Home ফিরে এসো অনুরাগে ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৭

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৭

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৭
নওরিন কবির তিশা

তিমিরাবৃত রজনী বিদায় নিয়ে পূর্বাকাশে কাঁচা সোনাঝরা ‌ রোদ অলস মেঘের কোল ঘেঁষে উঁকি দিতেই, জাফলংয়ের বুক চিরে জেগে ওঠা তালুকদার মঞ্জিলে এক ব্যস্তমধুর প্রভাতের সূচনা হলো। শিউলি তলার সিক্ত ঘাসে ভোরের বৃষ্টিবিন্দুরা মুক্তোর ন্যায় ঝিকমিক করছে, আর কামিনী ফুলের উগ্র সুবাস স্নিগ্ধ পবনে মিশে এক অপার্থিব আবেশ ছড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে আজকের ব্যস্ততার কারণ ভিন্ন বিয়ের কেনাকাটা করতে যাবে আজকে সকলে।আবারও কেনাকাটা! তৃষা সকাল থেকে গোঁ ধরে বসে আছে ও কোনোক্রমেই শপিংয়ে যেতে নারাজ। কেনোনা ওর ভালো করেই জানা একবার গেলে আর্য সমস্ত শপিংমলের সমস্ত কিছু ওর ঘাড়ে চাপিয়ে তবেই শান্ত হবে।আর কিছু বললেই শুরু হবে ধুমকি-ধমকি।
নিস্তব্ধ কক্ষে বসে তৃষা নখ খুঁটছিল, ঠিক তখনই কক্ষের নীরবতা ভেদিয়ে কর্নগোচর হল কারো পদধ্বনি, তৃষা কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাতেই দেখল আর্য আসছে। ও দৃষ্টি সরালো তৎক্ষণাৎ।আর্য ঘরে ঢুকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ঘড়িটা ঠিক করতে করতে আড়চোখে তৃষার মুখটা একবার দেখে নিল। অতঃপর গলাটা সামান্য পরিষ্কার করে গম্ভীর স্বরে বলল,

-‘ তৃষা, ১৫ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে নিচে আসুন। গাড়ি বের করা হয়েছে।
তৃষা নড়ল না। ও জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে রেখেই জেদি কন্ঠে বলল,
-‘ আমি যাব না। আমার শরীরটা আজ ঠিক লাগছে না। আপনারা যান।
আর্য এবার আয়না থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পুরোপুরি তৃষার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। ওর সেই তীক্ষ্ণ চাউনিতে তৃষা কুঁকড়ে গেল কিঞ্চিৎ। আর্য ভালোভাবেই বুঝতে পারছে তৃষা মিথ্যা কথা বলছে তাই একটুও বিচলিত না হয়ে ও পকেটে হাত গুঁজে ধীর পায়ে তৃষার সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
-‘ আমি কি আপনাকে একবারও জিজ্ঞেস করেছি যে আপনি যাবেন কি না? এটা কমান্ড, রিকোয়েস্ট নয়।
তৃষা এবার সোজা হয়ে বসল, শ্বাস নিয়ে সাহসের সঞ্চয় করে বলল,

-‘ দেখুন।
-‘ দেখাদেখির টাইম নাই এখন।
আর্য নির্লিপ্ত কন্ঠে খানিক থমকালো তৃষা। তবে দমলো না,
-‘ আপনার ওই কমান্ড জাহাজে দেখাবেন মিস্টার! এখানে আমি আপনার কর্মচারী নই। তাছাড়া কেনাকাটা আমার পছন্দ তবে দোকানের সমস্ত কালেকশন ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়াটা আমার একদম অসহ্য লাগে। গতবার তো প্রায় অর্ধেক শপিং মল আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছিলেন।
তৃষা একনাগাড়ে কথাগুলো শেষ করার পর আশা করেছিল আর্য হয়তো অন্তত একটা কড়া পালটা জবাব দেবে, কিন্তু আর্যর শান্ত ভঙ্গি ওকে আরও বেশি বিভ্রান্ত করে তুলল। আর্য কবজির ঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় প্রশ্ন করল,

-‘ আপনার লেকচার কি শেষ হয়েছে?
তৃষা জেদ ধরে মুখটা আরও এক ইঞ্চি বাঁকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,
-‘ হুম!
-‘ গুড। তাহলে এবার রেডি হন। ৫ মিনিটের মধ্যে নিচে না নামলে পেনাল্টির জন্য রেডি থাকবেন। সো,চয়েস ইজ ইয়োরস!
বলেই আর্য গটগট করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। তৃষা কয়েক মুহূর্ত মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নিজের শ্রাবনান্দ্রেয়কেও যেন বিশ্বাস করতে পারছে না ও। এতক্ষণ ধরে ও কাকে কি বোঝাচ্ছিল? ও আয়নার দিকে তাকিয়ে বিরক্তিভরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ওড়নাটা কাঁধে টেনে নিতে নিতে মনে মনে বিড়বিড়িয়ে বলল,
-‘ এই লোকটা কি রোবট? নাকি ওনার ইমোশনাল সার্কিটে কোনো প্রবলেম আছে? বোরিং!

শপিংয়ে যাওয়ার নাম শুনেই বাড়ির ছোট-বড় সবার মধ্যে এক অদ্ভুত তড়িৎপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে সকলের যাত্রায় প্রস্তুত, নবীনরা সকলে যাবে তবে প্রবীনদের মধ্য থেকে জাহানারা বেগম গুলশানারা বেগম, শাহানারা বেগম আর সালেহা বেগম।তৃষা খানিক বাদে বের হলো। ওর চোখেমুখে এখনো আর্যর সেই নির্দেশ অমান্য করতে না পারার বিরক্তি স্পষ্ট।ওকে দেখেই টুইংকেল একছুটে এসে ওর ওড়নার আঁচল জড়িয়ে ধরল।
-‘ ও বানি! তুমি তো রেডি হয়ে গেছ!চলো চলো, আজ আমি অনেকগুলো বার্বি কিনব, আর তোমার জন্য একটা ম্যাজিক স্টিক!
তৃষা টুইংকেলের নাকটা হালকা টেনে দিয়ে হেসে ফেলল। ওর সেই বিরক্তিটা মুহূর্তেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। ও নিচু হয়ে টুইংকেলের সম উচ্চতায় বসে স্নিগ্ধ হেঁসে বলল,
-‘ ম্যাজিক স্টিক দিয়ে কী হবে শুনি, মাই লিটল কুইন?
টুইংকেল বেশ বিজ্ঞের মতো হাত নেড়ে বলল,,

-‘ আরে, ওই স্টিকটা দিয়ে আমি পাপার মুখে একটা তালা লাগিয়ে দেব। পাপা তোমাকে বকলেই আমি ওটা লক করে দেব। তখন পাপা শুধু উঁ উঁ’করবে, আর আমরা দুইজন মিলে আইসক্রিম খাব। ডিল?
তৃষা খিলখিল করে হেসে উঠল। টুইংকেলের এই নিষ্পাপ ষড়যন্ত্র শুনে ওর মনটা একদম হালকা হয়ে গিয়েছে। ও টুইংকেলের হাত ধরে বলল,
-‘ ডিল! আপাতত তালা ছাড়াই ওনাকে সামলানোর চেষ্টা করি, চলো।
বাইরে তখন দুটো বড় গাড়ি স্টার্ট দেওয়া হয়েছে। রাইসা,রায়ারা আর অন্য কাজিনদের সঙ্গে উঠে হুড়মুড় করে পেছনের মাইক্রোবাসে উঠে জায়গা দখল করে নিয়েছে। শাহরিয়ার গিয়েছে ছেলেদের গাড়িতে আর অহনা রায়াদের সঙ্গে। জাহানারা বেগম আর গুলশানারা বেগম সামনের গাড়িতে উঠে তৃষার দিকে তাকিয়ে একটু থমকালেন। জাহানারা বেগম মুচকি হেসে বললেন,

-‘ মা, এই গাড়িতে তো তিল ধারণের জায়গা নেই। তুই বরং আর্যর সাথেই যা। টুইংকেলকেও নিয়ে নে, মেয়েটা তোর কাছেই থাকবে বলছে।
তৃষা একবার আর্যর শ্বেতশুভ্র গাড়িটার দিকে তাকাল। আর্য তখন সানগ্লাসটা চোখে লাগিয়ে স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় বসে আছে। তৃষা একটু আমতা আমতা করে বলল,
-‘ মা, আমি কি এখানে একটু চেপে বসতে পারি না?
গুলশানারা বেগম হাসতে হাসতে ফোড়ন কাটলেন,
-‘ আরে পাগলি! নতুনের সাথে নতুনেই মানায়। যা তো মা, আর্যর পাশে গিয়ে বস। স্বামীর আদরে আদরে যাবি। এতে এত ভয় কিসের?
গুলশানারা বেগমের এমন সরাসরি উক্তিতে লজ্জায় লাজুক লতার ন্যায় মিইয়ে পড়লো তৃষা। পুনর্বার না বলে সাধ্য হলো না ওর। ও টুইংকেলকে নিয়ে অনিচ্ছাসত্ত্বেও আর্যর গাড়ির পেছনের সিটে বসতে গেলে আর্য আয়নায় এক নজর তাকিয়ে খুব শান্ত কিন্তু আদেশসূচক কণ্ঠে বলল,

-‘ সামনে এসে বসুন তৃষা। আমি কি আপনার পার্সোনাল ড্রাইভার যে আপনি পেছনে বসছেন?
তৃষা দাঁতে দাঁত চেপে টুইংকেলকে নিয়ে সামনে গিয়ে বসল। গাড়িটা যখন মসৃণ গতিতে পিচঢালা পথ চিরে এগোতে লাগল, জানালার বাইরে দ্রুত সরে যাওয়া পাহাড় আর অরণ্যের মাঝে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। আর্যর সেই পারফিউমের মাতাল করা সুবাসে তৃষার ঘোর লেগে যাওয়ার জোগাড়।
হঠাৎ নীরবতা ভেঙে ভেসে আসলো টুইংকেলের মিষ্টি কন্ঠস্বর, ও আর্যর কাঁধে একটা টোকা দিয়ে আদুরে গলায় প্রশ্ন করল,

-‘ পাপা! দেখো ওই পাহাড়গুলো কত বড়! আচ্ছা পাপা তাই ওরা ‌কিভাবে এত বড় হয়েছে?
আর্যর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে দুর্লভ হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে স্টিয়ারিংয়ে এক হাত রেখে অন্য হাতে সানগ্লাসটা একটু ঠিক করে গম্ভীর স্বরে বলল,
-‘ ওরা নিয়মিত রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভেজে, তাই ওরা এত বড়। তোমার মতো দুষ্টুমি করলে ওরা কোনোদিন এত বড় হতে পারত না।
টুইংকেল এবার মুখটা একটু বাংলা পাঁচের মতো করে তৃষার দিকে ফিরল। তৃষার ওড়নার আঁচলটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে ফিসফিস করে বলল,
-‘ বানি! পাপা না একদম বোরিং। শুধু স্ট্রং আর ডিসিপ্লিনের কথা বলে। তুমি বলো না, পাহাড়গুলো আসলে মেঘেদের সাথে লুকোচুরি খেলে, তাই না?
তৃষা আয়নায় আর্যর গম্ভীর মুখচ্ছবিটা একবার দেখে নিয়ে নিজের কোলঘেঁষে গুটিসুটি মেরে বসে থাকা টুইংকেলের চিবুক নেড়ে দিয়ে হাসল,

-‘ একদম ঠিক বলেছ সুইটহার্ট! পাহাড়গুলো আসলে মেঘেদের বেস্ট ফ্রেন্ড। আর জানো তো, যখন মেঘেরা বেশি দুষ্টুমি করে, তখন পাহাড়গুলো ওদের জড়িয়ে ধরে বন্দি করে ফেলে। তখন ঝমঝম করে বৃষ্টি নামে।
টুইংকেল খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠল। ও আর্যর দিকে তাকিয়ে খানিক ভাব নিয়ে বলল,
-‘ শুনলে তো পাপা? বানি কত কিছু জানে! তুমি তো শুধু হারি আপ আর কুইক বলতে জানো।
আর্য এবার আড়চোখে তৃষার দিকে তাকাল। তৃষার মুখে তখন এক স্নিগ্ধ জয়ের আভা। আর্য গলাটা সামান্য পরিষ্কার করে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
-‘ পাহাড় আর মেঘের গল্প শোনার প্রয়োজন নেই মাম্মাম। তোমার বানির মাথায় যে পরিমাণ অলীক মেঘ জমে আছে, সেটাই জিপিএস ম্যাপ জ্যাম করার জন্য যথেষ্ট। আর তৃষা, বাচ্চাকে এসব আজগুবি গল্প না শুনিয়ে বরং বাস্তবের সাথে পরিচয় করিয়ে দিন। ও যেন আপনার মতো স্বপ্নবিলাসী হয়ে ক্ল্যামজিনেসের জ্যামে না আটকে পড়ে।
তৃষা এবার মুখটা ঘুরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। মনে মনে বিড়বিড়িয়ে বলল,,
-‘ খাইস্টাউদ্দিনের ডিকশনারিতে কি কল্পনা বলে কোনো শব্দ নেই? আস্ত একটা রোবট!
টুইংকেল অবশ্য দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে তৃষার কানের কাছে মুখ নিয়ে আরও নিচু স্বরে বলল,
-‘ ডোন্ট ওয়্যারি বানি! পাপা না আসলে হিংসে করছে। আমরা যখন ম্যাজিক স্টিকটা কিনব, তখন পাপা দেখবার ওইটা নেওয়ার জন্য মাম্মা মাম্মা করে কাঁদবে, আর আমরা মেঘের দেশে চলে যাব। প্রমিজ!
তৃষা মুচকি হেসে টুইংকেলের তুলতুলে নরম চোয়ালটা টেনে বলল,,
-‘ ওকে সুইটহার্ট।

সূর্যটা তখন মধ্য গগনে। সিলেটের জিন্দাবাজারের ব্যস্ততা ডিঙিয়ে আর্যর গাড়িটি যখন নীলমণি শপিং কমপ্লেক্সের সুউচ্চ তোরণের সামনে এসে থামল। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিপণিবিতানটির ভেতরে পা রাখতেই বাইরের ভ্যাপসা গরম মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। চারদিকে অভিজাত সুগন্ধি আর নতুন কাপড়ের এক মাদকতাময় ঘ্রাণ। ওপর থেকে ঝোলানো বিশাল ঝাড়লণ্ঠন আর কাঁচের শো-কেসে সাজানো মনকাড়া সব লেহেঙ্গা ও কাঞ্চীভরম শাড়িগুলো যেন রীতিমতো দৃষ্টি ধাঁধিয়ে দিচ্ছে।
জাহানারা বেগমরা শুরুতেই সিল্কের সেকশনে গিয়ে থিতু হলেন। একের পর এক শাড়ি খোলার খসখস শব্দ আর মহিলাদের তর্কালাপের গুঞ্জনে চারপাশটা সরগরম। অহনা এক কোণে দাঁড়িয়ে লজ্জা মাখা মুখে লাল বেনারসী আর মেরুন লেহেঙ্গার দ্বন্দ্বে ভুগছিল। তৃষা ওর পাশে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলল,
-‘ অহনা আপু, রেডটা তোমার গায়ের রঙে বড্ড বেশি খুলবে। দেখো, এটা একদম বলিউডের হিরোইন হিরোইন ভাইব দিচ্ছে!
অহনা একটু হেসে তৃষার পছন্দটাকেই সায় দিল,-‘ তবে তুমি নিজের জন্য কিছু সিলেক্ট করো?
তৃষা দোনামোনা করে বলল,,-‘ আমার এমনিতেই অনেক আছে আপু। তুমি নিজের জন্য দেখোনা তোমার হলুদের জন্য ওই কাঁচা হলুদ কালার শাড়িটা দেখো।
সালেহা বেগম পাশ থেকে একটা ভারী কাজের লেহেঙ্গা উঁচিয়ে ধরে রাইসা আর রায়াকে ডাকলেন। তিনি বেশ গম্ভীর মুখে বললেন,

-‘ এই যে দুই বাদর! তোরা কি শুধু সেলফি তুলতেই এসেছিস? এই লেহেঙ্গাটা পরে দেখ তো, তোদের তো আবার মর্ডান কাট না হলে পছন্দ হয় না। এটা একদম ট্রেন্ডি, ঠিক তো?
রাইসা চোখ কপালে তুলে বলল,,
-‘ উফ মা ! এটা তো সেই গত বছরের ডিজাইন। এখন তো সারারা আর ক্রপ-টপ লেহেঙ্গার যুগ। আমরা বরং ওই কর্নারটায় যাই, ওখানে লেটেস্ট কালেকশন আছে।
রায়াও তাল মিলালো তার সঙ্গে। সালেহা বেগম মুখ শিটকে বললেন,
-‘ অন্য ব্যাপারে এক না হলেও আকাম-কুকামের বেলায় সব সময় এক থাকবে এই দুইটা।
রাইসা-রায়া এগিয়ে গেল।পুরো ফ্লোর জুড়ে তখন হাসাহাসি, দরদাম আর কাপড়ের খসখস শব্দে এক হুলস্থুল কাণ্ড। তামান্না আর তিথি এক কোণে দাঁড়িয়ে হলুদের কাপড় নির্বাচনে ব্যস্ত, আর জাহানারা বেগম সবকিছুর তদারকি করছেন এক দক্ষ ম্যানেজারের মতো।
রাইসা আর রায়া তখন লেটেস্ট ডিজাইনের সারারা নিয়ে ব্যস্ত, ভিড়ের মাঝে তৃষা আর টুইংকেল নিজেদের জন্য একটা নিভৃত কোণ খুঁজে নিয়েছে, যেখানে কাঁচের শো-কেসের ওপাশে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে ওদের পছন্দের পোশাক গুলো
টুইংকেল একটা পিচ কালারের ফ্রিল দেওয়া ফ্রক নিজের গায়ের সাথে ধরে আয়নায় দেখছিল। ও তৃষার ওড়নার আঁচল টেনে উত্তেজিত গলায় বলল,

-‘ ও বানি! দেখো তো, এই ড্রেসটা পরলে কি আমাকে একদম এলসা লাগবে? নাকি আমি সিনড্রেলা হয়ে যাব?
তৃষা নিচু হয়ে টুইংকেলের চুলগুলো ঠিক করে দিয়ে স্নিগ্ধ হাসল,
-‘ তুমি তো আমার লিটল কুইন সুইটহার্ট! তুমি যা-ই পরো না কেন, তাতেই তোমাকে মোস্ট কিউট টেস্ট বার্বিডল লাগবে সোনা।
টুইংকেল খুশিতে ডগমগ হয়ে এবার একটা গাঢ় ল্যাভেন্ডার রঙের জর্জেট ঝিকিমিকি কামিজের দিকে আঙুল তুলে তৃষাকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
-‘ নাউ ইটস ইওর টার্ন বানি! ওই দেখো, ওই ড্রেসটা ঠিক তোমার মতো। ভীষণ শাইনি আর কিউট। তুমি কি ওটা ট্রাই করবে? প্লিজ বানি‌।
তৃষা কিঞ্চিৎ লাজুক হেসে ড্রেসটা হাতে নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরের সাথে ওটা মিলিয়ে দেখছিল ও। ল্যাভেন্ডার রঙটা ওর ফর্সা ত্বকে রঙে এক অদ্ভুত আভিজাত্য লেপে দিচ্ছে। ও যখন তন্ময় হয়ে আয়নায় নিজেকে দেখছিল, ঠিক তখনই কানে এল সেই পরিচিত ভরাট কণ্ঠস্বর।
আর্য ফোনে কথা বলতে বলতে সেই সেকশনে প্রবেশ করল। ওর এক হাত পকেটে, অন্য হাতে ফোন কানের কাছে ধরা। ও গম্ভীর স্বরে কাউকে বলছিল,

-‘ ইয়েস, শিপমেন্টের ডিটেইলসগুলো মেইল করে দিন। আই উইল চেক ইট লেটার।
আর্যর গম্ভীর কণ্ঠস্বর কানে আসতেই তৃষার হাতের ল্যাভেন্ডার রঙের ড্রেসটা যেন কাঁপতে লাগল। ও দ্রুত ড্রেসটা শো-কেসের হ্যাঙ্গারে রাখতে গিয়েও থমকে গেল আর্যর কন্ঠে,
-‘ রাখবেন না, প্যাক করে নিন।ল্যাভেন্ডার সুটস ইউ্য ওয়েল।
তৃষা খানিক অপ্রস্তুত হলো ভাবল আর্যতো কথা বলছিল ও কখন দেখলো তাকে? পরক্ষণেই ওর মনে পড়লো ড্রেসটার প্রাইজ ট্যাগে ওর দাম দেখেছে তেরো হাজার। তাতেই ওর চক্ষু চড়ক গাছ। ছ্যাঁকা লেগেছে পুরোই। সামান্য একটা থ্রি পিস যদি এত দামি হয়! না না ও কিছুতেই এত দামি ড্রেস নিবেনা। কিন্তু আর্য যদি দেখে তাহলে এই ড্রেস ওর জন্য নিয়েই ছাড়বে তাই ও চিন্তা গুলো এক পাশে রেখে তৎক্ষণাৎ দুপাশে মাথা নাড়ল, বেশ কুণ্ঠিত স্বরে বলল,

-‘ আরে না না, দরকার নেই। আমি তো জাস্ট দেখছিলাম। মানে… কালারটা একটু বেশিই শাইনি না? আমার মনে হয় অন্য কিছু দেখি।
আর্য আর কিছু বলল না, ও বেশ কর্তৃত্বব্যঞ্জক স্বরে সেলসম্যানকে ইশারায় ডেকে বলল,
-‘ এক্সকিউজ মি, এই ল্যাভেন্ডার ড্রেসটা প্যাক করে দিন। সাইজটা চেক করে নেবেন।
আর্য এবার সরাসরি তৃষার চোখের দিকে তাকাল। ওর কণ্ঠস্বর কিঞ্চিৎ নরম হলেও বড্ড অটল। পকেটে হাত গুঁজে শান্ত গলায় ও বলল,
-‘ অহেতুক লজিক খুঁজবেন না তৃষা। ড্রেসটা আপনার রিফ্লেকশনে পারফেক্টলি ব্লেন্ড হচ্ছে।
তৃষা স্তম্ভিত হয়ে গেলো,
-‘ আপনি জানলেন কী করে?
আর্য কোনো উত্তর না দিয়ে সেলসম্যানকে কার্ডটা বাড়িয়ে দিল। তৃষা জেদ ধরে বলল,
-‘ বললাম তো নেব না।আপনি কি সব সময় আমার ওপর নিজের চয়েস চাপিয়ে দেবেন?
-‘ চয়েস চাপিয়ে দিচ্ছি না ম্যাম, জাস্ট একটা সুইট ডিল ফাইনাল করছি। টুইংকেল যদি দেখে আপনি ওর পছন্দের ড্রেসটা রিজেক্ট করেছেন, তবে ও কিন্তু শপিং মল মাথায় তুলবে। আপনি কি সেটা হ্যান্ডেল করতে পারবেন? ইটস আ ট্র্যাপ, চয়েস ইজ ইয়োরস!
তৃষা অসহায়ভাবে টুইংকেলের দিকে তাকাল, যে কি না ততক্ষণে নিজের ফ্রক হাতে নিয়ে তৃষার সম্মতির অপেক্ষায় ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে হার স্বীকার করল। আর্যর দিকে তাকিয়ে মুখটা একটু কুঁচকে বলল,

-‘ আপনি না আস্ত একটা ব্ল্যাকমেইলার! বিহেভিয়র রোবটের মতো হলেও আপনার চিপসেটে দেখি সব শয়তানি বুদ্ধি লোড করা আছে।
আর্য নির্বিকার ভঙ্গিতে বিলটা সই করতে করতে বলল,
-‘ থ্যাঙ্কস ফর দ্য কমপ্লিমেন্ট। এবার চলুন, বাকিদের সাথে জয়েন করি।
ওদের কথোপকথনের মাঝে হঠাৎ টুইংকেল বলল,,
-‘ বানি তুমি ড্রেসটা কিনেছো তো?
তৃষা কিছু বলার আগেই পাশ থেকে আর্য বলল,
-‘ কিনেছে মাম্মাম চলো।
ব্যাস! টুইংকেলকে আর দেখে কে? ও খুশিতে তালি বাজিয়ে তৃষার হাত ধরল। তৃষা গটগট করে হাঁটতে শুরু করল, কিন্তু ওর মনের কোণে এক চিলতে ভালোলাগা অলক্ষ্যেই দোলা দিয়ে গেল। আর্যর এই জেদমাখা কেয়ারিং ভাবটা ওর কাছে বড্ড অদ্ভুত অথচ নেশার মতো লাগছে।

তৃষারা এবার গহনার সেকশনে এলো। সেখানে রীতিমতো চাঁদের হাট বসেছে। কাঁচের শোরুমের ভেতর স্বণার্ভ আলোর বিচ্ছুরণে স্বর্ণ আর হিরের গহনাগুলো ঝিকমিক করছে। জাহানারা বেগম আর গুলশানারা বেগম সীতাহার আর ঝুমকোর নকশা নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন। অহনা নিজের বিয়ের গয়না পছন্দ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে, আর রাইসারা ব্যস্ত লেটেস্ট ডিজাইনের নোজপিন নিয়ে।
তৃষাকে দেখেই জাহানারা বেগম তৃষার চিবুক উঁচিয়ে ধরে বললেন,
-‘ কিরে মা, নিজের জন্য কিছু দেখলি?
তৃষা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতে জাহানারা বেগম ফের বললেন,-‘ তাহলে এখানে দেখ কি পছন্দ হয়।
তৃষা মাথা নাড়ল,
-‘ না আম্মু, আমার চুড়ি-মালা অনেক আছে। আমি বরং অহনা আপুর সেটটা দেখি।
আর্য একটু দূরে দাঁড়িয়ে ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালাচ্ছিল, কিন্তু ওর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বারংবার তৃষার ওপর গিয়ে আছড়ে পড়ছছ। হুট করেই আর্যর দৃষ্টি পতিত হলো তৃষার পায়ের দিকে। সেলোয়ার সামান্য সরে যাওয়ায় ওর ফর্সা গোড়ালি দুটো উন্মুক্ত হয়ে আছে, যা একদম খালি। আর্যর কপালে একটা সূক্ষ্ম ভাঁজ পড়ল। ও ফোনটা পকেটে রেখে বেশ গম্ভীর স্বরে ডাকল,
-‘ তৃষা! এদিকে আসুন একবার।
তৃষা অপ্রস্তুত হয়ে মুরুব্বিদের থেকে বিদায় নিয়ে আর্যর সামনে এসে দাঁড়াল। আর্য কোনো ভনিতা না করে সরাসরি তৃষার পায়ের দিকে ইঙ্গিত করে তীক্ষ্ণ গলায় বলল,

-‘ আপনার কি সব জিনিসেই….! আই মিন, একজোড়া নুপুর পরতে কি ট্যাক্স দিতে হয় আপনাকে?
তৃষা অবাক হয়ে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বলল,,
-‘ না মানে… ওটা পরলে হাঁটতে ঝনঝন শব্দ হয়, আপনার আবার ডিস্টার্ব হয় কি না তাই।
আর্য ওকে কথা শেষ করতে না দিয়ে সেলসম্যানকে ইশারায় ডেকে হুকুম দিল,
-‘ সবচেয়ে ট্রেন্ডি আর স্লিক ডিজাইনের নুপুর দেখান তো। সাউন্ড যেন মেলোডিয়াস হয়, নয়েজ নয়।
কাঁচের শো-কেসে রাখা হিরে আর কুন্দনের ঝিলিক ছাপিয়ে তৃষার দৃষ্টি আটকে গেল আর্যর ওই অতর্কিত নির্দেশে। সেলসম্যান দ্রুত একজোড়া রুপোলি চেইন-ডিজাইনের স্লিক নূপুর বের করে আনল, যার প্রতিটি হিল্লোলে এক মায়াবী নিক্বণ অনুরণিত হচ্ছে।তৃষা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আর্য ধীর পায়ে ওর সামনে এগিয়ে এল।
আর্যর সেই দীর্ঘ ঋজু দেহভঙ্গি দেখে তৃষা ভাবল ও হয়তো নূপুর জোড়া ওর হাতে ধরিয়ে দেবে। কিন্তু পরক্ষণেই যা ঘটল, তাতে উপস্থিত সেলসম্যান থেকে শুরু করে তৃষার হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত কয়েক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।
কোনো প্রকার ভনিতা না করেই আর্য এক হাঁটু গেড়ে তৃষার সামনে বসে পড়ল। ও মৃদু টানে তৃষার সেলোয়ারটা কিঞ্চিৎ সরিয়ে দিয়ে ওর ফর্সা-পেলব পা-টি নিজের হাঁটুর ওপর তুলে নিল। তৃষা চমকে উঠে টাল সামলাতে আর্যর কাঁধ খামচে ধরল, ওর কণ্ঠনালীতে বিঁধে থাকা বিস্ময়গুলো এক লহমায় বেরিয়ে এল,

-‘ আরে… একি করছেন? ছাড়ুন, আমার পা আপনার গায়ে লাগছে! সবাই দেখছে তো, প্লিজ!
তৃষার গলার স্বর কাঁপছে, লজ্জায় ওর কান-মুখ র’ক্তজবার ন্যায় লাল হয়ে উঠেছে। তবে এতকিছুর মাঝেও একদম নির্বিকার আর্য।ও নূপুর জোড়া হাতে নিয়ে তৃষার চোখের দিকে একবার গভীর দৃষ্টিতে তাকাল। ঠোঁটে আঙুল চেপে খুব আলতো করে এক শান্ত হুশ’ শব্দ করল, যার অর্থ চুপ থাকুন।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৬

আর্য অত্যন্ত নিপুণ হাতে নূপুরের হুকটা আটকে দিল। শীতল রুপোর ছোঁয়া তৃষার উষ্ণ ত্বকে লাগতেই ওর শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল। নূপুর পরানো শেষে আর্য তৃষার পায়ের ওপর হাত রেখে নিচু স্বরে বলল,,
-‘ আপনার মতো নারীর চঞ্চল পায়ের শুভ্রতা নূপুর ছাড়া বড্ড বিবর্ণ; আর আমার মতো একরোখা পুরুষের সকালটা আপনার ওই নূপুরের নিক্বণ ছাড়া একদম অসম্পূর্ণ।

ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ২৮