Home মেঘের ওপারে আলো মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৭

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৭

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৭
Tahmina Akhter

রিনির চোখ স্থির হয়ে আছে খাতার পাতায়। একের পর এক শব্দ তার চোখের সামনে ভাসছে। কিন্তু মস্তিষ্ক যেন সেগুলো গ্রহণ করতে পারছে না।
“I Love You, ডাক্তার সাহেব…”
শেষ লাইনটাতে এসে রিনির আঙুল কেঁপে উঠল। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল তার।
— “এইসব কি…! আপনি… আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলেন?”
রিনির কণ্ঠে কড়া শোনালেও রিনির মনের ভেতরে ভয় স্পষ্ট। আলো কোনো উত্তর দিল না।
আলোর নীরবতাই যেন সবচেয়ে ভয়ংকর উত্তর। রিনি হঠাৎ রাগে খাতাটা বন্ধ করে চোখ তুলে তাকালো আলোর দিকে। তার দৃষ্টি আর আগের মতো নরম নেই। বরং ভয়, রাগ আর অবিশ্বাস মিশে গেছে তাতে।
রিনি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে এসে আলোর সামনে বসে পড়ল।

— “আপনি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছিলেন…?”
আলো চোখ তুলল না। তবে খুব নিচু স্বরে বলল,,
— “সব শেষ হয়ে গেলে… বেঁচে থেকে কি করব?
আলো মাথা নিচু করে বসে আছে। তার কাঁধ কাঁপছে হালকা হালকা। হয়তো কান্না আঁটকে রাখার ফল!
— তাই বলে আপনি আত্মহত্যা করতে চাইবেন? সব শেষ হয়ে গেছে বলে এই সিদ্ধান্তটা আপনি কিভাবে নেয়ার চিন্তা করলেন?
আলো ক্লান্ত। ভাবছে রিনির এই প্রশ্নের জবাব কিভাবে দেয়া যায়? তবুও যে উত্তর দিতে হবে।

— “আমি যা দেখেছি সেটাই তো সত্যি ধরে নিয়েছিলাম।
আলোর কথা শুনে রিনি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল। মানে চোখের দেখা কি সব? যাচাই করবে না চোখে দেখার আড়ালে অন্য ঘটনা লুকিয়ে আছে কিনা?
— “আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন? একটা মানুষকে ভালোবাসেন বলে নিজের জীবন শেষ করে দিতে চান? এটা ভালোবাসা না, এটা দুর্বলতা!”
রিনি ভিষণ রেগে গিয়ে বলল কথাগুলো।
আলো মাথা তুলে তাকাল এবার। চোখ দুটো লালচে ভাব কমছে না। এখন তো আলোর চোখে শূন্যতার বিস্তার দেখা মিলছে।

— “দুর্বলতা…?”
ধীরে ধীরে নিজেই নিজেকে বলল আলো। তারপর, রিনির দিকে ফিরে বলল,
— “ভালোবাসা যদি দুর্বলতা হয়… তাহলে আমি দুর্বলই ভালো।”
রিনি থমকে গেল। এই উত্তরটা সে আশা করেনি। দু’জনেই চুপ করে রইল। তারপর রিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আলোর সামনে বসে পড়ল। খাতাটা পাশে রেখে আলোর দুই কাঁধ ধরে বলল,
— আপনি শক্ত মনের মানুষ… তাই না?
রিনির প্রশ্নটা অদ্ভুত শোনালো আলোর কাছে। আলো হালকা হেসে ফেলল। একটা তিক্ত, ভাঙা হাসি।
— “ছিলাম হয়তো…”
— “আবার হোন।”
একদম সোজা গলায় বলল রিনি। ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর রিনি উঠে দাঁড়াল।
— “ফ্রেশ হয়ে নিন। শরীরটা খুব দুর্বল লাগছে আপনার।”
কিছুদূর গিয়ে আবার থামল। পেছনে না তাকিয়েই বলল,
— “তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নিলে… নিজেরই বেশি ক্ষতি হয়।”
কথাগুলো শেষ করে বারান্দার দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে। আলো স্থির হয়ে বসে আছে এখনও। হাতের খাতাটার দিকে তাকিয়ে। পাতা খুলল ধীরে। নিজের লেখা শব্দগুলো চোখে পড়তেই বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল।
“বিদায়…”
শব্দটার ওপর আঙুল রেখে থেমে গেল সে।

— “সত্যিই কি… বিদায়?”
নিজের কাছেই প্রশ্ন করল। কোনো উত্তর এলো না। শুধু বুকের ভেতরে চাপা একটা ব্যথা অনুভব করল। আলো ধীরে ধীরে খাতাটা বন্ধ করল। তারপর মাথা তুলে আয়নার দিকে তাকাল।
— এই আমি কি করতে যাচ্ছিলাম! এত বড় ভুলের কি মাফ পাওয়া যাবে? আজ যদি রিনি না আসত তবে তার পরিণতি কি হতো? এতক্ষণে নিশ্চয়ই সে নিজেকে শেষ করে ফেলত। পুলিশ আসত? ইনভেস্টিগেশন হতো? বাংলাদেশে থাকা তার মায়ের কানে এমন ভয়ংকর খবর গেলে তার মা কিভাবে সহ্য করতো?
ডাক্তার সাহেব কি করতো? এত এত ভুল কেন সে করে? যার জীবনের ক্যারিয়ারে কোনো দাগ নেই। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে কেন এত এত ভুল ঠাঁই পেয়েছে? সবই কি তার নিজ হাতে গড়া নয়তো? অবশ্যই তার নিজ হাতে গড়া এসব কিছু।
আলো যখন নিজেকে নিয়ে বোঝাপড়া করতে ব্যস্ত ঠিক তখনই রিনির ফোনটা বেজে উঠল। বারান্দার টেবিলের ওপর রাখা ফোনের স্ক্রিনে আলো জ্বলে উঠেছে। রিনি ফোনটার দিকে তাকাল। স্ক্রিনে ভেসে উঠছে

“কাব্য ভাই কলিং…”
রিনির ভ্রু কুঁচকে গেল।
— “এই সময়ে…?”
নিজের কাছেই বিড়বিড় করল সে। ফোনটা রিসিভ করল।
— “হ্যালো, কাব্য ভাই?”
ওপাশ থেকে কোনো ভণিতা ছাড়াই তাড়াহুড়ো ভরা কণ্ঠে কাব্য বলল,
— “রিনি! মেঘালয় কি বাসায় আছে?”
রিনি একটু চমকে উঠল।
— “না… কিছুক্ষণ আগেই বের হয়েছে।”
এক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর কাব্যের গলা আরও ভারী হয়ে এলো,
— “ও কোথায় গেছে জানো?”
— “না… কিছু বলেনি। কি হয়েছে, ভাইয়া?”
রিনির চোখেমুখে এখন স্পষ্ট দুশ্চিন্তার দেখা মিলল। মোবাইলের ওপাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।
— “আমি একটা কাজ করে ফেলেছি রিনি…”
রিনি বুঝতে পারল কাব্য কোন কাজের কথা বলছে।

— আলো… আজ লন্ডনে আসবে। এই ব্যাপারটা আমি মেঘালয়কে বলিনি। আমি বলেছি আমার স্টুডেন্ট যাচ্ছে। ওকে আমি বারবার বলেছি ও যেন এয়্যারপোর্টে গিয়ে আমার স্টুডেন্টকে রিসিভ করে। সকালে কল করলাম মেঘালয়ের কাছে কিন্তু মেঘালয় কল রিসিভ করে আমাকে বলল যে, আরহামকে এয়ারপোর্টে পাঠিয়েছে। অথচ, আমি চেয়েছিলাম এত বছর পর ওদের খুব সুন্দর একটা পূর্ণমিলনী হোক। কিন্তু, মেঘালয় তো…।
এতটুকু বলেই কাব্য দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর, বলল
—সবসময় একরোখা আর নিজের জেদটাকে প্রশ্রয় দিয়ে গেছে। আলোর সঙ্গে আমি কোনোভাবে যোগাযোগ করতে পারছি না। আদৌও কি আরহাম আলোকে রিসিভ করতে গিয়েছিল কি-না? আমার তো এখন দুশ্চিন্তা হচ্ছে।
মেয়েটার বিদেশবিভুঁইয়ে কে আছে, বলো তো রিনি? যাকে বিশ্বাস করে মেয়েটার নিরাপত্তার দায়ভার চাপিয়ে দিতে চাইলাম সে কিনা?
কাব্য’র কথাগুলো শেষ হবার পর রিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে নীচু গলায় বলল,

— ভাইয়া আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। আরহাম আলো ভাবিকে নিয়ে বাড়িতে ফিরেছে।
রিনি মুখ থেকে শোনা দুটো বাক্য যেন কাব্যকে সাত আসমানে নিয়ে গেছে। খুশির চোটে বেচারার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। কাঁপা কন্ঠস্বরে রিনিকে জিজ্ঞেস করল,
— মেঘালয় কি বলল আলোকে দেখে? আলো নিশ্চয়ই আমাকে মনে মনে বকাবকি করছে। এই রিনি? পাগল দুটো এখন কি করছে?
— পাগল দুটো আগের মতই আছে ভাইয়া। পাগল দুটোকে সামলাতে গিয়ে আজ আমার শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া ক্যান্সেল হলো।
রিনির কাছ থেকে এসব শুনে কাব্য অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ধীরে ধীরে সবটা কাব্যকে খুলে বলল রিনি। মেঘালয় কি করেছে এবং কি বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে? আর বোকা আলো যে রিনির সঙ্গে মেঘালয়কে জড়িয়ে উলটাপালটা ভেবে সুইসাইড করার চিন্তা করেছে সেটাও বলল। সবটা শোনার পর কাব্য রিনিকে বলল,
— কিন্তু আমি বুঝিনি… ওরা এতটা ভেঙে পড়বে। এভাবে রিয়্যাক্ট করবে।
কাব্যর কন্ঠে স্পষ্ট অনুশোচনা। রিনি ধীরে চেয়ারে বসে পড়ল। কাব্য বলল,

— “মেঘালয় আসলে কি চাইছে কে জানে?”
— “না বললে কিভাবে বুঝব ; বলুন তো ভাইয়া? ”
কথাটি বলার সময় রিনির বুকের ভেতরটা কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল। অজানা আশংকায় তার পুরো শরীর কাটাঁ দিয়ে উঠছে। আচমকা রিনি কাব্যকে প্রশ্ন করলো,
— আচ্ছা ভাইয়া আপনি কি মনে করেন… ও ঠিক আছে?
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপ। তারপর ধীরে উত্তর এলো,
— “আমি জানি না…”
এই ‘জানি না’ কথাটা যেন আরও ভয়ংকর। রিনি ঠোঁট কামড়ে ধরল।
— “আমি… আমি খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছি।”
— “প্লিজ রিনি, যদি ওর কোনো খবর পাও… আমাকে জানিও। তুমি আলোর দিকে খেয়াল রেখো। আর ওই গাধাটাকে গাধামি করতে দাও। এ্যাহ্ আট বছর পর বউ ফিরে এসেছে কই মান-অভিমান ভুলে এক হবে তা না টিনএজ বাচ্চার মতো ন্যাকামি করছে। আমি দেখি মাশফি ভাইয়ার সঙ্গে কথা বলে কিছু করতে পারি কিনা?
রিনি স্থির হয়ে গেল। চোখের সামনে কয়েক মিনিট আগের ঘটনাগুলো ভেসে উঠছে। তবুও ধীরে ধীরে বলল,

— “আচ্ছা…”
কলটা কেটে গেল রিনি ধীরে ফোনটা কান থেকে নামাল। তার মাথার ভেতর একটা কথাই ঘুরছে
—মেঘালয় এখন কোথায়…?
ঠিক তখনই পেছন থেকে খুব ধীরে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো
— “কি হয়েছে?”
রিনি চমকে ঘুরে তাকাল।
দেখল, আলো দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। চোখদুটো শান্ত… কিন্তু চোখের ভেতরে প্রশ্নে ভরা। রিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। সে কি সব বলবে?
নাকি কিছু লুকাবে…? রিনি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। মেঘালয়ের কথা মনে পড়ল হঠাৎ।
“খবরদার, আলোকে কিন্তু কিছুই বলবে না। আমার কথা জানতে চাইলে বলবে, আমি বাড়িতে নেই…”
রিনির ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
সে কি সত্যিটা বলবে…? নাকি? একটু চোখ নামিয়ে নিল সে। তারপর খুব স্বাভাবিক গলায় বলল

— “কিছু না… কাব্য ভাইয়া কল করেছিল। তোমার কথা জানতে চাইল”
আলো স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
— “কাব্য স্যার?”
আলো আর কিছু বলল না।
আলো ধীরে এগিয়ে এসে বিছানায় বসল।
— “ডাক্তার সাহেব… কোথায় আছে?”
প্রশ্নটা আসতেই রিনির বুক ধক করে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো সব বলে দেবে। কিন্তু, মেঘালয়ের মুখটা ভেসে উঠল। তার সেই অসহায় কণ্ঠ
–“বলবে, আমি বাড়িতে নেই…”
রিনি ঠোঁট চেপে ধরল। তারপর ধীরে মাথা নাড়িয়ে বলল,
— “না… সে বাসায় নেই।”
আলো চুপ করে রইল। তার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে নিজের শাড়ির আঁচলের কোণা মুচড়ে ধরছে।
— “কোথায় গেছে…?”
রিনির গলা শুকিয়ে গেল। তবুও নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল,

— “জানি না। কিছু না বলেই বের হয়েছে।”
আলো মাথা নিচু করল। চোখের পাতা কাঁপছে হালকা।
— “ওহ…”
একটা ছোট্ট শব্দ। কিন্তু তাতে কেমন একটা ভাঙা অনুভূতি লুকিয়ে আছে।
রিনি তাকিয়ে রইল তার দিকে।
মনের ভেতরটা কেমন অস্বস্তি করছে।
সে জানে, সে মিথ্যে বলছে। কিন্তু এই মিথ্যেটা কার জন্য? মেঘালয়ের জন্য?
নাকি… এই মেয়েটার জন্যই?
আলো ধীরে উঠে দাঁড়াল।
— “আমি… একটু ফ্রেশ হয়ে আসি।”
রিনি মাথা নাড়ল।
— “হ্যাঁ… যান।”
আলো আর কিছু না বলে ওয়াশরুমে চলে গেল। দরজাটা ধীরে বন্ধ হয়ে গেল তার পেছনে। রিনি একা দাঁড়িয়ে রইল।
চারপাশে নিস্তব্ধতা। তার বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আছে।
— “আমি ঠিক করলাম তো…?”
নিজের কাছেই ফিসফিস করে বলল সে।
কোনো উত্তর নেই। আছে শুধু অদৃশ্য চাপা ভয়… আর অজানা পরিণতির অপেক্ষা।

লন্ডনের রাস্তাগুলো তখন ধীরে ধীরে সন্ধ্যার অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে।
হালকা ঠান্ডা হাওয়া বইছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো একে একে জ্বলে উঠছে। গাড়ির শব্দ, মানুষের কোলাহল সবকিছু চলছে নিজের নিয়মে।
কিন্তু, এই শহরের ভিড়ের মাঝেও একা দাঁড়িয়ে আছে মেঘালয়।
রাস্তার একপাশে, একটা নির্জন পার্কের ভেতরে বসে আছে সে। হাত দুটো পকেটে ঢোকানো। মাথা নিচু। তার নিঃশ্বাস ভারী ঠেকছে নিজের কাছে। মনে হচ্ছে বুকের ভেতর জমে থাকা কিছু একটা ফেটে বের হতে চাইছে… কিন্তু পারছে না।
— “আলো…”
খুব নিচু স্বরে নামটা উচ্চারণ করল সে।
শব্দটা ঠোঁট ছাড়িয়ে বের হতেই যেন আরও ভারী হয়ে গেল চারপাশ। চোখ বন্ধ করল মেঘালয়। মুহূর্তেই ভেসে উঠল সেই দৃশ্য, “আলোকে কোলে তুলে নেওয়া,
তার নিস্তেজ শরীর, তার ভেজা চোখ”
মেঘালয়ের বুকটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।

— “আমি কেন চলে এলাম…?”
নিজের কাছেই প্রশ্ন করল সে।
— “ওর সামনে থাকলেই তো পারতাম…”
হাসল হালকা একটা তিক্ত, ব্যথা মেশানো হাসি ফুটে উঠেছে মেঘালয়ের ঠোঁটের কোণে।
— “না… পারতাম না।”
মাথা নাড়ল মেঘালয় তারপর মাথা দু’হাতে চেপে ধরল।
— “তুই কাপুরুষ, মেঘালয়! এত বছর ধরে যাকে ভালোবাসলি, আজ তাকে সামনে পেয়েও পালিয়ে গেলি?”
চোখের কোণে জমে থাকা জল এবার গড়িয়ে পড়ল। সে তা মুছল না।
— “এবার ও যদি সত্যিই আমাকে ঘৃণা করে…?”
প্রশ্নটা বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে রইল।

— “তাহলে… আমি কি করব?”
হঠাৎ পকেট থেকে ফোনটা বের করল সে।
স্ক্রিনে তাকাল কিছুক্ষণ। আলোর নাম নেই সেখানে। থাকার কথাও না। তবুও
কেন যেন মনে হচ্ছে… যদি এখন একটা কল আসে? মেঘালয় চোখ বন্ধ করল আবার। হঠাৎ ফোনটা শক্ত করে চেপে ধরল সে। তারপর নিজের সাথেই যুদ্ধ করতে করতে আবার ঢিলে করে ফেলল হাতটা।
— “না… না। ওকে আর কষ্ট দিতে পারব না আমি।”
বেঞ্চে হেলান দিয়ে চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকাল। আকাশ অন্ধকার হয়ে গেছে প্রায়। একটা তারা ঝিলমিল করছে দূরে।
আলোকে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ যেন নিজের ভেতরের সবকিছু আর ধরে রাখতে পারল না মেঘালয়। পকেট থেকে ফোনটা বের করল সে। স্ক্রিনে আঙুলটা কয়েক সেকেন্ড থেমে রইল।

“কাব্য ভাই…”
নামটার দিকে তাকিয়ে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
— “সব জানতে তুমি…”
নিজের মনে বিড়বিড় করল সে।
— “তবুও কিছু বললে না আমায়? ”
হঠাৎই কল বাটনে চাপ দিল। ট্রিং… ট্রিং…
প্রতিটা রিং যেন তার ধৈর্য আরও ক্ষয়ে দিচ্ছে। অবশেষে কাব্য কল রিসিভ করলো,
— “হ্যালো?”
ওপাশ থেকে কাব্যের স্বাভাবিক কণ্ঠ ভেসে এলো। মেঘালয় এক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর চাপা গলায় বলল,
— “তুমি জানতে… তাই না?”
কাব্য মৃদু স্বরে উল্টো জিজ্ঞেস করলো,
— “কি জানতাম?”
মেঘালয়ের চোখমুখ শক্ত হয়ে গেল।
— “আলো আজ আসবে… এটা তুমি জানতে?”
এইবার আর প্রশ্ন করার কোনো কারণ। কারণ সরাসরি অভিযোগ উঠে এসেছে। কিছুক্ষণ চুপ থাকল কাব্য। তারপর ধীরে বলল,

— “হ্যাঁ… জানতাম।”
এই স্বীকারোক্তিটা যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল। মেঘালয় হেসে উঠল, কষ্টভরা হাসি।
— “ওয়াও…!”
মাথা নিচু করল সে।
— “তুমি জানতে! তবুও আমাকে কিছু বললে না?”
— “আমি ভেবেছিলাম?”
— “কি ভেবেছিলে?”
কথার মাঝেই থামিয়ে দিল মেঘালয়।
গলার স্বর এবার একটু উঁচু হলো।
— “হঠাৎ করে ওকে আমার সামনে দাঁড় করালে সব ঠিক হয়ে যাবে?”
ওপাশের কাব্য চুপ। মেঘালয় অনর্গল বলেই যাচ্ছে।

— “তুমি জানো না! আমি কতটা কষ্টে ছিলাম এতদিন? প্রতিটা দিন, প্রতিটা রাত, আমি ভাবতাম, ও ভালো আছে তো? আমি মৃত্যুর আগে ওর মুখটা একবার দেখতে পারব তো?”
একটু থামল সে। শ্বাস নিল গভীর করে।
— “আর আজ যখন ওকে সামনে পেলাম, আমি দাঁড়াতেই পারলাম না ওর সামনে।”
ওপাশ থেকে কাব্যের দীর্ঘশ্বাস ভেসে এলো।
— “আমি ভুল করেছি, মেঘালয়। আমি চেয়েছিলাম, তোদের দু’জনের মধ্যে যা আছে তা মিটে যাক। তোরা নিজেদের আবারও গুছিয়ে রাখ ।”
মেঘালয় তিক্তভাবে হেসে উঠল।
— মিটে যাবে? কিন্তু কিভাবে?
তার গলার ভেতরে জমে থাকা ব্যথা এবার স্পষ্ট।
কিছুক্ষণ দু’জনেই চুপ। শুধু দুই প্রান্তে ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ। তারপর কাব্য ধীরে বলল,
— “সবকিছু যেমন করে ভাবছিস তেমন নাও হতে পারে।”
মেঘালয় তৎক্ষণাৎ বলল

— “প্লিজ! এই ডায়লগটা আর বলবে না।”
কাব্য এবার একটু গম্ভীর হলো।
— “তুই কি ওর সাথে কথা বলেছিস?”
কাব্য সব জানে তবুও মেঘালয়ের কাছ থেকে শুনতে চায়। কাব্যের প্রশ্ন শুনে মেঘালয় থেমে গেল। উত্তর নেই। তার নীরবতাই সব বলে দিল কাব্যকে। কাব্য ধীরে বলল
— সব সময় পালিয়ে গেলে চলবে না, মেঘালয়?
— “আমি পালাচ্ছি না… আমি শুধু ওকে বোঝাতে চাই হাত বাড়ালেই যাকে স্পর্শ করতে পারব তাকে স্পর্শ করতে না পারার কষ্ট কেমন হয়?”
আবার নীরবতা এলো। মেঘালয় চোখ তুলে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকাল। তারপর আবারও বলল,
— “এইটুকুই তো পারি… তাই না?”

সারারাত বাড়িতে ফিরল না মেঘালয়। রিনি আলোকে কিছুই টের পেতে দেয়নি। কিন্তু, আলো যেন সবটা বুঝে ফেলল। মেঘালয় যে তাকে ইচ্ছে করে এড়িয়ে যাচ্ছে তা বুঝতে পারল। এখন সে অপেক্ষা করছে সকাল হওয়ার জন্য। সকাল হলে সে হোস্টেলে ফিরে যাবে। লন্ডনে সে দুটো কাজের জন্য এসেছে। লেখাপড়া চলুক। ডাক্তার সাহেবকে সামলানো যাবে তবে এখনই নয়। সে যতদিন দূরে থাকতে চায় থাকুক। কিন্তু, আলোর কাছেই তাকে ফিরতে হবে।
আলো মেঘালয়ের ঘরটায় চুপচাপ বসে আছে। মানুষটার ছোঁয়া যেন এই ঘরটায় লেগে আছে। আলো চোখ বন্ধ করে মেঘালয়কে অনুভব করার চেষ্টা করছে। তারপর, ঘড়ির দিকে তাকালো। সকাল সাতটা বাজে। ধীরে ধীরে ঘর থেকে বের হলো। রিনি, রিনির স্বামী এবং রিনির বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আলো এই বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল। বাড়ি থেকে বের হবার পর আলোর বারবার মনে হচ্ছিল, “অচেনা পথে যদি চেনা মানুষটার দেখা পেত! এক দৌঁড়ে গিয়ে মানুষটার বুকে লুকিয়ে পড়ত।”
আলো দীর্ঘশ্বাস ফেলে ক্যাবে উঠে পড়ল। উদ্দেশ্য ইউনিভার্সিটি।

দুপুর নাগাদ বাড়িতে ফিরে এলো মেঘালয়। বাড়িতে ফিরে আসার পর আলোকে খুঁজছে। কিন্তু, আলো তো দূর আলোর ছায়া অব্দি এই বাড়িতে নেই। মেঘালয় এবার দিশেহারা বোধ করছে। এক দৌড়ে ছুটে গেল রান্নাঘরে। গিয়ে রিনিকে প্রশ্ন করলো,
—রিনি, আমার বউ কই?
মেঘালয়কে চেঁচামেচি শুনে রিনি বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকায়। তারপর, দাঁত চিবিয়ে বলল,
— তোমার বউকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলেছি আমি।
রিনির কথা শুনে মেঘালয় চোখ বড় বড় করে বলল,
— সত্যি বলছো নাকি?
— হান্ড্রেড পার্সেন্ট মিথ্যা বলছি। বিশ্বাস না হলে আমার স্টোমাক আর দাঁতের পরীক্ষা করাও। যতসব!!
রিনি ঝাড়ি মেরে ডাইনিং টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ালো। মেঘালয় আমতাআমতা করে রিনিকে বলল,
— একটা রাত আমার বউটাকে দেখে রাখতে বলেছিলাম। সেটাও পারলে না?
রিনির ইচ্ছে করলো হাতের কাচা আলুটা মেঘালয়ের মাথায় ছুঁড়ে মারতে। সারারাত আর দিন অর্ধেক পেরিয়ে যাওয়ার পর এখন আসছে বউ এর খোঁজ খবর নিতে!

মেঘালয় যখন রিনিকে কথাগুলো বলছিল ঠিক তখনি নিজের পেছনে কারো অস্তিত্ব খুঁজে পায়। রিনি মানুষটাকে দেখে মুচকি হাসছে । মেঘালয় রিনির হাসিমুখ দেখে পেছনে ফিরে দেখল, আলো দাঁড়িয়ে আছে। মেঘালয় স্তব্ধ হয়ে গেছে আলোকে দেখে। সাদা চুরিদার, কোমড় ছাড়িয়ে যাওয়া চুলে আলোকে দেখে মেঘালয়ের দুনিয়া থেমে গেল আলোকে কেন্দ্র করে। মেঘালয়ের ওমন হৃদয় নাড়িয়ে দেয়া চাহনি দেখে আলো অপ্রস্তুত হয়ে যায়। পিছনে যাওয়ার উদ্দেশ্য এক পা রান্নাঘরের দরজার বাইরে ফেলল। মেঘালয় এককদম এগিয়ে যায়। আলো আবারও পিছিয়ে যায়। মেঘালয় এবারও এক কদম সামনে এগিয়ে যায়। আর আলো ভীষণ ভয় পেয়ে পেছনের দেয়ালের সঙ্গে শরীরের ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আলোর মনে হচ্ছিল এই বুঝি মেঘালয় এসে তাকে দুটো থাপ্পড় মারবে। কিন্তু, আলোর আশায় সেগুড়ে বালি দিয়ে মেঘালয় আলোকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল । আলো বিস্মিত হয়ে মেঘালয়ের চলে যাওয়ার দৃশ্য দেখছে।

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৬

আর রিনি কাঁচা আলু হাতে নিয়ে ওদের কাহিনি দেখছে। মনে হচ্ছে কোনো থ্রিলার মুভি চলছে। বাপ রে! মেঘালয় এত অভিনয় করতে পারে রিনির জানা ছিল না। গতকাল আলোকে সেন্স লেস অবস্থায় দেখে দম আঁটকে মরে যাচ্ছিল। আর আজ ঢং করছে। ব্যাডা মানুষ, হুহ্!!

মেঘের ওপারে আলো দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৫৮