Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫৪

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫৪

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫৪
রাত্রি মনি

সন: ১৯৯৩; গুলশান, ঢাকা
শীতের সন্ধ্যায় ল্যাম্পপোস্টের মৃদু আলো রাস্তায় পড়ে চিকচিক করছে। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে এক প্রাসাদ তুল্য ম্যানশন; সম্ভ্রান্ত আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে। বিশাল ফটকের ওপর ব্রোঞ্জের প্লেটে খোদাই করা “Chaudhary Mansion” লেখাটি সন্ধ্যার নিয়নে ঝলমল করছে।
গেট পেরিয়েই লম্বা পাথরের পথ, দুই পাশে ম্যানিকিউর করা বাগান। বাড়িটা যেন ছোটখাটো প্রাসাদ। ভেতরে ঢুকতেই রাজকীয় সাজে বিশাল ড্রয়িং রুমে দামি কার্পেট আর পুরনো দিনের আসবাবপত্রের সুঘ্রাণ। । বড় বড় ঝাড়বাতি থেকে নরম আলো ঝরে পড়ছে নিচে।

ড্রয়িং রুমেই থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচজন—দু’জন বিশ্বস্ত পুরনো কাজের লোক, তাদের মধ্যে একজন মহিলা অন্যজন পুরুষ। তাদের পাশেই একজন ভদ্রমহিলা তিনি আহনাফ চৌধুরীর স্ত্রী তৃধা চৌধুরী, এবং তাঁদের একমাত্র কন্যা, অরিত্রিকা চৌধুরী। বয়স ১৯ এর কাছাকাছি। তার মাথা নিচু মুখের ভঙ্গিমা বোঝার উপায় নেই। তার পাশেই বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে ২৫-২৬ বছর বয়সী এক যুবক, অরিত্রিকার চাচাতো ভাই, আব্র চৌধুরী। দেখতে খুবই সুদর্শন, যেন বিদেশিদের মতো তীক্ষ্ণ নাক-চোখ, কিছুটা ইউরোপীয় ধাঁচের চেহারায় দৃঢ় প্রত্যয়।যা তার চেহারায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।
ঘরের কেন্দ্রে, একটি রাজকীয় সোফায় আরাম করে বসে আছেন ‘আহনাফ চৌধুরী’। শুভ্র পাঞ্জাবির ওপর গোল্ডেন পাড়ের কাজ করা কালো শাল জড়ানো। তাঁর উজ্জ্বল মুখে একধরনের শীতল গাম্ভীর্য, যা তাঁর সিদ্ধান্তগুলোর মতোই অনড়।তিনি এই বাড়ির কর্তা, যাঁর সিদ্ধান্তই শেষ কথা। তার চেয়েও বড় পরিচয়, তিনি বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রী।
দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে তৃধা চৌধুরী নিচু, ফিসফিসে স্বরে বললেন,

“আপনি একজন শিক্ষামন্ত্রী হয়ে মেয়ের পড়াশোনার বিষয়ে এমন বিরোধিতা করছেন, এটা কি সমাজের চোখে শোভনীয়? মাত্র ক’টা মাস। ওকে যেতে দিন।মানুষ জানলে কি ভাববে?”
আহনাফ চৌধুরী শালটা আরও একটু টেনে নিলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ধীর, কিন্তু তীক্ষ্ণ।
“দেখো তৃধা, মেয়ের শিক্ষার বিষয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু চৌধুরী বাড়ির নিয়ম—বংশের মেয়েরা একা, অভিভাবক ছাড়া বিদেশে গিয়ে থাকবে, এমনটা হয়নি, হবেও না। পরিবারের ঐতিহ্যের ওপর কোনো আপস হয় না। আমি দ্বিতীয়বার কোনো কথা বলতে পছন্দ করি না।”
তিনি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তার একেকটা শব্দ যেন পাথরের মতো।কেউই পাল্টা কথা বলতে সাহস পায় না।
“আমার কাজ আছে।আসছি।”
তিনি চলে যাওয়ার জন্য উঠতে উদ্যত হতেই আব্র দ্রুত এগিয়ে এলো।
“চাচু, অনুরোধ করছি, এমনটা করবেন না। অরিত্রিকা ওর কলেজের সেরা ছাত্রী। কত পরিশ্রম করে ও স্কলারশিপ পেয়েছে—লন্ডনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ। এটা ওর জীবনের স্বপ্ন। আর একা কোথায়? আমি তো এক মাস পরেই যাচ্ছি। আমি দেখাশোনা করবো! আপনি ভরসা করতে পারেন।”
আহনাফ চৌধুরী সামান্য ঘুরে আব্র’র দিকে তাকালেন। তাঁর চোখ দুটো শীতল।দৃষ্টি এমন—যে দৃষ্টি দেখে মানুষ পেছনে সরে যায়।

“তোমার ওপর ভরসা? বিদেশে তোমার চালচলন সম্পর্কে আমি ওয়াকিবহাল। আমার যা বলার ছিল, আমি বলেছি। এখন যাও।”
আব্র থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল।ঠিক তখনই অরিত্রিকা দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরল।
“বাবা, বাবা প্লিইজ! শুধু একটা সুযোগ। বিশ্বাস করো, তোমার মেয়ে তোমার সম্মান নষ্ট হতে দেবে না। আমাদের পরিবারের নাম উজ্জ্বল হবে, বাবা। আমাকে যেতে দাও বাবা।এটাই আমার শেষ সুযোগ!”
তার কণ্ঠে হৃদয় নিংড়ানো আকুতি। আহনাফ চৌধুরী থমকে গেলেন। তার কঠোর মুখ সামান্য নরম হলো।তৃধা সুযোগ পেয়ে দ্রুত বললেন,
“এই যে শুনছেন, মেয়েটা এত করে বলছে। দিন না যেতে। তাছাড়া আমাদের আব্রও তো যাচ্ছে এক মাস পর। বোনকে দেখেশুনে রাখতে পারবে।”
আব্র সঙ্গে সঙ্গে যোগ করল,
“হ্যাঁ চাচু, তুমি একদম কোনো টেনশন করবে না। প্রথম একটা মাস একটু কষ্ট করতে হবে। তবে সেখানে তো আমার আন্টি আছেন। আমি কথা নিয়েছি। ওর থাকা নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।”
আহনাফ চৌধুরী স্থির হয়ে রইলেন। দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি। এই প্রথম, মেয়ের আকুতি আর স্ত্রীর যুক্তির কাছে তিনি যেন কিছুটা দুর্বল হলেন।

“ঠিক আছে,”
একসময় তাঁর কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“তোমাদের যা ভালো মনে হয়, তাই করো।”
অরিত্রিকার চোখে মুহূর্তেই খুশির ঝিলিক। সে বাবাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো,
“থ্যাংক ইউ, বাবা!”
আহনাফ মেয়ের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেন।
“মনে রেখো, অরিত্রিকা। এই চৌধুরী বাড়ির সম্মানের সাথে তোমার পড়াশোনার কোনো সম্পর্ক নেই। সম্মান নষ্ট হলে নিজের এই সিদ্ধান্তকে আমি কোনোদিন ক্ষমা করবো না।”

সাউথ কেনসিংটন (South Kensington), লন্ডন।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন (Imperial College London): বর্তমানে এটি লন্ডনের এক নম্বর এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা মেডিকেল স্কুল। এর মেডিকেল অনুষদটি গবেষণার জন্য বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। পেনিসিলিন আবিষ্কারক আলেকজান্ডার ফ্লেমিং এই প্রতিষ্ঠানেরই শিক্ষার্থী ছিলেন।
হাওয়া কাটতে কাটতে চলে গেল ছয় মাস। অরিত্রিকার ক্লাস, নতুন শহর, হোস্টেল, ইউনিভার্সিটির পরিবেশ—সব ধীরে ধীরে পরিচিত লাগতে শুরু করল।তবুও মাঝে মাঝে গুলশান-২ এর বড় গেট, চৌধুরী ম্যানশন, বাবার গম্ভীর মুখ—সব মনে পড়ে যায়।
এরই মাঝে একদিন কলেজ থেকে ঘোষণা এলো সুডেন্ট পিকনিক; তাদের একটি পাহাড়ি এলাকায় পিকনিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
সবাই যখন কোলাহলে ব্যস্ত, অরিত্রিকার মনটা ভারী লাগছিল।মন খারাপ লাগায় সে বিকেলের দিকে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নির্জন, নিরিবিলি একটি পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে লাগলো।সে প্রাচীন গাছের সারি পেরোতেই চোখে পড়লো মাটিতে হেলান দিয়ে বসে থাকা একটি কালো আকৃতি। লোকটার পরনে সম্পূর্ণ কালো পোশাক, মুখ কালো মাস্কে আবৃত। ভয়ে অরিত্রিকার বুক কেঁপে উঠলো। কিন্তু লোকটার করুণ অবস্থা দেখে ভয় ছাপিয়ে জাগলো মানবিকতা।তার ডান হাতের বাহুতে কাঁচের টুকরো গেঁথে আছে, আর রক্ত চুঁইয়ে সবুজ ঘাস ভিজিয়ে দিচ্ছে।
অরিত্রিকা দ্রুত তার কাছে গিয়ে বসলো। তার কণ্ঠস্বর ভয়ার্ত,

“কে আপনি? কী হয়েছে আপনার? আপনার এই অবস্থা কেন? আপনি এখানে কিভাবে এলেন?”
লোকটা চোখ তুলে তাকালো। সেই চোখ দুটো দেখেই ভয়ে অরিত্রিকার কলিজা শুকিয়ে গেল। চোখ দুটো বড়ই অদ্ভুত—নীলাভ। এই মুহূর্তে যেন সেই চোখ থেকে আগুন ঝরছে, এক প্রকার বিপজ্জনক ঔদ্ধত্য।
“Cazzo, stai lontano da me. Altrimenti sarai nei guai per il resto della tua vita.”
(ফা*ক, আমার থেকে দূরে থাকো। নাহলে সারাজীবন পস্তাবে।)
তার গলার স্বর এতটাই গভীর ঠান্ডা অরিত্রিকার বুকে কাপন ধরিয়ে দিল। সে কিছুই বুঝল না।তবুও ভয়ে ভয়ে বলল,
“How did you get hurt? Your injury is severe. I am a medical student; you need treatment immediately. Please, come with me, I will arrange it.”
“No need,” লোকটার কণ্ঠস্বর ছিল পাথরের মতো নিচু,
“Stay away from me, or you will regret it for the rest of your life.”
“But you are bleeding profusely!”
অরিত্রিকা জোর দিলো।

“If you don’t stop the bleeding, you might die!”
“These pathetic injuries won’t kill me,” লোকটা প্রায় দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“I’m used to it. I have to leave.”
অরিত্রিকার চোখের সামনেই লোকটা কোনো যন্ত্রপাতির তোয়াক্কা না করে, হাত দিয়ে হিংস্রভাবে কাঁচের টুকরোগুলো টেনে বের করে ফেললো। যন্ত্রণায় তার মুখ বিকৃত হলো। এরপর সে একমুঠো শুকনো মাটি বা বালি নিয়ে ক্ষতের ওপর চেপে ধরলো। অরিত্রিকা—যে কিনা একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট; মানুষের শরীর নিয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করে—এমন নির্মম দৃশ্য দেখে শরীর শিউরে উঠলো।লোকটার অমানুষিক সহ্যক্ষমতা দেখে সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।লোকটা সেসব উপেক্ষা করে শক্ত পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলো।
“Please stop!”
অরিত্রিকা চিৎকার করে উঠলো।
চলন্ত পা দুটো থেমে গেল লোকটার। অরিত্রিকা দ্রুত তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। দ্বিধা না করে নিজের গলার ওড়নাটা খুলে রক্তক্ষরণের স্থানে বেঁধে দিল।

“See a doctor, please। Infection হতে পারে।”
লোকটা এক মুহূর্ত তার শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো অরিত্রিকা পানে। কোনো উত্তর না দিয়ে, দ্রুত পা চালিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। অরিত্রিকা তার চলে যাওয়ার পথের দিকে অপলক তাকিয়ে রইলো। এই লোকটা যেন কোনো সাধারণ মানুষ নয়, বরং এক রহস্যময়, অন্ধকার জগতের বাসিন্দা।
হঠাৎই মনে পড়লো তাকে দ্রুত পিকনিক স্পটে ফিরে যেতে হবে। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সে দ্রুত পা চালাল সেদিকে।

পিকনিক শেষে আবার অরিত্রিকা কলেজ আর পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো। লন্ডনের জীবনযাত্রায় ধীরে ধীরে সে অভ্যস্ত হচ্ছিল।
হঠাৎ একদিন কলেজ থেকে ফিরতে রাত হয়ে যায় অরিত্রিকার। বাস স্টপেজে বেশ কিছুক্ষণ একা দাঁড়িয়ে থেকেও সে কোনো বাসের আসা-যাওয়া দেখতে পেল না। শহরের এই অংশে সাধারণত এত রাতে বাসের চলাচল কম থাকে। ভয়ে বুকটা ধড়ফড় করছিল তার।
ঠিক তখনই একটি কালো গাড়ি এসে তার সামনে দাঁড়ালো। অরিত্রিকা ভয়ে নড়েচড়ে দাঁড়ালো। গাড়ি থেকে নেমে আসা এক স্থূলদেহী লোক তার কাছে এগিয়ে এলো।
“Hey, beautiful, need a ride?”
লোকটার মুখে অশ্লীল হাসি।
“No need,” অরিত্রিকা দ্রুত জবাব দিল।
লোকটা আরো কাছে আসতেই অরিত্রিকা হাঁটা শুরু করলো। লোকটাও তার পিছু পিছু হাঁটতে লাগলো। প্রথমে ধীরে ধীরে, তারপর হাঁটার গতি বাড়তে লাগলো। একসময় অরিত্রিকা ভয়ে ছুট লাগালো। লোকটাও তার সাথে সাথে ছুটতে শুরু করলো।
ছুটতে গিয়ে হঠাৎ একটি গাড়ির ওপর মুখ থুবড়ে পড়লো অরিত্রিকা। গাড়িতে থাকা লোকটি দ্রুত ব্রেক কষে নেওয়ায় তেমন কোন ক্ষতি হলো না।গাড়ির জানালা নেমে গেল। ভেতর থেকে ঠান্ডা, গম্ভীর একটি তিক্ত কণ্ঠ ভেসে এলো,

“Fu*ck Did you choose my car to die in? Were there no other cars in London?”
অরিত্রিকা মাথা তুলে তাকালো। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
“Sorry, I didn’t see it. Actually, this guy has been following me since then…”
মাঝপথেই থেমে গেল বাক্য। বিস্ময়ে চোখ বড় করে চেয়ে রইল অরিত্রিকা। লোকটা গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বের করে রেখেছে।সেই কণ্ঠ, সেই দৃষ্টি…
মুখটা দেখা মাত্রই পেছনে থাকা লোকটা উল্টো দিকে দ্রুত ছুটে পালাল।
অরিত্রিকা উৎসুক কন্ঠে বলল
“You! Aren’t you that guy?”
লোকটার মুখে কোনো উত্তর নেই। কেবল ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। অরিত্রিকা এবার সাহস সঞ্চয় করে জোরপূর্বক মুখে সামান্য হাসি ফুটিয়ে তুললো।
“Well, are you in a big hurry? Would you be kind enough to drop me off?”
“No,”
এক শব্দ।শুষ্ক।নির্দয়। অরিত্রিকার মুখটা চুপসে গেল।

“Get in the car,”
কয়েক সেকেন্ড পর অপ্রত্যাশিতভাবে লোকটা গম্ভীর স্বরে বললো।
অরিত্রিকা দ্রুত গাড়িতে উঠে পড়লো।
“আরে! ঐ লোকটা কোথায় চলে গেল?”
“পালিয়েছে।”
অরিত্রিকা নিজের বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে পারছে না।
“আপনি বাংলা জানেন?”
“শুধু বাংলা নয়, পৃথিবীর নয়টি দেশের ভাষায় দক্ষ।”
“বাহ্ আপনি তো দেখছি অনেক ট্যালেন্টেড! আচ্ছা, আপনি কী করেন? সবসময় মুখে এমন মাস্ক লাগিয়ে থাকেন কেন? আর আপনার হাতে চোট লেগেছিল কিভাবে? আপনি কি ডাক্তার দেখিয়েছিলেন? আপনি জানেন, আপনাকে দেখতে না একদম সিনেমার গ্যাংস্টারদের মতো লাগে। আচ্ছা, আপনার নাম কী? আপনি কিছু বলছেন না কেন? আপনি কি সবসময় এমন চুপচাপ থাকেন? আচ্ছা ঠিক আছে, বেশি কিছু বলতে হবে না। শুধু আপনার নাম আর আপনি কী করেন, সেটা বললেই হবে।”
হঠাৎ লোকটা জোরে ব্রেক কষলো। গাড়ি থেমে গেল। ব্যালেন্স হারিয়ে সামনে ঝুঁকে পড়লো অরিত্রিকা। সে নিজেকে সামলে উঠে কড়া গলায় বলল,
“এটা কী করলেন আপনি? যদি কোনো অ্যাকসিডেন্ট হতো! কতটা ভয় পেয়েছিলাম আমি!”
আচমকা কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই লোকটা তার দিকে ঝুঁকে এলো। ভয়ে গাড়ির দরজার সাথে একেবারে মিশে গেল অরিত্রিকা।লোকটার শীতল নিঃশ্বাস তার মুখে পড়ছিল। লোকটা তার এতটাই কাছে যে তার হৃদস্পন্দনের শব্দও যেন অরিত্রিকার কানে বাজছে। ভয়ে তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল।

“আ-আপনি কী করছেন?”
লোকটার হিমশীতল ফিসফিসানো কণ্ঠস্বর,
“জিজ্ঞেস করলে না, আমি কী করি? যাদের মুখ বেশি চলে, তাদের মুখ বন্ধ করে দিই চিরতরে। Because I don’t like noise pollution.”
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল অরিত্রিকার। সে ফাঁকা ঢোক গিলে শ্বাসরুদ্ধ গলায় বলল,
“আ-আপনি…”
“I’m a gangster. Actually, no. I am the boss of all the gangs here।”
লোকটা এবার সোজা হয়ে বসলো। সামনের দিকে ইশারা করে বললো,
“Your apartment।”
অরিত্রিকা তড়িঘড়ি করে গাড়ি থেকে নামলো। মাথা নিচু করে জানালার সামনে গিয়ে ফিসফিস করে বললো,
“ধন্যবাদ, পৌঁছে দেওয়ার জন্য। যদিও আমি মজা করছিলাম কিন্তু আপনাকে দেখতে কিন্তু সত্যিই সিনেমার গ্যাংস্টারদের মতো।”
লোকটা ভ্রু তুলল।এক সেকেন্ড অরিকে তাকিয়ে দেখল।যেন তাকে প্রথমবার মন দিয়ে দেখছে।
অরিত্রিকা চলে গেলে, গাড়ির ভেতরে থাকা লোকটা তার ব্লুটুথ হেডসেটে ফিসফিস করলো,
“জুচো, I want every piece of information about that girl………”

রাত তখন বেশ গভীর। নিজের বিছানায় শুয়ে ছিল অরিত্রিকা। হঠাৎ তার মনে পড়লো—সে তো লোকটাকে তার অ্যাড্রেস বলেনি! তাহলে লোকটা কিভাবে জানলো? তার মানে কি লোকটা তাকে আগে থেকেই ফলো করছিল! একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল তার শিরদাঁড়া বেয়ে।

এরপর থেকে লোকটার সাথে প্রায় রোজই দেখা হতে লাগলো অরিত্রিকার—গাড়ির মধ্যে বসে থাকতো লোকটা। কখনো কলেজের ফটকে, কখনো সে যে কফি শপে যায় সেখানে, কখনো বা অ্যাপার্টমেন্টের নিচে। অরিত্রিকা ক্রমশ বিরক্ত হচ্ছিল, কিন্তু এক ধরনের অদ্ভুত আকর্ষণও অনুভব করছিল।
একদিন তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। সে লোকটাকে একা পেয়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বললো,
“এটা কী হচ্ছে? যেখানে যাচ্ছি, শুধু আপনি! আপনি কি আমাকে ফলো করছেন?”
“হ্যাঁ”
লোকটার কণ্ঠে কোনো দ্বিধা নেই। অরিত্রিকা হতভম্ব।
“কেন?”
“Because I wanna marry you. And… I think, I…. Like you।”
অরি স্তব্ধ।হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছিল না।
“হোয়াট! আপনি আমাকে সোজা বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে দিচ্ছেন!! দুদিনে কেউ কাউকে পছন্দ করে?”
“জানি না। But I want you desperately. সেদিন গাড়ি থেকে তোমাকে নামিয়ে দেওয়ার পর আর একটা রাতও ঘুম হয়নি আমার। এভবি টাইম… সব জায়গায় শুধু তোমাকেই ইমেজিন করছি।আমার সব শান্তি কেড়ে নিয়েছো তুমি। আর শান্তি পেতে হলে তোমাকেই লাগবে আমার।সেদিনের মতো রোজ তোমার বকবক শুনতে চাই আমি।”
লোকটার কণ্ঠে গভীর আসক্তি।

“আপনার মাথার স্ক্রু মনে হচ্ছে ঢিলে হয়ে গেছে! আপনাকে প্রথম দিন থেকেই কেমন যেন অদ্ভুত লাগে!”
“আমি অদ্ভুত। But I’m crazy about you.”
অরিত্রিকা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।সত্যিই মনে হয় এই লোকটা মানসিক ভারসাম্যহীন। তার ভাবনার মাঝে লোকটা ফিসফিস করে উঠলো,
“I didn’t get my answer.”
অরিত্রিকা আর কিছু না বলে হাঁটা শুরু করলো।
লোকটা গাড়িতে উঠে পড়লো। হঠাৎ অরিত্রিকা থেমে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
“শুনুন, আপনার নামটা কিন্তু এখনো বলেননি!”
লোকটা চোখে সানগ্লাস পরে গাড়ির কাঁচ নামিয়ে বললো,
“জেরিক জারকোভ।”

সন্ধ্যায় গুনগুনিয়ে মনের সুখে রুমে প্রবেশ করলো অরিত্রিকা। ঘরে ঢুকেই সে থমকে দাঁড়ালো।ফিসফিস করে অস্ফুটে বলল,
“ভাইয়া, তুমি!”
সোফায় বসে ছিল আব্র। সে এক ছুটে গিয়ে আব্রকে জড়িয়ে ধরে উৎফুল্ল কণ্ঠে বললো,
“তুমি কখন এসেছো? আমাকে আগে বলোনি কেন?”
আব্র মিষ্টি হেসে অরিত্রিকার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। “বললে কী আর সারপ্রাইজ দেওয়া হতো!”

“তারপর?……..”
আলেসান্দ্রো হাতের গ্লাভস খুলে টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়ালো। ড্যানিয়েল তার দিকে কৌতুহল ও উৎকণ্ঠা নিয়ে চেয়ে আছে।যেন সে দীর্ঘ এক উপন্যাসের শেষ অধ্যায়ের অপেক্ষায় আছে।
“তারপর আর কি যা হওয়ার তাই হলো। সিনেমা দেখিস নি কখনো? অরিত্রিকা জারকোভকে ভালোবেসে ফেললো।আর যখন অরিত্রিকার ভাই আব্র দেখলো, ওর বোনের সুখের উৎস কোথায়, তখন সে আর বিরোধিতা করলো না। সেই দুজনের বিয়েতে বড় ভূমিকা নিলো।
আলেসান্দ্রো থামলো।
“কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী আহনাফ চৌধুরী যখন এই ঘটনা জানতে পারলেন, যথারীতি সে মেনে নিতে পারলেন না।তিনি সাথে সাথেই মেয়েকে প্রত্যাখ্যান করলেন। মেয়েকে তিনি অনেক বেশি ভালোবাসতেন, আর বিশ্বাস করতেন। অনেক স্বপ্ন ছিল একমাত্র মেয়েকে নিয়ে। তাই নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে মেয়ের ইচ্ছে পূরণের জন্য বিদেশ পাঠিয়ে ছিলেন। কিন্তু ধর্ম, সম্মান, ঐতিহ্য—সবকিছু তাঁর কাছে আপসহীন।তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তিনি আর কখনো অরিত্রিকা চৌধুরী’র মুখ দেখতে চান না। মেয়ে হিসেবেও তিনি তাকে মেনে নিবেন না।

বাবার কঠিন সিদ্ধান্ত অরিত্রিকাকে ভেঙে দিল।তখন জারকোভ অরিত্রিকাকে নিয়ে নিজ দেশ ইতালি চলে এলো। তারপর সেখানেই তাদের নতুন জীবন শুরু হলো। এর মধ্যেই অরিত্রিকা প্রেগন্যান্ট হয়ে গেল। এই সময়ে আহনাফ চৌধুরীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন হলেও, তৃধা চৌধুরীর সাথে প্রায়ই লুকিয়ে লুকিয়ে তার যোগাযোগ হতো।অন্যদিকে, অরিত্রিকার ভাই, মানে আব্র চৌধুরী, তিনি বিয়ে করলেন জারকোভের বোন জেসিকাকে। অরিত্রিকার বাচ্চা হওয়ার কয়েকমাস পর জেসিকাও প্রেগন্যান্ট হলো। সবাই মিলে বেশ আনন্দেই দিন কাটাচ্ছিল। কিন্তু নিয়তি হয়তো অন্য কিছু লিখে রেখেছিল। জেসিকার প্রেগন্যান্সিতে কমপ্লিকেশন ছিল, আর ডেলিভারির সময় সে মারা যায়। স্ত্রীর মৃত্যুতে শোকে পাথর হয়ে যান আব্র চৌধুরী।

অরিত্রিকা সেই সদ্যোজাত শিশুকে নিজের সন্তানের মতোই বুকে আগলে নিলো।জীবনটা যখন স্বাভাবিক হচ্ছিল, ঠিক তখনই বিস্ফোরণটা ঘটল। একদিন অরিত্রিকা জানতে পারল… তার স্বামী জারকোভ কোনো সাধারণ মানুষ বা কোনো বিজনেস ম্যান নয়। কোনো একজন সাধারণ গ্যাংস্টারও নয়… সে সত্যি কারের অর্থেই ইউরোপের অন্যতম কু*খ্যাত মাফিয়া বস!
এই সত্যিটা জানার পর অরিত্রিকা আর এক মুহূর্তও থাকতে পারলো না।মাফিয়াদের জীবন, রক্তপাত—এটা তাঁর জন্য অকল্পনীয় ছিল। তাঁর বাবার এত বড় রাজনৈতিক পদ, আর স্বামীর এই অন্ধকার জগৎ—সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। তিনি সন্তানদের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে জেরিককে ছেড়ে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন।দুই সন্তান আর ভাইকে নিয়ে সোজা চলে এলেন বাংলাদেশ, “চৌধুরী মেনশন”। মেয়েকে প্রথম দেখায় মুখ ফিরিয়ে নিলেন আহনাফ চৌধুরী। কিন্তু তৃধা চৌধুরীর আকুতি মিনতি আর বাচ্চাদের নিষ্পাপ মুখ দেখে শেষমেশ নিয়মের কঠিন দেওয়াল ভেঙে গেল। তিনি মেয়েকে ঠাই দিলেন বাড়িতে। একসময় সব মান-অভিমান ভুলে তিনি তাঁর মেয়েকে আবার বুকে টেনে নিলেন।
কেটে যায় বেশ কয়েক বছর। কিন্তু স্ত্রী সন্তানকে ছাড়া একা থাকতে পারছিল না জারকোভ, তাই সেও সবকিছু ছেড়েছুড়ে ইতালি থেকে বাংলাদেশে চলে এলো। সে সময় আহনাফ চৌধুরী কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েন।
আলেসান্দ্রো এক মুহূর্ত থামলো।ড্যানিয়েল তখনও অধৈর্য।

“তারপর?……..”
“তারপর আর কি বাবার মৃত্যু।”
“মানেহ্! কার বাবা?”
আলেসান্দ্রো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ড্যানিয়েলের দিকে তাকালো।
“তুই জানিস আব্র আর জেসিকা কে ছিল?”
“কে ছিল?”
আলেসান্দ্রোর নীলাভ চোখ দুটো শীতল হয়ে উঠেছে,
“আমার বাবা মা। আর যেই বাচ্চাটাকে অরিত্রিকা মায়ের ভালোবাসা দিয়ে বুকে আগলে নিয়েছিল, সেটা আমি………”

“আরে কি করছেন? পোলাও তো ঝরঝরা থাকে! আপনি চালে পানি দিচ্ছেন কেন? পানি দিলে তো ভিজে যাবে!”
বিখ্যাত ইতালীয় শেফ, ‘এঞ্জো কারভ্যালি’ যার রান্নার জাদুতে গোটা ইউরোপ মুগ্ধ, আজ যেন এক কাঠের পুতুল! সামনে দাঁড়িয়ে আছে রিম। তার সরল উক্তিতে এঞ্জো যেন মুখের ভাষাই হারিয়ে ফেললো। সে হতভম্ব হয়ে রিমের সরল মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।রিমের ভাবখানা এমন—সে যেন শেফকে একটা মৌলিক বৈজ্ঞানিক সত্য শেখাচ্ছে। তার সরল চোখ দুটো চোখ পিটপিট করছে।
“ম্যাডাম, আপনি কি সত্যিই কোনোদিন আপনার মায়ের রান্নাঘরে… মানে, সামান্য উঁকিও দিয়েছিলেন?”
রিমের আত্মবিশ্বাসী মুখটি তৎক্ষণাৎ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“না। মা তো চিরকাল শুধু একটা কথাই বলেছেন—’মন দিয়ে শুধু পড়াশোনা করবি। যেন একটা ভালো চাকরি করতে পারিস।’… রান্না করার সুযোগই কোনোদিন দেননি। তবে টুকটাক কিছু পারি। এই যেমন- ডিম সেদ্ধ, আলু সেদ্ধ, ডাল সেদ্ধ তারপর কাপ নুডুলস আরো অনেক কিছু।”

এঞ্জো বুঝতে পারলেন, পরিস্থিতি গুরুতর। তবে বসের কঠিন নির্দেশ মনে পড়তেই তাঁর বুক কেঁপে উঠল। ‘ম্যাডামের সব কথা বেদবাক্য, অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে!’ —এই কথা না মানলে যে কী ভয়ংকর পরিণতি হবে, তা তাঁর ভালো করেই জানা। তিনি নম্রতা বজায় রেখে বললেন,
“ঠিক আছে ম্যাম। আপনি চিন্তা করবেন না। আজকের রান্নাটা নাহয় সম্পূর্ণটাই আমি সামলাচ্ছি। আপনি বরং আরাম করে চেয়ারটায় বসে সব দেখুন। শিখতে তো হয়! পরের বার নাহয় আপনি শুরু করবেন।”
রিম কোমরে হাত রেখে মুখ শক্ত করল।জেদি গলায় বলল,
“না আজকে আমিই রান্না করবো। আর তুমি কি রান্না করবে? তুমি তো নিজেই কিছু জানো না! আমাকে কী শেখাবে? সরো তো!”
রিম তার দামী ওড়নাটা দ্রুত কাঁধ থেকে খুলে কোমরে শক্ত করে বাঁধল—ঠিক যেন রান্নাঘরের রণাঙ্গনে নামার প্রস্তুতি।
“শোনো আমি যা যা বলছি, তুমি এখন শুধু সেটাই করবে।রাইস কুকারে চাল ধুয়ে দাও।”
“কিন্তু ম্যাম পানি না দিলে তো কুকার পুড়ে যাবে। ছোটখাটো একটা ব্লাস্টও হতে পারে।”
“পানি দিলে তো ভাত খিচুরি হয়ে যাবে। তুমি নিশ্চয়ই সেটাই চাইছো!”
“ম্যাম আপনি বুঝতে পারছেন না।”
“তুমি বুঝতে পারছো না।”

এঞ্জো এক প্রকার আত্মসমর্পণ করলেন। নিজের চোখে ছোটখাটো একটা দুর্ঘটনা দেখা ছাড়া তাঁর আর কোনো উপায় রইল না। ‘যাকগে, একটা রাইস কুকার পুড়লে পুড়ুক! বড়জোর একটা হালকা বিস্ফোরণই হবে! অন্তত, এই ভয়ঙ্কর চাকরিটা তো বাঁচবে!’ —এই ভেবে তিনি আর কথা না বাড়িয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে রিমের কথামতো চাল ধুতে শুরু করলেন।
রিম রান্নাঘরের তাকের দিকে চোখ বোলাচ্ছিল, ঠিক কোথা থেকে শুরু করবে তা বুঝতে পারছিল না। মনযোগ বিক্ষিপ্ত করতে সে একটি কেচাপের বোতল টেনে নিল, আঙুল ডুবিয়ে সামান্য কেচাপ মুখে নিয়ে জিভের ডগায় একটু স্বাদ নিল।
ঠিক তখনই, তার জামার ফাঁকে উদরের মসৃণ ত্বকে একটি ঠান্ডা, রুক্ষ হাতের স্পর্শ পেল। সেই স্পর্শে তার শরীর বিদ্যুতের মতো কেঁপে উঠলো। এক সেকেন্ডের জন্য তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। চিরচেনা পুরুষালী ক্লোনের কড়া পারফিউমের মাদকতা নাকে আসতেই রিম যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো।
রিমের কোমরে জেইনের একটি হাত শক্ত হয়ে চেপে বসলো, অন্য হাতটি ধীরে ধীরে তার বুকের নরম উঁচু অংশ জুড়ে বিচরণ করতে লাগলো—এক ধীর, বেপরোয়া গতিতে। জেইন তার মুখ ডুবিয়ে দিল রিমের ঘাড়ে। উষ্ণ নিঃশ্বাস রিমের ত্বকে মিশে যাচ্ছে, জেইনের ঠোঁটগুলি রিমের উষ্ণ ঘাড়ের উপর আলতো করে চু*ষন করে জিভ দিয়ে সেই অংশটুকু শ্লেহন করছে। মাঝে মাঝে মৃদু, গভীর চুম্বনের শব্দ।

রিম দু’হাতে শক্ত করে নিজের জামার কাপড় খামচে ধরলো। এই তীব্র স্পর্শে তার ঠোঁট সামান্য ফাঁক হয়ে গেল, সে ঘন ঘন নিঃশ্বাস টানতে লাগলো—যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে। জেইনের স্পর্শ যত তীব্র ও বেপরোয়া হচ্ছে, রিমের মুখ থেকে তত মৃদু স্বরে একরকম গোঙানির আওয়াজ বেরিয়ে আসছে, যা সেই মুহূর্তে রান্নাঘরের নৈঃশব্দ্যে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
জেইন ধীরে ধীরে ঘাড় থেকে তার জিভ ছুঁইয়ে গলার দিকে উঠে এলো। কানের লতিতে আলতো করে চুমু খেয়ে সেটিকে নিজের ঠোঁটের মধ্যে পুরে নিল। ধীরে ধীরে শুষে নিতে লাগলো।
রিমের সারা শরীর জুড়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ হচ্ছে, সে অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে।নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়ে সে এক হাত পেছনে নিয়ে জেইনের সিল্কি চুল শক্ত করে খামচে ধরলো। জেইন যেন আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠলো। মুহূর্তেই রিমকে এক হেঁচকায় নিজের দিকে ঘুরিয়ে, কোমরে টান দিয়ে একেবারে মিশিয়ে নিল। রিমের চোখ বন্ধ, পাতা কাঁপছে। নিঃশ্বাস ধীর। কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে সে ফিসফিস করে বলল,

“ক-কি করছো? উনি তো দেখেছেন। ছাড়ো প্লিজ। আহহ্…. ছাড়োহ্।”
জেইনের হাতের স্পর্শ আরো তীব্র হয়ে উঠলো। রিমকে দুহাতে শূন্যে তুলে কিচেন কেবিনেটের শীতল প্ল্যাটফর্মের উপর বসিয়ে দিল। গাঢ় হাস্কি ভয়েসে ফিসফিস করে বললো,
“কেউ ছেখছে না। এখানে কেউ নেই।”
রিম ঠাস করে চোখ খুলে ফেললো। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো সত্যিই শেফ নেই।
“উনি কোথায় গেল?”
“চলে গেছে।”
এইটুকু বলেই জেইন রিমের গলায় মুখ গুঁজে দিল। তার অস্থিরতা এখন গভীর আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়েছে। চুম্বন আরো গভীর হয়ে উঠলো।রিম যেন দেয়ালে মিশে যাচ্ছে, তার শরীর পেঁচিয়ে যাচ্ছে সাপের মতো, যেন আত্মসমর্পণ করতে চাইছে। সে জেইনের চুল শক্ত করে খামচে ধরলো, নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো, কিন্তু জেইনের এই তীব্র, অবাধ্য স্পর্শ থামছিল না।

তখন জেইন এখানে আসতেই চোখের ইশারায় শেফ এঞ্জোকে চলে যেতে বলেছিল, আর এঞ্জো এক মুহূর্ত দেরি না করে তৎক্ষণাৎ দ্রুত প্রস্থান করেছিল।
“আহহ্…. ছাড়োহ্ কেউ এসে যাবে।”
রিম ধীরে শ্বাস টেনে মৃদু স্বরে ফিসফিস করে উঠলো।
“কেউ আসবে না।”
“এটা কিচেন। তোমার বেডরুম নয়!”
জেইন ঠোঁট কামড়ে ক্রুর হাসলো,

“সো হোয়াট? মাই কিংডম, মাই ওয়াইফ, মাই উইশ।আমার যেখানে ইচ্ছে হবে সেখানেই করবো। বাথটাবে ঘুমাবো, বেডে শাওয়ার নিব, ড্রয়িং রুমে খাবার খাবো। আর কিচেনে… তোমায়।…. মিনস্ তোমার সাথে রোমান্স করবো।”
জেইন আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। তার চোখের অতল গহ্বরে যে মত্ত নেশা খেলা করছিল, তা রিমের হৃদস্পন্দনকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। জেইনের শুষ্ক, তৃষ্ণার্ত ঠোঁটদুটো রিমের গোলাপের পাপড়ির মতো কোমল ওষ্ঠদ্বয়কে তীব্রভাবে গ্রাস করল। এক গভীর আকাঙ্ক্ষাপূর্ণ চুম্বন।জেইন রিমের নিচের ঠোঁটটি তার নিজের ওষ্ঠপুটে বন্দি করে নিয়ে অত্যন্ত ধীরলয়ে আস্বাদন করে চুষ-তে লাগল , যেন এই মুহূর্তের সবটুকু স্বাদ নিতে চাইছে।
রিম ছটফট করে উঠলো—তার বুকের ভেতরটা হাহাকার করছে একটু বাতাসের জন্য, ফুসফুসে যেন অক্সিজেনের আকাল পড়েছে। কিন্তু জেইনের দুহাতের বেষ্টনী আর এই অতলস্পর্শী চুম্বনের তীব্রতায় সে এক পরম অসহায় শিকার। তার পালানোর কোনো পথ নেই, কেবল এই জাদুকরী ঘূর্ণাবর্তে তলিয়ে যাওয়া ছাড়া। বেশ কিছুক্ষণ পরেও জেইন রিমের ঠোঁট ছাড়ল না। রিমের নিঃশ্বাস যখন প্রায় বন্ধ, মুক্তির জন্য মরিয়া হয়ে, রিম শেষে জেইনের নিচের ঠোঁটে কুট করে একটি ক্ষুদ্র কামড় বসিয়ে দিল।

তৎক্ষণাৎ জেইন ঠোঁট ছেড়ে দিল।সে তার নেশালো চোখ দুটো রিমের চোখে স্থির করল।তার বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠোঁটের কামড়ে দেয়া স্থান থেকে রক্তবিন্দু মুছে নিল। সেই রক্তটুকু আলতো করে নিজের ঠোঁট দিয়ে শুষে নিলো। জেইনের সেই নেশাভরা, বন্য দৃষ্টি আর রক্ত আস্বাদনের ভঙ্গি রিমের সারা শরীরে এক অসহ্য শিহরণ বইয়ে দিল। পায়ের পাতা পর্যন্ত সেই শিরশিরানি অনুভব হলো।
জেইনের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল সেই পরিচিত, বন্য শয়তানি হাসি। রিমের ভেতরের চাপা উত্তেজনাকে আরও উস্কে দিতে সে রিমের একটি আঙুল তুলে নিয়ে টকটকে লাল কেচাপের বোতলে ডুবিয়ে দিল। রিমের চোখে চোখ রেখে, এক মুহূর্ত পলক না ফেলে, জেইন নিজের জিভ বের করে সেই আঙুলের কেচাপটুকু অত্যন্ত ধীরলয়ে চেটে নিল। পরক্ষণেই আচমকা সে রিমের সেই সরু আঙুলটি নিজের উষ্ণ মুখে পুরে দিয়ে গভীর নেশায় শ্লেহন করতে শুরু করল।
জেইনের সেই আর্দ্র জিভের পরশ আর ঠোঁটের মৃদু চাপে রিমের শরীর এক অদ্ভুত, অবর্ণনীয় যন্ত্রণায় মুচড়ে উঠল। তার ঠোঁট দুটো আপনাআপনি ফাঁক হয়ে এলো, বুকের খাঁচা দ্রুত ওঠানামা করছে—নিঃশ্বাস যেন ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে। জেইন রিমের আঙুলটি মুখ থেকে বের করে তার হাতের উল্টো পিঠে শব্দ করে এক গভীর চুম্বন এঁকে দিল, রিমের মনে হলো তার শিরদাঁড়া দিয়ে এক তীব্র শীতল স্রোত বয়ে গেল।

জেইন এক মুহূর্ত থামল, রিমের চোখের গভীরে তার অস্থিরতা খুঁজল, তারপর এক দীর্ঘ ও গভীর শ্বাস টেনে নিল। তার চোখের মণি এখন এক অদম্য আকাঙ্ক্ষার ভাষা বলছে। সে আলতো ভাবে রিমের জামাটা সামান্য সরিয়ে দিল। উদরের সেই মসৃণ, দুগ্ধধবল ত্বকে নাভির ঠিক মধ্যবিন্দুতে জেইন তার মাঝের আঙুলটি আলতো ভাবে প্রবেশ করিয়ে দিল।
প্রথম স্পর্শেই রিম শিউরে উঠল। জেইন থামল না; সে ধীরে ধীরে, এক ছন্দময় মত্ততায় সেই অংশে আঙুল ঘষতে লাগল। শীতল কিচেন ক্যাবিনেটের ওপর রিমের শরীর যেন মোমের মতো গলে যাচ্ছে, তার পিঠ ধনুকের মতো বেঁকে উঠছে বারবার। তার নিঃশ্বাস এখন অস্বাভাবিক দ্রুত—এক অসহ্য অথচ পরম তৃপ্তির যন্ত্রণায় সে ছটফট করছে। রিমের অবচেতন মন যেন চিৎকার করে বলছে, এই মুহূর্তে হয়তো মরে গেলেও সে মুক্তি পাবে না, কারণ তার শরীর ও আত্মা জেইনের কাছে আরও বেশি কিছু চাইছে।

কিন্তু জেইন যেন তাকে এই যন্ত্রণার শেষ সীমানায় নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর। রিমের এই সংবেদনশীল অবস্থাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে জেইন ধীরগতিতে নিচে ঝুঁকে বসল। তার কণ্ঠস্বর এখন এতটাই গাঢ় আর গম্ভীর যে তা রিমের কানের পর্দায় এক তীব্র কম্পন সৃষ্টি করল। সে রিমের দু’পায়ে তার হাত রেখে ফিসফিস করে বললো,
“ওপেন ইয়োর লেগস্ ফর মি।আই ওয়ান্ট টু লি*ক ইট।”
রিম শ্বাস আটকে ক্যাবিনেটের ওপর বসে রইল।তার কণ্ঠনালি মরুভূমির মতো শুকিয়ে কাঠ, প্রতিটি ঢোক গেলাই যেন এক দুঃসাধ্য লড়াই। জেইনের চোখের সেই ঘন হয়ে আসা অন্ধকার নেশা দেখে তার শরীরের প্রতিটি কোষ অবশ হয়ে আসছিল। জেইন ধীর লয়ে এগোলো; তার দু’হাত রিমের উরুর ওপর স্থির হলো, রিম এক অদ্ভুত বিদ্যু তরঙ্গ অনুভব করল। জেইন অত্যন্ত ধীরগতিতে, প্রায় সম্মোহনী ভাবে রিমের পা দুটোকে আলগা করে ফাঁক করে দিল—যেন এক নিষিদ্ধ রাজ্যের গোপন দুয়ার উন্মোচন করছে সে।

প্রথমে স্পর্শটা ছিল পালকের মতো নরম, কিন্তু মুহূর্তেই তা বদলে গেল তীব্র ও গভীর চুম্বনে। মুহূর্তেই রিমের জগত ওলটপালট হয়ে গেল। জেইনের অবাধ্য স্পর্শে রিমের শরীর বিদ্যুতের তীব্রতায় শিরশিরিয়ে এক ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। তার শরীর অবশ হয়ে সামনের দিকে সামান্য হেলে পড়ল, ভারসাম্য হারিয়ে সে যেন জেইনের অস্তিত্বে বিলীন হতে চাইল। তার মাথাটা এলিয়ে পড়ল পেছনে, চোখের সামনে কিচেনের সিলিংটা ঝাপসা হয়ে এল। ঠোঁটের ফাঁক থেকে বেরিয়ে আসা ঘন, ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ কিচেনের ভারী নীরবতাকে ছিঁড়ে দিচ্ছিল। রিমের চোখের কোণে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল—সেটা কি অসহ্য সুখের চরম সীমা, নাকি এক তীব্র যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ? বোঝা দায়।
কিন্তু এই আচ্ছন্ন ভাবের মাঝেই,

“উফ্….umm…ummmhh….uhmmm!!!”
রিমের ঠোঁটের ফাঁক থেকে মৃদুস্বর।হঠাত জেইনের স্পর্শ এতটাই তীব্র যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠলো যে রিম অচেতনে নিজের সমস্ত শক্তি এক সুতোয় গেঁথে দু’হাতে প্রচণ্ড এক ধাক্কা দিল জেইনকে। জেইন তখন হাঁটু গেড়ে বসে রিমের নেশায় বিভোর ছিল, তাই এই আকস্মিক ধাক্কায় সে টাল সামলাতে না পেরে ধপ করে মেঝেতে পড়ে গেল।
জেইনের বুঝে উঠতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। তারপর ক্রুর হেসে মেঝেতে এক হাতে ভর দিয়ে গা ছাড়া ভাব নিয়ে আধশোয়া অবস্থায় বসলো, তার চোখেমুখে কোনো রাগ নেই, বরং এক অদ্ভুত তৃপ্তি। সে জিভ দিয়ে নিজের ঠোঁট দুটো চেটে নিল, তারপর বুড়ো আঙুল দিয়ে ঠোঁটের কোণটা মুছে নিল। গাঢ়, হাস্কি ভয়েস সে বলল,
“উমম্… ফা*ক! সো জুসি। সুইটার দেন হানি।আই ওয়ান্ট টু সা*ক ইট এগেইন এন্ড এগেইন।”
জেইনের সেই কণ্ঠস্বর রিমের শিরদাঁড়া দিয়ে এক ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দিল, মনে হলো এই মানুষটি কেবল তার শরীর নয়, তার আত্মাকেও নিজের দখলে নিতে চায়।রিমের শ্বাস দ্রুত কিন্তু স্থির। চোখ জ্বলছে।
“কাছে আসবে না একদম। তাহলে কিন্তু চিবিয়ে খেয়ে ফেলবো তোমায়! দেখো নি আমি কত মন দিয়ে কাজ করছিলাম। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমার রান্না শেষ হচ্ছে একদম ডিস্টার্ব করবে না, বলে দিচ্ছি। খুব বেশি অসভ্য হয়ে গেছো তুমি।”
মেঝেতে বসা জেইন ঠোঁট কামড়ে হাসলো। উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে রিমের দিকে এক পা এক পা করে এগিয়ে আসতে লাগলো,

“আমি যে অসভ্য, এটাতো আমি জানি। বাট….”
সে একটু থেমে রিমের একেবারে কাছাকাছি ঘেঁষে এলো, তার কণ্ঠস্বর এখন গভীর ফিসফিসানি,
“তুমি কি জেনো বললে? ওহ্ হ্যাঁ আমাকে চিবিয়ে খাবে… রাইট? সো কখন খাবে বলো। আই’ম অল ইয়োরস্। তুমি যখন বলবে তখনই রেডি হয়ে যাবো… সোনা। ”
“ছিহ্!”
রিম তাকে দুহাতে ধাক্কা দিয়ে দুরে সরিয়ে দিল।
“যাওহ্ এখান থেকে। এখুনি!! নয়তো রাতে তোমাকে ছেড়ে অন্য রুমে চলে যাবো আমি।”
জেইনের মুখ থমথমে হয়ে গেল। তার চোখ থেকে সমস্ত নেশা মুছে গিয়ে সেখানে অসহায়তা ফুটে উঠল।
“এ-এই না, এমন বলো না প্লিজ। তোমাকে ছাড়া থাকবো কিভাবে? কষ্ট হবে তো।”
“তুমি যাবে!!!”
রিম চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই, জেইন শুষ্ক ঢোক গিলে ফেলল।
“যাচ্ছি তো এমন করছো কেন?”

ড্রয়িংরুমের বিলাসবহুল সোফায় বসে ছিল ইয়াশ। দেখে মনে হচ্ছে যেন কোনো ভেঙে পড়া মূর্তি। তার মাথার চুল উস্কোখুস্কো, যেন সারারাত ঘুমোয়নি। চোখ দুটি ফুলে রক্তবর্ণ—এক তীব্র মানসিক কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। তাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকে তাকালো জেইন, তার চোখে প্রশ্ন।
“কি হয়েছে তোর? এমন বিধ্বস্ত লাগছে কেন?”
ইয়াশের মাথা নিচু। মৃদু স্বরে উত্তর দিলো, যেন প্রতিটি শব্দ বের করতে কষ্ট হচ্ছে,
“কিছু না। রাত্রে একটু বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম, ঠান্ডা লেগেছে। হয়তো তাই এমন লাগছে।”
তখনই সেখানে উপস্থিত হয় এলেনা। ইয়াশ তার দিকে একবার তাকিয়ে দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিলো। তার এই উপেক্ষায় এলেনার বুক অদ্ভুত যন্ত্রণায় কেঁপে উঠলো। সে টলটলে চোখে ইয়াশের দিকেই দৃষ্টি তাক করে রাখলো। জেইন এলেনার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল,

“মিটিংয়ের টাইম ফিক্স করা হয়েছে?”
“হ্যাঁ 12 am।”
“আআ্আ্আ্হহহ্……..”
তীব্র আর্তনাদের সঙ্গে ঝনঝন করে কাঁচ ভাঙার শব্দ ভেসে এলো রান্নাঘর থেকে। আতঙ্কে জেইনের বুক কেঁপে উঠলো, হৃদস্পন্দন যেন থেমে গেল এক লহমায়।ঝড়ের বেগে সে রান্নাঘরের দিকে ছুটল।
রান্না ঘরের মেঝেতে কাঁচের ধারালো টুকরোগুলো ছড়ানো। রিম এক হাত চেপে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। হাতের ক্ষত থেকে টাটকা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। জেইন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। চোখ বন্ধ করে একটি দীর্ঘ, গভীর নিঃশ্বাস টেনে নিলো—যেন নিজেকে স্থির করার চেষ্টা করছে।
পরক্ষণেই রিমকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিয়ে সে ড্রয়িংরুমের দিকে ছুটে এলো। ভয়ে রিম জেইনের গলা জড়িয়ে তার বুকে মুখ গুঁজে রইল। জেইনের বুকের ধুকপুক শব্দ যেন তার কানে বাজছে।
জেইন রিমকে সোফার উপর বসিয়ে এক বিকট চিৎকারে ফেটে পড়ল,
“মাত্তেওওওও…. মাত্তেওও!!!! ইডিয়ট!!!! কোথায় তোরা? ডাকলে সাড়া দিস না কেন? ফার্স্ট এইড নিয়ে আয়! তাড়াতাড়ি!!!”

“ব্রো, কী বলছিস তুই? মাত্তেও এখানে কিভাবে আসবে? ও তো হসপিটালে!”
ইয়াশের কন্ঠে জেইনের ঘোর কাটল। রিমের কাটা হাত দেখে সে এতই অস্থির যে সবকিছু ভুলে বসেছে।
রিম ফুঁপিয়ে শব্দ করে কেঁদে ওঠলে জেইন আরও বেশি অস্থির হয়ে উঠলো। তার অস্থিরতা এখন প্রায় উন্মত্ততার পর্যায়ে।
“তাড়াহ্… তাড়াতাড়ি ফার্স্ট এইড নিয়ে আয়। হাত অনেক বেশি কেটে গেছে। কতখানি রক্ত বেরিয়ে গেছে দেখছিস না? আমার জ্বলছে… খুব। সহ্য করতে পারছি না।”
তার কন্ঠ এতটাই অস্থির যেন আঘাতটা তার নিজের শরীরে লেগেছে। যেন সেই যন্ত্রণা সে অনুভব করতে পারছে।
তৎক্ষণাৎ ফার্স্ট এইড বক্স নিয়ে হাজির হলো এলেনা। জেইন থাবা দিয়ে তার হাত থেকে বক্সটা প্রায় কেড়ে নিলো। তার বুকের অস্থিরতা থামছে না কিছুতেই। রিমের হাতটা নিয়ে সে খুব সাবধানে তুলো দিয়ে রক্ত মুছে পরিষ্কার করল। কাঁচের ক্ষতের পাশাপাশি হাতে ফোস্কাও পড়েছিল।
রান্নাঘরে না বুঝে গরম ঢাকনায় হাত রাখতেই অতিরিক্ত তাপে ঝলসে যায় হাত, আর তাতেই ঢাকনা হাত থেকে পড়ে ভেঙে যায়।ভাঙা কাঁচের টুকরো উঠাতে গিয়েই এই আঘাত।
জেইনের চোয়াল শক্ত, মুখের পেশীগুলো টানটান। তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল না সে প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছে নাকি সীমাহীন রাগে ফুঁসছে। ঠান্ডা মলম হাতে লাগাতেই জ্বলুনিতে শব্দ করে কেঁদে উঠলো রিম। চোখের জল বাঁধ মানল না, গাল বেয়ে ঝরতে লাগলো।

“চুপ!!!! একদম চুপ!!”
দাঁতে দাঁত চেপে, চিবিয়ে চিবিয়ে বলল জেইন।
“আর একবার তোমার কান্নার শব্দ শুনতে চাই না আমি। আই স্যুয়ের জানে মেরে দেবো একদম। আমি বলেছিলাম না!!, এসব কিছু করতে হবে না তোমায়। যেটা পারো না সেটা করতে যাও কেন!!! হ্যাঁ? এই তুমি কি বোঝো না?!! তোমার এতটুকু কিছু হলে যন্ত্রণায় ফেটে যায় আমার বুক। তোমার চোখের জল সহ্য করতে পারি না আমি। বোঝো না তুমি?!!!”
রিম মাথা নিচু করে আরো জোরে শব্দ করে ফুঁপিয়ে উঠে। এতে যেন জেইনের রাগ আরো দ্বিগুন বেড়ে যায়। সে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে বড় করে নিঃশ্বাস টেনে নেয়। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে,
“অ্যাই, অ্যাই বান্দির বাচ্চা!! অ্যাই!!! কাদছিস কেন তুই হ্যাঁ? এখন কান্না পাচ্ছে তোর?”
সে রিমের চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরলো। এতটাই জোরে যেন আঙুল গুলো মনে হচ্ছে গাল চাপার হাড় ভেদ করে ঢুকে যাবে। তারপর রিমের থুতনি থেকে হাতটা ঝাকিতে ছাড়িয়ে সোফায় একপ্রকার ছুঁড়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
“আমার চোখের সামনে থেকে সর তুই? নয়তো কান্না করার জন্য এই চোখ আর থাকবে না তোর!!! একটু আহ্লাদ দিয়েছি বলে ভেবেছিস যা ইচ্ছে করবি আর শুধু প্রশ্রয় দিব তোকে! ইচ্ছে করছে, ইচ্ছে করছে… কলিজা টা ছিঁড়ে বের করি এক্ষুনি।কিন্তু কি করবো বল, শেষে কষ্ট তো আমারই হবে। ভালোব্…….”
মাঝ পথেই থেমে গেল বাক্য।রিম চমকে মাথা উঁচু করে তাকালো তার দিকে। তার চোখ তখন জলে ভিজেও জ্বলছে, অধীর আগ্রহে তার ঠোঁট কাঁপছে। কাতর স্বরে বললো,
“কি বললে তুমি? আবার বলো না! কি বলল…… ভালো কি? বলো না। তুমি.. তুমি ভালো বাসো আমায়? আরেকবার বলো না। আমার খুব শুনতে ইচ্ছে করছে। তোমার মুখে একবার বলো না। শুধু একবার। আমি মরে যাচ্ছি এই কথাটা শোনার জন্য। একবার বলো…”
জেইন দ্রুত নিজেকে সামলে চিৎকার করে উঠল,

“ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি!!! কি সব টিপিক্যাল কথাবার্তা শুরু করে দিয়েছো।‌কতবার বলবো তোমায়? ‌আমি ভালোবাসি না তোমাকে। আর এভাবেই আমার সাথে থাকতে হবে তোমায় ইউদাউথ এনি কোয়েশ্চেন! তারপরেও বারবার এক কথা, ভালো লাগে না আমার।”
মুহুর্তের মধ্যে রিম রাগে উন্মত্ত হয়ে উঠলো।জেদ করে জেইনের মাথার চুলগুলো দুই হাতে টেনে এলোমেলো করে দিল। যেন তার সমস্ত ক্রোধ ওই চুলে ঢেলে দিচ্ছে।জেইনের বুকে নিজের সমস্ত ক্রোধ ঢেলে দিয়ে উন্মাদের ন্যায় এলোমেলো ঘুষি ছুড়ে দিল। দুই গালে ঠাস ঠুস কয়েকটা থাপ্পর দিয়ে বড়বড় করে নিঃশ্বাস নিতে লাগলো। জেইন গালে হাত দিয়ে হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইল। রিমের চোখ দিয়ে এখনো জল গড়িয়ে পড়ছে, নাক মুখ লাল হয়ে গেছে।
“কুত্তা থাক তুই। আসবি না আমার কাছে। নু*ন্টু কেটে সেলাই করে দিব। সারাজীবন জ্বলে জ্বলে মরবি। করতে পারবি না কিছুই।”
এই বলে চোখের জল মুছে উঠে গেল সোফা থেকে। জেইন এখনো হা করে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর ধ্যান ভেঙে এলে ভ্রু কুঁচকে ফিসফিস করলো,
“কি বললো!!! নু*ন্টু… সেলাই…. মানেহ্!!!!!”

“You’d better stay home today. আমার সাথে ইয়াশ গেলেই হবে। সামান্য একটা মিটিং তোমার না গেলেও চলবে।”
জেইন আরো একটু ঝুঁকে এলো এলেনার দিকে। নিচু স্বরে বলল,
“Take care of the her, she’s very stubborn.”
সে একবার আড় চোখে রিমের দিকে তাকালো। রিম তখন সোফায় বসে, দুগাল ভর্তি করে আপেল নিয়ে চিবুচ্ছে আর রাগে ফুলিয়ে হেঁচকি টানছে। সে যখন অতিরিক্ত কাঁদে বা রেগে যায়, তখন এমন দুগাল ভরে খাবার নিয়ে ফোঁসফোঁস করতে থাকে। জেইনের মুখে এক মৃদু হাসি ফুটে উঠলো। তারপরেই দ্রুত মিলিয়ে গেল সেই হাসি। সে ঠোঁট কামড়ে ধরলো। আদরে আদরে একদম বাচ্চায় পরিণত হয়েছে মেয়েটা। সে একটু গলা খাঁকারি দিয়ে স্বর উঁচু করে বললো,

“আমি আসছি। আমি চলে যাওয়ার পর কেউ যদি আমার অবাধ্য হয়, তাহলে কিন্তু খুব খারাপ হবে আমি এলে।”
মুহুর্তের মধ্যে রাগে ফোঁস করে উঠলো রিম। উঠে দাঁড়িয়ে জেইনের সামনে খুব কাছে চলে এলো। স্টাইল করে রাখা চুল গুলো দুহাতে এলোমেলো করে দিয়ে গাল দুটো শক্ত করে টেনে ঠাস ঠাস করে দুটো থাপ্পর মেরে দিল। শার্টের টাই টেনে টুনে খুলে নষ্ট করে দিয়ে দুহাতে কলার শক্ত করে খামচে ধরে বললো,
“কাকে বলছিস তুই? কি খারাপ হবে? আজকে তোকে রুমেই ঢুকতে দিব না আমি। দেখি কিভাবে কি করিস তুই! জানোয়ার একটা। কি ভেবেছিস, তুই চলে যাবি দেখে, আমি কষ্ট পাচ্ছি? কান্না করছি তোর জন্য? একটুও না। তুই যেগুলো করতে না বলেছিস সেগুলোই আরো বেশি করে করবো আমি।তোর একটা কথাও শুনবো না।”
হঠাৎ করেই রিমের সমস্ত রাগ মিলিয়ে গিয়ে কান্নায় ডুবে জেইনের ঢেউ খেলানো প্রশস্ত বুকে মুখ গুজে দিল। কান্নার দমকে তার শরীর ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছিল।
জেইন আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। এক হাত বাড়িয়ে তাকে আরও কাছে টেনে বুকের সাথে মিশিয়ে নিল পুরোপুরি, যেন তার ভেতরের সমস্ত অস্থিরতা শান্ত করতে চাইছে। সে দুহাতের অঞ্জলিতে রিমের ছোট্ট মুখটা তুলে ধরল, কপালে শব্দ করে একটি দীর্ঘ, গভীর চুম্বন এঁকে দিলো। নিজের দুহাতে চোখের পানিটুকু মুছে দিয়ে রিমের লাল হয়ে যাওয়া গাল ও নাকের ডগায় ছোট্ট ছোট্ট চুমুতে ভরিয়ে দিলো—যেন তার সব কষ্ট শুষে নিচ্ছে। ব্যান্ডেজ করা হাতটা নিজের কাছে টেনে নিয়ে আদুরে,গলায় বলল

“এখনো ব্যথা হচ্ছে, সোনা?”
রিম ভেজা চোখে মুখ ডুবিয়ে দিলো জেইনের উষ্ণ বুকে।
“তাতে তোমার কি? যাও এখান থেকে।”
“উফ্ এতো রাগ। আমার ছোট্ট বাবুটা এত্তো অভিমান কোথায় লুকিয়ে রাখে হুম?”
কপালে একটা ছোট্ট করে একটা আদুরে চুমু দিয়ে বলল,
“লক্ষ্মীইইই বাচ্চা, রাগ করে না হ্যাঁ। আর বকবো না তোমায়। এবার আমি আসি, যেতে হবে।”
রিম তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“আমিও যাবো তোমার সাথে।”
জেইন তার দুগালে হাত রেখে বুঝিয়ে বললো,
“না, আমি যেখানে যাচ্ছি সেখানে অনেক রিস্ক আছে। তোমার জন্য একদম নিরাপদ নয়। আমি তোমাকে পরে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাবো, ঠিক আছে।
রিম নাক ফুলিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলো।চোখ দুটি জেইনের মুখের উপর স্থির,
“সত্যিই নিয়ে যাবে?”
“হুম।”
“তাহলে তোমাকেও যেতে হবে না।”
“কেন?”
রিম জেইনের কলার খামচে ধরলো, তার কণ্ঠস্বরে চরম ভয়,
“তুমি যে বললে ওটা নিরাপদ জায়গা নয়। তোমার যদি কিছু হয় আমি বাঁচতে পারবো না।”
“শুহ্হ্হ্হ্হ্…”
জেইন নিজের তর্জনী রিমের ওষ্ঠদ্বয়ে ঠেকিয়ে হাস্কি ভয়েসে ফিসফিস করে বলল,
“মরার কথা বলবে না একদম। এন্ড দিস ইজ মাই লাস্ট ওয়ারনিং।”

গাড়ির ব্যাক সিটে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে ইয়াশ আর জেইন। ইয়াশ একপলক জেইনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোকে খুব মেসি লাগছে চুলগুলো ঠিক কর, টাই টাও ঢিলে হয়ে আছে, শার্টের ভাঁজ নষ্ট হয়ে গেছে, একটা বোতাম নেই। এভাবে মিটিংয়ে যাবি! নিজেকে একটু গুছিয়ে নে।”
“থাক না এভাবেই!! ভলোই তো লাগছে। আমার বউ সাজিয়ে দিয়েছে!!!”
“এ্যাঁ!!! সবার বউ সুন্দর করে গুছিয়ে দেয়। আর তোর বউ…!!”
জেইন ঠোঁট কামড়ে হাসলো,
“আমার বউ বলে কথা! সবার থেকে একটু আলাদা তো হবেই। তুই বল এলেনার সাথে কি ঝামেলা হয়েছে তোর?”
ইয়াশ মাথা নিচু করে ফেলল। আমতা আমতা করে বলল,
“ক-কই কিছু না তো!”
জেইন হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে ফেললো,
“আমাকে মিথ্যে বলছিস তুই? আমার চোখকে ফাঁকি দেয়া এতো সহজ নয়। ছোট থেকে একসাথে বড় হয়েছি। আমার থেকে ভালো আর কেউ চেনে না তোকে।”

“কিছু হয়নি সত্যিই বলছি।”
“ঠিক আছে তোর যখন মনে হবে তখনই বলিস।”
কিছুক্ষণ পর ইয়াশ মাথা তুলে বললো,
“নিউ আপডেট পেয়েছিস?”
“কিসের?”
“তোকে যে স্টক করতো, দ্যাটস…. আ…. লিওনার্দোর’স সিস্টার, হোয়াটস দ্য নেম অফ হার? অলিভা!!! এখন পুলিশ কাস্টাডিতে। ৯৭ জন মহিলার খুনের দায়ীতে।”
“ইয়াহ্ আই নো।But catching her is not that easy. I think it’s some big plan.
“প্ল্যান!”
“হুম।……”

রিম অত্যন্ত সন্তর্পণে স্যুপের বাটিটা বেডসাইড টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখল। ঘরের মৃদু আলোয় অরিত্রিকা চৌধুরীর ফ্যাকাশে মুখাবয়বে এক অদ্ভুত আভিজাত্য খেলা করছে। রিম নিজের হাতে জলের গ্লাসটা তুলে ধরে ওনাকে জল পান করালো, তারপর একে একে ওষুধগুলো খাইয়ে পরম যত্নে শুইয়ে দিল নরম বিছানায়। রিমের হাতদুটো অরিত্রিকা চৌধুরীর কপালে আলতো বুলিয়ে দিতেই, ওষুধের প্রভাবে ওনার চোখের পাতা ক্রমশ ভারী হয়ে এল।
রিম স্থির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল ওনার শান্ত মুখশ্রীর দিকে। অরিত্রিকা চৌধুরীর নাকে থাকা ছোট্ট সোনালী নাকফুলটা টিমটিমে আলোয় বারবার হীরের মতো ঝলমল করে উঠছে।রিমের দৃষ্টি সেখানেই স্থির।
এতক্ষণ যাবত ডাক্তার নার্স কেউ চেষ্টা করেও শান্ত করতে পারেনি ওনাকে। শেষমেষ রিম অনেক চেষ্টা করে ছেলের কথা বলে বুঝিয়ে শান্ত করে ওনাকে।
রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। কিন্তু করিডোরে পা রাখতেই এক অসহ্য শূন্যতা তাকে গ্রাস করল। হঠাৎ করেই চারপাশের দেওয়ালগুলো যেন দুলতে শুরু করেছে। রিম টাল সামলাতে না পেরে করিডোরের শক্ত স্টিলের রেলিংটা খামচে ধরল। তার চোখের সামনে পুরো পৃথিবীটা যেন এক ঘূর্ণায়মান গোলক ধাঁধাঁয় পরিণত হয়েছে। দৃষ্টি ঝাপসা, কানের কাছে এক অদ্ভুত শোঁ শোঁ শব্দ।ঠিক তখনই এলেনা ছায়ার মতো এসে শক্ত করে ধরে ফেলল রিমকে।

“হোয়াট হ্যাপেন্ড? আর ইউ ওকে?”
“হুম।”
রিম কোনোমতে বিড়বিড় করল,
“শুধু মাথাটা একটু ঘুরছে। মনে হয় শরীরটা দূর্বল।”
“দূর্বল হবেই তো। সকাল থেকে পেটে একটা দানা-পানিও পড়েনি। খাচ্ছো না কেন!”
“আমি তো খেতে চাইছি।”
রিম দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগলো,
“কিন্তু পারছি না। খাবারের ঘ্রাণ নাকে এলেই বুক চিরে এক তীব্র অস্থিরতা উঠে আসছে। কেমন যেন গা গুলিয়ে উঠছে বারবার।”
এলেনা কিছুক্ষণ সন্দেহোর চোখে তাকিয়ে রইল। তারপর রিমকে নিজের সাথে আগলে নিয়ে বললো,
“আমার সাথে চলো। তোমার কি এখন বিশেষ কিছু খেতে ইচ্ছে করছে? এমন কিছু যা মুখে দিলে এই অস্থিরতা কমবে?”
রিম একটু ইতস্তত করল, তারপর যেন নিজের অজান্তেই তার অবচেতন মনের বাসনাটি বেরিয়ে এল।
“একটু চটপটা, টক ঝাল কিছু। আমের আচার হলে বেশি ভালো হয়।”

ড্রয়িংরুমের প্রশস্ত সোফায় গুটিসুটি মেরে বসে আছে রিম। তার সামনে রাখা একটি বাটিতে তেলের ঝাল আর মশলায় জারানো ফ্রোজেন আমের আচার। সে একমনে সেই আচারের দিকে তাকিয়ে আছে আর পরম তৃপ্তিতে তার টক-ঝাল স্বাদ নিচ্ছে। এলেনা কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে এক ধ্যানে রিমের দিকে তাকিয়ে আছে। এখানে আসার পর থেকেই রিমের প্রতি তার হৃদয়ে এক অদ্ভুত, অলৌকিক মায়া জমেছে। রিম যেন এক বিষণ্ণ অথচ উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার প্রতিটি পদক্ষেপে এক অদৃশ্য মায়ার টান কাজ করে।
হঠাৎ নীরবতা ভেঙে রিম আকুল স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“আচ্ছা, ও কখন আসবে? আমার না একদম ভালো লাগছে না।”
“খুব মিস করছো ওকে?”
“খুউউব…
নাহ্ মানে…., একটু।”

রিম ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে মুখে জোরপূর্বক এক চিলতে হাসি টেনে আনল। কিন্তু সত্যটা হলো, জেইন এখন তার রক্তে মিশে যাওয়া এক অভ্যেস। ওর গলার স্বর না শুনলে, ওর কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ না পেলে রিমের কাছে মুহূর্তগুলো পাহাড়ের মতো ভারী মনে হয়।
এলেনা রিমের অস্থিরতা বুঝতে পারল। সে রিমের চুলে হাত বুলিয়ে দিয়ে আশ্বস্ত করল,
“চিন্তা কোরো না, ও তাড়াতাড়িই ফিরে আসবে।”
রিমের চোখ দুটো হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যেন শরতের মেঘমুক্ত আকাশে এক চিলতে রোদ্দুর। সে এলেনার হাতটা খপ করে ধরে ব্যাকুল হয়ে বলল,
“তুমি কি আমায় নিয়ে যাবে ওর কাছে? প্লিইইজ…”
“কিন্তু এজে…”

এলেনা কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু রিমের আকুতি ভরা চোখের সামনে সে থেমে গেল।
“না কোরো না, প্লিজ! আমি জানি ও রাগ করবে, খুব বকবে আমাকে। কিন্তু আমি সবটা মানিয়ে নেব। আমাকে শুধু ওর কাছে নিয়ে চলো। ও তো সকালে না খেয়েই বেরিয়ে পড়েছে। আমি নিজের হাতে ওর জন্য খাবার গুছিয়ে নিয়ে যাব। বিশ্বাস করো, শুধু একবার ওকে দেখেই চলে আসব। প্লিজ, sorella (বোন)…”
এলেনা এক মুহূর্তের জন্য রিমের মায়াবী মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। রিমের কণ্ঠস্বরে এমন এক মখমলী মমতা ছিল যে, এলেনার পাথর-কঠিন মনটাও গলে জল হয়ে গেল। সে জানে, জেইন দেখলে প্রচণ্ড চটে যাবে, হয়তো তাকে অনেক কড়া কথা শুনতে হবে। কিন্তু এই মায়াবী মেয়েটার এক চিলতে হাসির জন্য সে জেইনের ক্রোধকেও মাথা পেতে নিতে রাজি।
এলেনা এক দীর্ঘ তৃপ্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে রিমের কাঁধে হাত রাখল।
“ঠিক আছে, ragazza pazza (পাগলী মেয়ে)। চলো, তোমায় তোমার আরাত্রর কাছেই নিয়ে যাই।”

বিশাল আকৃতির ২৭ তলা বিশিষ্ট একটি ভবন।
রোমের উজ্জ্বল দিনের আলোয় ভবনটি প্রথম নজরেই মানুষকে থমকে দেয়। এর অস্বাভাবিক গাম্ভীর্য এবং ঘোর কৃষ্ণবর্ণের আধিপত্যে এক ধরণের আদিম আভিজাত্য মিশে আছে। আশেপাশের হালকা রঙের ঐতিহ্যবাহী রোমান স্থাপত্যগুলোর মাঝে এটি যেন এক কালো গ্রানাইটের দুর্গ। পুরো ভবন জুড়ে ব্যবহৃত গ্রানাইট পাথরগুলো দিনের আলোয় কোনো ঝলক দেখায় না, বরং এক রহস্যময় ম্যাট ফিনিশ (Matte Finish) বজায় রাখে।
গাড়ি থেকে মাটিতে পা রাখল রিম। ভবনটির দিকে তাকিয়ে মুহূর্তের জন্য তার শ্বাস যেন আটকে গেল। প্রধান প্রবেশদ্বারের ওপরে বসানো একটি ভারী ব্রোঞ্জের নামফলক। সূর্যের আলোয় সেটি সোনার মতো ঝকঝক করে না, বরং প্রাচীন ব্রোঞ্জের এক গভীর আভা ছড়িয়ে দেয় যা আভিজাত্য আর ক্ষমতার প্রতীক। ফলকের মাঝখানে খোদাই করা একটি কৃষ্ণ ঈগল, আর তার নিচে তীক্ষ্ণ অক্ষরে লেখা— “NRC-S”।

প্রবেশপথের বিশাল দরজাটি সম্ভবত কালো ওক কাঠ বা ইস্পাতের তৈরি। দরজার ফ্রেম আর বিশাল হ্যান্ডেলগুলোতেও নিখুঁত ব্রোঞ্জের কাজ। রোমের স্বাভাবিক কোলাহল থাকলেও এই ভবনের চারপাশটা এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ঘেরা। কোনো সাইনবোর্ড নেই, নেই কোনো নিরাপত্তা প্রহরী। দেখে মনে হয়, এই অটল দেয়ালগুলোর ভেতরে এমন কিছু চলছে যা বাইরের জগতের কাছে সম্পূর্ণ অদৃশ্য।
ভবনের ভেতরে পা রাখামাত্র পরিবেশ এক নিমেষে বদলে গেল। বাইরের কঠোরতা ভেতরে রূপান্তরিত হয়েছে শীতল ও নিয়ন্ত্রিত বিলাসিতায়। রিম লবির ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলেই পথ আটকে দাঁড়ালেন একজন ম্যানেজার।
“Ma’am, you can’t go in now. Sir is busy in a very important meeting.”
সাথেই থাকা এলেনার কন্ঠস্বর মুহূর্তেই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো,
“Do you know who you’re holding back? If your boss finds out, he’ll fire you from your job today. She’s the queen of this “NRC-S Group of Industries”—the wife of Aratrik Jain Chowdhury!”
ম্যানেজারের গলা ভয়ে শুকিয়ে কাঠ। ঢোক গিলে কাঁপাকাপা গলায় বললো,

“Sorry ma’am, I didn’t know. Please go inside.”
“না ঠিক আছে। সমস্যা নেই। আমি বরং অপেক্ষা করছি।”
রিম বিনয়ের সাথে বললো কথাটা। এলেনা রিমের হাত ধরে আশ্বস্ত করে বললো,
“কোনো সমস্যা হবে না। একপলক দেখার জন্য এতদূর থেকে এসেছো। এখন অপেক্ষা করলে এক ঘন্টাও এক বছরের সমান মনে হবে। তুমি ভেতরে যাও আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।”

দরজার ওপর রুপালি হরফে খোদাই করা— ‘দ্য মার্বেল লবি’ (The Marble Lobby)।
রিম বুক ভরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো। কাঁপাকাপা হাতে দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখতেই, পাথর হয়ে গেল সে। ‘ঠাস!’—হাত থেকে সশব্দে মেঝেতে পড়ে গেল খাবারের বক্সটা।তার সামনের দৃশ্যটি দেখার জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
শব্দ পেয়ে বিরক্তিতে মুখ তুললো জেইন। তার কপালে ভাঁজ, চোখে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। কিন্তু পরক্ষণেই রিমকে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার ভ্রু জোড়া কুঁচকে কপালে উঠে গেল।
জেইনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অপরাধবোধ নাকি বিস্ময় খেলে গেল, তা রিম বুঝতে পারল না। কারণ ততক্ষণে তার দুই গাল বেয়ে নামা নোনা জল সব কিছু ঝাপসা করে দিয়েছে।

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫৩

এই মুহূর্তে ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। প্রশস্ত সেই কামরার বিশাল জানালার সামনে বসে আছে জেইন; তার রাজকীয় চেয়ারে। কিন্তু সে একা নয়। তার কোলের ওপর রাজকন্যার মতো বসে আছে এক রাশিয়ান কন্যা, পরনে অর্ধন*গ্ন প্রায় কাটা ছেঁড়া পোশাক। জেইনের বলিষ্ঠ বুকের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে লেপ্টে আছে সে। তাদের মধ্যকার সেই অসহ্য ঘনিষ্ঠতা রিমের চোখের সামনে জ্যান্ত নরকের মতো ফুটে উঠল।
জেইন তার আসন থেকে নড়েচড়ে বসতেই, মেয়েটি দ্রুত তার কোল থেকে উঠে দাঁড়ালো।
“তুমি এখানে?………”

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫৫