Tell me who I am 2 part 9
আয়সা ইসলাম মনি
ফাতিমা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলো একে একে বেরিয়ে এলো। ঢোক গিলে শুকনো গলাটা পরিষ্কার করলেন। তার সামনে আম্বিয়া চোখে গভীর মনোযোগ নিয়ে নিঃশব্দে বসে উত্তরের অপেক্ষা করছেন। সত্যিই কি ফাতিমা রমজানের দ্বিতীয় বউ? সেই অপেক্ষা শুধু কৌতূহলের নয়, অপমানেরও।
তাহলে কি এতটাই অধম তারা? মেয়ের জামাই সম্পর্কে এমন ভয়াবহ সত্যও অজানা ছিল! ভাবতেই রাগে আম্বিয়ার কুঁচকানো হাত দুটো মুঠোয় শক্ত হয়ে এলো। তবু তিনি কোনো প্রশ্ন করলেন না। শুধু তাকিয়ে রইলেন শূন্য দৃষ্টিতে।
ফাতিমা ধীরে বললেন, “সে পিছন ফিররা না তাকাইয়াই সোজা কইল, ‘প্রথমই। ওকে এখনো বিয়ে করিনি তোমার ভাইদের ভয়ে। কিন্তু এবার যেহেতু তুমি জেনেই গেছ, খুব জলদি বিয়ে করব।’
এই কথা কইয়াই চইলা গেল।”
এক মুহূর্তের জন্য ফাতিমার চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড় করতে করতে শুধালেন, “আমার ইচ্ছা করছিল, হাতের কাচের টুকরাটা ওর গায়ে ছুঁইড়া মারি। বুকের ভিত্রে তহন রাগে, অপমানে, ঘৃণায় ফুঁসতেছিলাম। কিন্তু ঠিক তহনই বিছানায় বসা মাইয়াটা কান্দন শুরু কইরা দিল। ও তো কিছুই বুঝবার পারে না, কিন্তু মায়ের হাতের ব্যথা—এই যন্ত্রণা হয়ত ঠিকই অনুভব করতেছিল। আমি কাচটা নামাইয়া রাখলাম। মাইয়াটারে কোলে নিলাম। চোখ দিয়া নিঃশব্দে পানি পড়তেছিল আমার। ভিতরটা ক্ষতবিক্ষত হইয়া গেছিল।
কিন্তু ঠিক এর পরের দিনই জানোয়ারটায় রাগে এমন একখান কাম কইরা বইছে… ও আমার ঘুমের মধ্যেই আমার কোমরে গরম আয়রন দিয়া ছ্যাক দিল। হুট কইরা ঘুম থেইকা জাইগা আমি চিৎকার কইরা উঠলাম। ‘আম্মা, আম্মা’ কইরা ডাকতেছিলাম। প্রতিহত করতে চাইছিলাম, কিন্তু ব্যাটা মানষের লগে কি আর পারোন যায়? পারলাম না। সে আমারে গাল দিয়া শাসাইয়া গেল, তার গালে হাত তোলার ফল এইটা। তারপর থেইকা প্রায় প্রায় আমার গায়ে হাত তোলা, হাত মুচড়ে দেওয়া, গালাগাল, লাথি—কোনটা রাইখা কোনটার হিসাব দিমু? একবার তো গরম ভাতের ফ্যানই গায়ে ফালাইয়া দিছিল।”
ফাতিমার ঠোঁট কেঁপে উঠল এবার, “আর আমার দোষ কি জানো? আমি কইতাম, ‘তিনটা ছেলেমেয়ের জন্য হইলেও অহনারে ছাইড়া দ্যান। আমি নিজে ওর লগে কথা কইয়া বুঝাইমু।’
ক্যান অহনারে ছাড়ার কথা কই, এইটাই আমার বড়ো অপরাধ। এই কথার জন্যই তার অত্যাচার আরও বাড়ছিল। পরে জানলাম, সে ইচ্ছা কইরাই বাড়ি আইত না। এমনকি আমি যহন চিঠিতে লিখছিলাম, ‘আমারে সাথে নিয়া যান।’
ওই চাকরির জায়গায় সে অহনার লগে এক ঘরে থাকত। আমি গেলে বাঁধা পাইব, এই ভয়েই আমারে নেয় নাই। এদিকে তারান্নুম তোমার ধারে, আর তালহা ভাইজানের ধারে মানুষ হইতে লাগল। আমি ফোনে খোঁজ নিতাম, কিন্তু দেখা করবার যাইতাম না। কেমনে যাই কও? আমার চেহারার কাটাছেঁড়ার দাগ যে লুকানোর উপায় আছিল না। গায়ের দাগগুলো তহনও টাটকা। আমার কোমরের—”
কথা শেষ হওয়ার আগেই আম্বিয়া ভাঙা, হতাশ স্বরে বলে উঠলেন, “আমার সোনার মাইয়ার মুখখানাতেও আঘাত হানছিল, জা*নোয়ারের বাচ্চাটায়?”
কথাটা বলতে যে তার ভেতরটা ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে, তা তার চোখ-মুখ অবলোকন করলেই বোঝা যায়। মেয়ের দিকে তাকিয়ে আছেন অসহায় দৃষ্টিতে, কিছু বলার শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট নেই।
এদিকে ফাতিমার কথা বলতে বলতে থুতনি কাঁপছে, ঠোঁট দুটো নিজের অজান্তেই আঁকড়ে ধরছে একে অপরকে। মাথা একটু নীচু করে সামান্য উপর-নিচে নাড়িয়ে সে হ্যাঁ-সম্মতি দিল।
আম্বিয়া দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ছাড়লেন। সেই নিশ্বাসে জমে থাকা ক্ষোভ, অসহায়তা আর প্রতিহিংসা প্রকাশ পেল। মেয়ের পিঠে ভারী করে হাত রাখলেন। গলা থরথর করে কেঁপে উঠল, “ওর ভাগ্য ভালো যে ফাতিমার হাতে মরছে! যদি আম্বিয়ার হাতে মরত—পুরা পাটোয়ারী বংশ তোর পায়ের কাছে লুইটাইয়া মাথা ঠেকাইয়া কান্নাকাটি করত, বাঁচার ভিক্ষা চাইত।”
ফাতিমা মায়ের চোখের দিকে তাকাল। সেখানে ক্রোধে দপদপ করে আগুন জ্বলছে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীরটা রাগে আরও কাঁপছে। ফাতিমা জানে, এই আগুনকে থামানোর চেষ্টা বৃথা। যতক্ষণ না রমজানকে মারার কাহিনি মুখে না আনে, ততক্ষণ এই আগুন নিভবে না।
তিনি পিঠ সোজা করলেন। চোখ সামনে স্থির রেখে বলতে শুরু করলেন, “মাইয়াটা ছোট দেইখা আমি বারংবার, হাজারবার তালাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়াও নিতে পারলাম না।
একদিন অহনারে কল দিলাম। পোরথমে কথা কইয়া খারাপ লাগলেও পরে বুঝলাম, মাইয়াটা খারাপ না। আমি আমার তিনটা ছেলে-মেয়ে, সংসারের কথা কইলাম। ও আমারে চিন্তা করতে বারণ করল। সেইদিন মনে মনে আমি অনেক খুশি হইছিলাম। মনে হইছিল, আল্লাহ বুঝি আমার দুঃখ দেইখা একটু দয়া করলেন।
কিন্তু ওই মাইয়াই পরে কালনাগিনি বাইর হইল। সব কথা রমজানরে কইয়া দিল। এরপর আবার মার। অহনারে কল দেওনের দুঃসাহসে এক দফা না, একটার পর একটা মাইর লাইগাই থাকত। একবার এমন মারল, যে সাত দিন বিছানা ছাড়তে পারি নাই। অথচ ওই খা*ন*কিরবাচ্চাগুলা আমারে চিকিৎসাও করায় নাই। এইভাবে দুই-দুইটা বছর কাটাইলাম। পরে শুনলাম, সে অহনারে বিয়া করছে। আরও পরে শুনলাম, অহনা প্রেগন্যান্ট। আমার ভিতরে মা*দারির বাচ্চার জন্য যতখানি মায়া আছিল, ওইদিন ওইটাও শ্যাষ হইয়া গেল।”
একটু থেমে ফাতিমা গভীর নিশ্বাস নেন। এবার তার মুখাবয়বে হঠাৎই কঠিন অভিব্যক্তি প্রকাশ পেল। গলা গভীর করে বললেন, “একদিন রাইত দুইটা বাজে। যতই চেষ্টা করি, ঘুম আহে না। চিন্তায় মাথা ফাইটা যাইতেছিল। তালহা, তরু বড়ো হইতেছে, এইসব জানলে ওদের মন-মানসিকতা নষ্ট হইবো, পড়ালেখায় ক্ষতি হইবো—ভাইবা আমি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাইতে পারছিলাম না।
সেই রাইতে বাসায় শাউড়ী আম্মা নাই; মাইয়ার শউরবাড়ি গেছে। পুরা ঘরে আমি আর তুব্বা। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পাই। আমি চমকাইয়া উঠি। বুক কাঁপতেছিল, থুতু দিলাম বুকে। একটা মোটা লোহার রড হাতে নিয়া ধীরে ধীরে দরজার দিকে আগাইলাম। দরজা খুইল্যা রমজানরে দেইখা কিছুক্ষণ হতভম্ব হইয়া দাঁড়াইয়া রইলাম।
আমি কিছু কওয়ার আগেই সে আমার গালে তরাম কইরা একখান থাপ্পড় মারল। কইল, ‘এতক্ষণ লাগে দরজা খুলতে? কী করছিলে? আম্মা নাই—এই সুযোগে প্রেমিকের সাথে ফষ্টিনষ্টি করছিলে নাতো? কই সেই হারামজাদা?’
ওই মুহূর্তে রাগে আমার গায়ে আগুন ধরতেছিল যেন। আমি চুপচাপ তার দিকে ঘুরলাম। সে আবার কইল,
‘হাতে রড নিয়ে কী করছ?’
আমি স্থির চোখে কইলাম, ‘চোর ভাবছিলাম।’
তার গায়ের কিছু জায়গায় ক্ষত দেখলাম। পাইলটের ড্রেসও অনেক জায়গা দিয়া ছিঁড়ড়া গেছে। তাজা ক্ষতের পাশে শুকাইয়া যাওয়া রক্তের দাগ, আর ধুলোয় মাখামাখি অবস্থা। লোকটার চেহারা দেইখাই বোঝা যাইতেছিল, সে কোনো স্বাভাবিক জায়গা থেইকা আইসা দাঁড়ায় নাই। তবু আমি প্রশ্ন করলাম না, কেমনে হইছে এসব। ভিতরে ভিতরে কেমন যেন একটা অস্বস্তি জমতেছিল, কিন্তু সেইটা চাইপা রাখলাম।
সে সামনের বড়ো রুমটায় বইল। ক্লান্ত চোখে গলা ভারী কইরা কইল, ‘হুম্, চোর তো তোমার দরজায় নক দিয়ে আসবে! বুদ্ধিতেও আমার অহনাকে ছাড়াতে পারলে না। আর এক গ্লাস পানি আনো তো।’
আমি চুপচাপ পানি আনতে পাশের ঘরে গেলাম। পেছন থেইকা তহনো তার গলার আওয়াজ আসতেছে। গলা উঁচাইয়া কথা কইতেছে, ‘বুঝলে, ফাতিমা? আল্লাহ আজ তোমার স্বামীকে অল্পের জন্য বাঁচিয়ে দিয়েছেন। আজ আমাদের যাত্রী নেওয়ার কথা ছিল না। রক্ষণাবেক্ষণের পর প্লেনটাকে টেস্ট ফ্লাইটে তুলেছিলাম আমি আর আমার সহকারী। এ ধরনের দায়িত্ব সাধারণত অভিজ্ঞ পাইলটদেরই দেওয়া হয়, কারণ যে-কোনো মুহূর্তে ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। মাঝআকাশে হঠাৎ করেই একের পর এক ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে প্লেনটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। আমি শেষ চেষ্টা হিসেবে জরুরি সংকেত পাঠাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তার আগেই ডানার একপাশে আগুন ধরে যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পুরো প্লেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে পড়তে শুরু করল। সহকারী পাইলট বের হতে পারেনি, ও সিটেই প্রাণ হারিয়েছে। আমি জানতাম, আর দেরি করলে বাঁচার কোনো সুযোগ থাকবে না। মুহূর্তের ভেতর প্যারাশুট বেঁধে আগুনের ভেতর দিয়েই ঝাঁপ দিতে হলো। আকাশ থেকে পড়ার সময় শরীরের বিভিন্ন জায়গা গাছের ডাল আর ভাঙা লোহার টুকরোয় কেটে গেছে। প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছিল, কিন্তু অবশেষে দূরের এক ঝোপঝাড়ে গিয়ে আঁছড়ে পড়লাম। এখনো কন্ট্রোল রুমে কেউ জানে না আমি জীবিত আছি। প্লেনটা এতটাই বিধ্বস্ত হয়ে গেছে যে হয়ত ভেতরের লাশ গলে গেছে।’
সে একটু থামল, নিশ্বাস ছাইড়া আবার কওয়া ধরল, ‘আমি তো প্রায় সাত-আট ঘণ্টা সেন্সলেস হয়েই পড়েছিলাম। উঠে কল করার জন্য ফোন নিব, দেখি সেটাও নেই। এরপর কোনোমতে ওই জায়গা দিয়ে বের হলাম। এই তোমার দশটার দিকে একজনের ফোন নিয়ে তালহাকে ফোন দিয়ে—’
এর মধ্যেই আমি পাশের ঘর দিয়া আইসা, উৎকণ্ঠা নিয়া কইলাম, ‘কি কইছেন তালহারে?’
সে কপাল কুঁচকাইয়া কইল, ‘কল ধরেনি।’
কথাটা আমার মুখের আগ্রহ দেইখা নাকি অন্য কিছু ভাইবা কইল, জানি না। জানতেও চাই নাই। সে আমার হাত থেইকা পানির গ্লাসটা নিল।
কিন্তু তার প্লেন ক্রাশের ঘটনাটা ওই রুমে থাকতে শুইনাই আমি মাথার ভিত্রে একটা ছক কষছি। তার গ্লাসের মধ্যে ইঁন্দুর মারার বিষ মিশাইয়া দিছিলাম।
চোখ-মুখ এক্কেবারে স্বাভাবিক রাখলাম। অনেকটা সময় তার পাশে বইসা তার থেইকা আরও অনেক কিছু জানলাম—কোথায় প্লেনটা ভাঙছে, কয়জন জানে, কয়জন জানে না, কী রিপোর্ট জমা পড়বে। যেন সবাই ভাবে সে সত্যিই প্লেন ক্রাশেই মইরা গেছে, এই জন্যই প্রয়োজনীয় সব তথ্য সংগ্রহ করতে থাকলাম।
আধঘন্টার মধ্যেই তার শরীর কাঁইপা উঠতে শুরু করল। বমি হওয়া শুরু হইল, মাথা ধরল, বিছানায় শুইয়া ছটফট করতে থাকল, চোখে আতঙ্ক ধরা দিল, ঠোঁটে ফেনা উঠল। আমার দিকে হাত বাড়াইয়া বারবার ডাক্তার ডাকার জন্য ইশারা করল।
কিন্তু আমি হাসলাম। শক্ত কাপড় দিয়া ওর হাত-পা-মুখ বাঁইধা মেঝেতে ফালাইলাম। আর্তনাদ বাইর হইবার আগেই গলায় কাপড় পেঁচাইয়া চাইপা ধরলাম। তারপর সেই রডটা দিয়া পোরথোমে গায়ের জোরে যতগুলান পারি, পিডাইলাম।
এরপর তার দিকে ঝুঁকলাম। জানোয়ারটার চোখে তহন আর রূপের গর্ব আছিল না, ওর অসহায় ভয় দেইখা কি যে আনন্দ লাগতেছিল আমার।
দেহটা তহন আধমরা অবস্থায় মেঝেতে পইড়া আছিল। ওইটার কলার ধইরা টান দিয়া ওর চোখে সেই রডটা ঢুকাইয়া দিলাম। গড়গড় কইরা র*ক্ত পড়তে থাকল। কিছুক্ষণ শুধু কাঁপুনি চলছিল। নিশ্বাস ভাঙা ভাঙা পড়তেছিল। রাগে তহন আমার চোখে আগুন জ্বলতেছে। ফুঁসতেছি আমি। দ্রুত উইঠা রান্নাঘরে গেলাম। বটিটা হাতে নিয়া ওর কাছে বইসা আস্তে আস্তে গলার রগ কাটতে থাকলাম। র*ক্ত ছিটকে উঠতেছিল। ও তহনো বাঁচবার চেষ্টা করতেছিল, ছটফটাইতেছিল, হাত-পা ছুঁড়তেছিল। বাঁধা মুখে গোঙানির অসহায় শব্দ পাইতেছিলাম। আর আমি ঠান্ডা চোখে সব দেখতেছিলাম।”
এই কথাগুলো বলার সময় ফাতিমার চোখ-মুখ ক্রমেই কঠিন থেকে পাথরের মতো হয়ে উঠছিল। মুখে একফোঁটা অনুশোচনার ছায়াও ছিল না। বরং চোখের গভীরে কেমন এক বিকৃত প্রশান্তি প্রকাশ পেল।
সে আরও নিচু, ভারী গলায় বলতে লাগল, “এরপরও আমার ভিতরের রাগ প্রশমিত হইল না। মনে হইল, আরো যদি মারতে পারতাম এইটারে, আরো যদি কোপাইতে পারতাম, আরো যদি র*ক্ত দেখতাম। শাস্তি তো কম পইড়া গেছে।
ওর হাতের আঙুল গুলা এক এক কইরা কাইটা দিতে থাকলাম। এক একটা আঙুল কাটার লগে যেমন র*ক্ত ছিটকা পড়ছিল, তেমন ও ছটফট করতেছিল। চোখ দিয়া পানি পড়তেছিল। র*ক্ত আমার চোখ-মুখ, মেঝেতেও ছড়াইয়া পড়ছিল। ওর দশটা আঙুল কা*টার পর ওর পায়ের দিকে গেলাম। ততক্ষণে ও ম*রার শ্যাষ ধাপে আগাইতেছিল, কিন্তু আমার ভিত্রের প্রতিশোধের নেশা যে ঘুমাইতেছিল না। তাই ওর পায়ের আঙুলগুলাও কাটতে লাগলাম। ওর পা ভিজজা গেল র*ক্তে; র*ক্তে আমার চেহারাও টইটম্বুর। গায়ের কাপড়ও ভিজজা গেছে। শ্যাষম্যাষ গলায় একটা বঁটি দিয়া পোজ দিলাম। ভলভল কইরা র*ক্ত উপর দিকে ছিটটা উঠল। র*ক্তের বুদ্বুদ দেখা দিল। আমি ওইখান দিয়া দূরে সইরা গেলাম।
কিন্তু এরপর না—আমার কিছু একটা হইল, আম্মা। আমি ধপ কইরা মাটিতে বইসা পড়লাম। র*ক্তে ভেজা চেহারা, চুল লইয়া এক দৃষ্টিতে রমজানের দিকে তাকাইয়া রইলাম। প্রায় আধঘন্টার মতোন ওর মৃ*তদেহের দিকে তাকাইয়া রইলাম। আমার কোনো অনুভূতি কাজ করতেছিল না। উলটা হুট কইরাই মস্তিষ্কে ওর আগের করা কাজগুলান নাড়া নিল। আমার চুলের মুঠি ধইরা কতগুলান মারছে, অহনার আর ওর মেসেজ গুলা—সতিনের বাচ্চা হওয়ার কথাও মনে পইরা গেল। শ্যাষ! আবার ওরে খু*ন করার নেশা জাগল।
কিন্তু ম*রা মানুষরে কি মা*রোন যায়?
হয়ত যায়! আমি আবার বঁটি হাতে নিলাম। ওর বুকের উপর কো*পাইতে থাকলাম। র*ক্ত ছিটকাইয়া উঠতে থাকল। ওর জামা ছিড়ড়া ছিন্নভিন্ন হইতেছিল। বুকের ফাটা জায়গা দিয়া লাল মাংস দ্যাখা গেল। কিন্তু আমি থামলাম না। কো*পাইতে থাকলাম যতক্ষণ গায়ের শক্তি শ্যাষ না হয়। একটা পর্যায়ে ক্ষান্ত হইলাম। আমার শরীর তহন নিস্তেজ হইয়া গেল। নিশ্বাস ঘন ঘন পড়তেছিল। আমি হাত নামাইয়া নিলাম। চারপাশে তাকাইলাম। মেঝেতে কেমন র*ক্তের রেখা এক জায়গায় ঘন, এক জায়গায় প্যাটার্ন আকারে বইতেছে। র*ক্তের গন্ধে কেমন বমি বমি ভাব আইল আমার। তাও কোথাও যেন শান্তির অভাব আছিল। আমি ভ্রূ কুঁচকাইয়া খণ্ডবিখণ্ড লা*শটার দিকে তাকাইলাম আবার।
পুলিশ, পোস্টমর্টেম, লোকজন জানলে কী হইবে—এসব কিছুই মাথায় আহে নাই, খালি তোমার ওই বারের খু*নি রূপটার কথা মনে পড়ল, আর তহনই নিজের মধ্যে আরো একবার সাহস জমা হইল। এরপর মনে হইল, ওর পুরু*ষ*ত্বে*র চিহ্নটাই শ্যাষ কইরা দেওয়া উচিত। সেইটাই করলাম। ওর প্যান্টের উপ্রে দিয়া কো*পাইয়া কাইটা, আস্তে আস্তে বঁটি দিয়া কাটতে লাগলাম জিনিসটা। নরম চামড়া কাটতে গিয়া র*ক্ত পড়তেছিল ধীরে ধীরে। ভিতরের সাদা-সাদা তরল, লাল অংশ দেখা যাইতেছিল।
কিন্তু আমার আফসোস হইল। ও জীবিত থাকলে কাটলে মনে হয় বেশি প্রশান্তি আসত—ভাইবা অনেক আফসোসই করলাম। কিন্তু থামি নাই। কাটা থামাই নাই। কাটতেই থাকলাম। তেমন র*ক্তও ঝরতে লাগল।
এক পর্যায়ে কাটা শ্যাষ হইলে অঙ্গটার দিকে তাকাইলাম। কেমন জানি ঘিনঘিন করতে লাগল শরীরটার মধ্যে। ওটা হুট কইরাই হাত দিয়া ছাইড়া দিলাম। কিন্তু তহন আমি হুতাশ। বুঝবার পারতেছিলাম না, অহন কী করা উচিত। প্রায় আরও ঘণ্টাখানেক বইসা রইলাম হতভম্ব হইয়া। মাথা ঝিমঝিম করতেছিল।
আমি ফাতিমা হয়ত এই কাম জীবনেও করতে পারতাম না, যদি না নিজের চোখে মার হাতে বাপের মরণ দেখতাম।
কিছুক্ষণ পর হুট কইরা আশপাশ তাকাইলাম। ওর র*ক্তাক্ত বুক দেইখা পাগলের মতোন হাহা কইরা হাসতে থাকলাম। এই বুকে কোনোদিনও আমার ঠাঁই হয় নাই, হইছে অহনার। ঘুমাইতে গেলেও সে আমারে দূরে সরাইয়া দিত। এইটা ভাইবা কষ্টে বুকটা ফাটতেছিল। কান্না আইছিল। গলা অবধি উঠছিল। কিন্তু চোখের পানি যে অতি মূল্যবান—আর ওর লাইগা ফালানো উচিত না, তাই চোখের পানি জোর কইরাই আটকাইয়া রাখলাম।
এরপর কিছুক্ষণ পর ফজরের আযান শুইনা আমার হুঁশ ফিরল। কেন জানি সবকিছু অচেনা লাগতে শুরু করল। নিজের নিশ্বাস ছাড়া আর কিছু শুনতে পাইলাম না। বুকের ভিত্রেটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগতেছিল। আমার আঙুলগুলা অবশ হইয়া গেছিল। শরীরটায় হঠাৎ ঠান্ডা অনুভব করতেছিলাম, অথচ পিঠ বাইয়া ঘাম নামতেছিল। আমি বুঝবার পারলাম না, কী করা উচিত। পায়চারি করতেছিলাম, থামতেছিলাম, আবার হাঁটতেছিলাম।
হঠাৎ আকবরের নাম মাথায় আইল। কেন যে তার নাম আইল, নিজেও জানি না। ঘরের ভিত্রে জলদি যাইয়া ফোন নিয়া আইলাম। কল দিলাম তারে। ভাবি নাই, ওই রাইতে সে আমার ফোন ধরবে। কিন্তু ভাগ্যক্রমে ফোন ধরছে।
আমি তারে শুধু কইলাম, ‘পাটোয়ারী বাড়ি আসেন, কেলেঙ্কারি হইয়া গেছে।’
সে কিছু কওয়ারও সুযোগ পায় নাই, আমিও সুযোগ দেই নাই।
সে বেশি সময় নিল না আইতে। ওই রাইতে একটা মেয়ে মানষের ঘরে আইবে, এইটাও হয়ত তার মাথায় কাম করে নাই। বোধ হয় ভাবছে, আমার কিছু হইছে, বা আমার ছেলেমেয়ের কোনো ক্ষতি করছে ওরা।
দরজাটা খোলাই আছিল। ভিতরে ঢুইকাই যহন আমারে ওমন র*ক্ত নিয়া বসা অবস্থায় আর রমজানের লা*শ দেখল, তার চোখ বড়ো হইয়া গেল।
চিৎকার দিয়া উঠল, ‘ফাতমা!’
কিন্তু আমি ভয় পাইলাম না। ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাইলাম। অথচ আমার চোখের পাপড়িতেও র*ক্ত জমাট বাঁধছিল। সে ঢোক গিলল। একটু একটু কইরা আমার দিকে আগাইল। হয়ত আমারে দেইখা আতঙ্কিত হইছে, হয়ত না। তার অভিব্যক্তি ধরতে পারলাম না।
সে আইসা আমার পাশে বইল। ‘ক্যান করলি?’
আমি শান্ত গলায় আস্তে কইরা কইলাম, ‘তার দ্বিতীয় সংসার আছে।’
সে আর কোনো প্রশ্ন করল না। শুধু একখান লম্বা নিশ্বাস ছাইড়া দ্রুত কইল, ‘জলদি কবর দিতে হবে। ওঠ, ফাতমা।’
কিন্তু আমি ঠিক ওইভাবেই বইসা রইলাম। আমার এই অবস্থা দেইখা সে হঠাৎ আমার কাঁধে ধাক্কা দিয়া চেঁচাইয়া কইল, ‘কানে কথা ঢুকেনি? চল, জলদি!’
ততক্ষণে বোধ হয় হুঁশে ফিরছিলাম। কিন্তু ধ্যানজ্ঞান তহনো ঠিকমতোন কাজ করে নাই। গলা শুকাইয়া আসছিল, ঠোঁট কাঁপতেছিল। কইলাম, ‘এ… এহন কী করুম, আকবর ভাই?’
সে তাড়াতাড়ি জিগাইল, ঘরে আর কেউ আছে কিনা। আমি মাথা নাড়াইয়া বুঝাইলাম, নাই। এরপর আর সময় নষ্ট করে নাই। তাড়া দিল। আমি তহনো পুরাপুরি নিজের মধ্যে ফিরি নাই—কি করছি, ক্যান করছি, কিছুই জানি না। সে যা যা নির্দেশ দিল, যন্ত্রের মতো ওইটাই করলাম।
দুইজন মিল্লা লা*শটা ধইরা ঘরের বাইর করলাম। দূরের এক জায়গায় নিয়া গিয়া মাটির নিচে চাপা দিলাম। আকবর পুরা ঘর ধুইয়া-মুইছা এমনভাবে সব সাফ করছিল যেন এইহানে কিছুই হয় নাই। আমার কাপড়ও পালটাইছি। কোথাও কোনো চিহ্ন রাখি নাই। বাইরে সব স্বাভাবিক রাখলাম, কিন্তু আমার ভিতরটা তহনো থরথর কইরা কাঁপতেছিল।
ওই রাইতে চোখ বন্ধ করলেই মনে হইত, মাটির নিচ থেইকা কেউ আমার নাম ধইরা ডাকতেছে।
এক ফোঁটাও ঘুম আহে নাই।
আমি তারে একবার কইছিলাম, ‘শুনেন, আমি পুলিসস্টেশনে যাই। নিজের অপরাধ স্বীকার করি, নইলে ম*রলেও শান্তি পাইব না।’
আকবর তহন থামাইয়া দিল। বুঝাইল—তিনটা ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ কি হইবে? বাপ নাই, মা-ও জেলে গেলে সমাজে ওরা মুখ দেখাইবে কেমনে? কত কথা, কত বাস্তবতা এক এক কইরা সামনে আনল। তাই আমিও শ্যাষম্যাষ চাইপা গেলাম। সে সব বুঝাইয়া চইলা গেল, আর আমি একা রইলাম ঘরে।
পরদিন শাউড়ী আইসা কী কান্দন! আমার নাকি অভিশাপ লাগছে তার ছেলের গায়, তাই প্লেন ক্রাশ করছে। আমি অপয়া, আমি ডাইনি, আমার লগে বিয়া দিয়াই এই সর্বনাশ। কান্দনের ফাঁকে ফাঁকে অহনার প্রশংসা করতেও ছাড়ল না। ও নাকি কত ভালো বউ, কত পুণ্যবতী! আমি চুপচাপ তার সামনে দাঁড়াইয়া রইলাম। এক ফোঁটা চোখের পানিও ফালাইলাম না। এইটা দেইখা আমারে আমার ছেলে-মেয়ে সহ কি গালটাই না দিল।
টিভিতে সরাসরি প্লেন ক্রাশের খবর দেখাইছিল। সেই খবর পাইয়াই তারা বাড়ি ফিররা আইছে। কিন্তু তার আর তার মাইয়ার মরা কান্দন দেইখা আমার ভিত্রে কিছুই নড়ল না। আমি ভাবলেশহীন গলায় কইলাম, ‘কর্মের ফল সবাই ভোগ করে। মরার আগে হোক, বা পরে।’
এই কথা শুইনা শাউড়ী তেড়ে আইলো আমারে মারতে। কিন্তু এইবার আর গায়ে হাত তুলবার সুযোগ দেই নাই। মুখ বেঁকাইয়া হাইসা বেটির হাতখানা শক্ত কইরা ধরলাম। এমন জোরে ধরছিলাম যে ওর চোখে ভয় ঢুইকা গেছিল। মনে হয় হাত ভাইঙা যাইত।
সে তখন চিল্লাইতে লাগল, ‘ও মা গো, ও বাবা গো।’
আমারে মা*গী-ছাগী থেইকা রাক্ষসী, চুন্নি, ডাইনি—কি না কি কইল। গালাগালগুলা কানে ঢুকলেও গায়ে লাগাই নাই। আমার ভিত্রে তহন অন্য কিছু জাগছিল। আমি কি করলাম জানো?”
আম্বিয়া স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইলেন। তার মুখে আর বিস্ময়ের ছায়াটুকুও নেই, কেমন যেন শান্ত, ভারহীন চেয়ে আছেন। বহুদিনের বোঝা নামিয়ে রাখার পর মানুষ যেমন হয়, ঠিক তেমন।
ফাতিমা ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি টানলেন। গলায় কোনো উত্তেজনা নেই, স্থির কণ্ঠে বললেন, “আমিই উলটা মা*গীর গালে থাপ্পড় মারলাম। এত জোরে মারছিলাম যে বেটি কাঁপতে কাঁপতে যাইয়া নিজের মাইয়ার গায়ে পড়ল। ওর মাইয়াও আমারে গালাগাল দিয়া মারতে আইল। কিন্তু আমি ওরেও একই গায়ের জোরে একটার পর একটা মারতে থাকলাম। এতদিনের জমা রাগ, অপমান, ভয়—সব একসাথে বাইর হইয়া আইলো।
আমিও তহন দেখাইয়া দিলাম, আমি আম্বিয়ার মাইয়া। আমি চৌধুরি বংশের মাইয়া।
এরপর আর কোনো কথা না কইয়া, তুব্বারে কোলে নিয়া ঘর দিয়া বাইর হইয়া আইলাম। একবারের লাইগাও আর পিছন ফিররা তাকাইলাম না।
দীর্ঘ একটা নিশ্বাস ছাড়লাম। মনে হইল, এত বছরের বুকের পাথরটা নাইমা গেছে। বুকের ভিতরটা হালকা লাগতেছিল। মুক্তির পথ পাইছি কিনা!
তুব্বার কপালে আলতো একখান চুমা খাইলাম।
তারপর হাইসা হাঁটতে থাকলাম যেদিক দু-চোখ যায়। অচেনা রাস্তাও সেদিন আপন লাগতেছিল।
কোমরে গোঁজা ফোনটা বাইর করলাম। আকবররে কল দিলাম। সে আইসা আমারে নিয়া গেল তার লগে। এই কয় বছরের সবকিছু, রমজানরে মারার কারণ—সব জিগাইল।
সব শুইনা সে কইল, ‘তোর উচিত ছিল ওই জানোয়ারটারে ডিভোর্স দেওয়া।’
আমি চোখ নামাইয়া শান্ত গলায় কইলাম, ‘তার থেকে এই শাস্তিটা সুন্দর হইছে না?’
সে হতাশ নিশ্বাস ছাড়ল।
‘অত্যাচারের কথা পুলিশরে জানাইলি না কেন?’
‘ইজ্জত যাইব।’
‘কার?’
‘আম্বিয়া জমাদ্দারের।’
সে কপাল কুঁচকাইয়া কইল, ‘কেমনে?’
‘ছেলেরে সে-ই পছন্দ করছিল।’
সে দীর্ঘ নিশ্বাস ছাইড়া কইল, ‘রমজান জেলে গেলে যতটা ইজ্জত যাইত, এই খু*নের কথা যদি কেউ জানে, তার থেকে বেশি সম্মান হারাবে খালাম্মা।’
‘কেমনে জানবে? আপনে কইবেন?’
সে দৃঢ় গলায় কইল, ‘মইরা গেলেও না।’
‘তাইলে নিশ্চুপই থাকেন। ক্যান, আপনিই না বুঝাইলেন—ছেলেমেয়েরে মানুষ করবার লাইগা পুলিশরে কিছুই জানানো যাইবে না, তাইলে আমার জেল হইবে।’
সে কিছুক্ষণ চুপ কইরা থাকল। তারপর কইল, ‘বলছি, আর একটা কথাও বলতে চাই।’
‘কি?’
‘আমি তোরে কালকেই বিয়া করতে চাই।’
আমি বিস্ময় ছাড়াই তাকাইলাম। ‘অনুমতি চাইছেন?’
‘না। জানাইয়া দিলাম।’”
কাহিনি শেষ করে অবশেষে ফাতিমা ধীরে ধীরে মায়ের দিকে তাকালেন। এতক্ষণ নিশ্চুপ থেকে সবকিছু শোনার পর আম্বিয়া একচিলতে হাসলেন। সেই হাসিতে বিস্ময়ের চেয়ে বেশি ছিল প্রশান্তি।
মায়ের মুখে হঠাৎ এমন আলতো হাসি দেখে ফাতিমা খানিকটা চমকেই গেলেন। তিনি তো ভেবেই রেখেছিলেন, গল্পের শেষ প্রান্তে এসে মা নিশ্চয়ই এমন কিছু বলবেন, যা তার বুক চিরে দেবে। অথচ তার বদলে এই নীরব হাসি! কেন যে হাসছেন, তার কারণ ফাতিমা কোনোভাবেই ধরতে পারলেন না।
তিনি ফ্যালফ্যাল করে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছেন। আম্বিয়া তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে, গলায় স্থিরতা রেখে বললেন, “চল, দুইজন মিললা মরিচ ভর্তারদা কয়টা পান্তা ভাই খাই। তোর গলাহান শুকাইয়া আইছে। পান্তা ভাত পড়লে প্যাটে শান্তি লাগব।”
এত বড়ো ঘটনার পর, এত ভয়াবহ স্বীকারোক্তির পর, মায়ের মুখে প্রতিবাদ তো দূরের কথা, এমন সাদামাটা প্রস্তাব আসবে—এটা ফাতিমার ভাবনার পরিধিতেও ছিল না। কপাল কুঁচকে তিনি আরও কিছুক্ষণ মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, বয়সের ভারে বুঝি হঠাৎ ভীমরতি ধরেছে! কিন্তু না, আম্বিয়া তো সে রকম মানুষ নন। এতক্ষণ তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ সচেতন, সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।
ফাতিমা ভাবলেন, তার মা কখনো অকারণে কিছু বলেন না বা করেন না। প্রতিটি নীরবতার পেছনেও তার যুক্তি থাকে। তবুও নিজের মনটাকে আশ্বস্ত করতে তিনি মায়ের কুঁচকে যাওয়া ডান হাতটা নিজের দুই হাতের মাঝে তুলে আলতো করে চুমু খেলেন। মায়ের শীতল, গভীর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বললেন, “তুমি ঠিক আছো, আম্মা?”
আম্বিয়া আবার সেই শান্ত হাসিটা ঠোঁটের কোণে ধরে রেখে বললেন, “ঘরে চল আগে। পইলা বেলার রান্ধনও তো বাকি।”
এই কথা বলে তিনি উঠে সামনে পা বাড়ালেন। কিন্তু ফাতিমা তখনো বেঞ্চে বসে মায়ের পিঠের দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ।
একটু পর ফাতিমা গলা উঁচু করে ডাকলেন, “তোমার ফাতমা কি কোনো ভুল করছে, আম্মা?”
ওপাশ থেকে উত্তরটা এলো ক্ষীণ স্বরে। বয়সের ভারে গলাটা খুব জোরালো হলো না, কিন্তু শব্দগুলোর ভেতরে দৃঢ়তা ছিল।
“আম্বিয়া জমাদ্দার করছে।”
এই কথাটা শুনে ফাতিমার ঠোঁটে আপনাতেই মুচকি হাসি ফুটে উঠল। মায়ের ইঙ্গিত তিনি বুঝে গেছেন। অর্থাৎ ওই জানোয়ারগুলোর ঘরে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে আম্বিয়াই ভুল করেছিলেন, কিন্তু ফাতিমা নিজের সম্মান আর অস্তিত্ব বাঁচাতে যা করেছে, তাতে কোনো ভুল নেই।
হালকা হাসি নিয়ে তিনি দ্রুত পায়ে এগোতে শুরু করলেন। মায়ের পাশে এসে হাঁটতেই এক ফাঁকে আম্বিয়া মেয়ের হাতটা নিজের কাঁপা হাতে চেপে ধরলেন। মা-মেয়ে পাশাপাশি কিছুক্ষণ হাঁটলেন নীরবে।
হঠাৎ আম্বিয়া গলায় খানিকটা রস ঢেলে বললেন, “জামাইটা তইলে ভালাই হইছে বুঝলি? কাইলকা বরণ করুম নাকি? বুড়া মাইয়ার বুড়া জামাইরে বরণ করবার কিন্তু আলাদা একখান মজা আছে।”
এতক্ষণকার ভারী, জমাট আলাপের পর হুট করে মায়ের রসিক ভঙ্গির কথায় ফাতিমা অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। লজ্জার উষ্ণতা ধীরে ধীরে গাল বেয়ে মুখাবয়বে ছড়িয়ে পড়ল। কথাগুলো যে আকবরকে ঘিরেই বলা, সে বিষয়ে তার মনে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই। তবু যে বিস্ময়টা তাকে আচ্ছন্ন করল, তা অন্য জায়গায়—এত অল্প সময়ের মধ্যেই মা সবকিছু মেনে নেবেন, তা তিনি কল্পনাও করেননি।
মায়ের প্রশ্নের সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে তিনি শুধু লজ্জাভেজা একটানা মুচকি হাসতে থাকলেন। আম্বিয়া তীক্ষ্ণ গলায় আবার কথা তুললেন, “নরম মাটি মাইনষে খামচায় বেশি, তাই মাইয়ারা ফুলের মতোন হইলেও কাঁটার মতোন ধার রাখোন চাই। যেন কেউ ছিঁড়তে আইলে রক্ত তার ঝড়ে, তোর না। এই দুনিয়া মাইয়াগো চুপ থাকবার শেখায়, অথচ মাটি হইলে পায়ের তলায় পিষে দেয় সব্বাই। তাই আঘাত করবার আগেই থাপ্পড় মারার জোর রাখোন চাই। চুল টানার আগে লাথি, আর কোমর ভাঙার আগে ঘাড় থেইকা সোজা গলাটা নামাইয়া দিতে হইব। ভাব রাখতে হইব এমন—দেখলে কথা কওয়ার আগেও যেন মানুষ দশবার ভাবে।”
প্রতিটা শব্দ ফাতিমার বুকের ভেতর আলাদা আলাদা করে গেঁথে যাচ্ছিল। তিনি মায়ের কথার গভীরতা বুঝে মাথা ঝাঁকালেন।
মুহূর্তের ভার কাটাতে আম্বিয়া এবার হালকা হাস্যরসের মোড়কে অভিমানী স্বরে যোগ করলেন, “তবে অভিনয়তে তোরে আমি দশে দশ দিছি।”
এই কথা শুনে ফাতিমা আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। শিশুর মতো গদোগদো মুখে মায়ের গা ঘেঁষে বললেন, “আম্মাআআ… ক্ষমা চাইছি তো।”
আম্বিয়া শুধু হাসলেন। কোনো কথা বললেন না।
কিন্তু সেই নীরব হাসির ভেতরেই ছিল ক্ষমা, ছিল সম্মতি, আর ছিল এক মায়ের নিঃশব্দ আশীর্বাদ।
মিরা কিছুক্ষণ তির্যক দৃষ্টিতে কারানের দিকে তাকিয়ে রইল। কারান নির্ভার হাসি ঠোঁটে ধরে একে একে চামচে খাবার তুলে মিরার ঠোঁটের কাছে এগিয়ে দিতে লাগল। খাওয়ার পর না চাইতেও মিরার ভ্রূ সামান্য উঁচু হয়ে গেল, স্বাদটা প্রত্যাশার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
প্রশংসা করবে না বলে মুখ শক্ত করে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা চলছিল, কিন্তু খাবারের পরতে পরতে এমন সূক্ষ্ম যত্ন আর নিখুঁত সামঞ্জস্য লুকিয়ে ছিল যে, অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে মুগ্ধতার ছাপ ফুটে উঠল। মিরা নিজেও চামচ তুলে কারানকে খাওয়াতে শুরু করল।
কারান হঠাৎ মিরার কোমর জড়িয়ে ধরে স্নিগ্ধ টানে তাকে নিজের দিকে টেনে নিল। চোখে চোখ রেখে বলল, “কিছু বলো।”
মিরা ঠোঁট ভিজিয়ে নিল।
“খুবই ভালো হয়েছে। তবে… তোমার থেকে কম টেস্ট।”
কারান ঠোঁট কামড়ে চোখ সরু করে কিছুক্ষণ নিথর তাকিয়ে রইল। অধর কামড়ানোর ভঙ্গিটা তাকে বিপজ্জনকভাবে প্রতিবারই আকর্ষণীয় করে তুলে। মিরার বুকের ভেতর অজান্তেই একটা তীব্র টান জেগে উঠল; ওই অধরে একবার দাঁত বসাতে পারলে কী স্বস্তিই না মিলত! ইশশ, তার স্বামী এতটা সুদর্শন কেন, এতটা মন্ত্রমুগ্ধকারী কেন?
অবচেতনে মিরাও সম্মোহনীভাবে হেসে কারানের মতোই গভীর, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল; দুই জোড়া চোখে তখন নীরব সংঘর্ষ চলছে।
কিয়ৎকাল পর কারান মিরার হাত ধরে সামনে এগিয়ে চলল। মিরাও নির্বাক মুগ্ধতায় তার পিছু নিল।
কারান তাকে নিয়ে গেল সেই ঘরে, যেখানে আত্মরক্ষার সরঞ্জামগুলো সুসংগঠিতভাবে রাখা।
মিরা বিস্মিত হয়ে বুকে দুই হাত বেঁধে বলল, “এখানে কেন নিয়ে এলে? সেদিনের মতো আরেকটা ঘুসি খাওয়ার শখ জাগল নাকি?”
কারান কোনো জবাব না দিয়ে সামনের তাকের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটি পিস্তল তুলে আনল। বলল, “সেল্ফ-ডিফেন্স-এর জন্য গান হ্যান্ডলিং শেখাটা মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট, সুইটহার্ট।”
“শিখাও শিখাও। তারপর কবে জানি তোমার উপরেই প্রয়োগ করে ফেলি।”
“এই একটাই কাজ তুমি করতে পারবে না। আই নো দ্যাট। অ্যান্ড আই’ম ফা’কিং শিওর।”
মিরার বুকে কোথাও যেন তীক্ষ্ণ এক ধাক্কা লাগল। এতটা অন্ধ বিশ্বাস তো সে নিজেকেও করে না, নিজের সিদ্ধান্তের উপরও না। তবু মুখে কিছু বলল না। গলার ভেতর জমে থাকা কথাগুলো ঢোক গিলে চেপে রেখে শুধু হাত বাড়াল, কারণ কারানের এই বিশ্বাসটা, এই অটল আস্থা নাহয় তার উপর জীবনভরই থাকুক।
কারান এক পা এগিয়ে এসে বন্দুকটা তার হাতের তালুতে তুলে দিল।
তারপর ঠিক তার পেছনে দাঁড়িয়ে সংযত স্বরে বলল, “লিসেন, দিস ইজ দ্য ব্যারেল। এই দিক থেকেই বুলেট বের হয়।”
সে মিরার হাতের অবস্থান ঠিক করে বন্দুকটা সামনের দিকে ঘুরিয়ে দিল। মিরা ভ্রূ কিঞ্চিৎ কুঁচকে মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগল।
কারান আবার বলল, “এই অংশটা ট্রিগার। এখানে চাপ দিলেই গুলি ছুটে। কিন্তু তার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস—”
সে বন্দুকের পাশে দেখাল, “দিস ইজ দ্য সেফটি সুইচ। অন থাকলে গান ইনঅ্যাকটিভ থাকে, অফ করলে ফায়ার করার অ্যাবিলিটি পায়। সো না বুঝে কখনোই অফ করবে না। আন্ডারস্টুড?”
মিরা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল।
কারান শেষবারের মতো যোগ করল, “অ্যান্ড দিস ইজ দ্য ম্যাগাজিন। এখানেই বুলেটস থাকে। ম্যাগাজিন ছাড়া গান ফায়ার করতে পারে না, রিমেম্বার দিস।”
সে বন্দুকটি খুলে দেখাল—কীভাবে ম্যাগাজিন সন্নিবেশ করতে হয়, কীভাবে তা পুনরুদ্ধার করতে হয়। মিরা অল্প হেসে জিজ্ঞেস করল, “একটি বিষয় জিগ্যেস করতে পারি?”
“অবশ্যই।”
“এই সব স্কিলস অ্যাচিভ করা কি আমার জন্য অত্যাবশ্যক? আর একদিনে কি শেখা পসিবল?”
কারান আদেশস্বরূপ কণ্ঠে বলল, “অ্যাবসোলিউটলি। আর আজ আমি তোমাকে ততক্ষণ শেখাবো, যতক্ষণ না তুমি কমপ্লিটলি পারদর্শী হও। গান চালানো অতিরিক্ত কমপ্লেক্স না, কিন্তু কন্টিনিউয়াস প্র্যাকটিস করা অপরিহার্য।”
তারপর পেছন থেকে মিরার কাঁধে হালকা হাত রেখে বলল, “ব্রেথ স্থির রাখো, রিস্টস শক্ত করো, কিন্তু অতিমাত্রায় টেনো না, নাহলে লক্ষ্য ডিভিয়েট করতে পারে। ফিঙ্গার রাখো ট্রিগারে, অ্যান্ড স্লোলি প্রেসার অ্যাপ্লাই করো…”
মিরা তার নির্দেশাবলির অনুবর্তীভাবে কাজ করল। এক ক্ষুদ্র টিক শব্দে গুলিটি ছুটে গেল শুটিং বোর্ডের দিকে।
কারান মুখ প্রসারিত করে হেসে বলল, “ওহ, গশ! পারফেক্ট, সুইটহার্ট।”
মিরাও হালকা হাসি দিয়ে বলল, “যদি নিশানা ঠিক থাকে, এটা খুব একটা হার্ড নয়, হানি।”
কারান রোমান্টিক দৃষ্টিতে মিরার গালে গাল মেলাল। নেশাজনিত কোমলতায় আওড়ালো, “যদি আপনার স্বামী আপনার পাশে থাকে, কোনো কাজই কঠিন মনে হবে না, বেগম।”
মিরা লজ্জায় মুচকি হাসল। এরপর আবার ঠিকভাবে বন্দুকটি ধরল। কয়েকবার অনুশীলন করল। প্রতিবার ভুল হলে কারান নিজে ধৈর্য সহকারে নিশানায় সমন্বয় করাল। প্রথম দিকে গুলি বোর্ডের এপাশ-ওপাশে ছুটলেও, ক্রমশ নিশানার সঙ্গে সংগতি স্থির হলো। এবারের গুলিটি একদম মাঝখানের বুলস আই-তে নিখুঁতভাবে আটকে গেল।
মিরা আনন্দে লাফিয়ে উঠল, তার চোখ-মুখ চকচক করছে। কারানও বউয়ের প্রচেষ্টাকে হাত তালি দিয়ে বাহবা জানাল।
কাব্যের হঠাৎ উচ্চারিত কথাটিতে ইলিজা মুহূর্তেই অপ্রস্তুত এক ঝাঁকুনিতে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। চোখদুটি বিস্ফোরিত। ঠোঁট দুটো নড়ল বটে, কিন্তু কোনো ধ্বনি বেরোল না।
জীবনে প্রথমবার যার জন্য তার হৃদয়ের গভীরে অনাবিষ্কৃত এক আবেশের বীজ অজান্তেই রোপিত হয়েছিল, যার অস্তিত্বে নিজেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছিল—সে কিনা জেলে গিয়েছিল!
তার মানে সে নিশ্চয়ই এমন কোনো অপরাধ করেছে, যা সমাজের চোখে ক্ষমার অযোগ্য। ইলিজা ভিতরে ভিতরে নিজেকে অভিযুক্তের আসনে বসাল। না জেনেশুনে এমন একজন মানুষের প্রতি দুর্বল হওয়াটা যে মারাত্মক ভুল, এই উপলব্ধি তীক্ষ্ণ ছুরির মতো বুকে বিঁধতে লাগল তার। অথচ যুক্তির সমস্ত দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে অবুঝ মন।
কিছুক্ষণ নিশ্বাস চেপে ধরে, ছলছল দৃষ্টিতে কাব্যের দিকে তাকিয়ে রইল সে। লক্ষ্য করল, কাব্যের ভ্রূকুটিতেও কোনো আলোড়ন নেই। মুখাবয়বে নেই ব্যাখ্যার তাড়াহুড়ো কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের ক্লান্তি। সে নির্বিকারভাবে সামনে নদীর স্থির জলরাশির দিকে তাকিয়ে আছে।
ইলিজা আগের জায়গা থেকে খানিকটা সরে গিয়ে বসল। কাব্য সেই পরিবর্তন অনায়াসেই বুঝে ফেলল।
কাব্য ঠোঁটের কোণে একফোঁটা অর্থবহ হাসি ঝুলিয়ে রেখে শান্ত গলায় বলল, “ভয় পাচ্ছেন?”
ইলিজা ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠলেও দৃশ্যমান দুর্বলতা দেখাতে চাইল না। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “না… তেমন কিছু না।”
কাব্য হালকা হেসে দৃষ্টি নামাল।
“কিন্তু দূরত্ব তো তাই বলছে।”
কথাটায় ইলিজার চোখ আপনাতেই নুয়ে পড়ল। কারণ সত্যিটা তো এই, সে ইতোমধ্যেই ভালোবাসার মতো এক অনিরাপদ সুতোয় জড়িয়ে পড়েছে।
কাব্য আবার বলল, “চিন্তা করবেন না। আমি কোনো ক্রিমিনাল নই।”
ইলিজা দ্রুত চোখ তুলল।
“তাহলে… তাহলে জেলে যাওয়ার কথা বললেন কেন?”
“শেখ ইমতিয়াজ বায়জিদের নাম শুনেছেন?”
ইলিজা ভ্রূ কুঁচকে ভাবল।
“উমম… বাবার কাছে শুনেছিলাম।”
“উনি আমার জন্মদাতা,” বলেই কাব্য গভীর টানে দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ল।
এই তথ্য শুনে ইলিজার বিস্ময় এবার কৌতূহলে রূপ নিল। আগের সব দ্বিধা ছাপিয়ে সে সামান্য কাব্যের দিকে এগিয়ে এলো।
“উনি তো অনেক বড়ো একজন শিল্পপতি, কিন্তু আপনাকে দেখে তো কখনোই এমন কিছু…”
কাব্য মাথা নিচু রেখেই বলল, “সবকিছু বাইরে থেকে প্রকাশ পায় না।”
ইলিজা আরও একটু কাছে এসে বসল। কাব্যের অবসন্ন, ভারাক্রান্ত মুখাবয়বের দিকে তাকিয়ে নরমভাবেই আগ্রহী স্বরে বলল, “যদি অসুবিধে না থাকে, আমি আপনার জীবনের পুরো গল্পটাই শুনতে চাই।”
কাব্য কখনোই নিজের জীবনকথা কাউকে শোনায়নি। এই জীবনের স্মৃতিগুলো এমন এক জায়গায় পোঁতা, যেখানে অযাচিত কৌতূহল ঢুকলে তা সহজেই উপহাসে পরিণত হতে পারে, কারণ সবাই সবকিছু বোঝে না।
কিন্তু ইলিজার কাছে গোপন রাখা অনুচিত। অনৈতিকও। যাকে সে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে চায়, তার সামনে কোনো অদৃশ্য দেয়াল তুলে রাখার অধিকার তার নেই।
কাব্য গভীর করে নিশ্বাস টানল। বুকের ভেতর জমে থাকা বহু বছরের অপ্রকাশিত ভার নিয়ে একটু নড়েচড়ে বসল। সে একবার সামনের বিস্তৃত আকাশের দিকে উদাস চোখে তাকাল। তারপর ধীরস্বরে বলতে শুরু করল, “আমার চেহারা নাকি আমার মায়ের সঙ্গে অনেকটা মিলে। গায়ের রংটা পর্যন্ত। আমার মাকে যদি কখনো দেখাতে পারতাম, বুঝতে পারতেন, কী অসম্ভব মায়া ছিল সেই মুখে। যদিও মায়ের শ্যামল বর্ণটা আরও গভীর, আরও কোমল ছিল। আমার তো কখনো কখনো মনে হয়, এই রংটা কেবল আমার মায়ের জন্যই সৃষ্টি। আমার…”
কাব্য নিজের জীবনের প্রকৃত অধ্যায়ে ঢোকার আগেই ইলিজা হঠাৎ বলে উঠল, “মায়ের কোনো ছবি আছে?”
‘মা’ শব্দটা ইলিজার মুখে শোনা মাত্র কাব্য অল্পক্ষণের জন্য থমকে গেল। সে একবার তাকাল ইলিজার দিকে। তুলতুলে, কোমল, ফরসা মুখটায় তখন কেবল উৎকণ্ঠা বিরাজমান। কোনো ভণিতা নেই, কোনো কৃত্রিমতা নেই। কাব্য বুঝতে পারল, ইলিজা অনিচ্ছাকৃতভাবেই কাব্যের মাকে ‘মা’ বলে ফেলেছে।
কাব্য আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল সামনে। কণ্ঠ শুকিয়ে এলো, “ছিল। এখন আর নেই।”
“কেন নেই? নাকি আমাকে দেখাতে চান না আমার সুন্দরী মাকে?”
এইবার কাব্য আর হাসিটা চেপে রাখতে পারল না। ইলিজার শিশুসুলভ কণ্ঠে ‘মা’ শব্দটা কী অদ্ভুতভাবে সুন্দর শোনাচ্ছে! সে হালকা কাশি দিয়ে বলল, “আসলে মৃত মানুষের ছবি রাখা ইসলামে নিষিদ্ধ। তাই আমি সব নষ্ট করে দিয়েছি। যদিও আমার মনে তার অসংখ্য ছবি আজও বেঁচে আছে।”
ছবি নেই—এই কথাটায় ইলিজার মুখটা খানিক মলিন হয়ে গেল। যাকে সে কখনো দেখবে না, সেই শাশুড়ি মায়ের কথা ভেবে মনটা ভারী হয়ে উঠল। কাব্য ইলিজার সেই শুষ্ক মুখের দিকে আর তাকাল না। স্মৃতির অতলে নেমে গিয়ে নিজের জীবনকথা বলতে শুরু করল, “আমার জন্মের পরপর হাসপাতালেই মিসেস আরশিয়া রহমান মারা যান। কর্তৃপক্ষের গাফিলতিই এর কারণ ছিল। আমাকে বের করার পর, মায়ের পেটের ভেতর একটা ধারালো যন্ত্র রয়ে গিয়েছিল। মা অনেকক্ষণ যন্ত্রণায় কাতরেছিলেন। আমাকে ধরতে চেয়েও পারেননি। অসহ্য ব্যথায় শরীর সাড়া দিচ্ছিল না।
শুনেছি, মায়ের চোখ বেয়ে তখন নাকি পানি নেমেছিল। তিনি আমার দিকে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে ছিলেন। তারপর আবার অপারেশন করা হলো। আর সেখানেই সব শেষ।
শেষ হয়ে গেল আমার মা।
না তিনি আমাকে ছুঁতে পারলেন,
না আমি তাকে।”
কথাগুলো বলার পর কাব্য চুপ করে রইল। কথার সঙ্গে সঙ্গে তার ভেতরের শক্তিটুকুও নিঃশেষ হয়ে এসেছে। কয়েকবার গভীর করে নিশ্বাস নিল।
ইলিজা সংযত মুখে তার দিকে তাকিয়ে রইল। কোনো প্রশ্ন করল না। কোনো কৌতূহল দেখাল না। সে অনুভব করতে চাইল, এই মানুষটার ভেতরে এই মুহূর্তে ঠিক কী চলছে।
পুরুষ মানুষ কাঁদে না—এই সামাজিক ধারণাটা তার মাথায় ধাক্কা দিল। কিন্তু কাব্যের দিকে তাকিয়ে ইলিজার মনে হলো, এই শুষ্ক, গভীর চোখের ভেতরে জমে আছে অগণিত অশ্রু; যা বেরিয়ে আসতে পারছে না। হয়ত সে কেঁদেছে বছরের পর বছর। এতটাই কেঁদেছে যে এখন আর চোখে পানি নেই, শুধু রয়ে গেছে এক নিস্তরঙ্গ শূন্যতা।
কাব্য হয়ত আবার কথা বলবে ভেবে অনেকক্ষণ ইলিজা অপেক্ষা করল। কিন্তু না। কাব্য আর একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। অর্থাৎ সে যে মায়ের কথাতে থেমে গেছে, সেখান থেকে আর উঠে দাঁড়ানোর শক্তি তার নেই।
অবশেষে উপায় না পেয়ে, নরম স্বরে ইলিজাই বলল, “তারপর?”
এই একটি শব্দে যেন কাব্যের মাথার ভেতর হঠাৎ ঝাঁকুনি খেল। সে অন্যমনস্কভাবে ইলিজার দিকে তাকিয়ে বলল,
“হুম্?”
ইলিজা সামান্য হাসার চেষ্টা করল, যদিও হাসিটা ঠোঁটে এলেও চোখ অবধি পৌঁছাল না।
“থেমে গেলেন যে…”
এবার কাব্যের মনে পড়ল, একটু আগে সে কী বলছিল। নিজেকে সামলাতে সে অল্প করে নড়েচড়ে বসল। ঠোঁট ভিজাল। গলা পরিষ্কার করার ব্যর্থ চেষ্টা করল।
ইলিজা তাকিয়ে রইল তার দিকে। এখনকার কাব্যকে কেমন যেন আলাদা লাগছে। মুখাবয়বে আপাত শান্তি থাকলেও ভেতরে ভেতরে যে এক দুর্বিষহ অস্থিরতা দাউদাউ করে জ্বলছে, এটা স্পষ্ট।
জ্বলবেই বা না কেন? এত বছরের গোপন স্তর, চেপে রাখা অনুচ্চারিত সত্য যে আজ মুখে আনতে চলেছে। আসলে ‘লুকানো’ শব্দটা ঠিক মানায় না। কারণ কেউ কখনো জানতেই চায়নি। প্রথমবার ইলিজাই জানতে চাইল।
এর আগে শুভ্র একবার কেবল জিজ্ঞেস করেছিল, তার বাবা কী করেন। সে বলেছিল, শিল্পপতি। ব্যাস। এত বড়ো বাড়ির ছেলে হয়েও কেন সে এমন খেটে খাওয়া জীবনে অভ্যস্ত, কেন এমন ভবঘুরে, কেনই বা এতটা ছন্নছাড়া—এই প্রশ্নগুলো শুভ্র আর করেনি। কাব্যের চোখে তাকিয়েই হয়ত সে বুঝে গিয়েছিল, এই চোখের পেছনে লুকিয়ে আছে এমন এক অতীত, যেটা টেনে আনাটা নিষ্ঠুরতা ছাড়া কিছু নয়। তাই সে তাকে তার মতোই থাকতে দিয়েছিল।
অথচ আজ… আজ কাব্য নিজেই সেই দরজাটা খুলতে চলেছে।
একটা দীর্ঘ, ভারী শ্বাস টানল কাব্য। তারপর ক্লান্ত স্বরে বলতে শুরু করল, “মা মারা যাওয়ার পর শেখ ইমতিয়াজ বায়জিদ ভেঙে পড়েছিলেন ভয়ংকরভাবে। মায়ের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল প্রবল, অস্বাভাবিক রকমের গভীর। এতটা কেঁদেছিলেন যে একাধিকবার মাথা ঘুরে হসপিটালেই লুটিয়ে পড়েছিলেন। শরীর সচেতন থাকলেও মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। তিনি ছিলেন দাদা-দাদির একমাত্র সন্তান। তখন দাদা বেঁচে ছিলেন না, শুধু দাদি ছিলেন। নিজের ছেলেকে এমন অসহায় অবস্থায় দেখে দাদিও ভেঙে পড়েছিলেন। বাড়িতে আসার পর, দু’জনের কান্নায় তখন পুরো বাড়িটাই শোকের ঘরে পরিণত হয়েছিল।
আপনি যদি সুখী পরিবার কাকে বলে জানতে চান—আমাদের পরিবারটা ঠিক তেমনই ছিল। দাদা অনেক আগেই মারা যাওয়ায়, দাদি একা হাতেই শেখ ইমতিয়াজকে বড়ো করেছেন। ছেলে বড়ো হয়ে বিজনেসে সফল হওয়ার পর, তিনি নিজের পছন্দে মাকে ঘরে তোলেন। সংসার তখন জমজমাট।
মা আর দাদির সম্পর্ক ছিল অবিশ্বাস্য রকমের সুন্দর। একসাথে কাজ করতেন, একসাথে খেতেন, এমনকি ঘুরতেও যেতেন। তখনকার সময়ে যেখানে শাশুড়ি-বউয়ের সম্পর্ক মানেই অত্যাচার আর তিক্ততা ছিল, সেখানে দাদি ছিলেন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।
আর শেখ ইমতিয়াজ… তিনি মাকে চোখে হারাতেন। তার কাছে মা ছিলেন চাঁদের সমান। মজার ব্যাপার হলো, দু’জনের গায়ের রং ছিল প্রায় একই রকম। এই নিয়ে নাকি প্রায়ই ঠাট্টা করতেন। দু’জনেই বলতেন, ‘এই দেখো, আমি তোমার থেকেও বেশি ফরসা।’”
এই কথাটুকু বলে কাব্য হালকা করে হাসল। কিন্তু ইলিজা হাসল না। সে গভীর মনোযোগে শুনছিল। তবে তার মাথার ভেতর একটা প্রশ্ন ক্রমাগত পাক খাচ্ছিল, এইসব গল্প কাব্য জানল কীভাবে? কিন্তু প্রশ্নটা করতে হলো না। কাব্য নিজেই বলল, “এই গল্পগুলো আমি দাদির কাছ থেকে ছোটোবেলায় শুনেছি। তিনিই আমাকে মানুষ করেছেন।
মায়ের মৃত্যুর পর শেখ ইমতিয়াজ পুরো এক মাস যেন পাগলের মতো ছিলেন। ঠিকমতো খেতেন না, ঘুমাতেন না, অফিসেও যাননি। তারপর ধীরে ধীরে আমার কথা আর নিজের মায়ের কথা ভেবে, বাস্তবতায় ফিরতে বাধ্য হয়েছিলেন।
প্রথম তিন বছর তিনি আর দাদি আমাকে খুব যত্নে রেখেছিলেন। কিন্তু একটা সময় দাদির মনে ভয় ঢুকে গেল। তার মনে হলো, ছেলে যদি সারাজীবন একা থেকে যায়? আর তিনি যদি হঠাৎ না থাকেন, তখন আমাকে মানুষ করবে কে? এই চিন্তা তাকে ভেতর থেকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে শুরু করল।
তাই যখন আমার বয়স তিন বছর, দাদির কথায় প্রায় বাধ্য হয়েই শেখ ইমতিয়াজ আবার বিয়েতে রাজি হলেন। তারপর…”
কাব্য আর কথা এগোনোর আগেই ইলিজা হঠাৎ উদ্বিগ্ন স্বরে বলে উঠল, “একটা কথা জিজ্ঞেস করি? আপনি বারবার আংকেলকে নাম ধরে ডাকছেন কেন? শুনতে কেমন কানে লাগে।”
ইলিজার হঠাৎ এমন প্রশ্ন আসতে পারে—এই চিন্তা কাব্যকে অবাক করেনি। বরঞ্চ এতক্ষণেও কেন সে এই প্রশ্ন করল না, তা নিয়েই সে খানিকটা মনস্তাত্ত্বিক ভাবনায় ডুবে ছিল। কিন্তু বয়ঃসন্ধিকালের মন তো বুঝে না, এমন গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা উচিত না।
তবে ইলিজা জানে, কাব্য আর যাই হোক না কেন, তার উপর কখনোই রাগ দেখাবে না।
ইলিজার ভ্রূ কুঁচকানো, শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে কাব্য বলল, “আস্তেধীরে বুঝতে পারবেন।”
ইলিজা চোখ নামাল, “আচ্ছা, শুনি তাহলে। এই যে আমার কৌতূহল মুহূর্তে মুহূর্তে বাড়াচ্ছেন, এটাও কিন্তু ছোটোখাটো একটা অপরাধ।”
কাব্য স্নিগ্ধ হেসে জিভ দিয়ে অধর কামড়ে বলল, “আপনাকে ভালোবেসেছি বলে ‘অপরাধী’ উপাধি দিচ্ছেন তো? অবশ্য, সে দায় আমি গর্বের সঙ্গে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করব। বরং চাই, এই একমাত্র অপরাধ-এর মালিকানা যেন শুধুই আমার থাকে।”
ইলিজা অবাক হয়ে চুপ হয়ে গেল। এমন একটা উৎকণ্ঠায় ভরা মুহূর্তে কাব্য এমন কথা বলে বসবে, সে কল্পনাও করতে পারেনি। তাই অনিচ্ছায়ই তার গাল লাল হয়ে উঠল। কাব্য সেই দিকে দৃষ্টি দিয়ে মুহূর্তটাকে বিনষ্ট করতে চাইল না। আজ না হয় ভারই থাকুক। সবকিছু প্রকাশিত হোক।
একটা দীর্ঘ শ্বাস টেনে কাব্য বলতে লাগল, “প্রথম দিকে সেই মহিলা আমাকে মোটামুটি আদর দিতেন। যদিও সেটা শুধু শেখ ইমতিয়াজের চোখের সামনে। এক বছরও কেটে না যেতেই ঘরে নতুন সদস্যের আগমন ঘটল। কন্যা সন্তান দেখে সৎ মা নামক নবনীতা মহিলাটি খুশি হলেন না। কারণটা একটাই—যেহেতু আমি ছেলে, সম্পত্তির অধিকাংশ অধিকার আমারই। ছোটোবেলায় যদিও এসব কিছু বুঝতে পারিনি, পরে বুঝেছি।
আরো তিন বছরের মাথায় ভাগ্যের এক নিষ্ঠুর খেলার সামনে দাঁড়ালাম। দাদিও আমাকে ছেড়ে চলে গেলেন। আমার বয়স তখন কত হবে! সাত! তখনই আমাকে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলো। এই কাব্য নামক শিশুটার উপর, তার তথাকথিত বাবার অনুপস্থিতিতে কতটা অত্যাচার চালানো হয়েছে, তা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। বড়ো মাছটা, বড়ো গোশ্তের টুকরাটা বোনকে দেওয়াতে আমার কখনোই হেলদোল ছিল না। উলটো বোনকে আমিই প্লেট থেকে খাবার তুলে দিতাম।
তবে মিসেস নবনীতা এসব পছন্দ করতেন না। আমার থেকে দূরে দূরেই সরিয়ে রাখতেন ইফাকে। কেন রাখতেন—সে উত্তর আমি এখনো পাইনি।
ঘরের বেশিরভাগ কাজ আমাকে দিয়ে করানো হতো। যদিও কাব্যের এসবে সমস্যা ছিল না, হাসিমুখেই করে নিত। তবে স্কুলের পড়াশোনা করে ঘরের কাজ করাটায় কষ্টটা বেশিই হতো, এই যা! সত্যি বলতে, আমার নিজেরই কাজ করতে ভালো লাগে, তাই কখনোই শেখ ইমতিয়াজকে এসব নিয়ে অভিযোগ করিনি। করলেও এর বিপরীতে কিছু বিচার পেতাম কিনা, কে জানে!
এভাবে তিন-তিনটে দীর্ঘ বছর কেটে গেল। তখন আমি দশ বছরের। মিসেস নবনীতাকে কখনোই ‘মা’ বলে ডাকি নি। না না, ভাববেন না যে আমি নিজে থেকে ডাকিনি। অতটুকু বয়সে আমিই বা কি বুঝি এসবের! শেখ ইমতিয়াজ তাকে মা ডাকতেই বলেছিলেন। কিন্তু এই নির্দেশনার আড়ালে নবনীতা বেগম শাসিয়ে দিয়েছিলেন, এই মুখ দিয়ে যেন তাকে ‘মা’ না বলা হয়।
আমি মানুষটা কেমন যেন! এত অন্যায়ের ঝড় যাওয়া সত্ত্বেও ছোটোবেলা থেকেই চোখে কখনো পানি জমেনি।
অতঃপর একদিন শেখ ইমতিয়াজ বাসায় ছিলেন না, অথচ পরের দিন আমার স্কুলের ফাইনাল এগজামের ফি দিতে হবে। তাই আমি সাহস করে মিসেস নবনীতার কাছে গিয়েছিলাম। তিনি কোনো শব্দ না বলে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিলেন, বাবার পকেট থেকে টাকা নাও। আমি এমন কাজ আগে কখনো করিনি, তাই অন্তর্ভুক্তভাবে দ্বিধা অনুভব করছিলাম। কিন্তু পরে ভাবলাম—অপেক্ষা করি, তিনি বাড়ি ফিরলে নাহয় টাকা দেবেন।
নবনীতা বেগম জানালেন, অফিসের কাজে তিনি শহরের বাইরে আছেন, আজ আর ফিরবেন না। তাই উপায় না দেখে, অনেক ভেবে-চিন্তে সাহস করে বাবা নামক ব্যক্তির পকেট থেকে টাকা নিই।
পরদিন স্কুল থেকে ফিরে দরজার মুখে পা রাখতেই, আমার গালে একটা সশব্দে থাপ্পড় পড়ল! মিসেস নবনীতা আমাকে মারলেন। আমার অপরাধ? টাকা চুরি!
ছোটো হলেও এতটুকু তো বুঝি যে আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে। সেদিন বাবা নামক ব্যক্তি আমাকে চরম কথা শুনিয়ে দিলেন। আমি কত করে বললাম, ‘আমি চুরি করিনি, বাবা। বিশ্বাস করো, আন্টিই বলেছিল নিতে। আমি চুরি করিনি।’
কিন্তু তিনি ফোন ভিডিয়োতে স্বচক্ষে দেখেছেন, এবং সেই ভিডিয়ো মিসেস নবনীতাই দেখিয়েছেন তাকে। তাই আমাকে বিশ্বাস করলেন না। সেদিন বুঝলাম, বাবা নামক ব্যক্তির থেকে দূরে সরে যাওয়া আমার জন্য অনিবার্য।
আর মিসেস নবনীতাকে তো চিনলামই। তাকে নিয়ে এমনটা যে খুব অপ্রত্যাশিত ছিল—এমনও না, তিনি কয়েকবারই আমাকে ঘর ছাড়া করতে চেয়েছেন। কিন্তু শেখ ইমতিয়াজের আমার উপর দয়া হওয়ায়, আমার না হওয়া ভুল গুলো, যেগুলো তার সামনে অন্যায় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো ক্ষমা করেছেন বহুবার।
তবে সেই ব্যক্তির সাথে এ দূরত্ব আমার আজকের না।
মা মরে যাওয়ার পর থেকে, অর্থাৎ আমার জন্ম থেকেই তিনি ভাবতেন, আমি অভিশপ্ত বলেই তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি এটা ভাবতে পারলেন না, তার স্ত্রীর সন্তান যে আমিই।
এসবের মাঝে একমাত্র ইফার সাথে আমার সম্পর্কটা দারুণ ছিল। না ইফা আমাকে সৎ ভাই ভাবত, না আমি ওকে। ছোটোবেলা থেকেই ও আমার কাছেই সব আবদার করত। এই যেমন: ওর জন্য চিপস কিনে আনতে হবে, ফুল আনতে হবে। ওর ছোটো ছোটো আবদারে মায়া ছিল প্রকট। আর মেয়েটা দেখতেও চমৎকার ছিল—গোলগাল, ফরসা, ড্যাবড্যাবে চোখ। বোনটা তার ভাইয়ের বাধ্য বোনও বলা যায়। আমি যা বলতাম, ও তা শ্রদ্ধার সঙ্গে শুনত।
আমার বয়স তখন ১৬। এই ছয় বছরে আমি যে কতকিছু সহ্য করেছি, তা বিস্তারিত লিখতে গেলে, মিস মনি একটা পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসই রচনা করতে পারবেন।
মিসেস নবনীতার প্রায়ই হাঁটু ব্যথা হতো, তাই রান্না বাদে প্রায় কাজের দায়িত্ব আমার ঘাড়ে ছিল। যদিও তার আসলে হাঁটুর কোনো রোগ ছিল না—তবু সে যাক! তবে এক জিনিস আগে উল্লেখ করা দরকার। আমার একলা থাকাতে ভয় হয়, মাকে মনে পড়ে খুব। তাই কখনোই দরজা বন্ধ করে ঘুমাতাম না। যেন ভয় পেলে, ঘর ছেড়ে দৌড়ে সরাসরি শেখ ইমতিয়াজের কক্ষে পৌঁছাতে পারি।
সেদিনও দরজা খোলা ছিল। রাত প্রায় দুইটা। সারাদিনের ক্লাস, কোচিং, ঘরের কাজের পর হোমওয়ার্ক সম্পন্ন করে শীর্ণ দেহটিকে বিছানায় ফেলে দিয়েছিলাম মিনিট দশেক হলো। ক্লান্তির অতিভারেই চোখ লেগে গিয়েছিল। তখনই পাশে এসে শুয়ে পড়ল ইফা। সে তখন বারো বছর অতিক্রম করেছে। আমি ঘুমের ভেতর টেরই পাইনি।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ইফা চিৎকার করতে করতে বাড়ি মাতিয়ে দিল। আমি হুড়মুড় করে চোখ মেললাম।
লাইট জ্বালালাম। ইফার অবস্থা দেখে আমি কিছু বলার আগেই মিসেস নবনীতাসহ শেখ ইমতিয়াজ এবং বাড়ির অন্যান্য লোক হাজির। আমি তখন হতবাক, কী হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।
প্রশ্ন করার আগেই মিসেস নবনীতার সুনির্দিষ্ট কণ্ঠ শুনলাম, ‘কি হয়েছে? কি হয়েছে, তোর মা? তোর এ অবস্থা কেন?’
তার প্রশ্ন আমার চেতনাকে এক মুহূর্তের জন্য স্থবির করে দিল। সে প্রশ্ন করলেও, সে বাদে বাকিরা সবাই হতবাক।
ইফা কেঁদে কেঁদে বলল, ‘পানি খেতে নেমেছিলাম নিচে… তখনই হঠাৎ ভাইয়া ডেকে…’
বাক্য শেষ করার আগেই ও মিসেস নবনীতার বুকে হাউমাউ করে লুটিয়ে কাঁদতে লাগল। আমি তখনও স্তব্ধ। শুধু তাকিয়ে রইলাম ইফার অবস্থার দিকে; ওর গায়ের জামার ছেঁড়া অংশ, লাল দাগ, আর সেই নির্দিষ্ট বেদনাময় চাহনি দেখে আমার ভিতরটা কেঁপে উঠল।
আমার স্তব্ধতার মধ্যেই আরেকবার স্তব্ধ করে দিলেন শেখ ইমতিয়াজ। হঠাৎ করেই আমাকে কয়েকটা চড় বসালেন। তখনই আমি হুঁশে এলাম। বোনের কাছ থেকে পাওয়া এমন জঘন্য অপবাদে আমি কাঁদতে শুরু করলাম।
ওই প্রথমবার বোধ হয় আমি কেঁদেছি। বাবা নামক সেই ব্যক্তির জোরালো আঘাত আমাকে কাঁদাতে পারেনি—কেঁদেছি আমার এত ভালোবাসার বোনটা কীভাবে এটা বলতে পারল! ওর কলিজা কেঁপে উঠেনি?
আমি চেষ্টা করলাম বোঝাতে, কিন্তু মুখ খুলবার আগেই বেল্টের বারি চলতে লাগল। ব্যথায় মেঝেতে লুটিয়ে পড়েও আমি শুধু তাকিয়ে রইলাম আমার অভিনয় করা বোনটার দিকে। ততক্ষণে আমার চোখেও আর পানি নেই, অথচ গায়ের জোরে মেরে চলেছেন সেই বাবা নামক ব্যক্তি।
হয়ত আমি মরেই যাব ভেবে, অবশেষে মাইনুল নামক কাজের লোক ব্যক্তিটি আমাকে ধরে বললেন, ‘বাচ্চাটা মরেই যাইবে, ভাইজান। এইবার থামেন।’
রেগেমেগে আমাকে মা নিয়ে কিছু গালাগাল করে শেখ ইমতিয়াজ উপরে চলে গেলেন। যার নুন খায়, তার বিরুদ্ধে তো কেউ কথা বলে না; তাই মাইনুল কাকাও কিছু করতে পারলেন না। মিসেস নবনীতার ইশারায় আমাকে একা ফেলে চলে গেলেন তিনিও। আমি তখনও হতবাক, বুকে জমে থাকা সমস্ত ক্ষোভ, ব্যথা আর অবিশ্বাসের সঙ্গে কেবল বোনের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
ভাবছিলাম, বোনটা অন্তত একবার এসে দাঁড়াবে। না হোক ক্ষমা—হয়ত বলবে, মায়ের কথায় এমন কিছু করে ফেলেছে। বলবে, পরিস্থিতি তাকে ভুল করিয়েছে। কিন্তু না, ও একবার পিছনে ফিরেও তাকায়নি। ওইদিন ঘুম তো দূরের কথা, আমার স্তব্ধতা কাটতেই ঘণ্টাখানেক সময় লেগে গিয়েছিল। শুধু শরীরটাই মেঝেতে পড়ে ছিল, কিন্তু ভিতরের আমিটা আর ছিলাম না।
সেদিন মাকে এমনভাবে মনে পড়ছিল যে মনে হচ্ছিল, আল্লাহর কাছ থেকে মাকে কেড়ে এনে বুকে জড়িয়ে ধরি। ছোটোবেলা থেকে শেখ ইমতিয়াজ আমাকে একটা জিনিস শিখিয়েছেন—নামাজ পড়া। নামাজ না পড়লে ভাত খেতে দিতেন না। সেই শেখানো অভ্যাসটাই ওই রাতে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। অযু করে তাহাজ্জুদের নামাজে বসে পড়ি। আল্লাহর কাছে কত অভিযোগ, কত কান্না করলাম, তার কোনো হিসেব নেই। আমার জীবনের সবচেয়ে জঘন্য রাত ছিল ওটা। কিন্তু ওই উপরওয়ালার দিকে কেঁদে কেঁদে হয়ত হৃৎপিণ্ড ফেটে যায়নি বলেই আমি বেঁচে গিয়েছিলাম। নাহলে ওই রাতেই ওই ঘর থেকে আমার লাশ বের হতো।
পরদিন শেখ ইমতিয়াজ আমার মুখ দেখতে চান না বলে মিসেস নবনীতাকে দিয়ে খবর পাঠাতে চেয়েছিলেন, আমি যেন ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাই। অথচ ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্ত আমি আগের রাতেই নিয়ে ফেলেছিলাম। যখন সেই মহিলা তার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে দূর থেকে গালি দিতে দিতে, বাড়ি ছাড়ার হুকুম দিতে দিতে আমার ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালেন—ততক্ষণে দেখলেন, আমি আমার আরশিয়া মায়ের কিছু জিনিস গুছিয়ে ফেলেছি। তিনি আর কিছু বললেন না। শুধু ভেংচি কেটে চলে গেলেন।
ঘর ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে ইফাকে দেখলাম। ওর চোখে যেন আগুন জ্বলছে। আমি শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন করলি, বোন?’
ও মুখ ঘুরিয়ে বলল, ‘নাহলে এই সম্পত্তির ডাবল ভাগ হয়ে যেত। আর বাবার বাড়ির সম্পত্তি তো মেয়েরা এমনিতেই কম পায়।’
কথাগুলো যে ওর নিজের নয়, সেটা আমি বুঝেছিলাম। কিন্তু এত ভারী, হিসেবি কথা ওর মুখে কেমন বেমানান ঠেকল। যার চোখে তখন ভয় বা অপরাধবোধ থাকার কথা ছিল, তার মুখে এই হিসাব শুনে বুকের ভেতরটা আরও ফাঁকা হয়ে গেল। আমি অসহায়ভাবে হেসে ওর মাথায় হাত বোলাতে চেয়েও হাত রাখিনি। শুধু বলেছিলাম, ‘তোর জন্য দোয়া থাকবে।’
Tell me who I am 2 part 8 (3)
এরপর আর কোনো প্রশ্নের দরকার ছিল না। আগের রাত থেকে পরদিন পর্যন্ত যা হয়েছে—সবটাই যে সাজানো, সেটা আমি অক্ষরে অক্ষরে বুঝে গিয়েছিলাম। কিন্তু এত জঘন্য কাজ যে মিসেস নবনীতা করতে পারেন, এটা কখনো কল্পনাও করিনি। আর ইফা…ইফাটাও কেমন স্বার্থপরতা দেখালো বলুন? ও কি একবারও ভেবেছিল, কীসের অপবাদ নিজের ভাইয়ের ওপর চাপাচ্ছে? বারো বছরের মেয়েরা কি সত্যিই এতটা অবুঝ হয়? এতটা হয়, বলুন না?”
