সে বলল পরে কনকের সাথে কথা বলবে।ময়ূরী বারণ করল।বলল,
“এসব নিয়ে ঝামেলা করে লাভ নেই।ভুল করে ফেলেছে একটা।বাদ দিন।”
তাহসিন মাথা নাড়ল।ময়ূরী উঠতে চাইল তাহসিনের কোল থেকে।তাহসিন ছাড়ল না।ময়ূরী শুষ্ক ঢোক গিলে বলল,
“দুপুর হয়েছে,খাবেন না?”
“হু!”
“নিচে চলুন।”
“ভাত খাব না।”
ময়ূরী ফট করে তাকাল তার দিকে।বলল,
“তাহলে?”
“ভালোবাসা খাব।”
ময়ূরী ঠোঁট চেপে বলল,
“ভালোবাসা খায় কিভাবে?”
ময়ূরীর প্রশ্নে তাহসিনের ঠোঁটের কোণায় হাসি ফুটে উঠল।তার চোখে একধরনের গভীর,বাঙ্ময় দৃষ্টি,যা ময়ূরীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন কাঁপিয়ে তুলল।
তাহসিন বলল,
“ভালোবাসা খাওয়া যায়,যদি তুমি খাওয়াও।”
ময়ূরী চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।
তার গলা শুকিয়ে এসেছে।হাত দু’টো অবচেতনেই নিজের আঁচলের কোণা মুঠো করে ধরল।
“ছাড়ুন!উঠতে দেবেন না?”
তাহসিন মাথা নাড়ল।
“না।”
“এভাবে তাকাবেন না।”
তাহসিন একটু ঝুঁকে এসে বলল,
“তাহলে কীভাবে তাকাব? আমার স্ত্রী হয়ে আমার চোখে চোখ রাখবে না?”
ময়ূরীর কপালে অভিমান মেশানো লাজ ফুটে উঠল।সে মুখ ঘুরিয়ে নিল।তাহসিন হাত বাড়িয়ে আলতো করে তার চিবুক তুলে ধরল।
“তোমার কাছে আমি একবার ভালোবাসা চাইলে,তুমি কি দিতে পারবে না?”
“কেমন ভালোবাসা?”
তাহসিন তার কোলের উপর বসে থাকা ময়ূরীকে একটু কাছে টেনে নিল।তাদের মাঝের দূরত্বটি একদমই মিলিয়ে গেছে।ময়ূরীর নরম চুলের গন্ধটুকু তাহসিনের নাকে এসে লাগল।
কিশোরী কন্যা পর্ব ২৫
“এই ভালোবাসা।” তাহসিন ফিসফিস করে বলল
এবং ধীরে ধীরে তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
একটা দীর্ঘ,স্থির,নিঃশব্দ চুম্বন।মেয়েটার নিঃশ্বাস থমকে আছে।
