হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৪ (২)
সাঞ্জেনা শাজ
শুভ্রতা মেহরাদকে ইমারজেন্সী ফ্লাইটে ঢাকা পাঠানো হয়েছে ।সেখানে চিকিৎসাদীন থাকবে দু’জন। দু’জনের অবস্থাই ক্রিটিকেল। শুভ্রতার এক পায়ে বাজে ভাবে আঘাত লেগেছে। মাথায় সেলাই পড়েছে পাচটা। চুল গুলো ফেলে দিতে হয়েছে। মেয়েটা ক্ষনে ক্ষনে চোখ খুলছে আর বুজছে দীর্ঘ এক অপারেশনের পর মেয়েটা এক প্রকার শয্যাশায়ী। তখনের পর আর জ্ঞান ফিরেনি।
মেহরাদ এখনো কোন রেসপন্স করেনি দীর্ঘ অপারেশনের পরও। ২৪ ঘন্টা পের হয়ে যাচ্ছে। ডক্টরের আশংকা অপারেশন সাক্সেসফুল না হলে এখানের চিকিৎসায় কাজে দিবে না। সিঙ্গাপুরের জন্য সাজেস্ট করছে।
তবুও তারা আশাবাদী। আরও একটু সময় চাচ্ছে। কিন্তু আলতাফ তালুকদার ছেলের জন্য দিশেহারা। তিনি সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যবস্থা ইতিমধ্যে সেড়ে ফেলেছেন। হসপিটালের কড়িডর থেকে একের পর হৃদয় নিংরানো আহাজারি ভেসে আসছে।
তালুকদার বাড়ির সকলে উপস্থিত ইতিমধ্যে হাসপাতালে। সোহানারাও এসে পৌচেছে কিছুক্ষণ আগেই। দু বোন কান্না করতে করতে শান্ত হয়েছে একটু আগে। রোজা কাদছে তার ভাইয়ের জন্য গুনগুন করে। পোয়াতি মেয়েটাকে স্বান্তনার বাণী শুনিয়েও কাজ হচ্ছে না। জাবের ছুটোছুটির ফাকেও সামলানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু কাজ হচ্ছে না।
এতো সব কিছুর মধ্যে নিস্তব্ধ পাথরের মূর্তি বনে বসে আছে শায়ান তালুকদার আর রিমা বেগম। নিজের অজান্তেই বিশাল বড় এক সত্যের উন্মোচন করে দিয়েছে রিমা বেগম। সেই থেকেই সব শান্ত তাদের মধ্যে। একদম পিন পতন নীরবতা। শায়ান তালুকদারের মনে হলো এই ১৯ শে ডিসেম্বর বুঝি তার দু সন্তানকেই কেড়ে নিতে এসেছে।
রায়হান সহ তার পরিবারের সকলে এসেছিলো কিন্তু তালুকদাররা কেউ-ই পছন্দ করেনি তা। তাড়িয়ে দিয়েছে সন্দেহের তীর তাদের দিকে গেথে। তাদের অভিযোগ, এ কোন এক্সিডেন্ট নয়।ঘোর চক্রান্ত। আর এই চক্রান্ত কগান বংশ ছাড়া আর কেউইই করবে না তাদের বিরুদ্ধে। এদিকে রায়হান শুভ্রতার জন্য পাগলামু করেছে বেশ। সে তো এমনটা চায়নি! কি করে হয়ে গেলো? সবচেয়ে বড় কথা, তার ছেলেদের মধ্যে কেউ-ই এ কাজ করেনি। তাহলে?
শুভ্র সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে শুভ্রতা। মেডিসিনের এক সোধা ভোতা ঘন্ধ৷ এন আই সি ইউ’র নিস্তব্ধতা ভেঙে মিশিং এর পিপ পিপ শব্দ। এক পা সম্পূর্ণ বেন্ডেজ মুড়ানো, ঝুলিয়ে৷ মুন্ডন করা মাথায় শুভ্র ব্যান্ডেজে লালিমা চিহ্ন।
চোখ দুটো নিভু নিভু। তবুও জোর খাটিয়ে খুলে রেখেছে অশ্রু বিসর্জনের জন্য। অঝোর ধারায় ফোটা বৃষ্টির ন্যায় পানি ঝড়ছে দু’চোখের কোল ঘেঁষে। ঠোঁট দুটো নাড়ানো দায়। কিন্তু রক্তিম ক্ষতবিক্ষত মুখশ্রীতে অব্যক্ত করুণ যন্ত্রণা। এক বুক হাহাকার।
একটুকরো আগেই জ্ঞান ফিরেছিলো তার। কিন্তু, চোখ দুটো খুলতে না পাড়লেও বেডের সাথে বসা বাবার করুণ, নিভু স্বরের আহাজারি শুনেছে। সে তার বাবার মেয়ে না। মা’য়ের সন্তান না। তালুকদার বাড়ির কিচ্ছু না। এই তিক্ত সত্যি জানার আগে তার রুহ এর জগতের মালিকের দর্শনে চলে গেলে ভালো ছিলো না?
একটু আগের ঘটনা…
শুভ্রতাদের যখন জ্ঞানহীন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকায় আনা হয়েছে। তখন শুভ্রতার অতিরিক্ত ব্লাড লস হওয়ায় কয়েক ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছিলো ইতিমধ্যে। আরও প্রয়োজন ছিলো। শায়ান তালুকদার দিতে চেয়ে এগিয়ে যেতেই ডক্টর নিষেধ করলো বারবার। এমনকি পরিবারের কারো থেকেই নিবে না বলে জানালো। নিজের রক্তের মানুষদের থেকে ব্লাড না নেওয়াই যথেষ্ট ভালো বলে সাজেস্ট করেছেন তারা। কখনো কখনো এতে ভয়াবহ ক্ষতিও হয়ে যায় রুগীর। এমনিতেই রুগীর অবস্থা করুণ। তাই তারা নিষেধাজ্ঞা জাড়ি করেছিলো। কিন্তু, এদিকে কোন ব্লাড ব্যাংক থেকে রক্ত সংগ্রহেও দেরি হয়ে যাচ্ছিলো।
সবসময় দূরছাই করা রিমা বেগমও পালিত মেয়ের এরকম করুণ মৃত্যুশয্যা দেখে ভেঙে পরেছিলেন। যতই হোক, প্রথম মা ডাক শুনা এই মেয়েটার কাছ থেকেই। সে যখন পি এইচ ডির জন্য বাহিরে গেলো তখন, চাল হিসেবে সকলকে জানিয়েছিলো সে কনসেভ করেছে। সে এতো দ্রুতই সন্তান নিতে চায়নি। ভেবেছিলো তালুকদার পরিবারের বিংশ গড়িমা ধূলিসাৎ করে তারপর নিজেদের নিজের মতো আলাদা জীবন সেট করে সংসার এগোবে। কিন্তু শায়ান তালুকদারের জোড়াজুড়িতে না পেরে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। পড়াশোনা বাদ দিয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া তখন তার কাছে খুবিই তুচ্ছ কিছুই মনে হয়েছিলো বই কি! দূর দেশে কেউ আর তার সত্যটা জানেনি। কখনো কেউ কল্পনাও করবে না এসব, তার এই-ই ধারনা ছিল। হয়েছিলোও তাই। কেউ কোন সন্দেহ করেনি। বরং সময় অসময় তার খোঁজ খবর রেখেছে।
আর তিনিও সময় মতো শুভ্রতাকে এক বাঙালী পরিবার থেকে এডোপ্ট করে নিয়েছিলো। সে থেকে মেয়েটা তার সন্তানের মতো ছিলো যতদিন সত্যি সত্যি নিজের কোলে সন্তান এলো। শুভ্র এলো। কিন্তু ভাগ্যের নিদারুণ নিষ্ঠুরতায়, সে তার নিজ সন্তানকে হাড়িয়েছে ওই পালিত মেয়ের জন্য। এটাই সে কোন ভাবে মানতে পাড়েনি।
কিন্তু, বহু বহুদিন পর আজ আবার মৃত্যুশয্যায় থাকা মেয়েটার জন্য মায়া হচ্ছে। অন্তর জ্বালাপোড়া করছে। দগদগে অনুভূতি হচ্ছে। এক সন্তান নেই। এই মেয়েটাও থাকবে না সে মানতে পাড়বে না। তাইতো অথই সাগরে হাবুডুবু খাওয়া পথহারা নাভিকের মতো সকলের সামনে সত্যটা জানিয়েছে। বলেছে, শুভ্রতার সাথে এ বাড়ির রক্তের কোন সম্পর্ক নেই। সে শুভ্রতাকে এডোপ্ট করেছিলো ইউ কে থেকে। নিজের সন্তান হিসেবে। ও এই পরিবারের কেউ না। রক্তের কোন সম্পর্ক নেই। দয়া করে যেন যার সাথে ব্লাড মেচ হয়, সে যেন ব্লাড ডোনেট করে।
একে একে সকলে স্তব্দ বিমূঢ় হয়ে ছিলো কিয়ৎক্ষন। রা করতে ভুলে বসেছিলো। সেই বিমূর্ততা কাটিয়েছে মেহরাদের ক্রিটকাল অবস্থার আভাস পেয়ে। বাড়ির কর্তরাা সহ জাবের আদনান কাগজ পত্র রেডি করছে। মহিলারা কান্না করছে মুনাজাতে , দোয়া চেয়ে, দুই সন্তানের জন্য। তাদের পরিবারের জন্য।
স্ত্রীর ধোকা, নিজ সন্তানের মতো এতোকাল দেখে আসা মেয়েটার করুন অবস্থায় শায়ান তালুকদার একদম ভেঙে পরেছেন। নিঃস্ব এক বাবা হয়ে মেয়ের শিয়রে বসেছিলো মেয়ের জ্ঞানহীন অবস্থায়। আহাজারি করে জানিয়েছে, এ দুনিয়া তাকে কেন এতো এতে পরিক্ষার সম্মুখীন করলো! তার দোষ টা কোথায়? কোন পাপের শাস্তি এ রবের পক্ষ থেকে! তার কেন এতো দহন! এই এক সময়, এক দিন, এক তারিখ, তাকে কেন নিঃস্ব করে দিয়ে যায় সবসময়!
এক সময় ছোট সন্তানকে নিয়ে নিলো আজ আবার জীবনের তিক্ত এক সত্য জানলো। এই মেয়েটা তার রক্তের না? সে এই মেয়েটার প্রকৃত বাবা না! স্ত্রীর এ ধোকা! ভদ্রলোক সত্যিই ভেঙে পরেছেন একদম। যতটা ভাঙ্গলে, পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়ে বিয়ে করা ভালোবাসার স্ত্রীর প্রতি ঘৃণা জন্মায়, ঠিক ততটা। মনে মনে কঠিন সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে সে। মেয়ের কাছে এসবই বলেছে নিজেকে হালকা করতে। কষ্টে বুক ভেঙে এসেছে তার বারবার। অশ্রুবিসর্জন দিয়েছে অগনিত বার।
কিন্তু, তার অজানা ছিলো শুভ্রতার জ্ঞান ফিরেছে। ইন্দ্রিয় সজাগ, কিন্তু চোখ মেলতে পারে না। কোন মুভমেন্ট করতে পাড়েনি সাথে সাথেই। কিন্তু বাবার সমস্ত কথাই কানে পৌচেছে। মস্তিষ্ক ধারন করেছে আস্তেধীরে। আর সবটা আয়ত্তে আসতেই হার্ট রেট তড়তড় করে বাড়তে শুরু করেছে। অবাদ ধারায় অশ্রুপাত করছে বুজে আসা চোখ দুটো দিয়ে।
মনিটরের পিপ পিপ শব্দের স্পিড বাড়তেই ডেস্ক থেকে নার্স দু’জন ছুটে আসলো একটু দূর থেকে । জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলছে মেয়েটা। শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। ডক্টর ডেকে আনতে ছুটে গেলো একজন। বাহির থেকে তালুকদার বাড়ির সকলে ছুটে আসলো এন’আই’সিউ কেবিনের সামনে। ভিতরে আসতে চাইলে সকলে, নার্সরা কর্কশ কন্ঠে বাহিরেই থাকতে বললো। কেবিনে ভীর করার নিষেধাজ্ঞা জানিয়েছে। এদিকে শুভ্রতার এ অবস্থা দেখে সকলেই মুখে হাত চেপে কান্না আটকালো। আতংকিত তাদের মন। তাদের পরিবারে এ কোন গ্রহণ লাগলো? ছেলে মেয়ে দুটোকে তাদের কাছে ফিরিয়ে দিক আরশের মালিক।
হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৪
ডক্টর এসে শুভ্রতাকে কিছু মেডিসিন দিলো, মেয়েটা আস্তে আস্তে নিস্তেজ হতে হতে একটা হাত উচিয়ে দিলো। চোখের সামনে শুধু তার মেহরাদ ভাই ভাসছে। তাকে একটু ধরতে চায় সে, ছুতে চায়। তার কাছে গিয়ে চুপটি করে বসে থাকতে চায়। তার মস্তিষ্ক জুড়ে তখন শুধু এটাই বিচরণ করছে ‘তার মেহরাদ ভাই ব্যাতিত তাকে লেউ ভালোবাসে না। তাকে কেউ ভালোবাসে না। কেউ না। কেউ না…” ব্যাস, তলিয়ে গেল ঘোর অন্ধকারে। নিস্তেজ হলো সমস্ত দেহ মন মস্তিষ্ক। মিনিটের জন্য দুনিয়ায় ফেরা মেয়েটার খেয়ালই হলো না তার মেহরাদ ভাই’ও তো তার সাথে ছিলো। মানুষটা কই? তার পাশে নেই কেন? তার কি অবস্থা…?
