হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৭ (২)
সাঞ্জেনা শাজ
অফিসে বাবা ছেলে সামনা সামনি বসে আছে। মেহরাদ নিজের ব্যাস্ততার সর্বোচ্চ দেখাতে চাইছে। আলতাফ তালুকদার চেয়ে চেয়ে দেখছে শুধু ছেলের কর্মকান্ড খানা। তিনি গলা খাকাড়ি দিলেন। ফাইল হাতে মেহরাদ একবার তাকালো বাবার দিকে। আবার ফাইলে চোখ ডুবিয়ে বললো,
“কোন প্রবলেম হচ্ছে, বাবা? পানি দিবো না-কি গলা ঝেড়ে কিছু বলবে?” আর কতোক্ষন এভাবে বসে থাকা যায়! সে জানে তার বাবার আসার কারণ, কি বলবে সেটা ও জানে।
“,তুমি চট্টগ্রাম যাচ্ছো ওঁরা জানলো কিভাবে? ”
“কারা?”
“এ্যাহ্! বুঝোনা তুমি? সকালে শুভ্রতা মা কি বললো নাস্তার টেবিলে শুনো নি? ”
“ওহ, হ্যাঁ। শুনেছি।”
“শুনেছি মানে কি? তুমি নিষেধ করবে না? ওঁকে তোমার সাথে পাঠাবো আমি?”
“আমি কি জানি! ও আমায় কিছু বলেছে? বলেছে তো তোমাকে। নিষেধ করার হলে তুমি করে দাও!”
“এই ছেলে, আমাকে ফাঁসাচ্ছো কেন? আমি ওঁকে না করতে পাড়বো? ও কষ্ট পাবে না? ”
“হ্যাঁ, আর আমার কথায় তো খুউব আনন্দ পাবে না?”
“তোমার আর আমার বিষয়টা এক হলো? ”
“ভিন্ন কি এদিকে? শি ইজ মাই ওয়াইফ। ”
“এক্সেক্টলি! এটাই তো সমস্যাটা। ”
“কি বলছো বাবা? আমরা হাসবেন্ড ওয়াইফ এটাতে কি সমস্যা?”
“উঁহু। আমার চোখে তোমাদের হাসবেন্ড ওয়াইফ থেকে শিয়াল আর মুরগী মনে হয় বেশি। এন্ড দেটস দ্যা প্রবলেম!”
আহাম্মক হয়ে তাকিয়ে রইলো মেহরাদ। সিরিয়াসলি! তার বাবা এটা বলছে তাকে! তার মানসম্মান কোথায় নিয়ে ঠেকিয়েছে লোকটা? শেষ মেষ শিয়াল আর মুরগী!
আলতাফ তালুকদার ছেলের দিকে তাকিয়ে আবার বললেন,
“শুনো, আমি ওঁকে বা ওদের মানা করতে পারবো না। তুমি তোমার খুব ব্যাস্ততা দেখাবে, বুঝলে? ”
“আচ্ছা। তারপর? ”
“,তারপর মানে কি? তারপরও যদি না মানে, নিয়ে যাবে সাথে করে। কিন্তু খবরদার…. চট্টগ্রাম নিয়েই তোমার চাচ্চুর কাছে রেখে আসবে ওঁদের। তুমি তোমার মিটিং নিয়ে থেকো। ওঁদের নয়তো শায়ান সামলে নেবে।”
মেহরাদ তাকিয়েই রইলো ওর বাবার দিকে। মনে মনে একটু হাসলোও। সব তার বিরুদ্ধে। সে মাথা দুলিয়ে বলল,
“আচ্ছা। যো আপকি মারজি।”
আগামীকাল সকালে রওনা দিবে সকলে এটাই সকলে জানে। তিন বোন মিলে গোল মিটিং হয়ে বসে আছে। কি কি গুছাবে সেসব নিয়ে। কিছু কেনা কেটা করতে হবে তা-ও লিস্ট করে নিলো। মেহরাদকে আসতে বলেছে। বলেছে সন্ধ্যায় এসে নিয়ে যাবে শপিং এ।
কথাবার্তার এক পর্যায়ে সোহানা বললো,
“আচ্ছা ধর, কোন কারণ বসত আমরা যদি না যেতে পাড়ি। শুধু তুই ই যেতে পাড়বি এমনটা হয়। তখন কি করবি?”
শুভ্রতা ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলো । এটা আবার কেমন কথা? সে কিছু না বুঝেই বললো,
“তোরা আবার যেতে পাড়বি না কেন? আর তোরা না গেলে আমি যাব? নিবে আমায়? দিবে কেউ?”
“যদি নেয়? আর আমরা সকলকে মানাই, তাহলে?”
শুভ্রতা এযাত্রায় নড়েচড়ে বসলো। শুধালো,
“কি খিচুড়ি পাকানো হচ্ছে তোর মাথায়? সত্যি করে বলতো?”
সোহানা আবারও কিছু বলতে চাচ্ছিলো, শান্তা থামিয়ে দিলো। নিজের মতো গুছিয়ে সুন্দর করে বললো,
“আমি আর সোহানা অন্য কোথাও চলে যাবো ঘুরতে। তুই আর ভাইয়া ঘুরে আস চট্টগ্রাম থেকে। বাড়ির লোকদের আমরাই ম্যানেজ করার চেষ্টা করবো।”
শুভ্রতা চোখ বড়ো বড়ো করে হা করে তাকিয়ে রইলো। বলল,
“কি বলো, আপু? আমি আর উনি যাবো মানে কি? তোমরাই বা যাবে না কেন?”
সোহানা চাটি মারলো ওর মাথায়।
“গাধী তুই? বুঝিস না? এ পর্যন্ত ভাইয়ার সাথে কোথাও একা গিয়েছিস? কাপালদের মতো টাইম স্পেন্ড করেছিস?”
শুভ্রতা ‘ উহু ‘বলে মাথা ডললো। বিরক্ত চোখে তাকালো সোহাবার দিকে। কি আমার চালাকটা গোওও!
“শুন, তুই বোকা? তোর জন্য তো এটাই গোল্ডের অপারচিউনিটি ভাইয়ার সাথে সময় কাটানোর জন্য। আমরা সেখানে কি করবো? তুইই যা। আমরা নয়তো নানুর বাসা থেকে ঘুরে আসবো। ”
শুভ্রতা সব হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলিয়ে গেলো। সে এটা বুঝলো না। বাড়ির বাকিরা দেবে….
সিন্ধ্যার পর মেহরাদ আসলো। এসেই সাফিকে দিয়ে খবর পাঠালো শুভ্রতার রুমে রেডি হতে। একটু পর শপিং এর জন্য বের হিবে। তার নিজেরও গোছগাছ আছে করতে হবে। সেখানে থাকতে হবে দু’দিন। তাদের কোম্পানির সাথে সংযুক্ত আরও দুটো কোম্পানিও সেখানে থাকবে।
শুভ্রতা রেডি হলো দ্রুত। বেশি লেট হলে যদি আবার নিয়ে না যায়! তখন? তার আবার তেমন কেনা কাটা নেই। শুধু অল্প কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস!
মেহরাদ গিয়ে নিচে বসলো সোফায়। গড়িতে সময় দেখলো ০৮:২৩ বাজে। এখনো নিচে নামছে না। কখন যাবে কখন আসবে!এদিকে গুছানো বাকি। সকালেই রওনা দিতে হিবে। ওঁদের সাথে নিয়ে যাবে বলে আজই রাসেল সাহেবকে পাঠিয়ে দিয়েছে চট্টগ্রাম। সেখানে হোটেলের ব্যাবস্থা সহ যাবতীয় সব কিছু ঠিক করে রাখার জন্য।
শুভ্রতা নামলো আরও মিনিট পাচেক পর। সে নামতেই মেহরাদ উঠে দাড়ালো। গড়ি দেখে বললো,
“আরও ঘন্টা খানিক সময় নিতি? বিয়েতে যাচ্ছিলাম তো!” বলেই বেরিয়ে গেলো।
শুভ্রতা মুখ মোচড়াল। উউউউহ, শুধু শুধু বকে সবসময়। সে বড় মা মেঝো মা’র কাছ থেকে বিদায় নিতে কিচেনে গেল। আসার পিথে স্বপ্না খালা আফসোস করে বললো,
“আহারে কি ফ্রেম করলা? কইরা বিয়া করলা! জামাই এহন আদর সোহাগের নাম কইরা ডাকবো! আর অনেও কি তুই তুকারি করে! নিজের কপাল নিজে খুয়াইছো গো মাইয়া। নিজের কপাল নিজে খুয়াইছো!”
শুভ্রতা শুনতে শুনতে এসেছে৷ সে জানে এগুলো কার উদ্দেশ্যে বলা। আর ভুলও তো তেমন বলেনি। তাই সব কিছু মাথায় সেট হতে হতে সে মুখ গুজু করলো। করেই গেটের সামনে ইঞ্জিন স্টার্ট দেওয়া গাড়ির সামনে গিয়ে দাড়ালো মুখ অন্ধকার করে। তা দেখে মেহরাদ বললো,
“কি ম্যাডাম? এখন নি রেড কার্পেট লাগবে গাড়িতে উঠতে?”
আবার এরকম করে বললো! শুভ্রতার মুখটা আরও কুচকালো। তারপর গাড়িতে উঠে বসলো বিনা বাক্যে। তার মনে ওসব কথাই ঘুরপাক খেতে লাগলো। কিশোরী বলে কথা!
মুখ ভার রেখেই যা যা কেনার কথা সব কিনেছে শুভ্রতা। কিনে আবার ফিরেও যাচ্ছে তারা। মেহরাদ গাড়ি চালানোর ফাকে ফাঁকে একটু আকটু ফুলানো মুখটা দেখছে।
বেশি দূর না। শপিংমলের একটু দূরেই একটা রেস্টুরেন্টের কাছে গাড়ি থামালো মেহরাদ। শুভ্রতার তখনো কোন ভাবান্তর দেখা গেল না। মেহরাদ ওর দিকে তাকিয়ে হর্ন বাজালো কিছুক্ষণ। শুভ্রতা চোখ মুখ কুচকে মেহরাদের দিকে তাকাতে মেহরাদ ভ্রু নাচালো। জিজ্ঞেস করলো,
“এই মুখ কখন খুলবে?”
“জানি নাহ।” বলেই মুখ জামটালো শুভ্রতা।
মেহরাদ ওর সিট থেকে ওঁকে টেনে বসালো নিজের সাথে মিশিয়ে। শুভ্রতা ভরকালো আচমকাই এরকম করায়৷ শক্ত করে খামচে ধরলো মেহরাদের কাধ।
“আগামীকাল যাওয়ার ইচ্ছে আছে তো? হু?”
“ভয় দেখাচ্ছেন?”
“উঁহু, মনে করিয়ে দিলাম আর কি! ”
শুভ্রতা কিছু বুঝেনা ভেবেছে! সে বেশ বুঝেছে। তবুও ঠোঁট ভেঙে বললো,
“যখন তখন ধমকা ধমকি করেন৷ আবার তুই ও তো বলেন! ”
“আগডুম ভাগডুম কাজ করে কে? ধমক সাধে দেই? আর তুই বলা নিয়ে নিয়ে সমস্যা হলো? ”
শুভ্রতা এবার মিন মিন করে বলতে চাইলো,
“এ…এখন তো বউ হই৷ ”
“সো হোয়াট??”
শুভ্রতা তেতে গেলো।
“এই কারনেই স্বপ্না খালা আপনায় দেখতে পারেন না। কথার কোন রসকষ নেই।”
“হাহ!ওনাকে বলে দিবি, আমিও ওনায় তেমন দেখতে পাড়ি না। ফিলিংস মিচুয়াল।”
শুভ্রতা মনে মনে কপাল চাপড়ালো। কাকে কি বলছে! সে নেমে যেতে চাইলো। মেহরাদ আটকালো। ঘার গলিয়ে ধরা হাতের ছোয়া প্রগাঢ় করে কাছে টেনে আনলো। বাহিরের লেম্প পোস্টের মৃদু আলোয় মেহরাদের গভীর চোখের চাহনি দেখে শুভ্রতা কান গাল গরম হতে থাকলো আপনা-আপনিই। জ্বীব দ্বারা ওষ্ঠ ভেজাল। মেহরাদ বড়ই নাখোশ হলো। চাপা ধমকে ওষ্ঠ জোড়ার এক হাতে উঁচু করলো। কাছে এগিয়ে যেতে যেতে বললো,
“এই দায়িত্বটা তো আমার….. ”
শুভ্রতারা বাড়িতে আসলো রাত প্রায় এগারোটার পর। সকলে তখন ঘুমে। গাড়িতে আসতে আসতে শুভ্রতা নিজেও ঘুমে ঢুলো ঢুলো। মেহরাদ ওঁকে জাগালো না। গাড়ি গ্যারেজে রেখে। গাড়ি থেকে বের হয়ে আরেক পাশ থেকে ওঁকে কে তুলে নিলো। ঘুমের ঘোরেই গলা জড়িয়ে ধরলো শুভ্রতা। মৃদু স্বরে কি যেনো বিরবির করলো।
মেহরাদ ওকে নিয়ে রুমে গিয়ে শুয়িয়ে দিলো। লাইট অফ করে ডিম লাইট জ্বালিয়ে দিলো। আবার গেলো বিছানার কাছে। শুভ্রতা বির বির করছে। কান এগিয়ে নিলো ওর মুখের সামনে৷
বিরবির করে বলছে ‘আমায় নিয়ে যাবেন৷ ফেলে রেখে যাবেন না কিন্তু….. ‘
মেহিরাদ হেসে ফেললো ওর বিরবিরানো শুনে৷ বৃদ্ধা আঙুল দ্বারা তুলতুলে ওষ্ঠ দুটো চেপে ধরে রাখলো সেকেন্ড খানেক। শুভ্রতা থেমে গেল নড়েচড়ে ।
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৭
মেহরাদ ওর কপালের কাছে কিছু চুল সড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো এক দৃষ্টিতে। আবেশে দৃষ্টি স্থীর। ঘুমন্ত প্রেয়সীর সুশ্রী রূপ বুকে গভীর রাতের কালবৈশাখী ঝর তুলছে। এই মেয়েটাকে নিয়ে সে সেখাবে কিভাবে থাকবে? তার এখনি মাথা হ্যাং করছে।
রুম থেকে বেরিয়ে গেল মেহরাদ৷ নিজের রুমের দিকে যেতে শার্টের সমস্ত বোতাম খুলতে খুলতে বলছে,
“শাওয়ারের উপরেই থাকতে হবে আগামী দু’দিন মনে হচ্ছে। আর…আর টিকতে না পাড়লে, এটাকেও নেওয়াবো….”
