Home Tell me who I am 2 Tell me who I am 2 part 7 (3)

Tell me who I am 2 part 7 (3)

Tell me who I am 2 part 7 (3)
আয়সা ইসলাম মনি

কারান থেমে মুচকি হেসে আড় চোখে তাকাল। সম্মোহনী গলায় বলল, “এত তাড়া কীসের? আমি তো চাইলে তোমাকে এক্ষুনি বাচ্চার মা বানিয়ে দিতে পারি, কিন্তু সমস্যা হলো, তাহলে বেবিটা আমাদের রোমান্সে অনেক বাঁধা দিবে। তাছাড়া ওকে তো আর এসব হওয়ার পরই শিখানো উচিত না, বলো?”
মিরার কটমট করে তাকিয়ে বলল, “তুমি এতটা অসভ্য কেন, কারান?”
কারান হেসে রান্নাঘরের সিঙ্কের দিকে এগিয়ে গেল। ঝকঝকে কলের তলায় শীতল জলের ধারায় সবজিগুলো ধুতে শুরু করল। জলধ্বনির মধ্যে দিয়ে কারানের কণ্ঠ ভেসে এলো, “দেখো, এই ব্যাপারে আমি কিন্তু ভীষণ সিরিয়াস। আমি ভেতর থেকে ছটফট করব, জ্বলে-পুড়ে খাক হয়ে যাব, যখন আমার বদলে ও তোমার কোলের মধ্যে মাথা রেখে ডট ডট খাবে।”

মিরার ভ্রূ ঊর্ধ্বমুখী হলো। অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলেও তার রক্তস্রোত ক্রোধে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। কারান ফাঁকে একবার ক্ষণিকের দৃষ্টিতে মিরার চোখে তাকিয়ে ঠোঁট দুটো চোখা করে চুমু খেয়ে নিল। আবার নির্বিকার মুখে ফের জলে হাত চালিয়ে ধুতে থাকল। শান্ত গলায় বলল, “আজব! তুমি এভাবে তাকাচ্ছ কেন? তোমার মাইন্ড ঠিক করো, স্টারলিং। আমি চুমু খাওয়ার কথা বলেছি।”
রাগে ফুঁসে উঠল মিরা। চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে বলল, “নষ্টের ঘরের নষ্ট! বাচ্চা জন্ম নিয়েই আমাকে চুমু খেতে আসবে, তাই না? ডাবল মিনিং করে কথা বলবে, তারপর বলবে আমি ভুল বুঝেছি!”
কারান এগিয়ে আসল মিরার দিকে। এক নিমিষে কোমর আঁকড়ে ধরল। ঠোঁটে ধূর্ত হাসি ফুটিয়ে ঝুঁকে নেশাভরা স্বরে বলল, “শেম অন ইউ, সুইটহার্ট। তুমি কি ভাবো, আমি এত ভদ্র যে শুধু উপরের দিকটা খাওয়ার কথা বলব?”
চোখের দিকনির্দেশে সে স্পষ্ট ইঙ্গিত করল নিচের দিকে। ক্রোধে ক্ষিপ্ত হল মিরা। রক্তচক্ষুর দাহে সে কারানের হাত সরিয়ে দিল কোমর থেকে। কারান মুখ শক্ত করে নিজের আবেগকে দমন করল। নির্বিকার ভঙ্গিতে সবজি তুলে নিয়ে এগিয়ে গিয়ে কাটতে শুরু করল। তার শীতল মুখশ্রী মিরার ক্রোধকে আরও উসকে দিল। দাঁত চেপে সে বলে উঠল, “শয়তানের ঘরের শয়তান! আজ তোমাকে আমি গুলি করে উড়িয়ে দেব!”

গুলির নাম শুনেই কারানের মুখে গাম্ভীর্য ঘনীভূত হলো। এগিয়ে এসে শান্ত কণ্ঠে বলল, “ভালো কথা মনে করেছ। তুমি তো গান ইউজ করতে জানো না। তোমাকে শেখাতে হবে, সুইটহার্ট।”
“আমার এসব শিখতে হবে না। সরো তুমি।”
সে কারানকে ঠেলে দূরে সরাতে চাইছিল। কিন্তু কারান পরিহাসমিশ্রিত ভঙ্গিতে মিরার হাত আঁকড়ে ধরে হঠাৎই টেনে তাকে নিজের উদরের সঙ্গে একাকার করে ফেলল। তার আঙুলগুলি মিরার হাতের নীচ থেকে চলে গিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ছুরিটা তুলে নিল। মিরাকে নিজের সাথে চেপে রেখে, পিছনে দাঁড়িয়ে কারান সবজি কাটার টুংটাং শব্দ তুলে দুষ্টু হেসে বলল, “আচ্ছা, তুমি কি সত্যিই ডাবল মিনিং কথার মানে বুঝতে পারো?”
মিরা বিরক্ত ভঙ্গিতে তাকে কনুই দিয়ে সরাতে সরাতে বলল, “খুব ভালোই বুঝি।”
কারান আবার কোমরে চাপ দিল, টান দিয়ে তার দেহটাকে আরও শক্ত করে নিজের বৃত্তে আবদ্ধ করল। তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “না, তুমি বুঝ না। যদি বুঝতে তবে সেই দিন ফুচকা খাওয়ার সময় আমি যে কথাটা বলেছিলাম, তার গুপ্তার্থ বুঝে ফেলতে।”

স্মৃতি খুঁজে বের করার চেষ্টা করল মিরা। কিন্তু স্পষ্ট মনে পড়ছিল না। ভ্রূ আরও কুঁচকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “কোন কথা?”
কারান মুখের কোণে বিদ্রুপমাখা হাসি ফুটিয়ে উচ্চারণ করল, “তুমি এত বড় হা করতে পারো?”
বাক্যটি কানে পৌঁছতেই মিরার দৃষ্টি বিস্ফোরিত হয়ে উঠলো। তার ঠোঁট অনিচ্ছায় আধখোলা হয়ে গেল, আর চোখে জমলো বিমূঢ় বিস্ময়। হৃদকম্পন যেন আচমকা বেড়ে গেল। তারপর হঠাৎই সে শক্ত করে মুঠি আঁটল, আর কারানের উদরে এক চোরা ঘুসি বসিয়ে দিল। আঘাতের পর নিজেকে সরিয়ে নিয়ে সে ঝট করে ঘুরে দাঁড়াল, আর দেখতে পেল—কারান এখনও সেই তির্যক হাসি খেলাচ্ছে ঠোঁটে।
এই দৃশ্য দেখে মিরার রাগ চূড়ান্তে পৌঁছল। সে ক্ষিপ্ত হয়ে কারানের পায়ে এক লাথি বসিয়ে বলল, “অসভ্যেরও অসভ্য, নির্লজ্জেরও নির্লজ্জ! তোমার ভেতরে এতটা লাগামহীনতা কেন, কারান?”

কারান ব্যথার তোয়াক্কা না করেই পায়ের দিকে তাকাল, আবার সেই একই হাসি খেলল তার মুখে। আসলেই কতটা অশোভন কথা সে বলে ফেলেছিল, অথচ সেই অর্থ এতদিনে মিরার বোধগম্য হয়েছে। মিরার এই দেরিতে পাওয়া উপলব্ধিতে সে বিদঘুটে বিনোদন খুঁজে পেল। আবারও মিরাকে ঘুরিয়ে নিজের আয়ত্তে নিয়ে এলো। তার থুতনি মিরার কাঁধে স্থির হয়ে রইল। ছুরি দিয়ে টুপটাপ করে সবজি কাটতে কাটতে ব্যঙ্গমিশ্রিত কণ্ঠে কারান বলল, “সমস্যাটা কোথায় জানো? এই কথাটাই যদি আমি ইংলিশে বলতাম, তুমি ঠিকই রস আস্বাদন করতে। কিন্তু বাংলায় বলেছি বলেই এত শক খেয়েছ। দিস ইজ নট ফেয়ার, জান।”
মিরা ভ্রূরেখা গভীরভাবে ভাঁজ করে বলল, “সমস্যা ভাষায় নয়, সমস্যা তুমিতে। আমার মনে হয় না পৃথিবীতে তোমার মতো আর কোনো নির্লজ্জ পুরুষ আছে। লাগামহীন কথার প্রকৃত কিং তুমি।”
“অপবাদ দিচ্ছ? অ্যান্ড ইয়েস, আই অ্যাম ডেফিনিটলি দ্য কিং। বিকজ ইট’স কারান চৌধুরি, ইউ নো। কিন্তু তুমি আমাকে খারাপ বলতে পারো না। যদি সত্যিই খারাপ হতাম, তবে বউয়ের অসুস্থতার সুযোগ নিতাম। কিন্তু দেখো, এই কয়েকদিন আমি নিজেকে কতটা কন্ট্রোলে রেখেছি।”
মিরা বিরক্তির সঙ্গে মৃদু হেসে উঠল, “তোমার সান্নিধ্যে আমিও দিনে দিনে লাগামহীন হয়ে যাচ্ছি। কি একটা জিনিস আবিষ্কার করেছে আমার শ্বশুর!”

কারান ছুরি নামিয়ে মিরার দিকে তাকিয়ে ভ্রূ উঁচাল, “শ্বশুর কেন বলছ? বলো আমাদের রাইটার। শি’জ সাচ আ জিনিয়াস, রাইট বেবি?”
মিরা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “ঢং করছ?”
“একটু। কিন্তু তুমি তো আমার সেই ইচ্ছেটা পূরণ করোনি, সোনা।”
“কোনটা?”
কারান হাসি চেপে মিরার কানের কাছে ফিসফিস করল, “হা করার ব্যাপারটা।”
এই কথা শুনে মিরা রাগ আর লজ্জা নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছিল, কিন্তু কারান কোমরে শেকলের মতো হাত শক্ত করে ধরে রাখল। তার শরীর কারানের বেষ্টনী ভেদ করে আর সরতে পারল না। বিরক্ত হয়ে বলল, “আসলে রোমানা ভাবি তোমার এসব বেহায়া কথার সঠিক জবাব দিতে পারত। আমি বেশি ভোলাভালা হয়ে গেছি।”
“আমার সঙ্গে এতদিন কাটানোর পরও নিজেকে ভোলাভালা দাবি করলে যে আমার ইজ্জত যাবে।”
মিরা মুখ টিপে হেসে বলল, “ওই ইজ্জত তো অনেক আগেই লুটে নিয়েছি আমি। এখন তুমি এক্সপায়ার্ড, অর্থাৎ ইউজড প্রোডাক্ট।”

কারান প্রশস্ত মুখে হেসে উঠল। সে হাত আরও শক্ত করে মিরাকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, “ছি! আমার তথাকথিত ভোলাভালা বউ আমাকে ইউজ করে ফেলেছে! ছি কারান, লজ্জা কর! তোর মুখ এখন বউয়ের শাড়ির নিচে লুকিয়ে ফেলা উচিত।”
মিরা চোখ ঘুরিয়ে কারানের দিকে তাকাল। লজ্জায় তার গালের দু’পাশে লালিমা ভরে উঠল, মনে হয় গাল দুটো ফেটে যাবে। যদিও সে এখন শাড়ি পড়ে নেই, তবে কারানের ইঙ্গিতের গভীরতা ঠিকই উপলব্ধি করতে পারল। কারান ঠোঁটের কোনে হালকা হেসে চুল ব্যাকব্রাশ করতে করতে বলল, “I said saree, not underskirt.”
মিরার মনে হল, এই মুহূর্তে এই লোককে কিছু উত্তর দেওয়া মানে আরও গভীর, আরও বিপদসীমার দিকে ধাবিত হওয়া। কিন্তু কারানের নির্লজ্জ হাসি তাকে আরও বিব্রত করল। স্বাভাবিকভাবেই মিরা হেসে তার হাত ধরল, যেন মুহূর্তটি হালকা হতে পারে। কারান মিরার অভ্যন্তরীণ অনুভূতি বুঝেও কিছু বলল না। এরপর মুখের মধ্যে জিভ দিয়ে গাল ঠেলে বিড়বিড় করল, “এভাবে জোর করে হাসি চাপতে গিয়ে আমার গাল ব্যথা হয়ে যাচ্ছে।”
মিরা ঘুরে বলল, “কিছু… কিছু বললে?”

“উঁহুঁ।”
কারানের ঠোঁটে আবার সেই বাঁকা, প্রলুব্ধ হাসিটা ফুটে উঠলো। মিরা কিছু না বলে সামনে তাকাল। কিচেন বোর্ডের উপর দুজনেই নিখুঁত সমন্বয়ে বাকি সবজি কাটতে লাগল। কারান হঠাৎ মৃদুভাবে মিরার ঘাড়ে আলতো চুমু দিল। মিরা হেসে কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল। এই হালকা স্পর্শেও তার হৃদয়ের অগ্নিশিখা জ্বেলে উঠল। তবুও মিরা কিছু বলল না, শুধু হালকা ঢোক গিলল।
দুজন একসাথে রান্নার উপকরণ প্রস্তুত করল। কারান প্যান বসাল, মিরা তাতে মশলা ছিটাল। কারান মাংস ঢেলে দিল। মিরা ফাঁকে তার গালে চুমু দিল। সে মিরার দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল। এরপর তরকারি নাড়তে শুরু করল, আর মিরা আলতো হেসে বলল, “ওয়েট, তোমার রান্নায় একটু দম এনে দিই।”
কারান কপাল কুঁচকে তাকাল। এই ফাঁকে মিরা ফোনে একটি সফট গান চালিয়ে দিল। সকালবেলার এমন স্নিগ্ধ সুর মুহূর্তে মন শান্ত করে দিল। কারান ভ্রূ উঁচিয়ে বলল, “ওহ, বেব, দ্যাট’স সুইট।”
এরপর মিরার হাত ধরে ঘুরিয়ে নিল। দুজন একসাথে মাথা নাড়াতে নাড়াতে নাচতে লাগল। মাঝে মাঝে মিরা তাকে জড়িয়ে ধরল, আর সে মিরার ডান হাতের উলটো দিকে আলতো চুমু খেল। মিরা হাসল। তারপর আবার রান্নায় মনোযোগ দিল।

এই প্রশান্ত মুহূর্তে অকস্মাৎ মিরা কারান থেকে একটু দূরে সরে গেল। কারণ জানে, যে কথাটা এখন বলতে চলেছে, তা কারানকে আগুনের মতো উত্তেজিত করে দিতে পারে। মিরা আলতো কাশি দিয়ে শান্ত গলায় বলল, “কারান, আমি কিন্তু ইচ্ছে করেই রেলিংয়ে উঠেছিলাম। কারণ আমি জানতাম, যদি পড়েও যাই—তুমি ঠিকই ধরে ফেলবে।”
কথাটা শুনে কারান ঘুরে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল, হাতে থাকা খুন্তিটা শক্ত করে ধরল। মিরার দিকে তাকিয়ে কিড়মিড় করে বলল, “খুন্তির বারি মারব তোকে! আবার রাগাচ্ছিস?”
মিরা কারানের রাগ বুঝে হাসিটা জোর করে মুখে চেপে রাখল। কারান তার কাছে এগিয়ে এলো। কটমট করে বলল, “বুদ্ধি কি বাবার বাড়িতে সিন্দুকে তালা দিয়ে রেখে এসেছ? ইডিয়ট!”

মিরা দুই হাত দিয়ে কারানের গলা আঁকড়ে ধরে তার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল। ফিসফিসে আওয়াজে বলল, “আমি অনেক ভেবে দেখেছি, তোমার মধ্যে কিন্তু ব্যাপার আছে, হানি। রেগে গেলে তোমাকে আরো বেশি সে”ক্সি লাগে। চেহারাটা লাল টকটকে হয়ে যায়, একদম ঝাল মরিচের মতো! ইচ্ছে করে কামড় দিয়ে খেয়ে ফেলি।”
মিরা একটা হালকা কামড়ের ভঙ্গিমা করল। কারান নেশাগ্রস্ত চেহারায় দাঁত চেপে ধরে তাকাল। হঠাৎ করে সে মিরার ঠোঁটে কামড় বসিয়ে দিল। মিরা চিৎকার না করে ঠোঁটের দিকে হাত নিল। হাতটা চোখের সামনে এনে ধরল। সামান্য রক্ত ঝলমল করলেও সে রাগ দেখাল না; উলটো চোখে নেশার ঝিলিক নিয়ে এক ভ্রূ উঁচু করল।
মিরার এই দমনকৃত উচ্ছ্বাস আর প্রলোভনময় চাহনি দেখে কারান ঠোঁট কামড়াল, অবশিষ্ট মনকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আবার রান্নায় মন দিয়ে বলল, “কন্ট্রোল ইয়োরসেলফ, সুইটহার্ট। এরপর কিন্তু রান্না রেখে কাঁধে তুলে বেডে নিয়ে যাব।”

মিরা হঠাৎ একটি ধূর্ত আইডিয়া পেল। হালকা খুকখুক কাশি দিয়ে বলল, “কারান, আমার শ্বশুর মা শা আল্লাহ, বেশ আকর্ষণীয় ও ব্যক্তিত্বময় মানুষ।”
কারান কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। কাজ করতে করতে হালকা গলায় বলল, “হুঁ…”
“আর ভাসুরটাও খুব স্মার্ট, মা শা আল্লাহ।”
এবার কারান হালকা ভ্রূ কুঁচকে বলল, “ওকে… আর স্বামী?”
“আস্তাগফিরুল্লাহ!”
কারান শান্ত চেহারায় বলল, “আমার বউয়ের নজর এখন বাড়ির অন্য দিকে চলে যাচ্ছে। এবার মনে হচ্ছে ভাই আর বাবার গলা কাটতে হবে।”
মিরার চোখ কপালে উঠল। অবাক কণ্ঠে বলল, “নাউজুবিল্লাহ!”
“আর তোমারটাও।”
“ইন্না-লিল্লাহ!”

কারান কিড়মিড় করে বলল, “আরেকবার এমন কথা বলে দেখো, মিরা। তোমার বুক চিড়ে হার্ট বের করে আনব।”
মিরা কারানের অনড় মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল যে তার কথাগুলো কারানের অন্তরে মোটেও গ্রহণযোগ্য হয়নি, যদিও সে নিজের ভঙ্গিমায় নিস্পৃহ ও শান্ত। কিন্তু কারানের চোখের মণি যেন আগুনের জ্যোতি হয়ে জ্বলে উঠেছে, আর গলার নীল রগগুলো ফুলে ফুলে দৃশ্যত প্রতিক্রিয়া দিচ্ছে। সে দাঁত চেপে মিরার দিকে তাকিয়ে আছে।
মিরা লক্ষ্য করল, যদি সে এখনো এই বিষয় ধরে রাখে, কারানের রাগ আরও বাড়বে। তাই হঠাৎ করে বিষয় পাল্টিয়ে বলল, “কারান, তোমার কাছে এখন কত টাকা আছে?”
কারান ওভেনে একটি খাবার আইটেম ঢুকিয়ে দিয়ে, আবেগহীন কণ্ঠে বলল, “জানি না।”
মিরা বুঝল, রাগ এখনও মিশে আছে কারানের কণ্ঠে। তাই সে কপাল কুঁচকে, হালকা অসহায় ভঙ্গিতে বলল, “এত রাগ দেখাতে হবে না, বলো না।”

“জানলে তো বলব। এগুলো কি হিসেব করে রাখার বিষয়?”
মিরা অবাক হয়ে বলল, “কি বলছ? টাকাপয়সা হিসেব করার বিষয় না? তাহলে কি হিসাব করা উচিত?”
কারান দুই হাত উপরে তুলে আড়মোড়া ভেঙে বলল, “বউ কয়টা চুমু দিচ্ছে, আর কয়টা দিতে কিপটেমি করছে।”
মিরার গাল লজ্জায় রক্তিম হয়ে গেল। তবুও সে শান্ত কণ্ঠে বলল, “সবসময় এসব বলতেই হবে? অন্তত আন্দাজে কিছু বলো।”
কারান গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “কয়েক ট্রিলিয়ন।”
মিরা মুখ বেজার করে বলল, “মজা করছ? তুমি কি বিল গেটসের থেকেও লোডেড নাকি?”
হঠাৎ করেই কারান পেছন থেকে মিরাকে আলিঙ্গন করল। ওভেনের দিকে তাকিয়ে খাবার হওয়ার অপেক্ষা করতে করতে বলল, “হুম।”
মিরা ভ্রূ কুঁচকে মোচড়ামুচড়ি করতে করতে বলল, “এই সরো তুমি! সবসময় এমন করবে! তুমি কি ডাকাতি করেছ নাকি?”
“হুম।”

মিরার চোখ অবাক হয়ে চড়কগাছ। সে মুখ ঘুরিয়ে কারানের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, “কিহ?”
“ব্যাংক রবরি করেছি। অর্থাৎ তোমার হাসব্যান্ড বিল গেটসের থেকেও ওয়েলথি।”
মিরা এবারও রাগে মুখ লাল করে বলল, “তুমি একটা মিথ্যুক, কারান। তুমি ডাকাতি করেছ, আর তোমাকে তো পুলিশ না ধরে বসে থাকবে?”
“পুলিশ তো জানেই না।”
মিরার মনটা হঠাৎ বিষণ্ন হয়ে গেল। কারণ সে ভালোই বুঝতে পারছিল—কারান সবই মজা করে বলছে, কিন্তু তার কণ্ঠের অস্বাভাবিক স্থিরতা, চোখের ধারালো দৃষ্টি সবই অন্যরকম প্রাধান্য বহন করছে। মৃদু হতাশার সঙ্গে মিরা বলল, “আচ্ছা, তাহলে আমাকে যে সব গিফট দিয়েছ, সেগুলো সবই কি হারাম অর্থের?”
“সব হালাল, মহারানি। ওগুলো তোমার স্বামীর পরিশ্রমের ফল। এমনও গেছে, আমি টানা তিন রাত ঘুমাইনি, শুধু কাজের জন্য।”
“আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মালিক তুমি, শুধু বিজনেস করে—এটা কীভাবে সম্ভব?”

কারানের চোখে নিস্পৃহ দৃঢ়তা ফুটে উঠল। জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে ধীরে ধীরে বলল, “ওকেএএএ! তোমাকে আমি হিসেব দিই, তুমি নিজেই বিচার করো। আমার টেক্সটাইল গ্রুপ এক বছরে পঁইত্রিশ বিলিয়নের বেশি রেভিনিউ আনে। প্রফিট মার্জিন বাদ দিয়েও, শুধু গ্রস রেভিনিউ শেয়ার হিসেব করলেই আমার ইনকাম মাসে চারশো পঞ্চাশ কোটি। আমি এমন সব বিজনেস হ্যান্ডেল করি, যেগুলোর নামও অনেকে প্রোপারলি প্রোনাউন্স করতে পারে না। দুবাই থেকে দোহার, মিলান থেকে ম্যানহ্যাটান আমার রিয়েল এস্টেট প্রজেক্টগুলো শুধু ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট না, দে রিশেইপ স্কাইলাইন্স। সেখান থেকে মাসে আরও তিনশো কোটি আসে। অ্যাট টুয়েন্টিওয়ান, ডিউরিং মাই এন সি স্টেট ইয়ার্স, আমি আমার এআই অ্যান্ড অটোমেশন কোম্পানি গড়ে তুলি, সেটা এখন ইউরোপের সতেরোটা ন্যাশনাল গভার্নমেন্ট সার্ভার অপারেট করে। শুধু সফটওয়্যার লাইসেন্স ফি থেকেই মাসে আসে দু’শো কোটি। তুমি তো জানোও না, আই ওন কন্ট্রোলিং স্টেইকস ইন সিক্স ডায়মন্ড মাইনস অ্যাক্রস আফ্রিকা। ওখান থেকে প্রতিদিন জেনারেট হয় লক্ষাধিক কোটি রেভিনিউ। ব্যাংক অব সুইজারল্যান্ড, এইচ এস বি সি, এমিরেটস এন বি ডি—সবখানেই আমার অফশোর হোল্ডিংস ছড়ানো। শুধু ইন্টারেস্ট ইনকামেই মাসে আসে একশ কোটি। আর ইনভেস্টমেন্টস? নাজড্যাক বা ডাও জোনস যেভাবে ফ্লাকচুয়েট করে, আমার অ্যাসেট ভ্যালুও তেমনই রাইজ করে। আমি চাইলে তোমার জন্য পুরো রাজপথ হীরায় বিছিয়ে দিতে পারি। আর যে হোপ ডায়মন্ড দিয়েছিলাম, ওটা তো আমার কোল্ড ভল্টের সবচেয়ে ইনসিগনিফিক্যান্ট স্টোন। অন অ্যাভারেজ, আই আর্ন একশ পঞ্চাশ থেকে দুইশো কোটি এভরি সিঙ্গেল ডে, তাও সব হিসেব বলিনি। কারণ মানি ফর মি ইজ দ্য মোস্ট রিপ্লেসেবল অ্যাসেট। আমার সবচেয়ে ইরিপ্লেসেবল প্রপার্টি কি জানো?”

মিরার মাথা ভারী হয়ে গেল। সে চোখ বড় করে তাকাল। কিন্তু তবুও উত্তরটা জানা চাই, তাই বিস্ময় মিশ্রিত কণ্ঠে বলল, “কি?”
কারান তার দিকে গভীর চোখ রেখে বলল, “দ্যাটস ইউ।”
মিরা ঠোঁটে বিস্তৃত, উজ্জ্বল হাসি ফোটাল। ঘুরে কারানের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি এভাবে আমাকে পাগল না করলেও পারতে, কারান। আমি আর জীবনেও তোমাকে এসব টাকাপয়সার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করব না।”
“তুমি কি সব বুঝেছ?”
“অর্ধেকটা আমার মাথার উপর থেকে উড়ে গেছে। আর বাকিটা বুঝতে চাই না।”
হঠাৎ করেই কারান মুখের ভঙ্গি বদলাল। চোখ ক্ষুদ্র করে মুখে ভারী ভাব নিয়ে বলল, “মিরা, আমি একটা বড় ভুল করে ফেলেছি।”
মিরার কৌতূহল জাগল। “কি হয়েছে?”
কারান মুখ ছোট করে বলল, “বিশাল, অপরিসীম একটা ভুল করেছি।”
মিরা দ্রুত তার গলা ধরে বলল, “কি ভুল?”
“আমার রিগ্রেট হচ্ছে, মিরা।”
“আমাকে এত অস্থিরতায় রাখছ কেন? কি হয়েছে, বলো তো।”
কারান দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল, “আমার নিজেকে এখন অপরাধী মনে হচ্ছে, বকা দিতে মন চাচ্ছে।”
মিরা হতবুদ্ধি হয়ে বলল, “কেন, কারান? হঠাৎ এমনভাবে বলছ কেন?”

“এত দিন হয়ে গেল আমাদের ম্যারিড লাইফের, অথচ আমি এখনও একটা বেসিক ইনফরমেশন জানি না।”
“কি জানো না? উফফ, বলো না বাবা!”
কারানের কণ্ঠে হঠাৎ অস্থিরতা ফুটল, “মিরা, তোমার বার্থডে কবে?”
মিরা হালকা হাসল। মনে মনে বলল, “এমনভাবে বলল যেন কি না কি ভুল করে ফেলেছে!”
এরপর দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে আওয়াজ করে বলল, “সত্যি বলব?”
“আজব! তাহলে কি মিথ্যা বলবে? বলো, কবে?”
মিরা হেসে বলল, “১৩ই এপ্রিল।”
কারান গভীর চোখে তাকিয়ে বলল, “আমি সিরিয়াস, বেগম।”
“আমিও।”
কারান কপাল কুঁচকে বলল, “তোমার বার্থডে আমাদের ম্যারেজ অ্যানিভার্সারির দিন?”
মিরা মাথা হেলিয়ে হালকা ভাবে বলল, “হুম।”
কারান চোখ বিস্ময়ে বড় করে বলল, “হোয়াট দ্য ফা’ক! কেমনে সম্ভব?”
“প্ল্যান করে করলে সবই সম্ভব।”
কারান কৌতূহল ও বিস্ময় মিশ্রিত কণ্ঠে বলল, “প্ল্যান করে মানে?”

মিরা এবার কারানের গলা ছেড়ে সামান্য পেছনে সরে এলো। তবে কারান এক দৃষ্টিতে ওভেনের ভেতর তাকিয়ে বুঝল, খাবারটা সঠিক সময়েই সম্পূর্ণ হয়েছে। সে ধীরস্থির ভঙ্গিতে তাপরোধী দস্তানা গলিয়ে সাবধানে ট্রেটা নামিয়ে আনল। গরম ধোঁয়া ঘূর্ণায়মান পরতের মতো উপরে উঠে রান্নাঘরের বাতাসকে মশলাদার সুবাসে ভরিয়ে তুলল।
অন্যদিকে মিরা রান্নাঘরের মার্বেল কাউন্টারের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। সে স্নিগ্ধ হেসে বলল, “আমি মাহিকে আগেই বলেছিলাম, যেন মাকে দিয়ে এই তারিখটাই ঠিক করায়। তখন তো তোমারটা জানতাম না, তাই আমার জন্মদিনের তারিখের সঙ্গে মিলিয়ে বিয়ের দিন নির্ধারণ করেছিলাম।”
কারান বিস্মৃত ভঙ্গিতে ভ্রূ তুলে তার দিকে তাকাল। তারপর স্নিগ্ধ হাসি নিয়ে মিরার দিকে এগিয়ে গিয়ে গাল দুটোকে দু’হাতে আলতোভাবে ধরে বলল, “দ্যাট’স মাই ওয়াইফ। বুদ্ধিটা ভালো ছিল। এখন একদিনেই দুইটা সেলিব্রেশন করা যাবে, আর আমার টাকাগুলোও বেঁচে যাবে।”

মিরা হেসে জবাব দিল, “হ্যাঁ, তোমার টাকা বাঁচাতেই তো আমি সবকিছু হিসেব করে করেছি।”
কারান মৃদু হাসিতে মিরার গালে হাত বুলিয়ে দিল। কোমল কণ্ঠে বলল, “এবার যাও সোনা, টেবিলে গিয়ে বসো। আমি একে একে সব আইটেম সার্ভ করে দিচ্ছি।”
মিরা অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, “সব হয়ে গেছে নাকি?”
কারান মাথা নেড়ে বলল, “না, এত তাড়াতাড়ি কি হয়! যেগুলো তৈরি হয়ে গেছে সেগুলো আগে তোমার সামনে দেব। তুমি খেতে শুরু করো, বাকিগুলো আমি শেষ করছি।”
মিরা ঠোঁট বাঁকিয়ে কপট অভিমানী ভঙ্গিতে বলল, “হুম… তাই তো! আমি ওখানে আরাম করে বসে গিলব, আর আমার স্বামী একা এখানে দাঁড়িয়ে কাজ করে যাবে—এটাই চাইছ তো?”
মিরার মুখের ভাঁজ আর চোখের ভেতর চাপা বিরক্তি দেখে কারান হালকা হাসল। সে আলতো করে মিরাকে টেনে নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আচ্ছা, ঠিক আছে। বাকিগুলোও হোক, তারপর একসঙ্গে বসে খাবো। কিন্তু এখন তুমি বসো, বেবি। আমি চাই না, আমার বউয়ের পায়ে সামান্যতম ক্লান্তিও জমুক।”

মিরা হাসিমুখে টেবিলে গিয়ে বসল, দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখল রান্নাঘরে ব্যস্ত কারানের দিকে।
কারান হাত বাড়িয়ে কাছেই রাখা জীবন্ত লবস্টারটিকে তুলে নিল। বরফ-শীতল পানিতে কিছুক্ষণ সেটাকে ডুবিয়ে রেখে স্টিমারে তুলল। ঢাকনা খোলার সঙ্গে সাইট্রাস ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। ফুটন্ত পানিতে পড়তেই লবস্টারের খোলস বাদামি থেকে রক্তাভ লালে রূপ নিল। স্টিমিং শেষে কাটিং বোর্ডে এনে ধারালো ছুরিতে খোলস ভেঙে উন্মোচন করল শুভ্র রসাল মাংস। তার উপর ঢেলে দিল বাটার, রসুন কুচি আর পার্সলে। প্লেট সাজানোর সময় লবস্টারের অর্ধেক খোলসের ভেতর মাংস রাখল, পাশে লেবুর টুকরো, সী-সল্ট, আর গ্রিল করা অ্যাসপারাগাস দিয়ে সাজালো। শেষ ছোঁয়ায় হালকা অলিভ অয়েল ব্রাশ করে পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত করল।
মিরা এতক্ষণ একটানা কারানের প্রতিটি কাজ মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করছিল। তার চোখে বিস্ময়, ঠোঁটে অচেতন প্রশান্তি খেলা করছিল। কিন্তু মনে এক অস্থিরতার ঢেউ আছড়ে পড়ছিল। নিজের সাথে নিজেই নিঃশব্দে বিতর্ক করল, “এখন প্রশ্নটা করা কি ঠিক হবে? যদি এই শান্ত মুহূর্তটা নষ্ট হয়ে যায়?”

কিছুক্ষণ থেমে আবার নিজের মনে যুক্তি খুঁজল, “না, বলা উচিত। উলটো গোপন রাখাটা অন্যায় হবে।”
শেষমেশ শান্ত কণ্ঠে বলল, “কারান, অনেকদিন ধরে একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু… সুযোগ হয়নি।”
কারান ইতোমধ্যেই ইলিশের পাতুরি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। টাটকা ইলিশটিকে টেবিলে রেখে প্রথমে অস্থি আলাদা করল। পানির নিচে ভালোভাবে ধুতে ধুতে জিজ্ঞেস করল, “কি কথা?”
মিরা দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলল, “আকবর কাকা… তিনি ফুফির স্বামী। ফুফি হয়ত কাউকে বলেনি, শুধু আমাকেই জানিয়েছেন। আমার মনে হলো, তোমাকে জানানো দরকার।”
কারান তখন শান্ত মুখে মাছের শরীরকে সমান টুকরোতে ভাগ করছিল। বিস্মিত হওয়া ছাড়াই নির্বিকার স্বরে বলল, “আমি অনেক আগেই জানি।”

তারান্নুমের সাথে দীর্ঘ আলাপচারিতা শেষ করে ফারহান আবার নির্লিপ্ত মুখে কাজে মনোনিবেশ করল। টেবিলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কাগজপত্র, হার্ডডিস্ক, নথি আর অগণিত ডিজিটাল ডিভাইসের ভিড়ে ল্যাম্পের ক্ষীণ আলো তার চোখের তলদেশে অনিদ্রার ছায়া স্পষ্ট করে তুলছিল।
জেহেরের বিরুদ্ধে সন্দেহ নতুন কিছু নয়—বছরের পর বছর ধরে নাম উঠেছে অঙ্গ পাচার ও নারী পাচারের সাথে সংশ্লিষ্টতার। কিন্তু সমস্যা হলো, প্রমাণের অভাব। প্রতিবারই পুলিশের হাতে ধরা দেয় খণ্ডিত ইঙ্গিত, অথচ আদালতে টিকবে এমন অখণ্ড প্রমাণ মেলে না।
আয়লার কাছ থেকেও সুনির্দিষ্ট কিছু পাওয়া যায়নি। সে কেবলমাত্র একবার জেহেরকে ম্যানিপুলেট করতে সক্ষম হয়েছিল, আর সেখানেই জেহের বলেছিল, “হ্যাঁ, আমাদের একটা গোপনে স্পেশাল জায়গা আছে। সেখানে অনেক অনৈতিক কাজ করা হয়। আমি এসব ডিল করি।”

এর বাইরে কী ধরনের কাজ হয়, কোথায় হয়—সেসব প্রশ্ন করার আগেই জেহেরের লোক চলে আসায়, আর জিজ্ঞেস করতে পারেনি আয়লা। তবুও ফারহান ও আয়লা অন্তরে নিশ্চিত, সে ‘গোপন কাজ’ আসলে মানবদেহের অঙ্গপাচার ও নারী পাচারের দিকেই ইঙ্গিত করেছে। এখন একমাত্র প্রয়োজন অখণ্ড ও নিবারণযোগ্য প্রমাণ, যা আদালতে দাঁড়িয়ে জেহেরের মতো শঠ ও প্রভাবশালী অপরাধীকেও অস্বীকারের সুযোগ দেবে না।
ফারহান ডেস্কে বসে কম্পিউটারে জেহেরের একটি সাম্প্রতিক ছবি লোড করে মুখ শনাক্তকরণ সফটওয়্যার চালু করল। সফটওয়্যার একের পর এক ডাটাবেজ স্ক্যান করতে লাগল। মিনিট কয়েকের ভেতরেই কিছু ফলাফল বেরিয়ে এলো।
জেহেরের একাধিক ভুয়া নাম, জাল আইডি, আর ডজনখানেক বিদেশ ভ্রমণের রেকর্ড পাওয়া গেল। ফারহানের মুখ কঠিন হয়ে উঠল। আরও গভীরে অনুসন্ধান করতে এবার হাতে নিল হ্যাকিং টুলস। লক্ষ্য সেই পুরোনো ল্যাপটপ, যেটি কয়েক মাস আগে বাজেয়াপ্ত হলেও যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। আসলে এই তথ্যটাও আয়লাই সরবরাহ করেছিল, যখন সে চতুর কৌশলে জেহেরকে ম্যানিপুলেট করেছিল।
হার্ডড্রাইভ খুঁটিয়ে ঘাঁটতে গিয়ে ফারহান আবিষ্কার করল স্তম্ভিত করার মতো কিছু প্রমাণ:

– ডিলারদের সঙ্গে এনক্রিপ্টেড ই-মেইল আদান-প্রদানের ইতিহাস।
– অচেনা নারীদের মেডিকেল রিপোর্ট, সার্জারির প্রস্তুতির ডকুমেন্ট।
– ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেটে কোটি কোটি টাকার সমমূল্যের লেনদেন।
– একটি ফোল্ডার ভর্তি বিদেশি নামের তালিকা ও পাসপোর্ট স্ক্যান—সম্ভবত ভিকটিম অথবা ক্রেতাদের তথ্য।
স্ক্রিনে তথ্যগুলো ভেসে উঠতেই ফারহানের চোখে দমিত ক্ষোভ জমাট বাঁধল। মুঠো শক্ত করে সে ফাইলগুলো সেভ করে প্রতিটি ডকুমেন্ট একত্রিত করল। এর মধ্যেই তার মস্তিষ্কে কেবল একটিই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল, “এগুলো দিয়ে জেহেরকে ধরা তো সম্ভব। বাট ইট’স স্টিল আননোন যে ওদের আসল অপারেশনের সাইট কোথায়! আর সেখানে কয়জন নারী বা শিশু আটকে রাখা হয়েছে? জেহেরকে ধরা হলে যদি অপরদিকে ওদের হার্ম করে ফেলে? মোস্ট অফ দ্য টাইম এরা তো এসবই টার্গেট করে! আচ্ছা, এমন তো নয় যে আমাদের ভুলপথে চালিত করা হচ্ছে! নাহলে এত দ্রুত প্রুফ পেয়ে যাব!”

এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ ক্লান্ত দেহটাকে টেনে চেয়ারে হেলান দিল। কপালে হাত রেখে ফারহান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখের ভেতর ক্লান্তি জমেছে, কিন্তু চোখে ঘুম নেই। কয়েক মুহূর্ত বাদে আবার সংযত হলো। সজাগ মস্তিষ্কে সব প্রমাণ এনক্রিপ্টেড ফরম্যাটে কারানের কাছে ই-মেইলে পাঠিয়ে দিল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে হঠাৎ তার কাঁধে একজোড়া হাত স্পর্শ করল। চমকে উঠে সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল।
আয়লাকে দেখে ঠোঁট শক্ত করে সামান্য বিরক্ত ভঙ্গিতে আবার স্ক্রিনের দিকে মন দিল। আয়লা সাধারণ কালো ট্রাউজার আর হালকা গোলাপি রঙের গেঞ্জি পরা, চুলগুলো সুন্দরভাবে পেছনে জুটি বাঁধা।
কিছুক্ষণ পর ফারহান শুষ্ক গলায় বলল, “তোমার উচিত জেহেরের সাথে রিলেশনশিপের ভান করা। তাহলে ভেতরের সব গোপন তথ্য বের করা সম্ভব হবে। আর সত্যি বলতে, বান্দা কিন্তু এমনিতে হ্যান্ডসাম আছে।”
শেষ কথাটা মুখে বাঁকা হাসি টেনে বলল সে।
আয়লা এই কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। চোখে অন্যমনস্কতা নিয়ে নিস্তেজ স্বরে বলল, “তোমার ফ্রেন্ডের খবর কি? ও আর দুবাই আসবে না নাকি?”

ফারহান ঠোঁট বাঁকিয়ে ব্যঙ্গভরা হাসি ছুঁড়ে বলল, “ও শালা বউকে পেলে দুনিয়ার আর কিছুই মাথায় রাখে না। ওর উপর আমার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই। এবার মনে হয় সোজা বাচ্চা জন্ম দিয়ে কোলে নিয়েই হাজির হবে।”
কথাটা শেষ করেই সে আচমকা আয়লার দিকে তাকাল। দেখল, তার চোখে শীতল রহস্যময়তা লেগে আছে। ফারহান ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি আবার ওকে নিয়ে হঠাৎ এত ইন্টারেস্ট দেখাচ্ছ কেন?”
আয়লা তার পাশে সোফায় বসল। ফারহানের ম্যাকবুক টেনে নিয়ে নিজের হাঁটুর উপর রাখল, আঙুলগুলো নির্ভুল ছন্দে কি-বোর্ডে চলতে লাগল। শান্ত কণ্ঠে বলল, “ইন্টারেস্টেড তাই।”
ফারহান সামান্য ঝুঁকে আয়লার চোখে চোখ রাখল। “নিজের চরিত্র ঠিক রেখো, আয়লা।”
“আমার চরিত্র ঠিকই আছে, নাহলে কবেই তোমার বন্ধুকে খেয়ে ফেলতাম।”
ফারহানের মুখ মুহূর্তেই রং হারাল। রাগে তার বুকের ওঠানামা তীব্র হয়ে উঠল। সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল, তার কণ্ঠে ঝাঁঝ ঝরে পড়ল, “আরেকবার যেন তোমার মুখে কারানকে নিয়ে কোনো বাজে কথা না শুনি!”
আয়লা মাথা সামান্য কাত করল। কটমট করা ফারহানকে দেখে সে হাসতে হাসতেই বলল, “তুমি এমনভাবে রিয়েকশন দিচ্ছ যেন কারান তোমার বয়ফ্রেন্ড। আচ্ছা, তোমরা দুজন আবার… বাইসে’ক্সু’য়াল না তো?”
“মাথার সব তার কি ছিঁড়ে গেছে তোমার?”

আয়লা ল্যাপটপে চোখ রেখেই ঠান্ডা সুরে বলল, “এত উত্তেজিত হচ্ছ কেন? তুমি যেভাবে কারান কারান করো, তাতে আমার তো প্রায়ই মনে হয় কারান তোমার বউ, না হলে তুমি ওর বউ। সাধারণত বউকে নিয়েও মানুষ এতটা টেনশনে থাকে না।”
“কারণ কারান শুধু আমার বন্ধু না, ও আমার ভাই। আর ওর জন্য আমি যেমন প্রাণ দিতে পারি, তেমন প্রাণ নিতেও পারি।”
আয়লা ম্যাকবুকে মনোযোগ রেখে পা নাড়াতে লাগল। স্বরে মৃদু বিস্ময় ফুটে উঠল, “ইন্টারেস্টিং! আচ্ছা, তুমি কখনো মিরাকে দেখেছ?”
ফারহানের চোখ এক লহমায় ক্ষীণ হয়ে এলো। ভ্রূ কুঁচকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, “কারানের স্ত্রী?”
“হ্যাঁ।”
“কেন? হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন?”

আয়লা এবার ম্যাকবুক বন্ধ করল। শান্ত গলায় বলল, “দেখে ফেললে কারান তোমার শত্রুতে পরিণত হবে। যদিও মিরা… মিরা তো আবার আমার চিরশত্রু।”
ফারহান আয়লার পাশে বসল। আয়লার হাত থেকে ম্যাকবুকটা ছিনিয়ে নিল। হুঁশিয়ারি কণ্ঠে বলল, “ডিরেক্ট কথা বলো। আমাকে রাগিয়ে দিও না, আয়লা। কারান যেমন চিতাবাঘ, আমি তেমন ব্ল্যাক প্যান্থার। খু’ন কিন্তু আমিও কম করিনি। তোমাকে করলে বড়জোর হাত ময়লা হবে।”
আয়লা এক ভ্রূ উঁচু করে তাকাল, ঠোঁটে বিদ্রুপ টেনে বলল, “ওহ, রিয়েলি? তুমি একজন RAW-এর এজেন্টকে থ্রেট দিচ্ছ?”

“উঁহুঁ। আমি বা আমরা থ্রেট দিই না। সোজা কবরস্থানে পাঠিয়ে দিই। আর কথা ঘুরিয়ে নিও না। কারান আমার, আর মিরা তোমার শত্রু কীভাবে?”
“কারান যদি মিরাকে বিয়ে না করত, তাহলে আমার হতো। তবে চিন্তা করো না। আয়লার পার্সোনালিটি তোমার নিশ্চয়ই জানা। আমি কারান বা মিরাকে এক সেকেন্ডের জন্যও ডিস্টার্ব করব না। না ওদের মাঝে হাড্ডি হবো! বাট দ্য ট্রুথ ইজ, আই লাভ হিম।”
ফারহান কটমট করে তাকাল। রাগে তার মুখ লালচে হয়ে উঠল। চোখ দুটি যেন রক্তাভ আগুনে জ্বলছে। এক মুহূর্তে আয়লার গলার দিকে হাত বাড়িয়ে আবার সরিয়ে নিল। কণ্ঠে ঝাঁঝালো হুঁশিয়ারি নিয়ে বলল, “শুধুমাত্র আমি কুইনকে ভালোবাসি বলে মেয়েদের গায়ে হাত দিলাম না। কারানকে ভালোবাসার কথা মুখে আনলে কোন সাহসে?”
আয়লা চোখে অটল দৃঢ়তা নিয়ে বলল, “ওকে না ভালোবাসার একটা কারণ দেখাও।”
“আমি মেয়ে না যে ওর গুণাগুণ খুঁজব। ও আমার প্রাণ, আর তোমার মতো দুই পয়সার মেয়েরা ওর ওপর ইন্টারেস্ট দেখাবে, এটা আমি সহ্য করব না।”

এই কথায় আয়লা হঠাৎ পাশের ছু’রি হাতে তুলে চটজলদি ফারহানের কোলের উপর বসে পড়ল। তার শক্ত হাতে ফারহানের চুল ধরে সোফার সঙ্গে ঠেকিয়ে গলার কাছে ছু’রি ঠেকাল। ফারহানও উত্তেজিত হয়ে পকেট থেকে পি’স্তল বের করে আয়লার বুকের মাঝখানে ধরল। রাগে তার হাতের শিরা ফুলে উঠল।
আয়লা চোখ-মুখ কুঁচকে বলল, “Have we ever been intimate physically?”
ফারহান কপাল কুঁচকে বলল, “হঠাৎ এই প্রশ্ন কেন? আর তুমি নাইফ সরাও, নয়তো আমি গান চালিয়ে দিব।”
“আমার প্রশ্নের উত্তর দাও।”
“না।”
“তাহলে কেন বললে ‘দুই পয়সার মেয়ে’? তুমি কি জানো, আমি এখনো ভা’র্জিন।”
ফারহান ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “আমি জানতেও চাই না।”
“তোমার জানা উচিত। আমি স্টিল ভা’র্জিন, তার কারণ কারান।”
ফারহান অবাক হয়ে আয়লার বুক থেকে বন্দুকটা সরিয়ে নিল। চোখ বড় করে বলল, “ওহ ফা’ক! আর ইউ কিডিং মি?”

আয়লাও ছু’রিটা সরিয়ে ফারহানের কোল থেকে উঠে পাশে বসল। দীর্ঘ এক নিশ্বাস নিল। চোখ বন্ধ করে শান্তভাবে মাথা নত করল। দুই পায়ের ফাঁকের মধ্যে রেখে হাতদুটো একত্র করল। শীতল কণ্ঠে বলল, “তুমি তো জানো, আমি ইন্ট্রোভার্ট। আমাদের রিলেশনশিপের এক মাসের মাথায়, একদিন হঠাৎ তুমি আমার রুমে এলে। আমি তখন আমার মিশনের একটা কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। হুট করে তুমি আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলে। যদিও আগেও আমরা দুজন দুজনকে হাগ করেছি, কিন্তু ওইদিন ওই মুহূর্তে আমি ফিল করলাম, তুমি অন্য মুডে আছ। পরবর্তীতে তুমি রুমডেটের প্রস্তাব দিলে। হ্যাঁ, আমি তখন তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম, তাই রাজি হয়ে গেলাম। এরপর আমরা একসাথে বেডে গিয়েছিলাম। তুমি শার্টটা খুললে…”
এরপর আর ফারহানের সহ্যশক্তি স্থির থাকলো না। হ্যাঁ, অতীতে সে প্রকৃতপক্ষে দুর্বৃত্ত ছিল—মাসের পর মাস নারীদের প্রতি তার অস্থির প্রবণতা ছিল। কিন্তু বর্তমানে তার হৃদয় সম্পূর্ণরূপে তারান্নুমের প্রতি নিবেদিত। অতীতের অনাকাঙ্ক্ষিত স্মৃতি তার কাছে অচেতন মনে হলো; কারণ সে তো সেগুলোকে স্মৃতিশূন্য করতে চায়। সে হঠাৎ বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। উত্তেজনায় দেহে ঝাঁকুনি খেল। গলার স্বরে টান দিয়ে বলল, “স্টপ ইট, আয়লা! এত বছর পর এখন এসব কেন তুলছ?”

আয়লা কটাক্ষের স্বরে উত্তর দিল, “আমার কথা বলার মাঝে কথায় বাঁধা দেওয়াটা আমার পছন্দ নয়, এটা তুমি জানো। চুপচাপ বসো, মাই ওয়ার্ডস আর নট ওভার ইয়েট।”
ফারহানের হৃদ্‌যন্ত্র দ্রুত এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে ধুকপুক করছে। প্রতিটি স্পন্দন তার ভেতরের অস্থিরতা আরও প্রবল করে তুলছে। তবুও অনিচ্ছাসত্ত্বেও বসল। আয়লার চোখ এড়িয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে বলল, “বেশি সময় নিবে না।”
আয়লা গভীর নিশ্বাস নিয়ে বলল, “যখন তুমি শার্টটা খুললে, হঠাৎ করে কারানের কল আসল। তুমি কলটা পেয়ে এত এক্সাইটেড হয়ে গেলে যে আমাদের ওই স্পেশাল মোমেন্টের কথা ভুলেই গেলে। আমার রাগ হলো। আমি তোমাকে কিছু বলার জন্য মুখ খুলতে চাচ্ছিছিলাম, কিন্তু ঠিক তখনই তুমি কল রিসিভ করলে। আর ফোন লাউডে থাকায় আমি সবই শুনেছি। তখন কারানের গলায় প্রথম ‘ফারহান’ ডাকটা শুনেই আমার ভিতরে অস্থিরতার ঝড় বয়ে গেল। আমার চেতনার সবচেয়ে সংবেদনশীল স্তর পর্যন্ত প্রবেশ করল। ওর প্রতিটি উচ্চারণ এতটা ডিপ আর ম্যানলি… কিছু মুহূর্তের জন্য আমি অন্য একটা দুনিয়ায় চলে গেলাম। কল কেটে যাওয়ার পরও আমার সেই অস্থিরতা থামল না। তুমি আমাকে অনেকক্ষণ ডাকলে, আমি শুনলাম না। তাই তুমি আমাকে ধাক্কা দিয়ে হুঁশে ফিরিয়েছিলে। আমার ভিতরের উত্তেজনা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। আমি চমকে উঠে কেবল তোমার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

তুমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘মে আই?’
আমি বললাম, ‘নো।’
তুমি বিস্ময়ে বলল, ‘হোয়াট ডু ইউ মিন?’
আমি তখনই কণ্ঠস্থভাবে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি যার সঙ্গে কথা বলেছিলে, ওর নাম কি?’
তুমি অবাক হয়ে বললে, ‘মাই ফ্রেন্ড কারান। এনি প্রবলেম, বেবি?’
আমি বললাম, ‘Farhan, give me some time, I’ll think about it and let you know later.’
তুমি তখন আমার অবস্থাটা বুঝে সংক্ষেপে ‘ওকে’ বলে সরে গেলে।”

আয়লা চোখে দীপ্তি নিয়ে পুনরায় বলতে থাকল, “এদিকে কারানের প্রতিটি শব্দ আমার চেতনার অঙ্গনে গভীরভাবে গেঁথে রইল। আমার ওর প্রতি আগ্রহ বাড়তেই থাকল। যে কারণে আমি তোমার থেকে সাটলভাবে ওর প্রোফাইল জেনে নিলাম। প্রথম দেখাতেই ওর চোখে আটকে গেলাম। মনে হলো, চোখ দুটো যেন রাতের আকাশে জ্যোতির্ময় কোনো নক্ষত্র। ওর সঙ্গে আমার সংযোগের আকাঙ্ক্ষা প্রতিনিয়ত বর্ধিত হতে লাগল। প্রতিটি ক্ষণ ওর সম্পর্কে জানার তীব্র কৌতূহল আমার ভেতরের ক্ষুধা আরও উদ্দীপ্ত করল। এরপর ওকে স্টক করতে শুরু করি, জানার চেষ্টা করি, ও কেমন মানুষ, কোথায় থাকে। ওকে যত জানছিলাম, ততই প্রতিটি সেকেন্ড আমি আরও মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম। আমি বিভিন্নভাবে ওর সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করার চেষ্টা করি। কিন্তু কারানের ইন্টারেস্ট কোনো মেয়েদের দিকে ছিল না, তাই কথা বলা হয়ে উঠেনি। দেয়ারফোর, আমি শুধু ওর প্রতি ক্রমশ মুগ্ধতায় বন্দি রইলাম, এবং প্রতিটি মুহূর্তে ওর রহস্যময় ব্যক্তিত্ব আমাকে আরও আকৃষ্ট করতে থাকল।”

এসব শুনে ফারহান কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ চোখে তাকাল। তারপর বলল, “তুমি এসব আগে কেন আমাকে বলোনি? আর তার মানে কি তুমি ওকে আরও পাঁচ বছর আগে থেকেই…?”
“হ্যাঁ,” সে গভীরভাবে নিশ্বাস নিয়ে বলল, “আই হ্যাভ লাভড হিম হোলহার্টেডলি ফর ফাইভ ইয়ার্স। আর ওর জন্যই তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক শেষ করেছি।”
ফারহান চমকে বলল, “কিন্তু ফার্স্ট যেদিন তোমাকে ওর সঙ্গে মিট করালাম, সেদিন তো আমার কাছে কিছুই মনে হয়নি।”

“ফারহান, যেখানে তুমি এটা বুঝতে পারোনি যে আমি একজন এজেন্ট, সেখানে তুমি কীভাবে বুঝবে যে আমি কারানকে ভালোবাসি? ওইদিন আমি নিজেকে এমনভাবে প্রেজেন্ট করেছিলাম যেন মনে হয় আমি ওকে চিনিই না। কিন্তু সত্যি কথা বলতে, ওকে দেখে আমি শকড হয়ে গিয়েছিলাম, কারণ ও এতটাই সুদর্শন। আর সবথেকে বেশি আঘাত পেয়েছিলাম যখন জানলাম, ও বিয়ে করে ফেলেছে। যে মানুষটিকে আমি পাঁচ বছর… পাঁচটা বছর ধরে অন্তরের গভীরতা দিয়ে ভালোবেসেছি, প্রথম দেখাতেই জানতে পারলাম সে ম্যারিড। তবুও আমি ভেতরের যন্ত্রণাকে কোনোভাবেই প্রকাশ করিনি। ভিতরে ভিতরে যেন সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু আমি কোনো সংকেত দেইনি; না তোমাকে, না কারানকে। শুধু চেয়েছিলাম ওর একটু… একটুখানি কাছে থাকতে, কিন্তু ও তো সেটাও হতে দেয়নি।”
ফারহান চোখ কুঁচকে প্রশ্ন করল, “ঠিক আছে। আগে একটা কথা বলো, তুমি যে কারানকে স্টক করলে… কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব হলো? ওর সবকিছুই তো আমি হ্যান্ডেল করি। কারান নিজেই সব সিকিউরিটি নিশ্চিত করেছে, যা কেউ জানতেও পারবে না। ওর ফোনে সিকিউরিটি এনক্রিপশন, গাড়িতে ট্র্যাকিং ডিভাইস, বাড়িতে ২৪/৭ ক্যামেরা এবং ব্যক্তিগত বডিগার্ডদের তালিকা সবই সম্পূর্ণ গোপন। এমনকি বাংলাদেশের ওর পরিবার থাকার খবরটাও শুধু ওর জানা, বাইরে কেউ কিছুই জানে না। তাহলে তুমি কীভাবে…”

আয়লা হালকা হেসে বলল, “ওর সম্পর্কে ধারণা নেওয়াটা সহজ ছিল না। বহুত ধৈর্য আর কঠোর পরিশ্রমের পরই জানলাম যে ওর বাংলাদেশে ফ্যামিলি আছে। আর এসব সম্ভব হয়েছে শুধুই তোমার জন্য।”
ফারহান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “হোয়াট? আমার জন্য?”
“হ্যাঁ, তুমি জানো না, মাঝে আমি তোমাকে ম্যানিপুলেট করেছিলাম। তখনই কারানের পরিবারের সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম।”

“তার… তারপর?”
আয়লা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, “তারপর আর কি, তুমি নিজেই কারান সম্পর্কে অনেক ইনফরমেশন দিয়েছ। আর দুবাইতে কারান আসার পর ওর বিয়ের খবর জানার পর ভাবলাম, কারানকেও ম্যানিপুলেট করে ওর মস্তিষ্ক থেকে মিরাকে সরিয়ে দেব। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও পারিনি।”
ফারহান হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, “তুমি একজন ম্যানিপুলেটরকে ম্যানিপুলেট করতে চেয়েছিলে? হাউ রিডিকিউলাস!”
“সে জন্যই চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। তবে আমি অন্য পথ খুঁজছিলাম, কিন্তু তার আগেই মিরার ছবি চোখে পড়ল। আর তখনই বুঝলাম, আমার ভালোবাসা একপাক্ষিক হয়েই থাকবে। কারানকে পাওয়া সম্ভব না। আর তুমি যদি মিরাকে দেখো, হয়ত চেষ্টা করবে কারানকে সরানোর।”
ফারহান রেগে না গিয়ে, গভীর স্বরে বলল, “তোমার ধারণা নেই তুমি ঠিক কতটা নিম্ন ও অমূল্য অবমাননাকর কথা বলছ।”

“আর তুমি জানো না, মিরা ঠিক কতটা অপার্থিব ও মনোমুগ্ধকর সুন্দরী।”
“এটা আমার জানার দরকার পড়বে না। আমি অলরেডি বুঝতে পেরেছি, কারানকে হ্যান্ডেল করতে পারে যে, সেই মেয়ে কি ক্যালিবার এর!”
আয়লা নীরব হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর শিহরন জাগানো কণ্ঠে বলল, “I won’t hurt Mira. And never Karan. But Karan… his persona, the way he strides with a manly grace, the calm precision in his words, the seamless etiquette, the commanding aura, the sculpted physique—they unsettle me, yet fascinate me.”
(বাংলা: আমি মিরাকে আঘাত করব না। আর কারানকে তো কখনোই না। কিন্তু কারান… ওর ব্যক্তিত্ব, ও যেভাবে ম্যানলি ভঙ্গিতে হাঁটে, ওর কথার শান্ত শব্দগুলো, নিখাদ ভদ্রতা, কর্তৃত্বময় উপস্থিতি, গড়া দেহসৌষ্ঠব—সবকিছুই আমাকে অস্থির করে তোলে, তবু অদ্ভুতভাবে মুগ্ধও করে।)

ফারহান এক গভীর নিশ্বাস নিয়ে বলল, “এসব ভাবনা বন্ধ করো, তোমারই ক্ষতি।”
“আমার কোনো লাভের আশা নেই, ফারহান। তুমি হয়ত বুঝবে না। ভালোবাসা অনেকসময় অদৃশ্য বন্ধনের মতো; যা সাধারণ চোখে ধরা পড়ে না, যা সবাই উপলব্ধি করতে পারে না।”
ফারহান প্রথমবারের মতো আয়লার চোখে জমে থাকা জল দেখল। হঠাৎ তার মনও অস্বাভাবিকভাবে ভারী হয়ে উঠল। সে পাশ থেকে টিস্যুর বক্স খুলে টিস্যু তুলে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে দিল।
আয়লা হেসে সেটা নিয়ে চোখ মুছতে লাগল, কিন্তু ফারহানের এই সহজ ভঙ্গি তার হৃদয়কে শান্তির স্পর্শ দিল। ফারহান ওর পিঠে হালকা চাপড় দিয়ে হাত রাখল।
সহানুভূতির স্বরে বলল, “ভালোবাসার ওপর কোনো বিধিনিষেধ নেই। ভালোবাসো, কিন্তু চাওয়ার চেষ্টা করো না।”
“চাওয়ার সাহসও থাকব না,” আয়লা ভারাক্রান্তভাবে হেসে বলল।

ফারহান ধীরে মাথা নাড়ল। তারপর নীরবভাবে আয়লার দিকে তাকিয়ে থাকল। তার দৃষ্টির গভীরে এক অদৃশ্য স্বস্তি খেলা করছে, যেন বুকের ভেতরে দীর্ঘদিন জমে থাকা শ্বাসরুদ্ধকর ভার হঠাৎ সরে গিয়ে শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। অথচ সেই শূন্যতাকে আয়লার চোখে প্রতিফলিত করা যাচ্ছিল না, বরং সেখানে আবেগের ঘূর্ণিঝড় ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছিল। তার কণ্ঠে তীক্ষ্ণতা থাকলেও ভিতরে ছিল দগ্ধ হৃদয়ের চাপা উত্তাপ।
কিছু সময় পর আয়লা ঠোঁট কামড়ে হঠাৎ বলল, “থাক, এসব বাদ দাও। এখন তুমি বরং কারানকে যত দ্রুত সম্ভব এখানে আনো। ও ছাড়া এই মিশন সফল হবে না। ইব্রাহিমের প্যালেসের ভিতরে প্রবেশ করার একমাত্র উপায় ও-ই।”
ফারহান চোখ নামিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, “হয়ত অন্য কোনো কারণে দেরি করছে। আমি কেবল গেস করতে পারি।”
আয়লা কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল, “মানে?”
“এই মিশন অস্বাভাবিকভাবে টাফ। পরিণতি আমরা কেউ জানি না—আমাদের অবস্থান, আমাদের ভবিষ্যৎ… কিছুই স্পষ্ট নয়। হয়ত সেই অনিশ্চয়তার জন্যই কারান এখন কিছুটা সময় নিজেকে দিচ্ছে।”
“ও এখন কোথায় আছে?”
ফারহান মুহূর্তের জন্য চুপ করে গেল। সে জানে, কারান আসলে আমেরিকায়, কিন্তু সত্য প্রকাশ করা মানেই বিপর্যয় ডেকে আনা। ঠান্ডা মাথায় গোপন রেখেই বলল, “বাড়িতে… আই থিংক বাড়িতেই আছে।”
আয়লা ঠোঁটে ক্ষীণ বিদ্রূপের রেখা টেনে উত্তর দিল, “মিথ্যা বলছ? কারান এখন আমেরিকায়, আর তার স্ত্রীকে নিয়েই আছে।”

ফারহান চোখ সরু করে তাকাল। “তুমি আবার ওকে স্টক করা শুরু করেছ নাকি?”
আয়লা নির্বিকার কণ্ঠে বলল, “না। তুমি নিজেই তো বলেছিলে।”
ফারহান বিস্মিত হয়ে উঠে দাঁড়াল। “আমি? কখন?”
“সেদিন, যেদিন তুমি আমেরিকা থেকে ফিরে এলে।”
ফারহান থমকে গেল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে নীচু স্বরে বলল, “আমি… আমি আমেরিকায় গিয়েছিলাম কেবল নিশ্চিত হতে, কারান সেইফ আছে কি না। তখনই জেনেছি ও অ্যাকসিডেন্ট থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। পরে ট্র্যাফিক পুলিশ থেকে জানলাম, সাথে ওর ওয়াইফও ছিল। অথচ কারান আমাকে কিছুই জানায়নি। হয়ত কল ট্র্যাক হওয়ার সম্ভাবনা ছিল বলে গোপন করেছে। কিন্তু তুমি জানলে কীভাবে?”

“ম্যানিপুলেশন।”
ফারহান ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকাল। কণ্ঠ কেঁপে উঠল, “তুমি কি পাগল হয়ে গেছ?”
“আমার আর উপায় ছিল না। যখন জিজ্ঞেস করলাম কোথায় গিয়েছিলে, তুমি কোনো উত্তর দাওনি। তাই আমাকে বাধ্য হয়ে তোমাকে ম্যানিপুলেট করতে হয়েছে।”
ফারহান দাঁত চেপে ফিসফিস করল, “এই কথা যেন আমাদের মাঝেই থাকে। যদি কারান টের পায় আমি ওকে না জানিয়েই আমেরিকায় গিয়েছিলাম, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে যাবে। গুম করে ফেলবে দুজনকেই।”
আয়লা হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গ তুলল, “একটা প্রশ্নের উত্তর দাও, মিরার নাম মেলেক ইলমাজ কেন দেওয়া হলো?”
ফারহান গম্ভীর স্বরে বলল, “মিরাকে সুরক্ষিত রাখার জন্য। ইউএসএ-তে আমাদের শত্রুর সংখ্যা অগণিত। একবার যদি ওরা জানতে পারে মিরা আসলে কারানের স্ত্রী, তবে ওকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে এক মুহূর্তও দেরি করবে না। তাই ওর পরিচয় আড়াল করা ছাড়া উপায় ছিল না।”
আয়লা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, “আচ্ছা… তোমরা আগে কি এমন করতে যে প্রতিটি ডিসিশনেই এত রিস্ক?”

ফারহান মুখ ঘুরিয়ে নিল। ঠান্ডা কণ্ঠে উত্তর দিল, “সেসব বলা যাবে না, আয়লা। তুমি বরং অপ্রয়োজনীয় দিকে মন না দিয়ে সামনে নজর দাও। শুনেছি, জেহেরের সঙ্গে বাংলাদেশের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিও যুক্ত রয়েছে।”
আয়লার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। ঠোঁট থেকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও বেরিয়ে এলো, “ও এম জি! তাহলে এবার আমাকে জেহেরের সঙ্গে প্রেম করতে হবে?”
ফারহান ম্লান হাসল, “প্রেম নয়, কিন্তু একটু লাইন তো মারতেই পারো।”
আয়লা দুষ্টু হেসে ফারহানের দিকে তাকাল। কিন্তু আর কোনো অতিরিক্ত প্রশ্ন করল না। মাথা নাড়িয়ে নীরবে কাজে মন দিল। ফারহানও তার পাশে দাঁড়িয়ে ম্যাকবুকে মনোযোগ দিল।

পলাশ যেহেতু পুলিশ সদর দপ্তরে খবর দিয়েছিল, তাই রাত গভীর হতেই নীলবাতি জ্বালানো গাড়ির বহর ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিল। অথচ তার আগেই অন্ধকারের ফাঁক গলে OWL-রা মিলিয়ে গিয়েছিল। পুলিশের টর্চলাইটের আলোয় ধরা পড়ে গিয়েছিল এক বিভীষিকাময় দৃশ্য—পলাশের দেহ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে। দেখে মনে হলো, কোনো নৃশংস জন্তুর থাবায় তাকে ছিঁ*ড়ে ফেলা হয়েছে। দৃশ্যটি এতটাই নির্মম ছিল যে চারপাশে দাঁড়ানো অফিসারদের বুক হঠাৎ করেই হিম হয়ে গিয়েছিল। কণ্ঠ শুকিয়ে এসেছিল, কারো কারো হাত কেঁপে উঠেছিল।
শবদেহ দ্রুত সাদা কাপড়ে ঢেকে নেওয়া হয়েছিল। পলাশের র*ক্তাক্ত শরীরের দাগ ঢাকতে ঢাকতে একজন অফিসার বিড়বিড় করে বলেছিল, “হে আল্লাহ! এমন নরপিশাচও আছে পৃথিবীতে!”

তার লাশকে পাঠানো হয়েছিল ফরেনসিক বিভাগে, যেন টুকরো টুকরো দেহ থেকে ন্যূনতম সূত্র উদ্ধার করা যায়।
রাত গড়িয়ে ভোর হলে থানার ভেতরে ভারী নীরবতা নেমে আসল। সবার মুখেই হতাশা আর দুঃখবোধ স্পষ্ট দৃশ্যমান। এমন একজন কর্মঠ, সৎ, দায়িত্বশীল পুলিশের এমন জঘন্য মৃত্যু কেউই মেনে নিতে পারছিল না।
ডেস্কে বসে ছিল আমান। তার চোখে অনিদ্রার ছাপ, কপালে ঘাম জমে ছিল। সে ভাবছিল, কীভাবে মুখোমুখি হবে পলাশের পরিবারের? কেমন করে জানাবে, যে প্রতিদিন সত্যের লড়াই করেছে, সে আজ এক অমানবিক মৃ*ত্যুর শিকার? অথচ বলতে পারবে না যে তাদের প্রিয়জন OWL নামক অশুভ গোষ্ঠীর হাতে নিহ’ত হয়েছে। কারণ এই তদন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে গোপন। সে জানে, এই খবর যদি জনগণ জানতে পারে, তাহলে ভয়, বিদ্বেষ আর বিশৃঙ্খলা একসাথে বিস্ফোরিত হবে। পুলিশ বাহিনীর ওপর আস্থা ভেঙে পড়বে মুহূর্তেই। বলবে, ‘যেখানে পুলিশই নিরাপদ নয়, সেখানে সাধারণ মানুষ বাঁচবে কীভাবে?’

আমানের পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে হুমায়ুন। লম্বা শরীর কেঁপে উঠছে বারবার, চোখ ভিজে উঠেছে। বুকের ভেতর শূন্যতা আর ক্রোধ একসাথে ধাক্কা দিচ্ছে। এমন একজন মানুষের অমানবিক মৃ*ত্যু তার মস্তিষ্ক মানতে চাইছে না। তার উপর সে ছিল হুমায়ুনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, প্রায় পরিবারের মতো। অসহায় বেদনায় তার ভেতরটা পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে।
অমানকে নিশ্চুপ বসে থাকতে দেখে হুমায়ুন আর সামলাতে নিজেকে পারল না। গলা কেঁপে উঠলেও সরাসরি বলেই ফেলল, “স্যার, এরপরও কি আমাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকা উচিত হবে?”
কথাটা শুনেও আমান কোনো উত্তেজনা প্রকাশ করল না। ধীর ভঙ্গিতে কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল, “তো, কী করতে চান আপনি?”

হুমায়ুনের বুক ফেটে যাচ্ছে ক্ষোভে, তবুও গলা সামলে বলল, “স্যার, এবার পুরো দেশে ওদের হ*ত্যাকাণ্ড প্রকাশ করা উচিত। অন্তত মেয়েরা ঘরে নিরাপদ থাকুক। আর কতকাল এমন চলবে?”
অমান ভ্রূ কুঁচকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, “আপনার নিজের কেউ কি এর শিকার হয়েছে?”
হুমায়ুন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হলো। তারপর বলল, “না তো, স্যার।”
“তাহলে এত উত্তেজনা কেন? আগে উপরমহল থেকে নির্দেশ আসুক, তারপর ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।”
অমানের নির্লিপ্ত উত্তর শুনে হুমায়ুনের ভেতরটা যেন তীব্র আগুনে জ্বলতে লাগল। তার মনে হলো, দফতরের আমলাতান্ত্রিক নিষ্ক্রিয়তা মানেই আরো অসংখ্য নিরপরাধ প্রাণ হারানো। সে দাঁত চেপে মনে মনে উচ্চারণ করল, “ঠিক আছে। যদি রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিতে না চায়, তবে আমি নেব। পলাশের শেষ ইচ্ছা আমি পূরণ করবোই। আর কোনো মেয়ে এই দেশে লাঞ্ছিত হবে না। আজ সন্ধ্যায় গোটা দেশ জানবে আউলদের র’ক্তপিপাসার কথা। সব রিপোর্ট, সব প্রমাণ আমি নিজে প্রকাশ করব।”

Tell me who I am 2 part 7 (2)

তার চোখে ভেসে উঠল পলাশের র*ক্তাক্ত শরীরের দৃশ্য। বুকের ভেতর আরো প্রতিজ্ঞা দৃঢ় করল, “না, আর নয়। এবার সত্য উন্মোচিত হবেই। এবার আলোয় টেনে আনতেই হবে ওদের। আই প্রমিজ, আর একটা মেয়েকে তোদের হাতে পড়তে দিব না, জা’নো’য়ারের দল।”

Tell me who I am 2 part 8