Home তুই আমার ৭ মিনিট তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৪১

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৪১

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৪১
ঐশী আফরিন

সকাল থেকে রুহি তৈরী করে রেখেছে সব। আজই পালিয়ে যাবে তারা। অভির কথামত সবাইকে আজ সারাদিন সময় দিয়েছে। আয়াজের কাছেও ক্ষমা চেয়েছে। যদিও আয়াজ ক্ষমা করেছে কীনা জানা নেই। বাড়ির বাকিরা ঘুমিয়ে গেলে নিজেও তৈরী হয়ে নেয়। আয়াজকে ইচ্ছে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে দিয়েছে। আর বাকিদের রুহিই খাইয়েছে। আপাতত বাড়ি নিস্তব্ধ। রুহি, ইচ্ছে আর মাধবী দাঁড়িয়ে আছে এক ধান ক্ষেতের পাশের নির্জন রাস্তায়। এখান থেকেই অভি রুহিকে নিয়ে যাবে। কিছুক্ষনের মাঝেই আরিয়ান,অপূর্ব, অরিন্দ,অভি উপস্থিত হয়।

রুহির হৃদপিণ্ড লাফিয়ে উঠে সবাই কে একসাথে দেখে। ভাবতেই বুক এফোড় ওফোড় হয়ে যাচ্ছে যে, এই মানুষগুলোকে আর একসাথে পাওয়া হবে না। আয়াজের পিছু পিছু গিয়ে ওদের আড্ডায় সামিল হতে পারবে না। মানুষগুলোর প্রান ভোলা হাসির দেখা আর পাওয়া হবে না। রুহির মনের অবস্থা বুঝতে পেরে মাধবী তার হাত চেপে ধরে চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করে। অভি সবার সাথে কোলাকুলি করছে। বিদায়ের এই বেলায় মনে হচ্ছে সারা জীবনের জন্য বন্ধুদের হাড়িয়ে ফেলছে। অরিন্দকে জরিয়ে ধরলে অরিন্দ আচমকাই বাচ্চাদের মত কান্না করে দেয়। ঠোঁট ভেঙে কান্না আটকে বলে “ভাই আবার আসবি কিন্ত হ্যা। তোকে আমাদের জন্য হলেও আসতে হবে। বউকে পেয়ে বন্ধুদের ভূলে যাস না। গিয়ে ঠিকানা দিবি। আমরা সবাই মিলে তোর বাড়িতে আড্ডা দিতে যাবো। আর কোন বন্ধুবান্ধব বানাবি না কিন্ত। যাস না ভাই…”

বলে ডুকরে কেঁদে উঠে অরিন্দ। অভি অরিন্দকে ধরে নিজেও কান্না করে দেয়। অপূর্ব চোখ মুছে বলে “সবাই তোরা চলে যাবি একে একে। আমাদের আর কেউ মনে রাখবি না। থাকবি না যখন তাহলে কেন মিশেছিলি আমাদের সাথে”
অভি ঠোঁট চেপে বলে “আসবো আমি। সব ঠিক হলে আবার একসাথে হবো। তখন আজীবন আমরা একসাথে থেকে যাবো”
অরিন্দকে ছেড়ে অভি আরিয়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। যে এই মুহূর্তে চোখ লাল করে তাকিয়ে আছে। হয়তো কঠোরতা ভেঙে কাঁদতে চাইছে না। অভি আচমকা তাকে জরিয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠে “আমার সব বিপদ আপদে তোরা যেমন পাশে ছিলি তেমন করে কেউ কখনো ছিলো না। আমি জানি না তোদের ছেড়ে গিয়ে কীভাবে থাকবো। তোরা ধর্ম না দেখে বন্ধুত্ব করেছিস আমার সাথো। সব সময় আমাকে যেকোন উৎসবে পাশে রেখেছিস। কখনো এতিম বলে ভেদাভেদ করিস। তোদের মত বন্ধু সবার হোক। আমাকে মনে রাখিস সবাই। ভূলে যাস না। তোর বোনের জামাই হিসেবে না আমি সবসময় তোর বন্ধু হয়ে থাকতে চাই”

বাকিরাও এসে জরিয়ে ধরে একসাথে। চোখ ভিজে উঠে রুহির। ইচ্ছে মুখ চেপে ডুকরে কেঁদে উঠে। বন্ধুমহলের সাথে কাটানো সময়গুলোই ছিলো জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্ত। যেখানে ছিলো না কোন স্বার্থপরতা ছিলো না কোন অহংকার। একসাথে হলে দুনিয়ার সব বিভিষিকা ভূলে গিয়ে হাসি আর আনন্দে মেতে উঠেছে। একজনের বিপদে আরেকজন জান দিয়ে হলেও ঢাল হয়েছে। কত শত স্মৃতি পরে রবে নিবিড় অবেলায়। একটা সময় কেউ সেগুলো মনে করতে চাইবে না। একে একে সবাই অভির মতই নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরবে। অকারণে হাসাহাসি গুলো স্থগিত হয়ে যাবে সেখানেই। কেন যেন মনে হচ্ছে এটাই সবার শেষ একসাথে হওয়া। মনে হচ্ছে এটাই যেন শেষ বিদায়। অভি জরানো কন্ঠে বলে “আয়াজকে বলিস ক্ষমা করে দিতে। এই শেষ সময়টাতে ওকে রাখতে পারলাম না। বলিস যেন দোয়া করে আমাদের জন্য”

সবাই পাথর হৃদয় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অভি ইচ্ছের কাছে গেলে ইচ্ছে আবারও কান্না করে দেয়। অভি হাসার চেষ্টা করে বলে “দূর পাগলি এত কান্নার কী আছে। মনে হচ্ছে আমি শশুর বাড়ি চলে যাচ্ছি। আমরা আবার একসাথে হবো। ততদিন নিজেকে মানিয়ে নিস। আর আয়াজের সাথে বাজে ব্যবহার করিস না। ও তোকে খুব ভালো বাসেরে। পাগল হয়ে যাচ্ছে ছেলেটা। একটু সময় দিস”
“ভাবি দোয়া করবেন আমাদের জন্য। আসছি”
অভি মাধবীকে স্বাভাবিক ভাবে বললেও রুহি স্বাভাবিক ভাবে বলতে পারলো না। সর্ব প্রথমেই মাধবীকে জরিয়ে ধরে ক্ষমা চায়। একে একে সবার কাছে ক্ষমা চাওয়া শেষে আবারও ফিরে আসে মাধবীর কাছে। আরশিকে শেষবারের মত দেখার জন্য মন ছটফট করছে। কিন্ত তা তো আর সম্ভব নয়। মাধবী সান্তনা দিয়ে বলে “কান্না করিস না। গিয়ে মরে যাচ্ছিস না। আর আমিও হাড়িয়ে যাচ্ছি না। পৌছেই একটা চিঠি লিখবি। সবাই অপেক্ষায় থাকবো। সাবধানে যাবি”
তারপর অভির উদ্দেশ্যে বলে “আমার বোনকে যেন কখনো কষ্ট দেওয়া না হয়। যেমন নিয়ে যাচ্ছেন পরিস্থিতি ঠিক হলে আবার তেমনভাবে ফেরত দেবেন”
অভি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায় “হুম”
এরপর আবারও শেষবারের মত সবার সাথে মুসাফাহা করে গরুর গাড়িতে উঠে বসে। সকলের মনই যেন মানতে নারাজ। গরু গাড়ির চাকা চলতে শুরু করলেও মন সবার এক জায়গাতেই স্থির। বিদায়ের আলিঙ্গনে ভার হয়ে আছে মন। শেষ বেলায় চাইলেও কেউ হাসিমুখে বিদায় দিতে পারলো না। যতক্ষণ গাড়িটা দেখা গেল ততক্ষণ সবাই তাকিয়ে থাকে। অতঃপর ধীরে ধীরে গাড়িটা চোখের আড়াল হয়। সাথে আড়াল হয় হাসিখুশি এক বন্ধুমহলের হাসিখুশি দুটি প্রাণ!

অভি আর রুহিকে বিদায় দিয়ে মাধবী বাড়ি ফিরে এসে আরিয়ানের ঘুমিয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করে। আরিয়ানের খাবারেও ঘুমের ঔষধ মেশানো হয়েছে। কিছুক্ষনের মধ্যেই ঘুমিয়ে যাবে। মাধবী আজ চলে যাবে জ্বীন রাজ্যে। কালই যেতো। শুধু অভি আর রুহিকে বিদায় দেওয়ার জন্য থেকে যায়। বেশ কিছুক্ষন পর আরিয়ান ঘুমিয়ে গেলে মাধবী উঠে বারান্দায় যায়। কিছুক্ষন নিরবে ভাবনা চিন্তা করে। গ্রামের অবস্থা সম্পর্কে সে অজ্ঞাত। তবে এতটুকু জানে যে অবস্থা ভালো নেই। এখন সে যদি চলেও যায়- তাহলে কবে ফিরতে পারবে জানা নেই। গ্রামের মানুষ গুলোকে এমন বিপদের মুখে ফেলে স্বার্থপরের মত চলে যাচ্ছে। ফিরে এসে আর হয়তো রাজত্ব পাবে না। গ্রামের লোকজন তাকে ভূলে যাবে। এরপর চাইলেও চিরচেনা গ্রামটাকে তৃপ্তি ভরে দেখতে পারবে না।

কিন্ত এখন যে তার কিছুই করার নেই। তবে সে চাইলেই পারতো আরিয়ান কে সব জানাতে। তাহলে আরিয়ান হয়তো ঐ পরী সহ ওকে বুদ্ধি দেওয়া সবাই কে শাস্তি দিত! কিন্ত কেন যেন মন সায় দিচ্ছে না এসবে। বড্ড ইচ্ছে করছে সব ছেড়ে ছুড়ে একা কোথাও পালিয়ে যেতে। আর এটাই সেই সুযোগ। হয়তো আরিয়ান তাকে পাগলের মত খুঁজবে। খুব কষ্টও পাবে হয়তো! কিন্ত সে মনে মনে ভেবে নিয়েছে আরিয়ান যদি তাকে খুঁজে না বের করতে পারে তাহলে আর কখনও এখানে ফিরে আসবে না। আজীবন জ্বীন রাজ্যেই কাটিয়ে দেবে। এবার তার অব্যাহতি দরকার। পরিশ্রান্ত সে। এবার সে পালিয়ে যাবে। নিজের সমস্ত সৌন্দর্য সমস্ত আকর্ষণ নিয়ে পারি দেবে অলৌকিক জ্বীন জগতে। আর এখানে থাকা হবে না। সে পুরোদমে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে পরীকে ডাক দেওয়ার। তবে তার আগে আরেকবার ঘরে তাকিয়ে সেই নিষ্পাপের মত ঘুমন্ত মুখশ্রীতে চোখ বুলায়। তাচ্ছিল্য হাসে। ঠোঁটে বাঁকা হাসির উপস্থিতি রেখে জোরে জোরেই বলে-
“আপনি জেনে বুঝে এক স্বার্থপর নারীকে ভালোবাসলেন। যে নিজের স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। সে এতটাই স্বার্থপর যে আপনাকে ভালোও বাসলো স্বার্থের জন্য আর ছেড়েও যাচ্ছে স্বার্থের জন্য। যাকে আপনি একজন মানুষের জীবনে প্রথমবারের মত আসা মহাবিশ্বের সবচেয়ে দামী এবং শ্রেষ্ঠ সময়, ৭ মিনিটের উত্তরসূরী করলেন- সে আপনাকে তার মূল্য দিতে ব্যর্থ। ফিরে এসে বোধহয় আপনাকে আর পাঞ্জাবিওয়ালা হিসেবে পাওয়া হবে না। তবে আমাকে আর মধুমতী হিসেবে পাবেন না”

অভি আর রুহি ময়মনসিংহ থেকে বেশ দূরে কুয়াকাটার একটা ছোট্ট বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। আজই বিয়ে করবে বলে জানিয়েছে অভি। এই অচেনা জায়গায় এত রাতে কীভাবে কী করবে ভেবে পেলো না রুহি। বিরক্ত হয়ে বললো “রাত তো প্রায় শেষই। কিছুক্ষন পরেই আযান পরবে। কালই না হয় করি”
অভি ঘোর আপত্তি জানিয়ে বলে “না আজই”
“এত রাতে কোন কাজী আপনার বিয়ে পরানোর জন্য বসে আছে?”
“কিন্ত কাল পর্যন্ত তো দেড়ি হয়ে যাবে”
“কাল কী মরে যাবো যে কাল পর্যন্ত দেড়ি হয়ে যাবে?”
“তা- না। কিন্ত আজ রাতটা কী করবো?”
“কিছু করার না থাকলে চলুন আশপাশটা ঘুরে আসি। রাতের বেলা ভালো লাগবে”

রুহির মনের অবস্থার কথা ভেবে অভিও রাজি হয়। বাহিরে চাঁদের আলোয় চারিদিক আলোকিত। দরজার খিলে একটা ছোট্ট তালা ঝুলিয়ে দুজনে মাটির রাস্তায় হাঁটা ধরে। উদ্দেশ্য হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রের গর্জনে হাঁড়িয়ে যাবে। কিছুক্ষনের মাঝেই তারা সমুদ্রের পারে পৌছে যায়। জীবনে প্রথম বারের মত সমুদ্র দেখে রুহি আনন্দে বাঁকহারা হয়ে যায়। ছুটে যায় নোনাজল ছুঁয়ে দেখার লোভে। পুরো এলাকাটা জনমানবশূন্য। শুধু চাঁদের আলোয় রুহির হাস্যজ্জল বদনটা ঝিলিক দিয়ে উঠছে। এতক্ষণের মন খারাপ টা নিমিষেই কেটে গেছে নীল পানি দেখে। রুহি সাগরের পানিতে দুজনের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে “জানেন আমার সমস্ত শখের মধ্যে এটা একটা ছিলো। আপনার সাথে সমুদ্র বিলাস করবো। আজ যেন হঠাত করেই শখটা পুরণ হয়ে গেল”
অভি ঠোঁট কামরে হেসে বলে “আচ্ছা?”

“হুম”
“আর কী শখ আছে?”
রুহি ভাবুক হয়ে বলতে শুরু করে “আপনার আর আমার একটা ছোট্ট সংসার হবে। ওসব বিলাসিতার জীবন আমার লাগবে না। কেবল একটা ছোট্ট মাটির ঘরে আমরা সংসার সাজাবো। যেখানে ছোট্ট একটা প্রাণ পুরো উঠোন জুরে হেসে বেরাবে। প্রতি সকালে আপনি শিউলি ফুল কুড়িয়ে এনে আমায় দেবেন। আমি সেগুলো শুকিয়ে যত্ন করে রেখে দেব। কাঠফাটা দুপুরে একসাথে উঠোনের খোলা বারান্দায় বসে খাবার খাবো। বিকেলে একসাথে দখিনা হাওয়ায় ভেসে যাবো। সন্ধ্যায় সারাদিনের ক্লান্তি শেষে একসাথে বসে গল্প করবো। অর্ধেক রাত পর্যন্ত জোছনা বিলাস করবো। ব্যস আপাতত এতটুকুই শখ। এগুলো পূর্ণ হয়ে গেলে আর কিচ্ছু চাই না”

“যদি ইশ্বর বাঁচিয়ে রাখে তাহলে তোমার সমস্ত শখগুলোকে একে একে পূর্ণ করবো”
“আমরা বাড়ি কবে ফিরতে পারবো?”
“জানি না। যখন পরিস্থিতি ঠিক হবে তখন চলে যাবো”
“আমরা জানবো কীভাবে ওদিকের পরিস্থিতি?”
“সে আমি খোঁজ রাখতে পারবো”
“আর কেউই তো জানেনা না আমরা বর্তমানে কোথায় আছি?”
“কাউকে জানাইনি”
“এখন যদি এখানে আমাদের কোন বিপদ হয় তাহলে ওরা তো আমাদের খুঁজেও পাবে না”
“তা ঠিক। সকালে আরিয়ানের ঠিকানায় চিঠি লিখে জানিয়ে দেব”
“আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। অবশেষে আমরা একসাথে হয়েছি”
“ইশ্বর আগে থেকেই আমাদের জুটি লিখে দিয়েছেন। তাই একসাথে হতে পেরেছি”

“ইশ্বর নয়। বলুন আল্লাহ। আল্লাহ চেয়েছে বলেই সম্ভব হয়েছে। নয়তো এত বাধার পরেও একসাথে হতে পারতাম? একে তো ধর্মের ব্যবধান, তার উপর আপনি কম হলেও আমার থেকে ১৩,১৪ বছরের বড়”
“বয়সের খোঁচা দিচ্ছো? হতে পারো তুমি ছোট কিন্ত বিয়ের জন্য আমার বয়স ঠিকই আছে”
রুহি চাঁদের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলতে শুরু করে “জানেন? আমি কখনও ভাবিইনি এমন কিছু হবে। এমনকি আপনিও যে মনে মনে আমাকে পছন্দ করেন সেটাও কখনো বুঝতে পারিনি। আপনাদের আড্ডায় সামিল হতে আমার বরাবরই ভাল্লাগতো। তাই ভাইয়া গেলে ভাইয়ার পিছু পিছু চলে যেতাম। আস্তে আস্তে ওখানের সবাইকে ভাইয়ের চোখে দেখলেও আপনার উপর অদ্ভুত এক আগ্রহ কাজ করতো আমার। যেটা কখনো হওয়ারই ছিলো না। তবে যখন জানলাম আপনি হিন্দু তখন মনটাই ভেঙে গেলো। এরপর অনেকবার চেষ্টা করেছি আপনাকে ভূলে থাকতে। কিন্ত পারিনি। মনকে কত বুঝ দিতাম যে, আপনার মত এমন সুদর্শন সুপুরুশ আমাকে কখনোই পাত্তা দেবেন না। তার উপর ধর্মের ব্যবধান। আর আপনার যে রাগ আমার হয়তো কখনও সাহসই হতো না আপনাকে কিছু বলার মত। কিন্ত যখন শুনলাম আমার প্রতিও আপনার অনুভূতি আছে তখন আমি কী যে খুশি হয়েছিলাম! বোঝাতে পারবো না। মনে হয়েছিল, এখন যদি পরিবার মেনেও না নেয়। তাহলে পালিয়ে যেতে পারবো। আর আজ সেটাই হলো। কাল হয়তো সবাই জেনে যাবে। সকলেই পুরো এলাকায় রটে যাবে কথাটা। সমাজের মানুষ আমার এবং আপনার চরিত্রে দাগ দিতে উঠে পরে লাগবে। দীর্ঘ একমাস ব্যাপি চলবে এই আলোচনার বহর। তাতে কী? ওসব তো আর আমি শুনবো না। আমি তো যাকে চেয়েছি তাকে পেয়েই গেছি”

বলে খিলখিল করে হেসে দেয় রুহি। অভিও হেসে দেয়। কিছুক্ষন পর রুহি আবারও বলে “একটু পর আযান পরলে একটা পাঞ্জাবি আর একটা শাড়ি কিনে আনবেন। বিয়েতে এসব না পরলে বিয়ের মত মনে হবে না। এরপর কাজী আর কিছু হুজুর ডেকে এনে প্রথমে মুসলিম হয়ে নিবেন। পরে কিন্তু বিয়ে শেষে ঘর গোছানো শুরু করতে হবে”
“তুমি তো এসব স্থানে থেকে অভ্যস্ত নও। কীভাবে সামলাবে সব?”
“আপনি বুঝি খুব অভ্যস্ত? ওসব কিছু না। থাকতে থাকতে সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন চলুন বাড়ি চলে যাই। কাল অনেক কাজ আছে। এখন তো এই সাগর সবসময়ই দেখতে পাবো। আর হ্যা, বিয়ের পর কিন্ত আমি সবসময় শাড়িই পরবো”
রুহির এত আগ্রহ দেখে অভি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে “একটা সংসারের খুব শখ মনে হচ্ছে তোমার!”
রুহি আকাশে তাকিয়ে দুহাত বারিয়ে দিয়ে বলে “খুউউব। কাল থেকে সেই শখ পূর্ণ হবে”
বাতাসের তোড়ে তাদের পরনের কাপড় শব্দ করে উঁড়ছে। রুহি নিজেই এগিয়ে গিয়ে অভির হাত ধরে বাহুতে মাথা রাখে। হাঁটতে হাঁটতে বলে “কাল থেকে পৃথিবীটাকে অন্যরকম করে দেখবো। তাড়াতাড়ি চলুন”

রাতটা দুজনে মেঝেতে দু পাশে দুটো মাদুর পেতেই কাটিয়ে দিলো। পরদিন সকালে রুহির কথামত অভি কয়েকটা শাড়ি সাথে মিল করে চুরি,টিপ,ঝুমকা কিনে নিয়ে আসে। সাথে একগুচ্ছ লাল গোলাপ আনতে ভোলে না। আলাদা করে বিয়ের জন্য একটা লাল টুকটুকে বেনারসি আনে। রুহির সামনে একটা আয়না রেখে বলে “নিন এবার তৈরী হয়ে নিন। আমি কাজী এবং হুজুর সবাইকে ডেকে আনছি। এসে যেন দেখি লাল টুকটুকে বউ সেজে বসে আছেন”

রুহি লাজুক হাসে। অভি চলে গেলে লাল শাড়িটা গায়ে জরিয়ে নেয়। দু হাত ভর্তি করে লাল চুরি পরে। খোপায় গোলাপ গুজে একদম সাদামাটা ভাবেই বিয়ের জন্য তৈরী হয়ে যায়। চোখে একটু কাজল দেওয়া দরকার। জীবনে একটা মাত্র বিয়ে বলে কথা। কিন্ত কাজল তো নেই। সে বেরিয়ে দূরে এক প্রতিবেশীর বাড়ির চুলো থেকে কয়লা নিয়ে আসে। তাদের বাড়ির আশেপাশে তেমন মানুষ জন নেই। তাই দূর থেকেই আনতে হলো। হাতে কয়লা ঘষে সেখান থেকে কালি নিয়ে স্বযত্নে চোখ দুটো রাঙিয়ে দেয়। এবার মনে হচ্ছে সব কিছু তৈরী। হুজুরদের মিষ্টি মুখ করাতে হবে বলে অভি কিছু মিষ্টি কিনে এনেছিলো। সেগুলো বের করে সাজিয়ে গুজিয়ে রাখে। সব শেষে খাটের উপর বসে পা দুলিয়ে বিরবির করে “অবশেষে পূর্ণতার গান গাইতে পারবো। আল্লাহ সহায় হয়ো”
তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়। অভি এসেছে ভেবে রুহি দেঁড়ি না করে চটজলদি দরজা খুলে দেয়। কিন্ত এ কি! এরা কারা? দরজার সামনে কিছু অপরিচিত লোক দাঁড়িয়ে আছে। কুচকুকে কালো বিভৎস চেহারা। অঙ্গভঙ্গী দেখে রুহির গাঁ গুলিয়ে আসার উপক্রম। মনকে শক্ত করে স্বগতিক গতিতে আওড়ায় “কে আপনরা?”
“তোর জম”

ইশান বাড়ির বৈঠক খানার উপরে ছোট খাট ঝড় উঠে যাচ্ছে। একের পর এক কাচের জিনিস গুলো ভেঙে পরে আছে মেঝেতে। আতঙ্কে সকলে জমে গেছে। শেষ ফুলদানিটা স্বজোরে মেঝেতে ছুরে চিৎকার করে উঠে আরিয়ান “বেয়াদব একটা নারী বিয়ে করেছিলাম আমি। যার কাছে আমার কোন মূল্যই নেই। পই পই করে বলেছি যেখানে যাবি আমাকে নিয়ে যাবি। কিন্ত শুয়োরের বাচ্চা আমার কথা শোনেনি। অবাধ্য বেঈমান নারী। ছ্যাহ”
তার কথার মাঝেই অপূর্ব আসে। ওকে সোফায় বসিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে। আরিয়ান রেগে হাত ঝারা দিয়ে ফেলে দেয়। পাশ থেকে মাহমুদা ইশান বলে “এসব কথা এখন আমাদের শোনালে হবে কী। নিজে নিজে বিয়ে করেছো এখন এসব আমাদের বলো না”

আরিয়ান অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে মাহমুদা ইশানের উপর। কিন্ত তিনি দমে যান না। শান্ত স্বরে বলে “ওর চিন্তা ছাড়ো। এমন নয় যে ও বিপদে পরেছে। ও পালিয়ে গেছে। যে হাড়িয়ে যায় তাকে খুঁজে পাওয়া যায় কিন্ত যে ইচ্ছে করে হাড়ায় তাকে পাওয়া যায় না। দেখোনা আরশিকে আর পাওয়া যায়নি। এবার তোমার সুষ্ঠু জীবন সঙ্গী দরকার। আমি মেয়ে দেখছি। খুব তাড়াতাড়ি বিয়ের জন্য প্রস্তুত হও”
কথাগুলো বলে তিনি গট গট পায়ে প্রস্থান করে। সেদিকে তাকিয়ে আরিয়ান ক্রোধের বশে সামনে থাকা টেবিলটা লাথি দিয়ে ফেলে দয়। অপূর্ব ওকে আটকে বলে “ভাই এভাবে অশান্তি না করে চল খুঁজে বের করি। ঘরে বসে থাকলে কী খুঁজে পাবো? আমি সবাই কে খবর দিয়েছি। ওরা ইতিমধ্যেই খোঁজা খুঁজি শুরু করে দিয়েছে”

আরিয়ান এবার নিজেকে শান্ত করার প্রয়াসে শান্ত স্বরেই বলে “তোর কী মনে হয় তুই ওকে খুঁজে বের করতে পারবি? কক্ষনো না। আম্মা ঠিকই বলেছে। যে হাড়ায় তাকে পাওয়া যায় কিন্ত যে নিজ থেকে হাড়ায় তাকে পাওয়া যায় না। ও নিজ থেকে হাড়িয়েছে। পুরো পৃথিবীর মানুষ লাগিয়েও ওকে তোরা খুঁজে বের করতে পারবি না”
বলে সে-ও গট গট পায়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায়। অপূর্ব সবাইকে ‘এসব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন’ বলে দৌড়ে আরিয়ান পিছু পিছু যায়। বাড়ির সকলে হাপ ছেড়ে বাঁচে। এবার রুহির মা রাশেদা ইশান চিৎকার করে উঠে “আমার মেয়েটা গেলো কোথায়। ঐ মেয়ে না হয় নিজের বুঝ বোঝে কিন্ত আমার মেয়েটা তো এসবের কিচ্ছু বোঝে না। কোথায় গেলো আমার মেয়েটা”

ভদ্রমহিলা এতক্ষন আরিয়ানের ভয়ে চুপ মেরে ছিলেন। কিন্ত এখন কিছুতেই পারছেন না। নমিতা ইশান সান্তনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পেলেন না। উনার নিজের মেয়েও তো আজ সপ্তাহ খানেক ধরে নিখোঁজ। বাড়ির সবগুলো ফুল চলে গেলো। একটা মেয়েও নেই। নমিতা ইশান বললেন “তোমার মেয়ে হয়তো অভি ছেলেটার সাথে পালিয়ে গেছে। আর আমি নিশ্চিত মাধবীই ওদের সাহায্য করেছে। তোমার মেয়ের খবর আরিয়ানও হয়তো জানে”
রাশেদা ইশান বিলাপ করে কেঁদে উঠে “আরে আমার মেয়েটা সংসারের কী বোঝে যে ওকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করলো। আমার কাছে যদি একটা বার বলতো তাহলে কী আমি দিতাম না ওদের বিয়ে। ওরা আমার মেয়েটাকে সর্বনাশের মুখে কেন ফেলে দিলো। আমার ভয় করছে খুব আমার মেয়েটার জন্য”
বলে তিনি ডুকরে কেঁদে উঠেন। আয়াজ এখনও ঘুম থেকে উঠতে পারেনি। নইলে আরো বড় তুলকালাম কান্ড ঘটে যেত। বাড়ির পুরুষদের অজ্ঞাত কারণ বসত সকাল থেকে দেখা পায়নি। একা একা মহিলা মানুষ গুলো কী করবে, কোথায় যাবে কিচ্ছু বুঝতে পারলো না। নাওয়া-খাওয়া সবার বিনালে গেল। বেলা বারতে লাগলো। বৈঠক খানায় কেবল বসে রইল দুই সন্তান হাড়া মা-!

ছোট্ট মাটির কুঠিরটায় আজ রুহির পাশে কেউ থাকলো না। পাঁচ ছয়-জন পুরুষ একসাথে ঘরের ভেতর ঢুকে পরে। রুহি কিছু বুঝে উঠার আগেই তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় একজন। সাজিয়ে রাখা মিষ্টির থালাটার উপর রুহির মাথাটা পরে। আবারও কিছু বুঝে উঠার আগেই একজন তার গলায় শক্ত থাবা বসিয়ে দেয়। শ্বাস আটকে রুহির দম বন্ধ হওয়ার জোগান। এতগুলো পুরুষকে একসাথে দেখে জীবনের চেয়ে বেশি ইজ্জতের ভয়ে কুকড়ে যায়। যখন দম একেবারে বেরিয়ে যাওয়ার জোগান তখনই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কাঁশতে কাঁশতে উঠে দাঁড়াতে নিলে পাশ থেকে একটা ওড়না নিয়ে তার হাত পা বেঁধে ফেলে। শাড়ির আচঁল টান দিতে গেলে রুহি আঁতকে উঠে। নিজের সর্বশক্তি দিয়ে ধাক্কা মেরে উঠে দাঁড়াতে নেয় কিন্ত পাঁ বেধে ফেলায় আবার পরে যায়। মিষ্টির রসে ইতিমধ্যেই তার তার শরীর চপচপে হয়ে গেছে। আহা ভাগ্য! যেই মিষ্টি আনা হয়েছিল তার নতুন জীবন শুরু করার খুশিতে সেই মিষ্টি এখন সাক্ষী হচ্ছে তার জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার। ধাক্কা দেওয়াতে ক্রোধের বশে একজন তাকে থাপ্পড় মেরে বসে। কানের নিচে থাপ্পড় পরায় রুহি গগন কাপিয়ে চিৎকার করে উঠে। শাড়ির আচঁল খুলে তার হাতদুটো বেঁধে ফেলা হয়। রুহি এবার অসহায় বনে যায়। ঠোঁটের পাশ কেটে রক্ত গড়াচ্ছে। ঝাপসা দৃষ্টি মেলে অসহায় কন্ঠে বলে “কি করতে চাইছিস তোরা। কেন এসেছিস এখানে। ছেড়ে দে আমাকে নয়তো উনি এসে তোদের একটাকেও জ্যান্ত রাখবে না। ছেড়ে দে আমাকে”

আরেকটা থাপ্পড় এসে পরে তার গালে। তবদা খেয়ে যায় মস্তিষ্ক। এমন পরিস্থিতিতেও সে কখনো পরেনি আর এত মার-ও তাকে কেউ দেয়নি। এতগুলো বলবান পুরুষের সাথে যে সে পারবে না তা জানে। কিচ্ছু করার নেই এখন তার। এই মুহূর্তে মনটা ভীষণ করে চাইছে তার ডাক্তার বাবু আসুক। একবার দেখে যাক তাকে। সে ভালো নেই। তার আদরের রুহিকে ওরা বেধরম পেটাচ্ছে। একটুও মায়া করছে না তার উপর। একবার তার ডাক্তার বাবু আসুক। জীবন বুঝি আজই শেষ! সে বুঝি আর বাঁচবে না! বিয়ের আগেই মারা যাবে! তখন কী তার ডাক্তার বাবু তাকে ভূলে যাবে! অন্য কাউকে বিয়ে করে নেবে! ভাবনার মধ্যেই তার মাথায় স্বোজরে এক আঘাত এসে পরে। রুহি অনুনয় করে বলে উঠে,

“আজকের জন্য ছেড়ে দিন না আমায়। আজ আমাদের বিয়ে। অন্তত বিয়েটা করতে দিন। আমি উনার জন্য সেজেছি। লাল শাড়ি পরে উনি এখনও আমাকে দেখেননি। উনাকে আসতে দিন। উনি বলেছে আমাকে দেখবে। উনার এখনও মুসলিম হওয়া বাকি। আমি মরে গেলে উনি মুসলিম হতে পারবে না। ছেড়ে দিন না আমায়। দেখুন সব তৈরিই করা। শুধু উনি আসলে বিয়েটা করে নেব। বিয়ের পর না হয় আমাকে মেরে দিয়েন। না হয় পরিবার হাড়া হওয়াটা যে আমাদের স্বার্থক হবে না। উনি ফিরে এসে আমাকে লাল শাড়িতে দেখতে চেয়েছেন, সাদা কাফনে নয়। ছেড়ে দিন না”
রুহির এত এত হৃদয় বিদারক কথা কারো কানে গেলো না। ওদের মধ্য থেকে একজন জোরে খেঁকিয়ে উঠলো “বিয়া করবার চাও? তোমার ভাতার আমাগো সব শেষ কইরা দিছে আর তুমি এহানে বিয়ার পিরিতে বসবার চাইতাছো? মাইয়া হুদা তোর লাইগ্যা আমাগো এত পেরেশাণি হওয়া লাগতেছে। এই তোরা দাঁড়ায় আছোছ ক্যান? মার নটিরে”
সবাই একসাথে ঝাপিয়ে পরে তার উপর। রুহি আর বাঁচাতে পারে না নিজেকে। বড় বড় লাঠির একের পর এক বারিতে তার ছোট্ট দেহ ক্ষত বিক্ষত হয়ে গেছে বহু আগেই। যখন অনুভব করলো তার পেট ফেরে একটা ছুরি এফোড় ওফোড় হয়ে গেল। সে বাঁচার আসা ছেড়ে দিল। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগে শেষবারের মত বিরবির করলো “অভি আপনি কোথায়-!”

অভি বিদ্ধস্ত শরীর নিয়ে হাঁটতে গিয়েও পরে যায় রাস্তায়। বুকের হাড়গোড় চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে রুহির চিন্তায়। গায়ে বিন্দু পরিমাণ জোর নেই। তবুও উঠে দাঁড়ায়। তখনই পেছন থেকে আবারও মাথায় এক বারি এসে পরতেই হাঁটু ভেঙে বসে পরে। কিছুক্ষনের আগের অতর্কিত আক্রমনে কূল না পেয়ে, কাজী আনতে যাওয়ার সময়ই বিদ্ধস্ত হয়। সে মারা গেছে ভেবে রাস্তাতেই তাকে ফেলে চলে যায় আক্রমণকারীরা। ওরা চলে যেতেই অভি ধীরে ধীরে উঠে বাড়ির দিকে আসার চেষ্টা করে। কিন্ত মাঝপথে আবারও আক্রমণের শিকার হয়। এবার আর উঠে দাঁড়ানোর মত বল পায় না শরীরে। বিদ্ধস্ত পরাজিত সৈনিকের ন্যায় ধীরে ধীরে শরীরটা পরে যায় মাটিতে। ধপ করে শব্দ তুলে হাড়িয়ে যায় পৃথিবীর বুক থেকে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাত নেমে এসেছে ধরনিতে। ঝিরিঝির বৃষ্টিতে চারপাশ আবছা হয়ে আছে। অভি ধীরে ধীরে চোখ খোলার চেষ্টা করে। প্রাণ পাখি এখনও উঁড়ে যায়নি। আর দুই মিনিট গেলেই ছোট্ট কুঠিরটার দেখা মিলবে। প্রান পাখি এখনও উঁড়াল না দিলেও, দিতে বেশি দেঁড়ি নেই। মাথা ফেটে রক্ত গড়িয়ে বৃষ্টির জলে ভেসে যাচ্ছে। অধিক রক্তখরনের ফলে শরীরে বিন্দুমাত্র শক্তির দেখা নেই। জায়গায় জায়গায় হাত পা ভেঙে গেছে। সেটা উঠতে গিয়েই টের পেলো অভি। তবুও যে তাকে উঠতে হবে। ঐ ছোট্ট মুখটা হয়তো এখনও তার অপেক্ষায় বউ সেজে বসে আছে! তার জন্য হলেও তো পৌছতে হবে। ওখানে পৌছে একবার মেয়েটাকে তার বউ রূপে দেখে, এরপর মরে গেলেও আক্ষেপ থাকতো না। বৃষ্টির ঝাটকায় উঠতেও কষ্ট হচ্ছে। তবুও মাটিতে ভর করে উঠে দাঁড়ায়। ধীর পায়ে হেঁটে পৌঁছায় বাড়ির চৌকাঠে। এরমধ্যে দু বার পরেও গেছে রাস্তায়। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটেছে শরীর থেকে। দরজাটা হাঁট করে খোলা দেখে বুকের ভেতর মোচর দিয়ে উঠে। চটজলদি প্রবেশ করে ঘরের ভেতর। মাথা দুলে উঠে তার। হাঁটু ভেঙে বসে পরে রক্তাক্ত রুহির সামনে। হাত পা বাধা অবস্থায় নিথর হয়ে পরে আছে ছোট্ট শরীরটা। অভি দূর্বল হাতে রুহির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নেয়। গায়ে যতটুকু শক্তি আছে তা দিয়েই নরম হাতটা শক্ত করে ধরে ললাটে ছুঁইয়ে কান্নায় ভেঙে পরে।
“আমি পরলাম না কথা রাখতে রুহি। পারলাম না। নিজের সাথে তোমার সাজানো জীবনটাও ধ্বংস করে ফেললাম। আমার পাপের জন্য তোমার একটা সংসার হলো না রুহি। ক্ষমা করে দিও আমায়”

শরীর ভেঙে আসছে অভির। নিঃশ্বাস নিতে হিমশিম খাচ্ছে। হঠাত করে গা গুলিয়ে বমি করে দেয়। শরীর অবশ প্রায়। হাত পা ব্যথায় ম্যাজ ম্যাজ করছে। নাহ! আর সম্ভব না। সে গাঁ ছেড়ে শুয়ে পরে রুহির পাশে। হাত বারিয়ে রুহির নিথর হাতটা ছুঁয়ে দেখতে চায়। কিন্ত পারে না। সেভাবেই শুয়ে পরে রুহির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে,
“তোমার আল্লাহর কী লিলা! নিলো তো দুজনকে একসাথেই। সে জন্য শুক্রিয়া। কিন্ত আমাদের আর সংসার হলো না! তোমার শখগুলোও আর পূর্ণ হলো না। তবে আমরা সব অপূর্ণতার ভীরে একমাত্র পূর্ণতার ভাগিদার। জিতে গেছে আমাদের ভালোবাসা। পরজনমে এবার ঘর সাজানো বাকি”

এরপর আর কথা বলার সুযোগ হয়নি অভির। দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে দুটো আত্মা বিদায় নেয়। যাদের প্রতিশ্রুতি ছিলো একসাথে থাকার, তারা আজ একসাথেই আছে। তবে কেউ আর কারো সাথে কথা বলতে পারেনি। চোখ খুলে আর দেখা হয়নি একে অপরকে। আজও দুজন একে অপরকে বলতে পারেনি ‘আমি তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসি’। না বলার পরেও অজস্র বার বলা হয়ে গেছে আজ এই বৃষ্টির রাতে। বাহিরে বৃষ্টির বেগ বারছে। একের পর এক বিদ্যুত স্পৃষ্টের আলোয় ঘর আলোকিত হয়ে আবার আধারে তলিয়ে যাচ্ছে। একসাথে থাকার আশায় পালিয়ে আসা দম্পতিরা আজ সবার অগোচরে নিথর হয়ে পরে আছে। বাড়ির মানুষগুলোকে জানানোও হয়নি তারা কোথায়। দেশের শেষমাথায় হয়তো তাদের খুঁজতে কেউ আসবেও না। সবাই তো ভাববে দুজন ভালো আছে। কেউ হয়তো কল্পনাতেও আনবে না সুখের খোঁজে আসা দুটো পাখি আর নেই। চিরতরে হাড়িয়ে গেছে পৃথিবীর বুক থেকে দুটো নাম, অভি-রুহি!

সারাদিন নেশা করে শেষ রাতে বাড়ি ফেরে আরিয়ান। আশ্চর্যের বিষয়, সে সারাদিনেও মাধবীকে খোঁজেনি।চেষ্টাও করেনি। তবে ঘরে ঢুকতেই এক অজানা শূণ্যতা আকরে ধরে হৃদয়। ঘর জুরে খাঁ খা করছে এক বেঈমান নারীর শূণ্যতা। ঘরের প্রতিটা কোণে জমে আছে মেয়েটার স্মৃতি। এখানে ওখানে ওর অসংখ্য জিনিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আলমারি ভর্তি নতুন আনা শাড়ি গুলো ছুঁয়ে আরিয়ান বলে উঠে “কার জন্য আনলাম এগলো? এত আয়োজন কার জন্য? এক বেঈমানের জন্য? আহ আরিয়ান, জীবনে সবচেয়ে বড় ধোঁকা টা খেলি তার কাছ থেকে যাকে নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসতি”
কথা শেষে সবগুলো শাড়ি আলমারি থেকে ছুরে ফেলে দেয় নিচে। এক সেকেন্ডে আগুন ধরিয়ে দেয় সবগুলো শাড়িতে।
“যে নারীর আমার জীবনে স্থান নেই সেই নারীর কিচ্ছু থাকবে না আমার ঘরে”

তুই আমার ৭ মিনিট পর্ব ৪০ (২)

বলে একে একে সেই আগুনের উপর মাধবীর ব্যবহৃত সবগুলো জিনিস ফেলে দেয়। পাশ থেকে একটা চেয়ার টান দিয়ে পায়ের উপর পা তুলে বসে পরে সেই অগ্নিকাণ্ডের সামনে। পুরো ঘর ধোঁয়ায় ঢাকা পরে গেছে। সেই ধোঁয়ার দিকে একবার তাকিয়ে একটা চুরুট ধরায়। ধোঁয়ার উপরেই ধোঁয়ার কুন্ডুলি ছেড়ে দেয়।পৈশাচিক হাসি খেলে যায় পুরু ঠোঁট জুরে। প্রিয়তমার ব্যবহৃত জিনিস দ্বারা দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুনের দিকে চেয়ে বিরবির করে উঠে,
“যাকে নিজের পুরোটা কোমল সত্বা দিয়ে আগলে রাখতে চাইলাম, সে নিজের সম্পূর্ণ কঠোর সত্বা দেখিয়ে পালিয়ে গেল। তার জেদের কাছে আমার তাহাজ্জুদের দোয়াকেও হার মানতে হলো”

তুই আমার ৭ মিনিট শেষ পর্ব