মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ৩
jannatul firdaus mithila
ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে মাহি। দু’হাতে ধরে রাখা গোলাকার কাপড়ের গাঁটটা দেখে যাচ্ছে অনিমেষ চোখে। আরেকটু পরেই সবটা শেষ হয়ে যাবে, মাহির চোখদুটো বন্ধ হবে চিরদিনের জন্য। মাহি ধীরে ধীরে কাপড়ের গোলাকার গাঁটে মাথা ঢোকাচ্ছে ঠিক তখনি কর্ণকুহরে ভেসে এলো কারো নির্লিপ্ত কণ্ঠ!
“ কাপড়টা আরেকটু উঁচু করে বাঁধ, আর গলায় আরো দুটো গিট দে নাহলে ঝোলার সময় পড়ে যাবি। মানুষ ছোট হলেও তোর ওজন কিন্তু কম না!”
হতবাক মাহি তক্ষুনি ঘাড় বাকিয়ে তাকায় দরজার দিকে।যেথায় ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে বেল্ট পড়া প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে মুগ্ধ। গাঁ-টা কেমন উদোম হয়ে আছে তার। ফলে পেটানো দেহখানা পুরোপুরি উম্মুক্ত। চোখেমুখে তার নেই বিন্দুমাত্র উদ্বেগ, সে উল্টো মেয়েটাকে কেমন তাড়া দেখিয়ে বলল,
“ কিরে? ঝুলতে গিয়েও থেমে গেলি কেনো? যা… তারাতাড়ি গলায় ফা/**সঁ দে! তুই আজকে ম*রলে কালকেই তোর বাপকে গিয়ে টু*ক*রো টু*ক*রো করে আসব। নে এবার তারাতাড়ি মর! আমার লিভিং রুমের ফিশগুলো ক্ষুধায় চুকচুক করছে।”
গাঁটে গলা ঢুকিয়ে রাখা মাহি হতবিহব্বলতায় আর নড়তে অব্ধি পারলোনা। এই লোক কী মানুষ? এর মাঝে কী মনুষ্যত্বের এক দানা ছিটেফোঁটাও নেই? কেউ এভাবে ম*রতে চাওয়া মানুষকে এনকারেজ করে? তারওপর কিসব ভয়ংকর কথাবার্তা বলছে, তার মাছগুলো না-কি ক্ষুধায় চুকচুক করছে! ভাবা যায়? ঠিক কতটা ভয়ংকর হলে একটা মানুষ এহেন ভয়াবহ কথা এতটা শান্তভাবে বলতে পারে! মাহি ভয়ার্ত ঢোক গিলল কেমন। ফোপাঁতে ফোপাঁতে নিচু স্বরে বোকার মতো জিগ্যেস করল,
“ আপনার ফিশ গুলো ক্ষুধায় চুকচুক করছে কেন?”
গম্ভীর পুরুষ কুটিল হাসল। মাহির পানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কায়েম রেখে পা বাড়ালো সম্মুখে। একটু একটু করে এগিয়ে আসতে আসতে অত্যন্ত ভয়ানক শান্ত কন্ঠে শুধালো,
“ তোকে খাবে বলে!”
নিশ্বাস ফেলতে ভুলে গেল মাহি! দমটা বুঝি ফা*সঁ না দিতেই আঁটকে গেল গলার কাছে। চোখদুটো যেন ছিটকে বেরিয়ে আসবে কোটর ছেড়ে। সম্পূর্ণ বদনখানি কাঁপছে তার। হতবিহ্বল মেয়েটা গলায় ফা*সঁ দেয়ার ব্যাপারটা বুঝি একমুহূর্তের জন্য বেমালুম ভুলে গেল! তার মাথায় এবার চলছে অন্য কথা। মৃ*ত্যুর পর তার দেহটা কি-না ঐ মাছগুলো খেয়ে ফেলবে? তাহলে তার পরিবার তাকে শেষ দেখা টুকু দেখবে কিভাবে? মাহি নিজ ভাবনায় নিমগ্ন। এদিকে মুগ্ধ যে ইতোমধ্যেই তার অতি নিকটে এসে দাঁড়িয়েছে, তা হয়ত বিন্দুমাত্র টের পায়নি মাহি। টের পেলে হয়তো এক্ষুণি ঝুলে পড়তো মেয়েটা! মাহি ডুবে আছে ঘোরে। হঠাৎ টের পেলো — তার পাতলা কোমরখানায় কারো শক্তপোক্ত হাতের পরশ। মাহির ঘোর ভাঙলো তক্ষুনি। দুচোখ সম্মুখে তাকাতেই স্থির হয়ে গেল কেমন। গম্ভীর মুখো ভয়ংকর পুরুষ তার অতি নিকটে, তার সুদর্শন দাড়িবিহীন লম্বাটে মুখখানা মাহির একদম মুখোমুখি। দেখো কান্ড! মাহি এতো উঁচুতে দাঁড়িয়ে থেকেও কি-না এ লোকের উচ্চতার সমান হতে পারলোনা! এটা লোক না-কি উট? মাহি তৎক্ষনাৎ গাঁট বাঁধা গলায় ঝুলে পরতে চাইলেই মুগ্ধ মেয়েটার কোমর শক্ত করে চেপে ধরে, উঁচিয়ে তুললো বেশ। মাহি এবার ঝুলছে ঠিকই তবে ফাঁ*স দিয়ে নয় বরং মুগ্ধ নামক বলিষ্ঠ পুরুষের শক্ত হাতের বাঁধনে। মাহি কেমন মোচড়াচ্ছে এপর্যায়ে। দু’হাতে মুগ্ধের বুক বরাবর ঠেলতে ঠেলতে বলছে,
“ ছাড়ুন আমায়, নিচে নাম বলছি।”
মুগ্ধ প্রতিত্তোর করেনি। একহাতে মাহিকে তুলে রেখে আরেকহাতে চট করে মেয়েটার গলা থেকে গাঁটটা খুলে দিল আলগোছে। পরমুহূর্তে কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাহিকে বিছানায় ছুঁড়ে ফেলল সবেগে। ভয়াতুর মাহি ত্বরিত উঠে বসতে চাইলেই বাঁধ সাধলো মুগ্ধ। তক্ষুনি নিজের পাদু’টো দিয়ে আটকালো মাহির ছুটন্ত পা জোড়া, একহাতে মেয়েটার হাতদুটো মাথার ওপর উঠিয়ে এনে বিছানার সঙ্গে চেপে ধরল শক্ত করে, আরেকহাতে শক্ত থাবা বসালো মেয়েটার চোয়াল বরাবর। মাহি এবার নিরুপায়। হাত-পা, মুখ সবটা বাঁধা পরেছে লোকটার হাতে। মেয়েটা কেবল গোঙাচ্ছে! হাত-পায়ের ব্যাথার চাইতে চোয়ালের ব্যাথা যেন বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণ। মেয়েটার নরম-সরম চোয়ালের ওপর পাঁচ আঙুল চেপে ধরেছে মুগ্ধ। চোখেমুখে সে-কি রাগ! মনে হচ্ছে এই বুঝি মাহিকে কাঁচা খেয়ে ফেলবে। ছেলেটার বাদামী চোখদুটো যেন এক্ষুণি ঝলসে দিবে মাহিকে। মাহির চোয়ালে থাকা হাতটা আরেকটু চেপে ধরে, মুগ্ধ কেমন কটমট করতে করতে বলে ওঠে,
“ এতো তারাতাড়ি ম*রে গেলে কিভাবে হবে বান্দীর মেয়ে? তোর গায়ে এখনো ট্যাগ বসেছে আমার নামের? বসেনি তো! আগে তোকে নিজের র*ক্ষি*তা বানাই, তোর ওপর করা অত্যাচারগুলো তোর বাপকে দেখাই, তারপর না তোকে মরতে দিব।”
একমুহূর্ত থামে মুগ্ধ। কাঁদতে থাকা মাহির পানে তাকিয়ে থেকে কেমন বিদ্রুপাত্মক হাসল। দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে ফের শুধালো,
“ কান খুলে শুনে রাখ জা*নো*য়া*রের বাচ্চা! তোকে এখানে আদর করে লু লু লু করার জন্য আনিনি, এনেছি তোর ওপর টর্চার করতে। তোর বাপকে জীবন্ত রেখেও রোজ একটু একটু করে মা*র*তে। তুই আমার পাতা দাবার চালের একমাত্র মুখ্য গুটি, যে নড়লেও আমার আদেশে নড়বে, সরলেও আমার আদেশে সরবে! তোর বাপকে না মেরে তোকে এতো তারাতাড়ি মরতে দিচ্ছিনা জা*নো*য়ারের বাচ্চা! আগে তোর বাপকে মা*রব, তারপর পুরো এহসান পরিবারকে,তারপর তোকে! তোকে সবার শেষে একটু একটু করে মা*র*ব। তাও মা*র*বই! গেট দেট ওয়ার্ডস ইন ইউর হেড।”
কথা শেষ করেই মুগ্ধ নামক ভয়ংকর পুরুষ নিজের চিরায়ত পৈ*/শা-চিক রুপে ফিরল। মেয়েটার চোয়াল ছেড়ে দিয়ে, রয়েসয়ে সরে গেল তার ওপর থেকে। অতঃপর একমুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে বিছানায় পড়ে থাকা মাহির পানে তাকিয়ে থেকে হুট করেই শুরু করল নিজের পাগলামি! শক্ত হাতে তক্ষুনি খামচে ধরল মাহির উম্মুক্ত উরু, ধারালো নখগুলো তার দেবে গেল মেয়েটার নরম চামড়ায়। এদিকে পায়ের এহেন অসহ্য ব্যাথায় ককিয়ে ওঠে মাহি। গলা ফাটিয়ে আর্তনাদ করে ওঠে কেমন। দু’হাতে মুগ্ধের হাত সরাতে চাইলেই খারাপ পুরুষ সপাটে থাপ্পড় বসাল মেয়েটার গালে। সঙ্গে সঙ্গে দাঁতের সাথে ঠোঁট লেগে গিয়ে ঠোঁটের চামড়া ফেটে গেল মাহির। এদিকে মুগ্ধ থামছেনা। তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত শান্তি, মেয়েটার কান্নাগুলো যেন বেশ স্বস্তি দিচ্ছে তাকে। সে নিজের আরেকথাবা বসায় মাহির গলার কাছে। সেখানেও নখ দাবিয়ে গর্জে ওঠে বলল,
“ চিৎকার কর! গলা ফাটিয়ে চিৎকার কর, ডাক তোর বাপকে! ডাক জা*নো*য়ারের বাচ্চা!”
ক্রন্দনরত মাহি ঠিকই কাঁদছে গলা ফাটিয়ে। বারবার অনুনয় করে বলছে,
“ প্লিজ আমায় ছেড়ে দিন। ব্যাথায় কলিজা ফেটে যাচ্ছে আমার, আমি সত্যি মরে যাচ্ছি ব্যাথায়, প্লিজ আপনার হাতটা সরান।”
মেয়েটার কলারবোনের কাছে এখনো নখ দাবিয়ে রেখেছে মুগ্ধ। যেখান থেকে গড়িয়ে পড়ছে লহু। অথচ মুগ্ধের মায়া হলোনা একটুও, সে উল্টো ক্রুর হেসে আওড়াল,
“ আমায় ছেড়েছিল তোর বাপ? ছেড়েছিল আমার মা’কে? তাহলে আমি কেনো ছাড়ব তোকে? কেনো ছাড়ব তোর মতো জা*নো*য়া*রের মেয়েকে?”
মাহি প্রতিত্তোর করতে পারলোনা তেমন। কাঁদছে কেমন পড়ে থেকে। সে-ই কান্না পৌঁছাচ্ছে না মুগ্ধের কান অব্ধি, সে কেবল দেখছে মাহির ঠোঁট ভাঙা আর্তনাদ। ঠিক এভাবেই, হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক এভাবেই কাঁদত বাচ্চাটা। তবুও জালিমগুলো ওকে মারত। খুউব মা*রত! কেন মারত? কি দোষ ছিল বাচ্চাটার? কেন মারত কোমরের বেল্ট দিয়ে? বেল্টের কথা মনে পরতেই মুগ্ধ তৎক্ষনাৎ ছেড়ে দিল মাহিকে। উদোম গায়ে তার ইতোমধ্যেই লেপ্টে গিয়েছে ঘামের চিহ্ন। সে আবারও হালকা ঝুঁকে এসে মাহির চুলগুলো মুঠোয় চেপে ধরে, মাহিকে উঠিয়ে আনলো বিছানা থেকে। ব্যাথায় কুপোকাত মাহি পায়ের আর গলার ব্যথায় দাঁড়াতেও পারছেনা ঠিকঠাক মতো। তবুও তার চুল ধরে টানছে মুগ্ধ। টানতে টানতে আচমকাই মেয়েটাকে ছুঁড়ে ফেলল মার্বেলের তকতকে মেঝেতে। তারপর নিজের কোমর থেকে থেকে বেল্টটা খুলে আনল একটানে। মেঝেতে পড়ে আছে মাহি, কাঁদছে মুখ লুকিয়ে। এদিকে মুগ্ধ নিজের হাতে ধীরে ধীরে বেল্টের একাংশ পেঁচাচ্ছে। মাহি তখন রয়েসয়ে চোখ তুলে তাকায় মুগ্ধের দিকে। মুগ্ধ যেইনা বেল্টটা উঁচিয়ে ওর গায়ে এক-ঘা বসাতে যাবে ওমনি মাহি চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে,
“ মাআআআ! মা…মা গো আমি মরে যাচ্ছি মা! আমি..মরে যাচ্ছি। আল্লাহ! বাঁচাও মাবুদ।”
থমকায় মুগ্ধ! হাতটা তার থেমে গেল হুট করে। মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিল একমুহূর্তের জন্য। এতক্ষন রেবেলের চোখে জ্বলতে থাকা আগুনটা কেমন নিভে গেল ধপ করে। শক্ত মুখাবয়বে পরিবর্তন ঘটল সামান্য। তাও হয়ত অল্প কিছুক্ষণের জন্য! মুগ্ধ কিয়তক্ষন চুপ করে তাকিয়ে রইল মেঝেতে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে থাকা মাহির পানে। মেয়েটার সারা গা কাঁপছে ক্ষনে ক্ষনে। টকটকে ফর্সা গায়ে লাল রঙা পাতলা গাউনটা যেন বেশ ফুটেছে! গাউনের একপাশ দিয়ে এখনো বেরিয়ে আছে মেয়েটার ডান পায়ের উরু। সেথায় ক্ষত জমেছে গাঢ়, মুগ্ধের ধারালো নখের আঁচড় যা থেকে চুইয়ে পরছে লহু। মাথার সুন্দর সিল্কি চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে আছে। মুগ্ধ খানিক নিশ্বাস ফেলল বোধহয়। উপরিভাগের দাঁতকপাটির সাহায্যে নিচের ঠোঁটের একটুখানি অংশ কামড়ে ধরে, আলতো করে ভ্রু চুলকায় সামান্য। পরক্ষণে কিছু একটা ভেবে গম্ভীর মুখেই ডানহাতের মুঠোয় বেঁধে রাখা বেল্টটা ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে, অতপর পা বাড়াল বিছানার দিকে। একহাতে বিছানা থেকে ব্ল্যাঙ্কেটটা নিয়ে এসে, ছুঁড়ে ফেলল মাহির দিকে। গমগমে গলায় আদেশ ছুড়ল,
“ গা ঢাক!”
কথাটা কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই হকচকিয়ে তাকায় মাহি। একমুহূর্ত কান্না ভুলে গিয়ে হা করে তাকিয়ে রয় কেমন। তা দেখে ভীষন বিরক্ত মুগ্ধ! দু’হাত কোমরে চেপে তক্ষুনি দাঁত খিঁচে মাহিকে দিল এক ধমক,
“ নোংরা মেয়েদের মতো প্রথম রাতেই বালছাল পড়ে সিডিউস করার স্বভাব পেয়েছিস কোত্থেকে? সবাইকে কী নিজের বাপের মতো মনে করিস না-কি? নোংরা মেয়েছেলে কোথাকার! এক্ষুনি শরীর ঢাক নয়তো গায়ে আগুন ধরিয়ে দিব তোর!”
হতভম্ব মাহি প্রতিক্রিয়া দেখাতে ভুলে গেল যেন। সে-তো ইচ্ছে করে এ কাপড় পরেনি, না তো এর আগে কোনদিন পরেছে। সে-তো মেইডেন ইরা না-কি পরিয়ে দিয়েছে তাকে! মাহি যখন নিজ ভাবনায় নিমগ্ন ঠিক তখনি মুগ্ধ কেমন একহাতে নিজের ঘাড় ডলতে ডলতে হিসহিসিয়ে বলল,
“ আর এক সেকেন্ডের মধ্যে গা না ঢাকলে, আই সয়্যার আমি তোকে বেসমেন্টের সুইমিংপুলে ছুঁড়ে ফেলে আসব!”
ভড়কায় মাহি। ভাবনার ঘোর ভাঙলো অচিরেই। হকচকিয়ে তাকাতেই গায়ের ওপর ব্ল্যাঙ্কেট পেয়ে তক্ষুনি ব্যগ্র হাতে সারা গা ঢাকতে ব্যস্ত হলো মেয়েটা। সুন্দর করে নিজের সর্বাঙ্গে চেপে নিলো ব্ল্যাঙ্কেটটা। মাথা নুইয়ে আরেকবার ফোপাঁতেই শোনা গেল মুগ্ধের হুংকার!
“ মুখ ঢাকবে কে? তোর বাপে এসে?”
ফোপাঁতে থাকা মাহি এবারেও বেকুবের ন্যায় চোখ তুললো ওপরে। মুখ ঢাকবে বলতে? এদিকে তাকে ওমন তাকিয়ে থাকতে দেখে মেজাজ চটলো মুগ্ধের। ছেলেটা কেমন ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে এসে, কোনরূপ বলাকওয়া ছাড়া আচমকা চড় বসাল মেয়েটার গালে। যদিওবা এবারের চড়ে আগেরবারের মতো ওতো ঝাঁঝ নেই, তবুও এই সামান্য চড়ের তাল সামলাতে না পেরে গাল বেঁকে গেল মাহির। মেয়েটা ঠোঁট কামড়ে ফের ফোপাঁতে লাগল কেমন। মুগ্ধ তখন একহাঁটু গেঁড়ে বসলো মাহির সামনে। তৎক্ষনাৎ শক্ত চোয়ালে ব্ল্যাঙ্কেট উঠিয়ে মাহির মাথা অব্ধি ঢেকে দিল আলগোছে। পরক্ষণে কেমন কাঠকাঠ কন্ঠে বলল,
“ আমি না বলা অব্ধি ভুলেও মাথা থেকে ব্ল্যাঙ্কেট নামলে, মাথাটা কিন্তু চোখের পলকে শরীর থেকে আলাদা হয়ে যাবে,রিমেম্বার!”
এহেন ধমকিতে গা কেঁপে ওঠে মাহির। মেয়েটা আর সাহসও করেনি মাথা থেকে ব্ল্যাঙ্কেট নামানোর। মুগ্ধ এবার চুপচাপ উঠে দাঁড়ায়। খানিকটা হেঁটে গিয়ে গা এলিয়ে বসলো ডিভানে। দু’হাত দুদিকে ছড়িয়ে গর্জন তুলে ডাকলো,
“ থমাস!”
একটা ডাক! শুধুমাত্র একটা ডাক পেয়েই তড়িঘড়ি করে কক্ষের সামান্য ভিরিয়ে রাখা বিশালাকার দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকলেন থমাস। বরাবরের ন্যায় মাথা নুইয়ে, হালকা কুর্নিশ জানিয়ে। কক্ষের মেঝেতে গোটা একটা মানুষ যে ওভাবে ব্ল্যাঙ্কেট পেচিয়ে বসে আছে সেদিকে একবারও দৃষ্টি ফেলেনি থমাস।বড্ড বাফাদার কি-না! দরজার কাছে ঠায় দাঁড়িয়ে মহাশয় বেশ নম্র স্বরে বললেন,
“ ইয়েস মনস্টার!”
মুগ্ধ তাকায়নি তার দিকে। গুরুগম্ভীর কন্ঠে আদেশ ছুড়েঁ,
“ গেট মা’ই ফুড!”
থমাস ওপর নিচ মাথা নাড়িয়ে তক্ষুনি চলে গেলেন। ফিটে এলেন প্রায় মিনিট পাঁচেক পর। হাতে ঠেলে ঠেলে আনছেন সার্ভিং রেক। যেথায় সাজানো হরেকরকম খাবারের বাহার। থমাস সার্ভিং রেকটা ডিভানের সামনে অব্ধি আনতেই মুগ্ধ হাত উঁচিয়ে থামতে বলল তাকে। পরক্ষণেই দু-আঙুলের ইশারায় বোঝালো চলে যেতে। থমাস তাই করল। আবারও কুর্নিশ জানিয়ে চলে গেল কক্ষ থেকে। এরইমধ্যে আরেকজন কমব্যাট চলে এলো মুগ্ধের পোষা পেটকে নিয়ে। মুগ্ধ আড়দৃষ্টিতে দেখল তাকে। এবারেও নিঃশব্দে কমব্যাটকে বোঝায় চলে যেতে, তবে কমব্যাট মুগ্ধের পোষা পেটকে রেখে গেল কক্ষেই। যা ধীরে ধীরে লেজ নাড়িয়ে নাড়িয়ে এসে থামলো ডিভানের সামনে, মুগ্ধের পায়ের কাছে। মুগ্ধ হাত উঁচিয়ে একটুখানি বুলিয়ে পোষা প্রাণীর মাথায়। প্রাণীটা কেমন মাথা দোলাচ্ছে আনন্দে। মুগ্ধ নিজের একহাত প্রাণীটার মাথার ওপর ধরে রেখেই শক্ত গলায় মাহিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“ এদিকে আয়!”
মাহি দেখছেনা কিছু! মাথার ওপর ওতো মোটা একখানা ব্ল্যাঙ্কেট, এর ফাঁক গলিয়ে থোড়াই কিছু দেখা যাচ্ছে! মেয়েটা কেমন অসহায় কন্ঠে মিনমিনিয়ে বলল,
“ কোথায়?”
“ তোর যমের বাড়ি!”
এহেন প্রতিত্তোরে মৌন রইল মাহি। কিয়তক্ষন বাদে ফের শুনল মুগ্ধের কিড়মিড় কন্ঠ,
“ মাথা থেকে ব্ল্যাঙ্কেট সরা!”
এতক্ষণে বোধহয় খানিকটা স্বস্তি পেল মাহি। তৎক্ষনাৎ মাথার ওপর থেকে ব্ল্যাঙ্কেটটা সরাতেই যেইনা সম্মুখে চোখ পরলো ওমনি মেয়েটা কেমন আতঙ্কে চিৎকার দিয়ে উঠল!
“ আল্লাহ গো…বা-ব-বাঘ!”
ভয়ার্ত মাহি তক্ষুনি দিনদুনিয়া ভুলে ছুটে গেল দরজার কাছে। কাঠের মোটা কারুকাজের দরজার গায়ে ইচ্ছেমত হাত চাপড়ে কাঁদতে কাঁদতে ওপাশের মানুষজনদের উদ্দেশ্যে বলল,
“ প্লিজ দরজা খুলুন। এখানে.. এখানে ব-ব-বাঘ আছে, আ-ম-ম-আমায় খেয়ে ফেলবে এটা। প্লিজ কেউ আছেন?”
কে শুনবে মাহির আর্তনাদ? দরজা যে এবার পুরোপুরি বন্ধ! এতক্ষণ যারা শুনেও শুনলোনা তার চিৎকার গুলো, এখন তারা থোড়াই শুনবে! এদিকে মাহির ওমন চেঁচামেচিতে বিরক্ত মুগ্ধ। পায়ের কাছে বসে থাকা বাঘের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে স্রেফ বলল,
“ প্রাডা!”
মালিকের কণ্ঠধ্বনি কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে গর্জন তুললো প্রাডা। পুরো কক্ষে ছড়িয়ে গেল তার গর্জনধ্বনি। সে ধ্বনিতে কলিজা কেঁপে ওঠে মাহির। মেয়েটা এবার হাউমাউ জুড়ে কেঁদে উঠে কেমন! কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি তুলে বিরবির করে,
“ আম্মু! বাঘ!”
মুগ্ধ বাঁকা হাসল মনে হচ্ছে! নিচের ঠোঁটটা হালকা বেঁকে গেল বা-দিকে। সে তৎক্ষনাৎ গলা উঁচিয়ে মাহিকে বলে,
“ কাছে আয়!”
ত্বরিত দু’ধারে মাথা নাড়ায় মাহি। ভয়ে আঁটসাঁট হয়ে গেল কেমন। বাঘের সামনে ডাকছে এই লোক! তাকে না আবার বাঘের পেটে চালান করে দেয়। এদিকে মাহির ওমন অবাধ্যতায় মুখাবয়ব শক্ত হয়ে গেল মুগ্ধের। সে কেমন আগুন চোখে তাকাল মেয়েটার দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে ভয়ংকর গর্জন তুলে আওড়াল,
“ ভুলেও আমার কথার অবাধ্য হতে যাস না মেয়ে, নাহলে অকালে প্রাণটা হারাবি।”
মাহি পড়ল এবার বিরাট দোটানায়। এমুহূর্তে তার সামনে কেবল একটা নয় বরং দুটো বাঘ। দু’টোই সমান হিংস্র! মাহি আর ভেবে কূল কিনারা পেল না তেমন। তাইতো মনের মধ্যে একরাশ ভয় নিয়েও সে কেমন চোখদুটো কুঁচকে কাঁপা কাঁপা বদনে হেঁটে চলে এলো মুগ্ধের সামনে। খানিকটা দুরত্বে এসে দাঁড়াতেই মুগ্ধ ক্রুর হেসে বলে ওঠে,
“ নিল ডাউন!”
মাহি তা-ই করল। চুপচাপ মেঝেতে বসল হাঁটু মুড়ে। মুগ্ধ তখন কোনরূপ কথাবার্তা ছাড়াই, মেঝেতে বিছিয়ে রাখা মাহির হাতটার ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে বেশ সজোরে। মাহি ব্যাথাতুর শব্দ তুললেও চোখ খুলেনি একবারও। খুললেই তো অক্ষিপটের সামনে দেখবে দুটো হিংস্র প্রাণীর মুখ! মুগ্ধ এবার প্রাডার ঘাড়ে হাত রেখে বলল,
“ গো এন্ড সিট বিসাইড হার!”
এবার যেন সত্যি সত্যি দেহ খাঁচা থেকে প্রাণটা উড়ে যাবে মাহির। বাঘটা কী তবে তার পাশে এসে বসবে? একদম পাশে? মাহির ভাবনার মাঝেই সে টের পেলো মাংসাশী প্রাণীটার মখমলে পশমের পরশ! মেয়েটা তৎক্ষনাৎ ঘনঘন নিশ্বাস ফেলল। কাঁদতে কাঁদতে অনুনয় করে বলল,
“ ওকে আমার পাশ থেকে সরান, আমার খুউব ভয় করছে। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে!”
সার্ভিং রেক থেকেই ফর্কের আগায় খাবার তুলেছে মুগ্ধ! ওসব খাবার বাড়াবাড়ির ঝামেলায় নেই সে! কোনরকম মুখে তুলতে পারলেই বোধহয় হলো! মাহির এহেন কথায় সে হাতের ডগায় ফর্কটা নাড়াতে নাড়াতে বলল,
“ মেয়ে মানুষের জান আর কই মাছের প্রাণ — দুটোই এক! বড্ড শক্ত! খুব তারাতাড়ি মরেনা তারা। তুইও মরবিনা!”
এহেন সঙ্গীন মুহূর্তে এরূপ গা-জ্বালানো কথা বোধহয় এ লোকের মুখ দিয়েই বেরুনো সম্ভব। এদিকে মাহি সত্যি মুখ হা করে নিশ্বাস নিচ্ছে। অধিক ভয়ে তার সাফোকেশন শুরু হয়, এখনো হয়তো শুরু হয়ে গেল তা। ওদিকে মুগ্ধ ততক্ষণে নিজের পায়ের জোর বাড়ালো। মাহির হাতটা বুঝি থেঁতলেই ছাড়বে অসভ্য ছেলে। মাহির চিৎকারের বেগ সামান্য বাড়লেও মুগ্ধ বড্ড নাখোশ হলো এটুকুতে। সে কেমন গমগমে গলায় আদেশ ছুড়ল,
“ আ’ম হাঙ্গরি! যতক্ষণ না আমার খাওয়া শেষ হবে ঠিক ততক্ষণ তোরা দু’জন চিৎকার করে যাবি। যদি ভুলেও আমার খাওয়ার মাঝপথে তোদের দু’জনার মধ্য থেকে কারো চিৎকার থেমে যায় তাহলে কিন্তু তার শেষ নিশ্বাসটা আমার হাতেই ত্যাগ হবে! সো ভুলেও আমার খাওয়ার মাঝপথে চিৎকার থামাবিনা। আমি আবার কারো ভয়ার্ত চিৎকার না শুনলে খেতে পারিনা!”
ভয়ার্ত মাহি ঢোক গিলল সামান্য! এ লোক তো কোনো সাধারণ মানুষ নয়, এ-তো একজন সাইকো! আ ব্লা*ডি সাইকো মনস্টার। যে না-কি অন্যের ভয়ার্ত আর্তনাদ না শুনলে খেতে পারেনা! কি আশ্চর্য! কি আশ্চর্য! মুগ্ধ এবার মুখগহ্বরের একটু টুকরো খাবার ঢোকালো ঠিক তখনি সম্মুখের হিংস্র বাঘ তার হিংস্র গর্জনধ্বনিতে গর্জে উঠল। সে গর্জন কানে যেতেই রুহ সহ কেঁপে ওঠে মাহির। মেয়েটাও ভয়ে একইভাবে চিৎকার করতে লাগলো। এদিকে তাদের ওমন চিৎকার শুনে খাবার মুখে নিয়ে আয়েশ করে চিবুচ্ছে মুগ্ধ। মাথাটা হালকা দুলাতে লাগল পরম আনন্দে। এ যেন মৃ*ত্যুপুরীর এক ভয়ানক রাক্ষস, যে অন্যের চিৎকার, কান্নায় আনন্দ পাচ্ছে, হাসছে, খাচ্ছে!
মির্জা সায়ান মুগ্ধ পর্ব ২
প্যারাডাইসের বা-দিকের বাগান হয়ে মাউন্টেনের আঁকাবাকা পথ দিয়ে নেমে আসছে সিদ্ধার্থ। একটুখানি সামনে এগুতেই বাঘের বিকট গর্জনধ্বনি শুনতেই থেমে গেল তার পদযুগল। মাথা উঁচিয়ে তাকালো ওপরের অট্টালিকার দিকে। বুঝে গেল — মনস্টারের কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে! আজও কী তার প্রাডা হাঙ্গরি তার মতোই? আজও কী তবে মনস্টার নিজের খাওয়া শেষ করে তার আদুরে প্রাডাকে ট্রিট দেবে রমণীদের গরম মা*ংস? কাল তবে নতুন করে আরেকটা ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখবে সে! সিদ্ধার্থ মাথা নুয়ায়। পায়ের গতি আবারও চলমান করে বিরবিরিয়ে বলে,
“ ব্লা*ডি মনস্টার — অধীর রায়!”
