obsession vs love part 2
নিরুর কল্পনারাজ্য
নিজের পেটে বাচ্চা থাকার পরেও আইয়ুশ অন্য কাওকে বিয়ে করে এনেছে। বিষয়টা যেনো মানতেই পারছেনা ঝিলিক। তার হঠাৎ সব বিভ্রম মনে হলো। মনে হলো যেনো এসব কিছুই মিথ্যে, স্বপ্ন কাটলেই যেনো সব মিটে যাবে। তার আইয়ুশ তার হয়ে যাবে। অথচ তেমনটি হলোনা। ওসমান মির্জা তখনও চেঁচামেচি করছেন।।বলছেন,
—এভাবে না জানিয়ে বিয়ে করার কারণটা আমি বুঝতে পারছিনা আইয়ুশ। তোমার থেকে ছোটোরা এই শিখবে? ছিঃ ছিঃ লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে আমার।
মালিহা বেগম ছুটে এলেন ছেলেকে রক্ষা করতে।
—আহ! ছাড়ো তো, যা হওয়ার তা হয়েই গিয়েছে। তাছাড়া আমাদের সাঁঝ কী কম লক্ষীমন্ত? ছাড়ো এসব।
শাহাদাদ মির্জা নিজেও অবাক হয়ে বসে আছেন। সাঁঝ যে এমন করতে পারে তা তার কল্পনায় ও ছিলোনা। সাঁঝকে তিনি প্রশ্ন করলেন,
—সাঁঝ, এটা কী হ্যাঁ? একবার তো আমাকেও জানাতে পারতে।
সাঁঝ মাথা নিচু করে বসে আছে সোফায়। তার ঠিক পাশেই আইয়ুশ। সে গম্ভীর স্বরে বলে,
—উফফ, থামো তোমরা। বাবা, আ’ম স্যরি। ওর কোনো দোষ নেই। আমিই ওকে হঠাৎ বিয়ে করেছি। মেঝো আব্বু, ওকে বকো না। ছাড়ো এসব, আমি রুমে যাচ্ছি!
ওসমান মির্জা বিরক্ত হলেন। শাহাদাদ মির্জাও হতবাক। চৈতি চৌধুরী নিজের বাপের বাড়িতে। তিনি জানেন না ঠিক কীভাবে কী বোঝাবেন তিনি ফিরে আসলে। ওপর থেকে ঝিলিক সব দেখলো। কই? তাকে নিয়ে তো কখনো এমন কিছু বলেনি আইয়ুশ। সে তো বলতো ঝিলিকই তার দুনিয়া। সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেনা। ওই মানুষটা ওপরে উঠে আসছে। তার খুব কাছে আসছে; অথচ তাদের মাঝের দূরত্ব অসীম! সে তাকিয়ে রইলো। চোখের জল যেনো শুকিয়ে গিয়েছে। তার দু’কদম হাঁটতেও যেনো বহু কষ্ট হলো। তবু সে কদম বাড়ালো ওই মানুষটির উদ্দেশ্যে। আইয়ুশ কোনোদিক না তাকিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে যাচ্ছে। ঝিলিক এগিয়ে গেলো। কৈফিয়ত নেওয়ার অধিকার তার আছে। আইয়ুশ রুমের দরজা বন্ধ করতে গেলো। ঠিক তখুনি ঝিলিক এসে আটকালো। আইয়ুশ তাকালো তার পানে। বিধ্বস্ত অবস্থা; যেনো কতবছরের ভাঙাচোরা এক পাহাড়। আইয়ুশের কোথাও একটা যেনো বিঁধে উঠলো। সে চোখ ঘুরিয়ে নেয়। ঝিলিকের চোখ থেকে তখনও অশ্রু গড়াচ্ছে। কাঁপা কন্ঠে সে বলে,
—কেনো করলে এমনটা?
আইয়ুশ জবাব দেয়না। রুমে ফিরে যায়। ঝিলিকও কদম বাড়ায়। ফের জিজ্ঞেস করে,
—আমি কী এতোটাই ঠুনকো ছিলাম তোমার কাছে? আমাদের ভালোবাসা এতোটাই ফেলনা ছিলো তোমার কাছে যে নিজের বাচ্চাটার কথা পর্যন্ত ভাবলেনা? বলো কেনো করলে এমন?
—এখান থেকে যাও ঝিলিক।
—এখন আমায় বিরক্ত লাগছে তাইতো?
ঝিলিক এগিয়ে গিয়ে কলার চেপে ধরে আইয়ুশের,
—যদি আপুকেই ভালোবাসতে তাহলে আমার সাথে এমন কেনো করলে? বলো?
—তোমার প্রতি ইন্টারেস্ট নেই আর তাই।
ঝিলিকের হাত থমকে যায়। আইয়ুশ! তাকে যে ভালোবাসতো এই আইয়ুশ সে আইয়ুশ নয়। সে সরে আসে। আহত স্বরে বলে,
—আইয়ুশ! তুমি তো এমন নও। কী হলো তবে তোমার? বলো এখন আমি কী করবো আইয়ুশ? আমি তো মরে যাবো।
—তো যাও!
আইয়ুশের এমন নিরুত্তাপ উত্তর ঝিলিক কখনোই আশা করতে পারেনি। তার মনে হলো-সে বেঁচে আছে কেনো? তার হুট করে বমি পেলো। পেট গুলিয়ে এলো। সহ্য করতে না পেরে মাটিতে বসে পড়লো। মাথা চেপে ধরলো যন্ত্রণায়। আইয়ুশ ব্যস্ত হাতে আগলে নিতে চাইলো। হাত বাড়িয়ে ধরতে চাইলো ঝিলিককে। ঝিলিক থামিয়ে দিলো তাকে। বুকের ওঠানামায় স্পষ্ট তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। তবু বহুকষ্টে বলে,
—ছোঁবেনা আমায়, একদম না। ঘৃণা হচ্ছে আমার নিজের প্রতি। কীভাবে আমি তোমার মতো কাওকে বিশ্বাস করলাম।
আইয়ুশের চোখ কেমন যেনো লাল দেখাচ্ছে; চোয়াল শক্ত হয়ে রয়েছে। ঝিলিক উঠে দাঁড়ালো। এরপর তার আর কিছু বলার নেই। সে কেমন করে যেনো চাইলো আইয়ুশপর পানে। আইয়ুশ সাথে সাথেই মুখ ঘুরিয়ে নিলো। ঝিলিকের বুক মোচড় দিয়ে উঠলো। ধীর পায়ে বের হয়ে গেলো রুম থেকে।
পরিবারের ছোটরা মাতামাতিতে মেতে উঠেছে। আইয়ুশের ছোটো ঐশি-ঝিলিকের চাইতে দু’বছরের বড়। শাহমীদ মির্জা দুই মেয়ে তিয়া-তোতা আর এক ছেলে নির্ঝর। তিয়া-তোতা জমজ। ২০ বছর। আর নির্ঝর সাঁঝের সমবয়সী-২৪। তিয়া বলে,
—আহা! বড় আপু, তুমি তো একদম আপু থেকে ভাবির ট্রানজিশন খুব জোসভাবে করে দিলে।
সকলের মাঝে হাসির রোল পড়ে যায়। বড়রা কিছু আলোচনা করতে নিজেদের রুমে গিয়েছেন। সাঁঝ লাজুক হাসে। নির্ঝর ভেঙ্গায় তাকে,
—কিরে, তুই না বলেছিলি বিয়ে-টিয়ে করবিনা। এখন একেবারে আমাদের আইডলকে বিয়ে করে নিলি?
—এই তোতা, আমরা কিন্তু এবারে ভাইয়া আর আপুর বাসররাতের ব্যবস্থা করব। কী বলিস সবাই?
ঐশি বিরক্ত হলো,
—ওসবের দরকার টা কী? বড় আব্বু তো এখনো কিছু বলেনি।
নির্ঝর জেদ ধরলো,
—আরে ধূর, আমরা সাজাবো বাসর ঘর। কিচ্ছু হবেনা। এমনিতেও বড়মা তো আছেই। এি এক মিনিট! আমাদের প্রিন্সেস কোথায়?
—হ্যাঁ তাইতো, ঝিলিক কোথায় তিয়া?
—আমার তো জানা নেই। ঘুমোচ্ছে বোধহয়। দাঁড়াও আমি ডেকে নিয়ে আসি।
তিয়া চলে গেলো ঝিলিককে ডাকতে। বাকিরা সাঁঝকে নিয়ে অন্যরুমে নিয়ে গেলো। তাদের আবার রুম সাজাতে হবে।
—ঝিলিক, এই ঝিলিক। কোথায় তুই?
ওয়াশরুম হতে পানির কলকল ধ্বনি এলো। তিয়া সেদিকপানে এগিয়ে যেতেই ঝিলিক বেরোলো। ঝিলিককে দেখতেই তোতা উৎফুল্ল হলো। আনন্দমিশ্রিত গলায় বললো,
—এই জানিস, বড় ভাইয়া বিয়ে করেছে।
ঝিলিকের চোখমুখ মলিন দেখাচ্ছে। তিয়া সেসব খেয়াল করলোনা। সে বলে গেলো।
—তাও আবার কাকে জানিন? বড় আপুকে! বড় আপু এখন থেকে আমাদের ভাবি। কীরেএএ…শুনছিস তুই আদৌও?
—হু!
ছোট এক উত্তর এলো শুধু। তিয়া টেনে ধরলো তার হাত। নিয়ে যেতে যেতে বললো,
—চল ঝিলিক। তুই অনেক বড় ড্রামা মিস করেছিস। বড় ভাইয়া যেভানে আপুকে ডিফেন্স করেছিলো তুই তো জানিসই না। এখন চল! বাসরঘর সাজাবো আমরা।
টেনে নিয়ে যায় তিয়া তাকে। ঝিলিকের সামনের রুমখানা আইয়ুশের। তিয়া টেনে নিয়ে যাওয়ার দরুণ তাল সামলানো দায় হয়ে পড়ে তার কাছে। বেরোনোর সময় দরজার কোণে পা লাগে। হোঁচট খেয়ে পরে যাওয়ার আগেই কারও শক্ত বাহুবন্ধনী তাকে বাঁচিয়ে নিলো। ঝিলিক চোখদুটো খিঁচে বেধে রাখলেও না পড়ার সম্ভাবনায় চোখ মেললো। চোখ খুলতেই সামনে আইয়ুশকে দেখেই তার হুটহাট কান্না পেলো। কান্না গিলে কোমড় পেঁচিয়ে রাখা আইয়ুশের কোমড় থেকে নিজের হাত হটায়। আইয়ুশ তখনো তার দিকে চেয়ে। তিয়ার দিকে বিরক্ত চোখে চেয়ে ক্ষিপ্র মেজাজে বললো,
obsession vs love part 1
—সমস্যা কী? আস্তে চলাফেরা করতে পারতিস না? যদি পরে যেতো তখন?
ঝিলিক তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে। মলিন স্বরে অন্যপাশ ফিরে বলে ওঠে,
—পরে গেলে হয়তো শরীরে আঘাত লাগতো অথচ মনের যে ক্ষত তা কীসে সারবে?
আইয়ুশ উত্তর দেয়না। স্পষ্ট অনিহা ভেসে ওঠে ঝিলিকের চোখে। আইয়ুশের স্বর এবার হঠাৎ নিম্ন হয়। বলে,
—সাবধানে চলবি!
ঝিলিকের মনের অবস্থা দূর্বিষহ হয়ে উঠছে যেনো আরও। মানুষটা নিজের জায়গায় অন্য কাওকে রেখে এখন যত্ন দেখাচ্ছে। সবই তো মিথ্যে!
—স্যরি ভাইয়া। সাবধানে থাকবো এবার থেকে।
এই ঝিলিক চল, চল….!
বলেই টেনে নিয়ে গেলো আবার ঝিলিককে।
