Home প্রেমসন্ধিক্ষন প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৮

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৮

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৮
সাইদা মুন

রিতু দাঁড়িয়ে আছে ফারাহর সামনে। ফারাহ রাগে ফুঁসছে। চোখ দুটো যেন আগুনের মতো জ্বলছে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—আমি ওই মেয়েটাকে জাস্ট সহ্য করতে পারি না।
রিতু শান্ত স্বরে প্রশ্ন করল,
—কিন্তু কেন?
রিতুর প্রশ্নে ফারাহর রাগের তীব্রতা খানিকটা কমলেও মুখের রাগী ভাঁজগুলো আরও স্পষ্ট হলো। কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলল,

—কেন মানে? তুই কি কিছুই জানিস না?
রিতু ধীরে ধীরে তার পাশে বসে পড়ল। কণ্ঠে অদ্ভুত স্বাভাবিকতা রেখে বলল,
—মেহরীন তোর ভালোবাসা কেড়ে নিয়েছে, তাই?
ফারাহ সঙ্গে সঙ্গে জোরে মাথা নাড়ল। রিতু থামল না, আবার বলল,
—তোর প্রিয় মানুষের স্ত্রী হয়ে গেছে বলে সহ্য হচ্ছে না?
এবার ফারাহ আরও দ্রুত মাথা নাড়ল। চোখের কোণ ভিজে উঠল, কয়েকফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। নাক টেনে ভাঙা গলায় বলল,
—ওই মেয়েটার জন্য আমি সব হারিয়েছি, সব। ও আমার জীবন শেষ করে দিয়েছে, আমার ভাইয়ের জীবনটাও নষ্ট করেছে।
রিতু চোখ সরু করে তাকাল। কণ্ঠে কঠোরতা মিশে গেল। বিরক্ত কন্ঠে বলল,

—এত বড় হয়েও এমন ইমম্যাচিউর কথাবার্তা বলছিস কেন? আর ইউ স্টুপিড? কেউ কারো জীবন শেষ করে দিতে পারে না। মানুষের জীবনে ধাক্কা আসবেই, তাই বলে জীবন শেষ হয়ে যায় না।
রিতুর কথা যেন ফারাহর ভালো লাগল না। তার মনে হলো রিতু যেন উল্টো ওই মেয়ের পক্ষ নিচ্ছে। তীক্ষ্ণ স্বরে প্রশ্ন করল,
—তোর কি মনে হচ্ছে না, তুই ওই মেয়ের হয়ে কথা বলছিস?
রিতু বিরক্তিতে ‘চ’ শব্দটা উচ্চারণ করল। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ফারাহর হাতটা ধরল,
—আমি কারো পক্ষ নিচ্ছি না। আমি শুধু একটা সাধারণ সত্য তোকে বোঝাতে চাইছি। মেয়েটাকে তুই দোষী বানাচ্ছিস, আসলে কিন্তু সে দোষী না..
কথা শেষ হতেই ফারাহ বিস্ময়ে চোখ বড় করে তাকাল। নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল। আশ্চর্য কন্ঠে বলল,

—মেহরীন তোর শত্রু না?
হঠাৎ এহেন কথায় রিতু ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
—ও আমার শত্রু হবে কেন?
—তুই তো ওকে সহ্যই করতে পারিস না!
—হ্যাঁ, পারি না। তাই বলে শত্রু হয়ে গেল?
রিতুর এমন উত্তর ফারাহকে আরও হতবাক করে দিল। সে কখনো রিতুর কাছ থেকে এমন সুর আশা করেনি। কৌতূহল চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,
—হঠাৎ করে তুই মেয়েটার ব্যাপারে এত পজিটিভ কথা বলছিস যে, কারণ কি?
রিতু ধীরে ধীরে একটা গরম নিঃশ্বাস ফেলল,
—কারণ, নেগেটিভ ভাবার মতো কিছুই খুঁজে পাইনি।
ফারাহ করুন চোখে বলল,
—তুই তো ওকে একদম সহ্য করতে পারতিস না রিতু..
রিতু সোজাসাপটা উত্তর দিল,
—অকারণে..
ফারাহ বেশ চমকাল,
—অকারণে মানে?

—অকারণই। আমি ভেবে দেখেছি, মেয়েটার জীবনেও একটা সুযোগ দরকার। একটু ভালো থাকা ওরও প্রাপ্য। ছোটবেলা থেকেই লড়াই করে এসেছে সে। এবার একটু সুখ পেলে মন্দ কি?
রিতুকে মেহরীনের হয়ে কথা বলতে দেখে ফারাহর যেন আর সহ্য হলো না। সে যেন আরও উত্তেজিত হয়ে উঠল। রাগে গর্জে উঠল, গলা উঁচু করে বলল,
—রিতু.. তুই এভাবে ওর পক্ষ নিতে পারিস না। সবাই কেন ওর দিকে চলে যাচ্ছে? তুইও কি ভুলে গেছিস, তুই ওকে কতটা ঘৃণা করতিস? বুঝতে পারছিস না, ও তোর ভাইয়ের জীবন শেষ করে দেবে। ওই মেয়ে ভালো না।
ফারাহর কথা রিতু চুপচাপ শুনলেও আমলে নিল না। বরং শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

—আমি কারো পক্ষ নিচ্ছি না। আমি শুধু বুঝেছি, মেয়েটাকে আমি যেরকম ভেবেছিলাম বা ভেবে এসেছি, সে আসলে তেমন না। আসার পর থেকে আজ পর্যন্ত সে কখনো আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেনি। এমন কিছু করেনি, যাতে আমার ক্ষতি হতে পারে বা আমার পরিবারের ক্ষতি হতে পারে। সি ইজ হার্মলেস ইয়ার। সবসময় স্বাভাবিকভাবে মিশতে চেয়েছে সকলের সঙ্গে। ভদ্র, মার্জিত আচরণ করেছে। আমি শুরু থেকেই মাথায় মেহরীনকে নিয়ে নেগেটিভ ধারণা তৈরি করেছিলাম, তাই তার সবকিছুই বিরক্তিকর লাগত। কিন্তু এখন এই বিরক্তির কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। অনেক ভেবেছি, ওকে ঘৃণা করার মতো কোনো শক্ত কারণই নেই।
ফারাহ হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। সেই কান্নার শব্দে রিতু থেমে গেল। সে আলতো করে ফারাহর কাঁধে হাত রাখতেই ফারাহ কাঁদতে কাঁদতে বলল,

—তোকেও ও নিজের দিকে টেনে নিয়েছে। ওই মেয়েটা আর তোর ভাই মিলে আমার সব স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে, সব….
রিতু ধীরে ফারাহর গাল দু’হাতের মুঠোয় নিল। কণ্ঠ নরম হয়ে এল,
—ফারাহ তুই একটু নিজের রাগ আর জেদ সরিয়ে বাস্তবতা দেখ। তুই কাকে ভালোবাসিস? তালহা ভাইকে, তাই না? কিন্তু ভাইয়া কি তোকে ভালোবাসে? কখনো বলেছে? কখনো তোকে এমন কোনো স্বপ্ন দেখিয়েছে, যেখানে তোরা একসাথে?
ফারাহ অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল। চোখের জল থামছে না। মাথা নাড়িয়ে ভাঙা গলায় বলল,
—না..
রিতু আরও ধীরে বলল,
—তোদের বিয়ের কথা উঠলে কখনো কি ইশারায়-ইঙ্গিতে হলেও ভাইয়া বুঝিয়েছে সে তোকে বিয়ে করবে? বল ফারাহ..
ফারাহ আস্তে করে মাথা নাড়িয়ে আবারও ‘না’ জানাল। রিতু নরম হাতে তার চোখের জল মুছে দিতে দিতে বলল,

—তাহলে তুই ভাইয়াকে কেন অকারণে দোষ দিচ্ছিস? অনুভূতিটা তো তোর একপাক্ষিক ছিল। আমার ভাইয়ের কি ভালো থাকার অধিকার নেই? ভালোবাসার অধিকার নেই? তুই তাকে ভালোবাসিস মানে ভাইয়াকেও তোকে ভালোবাসতেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আছে? তোর এই দাবি কি আদৌ যুক্তিসঙ্গত?
ফারাহ ঠোঁট কামড়ে আবার মাথা নেড়ে অসম্মতি জানাল। ধীরে ধীরে, কষ্টভেজা গলায় বলল,
—কিন্তু আমার মধ্যে কীসের কমতি আছে বল? কেন আমাকে ভালোবাসল না? মেহরীন তো এসেছে ক’দিন হলো, এতেই তাকে মন দিয়ে বসেছে, আর আমি সেই ছোটবেলা থেকে তার আশেপাশে ঘুরছি, সুযোগ পেলেই তার মন জেতার চেষ্টা করেছি। এত কিছুতে একটুও কি তার মন নরম হলো না? কী এমন পেয়েছে ওই মেহরীনের মধ্যে, যা আমার মধ্যে নেই?
রিতু গভীর স্বরে বলল,

—হালাল সম্পর্ক..
এই কথায় ফারাহর দৃষ্টি যেন অসহায়ত্বে ভরে উঠল। রিতু ধীরে ধীরে আবার বলল,
—বিয়ে এমন এক পবিত্র বন্ধন, যেখানে আল্লাহ নিজেই ভালোবাসা ঢেলে দেন। যাদের মাঝে ভালোবাসা থাকার কথা নয়, হওয়ার কথা নয়, তাদের মাঝেও আল্লাহ ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন। আমার ভাইয়ের ভাগ্যে মেহরীনই ছিল রে..
ফারাহ নিঃশব্দে, করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রিতু ধীরস্থিরভাবে নরম সুরে বলতে লাগল,
—তুই নিজেই একটু রাগ-অভিমান সাইডে সরিয়ে দেখ না, ভাইয়া কি কোনোদিন বিয়ের পক্ষে ছিল? বিয়ের কথা উঠলেই সে এড়িয়ে যেত, এমনকি বিরক্ত হত, যেন সে কোনোদিনই বিয়ে করবে না। আমার কথা কি তুই মানিস?
কথাগুলো ফারাহকে নাড়া দিল। নিজের যন্ত্রণা সরিয়ে রেখে ভাবতে বাধ্য হলো সে। সত্যিই তো, তালহাকে সবসময় বিয়ের বিষয়ে অদ্ভুত অনাগ্রহীই দেখেছে সে। সবাই যেখানে তার বিয়ে নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল, সেখানে তালহা যেন ইচ্ছে করেই দূরে সরে থাকত বিয়ের বিষয় থেকে। অস্বীকার করার কিছু নেই, রিতুর প্রতিটি কথাই সত্য। ফারাহকে খানিকটা শান্ত হতে দেখে রিতু এক দীর্ঘ, ভারী নিঃশ্বাস ফেলল। দৃষ্টি সরিয়ে ধীরে ধীরে বলল,

—বড় আব্বু যাওয়ার পর থেকে বড় আম্মুর এত আহাজারি দেখে ভাইয়া তো ঠিক করেই নিয়েছিল কখনো বিয়ে করবে না। কাছ থেকে আমি দেখেছি ভাইয়াকে, নিজেকে শক্ত দেখানোর চেষ্টা করলেও আড়ালে সে ডুকরে কেঁদে উঠতো। সে ভয় পায়, তার মা যেই কষ্টটা বহন করে চলছে, সেই একই কষ্ট অন্য কেউ পাক তা সে চায় না। সে ভয় পায় যদি বিয়ের পর তার কিছু হয়ে যায়, যার সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে সেই মেয়েটা যদি তার জন্য বাকি জীবন বিসর্জন দিয়ে দেয়। সে চায় না বড় মায়ের কষ্টটা অন্য কেউ ও পাক। এত বিয়ে বিরোধিতার পর ও অবশেষে সে বিয়ে করে একজনকে নিজের মন দিয়েছে, ভালোবেসেছে। সে কি সুন্দর একটা সংসার ডিজার্ভ করে না? তুই কি চাস না সে ভালো থাকুক? তাকে কেউ ভালো রাখুক? বল ফারাহ?
ফারাহ নিরুত্তর। কী বলবে, যেন ভাষাই খুঁজে পাচ্ছে না। নাকি সে ইচ্ছে করেই চুপ করে আছে, নিজেকে নিজেই বোঝতে পারছে না। সে তো চায় তালহা ভালো থাকুক, কিন্তু শুধু তার সঙ্গেই, অন্য কারো সঙ্গে নয়। তার নীরবতা দেখে রিতু হালকা করে হেসে ফেলল। সেই হাসি বলে দিচ্ছে সে ফারাহর নিরবতা পড়ে ফেলেছে।

—দেখলি তো? ভালোবাসায় তুই স্বার্থপর হয়ে গেছিস। শুন ভালোবাসা মানেই পাওয়া নয়। অনেক সময় ভালোবাসার মানে প্রিয় মানুষটাকে ভালো থাকতে দেওয়া। ভাইয়া কোনো ভুল করেনি, সে শুধু নিজের ভালোবাসাটা খুঁজে নিয়েছে, নিজের সুখ পেয়ে গেছে। এটা কোনো অপরাধ নয়।
বাকিটা তুই নিজেই বুঝে নে। আমি আর কিছু বলব না। আশা করি, এতটুকুতেই তুই বুঝে যাবি। আমি চাই না, রাগের মাথায় তুই এমন কিছু করে বসিস, যার জন্য পরে সবার সামনে তোকে মাথা নিচু করতে হবে। অনেক তো তুই আমাকে বোঝাতিস, এবার নিজের জ্ঞানগুলো নিজের জীবনে কাজে লাগা। ভালো-মন্দটা নিজেই বিচার কর, ফারাহ।
কথাগুলো বলে রিতু ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। আর একবারও পেছনে না তাকিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ফারাহকে একা রেখে। নিজের ভেতরের লড়াইয়ের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ করে দিয়ে।
ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল মুহুর্তে। আর সেই নিস্তব্ধতার ভেতর ফারাহ যেন ডুবে গেল নিজের চিন্তার গভীরে। আকাশপাতাল ভাবনা তাকে ঘিরে ধরল। রিতুর প্রতিটি কথা কানে বাজতে লাগল, বারবার, অবিরত। সে ঠিক-ভুলের এক অদৃশ্য দাঁড়িপাল্লায় নিজেকে মাপতে লাগল। সত্যিই কি সে ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে এমন পথে হাঁটছে, যা তাকে প্রিয় মানুষের চোখেই খারাপ করে দেবে?
অসংখ্য প্রশ্নের ভারে মাথা যেন ফেটে যাচ্ছে। দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে ধীরে ধীরে শুয়ে পড়ল সে, কিন্তু মনের ভেতরের ঝড় থামল না একটুও।

রাত বাজে এক’টা।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে শুয়েছে সকলেই। মেহরীন পানি খেতে উঠেছে। তবে ঘরে পানি নেই। তাই বাধ্য হয়ে ঘর থেকে বের হলো। গুটিশুটি পায়ে নিচে নেমে পানি খেয়ে ঘরে ফিরতে নিয়েও থেমে গেল। ছাদের দরজাটা খোলা দেখে কপাল কুঁচকালো। এত রাতে ছাদের দরজা খোলা? এখন তো মনে হয় না কেউ ছাদে যাবে। যদি চোর-টোর আসে। নানান চিন্তা করতে করতে ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। দরজা লাগানোর উদ্দেশ্যে দরজার কাছে আসতেই, কী মনে করে ভেতরে একবার উঁকি দিতেই দেখা মিলল রিতুর। ছাদের রেলিং ঘেঁষে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চুল ছেড়ে রাখার ফলে মৃদু বাতাসে উড়ছে।
এত রাতে রিতুকে একা, তাও আবার চুল ছেড়ে রাখা দেখে মেহরীন কিছুটা চমকালো। সঙ্গে সঙ্গে মনে ভয়ের আবির্ভাব ঘটল। তার দাদি বলত, মাঝরাতে তানারা বেশি চলাচল করে। চুল ছাড়া রূপবতী এমন নারী চোখে পড়লে আকৃষ্ট হয়ে পিছু নেয়। যদি রিতুর সঙ্গেও লেগে যায়! ভাবনাটা মাথায় আসতেই বেশ ভয় পেল। দ্রুত এগিয়ে গেল সে।

—আপু, আপনি এত রাতে এখানে একা?
হঠাৎ কারো কণ্ঠ পেতেই ধ্যান ভাঙল বোধহয় রিতুর। নড়ে-চড়ে উঠে পাশে ফিরে তাকাল। মেহরীনকে দেখতেই আচমকা অমায়িক এক হাসি দিল, যা দেখতে মোটেও প্রস্তুত ছিল না মেহরীন। মেহরীনকে আরও অবাক করে দিয়ে রিতু হাসিমুখেই উত্তর দিল,
—এমনি ভালো লাগছিল না, তাই একটু ছাদে আসলাম। তা তুমি ঘুমাওনি?
মেহরীন মিনমিনিয়ে উত্তর দিল,
—আসলে পানি খেতে উঠেছিলাম। যাওয়ার পথে ছাদের দরজা খোলা দেখে উঁকি দিতেই আপনাকে দেখলাম।
—ওহ আচ্ছা, এসেছো যখন, থাকো একটু।
বলেই রিতু পাশে ইশারা করল। মেহরীন চুপচাপ রিতুর পাশে গিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। ভালোই লাগছে, রাতের আধারে খোলা আকাশের নিচে। চাঁদটা যেন খেলা করছে, একবার মেঘেদের আড়ালে লুকাচ্ছে, আবার যেন বের হয়ে আসছে। মনোযোগ দিয়ে চারপাশ দেখছিল মেহরীন। এর মধ্যেই রিতু বলল,

—মনে হচ্ছে না চাঁদটা দুষ্টুমি করছে?
মেহরীন একপলক চেয়ে বলল,
—হুম, বারবার নিজেকে লুকানোর বৃথা চেষ্টা চালাচ্ছে।
রিতু ফিক করে হেসে বলল,
—এক্স্যাক্টলি। তবে কী লাভ লুকিয়ে? সে উজ্জ্বল নক্ষত্র, লুকালেও তার আলোই তার অবস্থান টের পাইয়ে দিচ্ছে, বোকা চাঁদ।
মেহরীন ঘাড় কাত করে রিতুকে দেখছে। এ রিতু কেমন যেন অচেনা। কথাগুলোতে রাগ-বিরক্তি নেই, কেমন যেন কোমল ঠেকছে। মেহরীনকে নিজের দিকে চেয়ে গভীর চিন্তায় বিভোর হতে দেখে রিতু তার চোখের সামনে তুড়ি বাজাল। মেহরীন হকচকিয়ে উঠতেই রিতু ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—কি ভাবো?
মেহরীন আমতা-আমতা করতে লাগল। মনে মনে যা ভাবছে তা তো ভুলেও বলা যাবে না। এই ভেবে প্রসঙ্গ বদলাতে বলল,

—না, মানে আপনি চুল ছেড়ে রেখেছেন কেন?
রিতু শান্ত স্বরে বলল,
—হালকা বাতাসে চুল খুলে রাখতে ভালোই লাগছে তাই। কেন, খারাপ লাগছে বুঝি আমায়?
মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
—না না। তবে রাত করে চুল ছেড়ে রাখা ভালো নয়। এতে তানারা আকৃষ্ট হয়।
মেহরীনের ভীতু ভীতু কণ্ঠে এমন কথা শুনে রিতুর যেন হাসি পেল। শব্দ করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বলল,
—তানারা কারা?
রিতুর প্রশ্নে আরও চিন্তিত ও ভীতু দেখাল মেহরীনকে। আশেপাশে তাকাতে তাকাতে বলল,
—ওই যে ওরা যারা মানুষ না।
রিতু ভেবে বলল,

—ও, জিনের কথা বলছ?
সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে উঠল মেহরীন। রিতুকে দ্রুত থামিয়ে বলল,
—রাত করে তাদের নাম মুখে নিবেন না। ওরা রেগে যাবে।
রিতু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—তাদের নাম মুখে নিলে রাগও করে?
মেহরীন অভিজ্ঞদের মতো মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
—হুমম।
প্রতিউত্তরে রিতু প্রশ্ন করল,
—এ কথা তুমি জানলে কীভাবে?
—আমার দাদি বলত।
—তাই বুঝি? তা তোমার দাদি আর কী কী বলত? আমাকেও একটু জানাও।
মেহরীন পিটপিট চোখে চেয়ে প্রশ্ন করল,
—আপনি শুনবেন?
রিতু মাথা দুলিয়ে বলল,
—আলবাত শুনব।

মেহরীন যেন খুশি হয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে মাথার ওড়নাটা ঠিক করে মাথায় পেঁচাতে পেঁচাতে বলল,
—আগে আপনি চুল বাঁধেন, তারপর শুরু করছি।
মেহরীনের প্রস্তুতি দেখে রিতুও চুল বেঁধে নিল। মাথায় ওড়না পেঁচাতেই মেহরীন শুরু করল গল্প, তার দাদির বলা নানান আদেশ-উপদেশ বলতে লাগল। আর রিতু চুপচাপ শুনছে, মাঝেমধ্যে হুঁ-হা করছে, কিছু না বুঝলে প্রশ্ন করছে। রিতু আজ প্রথম যেন উপলব্ধি করল মেয়েটা বেশ প্রাণবন্ত। একটু মিশলেই পুরোটা মিশে যায়। এই যে একটু ভালো করে কথা বলাতেই মেয়েটা তার সঙ্গে একদম গল্প জুড়ে দিয়েছে, মন খুলে কথা বলা শুরু করেছে, ভালোই লাগছে তার কাছে। এমন একটু আকটু সময় কাটানোর মানুষ পেলে মন্দ নয়।
এভাবেই চলল তাদের কথাবার্তা প্রায় ঘণ্টাখানেক। যখন দেখল, কথার মাঝে দু-একবার মেহরীন হাই তুলেছে, ঘুম পেয়েছে বুঝে রিতু তাকে রুমে যেতে বলল। মেহরীনও আর বেশিক্ষণ বসল না। পরে আবার কথা হবে বলে, বেশ ফুরফুরে মন নিয়েই নিচে নামল।

করিডোর ধরে এগোতে গিয়েই আচমকা থমকে দাঁড়াল মেহরীন। তালহা তার ঘরের দরজায় হেলান দিয়ে, দু’হাত বুকের কাছে গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঘুমে ভারী হয়ে আসা চোখ দুটো লালচে, ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। কালো টি-শার্ট আর কালো ট্রাউজারে, এলোমেলো চুলে তাকে যেন অদ্ভুত রকম আকর্ষণীয় লাগছে। নিঃশব্দ রাতের মধ্যে আরও বেশি করে চোখে পড়ার মতো।
মেহরীন চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখতে লাগল সেই সুপুরুষটিকে, কোনো কথা নেই মুখে , শুধু নীরব দৃষ্টি। তার এমন থমকে যাওয়া দেখে তালহা ধীরে হাত নামিয়ে পকেটে ঢুকাল। ঘুমজড়ানো কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
—এখনো জেগে আছো কেন?
মেহরীন ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বলল,

—পানি খেতে উঠেছিলাম।
তালহা এবার ভ্রু কুঁচকে সন্দেহভরা চোখে তাকাল,
—পানি খেতে হলে নিচে রান্নাঘর, ছাদে কি?
মেহরীন কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে রিতুর কণ্ঠ ভেসে এল,
—ছাদে আমরা একটু গল্প করছিলাম।
তালহা খানিকটা বিস্মিত হলেও সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠে কড়া সুর এনে বলল,
—রাত কটা বাজে? এখনো ঘুমাসনি?
তালহার ধমক খেতেই রিতু তাড়াতাড়ি নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
—এই তো যাচ্ছি, ঘুমাতে যাচ্ছি।
রিতু চোখের আড়াল হতেই তালহার দৃষ্টি আবার স্থির হলো মেহরীনের ওপর। সেই দৃষ্টিতে ছিল কিছুটা কঠোরতা, কিন্তু মেহরীন? সে ঠোঁট কামড়ে মুঁচকি হাসছে, দু’হাত পেছনে রেখে দাঁড়িয়ে আছে নির্ভার ভঙ্গিতে।
তার সেই হাসি দেখে তালহার কপাল আরও কুঁচকে গেল,

—হাসছ কেন?
মেহরীন কোনো উত্তর দিল না। বরং ধীরে ধীরে এগিয়ে আসতে লাগল তার দিকে। প্রতিটি পদক্ষেপে তালহার চোখে সন্দেহ আরও ঘন হতে লাগল। মেয়েটার এই আচরণ, এই দুষ্টুমি ভরা হাসি, কিছুই যেন বোধগম্য হচ্ছে না তার কাছে। একেবারে সামনে এসে থামল মেহরীন। এতক্ষণ পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল তালহার চোখের দিকে। এবার তালহা সোজা হয়ে দাঁড়াল, কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই মেহরীন এক হাত তুলে তার ঠোঁটে আঙুল ছুঁইয়ে দিল।

—হুশশ্‌…
শব্দটা যেন বাতাস কেটে গেল। তালহা মুহূর্তেই স্তব্ধ। বলা কথা ঠোঁটেই থেমে গেল। বিস্ময়ে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। পরের মুহূর্তেই ঘটল অপ্রত্যাশিত কিছু। মেহরীন হঠাৎ পায়ের আঙুলের ওপর ভর করে নিজেকে একটু উঁচু করল। দু’হাত তুলে আলতো করে জড়িয়ে ধরল তালহার গলা। সেই স্পর্শে তালহা যেন জমে গেল নিমিষেই, নড়াচড়া করার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলল। এমন কিছু হবে আশা করেনি সে।
মেহরীন আরও একটু উঁচু হয়ে মুখটা এগিয়ে আনল তার কাছে। এক হাতে মাথার ঘোমটাটা টেনে তালহার মাথাসহ ঢেকে ফেলল। তারপর হঠাৎ করেই পরপর দু’গালে শব্দ তুলে চুমু খেয়ে কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
—হাসছি কারণ আপনাকে আজ পুরো মাখনের মতো লাগছে।
কথাটা বলেই যেন নিজের সাহসেই নিজেই চমকে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে তাকে ছেড়ে দিয়ে দৌড় লাগাল মেহরীন। ছুটে চলে গেল নিজের ঘরের দিকে। একবারও পেছনে ফিরে তাকাল না। তাকানোর সাহস হলো না আর। যদি তাকাত, হয়তো দেখতে পেত বিস্ময়ে জমে থাকা তালহাকে, যার পক্ষে এই মুহূর্তে কোনো প্রতিক্রিয়াই খুঁজে পাওয়া কঠিন।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৭

ঘরে ঢুকে ধাম করে দরজা বন্ধ করতেই দরজার গায়ে হেলান দিয়ে নিচে বসে পড়ল মেহরীন। সঙ্গে সঙ্গে দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেলল। বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেছে, লজ্জায়, উত্তেজনায়, নিজের অপ্রত্যাশিত আচরণের জন্য। এমন কিছু করবে যে সে নিজেই জানত না।
ওদিকে দরজার শব্দে যেন হুঁশ ফিরল তালহার। হামলাটা আচমকাই হয়েছে, তাই হয়তো বুঝতে সময় লেগেছে। ধীরে ধীরে হাত তুলে গালে স্পর্শ করল, যেখানে এখনও রয়ে গেছে সেই উষ্ণতার ছাপ। আঙুল বুলাতেই ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠল এক চওড়া, বাঁকা হাসি। কানে যেন আবার ভেসে এল মেহরীনের সেই কথাটা। লম্বা একটা শ্বাস নিয়ে আধো-হাসিতে বিড়বিড় করে বলল,
—মাখনটা একটু টেস্ট করেও যেতে পারতে, আপত্তি তো আর করতাম না..
নিজের কথাতেই হালকা হেসে মাথা চুলকালো সে। তারপর ধীর পায়ে নিজের ঘরের ভেতর ঢুকে গেল।

প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৫৯

1 COMMENT

Comments are closed.