Home হৃৎস্পন্দন হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫
সাঞ্জেনা শাজ

রাস্তার পাশ ঘেঁষে হাটছে শান্তা। পিছনে দু’একটা বখাটে তার পিছু পিছু আসছে। সময়টা তপ্ত দুপুর। মানুষাদি কমিই রাস্তায়। ভার্সিটি থেকে বাড়ি ফিরছে। ইচ্ছে করেই রিক্সা নেয়নি আজ সে। এখন যে এ বিপদে পরতে হবে জিন্দেগীতে ভাবেনি সে।
একবার পিছু পিছু তাকাচ্ছে আরেক সামনে। সামনে একটা ক্লাব ঘর। বর্তমান মেয়রের চেলা পেলাদের হবে। চট করে মাথায় বুদ্ধি এলো শান্তার। আবার দুশ্চিন্তাও বারি খেল। সেখানে যারা থাকবে তারা যদি ভালো না হয়। তখন?
আল্লাহর নাম জপতে জপতে শান্তা ক্লাব ঘরের সামনে যাবে এর আগেই একটি গাড়ি এসে থামলো গেটের সামনে। রায়হান নামলো গাড়ি থেকে। ক্লাবের ছেলেদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং আছে তার।
গাড়ি থেকে নেমে শান্তা নামক স্বল্প পরিচিত মেয়েটাকে কাচুমাচু করে ভয়ে ভয়ে সামনে এগুতে দেখে ভ্রু কুচকালো রায়হান। তারপরেই পিছনে চোখ গেল। দুটো ছেলে হিহি হাহা করে আসছে আর এটা সেটা বলছে। তাকে এখনো খেয়াল করেনি ছেলেগুলো।

চোয়াল শক্ত হলো রায়হানের। এমনিতে সে খুব ঠান্ডা মস্তিষ্কের মানুষ। চিল্লায় কম, বুঝে বেশি ; রাগ কম। কিন্তু নিজের এলাকায় আবার নিজের আত্নীয়র সাথে এরকমটা মোটেই পছন্দ হলো না তার। এই নিন্দিত, গর্হিত কাজ তার রাগ উঠিয়ে দিল।
শান্তার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে শার্টের হাতা ফোল্ড করলো। সামনা-সামনি হলো শান্তার। মেয়েটার সাথে কখনো তেমন কথা হয়নি। মুখ চেনাচিনি আত্নীয় এতটুকুই জানা, ব্যাস!
“এই ছেলেগুলো কি আপনার পিছু পিছু আসছে? বিরক্ত করেছে? ”
শান্তা যেন হাফ ছেড়ে বাচলো। যাক! তাকে চিনেছে তাহলে। সে তো চেবেছিল তাকে চিনবেই না বুঝি। সে উপর নিচ মাথা নেড়ে হ্যা জানালো।
রায়হান ক্লাব থেকে ছেলেদের ডাক দিল। ছেলেগুলো রায়হানকে দেখে পালাতে চাইলো। তার আগেই রায়হান ছেলে গুলোকে ধরিয়ে ফেললো তার ছেলেদের দিয়ে। ছেলেটাকে তাদের হাতে দিয়ে সে শান্তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“একা একা যাচ্ছেন, আবার গাড়িও নেননি। অসুবিধে হতে পাড়েতো এরকম হলে! ”
“বুঝতে পাড়িনি এরকম হবে। আপনাকে ধন্যবাদ উপকারের জন্য। আর দুঃখীতও ঝামেলায় ফেলার জন্য। ”
“ঝামেলা কিসের! আজব! আমার এলাকার জনগনের সুবিধা অসুবিধে দেখার দায়িত্ব তো আমারিই। আপনার কি একটু লেট হলে অসুবিধে হবে? ”
ডানে বামে মাথা নাড়াল শান্তা। তার লজ্জা লাগছে রায়হানের সাথে কথা বলতে। কেমন আপনি আপনি করে বলছে। শুভ্রতার বড়ো বোন হিসেবে ওনার বড় বোন ধরেই কি আপনি আপনি করছে? আরও সংকুচিত হলো শান্তা। বাড়ির সকলেরই প্রায় জানা শুভ্রতা আর রায়হানের কথা।
“আপনি তাহলে একটু ওয়েট করুন গাড়িতে। আমার পাচঁ দশ মিনিট সময় লাগবে বেশি হলে, আপনায় বাড়ি পৌছে দিবো। এখন এই মাঝ রাস্তায় মাঝ দুপুরে আরও আগেই গাড়ি পাবেন না মনে হয়। ”
হাত দ্বারা না করতে চাইলো শান্তা কিন্তু তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই গাড়ির দরজা খুলে ভিতরে বসতে ইশারা করলো রায়হান। বেচারি শান্তা আর কি করবে! লজ্জা, সংকোচে কুন্ঠিত হয়েই গাড়িতে গিয়ে বসলো।
“কোন সমস্যা হলে জানাবেন দয়া করে, আসছি আমি। ” বলেই ক্লাবের ভিতরে চলে গেল রায়হান। রেখে গেল কুন্ঠিত এক রমনীকে নিজের বদ্ধ গাড়িতে। যার বুক ডিপডিপ করছে অজানা কারনে।

সময়টা তখন সন্ধ্যার পর। তালুকদার বাড়ির বাচ্চা কাচ্চা গুলো ড্রয়িং রুমে কিচির মিচির করছে বসে বসে। বাড়ির তিন গিন্নি রান্নাঘরে নাস্তার আয়োজন করছে সাথে আছে বাড়ির বিশ্বাস্ত কাজের লোক স্বপ্না। বেশ কয়েকবছর হবে এ বাড়িতে আছে সে। আস্তে আস্তেই বিশ্বস্ত হয়ে উঠেছে। যদিও কথায় টেবলেট বেচুনী ; এমনিতে মেয়ে ভালো।
এদিকে ড্রয়িং রুমে শান্তা, সোহানা, শুভ্রতা আর শাফি চার জনেই উপস্থিত। শান্তা রাস্তায় ঘটে যাওয়া ঘটনা বলছে দুজনকে। শাফি ব্যাস্ত মোবাইলে গেম খেলতে। তবে কানটা ঠিকি সজাগ রেখেছে বোনদের কথাতে। বড় ভাইকে বলতে হবেনা??

“রায়হান খান তো সেই সেই আপা। তুকে হিরোদের মতো সেভ করলো ঠিক নাড়ে শুভ্রতা? ” শুভ্রতার দিকে তাকিয়ে হেসে জিজ্ঞেস করলো সোহানা।
পাশে থাকা শান্তা সোহানার মাথায় গাট্টা মেরে বললো, “আক্কেল কেজি ধরে বিক্রি করে দিয়ে এসেছিস? ছোট বোনের হবু জামাই আমায় হিরোদের মতো সেভ করেছে? আর জিজ্ঞেসও করছিস কাকে! বেচারার হবু বউকে! জ্ঞান কবে হবে তোর? ”
“বিয়ে দিয়ে দেখতে পারো যদি একটু বারে আরকি হিহি।”

বত্রিশ পাটি দাত বের করে বললো সোহানা। এদিকে চুপটি শুভ্রতা। দীর্ঘশ্বাস ফেলছে ক্ষনে ক্ষনে।
ছেলে হিসেবে রায়হান ভাই যথেষ্ট ভালো। এটা সত্য এবং সে মানেও। কিন্তু তার কাছে এ লোকটাকে জম দূত মনে হয়। তার সবকিছু এলোমেলো করে দেওয়ার কারিগর। তার ভালোবাসার জীবনে প্রলয়ঙ্কারী ঝর। যা তার জীবনকে লন্ডবন্ড করে দিবে এক সময়। আর সে ঝরে যদি তার ধরে রাখার মানুষটা না থাকে সে ঝরে যাবে। মুছড়ে যাবে। কিন্তু সে জানে, তাকে দু হাতে আগলে রাখবে তার মেহরাদ ভাই ; সকল ঝর তুফান থেকে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।
“কিরে শুভ্রতা কিছু বলছিস না যে?মনে কুড়া পরেছে? মন বেজার কেন?” সোহানা জিজ্ঞেস করলো।
“নাহ ঠিক আছে। কোন সমস্যা না, এমনিই একটু চুপ ছিলাম। ” একটু হেসে বললো শুভ্রতা।
“আরেহ বল..বল তোর হবু স্বামীকে নিয়ে এসব বলাতে তোর ভালো লাগছেনা। বলে ফেল..”
শুভ্রতা কিছু বললো না। তার ভাসা ভাসা চোখ গুলো দিয়ে তাকিয়ে রইলো সোহানার দিকে। চোখের পলক পরছেনা। তার চোখ দুটোও যেন চিৎকার করে বলতে চাচ্ছে –আমি বিবাহিত, আমার স্বামী আছে। কেন অন্য একজন পর পুরুষকে আমার হবু স্বামী হবু স্বামী করছো? কেননন??

সোহানা, শান্তা দু’জনেই শুভ্রতার গভীর চোখ দুটো দেখলো। দেখেই আন্দাজ করতে পাড়লো মেয়েটার মনটা বোধহয় ভালো নেই আজকে। এই যে মেয়েটা চুপটি করে আছে কিন্তু চোখ গুলো যেন কতো কিছু বলতে চাচ্ছে! মেয়েটা সময়ে অসময়ে সকলের সাথে পানির মতো মিশলেও হটাৎ হটাৎই এই পানিকে বরফ করে জমে বসে থাকে, মুখে কুলুপ এঁটে। তখন এই চোখ জোড়া কথা বলে।
হটাৎ করেই তিন বোনের গম’গমা’গম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মোবাইল রেখে সোজা হয়ে বসলো শাফি। জোহরি চোখে পরখ করলো তিন জনকেই।
“এই সব এমন ভাব নিয়ে বসে আছো কেন? কিছু লুকাচ্ছো নাকি? আগে বাগে বলে ফেলো আমি ভাই আসলে জানিয়ে দিব। ” শাফি বললো।
সোহানা বিরক্ত হলো। সোফা থেকে কুশন ছুড়ে মারলো শাফির দিকে। চিড়বিড়িয়ে বলে উঠলো,,
“ভাইয়ার চামচা একটা! যাহ এখান থেকে। একটু চুপও থাকতে পাড়বোনা? ”
“তোমরা চুপ থাকলে কাকের কা কা করবে কে তালুকদার বাড়িতে? পাড়তো শুধু এটাই। ”
“তুকে তো…”

শাফিকে দৌড় চালাবে এর আগেই সেখানে উপস্থিত হলো সুরাইয়া বেগম। হাতে নাস্তার ডিশ। এগিয়ে এসে টেবিলে নাস্তা রাখতে রাখতে বললো,,
“কি হচ্ছে কি শুনি? এখনো ছোট আছিস সোহানা? ছোট ভাইয়ের সাথে এতো বড় মেয়ে, এখনো এরকম করে কেউ??”
“মা এই বেয়াদবটাকে নিয়ে যাও এখান থেকে, বিরক্ত করছে এটা। ”
“ইশশশ! আমাদের ছোট তালুকদারকে কে এভাবে বলার সাহস পাচ্ছে শুনি? কার এতোবর সাহস শাফি তালুকদারকে বেয়াদব বলে? ” কথাটা বলতে বলতে এগিয়ে এলেন রিমা বেগম। তার মুখে হাসি নিয়েই তিনি শাফির কাছে এগিয়ে গেলেন। মাথার ঝাকড়া চুল গুলো এলোমেলো করে দিলেন।
শুভ্রতা এক পলক তার মা আর শাফির দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলো। মুখে ব্যাথাতুর হাসি ফুটে উঠলো ক্ষনিকের। নিমেষেই তা আবার মুছে গেল। দু’পাশে হালকা মৃদু মাথা ঝাকিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে নাস্তার প্লেটে মনযোগ দিলো। বাকি সবাইওও তাই।
এভাবেই আস্তে আস্তে সন্ধ্যার সময়টা কাটিয়ে দিল খুনসুটির মাধ্যমে।

আফিসের ঝামেলা মিটিয়ে রাত প্রায় দশটা নাগাত বাড়ি ফিরলো মেহরাদ। চোখে মুখে খানিকটা ক্লান্তির রেশ। আজ সারাদিনেও বাড়ি ফিরতে পারেনি। তবুও একটা ইম্পোর্টেন্ট মিটিং পেন্ডিং আছে আগামীকালের জন্য।
রুমে ঢুকে ব্যাগ রেখে, টাই, ঘড়ি খুলে, শার্ট খুলে একেবারে শাওয়ার নিয়ে বের হলো মেহরাদ। পড়নে এডিডাস ট্রাউজার আর টি-শার্ট। চুল গুলো মুছে দেয়ালে টানানো ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো প্রায় এগারোটা বেজে গিয়েছে।
অফিসেই ডিনার সেড়ে নিয়েছে সে। কিছু পেন্ডিং কাজ শেষ করার জন্য আবারও লেপটপ টা নিয়ে সোফায় বসলো। বসতেই সামনের ছোট্ট টি -টেবিলের উপর দেখলো এক খানা কাগজ। মৃদু হেসে ভাজ করা কাজটা খুলে ফেললো।
বাড়ির ছোট তালুকদারের কাজ এটা। তারিই দেওয়া দায়িত্ব। যেদিন সে আসতে দেরি করবে সেদিন কাগজের পাতায় লিখে রেখে যাবে, যদি কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানানোর থাকে। বেচারার তো এ বয়সে মোবাইল নেই! মাঝে মধ্যে মা বোনের মোবাইলে সুযোগ পেলেই গেমস খেলে। সেই মোবাইলে তো আর গোপনীয় মিশন কমপ্লিট করা যায়না, তাই না! তাই এ পদ্ধতি।

কাগজে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা অনেক কিছুই দেখলো সে। কিছু জানা, যেগুলো সে অফিস থেকেই খবর পেয়েছে। আর কিছু অজানা। কপালদ্বয়ে ভাজ পড়লো মেহরাদের। আবারও বসা থেকে উঠে দাড়ালো লেপটপ টা অফ করে। বেড়িয়ে গেল রুম ছেড়ে।
কদম ফেলে এগিয়ে গেল কড়িডরের শেষ রুমটার দিকে। পুরো বাড়ি অন্ধকারে তলিয়ে তখন, শুধু ড্রয়িং রুমের ডিম লাইট নিয়ন আলো দিচ্ছে। তার রুম কড়িডরের এক মাথায় তো শুভ্রতার রুম আরেক মাথায়। দুই প্রান্তে যেটাকে বলে আরকি!
মেয়েটা রাতে খাবার না খেয়েই ঘুমিয়ে গেছে! কেন? একেতো এমনিই হাড্ডির হাড্ডি! তারউপর খাওয়া দাওয়ায় করে দুনিয়ার অনিয়ম। দু দিন পর কংকাল হওয়া থেকে ওকে কেউ আটকাতে পাড়বেনা! এটা দু কলমে লিখে দিতে পাড়বে মেহরাদ।
সে এমনিতেই যেতো ওর কাছে এক নজর দেখতে, ঘুমনোর আগে। মেয়েটাকে দেখা ছাড়া তার চোখে ঘুম ধরা দিতে চায়না। বহুদিন যাবৎই এই এক অভ্যাস বাজে অভ্যাসে ধারন করেছে তার। তবে এই বাজে অভ্যাসে তার ভালোবাসা প্রতিয়মান। এই বাজে অভ্যাসেকেও সে ভালোবাসে। এক কথায় তার শুভ্রা কে নিয়ে সবিই সে ভালোবাসে।

শুভ্রতার রুমের দরজা ভেজানোই ছিল। তাই অনায়াসেই রুমে ঢুকে গেল মেহরাদ। মাঝেমধ্যে ছাড়া প্রায়ই খোলা থাকে। আর যেদিন না থাকে সেদিন মাথার চান্দি গরম হয়ে যায় তার। সেদিন সে আর তার শুভ্রাকে দেখে ঘুমাতে যেতে পাড়েনা। অবশ্য ঘুমানোর কথা বলে লাভ নেই ; সেদিন তার ঘুমিই হয়না।
দরজা খোলার শব্দে উঠে বসলো শুভ্রতা। তার ঘুম আসছিলো না। শুধুই ম’রার মতো পরে এদিক সেদিক গড়াগড়ি খাচ্ছিলো। যেদিন তার মনে শান্তি থাকেনা। সেদিন ঘুম বাবাজিরাও ধরা দেয়না তার কাছে। সব কটা শত্রু তার। সব!
অন্ধকারে লম্বা কায়া দেখে কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত হলেও একটু পরেই ধরতে পাড়লো এটা যে তার মেহরাদ ভাই। ততক্ষণে রুমের লাইট জ্বালিয়ে দিয়েছে মেহরাদ। এতোক্ষণ অন্ধকারে থাকায় হটাৎ আলো জ্বলায় চোখ জোড়া খিচে বন্ধ করে নিল শুভ্রতা। কিছুটা বিরক্ত স্বরে ঠোঁট ফুরে বেড়িতে এলো,
“উমমম,লাইট জ্বালালেন কেন মেহরাদ ভাই? আর এতো রাতে এ রুমে কি? কেউ দেখলে কি ভাববে বলুন তো! ”
“যা ভাবার ভাবুক, হু ক্যায়ারস! আগে তুই বল খাবার খাসনি কেন?কি হয়েছে তোর? ” এগিয়ে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলো মেহরাদ।

“বলে দিয়েছে বিচ্ছুটা? আসতে আসতেই বলে দিয়েছে? কই এটা, ঘুমোয়নি এখনো? “সামনে থেকে হাত নামিয়ে আবারও রুর স্বরে বলে উঠলো শুভ্রতা।
মেহরাদ টেবিলের সাথে চেয়ার টেনে বিছানার সামনে বসলো শুভ্রতার। শুভ্রতার এক বাহু টেনে তার সামনা-সামনি করে জিজ্ঞেস করলো,
” কি হয়েছে? মন খারাপ ছিলো কেন সন্ধ্যায়? হু! ” শুভ্রতার সকল রুরতা উপেক্ষা করে শান্ত স্বরে আবেগ মিশিয়ে শুধালো মেহরাদ।
সন্ধ্যার মন খারাপ যেনো আবারও হানা দিল, মনসাপটে। মেহরাদের হাত থেকে বাহু ছাড়িয়ে নিয়ে দুই হাটু বুকে চেপে, হাটুতে থুতনি ঠেকিয়ে চুপটি করে গেলো শুভ্রতা। ভাসা ভাসা চোখ গুলো অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছে। তাতে বেদনার ছাপ।

এযাত্রায় মেহরাদ নিশ্চিত হলো, শুভ্রতা কঠিন রকমের মন খারাপে ভুগছে। সেই সাথে মস্তিষ্ক তৎক্ষনাৎ হিসেব কষে ফেললো, আর কিছুদিন পরেই বাড়িতে শুকের ছায়া পড়বে। যেটা গত আট বছর যাবৎ তাদের মনে বিষাদ ঢেলে যায় নির্দিষ্ট সময়ে, সময়ে।
চেয়ার ছেড়ে এগিয়ে গিয়ে শুভ্রতার বাহু টেনে পুরুষ্টু বোকে টেনে নিল মেহরাদ। বক্ষপিঞ্জিরায় বন্দী করলো মেয়েটাকে। সবসময় মাথায় হাত রাখা মানুষটার বুকটা পেয়ে ঢুকরে উঠলো শুভ্রতা। কোন শব্দনা, আক্ষেপ না, আহাজারি না ;শুধু চোখের জলে ভিজিয়ে দিচ্ছে বক্ষপিঞ্জরে আটকে রাখা মানুষটার বক্ষপট।
আরও শক্ত করে চেপে ধরলো নিজের সাথে শুভ্রতাকে মেহরাদ। যেনো, আলিঙ্গনেই বুঝিয়ে দিচ্ছে –আমি আছিতো। কান্না করছিস কেন! তোর কোন দোষ ছিলনা। আমার শুভ্রা শুভ্র ফোলের মতোই নিষ্পাপ। সেই সাথে ঠোঁট জোড়া চেপে ধরলো কম্পমান ছোট্ট দেহের রমনীর মাথায়। আদূরে সুরে আওড়াল সান্ত্বনার বানী।

সময় ব্যায়ে শান্ত করলো মেয়েটাকে মেহরাদ। বুক থেকে মাথা তুলে, সারা মুখের চোখের জল মুছে দিয়ে রক্তিম মুখশ্রীতে চুমু আকল একে একে। প্রথমে, কপালে,সরু নাকে,রক্তাভা লাল গালে, অশ্রুজলে ভরা চোখ জোড়ায়, কম্পমান ছোট্ট থুতনিটাতে দব শেষে তিরতির করে কাপতে থাকা ঠোঁট জোড়ায় উষ্ণ পরশ করলো।
“জন্ম মৃত্যু আমাদের কারো হাতেই থাকেনা শুভ্রা, আমরা মানুষ তো শুধু উছিলা মাত্র। সেদিন তোর কোন ভুল, দোষ কিছুই ছিলনা। আমরা সবাই জানি। ছোট চাচিয়ো জানে। দেখবি একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। সব। ”

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪

আদুরে সুরে শুভ্রাকে বুঝিয়ে বললো মেহরাদ। তারপর বিছানা থেকে উঠে শুভ্রাকেও পাজোকুলে তুলতে তুলতে বললো –“হয়েছে অনেক মন খারাপ। এবার কিছু খাবি তারপর তোর সাথে বাকি বোঝাপড়া। চল। ”
পাজোকুলে করেই শুভ্রাকে নিয়ে হালকা নিয়ন আলোয় আন্দাজে পা ফেলে নিচে নিয়ে গেল মেহরাদ। শুভ্রা নিশ্চুপে মাথা এলিয়ে রেখেছে মেহরাদের কাধে, দু হাত মেহরাদের গলায় পেচানো।

হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬