Home সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৭

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৭

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৭
jannatul firdaus mithila

“ অতিরিক্ত তেলমশলা জাতীয় খাবার খাওয়া কমিয়ে দিন ডিসি সাহেব। কেননা এখন থেকে রোজ নিয়ম করে আপনার প্রেসার বাড়ানোর দায়িত্ব আমার। এন্ড ইউ নো হোয়াট? এই কাজটা আমি কিন্তু খুব ভালো করে করব।প্রমিস!”
কুটিল হেসে চলে গেল মুগ্ধ। বেয়াদব ছেলে যতটুকু সময়জুড়ে ছিল, ততটুকুতে যেন একপ্রকার কথার বজ্রপাত করে গেছে এহসান বাড়ির ডাইনিং এ। বাড়ির সকলের মাঝে এক ভিন্ন উৎকন্ঠা পরিলক্ষিত। দূর্বল জুবাইদা বেগম টলতে টলতে হুট করেই বসে পড়লেন চেয়ারে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আওড়ালেন,
“ ও আমার রোদের কথা বলল কেনো? কি করেছে আমার রোদ?”
উত্তর আসেনি কারো কাছ থেকে। প্রত্যেকের চোখে মুখে লেপ্টে আছে অজানা আতঙ্কের ছাপ। তায়েফ সাহেব মৌন রইলেন ঠিকই, তবে মনের ভারি উচাটনে দিকবিদিকশুন্য মানুষটা। হয়তো ভাবছেন সন্তানদের কথা।

ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার প্রসিদ্ধ এলাকা— বড় মানিকা। এখানকার হাজী বাড়ি লোকমুখে বেশ সুপরিচিত। জনাব আলহাজ্ব মোঃ আইয়ুব হাজী, বড় মানিকার প্রাক্তন মেম্বার। মহাশয়ের যেমন নাম, তেমনই রুতবা! আইয়ুব হাজীর তিন কন্যা। বড় মেয়ে সুনয়না — স্বামী, সন্তান নিয়ে আপাততঃ লন্ডন থাকছে। মেজ মেয়ে ইকরা, বিয়ে হয়েছে এইতো পাশের এলাকায় — গঙ্গাপুরে। স্বামী তার বিশিষ্ট ব্যাবসায়ী। হাজী সাহেবের তৃতীয় এবং সর্বশেষ কন্যা — মাইমুনা বেগম। বাবার বড্ড কাছের এবং আদুরে যিনি। গতকাল হুট করেই মাইমুনা বেগম কল দিয়ে জানালেন — মেয়েদেরকে পাঠাচ্ছেন বাড়িতে। যদিওবা তিনি আসল ঘটনা বলেননি বাবাকে, তবুও নাতনিরা আসছে এতদিন পর, তা নিয়ে হাজী সাহেবের খুশী কে দেখে! আজ ভোর সকালে আহিরা,মাহিরা, পুতুল, অরিন এবং ইকরা, অনিক এসে পৌঁছেছে হাজী বাড়িতে। বরাবরের ন্যায় গাড়িতে নয়, লঞ্চে করে। তারা এসেছে পর থেকেই বৃদ্ধ হাজী সাহেবের ঠোঁটের কোণ থেকে যেন কিছুতেই হাসি সরছেনা। এহসান পরিবারের রত্নদের একসঙ্গে পেয়ে, তিনি বুঝি হাতে আকাশের চাঁদ পেয়ে গেছেন। সকাল থেকে তোড়জোড় চালিয়েছেন রান্না-বান্নার। হাঁক ছেড়ে একে ওকে ডাকছেন কাজের জন্য। বাড়ির কেয়ার টেকার শামসুর আলী ঠিক কতদিন পর হাজী সাহেবকে এতো খুশী হতে দেখলেন কে জানে! বৃদ্ধ গম্ভীর মুখো হাজী সাহেব নিজ স্ত্রী গত হওয়ার পর থেকে, একা একাই ব্রিটিশ আমলে তৈরি এই হাজী বাড়ি নামক বিশাল অট্টালিকায় থাকছেন। সঙ্গে অবশ্য সারিদ হিসেবে রয়েছেন বাড়ির কেয়ার টেকার শামসুর আলী। যিনি কি-না আপদে বিপদে সর্বদা পাশে থাকেন মানুষটার।

সুবিশাল অট্টালিকার শ্যাওলা পড়া ছাঁদ! ছাঁদের একদম কার্নিশ ঘেঁষে সটানভাবে বুকের ওপর দু’হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে মাহি। দৃষ্টি তাক করা অদূরের ঢেউখেলানো মেঘনা নদীর কোলে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে — আকাশটা বোধহয় নদীর বুকের সঙ্গে মিশে গিয়ে একাকার হয়েছে। মাহি নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে আছে সেদিকে। পিঠ সমান সিল্কি চুলগুলো বাতাসের মৃদু ঝাপটায় উড়ছে বেশ। কয়েকটা তো বেহায়ার ন্যায় উড়ে উড়ে আসছে মুখের ওপর। তবে মাহি মোটেও তাড়া দেখাচ্ছে না তাদের সরাতে। চুলগুলো উড়ছে নিজের মতো। ফর্সা ওভাল মুখখানায় একরাশ বিষাদের ছাপ। চশমাপরা চোখদুটোতে ভরে আছে তিক্ততা। মেয়েটার চোখদুটো আবার ভারী অদ্ভুত রকমের সুন্দর। তারা দেখতে পুরোপুরি কালোও না,আবার বাদামীও না। রোদের আলো পড়লে তারা কেমন চিকচিক করে ওঠে। তবুও মেয়েটা কেন যে তাদের চশমার আড়ালে লুকিয়ে রাখে কে জানে! মাহির পরনে আপাতত নীল রঙা ধুতি পাজামা, গায়ে সফেদ রঙা কুর্তা টাইপ জামা। গলার পেছন থেকে সামনে এসে ঝুলছে ওড়নার দুপাশ। মেয়েটার ঠোঁট দুটোও তো বেশ সুন্দর। দেখলে মনে হবে একদম নিখুঁত শিল্পীর হাতে আকাঁ ছবি। যার বাম দিকের একটুখানি নিচে জ্বলজ্বল করছে একখানা গাঢ় কালচে তিল। আহির মতো একইরকম দেখতে হলেও, মেয়েটার চোখ আর ঠোঁট দুটো হয়েছে বেশ আলাদা!

দূর পানে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাহি। আনমনে ভাবছে বোধহয় অনেককিছু। এরইমধ্যে ছাঁদে আগমন ঘটে আহির। হাতে একখানা কফির কাপ। পরনে ঘিয়ে রঙা জিন্স-কুর্তা। মাথার উষ্কখুষ্ক চুলগুলো কোনমতে ক্ল -ক্লিপে আঁটকে রাখা। চোখেমুখে স্পষ্ট সন্দেহের ছাপ। মেয়েটা খালি পায়ে চুপচাপ এগিয়ে আসে মাহির নিকট। একহাত দুরত্বে দাঁড়িয়ে ঘাড় বাকিয়ে তাকায় মাহির মুখপানে। মাহি ঠায় তাকিয়ে আছে অদূরে। আহির উপস্থিতি টের পেল কি-না কে জানে! আহি কিয়তক্ষন চুপ থাকলো। নিরব চোখে দেখল মাহিকে। আশ্চর্য! মেয়েটা হুবহু তার মতো দেখতে হলেও ব্যাক্তিত্বে এতো তফাৎ হলো কেন দু’জনার? কেন মাহি তার মতো শক্ত হলোনা? কেন হতে গেল এতো দূর্বল, ভীরু? কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই আহি নিজেকে শুধরে নেয় আবারও। মনে মনে ফের ভাবে,

“ মাহি কি আর ইচ্ছে করে দূর্বল হয়েছে? সে-তো ছোট থেকেই এমন। অল্পতে কাঁদে, চুপচাপ থাকে। পড়ালেখাতেও তো তারচেয়ে বহুগুণ ভালো। দেখতেও ভারি মিষ্টি!”
কথাগুলো ভাবনা শেষেই দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে আহি। খানিকটা গলা খাঁকারি দিতেই নড়েচড়ে ওঠে মাহি। বোধহয় এতক্ষণে সম্বিৎ ফিরল মেয়েটার।আহি আড়চোখে দেখল সবটা। হালকা হেসে বলল,
“ ভয় পেলি মনে হচ্ছে!”
মাহি তৎক্ষনাৎ জবাব দেয়নি। হাত বাড়িয়ে উড়তে থাকা চুলগুলোকে হাত খোঁপা বেঁধে ন্যায় নিঃশব্দে। সময় নিয়ে বলে,
“ না।”
আহি কথা পেলো না আর। বলার মতো বহু কথা থাকলেও গলার কাছটায় কোথাও যেন কথাগুলো আঁটকে যাচ্ছে তার। এমনটা কেন হচ্ছে কে জানে! আহিকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাহি এবার মুখ খুলল। ভারী কন্ঠে শুধালো,

“ কিছু বলবি?”
আহি মাথা নাড়ায় ওপর নিচ। ঠোঁট দুটো হালকা চেপে কথা সাজায় মনে মনে। হাতের কফি কাপটা ছাঁদের রেলিঙের ওপর দাঁড় করিয়ে রেখে, ঘুরে দাঁড়ায় পরক্ষণে। পিঠ ঠেকালো কার্নিশের সঙ্গে। মাহির ন্যায় দু’হাত বুকের কাছে বেঁধে রয়েসয়ে আওড়াল,
“ কি ভাবছিস?”
“ মরছি না কেনো!”
কথার পিঠে এহেন উদ্ভট উত্তরে ভড়কায় আহি। হতভম্বতায় চট করে খুলে গেল হাতের বাঁধন। ঠোঁট দুটোর দুরত্ব বাড়ল ক্রমশ। চোখদুটোতে একরাশ উদ্বিগ্ন ছাপ লেপ্টে নিয়ে সে হঠাৎ বলল,
“ পাগল হয়েছিস তুই? কি যা-তা বলছিস খেয়াল আছে?”
এপর্যায়ে ব্যাথাতুর হাসলো মাহি। জোড়া ভ্রুয়ের চোখদুটো দিয়ে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল আহির পানে। শুধালো,
“ খেয়াল আছে বৈকি!”
আহি এবার ভীষণ অস্থির। তৎক্ষনাৎ এগিয়ে এসে চট করে চেপে ধরে মাহির ডানহাতের কনুই। হালকা ঝাঁকিয়ে কপট ঝাঁঝ দেখিয়ে বলে,
“ আরেকবার মরার কথা বললে গাল বরাবর এক থাপ্পড় দিব বেয়াদব। বড় ছোট মানবো না মোটেও বলে দিলাম!”
মাহি এবারেও আলতো হাসলো। আহত চোখে তাকালো আহির দিকে। আহির বুকটা হু হু করে ওঠে মুহুর্তেই। শক্ত মানবীর হঠাৎ মন চাইলো একটুখানি জড়িয়ে ধরতে বোনকে। তবে কিছু একটা যেন বাঁধা দিচ্ছে তাকে। মাহি নিজেকে সামলায়। আলতো করে হাতের কনুই ছাড়িয়ে নেয় আহির হাত থেকে। পরক্ষণে চুপচাপ কদম ফেলে প্রস্থান ঘটায় ছাঁদ থেকে। এদিকে আহি কেমন অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো মাহির চলে যাওয়ার পথে।

বড় মানিকার কনক্রিটের সরু পথ দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে যাচ্ছে বেশ কতক বিদেশি গাড়ি। চারপাশের মানুষজন ইতোমধ্যেই রাস্তার দু’ধারে বেরিয়ে এসেছে। উৎসুক চোখে দেখছে গাড়ি গুলোর ছুটে যাওয়া। কেউ কেউ ভাবছে — এতো বিদেশি গাড়ি এই গ্রামের পথ দিয়ে যাচ্ছেই বা কোথায়? তো আবার কেউ কেউ ফোন বের করে রেকর্ড করতে ব্যস্ত এহেন দৃশ্য। ঝড়ের বেগে ব্ল্যাক মার্সিডিজ বেঞ্জ ব্র্যান্ডের গাড়িগুলো এক লাইনে ছুটছে। প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর, গাড়ি গুলো এসে থামলো হাজী বাড়ির সামনে। মুহুর্তেই ব্রেক কষায় রাস্তার ধুলো গুলো উড়ে-টুড়ে একাকার অবস্থা! চারপাশটা কেমন আবছা হয়ে গিয়েছে ধূলোর চাপে। ওদিকে হাজী সাহেব সন্দিহান ভঙ্গিতে তাকালেন বাড়ির কেঁচি গেটের ওপাশে। কেঁচি গেট লাগিয়ে রাখা বিধায় গাড়ি গুলো দাঁড়িয়েছে বাইরে। প্রথম গাড়িটা একাধারে হর্ন বাজাচ্ছে তো বাজাচ্ছেই! থামাথামির নামগন্ধও নেই দেখো! বৃদ্ধ হাজী সাহেব সাহেব এবার যেন বেশ বিরক্ত হলো। গম্ভীর মুখে হাতের লাঠিটা নিয়ে এগিয়ে এলো কেঁচি গেটের কাছে। খানিকটা উঁকিঝুঁকি দিয়ে, হাতির লাঠিটা সামান্য উঁচিয়ে ঝাঁঝাল কন্ঠে বললো,

“ এই থামেন! আমার বাড়ির সামনে এসে এতো হর্ণ বাজাচ্ছেন কেনো? কারা আপনারা?”
হর্ণ থামল পরমুহূর্তেই। প্রথম গাড়ি থেকে ড্রাইভার মহাশয়৷ আলতো করে মাথা বের করলেন জানালা দিয়ে। মানুষের চোখেমুখে সে-কি ভয়ের ছাপ! ভাব এমন — সাক্ষাৎ বাঘ নিয়ে ঘুরছেন যেন। তিনি কেমন গলা উঁচিয়ে হাজী সাহেবের উদ্দেশ্যে বললেন,
“ গেট খুলুন!”
হাজী সাহেব ভ্রু গোটালেন। মুখাবয়ব যথেষ্ট শক্ত রেখে, কঠিন বাক্য ছুড়লেন,
“ মামা বাড়ির আবদার নাকি যে বললেই খুলতে হবে? চিনি না জানি না, কোত্থেকে উড়ে এসে আমার বাড়িতে ঢুকতে চাচ্ছেন আপনারা? যান এখান থেকে।”
এরূপ কথায় ড্রাইভার যেন বেশ অপমানিত হলো। বেচারা মুখ লুকালেন গাড়ির ভেতর। ওদিকে অনিক এতক্ষণে বেরিয়ে এসেছে। এলোমেলো চুল, মলিন চেহারা। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় দেখাচ্ছে গোলুমলু ছেলেটাকে। সে এসেই তৎক্ষনাৎ থাবা দিয়ে বসল হাজী সাহেবের হাতে। অনড় কন্ঠে বললো,
“ ভুলেও দরজা খুলবেন না দাদু।”
হাজী সাহেব ভ্রু কুঁচকালেন ফের। সন্দিষ্ট চোখে তাকালেন ঘাড় বাকিয়ে। সন্দিহান গলায় প্রশ্ন ছুঁড়লেন,
“ তুমি কী জানো না-কি কে এসেছে?”

অনিক ঢোক গিললো সামান্য। হাজী সাহেবের হাত টানতে টানতে উঠোন পেরুতে লাগলো। ঠিক তখনি ঘটলো আরেক কান্ড! গাড়িগুলো সব ধীরে ধীরে বিকট আওয়াজ তুলে পেছাতে লাগলো কেমন। হাজী সাহেব হাঁটা থামিয়ে তাকিয়ে রইলেন সেদিকে। গাড়ি গুলো পেছাতে পেছাতে কয়েকটা দৃষ্টি সীমানার বাইরে পৌঁছিয়েছে ইতোমধ্যেই। তবে সামনের গাড়িটা কেন যেন খানিকটা দূরে সরে হঠাৎ মাঝ পথে থেমে গেল। পরক্ষণে গাড়ির ড্রাইভার বেরিয়ে এল ত্রস্ত পায়ে। তড়িঘড়ি করে ছুটে চলে গেলেন খানিকটা দূরে। এবার যেন পুরো বিষয়টা কেমন গোলকধাঁধার ন্যায় ঠেকছে হাজী সাহেবের নিকট। অনিক বারবার তার হাত টানলেও তিনি এবার নিজের হাতটা এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিলেন। গম্ভীর মুখে সম্মুখে তাকিয়ে থাকতেই হঠাৎ দেখলেন গাড়িটা স্টার্ট হয়েছে আবারও। ইঞ্জিন ব্যগ্র গতিতে ছুটলেও গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে ঠায়। যেন সে তৈরি হচ্ছে কিছুর জন্য। ইঞ্জিনের বিকট শব্দে মুখরিত চারপাশ। ঠিক মিনিট খানেক বাদেই ঘটে গেল বিশাল কিছু। গাড়িটা হুট করেই ব্যাপক গতিতে ছুটে আসতে লাগলো কেঁচি গেটের দিকে। হাজী সাহেব ভড়কালেন। ভড়কে যাওয়া কন্ঠফুড়েঁ যেইনা কিছু বলতে যাবেন তার আগেই গাড়ি এসে টক্কর বসালো কেঁচি গেটের সঙ্গে। বিরাট এ ধাক্কায় বেচারা কেঁচি গেট আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলোনা নিজের পায়ে। সঙ্গে সঙ্গে গেট ভেঙে পড়ল সামনের দিকে।

সে-ই ভাঙা গেটের ওপর দিয়েই ছুটে এলো গাড়ি। হাজী সাহেব ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে তৎক্ষনাৎ কদম পেছালেন বেশ, তবে গাড়ির মালিক বুঝি পাগল হয়েছে আজ। কেঁচি গেটের মতো মানুষকেও বোধহয় উড়িয়ে ফেলবে এক্ষুণি। অনিক তক্ষুনি হাজী সাহেবের হাত টেনে তাকে নিয়ে ছুটে বাড়ির দিকে। কিন্তু শেষ রক্ষাটুকু হলোনা। বেচারা বৃদ্ধ হাজী সাহেব পায়ে হোঁচট খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন সম্মুখে। হাত থেকে লাঠিটাও পড়ে গেল মাটিতে। অনিক সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে হাঁটু মুড়ে বসল হাজী সাহেবের সামনে। ঘাড় বাকিয়ে তাকাতেই দেখল — গাড়ি ছুটে আসছে তাদের দিকেই। হাজী সাহেব এবং অনিক তক্ষুনি নিজেদের চোখ ঢাকলো হাতের সাহায্যে। ঠিক তখনি গাড়িটা একদম তাদের নাকের ডগায় এসে থামলো। উঠোনের শুকনো ধূলোময়লা উড়তে লাগলো কেমন। তা নাকে যেতেই বুক চেপে কাশতে লাগলেন হাজী সাহেব। অনিকও কাশছে অনবরত। কিয়তক্ষন বাদে, গাড়ির ফ্রন্ট সিটের দুয়ার খুলল। হাজী সাহেব এবং অনিক নিবুনিবু চোখে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। কালো গাড়ি থেকে প্রথম বেরিয়ে এলো একখানা দামী ব্যুট পরিহিত পা। সময় নিয়ে পায়ের মালিকও বেরিয়ে এলো পরপর। অনিক রয়েসয়ে মাথা তুলে ওপরে। দেখে — মুগ্ধ নামক বলিষ্ঠ যুবক, দামী কোট-প্যান্ট পড়ে সাহেবের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। চোখে আটাঁ কালো রঙা রোদচশমা। যুবক কেমন বাঁকা হেসে বলে ওঠে,

“ লুকোনোর জায়গাটা খুব একটা সুবিধার ছিলোনা এহসানের ব্যাটা। চাইলে মাটি খুঁড়ে তলে লুকাতে পারতি।”
অনিক চোয়াল শক্ত করল এবার। কঠিন গলায় আওড়ায়,
“ বেশি বাড়াবাড়ি করবেনা মুগ্ধ।”
মুগ্ধ বাঁকা হাসলো। একহাতে আলতো করে চোখ থেকে চশমা খুলে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। কন্ঠে কেমন শ্লেষাত্মক ভঙ্গি টেনে বলল,
“ করলে কী করবি? মারবি? না কাটবি?”
অনিক উত্তর দিলো না। চোয়াল শক্ত করে দাঁড়াল চুপচাপ। এরইমধ্যে মুগ্ধের পেছন থেকে ছুটে আসলো বেশকিছু সশস্ত্র বডিগার্ড। প্রত্যেকের ড্রেসআপ একই রকম। কয়েকজন এসেই আগে চেপে ধরল পড়ে থাকা হাজী সাহেব এবং অনিককে। অনিক বেশ মোচড়াচ্ছে। গলা উঁচিয়ে বারবার ছাড়তে বলছে তাকে। এতে বোধহয় বিরক্ত হলো মন্সটার। তক্ষুনি চিড়বিড়িয়ে আদেশ ছুড়ল নিজ লোকেদের উদ্দেশ্যে,
“ এটার মুখ বন্ধ কর!”
হুকুম তামিল হলো যথার্থ। একজন তক্ষুনি পকেট থেকে রুমাল বের করে অনিকের মুখ আঁটকে দিলো। এতে এবার গোঙাচ্ছে বেচারা। মুগ্ধ ক্রুর হাসলো তা দেখে। শান্ত কন্ঠে বলল,

“ নাউ, ইট সাউন্ডস বেটার!”
বলেই সে এবার ডানহাতের তর্জনী উঁচিয়ে পেছনে থাকা গার্ডদের ইশারা করলো বাড়ির দিকে। মুহুর্তেই বাকিরা চোটপাট চালিয়ে ঢুকলো বাড়ির ভেতর। বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুজিঁ চালিয়েও বাড়িতে কারো হদিস না পেয়ে একজন গার্ড বেরিয়ে এসে শুধালো,
“ বাড়িতে কেউ নেই মাস্টার!”
মুগ্ধ খানিকক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ করেই কেমন বাঁকা হাসলো। বাঁকা চোখে তাকালো অনিকের পানে। গোঙাতে থাকা ছেলেটার পানে দৃষ্টি তাক রেখে আলতো মাথা নাড়িয়ে শ্লেষাত্মক কন্ঠে বলল,
“ নাইস ট্রায়!”

অনিক কি বুঝলো কে জানে! সে হঠাৎ থেমে গেল কেমন। শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো এক জায়গায়। মুগ্ধ খানিকক্ষণ এদিক-ওদিক ঘাড় নাড়িয়ে ফুটালো শব্দ করে। লম্বাটে চৌকস চোয়ালটা শক্ত হচ্ছে ক্রমশঃ। বাদামি ঠোঁটজোড়ার নিচের অংশ কামড়ে ধরেছে ধারালো দাঁত। সে সময় নিলো না একটুও। তৎক্ষনাৎ হাত ঘুরিয়ে কোমরের পেছন থেকে রাশিয়ান AQ1 মডেলের রিভ*লবারটা বের করে এনে, জোরালো কদমে এগিয়ে এলো অনিকের দিকে। বন্দুকের নলটা অনিকের কপালের ঠিক মাঝ বরাবর তাক করতেই হঠাৎ বাড়ির পেছনের বাগান থেকে ভয়ার্ত কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠল ইকরা। মেয়েটা তক্ষুনি স্বামীর টানে ছুটে আসতে চাইলেই সামনে থেকে দুজন গার্ড আঁটকে ফেলল তাকে। ইকরা তবুও থামছেনা। কাঁদতে কাঁদতে অসহায়ের ন্যায় বলছে,
“ প্লিজ ওনাকে কিছু করোনা। আমি মরে যাব ওর কিছু হলে! প্লিজ পুট দা গান ডাউন।”
ক্রুর হাসে মুগ্ধ। বাহাতের তর্জনী উঁচিয়ে গার্ডদের আবারও ইশারা করে বাগানের দিকে। গার্ডরা সেদিকে গেল ঠিকই, তবে এবারেও আর কাউকে খুঁজে পেলো না তারা। খালি হাতে মুগ্ধের দিকে এগিয়ে আসতেই মুগ্ধ এবার কটমটিয়ে অনিকের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,

“ বাকিরা কোথায়?”
অনিক নিশ্চুপ! মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে বেচারা। মুগ্ধের সহ্য হলোনা এহেন নিরবতা। সে তৎক্ষনাৎ নিজের ওপর থেকে সংবরণ হারালো। শক্ত হাতে চোখের পলকে ঘুষি বসালো অনিকের পেট বরাবর। তক্ষুনি বেচারার মুখ থেকে ছিটকে বেরুলো লহু! মুগ্ধ এতেও থামেনি। একহাতে অনিকের চুলগুলোকে শক্ত করে চেপে ধরে গান পয়েন্ট করলো ছেলেটার চোয়ালের নিচে। চারিদিকে সর্তকীকরণ নজর ঘুরিয়ে ঝাঁঝাল কন্ঠে বলল,
“ আর একমিনিটের মধ্যে বাকিরা বেরিয়ে না এলে আজ এখানে সব-কয়টার লাশ পড়বে বলে দিলাম!”
মুগ্ধ থামলো। শক্ত চোখে তাকিয়ে রইলো। ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটাটা পুরো একবার পরিক্রমা করতেই সে তৎক্ষনাৎ বন্দুকের ট্রিগার চাপলো। মুহুর্তেই বিকট শব্দ তুলে গুলি বেরুলো বন্দু*কের লৌহ নল দিয়ে। সে শব্দ কানে যেতেই উম্মাদের ন্যায় বাড়ির বা-দিকের খড়ের স্তুপের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে অরিন। কাঁপতে কাঁপতে ছুটে আসে মেয়েটা। গলা উঁচিয়ে ডাকতে থাকে,

“ ভাইয়া!!!”
কিন্তু ভাই অব্দি আসতে পারেনি অরিন। তার আগেই তাকে আটকে ফেলে গার্ডস। ওদিকে অনিকের ডান বাহু থেকে অঝরে ঝরছে লাল তরল। মুগ্ধ তার বাহুতে শ্যুট করেছে। বেচারা ব্যাথায় গুটিয়ে পড়েছে একপ্রকার। অথচ মুগ্ধ নামক অমানবিক নিষ্ঠুর যুবকের চোখেমুখে নেই কোনো অপরাধবোধ। সে আবারও চেঁচায়,
“ এবার না বেরুলে, আই সয়্যার আমি সব-কয়টাকে মেরে ফেলব!”
“ দাঁড়ান!”
মুগ্ধের কথার পিঠেই হঠাৎ কথাটা বলে ওঠে মাহি। মেয়েটাও বেরিয়ে এসেছে খড়কুটোর ভেতর থেকে। তার চোখেমুখে নেই তেমন উদ্বেগ। সে কেমন শক্ত মুখে আওড়ায়,
“ আপনার আমাকে চাই তাইতো? ওকে ফাইন নিয়ে যান। তবে বাকিদের ছেড়ে দিন।”

মুগ্ধ নিশ্চুপ! সরু চোখে মেয়েটার পানে তাকিয়ে থেকে এগিয়ে আসে কয়েক কদম। মেয়েটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার হঠাৎ কী হলো কে জানে! সে তৎক্ষনাৎ ব্যগ্র হাতের শক্তপোক্ত থাপ্পড় বসালো মেয়েটার গাল বরাবর। মুহূর্তেই এহেন বিকট থাপ্পড়পর তাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়লো মেয়ে। চোখদুটোর সামনে কেমন আধার হয়ে এসেছে তার। ঠোঁটে হঠাৎ স্বাদ অনুভব হলো ক্ষারীয় কিছুর। সে হাত বাড়িয়ে ঠোঁটের ওপর থেকে তরলটা হাতে নিয়ে দেখে — এ আর কিছু নয় বরং লহু। সে নিজেকে সামলে উঠতেই যাবে ঠিক তখনি তার পেছন থেকে এগিয়ে এসে তার চুলগুলোকে মুঠোয় চেপে ধরে মুগ্ধ। এহেন কান্ডে ককিয়ে ওঠে মেয়েটা। মুগ্ধের হাত সরাতে চাইলেই মুগ্ধ কেমন শক্ত গলায় শুধায়,

“ নিজেকে বড্ড চালাক মনে করিস মেয়ে? দু’জনার চেহারা এক হলেই ভেবেছিস আমি ধরতে পারবোনা কে কোনটা? বেয়াদবের বাচ্চা! কার সাথে নাটক করিস তুই? দেই এখন মেরে?”
আহি বুঝলো সে ধরা পরেছে। তাইতো মেয়েটা কেমন ককিয়ে যাচ্ছে ব্যাথায়। মুগ্ধ তাকে ছাড়লো সময় নিয়ে। রয়েসয়ে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে পা বাড়ালো খড়কুটোর পেছনে। অতঃপর একমুহূর্ত দাঁড়িয়ে থেকে হঠাৎ সে হাত বাড়িয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দেখল খড়কুটো গুলো। যে-ই টের পেল খড়কুটো সব শুকনো, ওমনি মহাশয় পকেট থেকে নিজের মোটা সিগারটা বের করে এনে ঠোঁটে গুঁজল। লাইটার দিয়ে সিগারের শেষ ভাগ ধরিয়ে হুট করেই লাইটারটা ছুঁড়ে মারলো খড়কুটোর গায়ে। মুহুর্তেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠল আগুন। সেকেন্ড ত্রিশেকের মধ্যেই খড়কুটোর ভেতর থেকে চিৎকার ভেসে আসে মাহির। মেয়েটা কোনমতে নিজের গা বাঁচিয়ে বেরিয়ে আসে খড়কুটোর ভেতর থেকে। তা দেখে নির্লিপ্ত ভাব বজায় রাখলো মুগ্ধ। ক্রন্দনরত মাহির পানে এগিয়ে এসে তক্ষুনি চেপে ধরে মেয়েটার হাতের কব্জি। জোরালো পায়ে এগুতেই হঠাৎ মাহি কেমন দাঁত খিঁচে বলল,
“ হাত ছাড়ুন আমার বদলোক! আমি কিছুতেই আপনার সাথে যাব না। আমার বাবা এলে কিন্তু আপনার খবর করে ছাড়বে বলে দিলাম!”

হঠাৎ এরূপ বাক্যে চলন্ত পা জোড়া থামালো মুগ্ধ। ঘাড় বাকিয়ে বাদামী চোখজোড়া সরু করে তাকাল মেয়েটার মুখপানে। পরক্ষণে তার কী হলো কে জানে! সে আচমকা মাহির হাতটা ছেড়ে দিল আলগোছে। মাহি হতবুদ্ধির ন্যায় তৎক্ষনাৎ নিজের হাতের কব্জি চেপে ধরে নাক টানে। ওদিকে মুগ্ধ এবার ভাব ধরেছে। ঠোঁটের কোণে ক্রুর হাসি লেপ্টে, একহাতে ঠোঁট থেকে সিগার নামিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে সুর টেনে টেনে বলে,
“ ভাভাগো! তোর বাপের কথা শুনে, আমিতো ভয়ে কেঁপে উঠলাম মেয়ে!”
একটু থেমে বেয়াদব ছেলে একপা এগিয়ে এসে, হঠাৎ প্যান্টের জিপারের ওপর হাত ঠেকিয়ে ঠোঁট কামড়ে বলে,
“ এই দেখ! ভয়ে আমার ইয়ে টাও কেঁপে উঠল! ইশশ্.. এবার আমার কী হবে?”

হতভম্ব মাহি! চোখমুখ কুঁচকায় মুগ্ধের ওমন বেলাল্লাপনায়। মাথাটা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেই হঠাৎ টের পেল, তার চুলের গোড়া দিয়ে আচমকা ঢুকে পরেছে কারো শক্তপোক্ত হাতের আঙুল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই, তার চুলের গোড়া শক্ত চেপে ধরে মুগ্ধ। মাহি ককিয়ে ওঠে ব্যাথায়। অথচ সেদিকে বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই মুগ্ধের। ছেলেটা কেমন শক্ত চোয়ালে তাকিয়ে আছে মেয়েটার পানে। চোখদুটো অগ্নিস্ফুলিঙ্গের ন্যায় জ্বলছে। তামাকে পোড়া বাদামী ঠোঁটজোড়া নড়ছে মৃদুমন্দ। সে আচমকা নিজের হাতের জ্বলন্ত সিগারটা চট করে চেপে ধরে মাহির ডানহাতে। এতে বোধহয় জান বেরিয়ে আসার যোগাড় মাহির। মেয়েটা বুক ফাটিয়ে আর্তনাদ করে ওঠে। এদিকে তার ওমন আর্তনাদ শুনে পৈশাচিক হাসিতে মেতে ওঠে মুগ্ধ। সে আরেকবার শক্ত হাতে ঝাঁকিয়ে ওঠে মাহির ক্ষুদ্র মাথাটা। বেচারি এবার কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারাবে যেন। গোলাপের পাপড়ির ন্যায় নরম অধর যুগল তিরতির করে নাড়িয়ে যেইনা কিছু বলতে যাবে ওমনি কর্ণকুহরে ভেসে এলো মুগ্ধের কটমটিয়ে বলা বাক্য!

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৬ (২)

“ তোর আধবুড়ো বাপেরে ডরাই আমি বান্দীর মেয়ে? তোর বাপকে বললে আমার বা*ল ছেঁড়া যাবে। শালার বালছিড়ুঁর মেয়ে কোথাকার। তাের বাপের সামনে থেকে তোকে কাঁধে তুলে নিয়ে যাব, দেখি তোর বাপ আমার কয়টা বা*ল ছিঁড়তে পারে। চল…!”

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি সিজন ২ পর্ব ২৮