নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৭
রূপন্তী সরকার
ইয়াশফা রেগে রান্না ঘরে চলে গেলো। তিথি ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে বললো
“কি হয়েছে আম্মু রেগে আছো কেনো?”
ইয়াশফা তিথির কথা শুনে চুপ করে রইলো। তিথি আবারো ইয়াশফা কে বললো
“রাত হয়েছে মা চলো খাবার খেয়ে নাও।”
“আচ্ছা”
তিথি এসে ইয়াশফা কে খেতে দিলো। বাড়ির সবার খাওয়া শেষ। রাহা অনেক আগেই খেয়ে নিয়েছে।
এইদিকে শুভ্র আর অদ্রিত এসে ইয়াশফার পাশে গিয়ে বসে পড়লো। শুভ্র তিথি কে ডেকে বললো
“খেতে দাও মা”
তিথি খাবার বাড়তে বাড়তে বললো
“কই ছিলি তোরা? কতো রাত হয়েছে দেখেছিস?”
শুভ্র ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে দেখলো ইয়াশফা খুব মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছে। কোনো দিকে খেয়াল নেই। ওর খাওয়া দেখে শুভ্রর খিদে পেয়ে গেলো। মেয়েটা কতো সুন্দর গুছিয়ে খাচ্ছে। শুভ্র ওর পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে টেবিলের উপর রাখলো। ইয়াশফা সেদিকে একবার তাকিয়ে শুভ্রর দিকে তাকালো। অদ্রীত শুভ্রর কান্ড দেখছে আর মুচকি মুচকি হাসছে। ইয়াশফা কিছু না বলে আবারো খাওয়াতে মনোযোগ দিলো। শুভ্র ইয়াশফা কে বললো
“চকলেট টা চাই?”
ইয়াশফা মিনমিন করে বললো
“মানুষের জিনিস আমি কেনো নিবো?”
শুভ্র চকলেট টা ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো
“এটা তোমার জন্যই এনেছি।”
ইয়াশফা চকলেট নিয়ে মুচকি হাসি দিলো। এরপর টেবিলের উপরে রাখা টমেটো সস দিয়ে চকলেটে একটা কামড় দিলো। সস দিয়ে চকলেট খাওয়া দেখে অদ্রীত আর শুভ্রর গা গুলিয়ে আসলো। এই মেয়ে এসব কি খাই। ছি ছি সস দিয়ে কি কেউ চকলেট খায়?
শুভ্র বললো
“এই পিচ্চি সস দিয়ে চকলেট খেতে হয় না। চকলেট এমনিই খেতে হয়। পেট খারাপ করবে তোমার”
ইয়াশফা চকলেট টা শুভ্রর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো
“খেয়ে দেখেন মজাই লাগে। টকটক মিষ্টি মিষ্টি”
শুভ্র কাঁদো কাঁদো মুখ করে বললো
“এই না না তুমিই খাও আমি খাবো না”
এর মধ্যেই রিদ এসে শুভ্রর কান ধরে দাড় করিয়ে দেয় শুভ্র মুখ কালো করে দাড়িয়ে আছে। রিদ বললো
“তুই চিকনির জন্য কান্না করিস হারামজাদা? ওই চিকনির পায়ে পড়িস?”
শুভ্র চিল্লিয়ে বললো
“এই কাকাই তুমি আবার আমার মেসেঞ্জারে ডুকেছো? এটা কিন্তু ঠিক না”
রিদ রেগে বললো
“ছি লজ্জা নাই ঘেন্না নাই তুই চিকনি চামিলির পা ধরেছিস জাউড়া। তুই বের হো আমার বাড়ি থেকে তুই যা ওই চিকনির কাছেই যা”
ইয়াশফা আর অদ্রিত অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইয়াশফা চকলেট মুখে নিয়ে হা করে দাড়িয়ে আছে। কি হচ্ছে কিছু বুঝতে পারছে না। অদ্রিত মুচকি মুচকি হাসছে। শুভ্র লজ্জায় কেনো কথা না বলে মুখ গামছা দিয়ে ডেকে সিড়ি দিয়ে উঠে চলে যায়।
ইয়াশফা ঋষভের রুমের বাহিরে দাড়িয়ে আছে। তিথি বলেছে ঋষভের ঘরে থাকতে। কিন্তু এই লোকের সাথে থাকার ইচ্ছে নেই। ইয়াশফা দরজায় নক করলো। একটু পর ঋষভ দরজা খুলে দিয়ে বললো
“কি চাই?”
“আমাকে আন্টি এই রুমে থাকতে বলেছে”
ঋষভের মাথা গরম হয়ে গেলো। ও কিছুতেই রুম শেয়ার করবে না। মগের মুল্লুক নাকি?
“একদম না। এই রুম আমি শেয়ার করতে পারবো না।”
ইয়াশফা রেগে বললো
“তাহলে আমি কোথায় থাকবো?”
ঋষভ বললো
“পাশের রুম ফাঁকা আছে ওইখানে যাও”
ইয়াশফা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বললো
“আল্লাহ বাচাইছে আমি তো এটাই চেয়েছিলাম। দেখি সরুন”
বলে ইয়াশফা দরজার পাশ দিয়ে ভেতরে ঢুকতে গেলো। কিন্তু ঋষভ হঠাৎ হাত বাড়িয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পথ আটকে দিলো।
“আমি কি বললাম শুনতে পাওনি? এই রুমে তুমি থাকবে না।”
ইয়াশফা ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
“নিয়মিত হাইগেন ভাই গু তো সব মাথায় উইঠা যাচ্ছে। আমি আপনার ঘরে থাকতে যাচ্ছি না আমি শুধু বালিশ টা নিয়ে অন্য রুমে যাবো”
ঋষভ রেগে তাকালো এই মেয়ে এতো ফালতু ভাষা কিভাবে ইউজ করে ছি ছি।
“থাপ্পড় দিয়ে সব দাঁত ফেলে দিবো এতো ফালতু কথা কোথায় থেকে শিখেছো ননসেন্স”
ইয়াশফা অবাক হয়ে বললো
“এতো কষ্ট করে বাংলা ভাষা শিখেছি এগুলো যদি ব্যবহারই না করতে পারি তাহলে বাংলা ভাষার জন্য এতো লড়াই করে কি লাভ?”
ঋষভ ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বললো,
“এই মেয়ে বের হবে তুমি? রাগিয়ে নিও না মেরে দিবো কিন্তু”
ইয়াশফা বালিশ নিয়ে ঋষভ কে একটা ধাক্কা দিয়ে মনে মনে বললো
“পাগলে কিনা কয় ছাগলে কিনা খায়। যায়গা ঘুম ধরছে।”
ঋষভ রেগে বললো
“এই মেয়ে তোমার এই পুতুল নিয়ে যাও”
ইয়াশফা আড়চোখে পুতুলের দিকে তাকালো। ছোটো বেলায় বাবা কিনে দিয়েছে তাই যত্ন করে এনেছে। এই বাড়িতে আপন বলতে শুধু পুতুলটাই আছে। রাতে ওর কাছেই থাকবে। ইয়াশফা মুখে মুচকি হাসি দিয়ে এক হাতে পুতুল আরেক হাতে বালিশ নিয়ে চলে গেলো।
ইয়াশফা বের হতেই রিদ ইয়াশফার সামনে এসে দাড়ায়। ইয়াশফা মাথা উঁচু করে রিদ কে দেখে। বাপ ছেলে দুটোই কি লম্বা লম্বা। রিদ ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে বললো
“কোথায় যাচ্ছো মা?”
ইয়াশফা বললো
“অন্য রুমে যাচ্ছি আঙ্কেল”
রিদ রেগে বললো
“কেনো এতো বড় রুম থাকতে তুমি বাহিরে কেনো যাবে?”
ঋষভ গম্ভীর গলায় বললো
“না ও বাহিরেই থাকবে আমি এই রুমে থাকতে দিবো না”
কথাটা শুনে ইয়াশফা রেগে বললো
“এই রুম আপনি আপনার দেহের ভিত্রে ভইরা রাখেন। ঘুমালাম না আপনার রুমে”
রিদ একবার ইয়াশফার দিকে তাকালো এই মেয়ে তো পুরাই এটাম এটামবোম। এমনই তো মেয়ে লাগতো ওর। রিদ বললো
“ঋশ ও তোমার বউ”
“মানি না ওকে আমি। এই ক্যাকটাস টা কে সরাও চোখের সামনে থেকে। মাথা খেয়ে ফেলছে আমার।”
ইয়াশফা মুখ ব্যাকা করে চলে গেলো। এই লোকের সাথে কথা বলার রুচি নাই। রিদ ও কিছু বললো না। তবে রিদের কাছে ইয়াশফা কে সেই লাগছে। মেয়েটার দম আছে। তার ছেলের চোখে মুখে উত্তর দেওয়ার ক্ষমতা সবাই রাখে না। রিদ ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে বললো
“এই এটাম বোম তুমি আমার সাথে আসো”
কথাটা বলেই রিদ বউমা কে নিয়ে চলে গেলো। মেয়েটা ছোট হলেও ঝাল বেশি।
ঋষভ মাথা দুহাতে চেপে ধরে আছে। রাগ লাগছে এই মেয়ের উপর।।একটা বাচ্চা মেয়ে ওর সাথে কিভাবে কথা বলছে। এসব ওর বাপ দেখেও কিছু বললো না।
সকাল সকাল ইয়াশফা রান্না ঘরে গেলো তবে আজকে আর শাড়ি পড়ে নি। রুহির একটা লং শার্ট পড়েছে। রাতে রুহির কাছেই ছিলো। মুলত রুহিই জোড় করে শার্ট পড়িয়ে দিয়েছে। বাচ্চা একটা মেয়ে ও কি শাড়ি পড়ে ঘুরতে পারে? ইয়াশফাকে দেখে রাহা বললো
“এসব কি পড়েছিস? নতুন বউ বাসায় মেহমান আসবে শাড়ি পড়ে আসতি”
মিহি রাহা কে বললো
“ও ছোট মানুষ রাহা শাড়ি ক্যাড়ি করতে পারবে না। তাছাড়া মেহমান আসলে শাড়ি পড়িয়ে দিবো”
রাহা চুপ করে গেলো। বাড়ির সবাই ইয়াশফা কে একটু বেশিই যত্ন করছে। মুগ্ধর সাথে ও রাহা কথা বলছে না। ও তো ওর ভালোবাসার মানুষ কে পাই নি। তাহলে কেনো মুগ্ধ ্র সাথে ঘর করবে। কিন্তু আপাতত কিছু করার নেই। থাকতেই হবে।
এইদিকে মিহি কফি বানিয়ে ইয়াশফা কে বললো
“যাও গিয়ে বর কে দিয়ে আসো”
ইয়াশফা মুখ কালো করে বললো
“যেতেই হবে আন্টি? আসলে আপনার ছেলে তো একটা জলহস্তি”
মিহির খুব হাসি পেলো তবে মুখ গম্ভির করে বললো
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৬
“ভুলে যেও সে আমার ছেলে আমার ছেলে কে এসব বলবে না। এখন যাও কফিটা দিয়ে এসো”
ইয়াশফা কফি টা নিয়ে চলে গেলো। এরপর সিড়ির উপর উঠে কফি তে থুথু দিয়ে দিলো খাবলা। বেশ করেছে। ওকে ধমক দেওয়া। এখন থুথু গিলুক। এই দৃশ্য দুর থেকে শুভ্র দেখে নিলো। এই মেয়ে তো একটা চিজ। শুভ্র ইয়াশফার পিছু পিছু ঋষভের ঘরে গেলো।
