হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬ (২)
সাঞ্জেনা শাজ
তুমুল মারামারির মাঝখানে পুলিশ এসে হাজির হয়েছে। স্বাভাবিক, একজন মেয়র আরেকজন হচ্ছে নামকরা বিজনেস ম্যান। পুলিশ আসবে না মানে! দৌড়েই আসবে। তবে নিজেদের নাম ঠিকিই রেখেছে। ওই যে বলে না, পুলিশের কাজিই সব শেষ হলে আসা৷ এখানেও হয়েছে তাই। উদম মারপিটের পর এসেছে পুলিশ। রায়হানের অবস্থা নাজেহাল। তার ছেলেদের ছাপিয়ে মেহরাদ ওর পর্যন্ত একাই পৌছাতে পাড়বে অবিশ্বাস্যকর ছিলো এটা৷ তবে মেহরাদ করেছে। ভালো করেই করেছে।
রায়হানের মুখ রক্তাক্ত। শরীরে আঘাতের চিহ্ন বেশ। রক্ত ঝড়ছে মেহরাদের নাক ঠোঁটের কোনা থেকেও। তবে স্বল্প। ছেলে গুলো আপাতত পুলিশের জিম্মি। মেহরাদের শার্টের বোতাম খুলেছে আরও দুটো। অবশ্য খুলেছে বললে ভুল হবে। ছিড়েছে। শার্ট ছাপিয়ে মাসেল দৃশ্যমান কিছুটা। এগুলোর জোড়েই আজ মেয়রের বেন্ড বাজিয়ে দিয়েছে।
“মেয়র মাই ফুট্টট্ট!” বলেই মুখ থেকে রক্ত থুতু ফেললো মেহরাদ। এসব ছোট খাটো চোট কিছুই না। জাস্ট নাথিং। এটাকে কেলিয়েছে এতেই স্বস্থি। তবে আরও কয়েকটা দিতে পাড়লে ভালো হতো ।
পুলিশেরা ছেলে পেলে গুলোকে গাড়িতে তুললো। তারপর রায়হানের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলতে শুরু করলো। যেহেতু রায়হান বেশি আঘাতপ্রাপ্ত তাই তাদের ধ্যায়ানও সেদিকেই। তারউপর হচ্ছে মেয়র। হুজুর সাব, হুজুর সাব করবে এটাই স্বাভাবিক!
মেহরাদ গাড়ির কাছে যেতে নিলো ঘুরে, পুলিশ অফিসার এসে দৌড়ে আটকালো ওঁকে। তাদের সাথে থানায় যেতে বললো। মেহরাদ নিজের দিকে আঙুল তাক করে জিজ্ঞেস করলো,
“ডু ইউ নো হু আই এম? ”
পুলিশ অফিসার জানালেন,
“স্যার আমি জানি আপনি কে। কিন্তু তবুও এটা ফর্মালিটিস প্লিজ কো’আপারেট করুন।”
“অন ডিউটি সরকারি কর্মকর্তার উপর হামলা করেছে। এইটাকে জেলে পুড়ুন। এজ এ মেয়র, আমি কেস ফাইল করছি। এইটাকে সেলের পিছনে দেখতে চাই। ” দূর থেকে কুকিয়ে চেচিয়ে উঠলো রায়হান।
মেহরাদ আবারও ওর দিকে ঘুরে হকিস্টিক দেখিয়ে বললো,
“আমায় সেলের পিছনে দেখবি তুই? তুই কিসের কর্মকর্তা রে? স্লা দুর্নীতি বাজ। রাজনীতি শিখাও আমাকে? এবার গেলে কিন্তু এটা নিও যাবো না। রাম/দা নিয়ে যাবো। ডাইরেক্ট কেল্লা ফতে!”
রায়হান রাগে চিৎকার করে উঠলো। রিমা খান ভাতিজার জন্য আহাজারি করছেন। এদিকে শুভ্রতা কাঁদছে মেহরাদের জন্য। চারদিকে কেমন এক থমকে যাওয়া পরিবেশ মনে হচ্ছে তার কাছে। অথচ, মানুষের কোলাহলের অভাব নেই।
মেহরাদ গাড়ির দরজা খুলে ভিতরে ঢুকতেই ওর বুকে ঝাপিয়ে পরলো শুভ্রতা। হসপিটালের সামনে তখন ভির কিছুটা কমে এসেছে। অফিসারদের সাথে সে যায়নি।।যাবেও না। সাহস থাকলে ওয়ারেন্ট নিয়ে এসে দেখাক! কার বুকে পাটা কতটুকু সে-ও দেখে নেবে। হুহ!
একহাতে শুভ্রতার পিঠে হাত ভুলিয়ে দিচ্ছে মেহরাদ। শুভ্রতার শরীরটা কেপে কেপে উঠছে কাঁন্নার তোপে। মুখ উঠালো মেয়েটা। কান্না করতে করতে নাক চোখ মুখ গাল সব লাল করে ফুলিয়ে বসে আছে। আজ নিজেকে বড্ড অসহায় লেগেছে তার। যদি কোন ক্ষতি হয়ে যেতো! তার একটা ডাকও শুনলো না!
সে কান্না করতে করতে বললো,
“কি করেছেন এগুলো হ্যাঁ? কত্তো ব্যাথা পেলেন! কেন করেন আপনি সব সময় এমন? আমার কত্তো…. কত্তো কষ্ট হচ্ছিলো জানে…ন? ” বলতে বলতেই মেয়েটা অজস্র চুম্বনে বড়িয়ে দিলো মেহরাদের জখমীত মুখশ্রী খানা।
আজ লোক লজ্জার ভয় খুবিই তুচ্ছ তার কাছে। বরংচ এমন হয়েছে আজ এই লেইম ওয়ার্ডটা তার মাথায় আসেই নি। পুরো দুনিয়া গোল্লায় যাক। এ লোকটা তার কাছে ফিরে এসেছে সে আদরে ভড়িয়ে দেবে না? তার যে কেমন লেগেছিলো এতক্ষণ কেউ বুঝবে এটা? কেউ জানে?
“হয়েছে হয়েছে আর কাঁদতে হবে না। আ’ম ফাইন, সী?”
“হু দেখছিই তো কতটা ফাইন। ” মেহরাদের শার্ট খোলা বুকে মাথা চেপে নাক ঘষে বললো শুভ্রতা।
আহারে, নাক ঘষার সাথে শর্ধি লেগে গিয়েছে বুকটায়। একটু কান্না কি করেছে, চোখের জল নাকের জলে দুনিয়া ভাসিয়ে শেষ। কেন, কান্না করলেই তোদের আসতে হবে কেন? সকলের সামনে এতো বড় মেয়ের নাকের পানি আসলে বিষয়টি লজ্জার না?
মেহরাদ চোখ খিচল একটু। তারপর শুভ্রতাকে বুক থেকে উঠিয়ে বরাবর করে গাড়ি থেকে ট্যিসু নিলো আগে। নিজের বুকের কাছটায় পরিষ্কার করলো। শুভ্রতার নাক আবারও পিট পিট করছে। শর্ধি এখন ঘরবাড়ি নিয়ে হাজির।
মেহরাদ আরেকটা ট্যিসু নিয়ে শুভ্রতার নাকে চাপলো। নিজেই মুছে দিতে দিতে বিরবির করে বললো,
“প্র্যাগনেন্ট! বউকেই এখনো পেলে পুষেই শেষ করতে পাড়ছি না। আবার বাচ্চা! ”
মেহরাদের অবস্থা দেখে বাড়িতে সকলে হতবাক। জাহানারা বেগম কান্নাকাটি শুরু করলেন। আহারে, তার ছেলেটা। সকলেরই সে-ই অবস্থা। মেহরাদ তাদের বুঝিয়ে শুনিয়ে রুমে চলে গেলো।
সময় তখন ভালোই গড়িয়েছে। বিকেলের দিকে তালুকদার বাড়িতে পুলিশ আসলো। সকলে তো অবাকের চরম পর্যায়ে। তালুকদার বাড়িতে পুলিশ?
মেহরাদ বড়ই শান্ত কন্ঠে তাদের জিজ্ঞেস করলো,
“কি ব্যাপার অফিসার? হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?” এটা সেই দুপুরের ঘটনা স্থলের অফিসারটাই।
অফিসার কাচুমাচু করলেন৷ তিনি এসেছে ওয়ারেন্ট নিয়ে। মেয়রকে মেরে হাসপাতাল পাঠিয়েছে তারউপর বাবা হচ্ছে বড় রাজনৈতিক নেতা এক কালের। সব কিছুই কি ধামাচাপা দেওয়া যায়! সে বড়ই বিনয়ী স্বরে বললেন,
“স্যার…. একটু যদি আমাদের সাথে থানায় যেতেন। একটুর জন্য। দুটো সাইন আর একটু থাকলেই চলবে।”
মেহরাদ আগেই বুঝেছে ঘটনা কি। সে স্বাভাবিক ভাবেই বললো,
“মে/রে তো ফেলিনি। যেদিন এটা হবে থানায় গেলেও আপসোস হতো না। কিন্তু শুধু এতটুকুতে! আসলে থানায় যাওয়াটা পোষাবে না।”
অফিসার সাহেব কপালের ঘাম মুছলেন। কিসের পাল্লায় যে পড়লো সে! এদিকে একজন ওদিকে একজন তার চাকরি নিয়ে টানাটানি শুরু করেছে!
সে আবারও বললো,
“স্যার যাবেন আর আসবেন। কেস ফাইল হয়ে গিয়েছে তো। কিছু ফর্মালিটিস….”
“আমার লয়ারের সাথে কথা বলে নিবেন৷ উনাকে পাঠিয়ে দিবো।”
এর মধ্যেই অফিসারের ফোনটা বেজে উঠলো। পকেট থেকে ফোন বের করে দেখলো। তার সিনিয়র অফিসার কল করছে। আইপিএস কায়েস আল মাহমুদ। সে একবার মেহরাদের দিকে তাকালো। মেহরাদ চোখের ইশারায় কল রিসিভ করতে বললো। অফিসার সাহেব ঢুক চেওএ তা-ই করলেন। ওপাশ থেকে ভেসে আসলো কায়েসের তীক্ষ্ণ প্রশ্নের বান,
“আপনি কার অনুমতি নিয়ে মিস্টার তালুকদারের বাসায় এরেস্ট ওয়ারেন্ট নিয়ে গিয়েছেন অফিসার? কার পারমিশনে? ডু ইউ ইভেন নো, হু হি ইজ?”
অফিসার সাহেব আমতা আমতা করে বললেন,
“মেয়র সাহেব…কেস ফাইল করেছে স্যার। যেকোনো মূল্যে…. ”
“মেয়র মাই ফুট্টট্ট। যদি উনি মেয়র হয় আপনার সামনে বসে থাকা লোকটা একজন আইপিএস পুলিশ অফিসার এর একজন এমপির ফ্রেন্ড। ডিড ইউ আন্ডারস্টেন্ড?? ”
অফিসার সাহেব চোরা চাহনিতে মেহরাদের দিকে তাকিয়ে মানে মানে করে বিদায় নিলো। সকলেই স্বস্থির নিশ্বাস ছাড়লো। আর শুভ্রতাতো দেখেই নি এই ঘটনা। দেখলে মেয়েটা যে কি করতো!
সন্ধ্যার পর শুভ্রতা রুম থেকে বের হলো। ভিতরে খুবিই সংকোচতা। সকলে কি না কি ভাবছে কে জানে! তাকে ঘিরেই তো কতকিছু হয়ে গেলো!
শুভ্রতাকে দেখে সকলে তেমন কিছুই বললো না। বরং ওকে ডেকে এনে মাথায় হাত ভুলিয়ে দিলো। শরীর এখন কেমন লাগছে জিজ্ঞেস করলো। জাহানারা বেগম নিজ থেকেই জানালেন, তিনি কল করে মানবতার খাতিরে রায়হানের কথা জিজ্ঞেস করেছে। এখন কিছুটা ভালো।
ছেলেটে বেদম পিটিয়েছে রিমা বেগম জানালেন। ভদ্রমহিলাও সেখানেই এখনো। সেটা অবশ্য জানা কথাই। সেখানেই থাকবে তিনি।
এভাবেই সন্ধ্যাটা কেটে গেলো। মেহরাদ বেরিয়েছিলো একটু। শত চেষ্টা করেও তাকে রাখা যায়নি বিকেলের পর বাসায়। বিকেলে থেকেছে এটাই অনেক!
মেহরাদ আসলো নয়টার সময়। হাতে একগাদা জাংকফুড। এগুলো থেকে এক ব্যাগের গুলো ড্রয়িং রুমে রেখে বাকিগুলো নিয়ে উপরে উঠলো। শুভ্রতার রুমের দিকে এগুলো।
শুভ্রতার রুমে গিয়ে দেখলো শুভ্রতা শুয়ে আছে কম্ফর্টার মুড়ি দিয়ে। সন্ধ্যার পর একটু ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। তবে ততটাও না। তবে এ কম্ফর্টার কেন? জ্বর টর এলো না-কি?
সে এগিয়ে গিয়েই শুভ্রতাকে ডাকবে তার আগে শুভ্রতা কম্ফর্টার সড়িয়ে মাথা উকি দিয়ে মেহরাদকে দেখলো। দেখেই উঠে বসলো ফাস্ট। মেহরাদ হাতের প্যাকেটটা পড়ার টেবিলের উপরে রেখে বিছানার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“জ্বর এসেছে? দেখি….” হাত ছুয়াতে নিলো কপালে।
শুভ্রতা ধরে ফেললো হাত খানা। নিজেই উল্টো ব্যাতিব্যস্ত হয়ে শুধালো,
“আমার কেন জ্বর আসবে? আপনার কি অবস্থা? পেইন কিলার নিয়েছিলেন?”
মেহরাদ ওকে রিল্যাক্স করলো। আজ বিছানায় না বসে দু সেটের কাউচে বসলো পাশের। টেবিলের উপরের এগুলো দেখিয়ে বললো,
” এগুলো এনেছি। আর কিছু লাগবে? কিছু খেতে মন চাচ্ছে? ”
শুভ্রতার মনটা হুট করেই খুব ভালো হয়ে গেলো। এ সময়ে কতো মুড সুয়িং হয়! তার মন বেশিরভাগই খারাপ থাকে। তারউপর দুপুরের সেই ঘটনা। ভুলতেই পাড়ছে না সেকেন্ডের জন্য। শুধু চোখের সামনে ভাসছে।
এসব চিপস টিপস তার সবসময় খেতে ভালো লাগে। কিন্তু এ সময় আরও বেশি ক্রেভিং হয়। কিন্তু এবার চিন্তায় ক্রেভিং কি আসল খাওয়াই ভুলে গিয়েছে।
সে হাটু মুড়ে এগিয়ে গিয়ে কাছে বসলো মেহরাদের। প্রগাঢ় চোখগুলোয় ব্যাথার ছাপ। মূহুর্তেই নাক মুখ লাল হয়ে উঠলো,
“কিচ্ছু লাগবে না। শুধু আপনি থাকলেই চলবে। ”
মেহরাদ ওর দিকে কিছু পল তাকিয়ে হাতের ইশারায় নিজের একটা উরুর উপর মৃদু হাতের ছোট্ট চাপর মেরে চোখের ইশারা করলো। শুভ্রতা মূহুর্তেই বুঝে গেলো। বিছানা থেকে উঠে সেকেন্ডের মধ্যেই মেহরাদের কোলে বসলো। জড়িয়ে ধরলো গলা। পা দুটোও বাকি উড়ুর উপর উঠিয়ে দিয়ে আহ্লাদী সাজলো একটু। একটু নাক টেনে আবারও কাঁদলো।
“ঠিক আছিতো আমি। ”
শুভ্রতা গুনগুন করে কতো কিছু বললো লোকটাকে! লাল লাল ব্যাথিত চিহ্ন গুলোতে গুনে গুনে কয়েক বার চুমু খেলো। শার্টের কলার টেনে ঘারেও চুমুও খেলো। এযাত্রায় মেহরাদ শিরশিরানিতে ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো একটু। তার মস্তিষ্কের নিউরন গুলো উল্কার বেগে ছুটছে।
শুভ্রতা ঘারে মুখ গুজে বললো,
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬
“আপনার এতো রাগ!”
“সবারিই থাকে।”
“উঁহু। আপনার একটু বেশি-ই… ”
“আমার সবিই বেশি। রাগ বেশি। ভালোবাসাও বেশি। আর আদর তো আরও বেশিইই। একদম Maximum লেভেলেরও সীমা পেরিয়ে…. ”
