Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪২

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪২

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪২
সানজিদা আক্তার মুন্নী

ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বেঘোরে চিৎকার করছে ওয়াসেম “তৃষ্ণা! তৃষ্ণা!” করে। অথচ তৃষ্ণার কিছুই হয়নি, সে তো উঠে গিয়ে রান্নাঘর থেকে খাবার আনতে বেরিয়েছে। কিন্তু ওয়াসেমের চোখে যা ভেসেছ তা কোনো এক অজানা বিভ্রম বা হেলুসিনেশনের ঘোর। নিজের নাম ধরে এমন আর্তনাদ শুনে বুক কেঁপে ওঠে তৃষ্ণার। কী এমন ঘটে গেল! তাড়াহুড়ো করে খাবারের প্লেট হাতে একপ্রকার দৌড়েই ঘরে এসে ঢোকে সে। টি-টেবিলের ওপর কাঁপা হাতে প্লেটটা নামিয়ে রেখে আমতা আমতা করে বলে, “নিন নিন, খাবার।”
খাবারের দিকে দৃকপাতও করে না ওয়াসেম। আচমকা হ্যাঁচকা টানে তৃষ্ণার সরু বাহুটা ধরে একেবারে নিজের বুকের কাছে টেনে আনে সে। এই আকস্মিক টানের জন্য একদমই প্রস্তুত ছিল না তৃষ্ণা। হন্তদন্ত হয়ে আছড়ে পড়ে ওয়াসেমের বুকের ওপর। ওয়াসেমের হাত ততক্ষণে ছুঁয়ে ফেলেছে তৃষ্ণার গাল, গলা। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে তৃষ্ণা র! রাগে দাঁত চেপে ধরে ওয়াসেম হিসহিস করে ওঠে, “এই শালী ইতর! তুই না বললি তোর শুধু মাথা ধরেছে? তাহলে গা এত গরম কেন? আমার সাথে নাটক চুদাস?”
জ্বরে দুর্বল শরীর, তার ওপর ওয়াসেমের এমন রুক্ষ স্পর্শ ভীষণ অস্বস্তি হতে থাকে তৃষ্ণার। তাও সে নিজেকে সামলে নেয়। ওয়াসেমের ক্রুদ্ধ চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে তোলে নিস্পৃহ গলায় বলে, “আমার মতো রাস্তার কুকুরের এসব সামান্য জ্বরে কিচ্ছু হবে না।”
তৃষ্ণার কথায় এককথায় আগুনে ঘি পড়ার তো প্রক্রিয়া হয়। হুংকার দিয়ে ওঠে ওয়াসেম, “তোর এটাকে সামান্য মনে হচ্ছে? গা তো পুড়ে যাচ্ছে তোর!”

তৃষ্ণা এবার আর ভয় পায় না। এক অদ্ভুত নিরাসক্তি ভর করে তার মাঝে। নির্লিপ্ত কণ্ঠে সত্যটা উচ্চারণ করে সে, “শুধু পুড়ছিই তো। মরছি তো আর না!”
‘মরণ’ শব্দটা কানে যেতেই ওয়াসেমের মনের ভেতর কিছুক্ষণ আগের সেই বিভ্রমের আতঙ্কটা আবার মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। নিজের এই দুর্বলতাকে ঢাকতেই আরও রুক্ষ হয়ে ওঠে সে। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে, “তোর মরার এত শখ?”
তৃষ্ণার ছোট্ট উত্তর, “মরলেই তো শান্তি।”
এবার ওয়াসেমের হাত চেপে বসে তৃষ্ণার চোয়ালে। শক্ত করে চোয়ালটা চেপে ধরে চোখের দিকে তাকিয়ে সে বলে, “এত মরার শখ তোর? যেই দেখলি আমি একটু পাত্তা দিচ্ছি, অমনি গলার আওয়াজ আর কথার ধরন পাল্টে নিচ্ছিস?”
ব্যথায় কুঁকড়ে যায় তৃষ্ণা। অস্ফুট স্বরে বলে, “আমি তো বলিনি আমাকে পাত্তা দিতে। এটা তো আপনার নিজের ইচ্ছে।”

কথাটা তীরের মতো বিঁধে যায় ওয়াসেমের অহংকারে। তীব্র আক্রোশে দাঁত চেপে সে তৃষ্ণাকে সজোরে দূরে ঠেলে দেয়। জ্বরে দুর্বল শরীরটা টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে লুটিয়ে পড়ে মেঝের ওপর। খাবারটা আর ছোঁয়া হয় না ওয়াসেমের। রাগে গটগট করতে করতে কোনো কথা না বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে যায় সে। মেঝেতে ঠিক সেইভাবেই পড়ে থাকে তৃষ্ণা। অসুস্থ, দুর্বল শরীরটা আর টেনে তোলার শক্তিটুকুও যেন অবশিষ্ট নেই তার। দুই চোখ বেয়ে অঝোরে ঝরতে থাকে লোনা জল। সুখ কি কোনোদিন তার কপালে জুটবে না? ওয়াসেম কি পারতো না তাকে একটু আগলে রাখতে? তৃষ্ণা তো খুব বেশি কিছু চায়নি। শুধু একটুখানি সম্মান চেয়েছিল। ভালোবাসা নাই বা দিল, ভালোবাসা পাওয়ার ভাগ্য তো তার নেই-ই। কিন্তু তাই বলে কি মানুষ হিসেবে সামান্য সম্মানটুকুও সে পাবে না? সত্যিই কি তাকে কুকুরের মতো বেঁচে থাকতে হবে?
যাওয়ার মতো তো কোনো জায়গাও নেই তার। ইশ! আজ যদি তার নিজের বলতে কোনো আপন মানুষ থাকতো, তবে সে ঠিকই চলে যেত। আর কোনোদিন ফিরে আসতো না এই নরকে। এই মেঝেতে পড়ে থেকেই তৃষ্ণা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে ওয়াসেমকে সে কখনোই ক্ষমা করবে না, কখনোই না। তার করা প্রতিটি নির্মম আচরণ তৃষ্ণার বুকের ভেতর জমিয়ে তুলেছে এক বিশাল ঘৃণার পাহাড়।

ক্লান্তি আর রাজনৈতিক কৌশলের ঘাম মেখে কেটে যায় দীর্ঘ দুই দিন। নির্বাচনের উত্তাপ এখন কিছুটা স্তিমিত, তবে তার রেশ রয়ে গেছে তৌসিরদের জয়োল্লাসে। কিছুটা সুষ্ঠু আর বাকিটা সূক্ষ্ম কারচুপির এক জটিল ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ খেলায় শেষমেশ তৌসিররা তন্ময় চাচাকে বিজয়ী করে আনে। গত ৪৮ ঘণ্টা তাদের ওপর দিয়ে যেন এক ঝড় বয়ে গেছে। মিটিং, মিছিল আর কর্মীদের সামলানোর নিরন্তর ব্যস্ততায় তৌসিরের নিজের ঘরে ফেরার সময় হয়নি, নাজহার সঙ্গে দুটো কথা বলার ফুরসত মেলেনি। ওদিকে নাজহার চাচা হেরে গেছেন। এটাই তো হওয়ার ছিল। প্রতিপক্ষ যখন জালিয়াতির দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে দেয়, তখন সত্যের লড়াইয়ে জেতা যে বড় কঠিন!
আজ চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি, রাত এখন এগারোটার কাছাকাছি। বাইরের জগৎটা যখন ভালোবাসার উৎসবে মত্ত, তখন ঘরের নিস্তব্ধতায় বিছানার এক কোণে দু-পা ঝুলিয়ে পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে নাজহা। তার চোখেমুখে শূন্যতা। অভিমানের এক বিশাল পাহাড় জমেছে তৌসিরের ওপর। সেই নির্বাচনের দিন থেকে শুরু হওয়া অবিশ্বাসের কাঁটাটা এখনো বিঁধে আছে বুকে। তার ওপর এই দুদিন তৌসির মনে হয় ভুলেই গিয়েছিল নাজহা নামের কোনো অস্তিত্ব তার জীবনে আছে। নাজহা যথেষ্ট বুদ্ধিমতী এবং পরিণত, তবু তার মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা এই অভিমানী কিশোরীটা বারবার ডুকরে উঠছে।

তৌসির ঘরে আসার পর থেকে এটা-সেটা কত কথাই না বলছে, কিন্তু নাজহার দিক থেকে উত্তর আসছে কেবল সংক্ষিপ্ত ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’-তে। তৌসির যাতে তার মনের মেঘলা আকাশটা টের না পায়, সেজন্য ঠোঁটের কোণে একটা মেকি হাসির রেখা টেনে রেখেছে সে। কারণ সে জানে, তৌসির একবার তার অভিমান বুঝতে পারলেই চিরাচরিত অভ্যাসে পায়ে পড়ে যাবে। কথার মায়াজালে তুড়ি মেরে রাগ ভাঙিয়ে দেওয়া তৌসিরের পুরনো খেলা। নাজহা এবার বড্ড বিরক্ত সে চায় না তৌসিরের এই চাতুর্যের কাছে আবারও হেরে যেতে। ওদিকে তৌসির গেছে পুকুরঘাটে গোসল করতে। পানির অপচয় আর মোটরের বিল বাঁচানোর বাতিক তার। শীতের শেষে পুকুরের জল শুকিয়ে ঘোলাটে হয়ে গেছে তাও সেই জলেই সে ডুব দেবে। কল টিপে পানি তোলার কষ্টটুকুও সে করবে, যদি তাতে চারটে পয়সা বাঁচে! কিপ্টামির যদি কোনো চূড়ান্ত সীমানা থাকে, তবে তৌসির সেই সীমানারও অনেক উঁচুতে বাস করে।
নাজহার ভাবনার সুতো ছিঁড়ে যায় ভেজা চুলের গামছা ঘষতে ঘষতে তৌসির ঘরে ঢোকায়। গামছা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে সে নাজহার ঠিক সামনে এসে দাঁড়ায়। গায়ের সেই পরিচিত ঘ্রাণ আর ভেজা চুলের আর্দ্রতা ছাপিয়ে তৌসিরের জিজ্ঞাসু দৃষ্টি বিঁধে যায় নাজহার মুখে। সে বলে ওঠে, “কী হইলো তোমার? এত চুপচাপ ক্যান আইজ?”
কথাটি বলে মনের ভুলেই ভেজা গামছাটা বিছানায় রেখে দেয় তৌসির। তবে রাখতেই ওর মনে পড়ে যায়, নাজহা এখন নির্ঘাত বেজাতের মতো চিল্লাবে। তাই তড়িঘড়ি করে ‘সরি সরি’ বলে গামছাটা আবার হাতে তুলে নিতে যায় সে। কিন্তু তার আগেই নাজহা গামছাটা নিজের হাতে তুলে নেয়। তারপর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে আলতো হাসি ফুটিয়ে বলে, “আমি মেলে দিচ্ছি, সমস্যা নেই।”

এই বলে সে গামছাটা নিয়ে বারান্দার দিকে পা বাড়ায়। তৌসির আগেই আঁচ করতে পারছিল, আজ এই মেয়ের নিশ্চিত কিছু একটা হয়েছে। ঘরে আসার পর থেকেই সে কেমন অস্বাভাবিক ঠান্ডা মেরে আছে। আর এখনকার এই দৃশ্য দেখে তৌসিরের সন্দেহ একেবারে সুনিশ্চিত হয়। নয়তো এই নাজহা জ্বরে কাঁপা অবস্থায়ও বিছানায় ভেজা গামছা রাখার অপরাধে ঘর মাথায় তুলত! তৌসির আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত উঠে নাজহার পিছু পিছু যায়। নাজহা ততক্ষণে বারান্দায় গামছা মেলে দিয়ে ঘরে ঢুকতে নেবে, ঠিক তখনই তৌসির ওর পথ আটকে দাঁড়ায়। একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নাজহার চোখে চোখ রেখে কৌতূহলমাখা কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে তোর?”
নাজহা কিছুই বুঝতে পারছে না, এমন ভান করে ভ্রু কুঁচকে বলে, “কী হবে?”

তৌসির এবার নাজহার দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরে আলতো ঝাঁকুনি দিয়ে বলে, “কী হইছে সেটা ক!”
নাজহা আগের মতোই না বোঝার নিখুঁত অভিনয় চালিয়ে যায়। ম্লান হেসে উত্তর দেয়, “কী হবে আমার? এমন করছেন কেন আপনি? আপনার কী হলো?”
তৌসির এবার আর মেজাজ ধরে রাখতে পারে না। রাগ ঝেড়ে রুক্ষ ও অনুসন্ধিৎসু কণ্ঠে বলে ওঠে, “নাটক চুদাস আমার লগে, নাটক? কী হইছে সেটা ক! এই দুইদিন ঘরে আসিনি সেজন্য?”
নাজহা আবারও সুক্ষ্ম অভিনয়ে তৌসিরের মুঠো থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। ঠোঁটে মেকি হাসিটা ধরে রেখেই বলে, “আরে দূর! কী যে বলেন, কী হবে? আমি কি বাচ্চা যে এসব নিয়ে কিছু ভাবব? নির্বাচনের মতো বড় বিষয়, একটু ব্যস্ত তো থাকবেনই।

কথাগুলো বলে নাজহা তৌসিরকে পাশ কাটিয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে যায়। তৌসির পেছন ঘুরে নাজহাকে উদ্দেশ্য করে তীক্ষ্ণ গলায় বলে ওঠে, “আমার সাথে সাউয়ার সাউয়ার কথা কইস না ছিনাল। আমি জানি তুই রেগে আছোস। কী হইছে ক আমারে, কী পাপ করলাম আমি আবার?”
নাজহা তৌসিরের এই রুক্ষ কথাগুলো একদম কানে তোলে না। ধীরপায়ে বিছানায় উঠে নিজের কোঁকড়ানো বাদামি কেশতরঙ্গ আলগা করে দেয়। বালিশে মাথা রাখতে রাখতে নিস্পৃহ স্বরে বলে, “সারাদিন রোজা ছিলাম, এখন আর মাথাটা খাইয়েন না আমার। চুপচাপ এসে লাইট অফ করে ঘুমান। বললাম যখন কিছু না, তখন না।”
{ এটা রমজান মাসের রোজা না। নফল রোজা }

তৌসির কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণ বাঁকা দৃষ্টিতে নাজহার দিকে তাকিয়ে থাকে। নাজহা কে নতুন করে পরখ করার চেষ্টা করে সে। তারপর নিঃশব্দে ঘরের লাইট অফ করে, দরজা লক করে দিয়ে বিছানায় নাজহার পাশে এসে ওঠে।
তৌসিরকে কাছে আসতে দেখেও নাজহা টুঁ শব্দ করে না, চুপচাপ পাশ ফিরে শুয়ে থাকে। হঠাৎ করেই তৌসির নাজহার ওপর ঝুঁকে পড়ে। ওর দুই হাত বিছানার ওপর নিজের শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে। অন্ধকারেও নাজহার চোখে চোখ রেখে তীব্র, প্রশ্নাতুর কণ্ঠে বলে, “কী হয়েছে যতক্ষণ বলবি না, ততক্ষণ জিজ্ঞেস করমু। তোর সাউয়ায় তেল মারার ইচ্ছে নাই, তাই চুপচাপ কইয়া দে!”

নাজহার বুকটা ভেতরে ভেতরে ধুকপুক করতে থাকে। জমে থাকা একরাশ অভিমানে ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে, কিন্তু কোনোভাবেই সে তা প্রকাশ করতে পারছে না। এই অব্যক্ত যন্ত্রণার অনুভূতি যে কতটা ভয়ংকর, তা কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে নাজহা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তৌসিরের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলে, “কী আর হবে? কিচ্ছু হয়নি। হাত ছাড়ুন, আমি ঘুমাব।”
কিন্তু তৌসিরও নাছোড়বান্দা। জেদ ধরে নাজহার দৃষ্টির মায়াজালে আবদ্ধ হয়েই কিছুটা কঠোর কণ্ঠে বলে, “না, আমি ঘুমাব না। তুই আগে বল না কী হইছে? কৈতরী, এমন ক্যান করিস, বল আমায়!”
নাজহা এবার নিজেকে আরও কঠিন আবরণে মুড়িয়ে নেয়। নিরাসক্ত স্বরে উত্তর দেয়, “আপনি ঘুমাবেন না তো না ঘুমান, আমায় ঘুমাতে দিন। আমার কী হবে? আপনি কেন বারবার আমাকে এক প্রশ্নে বিদ্ধ করছেন?”
তৌসির জেদ ধরে বলে, “আমি সজাগ থাকব, তাই তুইও থাকবি। আইজ রাত আমার।”
কথাটি শুনে নাজহা দৃষ্টি সরিয়ে অন্যদিকে তাকায়। তবে তৌসিরকে শুনিয়েই বিড়বিড় করে বলে ওঠে, “এখন এজন্য এত কথা প্রয়োজন পড়ছে, তাই এভাবে জিজ্ঞেস করা।”

তৌসিরের কণ্ঠে এবার ভর করে কর্কশ কাঠিন্য। সে তীক্ষ্ণ স্বরে বলে ওঠে, “শোন, আমি কাপুরুষের ঘরের কাপুরুষ নই, আমার বাপ-মা কোনো কাপুরুষ জন্ম দেয়নি। তোর শরীর পাওয়ার জন্য তোরে তেল মারমু? কী হইছে সেটা চুপচাপ ক বাইনচু**, নয়তো কপালে কিন্তু আইজ দুঃখ আছে বলে দিলাম!”
এমন কথা শুনে নাজহার ভেতরটা ক্রোধে ফুঁসে ওঠে। রক্তিম চোখে তৌসিরের পানে তাকিয়ে সজোরে তার বুকে এক ধাক্কা বসিয়ে দিয়ে ক্ষোভের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে বলে, “কী চাই শুনবেন? তাহলে শুনুন, আমি থাকব না আপনার সংসারে! থাকতে চাই না আমি আপনার সাথে!”
নাজহার এমন দুঃসাহসিক কথায় তৌসিরের মাঝেও ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে। রাগের বশবর্তী হয়েই তিক্ত ও রুক্ষ স্বরে সে বলে, “থাকলে থাক, না থাকলে নাই! তোর সাউয়ায় তেল মারার সময় আমার নাই।”
এই অপমানজনক কথায় নাজহা এবার রাগে ও অভিমানে ফেটে পড়ে। কণ্ঠ খাদে নামিয়ে তীব্র অভিমানের সুরে বলে, “হ্যাঁ, নেই তো! হবে কেন? কে আমি আপনার যে হতে যাবে? কে বলেছে তেল মারতে? আমি বলেছি জিজ্ঞেস করতে? আমি তো বিশ্বাসঘাতক, আমার সাথে এত কথা কিসের?”

শেষ কথাটি কানে যেতেই তৌসিরের কাছে সমস্ত সমীকরণ স্পষ্ট হয়ে যায়। সে বুঝতে পারে, তার সুন্দরী কালনাগিনী ঠিক কী কারণে তার ওপর ফোঁসফোঁস করছে! নির্বাচনের দিন নিজের আসল পরিচয়ের কথা গোপন রাখা এবং গত দু’দিন ধরে ঘরে না আসা এই জোড়া অভিমানই বুকে পুষে রেখেছে নাজহা। তৌসির একদৃষ্টিতে নাজহার পানে তাকিয়ে থেকে শান্ত স্বরে বলে, “আমি সেইদিন নিজের জন্মপরিচয় নিয়ে কিছু বলিনি, আর গত দু’দিন ধরে ঘরে আসিনি এই নিয়ে এত রাগ তোর? এত রাগ?”
তৌসিরের পেশির বাঁধন কিছুটা শিথিল হতেই নাজহা তাকে ধাক্কা দিয়ে নিজের ওপর থেকে সরিয়ে দেয়। বিছানা থেকে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে নিজের দীর্ঘ কেশরাজি অবিন্যস্তভাবে খোঁপা করতে করতে সে সামনের দিকে পা বাড়ায়। যেতে যেতেই বলে, “আমি নিচে ঘুমাব। আমি ঘুমাব না আপনার সাথে।”
তৌসির কালক্ষেপণ না করে দ্রুত উঠে দাঁড়ায়। হঠাৎ করেই গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে, “তুই জানতে চাস তো আমি কে? তাহলে শোন।”
কথাটি কানে যেতেই নাজহার পা জোড়া মেঝেতে গেঁথে যায়। সে থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকায়। কৌতূহলী চোখে প্রশ্ন করে, “কে?”

তৌসির একটি দীর্ঘ, উষ্ণ শ্বাস ছাড়ে। এরপর নাজহার বাহু ধরে টেনে তাকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে অত্যন্ত ধীর কণ্ঠে বলে, “এতটুকু জেনে রাখ, আমি রাজার ছেলে, রাজা। আমি এই পরিবারের কেউ না। আমি শিকদার নই, ইলমাজ পরিবারে জন্ম নিয়েছি। এতটুকু জেনে রাখ, সময় হলে বাকি সব জেনে যাবি।”
এ কথা শুনে নাজহার চোখেমুখে কিছুটা বিস্ময় ফুটে উঠলেও সে আকাশ থেকে পড়ে না। কারণ, তৌসির যে এই পরিবারের কেউ নয়, সে সম্পর্কে তার আগে থেকেই কিছুটা আঁচ ছিল। নাজহা তৌসিরের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে শুষ্ক কণ্ঠে বলে, “আমাকে এতটা বললেন যদি বিশ্বাস ভাঙি?”
তৌসির এবার শব্দ করে হেসে ওঠে, “আমি তোরে বিশ্বাস করি।”
নাজহা আবারও পালটা প্রশ্ন ছোঁড়ে, “যদি আমি আবার পেছন থেকে ছুরি মারি?”
তৌসির ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে কটাক্ষের সুরে বলে, “তুই আমার পেছনে ছুরি মারলে আমি তোর চৌদ্দগুষ্ঠির পেছনে আইক্কাওয়ালা বাঁশ ভরমু। সমস্যা কী?”

এমন অমার্জিত কথায় মুহূর্তেই নাজহার মেজাজ বিগড়ে যায়। সে চেঁচিয়ে উঠে সজোরে ‘ঠাস’ করে তৌসিরের গালে এক চড় বসিয়ে দিয়ে রাগান্বিত স্বরে বলে ওঠে, “সমস্যা কী আপনার? ভালো কথার মধ্যেও এসব কেন বলছেন?”
অপ্রত্যাশিত থাপ্পড়টি খেয়েও তৌসিরের মাঝে কোনো ভ্রুক্ষেপ দেখা যায় না। উল্টো সে দুহাতে নাজহার কোমর পেঁচিয়ে ধরে তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নেয়। নাজহার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে মাদকতাপূর্ণ স্বরে বলে, “চলো, একটু আরাম দিই তোমারে।”
রাগ-অভিমানের বরফ ততক্ষণে গলতে শুরু করেছে। নাজহাও আলতো করে তৌসিরের গলা জড়িয়ে ধরে বলে, “চলুন।”
তৌসির দুষ্টুমির ছলে আবারও জিজ্ঞেস করে, “না করবা না?”

নাজহা ধীরহাতে তৌসিরের শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে জবাব দেয়, “না করব কেন? যে বিষয়ে আপনিও স্যাটিসফাইড, আমিও স্যাটিসফাইড, সেখানে ন্যাকামি কেন করব? আমি যথেষ্ট ম্যাচিউর, আমি কচি খুকি নই।”
কথাটি শুনে তৌসির ঠোঁট চেপে হাসে। মৃদু হেসে সাবধান করার ভঙ্গিতে বলে, “পরে এ্যা কইরা কাঁনে কিন্তু আমি কিছু জানি না।”
নাজহা তৌসিরের শরীর থেকে শার্টটা সরিয়ে নিয়ে কিছুটা খুনসুটির সুরে বলে, “বেশি কথা এগোবেন তো ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে হবে কিন্তু! আমার ঘুম পাচ্ছে।”
তৌসির এক ঝটকায় নাজহাকে নিজের কোলে তুলে নেয়। চোখের দৃষ্টিতে গভীর আকাঙ্ক্ষা নিয়ে বলে, “ঘুম মারাইয়ো না, এই দু’দিন বহুত ঘুম দিছ।”
নাজহা দুহাতে তৌসিরের গলা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। তার উন্মুক্ত গ্রীবায় আলতো করে কয়েকটি চুমু এঁকে দিয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠে সে। ঘরের জমাট বাঁধা গুমোট পরিবেশটা মুহূর্তেই এক উষ্ণ আর প্রেমময় আবহে মিলিয়ে যায়।

রাতের নিস্তব্ধতা চিরে ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘর ছুঁইছুঁই করছে। সুবিশাল এই পাটোয়ারী বাড়িটায় আজ শূন্যতা বিরাজ করছে। সিতুজা, ইব্রাহিম কেউই নেই বাড়িতে, সবাই গ্রামের বাড়িতে। আয়রাদও সেই যে সকালে কাজের সন্ধানে বেরিয়েছে, এখনো ফেরেনি হয়তো কাল সকালে ফিরবে। এই ফাঁকা বাড়িতে তৃষ্ণা আজ বড্ড একা। তার ওপর শরীরটা আজ একেবারেই বিদ্রোহ করেছে। জ্বর আর ক্লান্তিতে শরীরটা এমন ভেঙে এসেছে যে, ভালো করে রান্না করার শক্তিটুকুও সে পায়নি। কোনোমতে এক মুঠো ভাত ফুটিয়ে, পুরোনো তরকারিটা গরম করেই সে নিস্তার খুঁজেছে। এখন ঠাণ্ডা মেঝেতে একটা পাটি বিছিয়ে নিথর হয়ে পড়ে আছে। কালবৈশাখীর ঝাপটায় উপড়ে পড়া কোনো দুর্বল লতার মতো সে মাটিতে মিশে আছে, ওঠার সামান্যতম শক্তিটুকুও তার অবশিষ্ট নেই।

ওয়াসেমের আজ কোনোভাবেই বাড়ি ফেরার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু বারবার মনে পড়ছিল, বাড়িতে আজ কেউ নেই, মেয়েটা একা। সেই অদেখা টানেই তাকে ফিরতে হয়। ঘরে পা রেখেই তার চোখ আটকে যায় মেঝের দিকে। তৃষ্ণার নিথরপ্রায় শরীরটা দেখেই তার বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে, তবে সে তা প্রকাশ করে না। পায়ের শব্দ পেয়েই তৃষ্ণা ধড়ফড় করে উঠে বসার চেষ্টা করে। তার বিধ্বস্ত রূপ দেখে ওয়াসেমের ভেতরের রাগ আর চাপা কষ্টটা রূঢ়তা হয়ে বেরিয়ে আসে। পকেট থেকে একটা ওষুধের প্যাকেট বের করে সজোরে ছুঁড়ে মারে তৃষ্ণার দিকে। কণ্ঠস্বর তার বরাবরের মতোই কর্কশ, “এই নে শালি, জানোয়ার! ওষুধ খা! খেয়ে বাঁচ। মরে গিয়ে ওপারে গিয়ে আবার বলিস না যে আমি মেরে ফেলেছি! তুই আমার বাড়ির কাজের লোক, তাই এনে দিলাম। ভাবিস না আবার তোর সাথে পিরিত চাদা**ছি!”

কথাগুলো তীরের মতো বিঁধলেও তৃষ্ণা এখন এসবে অভ্যস্ত। ওয়াসেম হয়তো ওষুধটা ভালোভাবেই দিতে চেয়েছিল, কিন্তু তৃষ্ণার করা কোনো এক পুরোনো অবহেলার প্রতিশোধ নিতেই সে নিজের এই নিষ্ঠুর মুখোশটা পরে নেয়। ওষুধের প্যাকেটটা কাঁপা হাতে কুড়িয়ে নিতে নিতে তৃষ্ণা ক্ষীণ, দুর্বল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, “খাবার এনে দেব?”
ওয়াসেম কোনো উত্তর দেয় না। সে সোজা তৃষ্ণার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে। তার স্থির, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আটকে থাকে মেয়েটার ফ্যাকাসে মুখের ওপর। তৃষ্ণার লালচে, ভেজা চোখদুটো তার অতি দুর্বলতা আর অসহায়ত্বের সাক্ষী দিচ্ছে। বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে, মন ভরে তৃষ্ণাকে দেখে নেওয়ার পর ওয়াসেম শান্ত কিন্তু গুরুগম্ভীর গলায় প্রশ্ন করে, “আমি খেয়ে এসেছি। তুই কিছু খেয়েছিস?”
তৃষ্ণা এখনো এক দানা খাবারও মুখে তোলেনি। কিন্তু সে জানে, শরীর খারাপের অজুহাতে না খাওয়ার কথা বললে ওয়াসেম রেগে গিয়ে হয়তো গায়ে হাত তুলবে। সেই ভয়ে সে চোখ নামিয়ে বাধ্য হয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়, “হ্যাঁ, খেয়েছি।”

মুহূর্তেই ওয়াসেমের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। চাপা ঠান্ডা গলায় সে হিসহিস করে ওঠে, “তাহলে ভাতের পাত্রে ভাত কানায় কানায় পূর্ণ কেন? তুই আমাকে মিথ্যা বলা শেখাচ্ছিস? কুত্তার বাচ্চা ভাতের লোভেই তো এই বাড়িতে কুকুরের মতো পড়ে আছিস, তাহলে সেই ভাত খেলি না কেন?”
তৃষ্ণা কোনো প্রতিবাদ করে না। মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে থাকে। সে জানে, এখন একটি কথাও বললে ওয়াসেমের রাগ আগুনের মতো জ্বলে উঠবে, জুটবে ওর কপালে অকথ্য গালিগালাজ। তৃষ্ণাকে এভাবে নিঃশব্দে মাথা নিচু করে থাকতে দেখে ওয়াসেমের ভেতরের রাগটা হঠাৎ করেই নিভে যায়। সে হাত বাড়িয়ে আলতো করে ওর কপাল আর গলা ছুঁয়ে দেখে। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে মেয়েটার!
ওয়াসেম তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর স্বরে বলে, “আমি ভাত এনে দিচ্ছি। চুপচাপ খেয়ে ওষুধ খাবি।”
তৃষ্ণা হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকায়। ওয়াসেম তাকে নিজের হাতে খাবার এনে দেবে? কী অবিশ্বাস্য ব্যাপার! তৃষ্ণার এমন অবাক চাহনি দেখে ওয়াসেম নিজের দুর্বলতা ঢাকতে নাকমুখ কুঁচকে বলে ওঠে, “এভাবে তাকানোর কিছু নেই। আমি শুধু তোর ওপর দয়া করছি, দয়া!”
এই বলে সে নিচে চলে যায়। একটু পরেই খাবারের প্লেট হাতে ফিরে আসে। তৃষ্ণা আগের মতোই জড়সড় হয়ে বসে আছে। ওয়াসেম সামনে বসতেই তৃষ্ণা তার কাঁপা কাঁপা হাতদুটো বাড়িয়ে দেয় প্লেটটা নেওয়ার জন্য।ওয়াসেম সাথে সাথে ধমকে ওঠে, “হাত নিজের কাছে রাখ! তোর এই কাঁপা হাতে আমার বাড়ির প্লেট ধরলে তো হাত ফসকে ভেঙেই যাবে। আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”

তৃষ্ণা বিস্ময়ের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যায়। আজ কী হয়েছে তার? যে মানুষটা একটু আগে তাকে জানোয়ার বলে গালি দিল, সে এখন নিজের হাতে খাইয়ে দেবে? কাঁপা কাঁপা দৃষ্টিতে তাকিয়ে তৃষ্ণা বলে, “আপনার হাত তো নোংরা হয়ে যাবে। আমি খেতে পারব, প্লেট ভাঙব না।”
ওয়াসেম এক লোকমা ভাত তৃষ্ণার মুখের সামনে তুলে ধরে কঠোর গলায় আদেশ দেয়, “চুপচাপ গেল। এত কথা বলিস, বিরক্ত লাগছে!”
তৃষ্ণা ‘বিসমিল্লাহ’ বলে খাবারটা মুখে পুরে নেয়। ওয়াসেম নিজে হাতে তাকে খাইয়ে দিচ্ছে এমন মুহূর্ত হয়তো যেকোনো স্ত্রীর কাছেই পরম আরাধ্য, কিন্তু তৃষ্ণা বিন্দুমাত্র খুশি নয়। যেদিন থেকে ওয়াসেম ওই অচেনা মেয়েটিকে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছিল, সেদিন থেকেই তৃষ্ণার মনের ভেতর ওয়াসেমের জন্য এক পাহাড়সম ঘৃণা জমা হয়ে আছে। প্রচণ্ড থেকে প্রচণ্ডতর ঘৃণা।
খাইয়ে দিতে দিতেই ওয়াসেম খুব সাবধানে জিজ্ঞেস করে, “আয়রাদ কি একেবারেই চলে গেছে?”
তৃষ্ণা মুখ তুলে শান্ত গলায় বলে, “আমি জানি না।”
ওয়াসেম হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলে, “যাক, জানিস না ভালোই হয়েছে। নইলে এতক্ষণে তুই মৃত হয়ে যেতিস।”

তৃষ্ণা এবার এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। তার শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে বলে, “মৃত্যুও আমাকে ঘৃণা করে, তাই সেও আমার কাছে আসছে না। এলে তো ভালোই হতো, তাই না?”
কথাগুলো শুনে ওয়াসেম একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায়। তার বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে ওঠে। তৃষ্ণার এই কথাগুলো হুবহু তার দেখা আগের দুঃস্বপ্নের মতো শোনাচ্ছে। তবে কি সেই ভয়ংকর স্বপ্ন সত্যি হতে চলেছে? না, তা কোনোভাবেই সম্ভব হতে দেওয়া যাবে না। ওয়াসেম এবার আর কোনো জবাব দেয় না। সে নীরবে তৃষ্ণাকে খাইয়ে দিতে থাকে। সে জানে, এখন কথা বাড়ালেই বিপদ। তৃষ্ণার কিচ্ছু না হোক, সে এভাবেই তার চোখের সামনে থাকুক। চোখের শান্তির জন্য হলেও মেয়েটা বেঁচে থাকুক। ওয়াসেমের নিজস্ব একবিন্দু চাক্ষুষ শান্তির জন্য হলেও সে দৃষ্টিসীমায় থাকুক। সে শুধু বেঁচে থাকুক তার সমস্ত অস্তিত্ব নিয়ে। ওয়াসেমের জীবনের একমাত্র প্রশান্তি, তার বুকের খাঁচার ছোট্ট সুখপাখিটা শুধু বেঁচে থাকুক।

পরের দিন
আজ অফিস থেকে একটু আগেই ফিরেছে ধ্রুব। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে শোবার ঘরের দরজাটা খুলতেই তার পা জোড়া মেঝের সাথে আটকে যায়। দৃষ্টি স্থির হয়ে যায় সামনের দৃশ্যটিতে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইকরা, কোথাও বেরোনোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে সে। ইকরা বাইরে যাবে, তাতে ধ্রুবের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা বা আপত্তি নেই। কিন্তু ওর পরনের পোশাকটা ধ্রুবের কপালের ভাঁজ এক নিমিষেই গভীর করে তোলে। ইকরা পরেছে একটা কুচকুচে কালো রঙের ক্রপ টপ, আর তার ওপরে বোতাম-খোলা অবস্থায় আলগা করে চাপানো একটা ওভারসাইজড চেক শার্ট। নিচে ঢিলেঢালা কালো কার্গো প্যান্ট আর পায়ে ধবধবে সাদা অ্যাডিডাসের স্নিকার্স। লুকটা একদমই ক্যাজুয়াল, বড্ড সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ আর ছন্নছাড়া সাজেই ইকরাকে কেন আজ অস্বাভাবিক রকমের আকর্ষণীয় লাগছে! এক অদ্ভুত বুনো সৌন্দর্য ঠিকরে বেরোচ্ছে ওর থেকে। ধ্রুব চাইলেও ওর দিক থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারছে না।

তার ওপর ইকরার ফেস-ফ্রেমিং লেয়ারস করে কাটা কালো চুলগুলো আজ খোলা। ঘাড় আর কাঁধ ছুঁয়ে থাকা অবাধ্য চুলগুলো ওর তীক্ষ্ণ চোয়ালের দু’পাশ দিয়ে আলতো করে নেমে এসেছে। ইকরার গায়ের রঙটা একটু চাপা বা শ্যামবর্ণ হতে পারে, কিন্তু ওর মুখের নিখুঁত গড়ন আর চোখের সৌন্দর্য যেকোনো মানুষকে থমকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আজ খোলা চুলে ওর সেই মায়াবী চেহারাটা যেন আরও কয়েক গুণ বেশি মোহনীয় হয়ে উঠেছে।
ধ্রুব এমনিতে নিজের কাঠিন্যের আড়ালে ইকরাকে সবসময় দূরে সরিয়ে রাখে। কথায় কথায় ওকে অবজ্ঞা করা, রূঢ় কথা শোনানো এসবই তার নিত্যদিনের অভ্যাস। কিন্তু মনের গহীনের নিরেট সত্যটা হলো, মাঝেমধ্যেই ইকরার দিকে তাকিয়ে সে এভাবেই বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। সম্মোহিতের মতো আটকে থাকে তার চোখ। আজও তার সেই ধ্রুপদী কাঠিন্য ইকরার এই সাদামাটা লুকের কাছে হার মানতে বসেছে।
অন্যদিকে, ইকরা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে ধ্রুব ঘরে ঢুকেছে এবং একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু সে ধ্রুবকে দেখেও না দেখার ভান করে যায় নিখুঁত নিপুণতায়। আয়নার সামনে থেকে সরে এসে বিছানায় পড়ে থাকা নিজের কালো রঙের ওয়াইএসএল শোল্ডার ব্যাগটা এক হাতে তুলে নেয় সে। তারপর সাবলীল ভঙ্গিতে সেটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে, ধ্রুবের উপস্থিতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দরজার দিকে পা বাড়ায়। ইকরার এই অবহেলা আর পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার ভঙ্গিটা ধ্রুবের ভেতরে অস্থিরতা তৈরি করে। ইকরা তাকে এভাবে এড়িয়ে চোখের সামনে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। ঠিক যখন ইকরা দরজা পেরিয়ে যাবে, তখনই ধ্রুবের গলা চিরে বেরিয়ে আসে একটা গম্ভীর, ভারী আর অধিকার খাটানো স্বর।

‘ইকরা, দাঁড়া!’
ধ্রুবের ডাক শুনে ইকরার পা জোড়া থেমে যায়। তবে সে পেছন ঘোরে না। স্থির দাঁড়িয়েই নিস্পৃহ কণ্ঠে বলে, “দাড়ালাম।”
ধ্রুব কয়েক কদম এগিয়ে এসে একেবারে ইকরার মুখোমুখি দাঁড়ায়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ওকে পরখ করে প্রশ্ন করে, “তুই এখন বাইরে কি জন্য যাচ্ছিস?”
ইকরা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বিরক্তি লুকিয়ে ছোট করে জবাব দেয়, “একটা কাজে যাচ্ছি।”
“এভাবে যাওয়ার কি।”
“কিভাবে?”
ধ্রুব হাত নেড়ে ওর পোশাকের দিকে ইঙ্গিত করে বলে, “এই এসব পড়ে এই দেখ ক্রপ টপটা দেখা যাচ্ছে শার্টের বোতাম লাগা। চুলগুলো বাধ।”

ইকরা নিজের দিকে একবার তাকায়। তারপর সরাসরি ধ্রুবের চোখে চোখ রাখে। কিছুটা ব্যঙ্গ মিশিয়ে বলে, “আপনি তো হাইক্লাস মানুষ আপনি কেন এই থার্ডক্লাশের এসব দেখছেন পেট পিট দেখা যাচ্ছে না এভাবেই আপনি আমার বিষয়ে হস্তক্ষেপ কেন করছেন।”
ধ্রুব রাগে দাঁত চেপে ধরে। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে বলে, “হস্তক্ষেপ করছি না বলছি সুন্দর করে যা নিজের ফিগার সুন্দর বলে সেটা এত প্রদর্শন করতে হবে না যা এটা বদলিয়ে আর কিছু পড়!’
কথাটা শুনে ইকরা জ্বলে ওঠে। রাগে ফেটে পড়ে বলে, “তুমি কে? কে তুমি আমার যা ইচ্ছে পড়ব যেমন ইচ্ছে চলব আমার আর তোমার কোনো সম্পর্ক নেই সেটি তুমি নিজে বলেছো তাহলে এখন আমার বিষয়ে হস্তক্ষেপ কেন করছো?”

এটুকু বলেই ইকরা ধ্রুবের পাশ কাটিয়ে চলে যেতে উদ্যত হয়। কিন্তু ধ্রুব ওকে যেতে দেয় না। শক্ত করে ওর হাত চেপে ধরে বলে, “তুই যাবি না মানে যাবি না”
বলেই ধ্রুব ঠাস করে দরজাটা লাগিয়ে দেয়। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কঠিন গলায় বলে, “আমি দেখি তুই কি করে যাস!”
ইকরা রাগে ফুঁসতে থাকে। সজোরে ধ্রুবকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, “সাউয়া সাওয়ার করিও না আমার মিটিং আছে!”
ধ্রুব একটুও না দমে উত্তর দেয়, “মিটিং আছে তো যাবি তবে এভাবে যাবি না”
“আমি যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে যাব তুমি কে এসব বলার?”
ধ্রুবর চোখেমুখে এখন এক আদিম জেদ। ইকরার অবাধ্যতা তার ভেতরের ক্রোধকে আরও উসকে দিচ্ছে । আচমকা ইকরার হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে সে। হ্যাঁচকা টানে তাকে বিছানায় ছুড়ে ফেলে তার ওপর ঝুঁকে পড়ে। বিছানায় পড়ে থাকা ওড়নাটা টেনে নিয়ে ইকরার দুই হাত এক করে বাঁধতে বাঁধতে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “এবার যা দেখি, কীভাবে যাস!”
ইকরার ভেতরেও এখন জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি। রাগে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সে ধ্রুবর মুখে থুতু ছিটিয়ে দেয়। তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার করে ওঠে, “ছাড়ো আমায়! আমি এভাবেই যাব। আর আমার পোশাক নিয়ে তুমি এত মাথা ঘামানোর কে?”

থুতুমাখা মুখটা নিজের শার্টের হাতা দিয়ে চরম বিরক্তি নিয়ে মুছে নেয় ধ্রুব। তার গলার স্বর এখন আরও শীতল, আরও ভয়ংকর, “তুই যাবি না। মানে যাবি না, ব্যাস! কথা এখানেই শেষ।”
নিজের বাঁধা হাত দুটো প্রাণপণ ছাড়ানোর চেষ্টায় ছটফট করতে থাকে ইকরা। রাগে তার চোখমুখ লাল হয়ে ওঠে, গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে, “আমার ওপর থেকে নিজের হাতির মতো শরীর নিয়ে সর বলছি শালা জানোয়ার! নয়তো সাউয়া ফাইরা নিমু খা-***!”
গালিটা শেষ হওয়ার আগেই সশব্দে একটা চড় আছড়ে পড়ে ইকরার গালে। ধ্রুব তার এক হাতের শক্ত মুঠোয় ইকরার গালটা চেপে ধরে হিসহিস করে ওঠে, “তুই আমার বউ! তিন কবুল পড়ে, কাবিন করে বিয়ে করেছি তোকে। তোর বিষয়ে আমি মাথা ঘামাব না তো তোর ওই অফিসের ক্লায়েন্ট ঘামাবে?”

থাপ্পড়ের আকস্মিকতায় ইকরা দমে যায় না, বরং তার ভেতরের বারুদ যেন আরও জ্বলে ওঠে। বাঘিনীর মতো গর্জে উঠে সে বলে, “আমার হাত ছাড়, কাপুরুষের কাপুরুষ! তুই কে? বউ মানিস না, আবার অধিকার ফলাতে আসিস সাউয়া চুদা***ও? তোকে মানি না আমি আমার সাউয়ার জামাই! ছাড়, সর আমার ওপর থেকে, সর!”
ক্ষোভে, অপমানে ইকরার শরীর তখন কাঁপছে। ক্রমাগত ছটফট করতে থাকা ইকরাকে একটু শান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টায় ধ্রুব তার গলার কাছে লেপ্টে থাকা এলোমেলো চুলগুলো সরিয়ে একপাশে গুঁজে দেয়। গলার স্বরটা এবার কিছুটা খাদে নামিয়ে বলে, “ইকরা, আমরা যৌথ পরিবারে থাকি। এভাবে চললে হবে না, তুই একটু বোঝার চেষ্টা কর।”
ইকরার দৃষ্টিতে তখনো তীব্র ঘৃণা। ধ্রুবর চোখে চোখ রেখেই সে দাঁত কিড়মিড় করে বলে ওঠে, “অন্য কারও কোনো সমস্যা নেই, সব সমস্যা তোমার! সেটা তুমি স্বীকার করো।”
“হ্যাঁ, সব সমস্যা আমার!আমি শুধু তোকে এই পোশাকে দেখব, বাইরের মানুষ না।”
“কে তুমি? আমার কে?”

“আমি তোর হাসবেন্ড, বুঝলি? তোর সাথে জোরজবরদস্তি করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই, তাই চুপচাপ মেনে নে।”
ইকরাও সমান তেজে ফুঁসে ওঠে, “না, মানব না! কিছুতেই মানতে পারলাম না!”
ইকরার এই লাগামছাড়া তেজ ধ্রুবর ভেতরের পুরুষালি অহংকারকে আঘাত করে। রাগে ফুঁসতে থাকা ইকরার উন্মুক্ত গ্রীবার দিকে তার দৃষ্টি আটকে যায়। সে চায় না এতটা কাছাকাছি যেতে, কিন্তু এক আদিম, অজানা আকর্ষণ যেন তাকে চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যায় ইকরার দিকে। ধ্রুবকে ঝুঁকতে দেখে ইকরা আতঙ্কে আর ক্ষোভে চিৎকার করে ওঠে, “যদি আমার শরীরে টাচ করিস, তাহলে খবর করে দেব জানোয়ার! শালা সর আমার কাছ থেকে!”
ইকরার কোনো চিৎকারই ধ্রুবর কানে পৌঁছায় না। সমস্ত বাধা উপেক্ষা করে সে নিজের উষ্ণ ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় ইকরার গলায়। হাত বাঁধা অবস্থাতেই প্রাণপণে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে শুরু করে ইকরা, “ছাড় বলছি! ছাড়! আমাকে ছুঁলে ফাইরা নিমু!”

ধ্রুবর উন্মাদনা এখন চরমে। ইকরার কোনো বাধাই সে ভ্রূক্ষেপ করে না। দুই হাতে তার কোমর শক্ত করে চেপে ধরে গলায় একের পর এক চুমু আঁকতে থাকে সে। পরিস্থিতি যখন আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, ধ্রুব যখন ইকরার শার্টটা খুলে নেওয়ার উপক্রম করেছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই ইকরার ব্যাগে রাখা ফোনটা বেজে ওঠে:
বেলতলী সুলেমান ল্যাংটা,
দোহাই ল্যাংটা, দোহাই ল্যাংটা।
কাঁটা কেলা, কাঁটা কেলা,
কেলায় করি “আল্লাহ, আল্লাহ”।
গনি শাহ আর কান্দু শাহ,
ভঙ্গ করে তোমার আশা।
রাহাত আলি শাহ, সোবহান শাহ
তুমি ভঙ্গ কর মুশকিল, আহসান।
গুলিস্তানে গোলাপ শাহ বাবা,
চরণধূলি আমায় দিও।
ফতুল্লাতে ফতেহ আলি,
তব নামে প্রদীপ জ্বালি।
মিরপুরেতে শাহ আলী,
তব নামে প্রদীপ জ্বালি।
জেলখানাতে রয় মাকুর শাহ,
পুরাও মনের আশা।

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪১

বেজে ওঠা সেই রিংটোনের শব্দে মুহূর্তেই পরিবেশের দমবন্ধ করা আবহাওয়াটা কেটে যায়।
আকস্মিক এই শব্দে ঘোর কাটে ধ্রুবর। চমকে উঠে ইকরার দিকে বড় বড় চোখে তাকায় সে। রিংটোনের ধরন শুনে বিরক্তি আর বিস্ময় নিয়ে বলে ওঠে, “তুই এসব টোন লাগিয়ে মিটিংয়ে যাচ্ছিস? মানুষ শুনলে কী মনে করবে?”
ইকরা তখনো রাগে আর অপমানে হাঁপাচ্ছে। শরীর থেকে ধ্রুবর ভার সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে গর্জে উঠে বলে, “যার যা ইচ্ছে মনে করুক! ফোন সবসময় সাইলেন্ট থাকে আমার। এবার আমার ওপর থেকে সরো! ব্যথা করছে। এতক্ষণ ধরে বসে আছ, আর কত?”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৪৩