Tell me who I am 2 part 12
আয়সা ইসলাম মনি
মিরা সেই প্রভাতেই জেগে উঠে গোসল সম্পূর্ণ করেছিল। মাত্র ঘণ্টাখানেক ঘুমানোর নিমিত্তে নিদ্রা এখনো চোখে লেগে আছে; তা সত্ত্বেও আনন্দে তার মন নিখুঁতভাবে দিশাহীন। বহু মাস পর নিজ গৃহে ফিরে যাওয়ার ভাবনায় ভেতরটা যেন হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে। বাথরুমের নৈঃশব্দ্য থেকে বের হয়ে, মাথায় তোয়ালে বেঁধে সে আয়নার দিকে এগোল। তোয়ালেটা খুলে দাঁড়িয়ে, পেছনের দিকে ঘুরে কারানের শুয়ে থাকা শরীরের দিকে নজর দিল। তার সুবর্ণ-ফরসা পিঠে মিরার নখের লাল দাগগুলো চমকপ্রদভাবে ফুটে উঠেছে।
কারান উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, কোমর থেকে নীচের অংশ এলোমেলোভাবে চাদরে আচ্ছাদিত। সূর্যের নরম আলোতে তার ফরসা শরীরের রেখাগুলো যেন আরও প্রলোভনময় ও মোহনীয় দেখাচ্ছে। মিরা তাকিয়ে তাকিয়ে মনে করল, কতই না আকর্ষণীয় এই মানুষটা, কতটা লোভনীয় তার প্রতিটি রেখা। ইচ্ছে করল, আবার রাতের মতো ওই পৃষ্ঠদেশে আক্রমণ চালাতে।
কিন্তু নিজেকে সামলে নিয়ে মিরা ঠোঁটের কোণে এক চতুর, সংযত হাসি এঁকে হেয়ারড্রায়ার হাতে তুলে ধীরে ধীরে চুল শুকাতে লাগল। তার চুল তখনও স্নিগ্ধ আর্দ্রতায় ভারী, আর গোসল-পরবর্তী বাষ্পের কোমল ছোঁয়ায় ত্বক হয়ে উঠেছে মসৃণ, দীপ্ত ও প্রাণবন্ত। সদ্য প্রস্ফুটিত গোলাপের সঙ্গে তার তুলনা করলেও হয়ত কম বলা হবে, কারণ পৃথিবীর কোনো ফুলই কারানের মহারানি ভিক্টোরিয়ার সমকক্ষ হতে পারে না। কী অপরূপ রূপ মিরার! অথচ সে নিজেই তা পুরোপুরি উপলব্ধি করে না—সে যে প্রকৃত অর্থেই এক ভুবনমোহিনী সৌন্দর্যের আধার।
আয়নার দিকে মুখ ফিরিয়ে শরীর থেকে বাথরোবের কিছু অংশ সরিয়ে সে নিজের গলা, বাহু ও পিঠজুড়ে ছড়িয়ে থাকা লাল দাগগুলোর উপর দৃষ্টি স্থির করল। আঙুলের ডগায় কণ্ঠনালির দাগে আলতো স্পর্শ বুলিয়ে দিতেই তার ঠোঁটে লাজুক হাসি ফুটে উঠল।
মুচকি হেসে বলল, “অস’ভ্যটার দাঁতগুলো ভেঙে ফেলব আমি। ইশ, যদি বাড়ির কেউ দেখে ফেলে, কি ভাববে?”
পিছনের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় বসে কারানের কাঁধে হাত রাখল, আলতোভাবে স্পর্শ করতে করতে বলল, “অবশ্য তুই নিজেও বা কম কীসে? কি হাল করেছিস স্বামীটার!”
হাসি মুখে কারানের কাঁধে চুমু খেল। তারপর নাক নামিয়ে তার শরীরের সুবাস শুষে নিল। কি মোহনীয়, কি প্রলোভনময়! যদিও মূলত এটা কারানের রোজা ওট লাক্স পারফিউমের গোলাপের সুবাস, তবুও মিরার মন আরও কাছে টানল।
এরপর মিরা চোখ দু’টো সরু করল। নখ ছোট হওয়ায় সমস্ত জোর একত্র করে কারানের পিঠে আঁচড় কেটে ইংরেজিতে লিখে দিল MINE। মুহূর্তেই সেই জায়গাটা রক্তিম হয়ে উঠল। অক্ষরগুলো ভয়ানক স্পষ্টতায় ফুটে উঠেছে। ঠিক সেখানেই মিরার ঠোঁট নেমে এলো; কয়েকটি অধিকারসূচক চুমু খেল অক্ষরগুলোর উপরে। কারানের পিঠের সঙ্গে মাথা ঠেকিয়ে শুয়ে রইল কিছুক্ষণ। এরপর দাঁত দিয়ে হালকা কামড় দিতেই কারান অল্প নড়ে উঠল। মিরা চোখ বন্ধ করে ক্লান্ত স্বরে বলল, “জাঁহাপনা, উঠুন।”
কিন্তু কারান কোনো সাড়া দিল না। মিরা ভ্রূ কুঁচকে হতাশ হয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল, “আর কত ঘুমাবে? এই কারান?”
ঘুমন্ত অবস্থাতেই কারান মিরাকে টেনে নিজের নিচে আনল। মাথা মিরার বুকের মাঝে রেখে, ঘুমন্ত স্বরে বলল, “সারা রাত ঘুমাতে দাওনি, সুইটহার্ট। এখন প্লিজ জ্বালিও না।”
মিরার মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চট করে জেগে উঠল। বাঁকা হাসি দিয়ে কারানের কাঁধে কামড় দিল। ব্যথায় কারান ভ্রূ কুঁচকে আধো চোখে তাকাল। হাস্কি কণ্ঠে আওড়ালো, “আহ! সিরিয়াসলি ব্যথা পেয়েছি, মিরা।”
“উমমম… আর আমার সারা শরীরে যে পেইন হচ্ছে, তার বেলা?”
কারান কিঞ্চিৎ ঠোঁট বাঁকিয়ে মিরার গালে চুমু খেয়ে আবার চোখ বন্ধ করল, “সুইট পেইন। আই নো, ইউ রিয়েলি এনজয়েড লাস্ট নাইট। এখন শান্ত হয়ে ঘুমাও।”
মিরা কারানের কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, “উঠবে নাকি কামড়াবো?”
কারান হতাশ নিশ্বাস ফেলল, গাল থেকে মুখ সরিয়ে ফোলা ফোলা চোখে তাকিয়ে বলল, “বা’ল! ঘুমাতে দে, বউ। কেন স্বামীর সঙ্গে শত্রুর মতো আচরণ করছিস? চুমু খেয়ে ঘুমিয়ে যাও, বেবি।”
এই বলে কারান মিরার কোমরের বাথরোবের ফিতেটা আলতো করে খুলে দিল। কাপড়ের এক পাশ সরিয়ে হাত ঢুকিয়ে মিরাকে নিজের দিকে টেনে নিল; এমনভাবে, যে দুটো শরীরের মাঝখানে আর কোনো ফাঁক রইল না। কারান ধীরে ধীরে মিরার বুকের ভাঁজে মুখ গুঁজে দিল; কিছুক্ষণের মধ্যেই তার শ্বাসের ছন্দ ঘন হয়ে এলো।
মিরা চুপচাপ কারানের চুলের ভেতর আঙুল চালাতে লাগল। আঙুলের স্পর্শে কারানের নিশ্বাস আরও গভীর হলো। একটু পরে মিরা হালকা হেসে বলল, “কারান, শোনো না।”
“উমম…” ঘুমের ঘোরেই কারানের মোহনীয় কণ্ঠ থেকে অস্পষ্ট শব্দ বেরিয়ে এলো।
“মায়ের জন্য দুটো চুড়ি বানিয়ে রেখেছিলাম, ওগুলো কে.ছি হাউজেই রয়ে গেছে। ওখানে গিয়ে তারপর মিরা মঞ্জিলে যেতে হবে।”
“ওকে।”
“তাহলে কালকেই বাড়িতে যাই, কী বলো?”
“হুম।”
মিরা কারানের চুলে একটা ছোট্ট চুমু রেখে বলল, “ইলিজার জন্য তো ফোন অর্ডার দিয়ে রেখেছি। বাবা-মায়ের জন্য কী নেওয়া যায়, বলো তো?”
“প্রাইভেট জেট।”
“উফফ, আমি মজা করছি না।”
“আমিও না।” কারান নড়েচড়ে মিরার গলায় একটা আলতো চুমু ছুঁইয়ে আবার আগের ভঙ্গিতেই স্থির হয়ে গেল।
“অন্য কিছু বলো,” মিরা নরম স্বরে অনুরোধ করল।
কারান চোখ বন্ধ রেখেই শান্ত কণ্ঠে বলল, “পোশাক থেকে গিফট—সব কাল বিকেলেই রেডি করে রেখেছি। কিন্তু ভাবছিলাম, ওসব তো অর্ডিনারি জিনিস। তাদেরকে একটু বড়ো কিছু দেওয়া উচিত। প্রথমে চেয়েছিলাম একটা অ্যাপার্টমেন্ট দিতে, কিন্তু জানি, মা-বাবা নেবেন না। তাই ভাবলাম, শহরের বাইরে একটা ছোটোখাটো সিক্স-স্টোরিড বাংলো দেব। সামনে থাকবে প্রাইভেট লেক, পিছনে গার্ডেন, আর ভেতরে হোম থিয়েটার থেকে মেডিটেশন রুম থাকবে।”
বিস্ময়ে মিরার দৃষ্টিদ্বয় কপাল ছুঁই ছুঁই করল। চমকে উঠে বলল, “বাবাহ! তুমি আমাকে না বলেই এত আয়োজন করে ফেলেছ? কিন্তু মা-বাবা এসব নেবেন না, কারান। আর বাবা তো বাসা ছেড়ে যায়ই না। তাই প্রাইভেট জেট দিয়ে কী করবে? ওটা বাদ রাখো।”
কারান সামান্য নড়েচড়ে আগের মতোই শুয়ে থেকেই শুধালো, “এখন না হয় যায় না, কিন্তু যখন আরেকটু বয়স বাড়বে, আর চারদিকের হাওয়া বদলাতে ইচ্ছে করবে, তখন কাজে লাগবে। তাদের জন্য সম্পূর্ণ পারসোনাল ক্রুসহ একটা বারো সিটার প্রাইভেট জেট রেখেছি। আর যদি কখনো জলভ্রমণের শখ জাগে, তার জন্য একশ’ ফুট লম্বা ইয়ট আছে। তাদের শুধু ইচ্ছেটা প্রকাশ করতে দাও, বাকি ব্যবস্থা আমার।”
এই অনায়াস ঐশ্বর্যের স্বচ্ছ বিবরণে মিরার দৃষ্টি আরও বিস্তৃত হলো; গলায় অপ্রস্তুত কাশির ক্ষীণ ঝাঁকুনি উঠল। তবে নিজেকে সামলে নিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে মুখে চাপা হাসি দিয়ে বলল, “একটু বেশিই হয়ে গেল না?”
কথাটি কানে যেতেই কারান মুহূর্তমাত্র স্থির হয়ে গেল। মিরার গলার কাছ থেকে মুখ তুলে তার দিকে তাকাল। চোখে এখনো নিদ্রার রেশ লেগে আছে, তবু কণ্ঠে শিশুসুলভ বিস্ময়ের আভাস নিয়ে বলল, “তুমি হেয়ালি করছ? একটু কম হয়ে গেছে কি? প্রথমবার আমার বউ তার নিজের বাড়িতে যাবে, আরেকটু বাড়িয়ে আয়োজন করা উচিত ছিল, তাই না?”
শেষ বাক্যগুলো বলার সময় তার কণ্ঠে মৃদু হতাশা জমে উঠল, যেন সত্যিই কোনো গুরুতর ত্রুটি করে ফেলেছে। তারপর স্বগত-উদ্বেগে যোগ করল, “আচ্ছা বলো তো, আর কী করা যায়? আমার মাথায় কিছুই আসছে না।”
কারানের এই গভীরভাবে চিন্তামগ্ন মুখচ্ছবি দেখে মিরা আর সংযম ধরে রাখতে পারল না। মুখ ফুলিয়ে হঠাৎই খপ করে হেসে উঠল সে। তবে সেই হাসিতে বিন্দুমাত্র বিদ্রুপ নেই, আছে নিখাদ মমতা ও স্নিগ্ধ স্নেহ। কারানের কপালে আলতো করে আঙুল ঠেকিয়ে টোকা দিতে দিতে বলল, “আমার স্বামীটা আসলেই খুব ইনোসেন্ট।”
এই বলে মিরা হাসতেই থাকল। সেই হাসির উষ্ণতা কারানের মনেও ছড়িয়ে পড়ল; সেও অল্প হেসে উঠল। আর কারান যখনই এই মৃদু হাসিটুকু হাসে, তার প্রাণবন্ত, সমুদ্রের ন্যায় নীল দৃষ্টিদ্বয়ও চকচক করে হাসে। আর ঠোঁটের এক কোণ স্বভাবতই সামান্য ঊর্ধ্বমুখী হয়, তবে এই সূক্ষ্ম ভঙ্গিতেই তার মুখাবয়বে জন্ম নেয় এক দুর্বার আকর্ষণ। যা দেখলে যে-কোনো নারীই কোনো শব্দের প্রয়োগ ব্যতীত তার প্রেমে পড়তে বাধ্য; ঠিক যেমনটি হয়েছে তার মহারানি ভিক্টোরিয়ার ক্ষেত্রে।
কারান আর কথা না বাড়িয়ে মিরাকে শক্ত করে বুকে টেনে নিল। কারণ এই মুহূর্তের শান্ত সান্নিধ্যই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। মিরার গলার কাছে মুখ রেখে তার দেহের স্বাভাবিক, কোমল নারীত্বের সুবাস গভীর শ্বাসে গ্রহণ করল। তারপর নিচু, ঘোরলাগা কণ্ঠে বলল, “এবার ঘুমোই, সোনা। একটুও ডিস্টার্ব করতে পারবে না। আর না এখান থেকে পালানোর চেষ্টা করবে। প্রমিজ করো।”
মিরা কারানকে আরও দৃঢ়ভাবে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করল। তার উন্মুক্ত বক্ষের উষ্ণ আশ্রয়ে মিরার হৃৎস্পন্দনের সকল অস্থিরতা ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এলো। নিশ্বাসের ওঠানামা কারানের নিশ্বাসের ছন্দে একসময়ে মিলিয়ে গেল। তার ওপর কারানের দেহ থেকে ভেসে আসা মোহনীয়, পরিচিত গন্ধ ইতোমধ্যেই মিরার ইন্দ্রিয়জুড়ে প্রশান্ত আবেশ ছড়িয়ে দিয়েছে।
চোখ বুজে, সমস্ত ক্লান্তি ও দ্বিধা ছেড়ে দিয়ে মিরা নিশ্চিন্ত কণ্ঠে বলল, “প্রমিজ।”
এই ক’দিন আগেই সোফিয়ার পায়ের ব্যান্ডেজ সম্পূর্ণ খুলে দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধতা ভেঙে সে এখন সাবলীল ভঙ্গিতে হাঁটতে পারে, যদিও মাঝে-মধ্যে হালকা অসুবিধে হয়। তবে তালহা সেই ক্ষণিক দুর্বলতাকেও আগলে রাখে নিখুঁত যত্নে। শুধু তালহাই নয়, এই বাড়ির প্রতিটি সদস্যই মমতার বৃত্তে সোফিয়াকে ঘিরে রেখেছে। বিশেষ করে ফাতিমা; ছেলে-বউকে তিনি যেন হৃদয়ের শীর্ষাসনে তুলে রেখেছেন।
আজ সকালেই সোফিয়া ও তালহা ঢাকা থেকে ফিরেছে। সঙ্গে করে এনেছে তারান্নুম, তুব্বা আর ফাতিমার জন্য অগণিত উপহার। আর আম্বিয়ার জন্য বিশেষভাবে এনেছে, একখানা জায়নামাজ, শীতের উষ্ণতার জন্য উলের চাদর আর কয়েকখানা শাড়ি। তবে সোফিয়া নিজে পছন্দ করে তারান্নুমের জন্য এনেছে একখানা দীর্ঘ গাউন। পোশাকটি তারান্নুমের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক জগতের প্রতিনিধি; সে কখনো এমন কিছু পরেনি, জানেও না কীভাবে তা ধারণ করতে হয়, কীভাবে নিজেকে তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। তাই সোফিয়া ধৈর্য নিয়ে তাকে শিখিয়ে দিয়েছে সবকিছু।
বিকেল গড়িয়ে পড়েছে। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে গ্রামজুড়ে। সোফিয়ার মনে হলো, গ্রামের পথঘাটে একটু ঘুরে দেখা যাক। মিরা থাকলে চারজন মিলে আড্ডা জমত খুব; হাসি, গল্প, স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসত সবাই। কিন্তু আজ মিরা নেই। তাই সিদ্ধান্ত হলো, তারান্নুমের সঙ্গেই বেরোবে। যদিও আম্বিয়া একা একা মেয়েদের বাইরে যেতে স্পষ্ট নিষেধ করলেন। অতএব, তালহাকেও সঙ্গী হতে হলো।
তারান্নুম অবশ্য আজ একেবারেই অনড়। সে ঠিক করেছে, সোফিয়ার দেওয়া আকর্ষণীয় হালকা গোলাপি গাউনটাই পরে বেরোবে। সোফিয়া অনেক বুঝিয়েছে, এসব পোশাক বিশেষ উপলক্ষ্য ছাড়া পরা উচিত না। কিন্তু কে শোনে কার কথা! গ্রামের বাড়িতে আবার শহরের মতো জাঁকজমক অনুষ্ঠান কোথায়? তাই তারান্নুম মনে মনে স্থির করল, আজ নিজেকে একেবারে ভিন্নভাবে দেখবে। শুধু নিজের জন্য নয়, ফয়সাইল্লার ছেলে ফারহানকেও দেখাতে চায়, সে কেবল গ্রাম্য পোশাক বা থ্রিপিসেই সীমাবদ্ধ নয়; বিদেশি পোশাকও অনায়াসে ধারণ করতে পারে। আর তাতে তাকে কেমন দেখাচ্ছে, সেটাও তো প্রকাশ করা দরকার।
সোফিয়ার শেখানো নিয়ম মেনে পোশাক পরে তারান্নুম সোফিয়ার ঘরে এলো। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, উপর থেকে নেমে আসা কোনো অপ্সরা।
দুধে-ধোয়া ফরসা গায়ের উপর হালকা গোলাপি গাউনটি এমনভাবে মানিয়ে গেছে, যেন পোশাকটি তার শরীরের জন্যই সৃষ্ট। কোমল আলোয় তার ত্বক আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে; ঘন চোখের পাপড়ি দুটি দৃষ্টিকে করেছে গভীর ও মায়াবী। সেই দৃষ্টির নিচে গোলাপি অধরের সূক্ষ্ম রেখা, তার সাথে লাজুক হাসি মিলিয়ে আজকের তারান্নুম যেন সৌন্দর্যের নিখুঁত এক প্রতিমূর্তি।
অন্যদিকে সোফিয়াও আজ বাঙালি শাড়িতে সজ্জিত। তার সোনালি চুলগুলো নরম ঢেউয়ের মতো কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে, প্রশান্তিকর সবুজ আঁখি, আর ফরসা গায়ের সঙ্গে শাড়ির রং মিশে তাকে করে তুলেছে অপরূপ। ইউরোপীয় সৌন্দর্যের সঙ্গে বাঙালি সাজের মেলবন্ধনে তার চেহারায় তৈরি হয়েছে এক অনন্য বৈপরীত্য। শাড়ি পড়লেও তার চলনে ছিল আত্মবিশ্বাসের স্থিরতা।
সোফিয়া চোখে বিস্ময়ের উজ্জ্বলতা নিয়ে তারান্নুমের দুই কাঁধে হাত রেখে বলল, “You look absolutely stunning, sweetheart. I didn’t think the dress would fit you this perfectly.”
লজ্জায় তারান্নুমের গালে হালকা রং ছড়িয়ে পড়ল। সে চোখ নামিয়ে মৃদু হেসে জবাব দিল, “তোমারেও বাঙালি সাজে এক্কেবারে ঝাকানাকা লাগতেছে। ভাই দেইখা উল্টাইয়া না পড়ে!”
কথাটা কানে যেতেই সোফিয়া ঠোঁটে হাত চেপে ধরে মুচকি হাসল। লজ্জার আবেশে তার গালের স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য ধীরে ধীরে রং বদলাতে লাগল। সেই মুহূর্তে ঠিক তাদের পেছনেই দরজার সঙ্গে হেলান দিয়ে, বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে ছিল একজন—সাদা শার্ট আর ডেনিম প্যান্টে অনায়াসে মানিয়ে যাওয়া শ্যামবর্ণ তালহা। সুগঠিত অবয়ব, ধারালো চোয়াল আর স্থির দৃষ্টিতে তার ব্যক্তিত্বে একটা স্বাভাবিক দৃঢ়তা ঝরে পড়ছিল। গভীর চোখজোড়া একাগ্রভাবে নিবদ্ধ ছিল শুধুমাত্র তার স্ত্রীর দিকেই। তার চোখেমুখে প্রশান্তির ছাপ, আর ঠোঁটের কোণে প্রশ্রয়ী একচিলতে হাসি খেলে যাচ্ছিল। বোন আর স্ত্রীর এই খুনসুটিতে তার মন অজান্তেই স্বস্তিতে ভরে উঠছিল; এটাই হয়ত তার কাছে জীবনের সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে আরামদায়ক দৃশ্য।
নির্ভার আলাপে তারান্নুম আর সোফিয়া একে অপরের প্রশংসায় মেতে উঠেছিল। হাসি, চোখের ভাষা, ছোট ছোট উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে মুহূর্তটা হয়ে উঠেছিল অনাবিল সুখোময়। হঠাৎ করেই তারান্নুমের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল ভাইয়ের দিকে। সে স্পষ্ট দেখতে পেল, তালহা মুগ্ধ নয়নে নিঃশব্দে তাকিয়ে আছে তার ভাবির দিকে। বিষয়টা বুঝে তারান্নুম হালকা খুকখুক কাশিতে বলল, “আমি তাইলে বাইরে দাঁড়াইয়া ওয়েট করতেছি, তুমি আসো ভাবি।”
একটু থেমে মুখ টিপে হাসি চেপে যোগ করল, “আমার দেওয়ানা ভাই তোমারে সেই কহন থেইকা দেইখা যাইতেছে। আমি বাবা এইখানে হাড্ডি হইতে চাই না।”
এই বলে সে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলে সোফিয়া হঠাৎ তার হাত ধরে ফেলল। স্বরে শিশুসুলভ আবদার মিশিয়ে আওড়ালো, “ধুর, ঠুমি আগে ভইসা নেও। তোমারে সাজানো বাখি যে।”
তার বাংলা উচ্চারণ স্পষ্ট ছিল না, কোথাও কোথাও টান ভাঙছিল। তবু সেই ভাঙা-ভাঙা শব্দগুলোর মধ্যেই ছিল আন্তরিক এক চেষ্টা। কিন্তু এদিকে প্রথমবার সোফিয়ার মুখে এত সাবলীলভাবে বাংলা শুনে দুই ভাইবোনই কিছুক্ষণের জন্য বাগরুদ্ধ হয়ে রইল। বিস্ময় আর আনন্দ একসঙ্গে জমে উঠেছিল তাদের চোখে।
নিজের কথায় এমন প্রতিক্রিয়া দেখে সোফিয়া একবার পেছনে তালহার পানে, আরেকবার সামনে তারান্নুমের পানে তাকাল। দুজনের স্তব্ধ মুখভঙ্গি দেখে সে নিজেই হালকা হেসে উঠল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে তালহা বুক থেকে হাত সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “Wait, did my wife just speak in Bangla?”
সোফিয়া ঘুরে তাকিয়ে চোখ টিপ দিয়ে হাসল, “ইয়েস, ডার্লিং।”
তারান্নুম অবশেষে বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে প্রশ্ন করল, “কেমনে?”
সোফিয়া স্নেহভরে তারান্নুমের গাল দুটো আঁজলায় আবদ্ধ করে, আলতো করে ঝাঁকিয়ে বলল, “মাই সুইট সাসু মামমাম শিখিয়েছেন।”
একটু আফসোসের সাথে যোগ করল, “But I’m trying to speak a little Bangla, though I can’t say everything properly.”
আকবরের প্রসঙ্গ তারান্নুমের কানে পৌঁছানোর পর থেকেই ফাতিমার কথা শুনলেই তার ভেতরটা অকারণ ভারে নুয়ে পড়ে। এমনকি আজ সারাদিনেও ইচ্ছাকৃতভাবেই ফাতিমার মুখোমুখি হয়নি সে, উপস্থিতি এড়িয়ে চলেছে।
তবে ফাতিমা মেয়েকে ভালো করেই চেনেন। জানেন, অভিমান যতই গাঢ় হোক, তারান্নুম বেশিক্ষণ মায়ের থেকে দূরে থাকতে পারবে না। দু’দিন না যেতেই সে আবার মায়ের স্নেহচ্ছায়ায় ফিরে আসবে, এই বিশ্বাসেই ফাতিমা আর কিছু বলেননি, চাপ দেননি। নীরব অপেক্ষাকেই তিনি শ্রেয় মনে করেছেন।
সোফিয়ার সামনে নিজের বিষণ্নতা প্রকাশ করতে চায়নি তারান্নুম। তাই কৃত্রিম উচ্ছ্বাস টেনে এনে হেসে বলল, “কিন্তু তাও তুমি দারুণভাবে বাংলা কইতে শিখখা গেছ।”
“ইয়াপ। আফটার অল, চৌধুরি বাড়ির ভৌমা বলে কঠা,” সোফিয়া হালকা গর্ব আর দুষ্টুমির মিশেলে পুনরায় বলল, “Now come, sit on the chair. Let me make you look beautiful, so enchanting that even a fairy would feel shy beside you. Although, you’re naturally more beautiful than her anyway.”
তারান্নুম ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি এনে মাথা নেড়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে আয়নার মুখোমুখি বসল। আলো-ছায়ায় তার মুখের ক্লান্ত ভাবটা ধরা পড়লেও সে তা লুকাতে চেষ্টা করছিল।
ঠিক তখনই পাশ থেকে তালহা এগিয়ে এসে আদরের আড়ালে তারান্নুমের মাথায় একটা আলতো গাঁট্টা বসিয়ে দিল।
“পড়াশোনা তো করিসনি, ইংরেজি বুঝিস কীভাবে? তোর ওই ফয়সাইল্লার পোলা ফারহান শিখিয়েছে নাকি?”
হঠাৎ ব্যথায় তারান্নুম চোখমুখ কুঁচকে চিৎকার করে উঠল, “ভাইয়া! আরেকবার মারলে কিন্তু কারান ভাইরে সব কইয়া দিমু।”
তালহা ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ঝুলিয়ে রাখল। তারপর চিরুনি হাতে নিয়ে যত্নশীল ভঙ্গিতে তারান্নুমের চুল গোছাতে গোছাতে ঠাট্টার সুরে বলল, “বল। দেখি, ভাই তোর মতো ডাব্বা মারা স্টুডেন্টের পক্ষ নেয় কিনা।”
ভাইয়ের এই অনাকাঙ্ক্ষিত কোমলতায় তারান্নুমের চোখের কোণে অজান্তেই আর্দ্রতা জমে উঠল। কারণ সম্পর্কটা নামেই কাছের, নামেই রক্তের, অথচ অনুভবে বরাবরই দূরের। তাদের মধ্যে কখনোই সেই নির্ভার বন্ধন গড়ে ওঠেনি, যেখানে ভাইয়ের ছোঁয়া বা যত্ন স্বাভাবিক বলে মনে হয়। আজ হঠাৎ এই সামান্য আদরই বুকের ভেতর জমে থাকা অপূর্ণতার স্তরগুলোকে নড়বড়ে করে দিল। সে হাসির আড়ালে ভেজা চোখ লুকিয়ে টেবিলের ওপর রাখা টিস্যু দিয়ে আলতো করে মুছে নিল নিজের দুর্বলতা।
এই ফাঁকেই তালহা কথার রেশ টেনে ধীরে ধীরে সোফিয়ার দিকে এগিয়ে গেল। কানের কাছে ঝুঁকে কণ্ঠ নামিয়ে, দুষ্টুমির উষ্ণতা মিশিয়ে ফিসফিস করে বলল, “একবার ভেতরের রুমে এসো, ক্যাব্বি।”
পরিস্থিতির আবহাওয়া ধরে রাখতে, তারান্নুম দাঁত চেপে বলল, “দেখলা ভাবি! এই দুইটা ভাই আমারে পাইলেই পঁচাইব। তুমি আর মিরা ভাবির মতো কেউ ভালো পায় না আমারে।”
এই বলে সে অভিমানী ভঙ্গিতে তালহার দিকে বাঘিনির ন্যায় তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। অথচ চুল আঁচড়ানো শেষ করে তালহা নির্বিকার পায়ে ভিতরের কক্ষের দিকে এগিয়ে গেল, চোখের ইশারায় সোফিয়াকেও আসার ইঙ্গিত দিল। সেই দৃশ্য দেখে সোফিয়ার ঠোঁটে মুচকি হাসি খেলল। দৃঢ় কণ্ঠে সে বলল, “Wait. I’ve given your brother a lesson he won’t forget.”
এই বলে হেসে অন্য কক্ষে চলে গেল সোফিয়া। ঘরের নীরবতায় পা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই তালহা হঠাৎ টান দিয়ে তাকে দেয়ালের সঙ্গে ঠেকিয়ে দিল। দুই পাশে হাত রেখে অবরুদ্ধ করে, গভীর ও রোমান্টিক দৃষ্টিতে তাকিয়ে নিচু কণ্ঠে বলল, “You are looking fu’cking gorgeous, my yummy wife.”
সোফিয়া বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে তালহাকে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত একবার সম্মোহনী চাহনিতে দেখে নিল। ঠোঁটের কোণে তীর্যক হাসি এনে উত্তর করল, “And you look fu’cking sexy, my delicious little demon of a husband.”
তালহার কণ্ঠ আরও নরম হয়ে এলো, “May I taste you?”
“Sure, darling.”
পর মুহূর্তেই তালহা সোফিয়ার ঠোঁটে ঝুঁকে পড়ল। আকস্মিকভাবে দুজোড়া অধর মিলিয়ে নিল। কয়েকটি নিশ্বাসের ব্যবধানে তারা দুজনেই নিজেদের চারপাশ ভুলে গেল। কেবল হৃৎস্পন্দনের ভাষাই সেখানে প্রবল হয়ে উঠল।
বেশ খানিকটা সময় পরে সোফিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে তারান্নুমের কক্ষে ফিরে এলো। লজ্জার আভায় তার গাল তখনো রঙিন। ঠোঁটে দেওয়া হালকা লিপস্টিক কিছুটা লেপ্টে গেলেও বাইরে থেকে খুব একটা চোখে পড়ার মতো নয়। তবে তারান্নুমের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে গেল না কিছুই। সে মুচকি মুচকি হেসে চুপ করে রইল। মনে মনে ভাবল, “এমন লেসন হইলে, সব পোলারাই স্বেচ্ছায় লাইনে দাঁড়াইবে।”
সোফিয়া এরপর মনোযোগ দিয়ে তারান্নুমকে সাজাতে লাগল। হালকা মেকআপে মুখে ফুটে উঠল কোমল দীপ্তি, ব্লাশনের ছোঁয়ায় গালে এলো প্রাণ।
কানে হীরের দুল আর গলায় সূক্ষ্ম পেন্ডেন্ট পরাতেই তারান্নুমের মুখখানা আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আয়নার সামনে বসে থাকা মেয়েটাকে এখন আর শুধু গ্রামীণ কোনো সহজ-সরল মুখ বলে মনে হচ্ছে না; তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা স্বাভাবিক সৌন্দর্যটা আরো গভীরভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। সোফিয়া তার চুলগুলো যত্ন করে বব স্টাইল আকারে উপরে তুলে সুচারুভাবে বেঁধে দিল। শেষবার আয়নায় তাকিয়ে নিজেই একটু থমকে গেল তারান্নুম, এই সাজে অদ্ভুতভাবে মানিয়েছে তাকে।
এবার নিজের কক্ষে গিয়ে কিছুক্ষণ পর হিল পড়ে টুকটুক শব্দ তুলে বেরিয়ে এলো তারান্নুম। অথচ তার ভঙ্গিতে কোনো জড়তা নেই। হিল জুতো পড়েও তাকে এত সাবলীল, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে হাঁটতে দেখে সোফিয়া সত্যিই বিস্মিত হয়ে গেল। গ্রামীণ মেয়ে যেহেতু, তাই সে ভাবতেই পারেনি, তারান্নুম হিলকে এভাবে সহজ করে নেবে।
সোফিয়া চোখ কপালে তুলে নিশ্বাস ফেলে বলল, “My eyes can’t seem to believe what they’re seeing. You look divine.”
এত এত প্রশংসার স্রোতে তারান্নুমের তুলোর মতো ফরসা গালদুটো মুহূর্তেই টমেটোর মতো রক্তাভ হয়ে উঠল। লজ্জার ভারে সে এক হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হেসে বলল, “কি যে কও না ভাবি!”
দৃশ্যটা দেখে সোফিয়ার চোখে তৃপ্তির ঝিলিক ফুটে উঠলো। সে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে ভেতরের কক্ষের দরজার দিকে তাকিয়ে উচ্ছ্বাসভরা গলায় ডেকে উঠল, “ডার্লিং, এখবার আমাদের তরুকে ধেইখা যাও।”
স্ত্রীর ভাঙা-ভাঙা বাংলা কানে যেতেই তালহা কবজিতে ঘড়ির বেল্ট আঁটতে আঁটতে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। বোনকে এক নজরে দেখে তারও চোখ কপালে উঠল, সত্যিই তারান্নুমের সৌন্দর্যটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবু মুখের স্বভাব তো বদলায় না। সে প্রশংসা চেপে রেখে মুখ টিপে হেসে দৃষ্টি সরিয়ে বলল, “সে তুমি বানরকে যতই পরী সাজাও, বান্দরই লাগবে।”
কথাটা শেষ হতেই তারান্নুম কটমট করে তাকাল। চোখে রাগের আগুন নিয়ে, কণ্ঠে ঝাঁঝ মিশিয়ে শুধালো, “হ! আর নিজে যে একটা কাইলা কুমড়া পটাস, ভেদর কাদা, মরাইট্টা কাউয়া, ইঁদুরের পাছা, তেলাপোকার গু, ব্যাঙের ছাতা—সেইটার বেলা? আমার সুন্দরী ভাবিরে পাইছো, তোমার চৌদ্দ গুষ্টির কপাল! আমিও চইলা যামুনে খুব জলদি, তহন বুঝবা।”
তারান্নুমের এই ঝাঁঝালো বিস্ফোরণে তালহা আর সোফিয়া দুজনেই মুখ টিপে হাসতে গিয়ে দিশেহারা। পরিস্থিতি সামলাতে তালহা খুকখুক কাশি তুলে ঠাট্টার সুরে বলল, “সত্যি কথা বললে সবারই গায়ে লাগবে। তুই কারান ভাইকে জিজ্ঞেস করতে পারিস, আমি তো তাও বান্দর বলছি। ভাই তোকে এর থেকেও নিচে নামাবে। ধর, হুলোবিলই, হনুমান, এই টাইপ কিছু বলবে।”
তারান্নুম ফুঁসতে ফুঁসতে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “তাই? দাঁড়াও, ভাইরে আমি অহনই কল দিতাছি।”
“দে দে,” তালহা নির্ভীক হাসিতে ফেটে পড়ল।
তালহার সেই খিলখিল হাসি সহ্য করতে না পেরে তারান্নুম রেগে গিয়ে তার পেটে এক ঘুসি বসিয়ে দিল। তালহা পেটে হাত দিয়েও হাসতে লাগল। আসলে ব্যথার চেয়েও বোনকে ক্ষেপাতে বেশি আনন্দ দিচ্ছিল। ঠিক তখনই সোফিয়া ভ্রূ কুঁচকে তালহার দিকে এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল, “Why provoke her like that? You know Taru looks so lovely, still, you won’t admit it.”
তালহা হেসে সোফিয়ার পেছনে গিয়ে তাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরল। তার কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল, “ভাইবোনের এসব মজা তুমি বুঝবে না।”
এদিকে সত্যিই রাগে-অভিমানে ফেটে পড়া তারান্নুম ফোন তুলে নিল। কারানকে কল দেওয়ার দৃঢ় সংকল্পে তার আঙুল স্ক্রিনে দ্রুত ছুটছে।
মিরা আজ বসন্তের রোদের মতো উজ্জ্বল এক হলুদ শাড়িতে নিজেকে মেলে ধরেছে। শাড়ির পাড় আর আঁচলে সূক্ষ্ম দৃষ্টিনন্দন কাজ করা। যেহেতু কারানের প্রাইভেট জেটেই বাংলাদেশে যাত্রা, তাই নিজেকে ঢাকার বাড়তি প্রয়োজন বোধ করেনি সে; বরং আনন্দের সাথে সেজেগুঁজে প্রস্তুত হয়েছে মন ভরে।
কারান অবশ্য তার চিরচেনা স্বভাবতায় শার্ট-প্যান্টেই তৈরি। ঘাড় ছুঁইছুঁই রেশমি চুলগুলো অভ্যাসমতো হালকা বাতাসে এলোমেলো হয়ে দুলছে। হাতার ভাঁজ গুটাতে গুটাতে সে বলল, “চলো, বের হই।”
“হুম, চলো।” মিরা হাসিমুখে উত্তর দিল।
ঠিক সেই সময় কারানের ফোনে তারান্নুমের কল এলো। রিংটোন শুনে মিরা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কে কল করেছে?”
কারান ভ্রূ কুঁচকে ভিডিয়ো কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তারান্নুম ফুঁসতে ফুঁসতে বলে উঠল, “ভাই, ভালো কইরা দেইখা কও তো, আমারে কেমন দেখায়?”
হাই–হ্যালো বাদ দিয়ে এমন প্রশ্নে কারান আর মিরা দুজনেই বিস্মিত হলো। ক্যামেরার ফ্রেমে মিরাকে দেখে তারান্নুমের চোখ আরও ভিজে উঠল। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “মিরা ভাবিইই! দেহো, তালহা ভাই আমারে শাকচুন্নি কইছে। তুমিই কও, আমারে কি শাকচুন্নির মতো লাগে?”
পাশ থেকে তালহা চোখ বড়ো করে সোফিয়ার দিকে তাকিয়ে প্রতিবাদ করল, “মিথ্যুক কাকে বলে দেখছ? আমি কবে ওকে শাকচুন্নি বললাম?”
ভাইবোনের এই খুনসুটি দেখে সোফিয়া মিটিমিটি হাসতে থাকল, যদিও তার চোখে নিখাদ আমোদ স্পষ্ট লক্ষ্য করা যাচ্ছিল।
এদিকে স্ক্রিনে তারান্নুমকে এত অপূর্ব লাগছে দেখে মিরার চোখ কপালে উঠল। বিস্ময় আর স্নেহে ভরা কণ্ঠে বলে উঠল, “মা শা আল্লাহ! কী যে লাগছে আমাদের তরুকে! মনে হচ্ছে যেন বাংলার মাটিতে কোনো বিদেশিনি এসে দাঁড়িয়েছে। আমার তো চোখই সরছে না। হায় মেরি জান, কারো নজর না লাগুক আমার ননদিনীর গায়ে।”
এই বলে সে আলতো করে তারান্নুমের দিকে উড়ন্ত চুমু ছুড়ে দিল। তারপর সমাজের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ডান হাত গুটিয়ে নিজের কপালে ছুঁইয়ে নিল।
ক্যামেরাটা একটু কারানের দিকে ঘুরিয়ে দিয়ে মিরা বলল, “দেখো তো আমার তরুটাকে! জান্নাতের হুর যেন আল্লাহ নিজে পাঠিয়ে দিয়েছেন, আমার চোখ ঠিক সেটাই বলছে।”
এত এত প্রশংসার ভারে তারান্নুম লজ্জায় একেবারে গুটিয়ে গেল। কয়েকবার পলক ফেলে সে মুচকি মুচকি হাসল।
সোফিয়া ফোনটা হাতে নিয়ে হেসে যোগ করল, “Yet your brother made her angry a little while ago. I’m also saying how beautiful she looks.”
এইবার সোফিয়াকে বাঙালি সাজে দেখে মিরা আবারও বিস্ময়ে চোখ বড়ো করল। হাসতে হাসতে বলল, “আয়হায়! ওখানে দেখি পরীদের মেলা বসেছে। তোমাকেও একদম বাংলার বউ মনে হচ্ছে, সোফিয়া। তালহা ভাইয়া জ্ঞান হারায়নি তো?”
সোফিয়া হালকা হাসি ছড়িয়ে উত্তর দিল, “But one fairy is absent; she’s in America at the moment.”
এই পরী যে মিরাকেই ইঙ্গিত করে বলা, তা ঘরে থাকা কারোরই বুঝতে বাকি রইল না। কিন্তু তারান্নুম যে সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনায় থামার পাত্রী নয়। অধৈর্য হয়ে ফোনটা ভাবির থেকে নিজের দিকে টেনে নিয়ে সে তাড়াতাড়ি বলল, “ভাবি, আগে কারান ভাইরে জিগাও না, আমারে কেমন লাগতেছে?”
কারান এতক্ষণ নীরবে তরুকে পর্যবেক্ষণ করছিল। এবার সে ঠোঁট উলটে বলল, “উল্লুক, বেল্লিক, উজবুক, এগুলো আজ তোকে বলব না। তোকে…”
ইচ্ছে করেই কথাটা টেনে থামল কারান।
তারান্নুমের চোখ তখন ঝিলমিল করছে। মনে মনে সে প্রস্তুত, না জানি কী প্রশংসা শুনবে। কারান পরের অংশটা বলল,
“তোকে ওদের থেকেও আজ বেশি সুন্দর লাগছে।”
শুনেই তারান্নুম খুশিতে লাফিয়ে উঠল, “আমি জানতাম, কারান ভাই ঠিকই—”
হঠাৎই কপাল কুঁচকে থমকে গেল সে। “এই দাঁড়াও, কী কইলা তুমি?”
এই দৃশ্যে তালহা তো হাসতে হাসতে প্রায় ভেঙেই পড়বে। সোফিয়া আর মিরাও নিজেদের হাসি সামলাতে পারল না, ঠোঁট টিপে হেসেই ফেলল। খানিক পর কারান হালকা হেসে, এবার সত্যিই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে স্নিগ্ধ স্বরে বলল, “চমৎকার লাগছে তোকে।”
এইবার তারান্নুম আর সামলাতে পারল না। লজ্জায় তার গাল দুটো গাঢ় লাল হয়ে উঠল। চুল কানের পাশে গুঁজে সে আপনমনেই বিড়বিড় করে বলল, “তুমি যহন কইছো, তার মানে ভালোই লাগতেছে। ইশশ! তুমি যদি আমার হইতা…”
এইটুকু বলেই নিজের ভাবনায় নিজেই চমকে উঠল সে। মুখের হাসিটা মিলিয়ে গিয়ে চোখ নামিয়ে ফেলল। অন্যমনস্ক কণ্ঠে নিজেকেই শাসাল, “ছি তরু, এইগুলা কী ভাবিস? ফারহান জানলে কতটা মন খারাপ করবে! নাহ, না না, আর এইসব চিন্তা করোন যাইব না। তুই আসলেই গরু, তরু।”
শেষ কথাগুলো সে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল। অর্থাৎ নিজের ভেতরের অপ্রয়োজনীয় আবেগটুকু ঝেড়ে ফেলতে চাইছে।
এরপর কারান-মিরা আর ওপাশে সোফিয়া-তালহা কিছুক্ষণ হালকা কথাবার্তা চালিয়ে কল কেটে দিল।
একটু পরেই তারান্নুম, সোফিয়া আর তালহা গ্রামের পথে বেরিয়ে পড়ল। যদিও সোফিয়া আর তালহা ইচ্ছাকৃতভাবেই খানিকটা দূরে আছে, যেন এই প্রকৃতিতে নিজেরা সুন্দর একটা মুহূর্ত কাটাতে পারে।
এই সুযোগেই তারান্নুম ধীরে ধীরে পা ফেলে হাঁটতে হাঁটতে ফারহানকে অডিয়ো কল দিল।
ওদিকে ফারহান তখন বিছানায় শুয়ে ছিল। হঠাৎ তারান্নুমের কল দেখে সে ভ্রূ কুঁচকে ফোন কানে তুলল। কল ধরতেই ওপাশে তারান্নুমের মুখে লাজুক, অচেনা এক হাসি ফুটে উঠল। তবু সে আগে কিছু বলল না।
ফারহান হেসে নরম কণ্ঠে বলল, “কি ব্যাপার, গ্লিমার? আজ নিজ থেকে কল দিলেন যে! এই ভাবনাতেই তো আমি দিশেহারা হয়ে গেছি।”
তারান্নুম মুচকি মুচকি হাসল বটে, কিন্তু কণ্ঠটা ইচ্ছে করেই গম্ভীর করে বলল, “একটা জিনিস দেখাইতাম, কিন্তু… এহন ক্যান জানি মনে হইতেছে, নাহ, থাক। বিয়ের দিনই না হয় দেখবেন।”
ফারহান আর শুয়ে রইল না। দ্রুত উঠে বসে ম্যাকবুক অন করতে করতে ক্লান্ত, ভারী কণ্ঠে বলল, “আমি অনেক বেশি ক্লান্ত, জানপাখি। তোমাকে রিকোয়েস্ট করলেও মনে হচ্ছে এনার্জি লস হবে। দেখাও, প্লিজ।”
ফারহানের নিস্তেজ স্বর শুনেই তারান্নুম বুঝে গেল, সে সত্যিই অবসন্ন। আর দেরি না করে সরাসরি ভিডিয়ো কল দিল।
ভিডিয়ো কল রিসিভ হতেই দৃশ্যটা বদলে গেল। কিছুক্ষণ আগেও যে ফারহান নিষ্প্রাণ ভঙ্গিতে বসে ছিল, সে মুহূর্তেই সোজা হয়ে গেল। চোখ দুটো বিস্ময়ে স্থির। ঠোঁট সামান্য ফাঁক হয়ে আছে, ঢোক গিলে সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল স্ক্রিনে ভেসে ওঠা তার অনুরূপা হবু বউয়ের দিকে।
তারান্নুম স্নিগ্ধ, মোলায়েম হাসি নিয়ে প্রশ্ন করল, “আমাকে কেমন লাগছে, মিস্টার ফারহান খান? আপনার স্ত্রী হওয়ার যোগ্য কি?”
ফারহানের কোনো উত্তর এলো না। সে যেন বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা হারিয়ে ফেলেছে। স্ক্রিনের ওপাশে কোনো অপ্সরা, না কি তারান্নুমকেই দেখছে, সে নিজেও বুঝতে পারছে না। তার প্রসারিত চোখের ভাষা এমন, যা শব্দে বাঁধা যায় না।
এই নীরবতা দেখে তারান্নুম একটু চোখ নামিয়ে নিল। কণ্ঠে হালকা অনিশ্চয়তা নিয়ে শুধালো, “বুঝেছি, আমাকে বোধ হয় সুন্দর লাগছে না।”
ঠিক তখনই সে লক্ষ্য করল, ফারহানের চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। কেন জানি মুহূর্তের মধ্যেই সে আবেগের কাছে ভেঙে পড়েছে। চোখে একরাশ তৃষ্ণা, মুখে অসহায় কাতরতা স্পষ্ট।
এটা অবলোকন করে তারান্নুম চমকে তাকিয়ে চিন্তিত গলায় বলল, “কি হয়েছে আপনার? এভাবে… মানে আপনার চোখে পানি কেন?”
ফারহান এবার ঠোঁট ভিজিয়ে হালকা হাসল। তবে হাসিটা ছিল ভারী, ব্যথাভেজা। জোর করে কান্না আটকে রাখা চোখ নিয়েই গভীর, ভারাক্রান্ত স্বরে আওড়ালো, “আমি… আমি আসলে তোমাকে পাওয়ার যোগ্য নই, তারান্নুম। আমার পাস্ট—ওটা মনে করলেই আমার ভিতরটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। আমি এতটা… আমি জঘন্য। সত্যিই খুব জঘন্য এই ফারহান।”
একটু থেমে সে শ্বাস নিল, “কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমাকে ফারহান যতটা ভালোবাসে, ততটা আর কেউ কখনো ভালোবাসতে পারবে না।”
তারান্নুম সম্পূর্ণ হতভম্ব। দ্রুত বলল, “হঠাৎ এসব কী বলছেন? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।”
ফারহান নিজেকে সামলাতে মাথায় হাত দিয়ে চুলকে, ভ্রূ কুঁচকে একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বলল, “কী ব্যাপার, কুইন? তুমি ঠিক আছো তো?”
তারান্নুম বিস্ময়ের স্বরে বলল, “হুঁ, আমি তো ঠিকই আছি! ক্যান, কী হইছে? আর আগে বলেন তো, আপনি এতক্ষণ কী সব কইছেন?”
ফারহান হঠাৎই চওড়া হাসল। ক্যামেরার দিকে ঝুঁকে অধর চোখা করে একটা উড়ন্ত চুমু ছুড়ে দিল। কণ্ঠে ফিরল তার চেনা দুষ্টুমি আর প্রাণচাঞ্চল্য।
“এই তো, কুইন আমার আসল রূপে ফিরে এসেছে। অত শুদ্ধ কথা মারাবা না তো। তোমার মুখে এইভাবে কথা শুনতেই সুকুন মিলতা হ্যায়। ওহ মেরি জান, কাব তুমহে শাদি কারকে ঘার মে লাউঙ্গা!”
এই কথাগুলো শুনেই তারান্নুম লজ্জায় একেবারে টকটকে লাল গোলাপ হয়ে উঠল। চাইলেও ঠোঁটের কোণে গজিয়ে ওঠা হাসিটা লুকাতে পারল না। মনে হলো, এই গ্রামীণ পথের কোথাও ছুটে গিয়ে নিজেকে আড়াল করে ফেলে। অথচ ফারহান স্ক্রিনের ওপাশে তার সেই লজ্জা দেখেই আরও মুচকি মুচকি হাসছে।
চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করতে করতে সে হালকা স্বরে বলল, “একদিন সেই লাল শাড়িটা পড়লেও তো পারো।”
তারান্নুম সামনের কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করল, “কোনটা?”
“ওই যে তুমি ঢাকা গিয়েছিলে কারানের সাথে। তখন শপিং মল থেকে কিনেছিলে, আমি পছন্দ করে দিয়েছিলাম যেটা…”
“ওইটা তো আপনি যেইদিন দেখতে আইবেন, ওই দিনের জন্য রাইখা দিছি।”
ফারহান হালকা হাসল। কণ্ঠে আবদার ধরে রাখল, “সে সেদিন না হয় আবার পড়বে। কিন্তু আরও আগেই আমি তোমাকে দেখতে চাই ওই শাড়িতে।”
তারান্নুম নরম স্বরে বলল, “আচ্ছা, দেখি। কিন্তু আমারে এইটায় কেমন লাগতেছে, তা তো এহনো জানতে পারলাম না।”
ফারহানের চোখে তখন আর দুষ্টুমি নেই। কণ্ঠটা হয়ে উঠল গভীর, নিশ্চিত। “আমার চোখের পানি তার প্রমাণ। আর কী কিছু শুনতে চাও?”
বাস্তবে এই প্রথমবার ফারহানের চোখে পানি এসেছে। ছোটোবেলা থেকেই সে ছিল চঞ্চল অথচ ভেতরে ভেতরে কঠিন, গম্ভীর এক মানুষ। তার জীবনে এমন কোনো ঘটনাও ঘটেনি, যা তার চোখ ভিজিয়ে দিতে পারে। অথচ আজ তারান্নুমকে এত অপার সৌন্দর্যে দেখে, এত আপন করে অনুভব করে, তার চোখ ভিজে গেছে।
তারান্নুম তখন সব বুঝে গেছে। এই জল কতটা দামি, কতটা অকৃত্রিম। আর এই মানুষটা তাকে ঠিক কতটা গভীর, নিঃশর্তভাবে ভালোবাসে, তার কোনো প্রমাণ আর বাকি রইল না।
অন্যদিকে তালহা আর সোফিয়া এগিয়ে চলল আঁকাবাঁকা গ্রামীণ পথে। শেষ বিকেলের সূর্যের সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকের নিস্তব্ধতায়। ধানক্ষেতের সবুজ পাতায় সেই আলো জ্বলে উঠছে, মনে হচ্ছে প্রকৃতি নিজেই কোনো অদৃশ্য দীপ জ্বালিয়ে দিয়েছে। বাতাসে মিশে আছে সদ্য কাটা ঘাসের কাঁচা আর ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ, যা শহুরে জীবনের সমস্ত কোলাহলকে মুছে দিতে পারে নিমেষেই। দূরে গোরু-ছাগল ফিরছে ঘরে, তাদের পায়ের শব্দের ফাঁকে ফাঁকে কোথাও এক রাখালের বাঁশির সুর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে পাখির সন্ধ্যাকালীন কূজনের সঙ্গে।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই তালহা থেমে গেল। দৃষ্টিটা আটকে রইল অস্তগামী সূর্যের দিকে। সোফিয়া তার সেই স্থিরতা ভেঙে মৃদু হাসি দিয়ে বলল, “Gosh, this place is so serene and beautiful. I’ll truly miss all this when we go to Australia, Talha.”
তালহা হালকা করে মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ, মনে হয় যেন দিনের সমস্ত ক্লান্তি মাটির গন্ধে গলে যাচ্ছে। কী অদ্ভুত স্নিগ্ধতা! ওখানে গিয়ে এগুলো আর কোনোদিন পাওয়া যাবে না।”
কয়েক কদম নীরবে এগোনোর পর হঠাৎ সোফিয়া থেমে গেল। তার স্বরটা এবার একটু দ্বিধাগ্রস্ত মনে হলেও ভিতরের কৌতূহল লুকালো না, “I’ve wanted to ask you a question for a long time.”
তালহা তার দিকে তাকাল। “কী প্রশ্ন?”
“তারান্নুম আর তুব্বার সঙ্গে ঠোমার সম্পর্কটা আসলে খেমন?”
প্রশ্নটা যেন আচমকা এসে বুকের ভেতর কোথাও আঘাত করল। তালহা দাঁড়িয়ে গেল। সোফিয়াও ঠিক তার সামনেই থামল। কিছুক্ষণ তালহা চোখ নামিয়ে রইল। নীরবতার ভেতর নিজেকেই খুঁজে ফিরছিল। তারপর ভারী স্বরে বলতে শুরু করল, “সত্যি বলতে কী, সম্পর্কটা ঠিকভাবে গড়েই ওঠেনি। কারান ভাই দূরে থেকেও আমার চেয়ে ওদের অনেক বেশি আগলে রেখেছে। আমি… আমি বরাবরই বড্ড সেলফিশ ছিলাম, সোফিয়া। বোন দুটোকে কিছুই দিতে পারিনি—না সময়, না নিশ্চয়তা।”
একটু থেমে সে শ্বাস নিল। আসলে এতদিনের জমে থাকা কথাগুলো যেন সহজে বেরোতে চাইছিল না। “তুমি হয়ত আমাকে ভুল বুঝবে, কিন্তু আমি যে পরিবেশে বড়ো হয়েছি, সেখানে সম্পর্ক মানে ছিল একটা দায়িত্বহীন অভিনয়। উপরে উপরে ভালোবাসা দেখালেও, ভেতরে ভেতরে সবাই নিজের দুনিয়ায় ব্যস্ত ছিল। ওখানে মন থেকে কাউকে সত্যিকারভাবে ছুঁয়ে দেখার সময় বা ইচ্ছা, কারোর মধ্যেই দেখিনি। হয়ত সেই কারণেই ওদের সঙ্গেও আমার সম্পর্কটাও কখনো গভীর হতে পারেনি।”
তালহা চোখ তুলল, সোফিয়ার দিকে তাকিয়ে একরকম অনিশ্চিত হাসি হেসে পুনরায় যোগ করল, “আমি জানি না তুমি ঠিকভাবে বুঝতে পারছ কিনা, হয়ত কথাগুলো তোমার কাছে এলোমেলো শোনাচ্ছে। তাই না?”
সোফিয়ার মুখভঙ্গি দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, সে সত্যিই সবটা ধরতে পারছে না। তার চোখে ছিল অসংখ্য প্রশ্নের ভিড়, অথচ মুখে কোনো শব্দ নেই। তালহা নিঃশব্দে সোফিয়ার হাত ধরে আবার সামনে হাঁটতে শুরু করল।
সোফিয়াও তালহার দিকে তাকিয়েই হাঁটতে লাগল। গ্রামীণ উঁচুনীচু পথে হোঁচট খাওয়ার আশঙ্কা তার মনে এলো না। কারণ সে জানে, তালহা আছে। তার অজান্তেই যে-কোনো টলমল মুহূর্তে সে তাকে সামলে নেবে। তাই এই মুহূর্তে তার সমস্ত মনোযোগ, সমস্ত আগ্রহ, শুধু তালহাকে ঘিরেই।
তালহা সোফিয়ার হাতটা আরেকটু শক্ত করে ধরল; আঙুলের চাপে নিজের ভেতরের অস্থিরতাটুকু বন্ধ করতে চাইল। হাঁটতে হাঁটতে ভারী স্বরে আবার বলতে শুরু করল, “আমাকে অনেক ছোটোবেলাতেই মা মামার বাড়িতে রেখে আসে। যে কারণে ধীরে ধীরে এই বাড়ি, এই মানুষগুলোর প্রতি টানটা ফিকে হয়ে যায়। এরপর যখনই এখানে আসতাম বা দাদাবাড়িতে যেতাম, নিজেকে বরাবরই একজন গেস্ট মনে হতো। নিজের ঘরে থেকেও যেন পর মানুষ আমি। তারান্নুমের সঙ্গে টুকটাক সম্পর্ক ছিল ঠিকই, কিন্তু তুব্বার সঙ্গে সেটুকুও গড়ে ওঠেনি। কারণ ওরা বড়ো হতে হতে আমি অস্ট্রেলিয়া চলে যাই।”
তালহা হালকা হাসল। যদিও সে হাসিতে আনন্দ নেই, আছে আত্মদোষারোপ। “এখানে আমার ফল্ট আছে, ক্যাব্বি। অনেক ফল্ট। আমি অস্বীকার করি না।”
কয়েক পা এগিয়ে আবার বলল, “তবে একটা বিষয়ে আমি কখনো টেনশনে ছিলাম না, কারান ভাই আছে তো। সে আমেরিকায় থেকেও ওদের সবদিক সামলেছে। তুমি পারহ্যাপস অলরেডি ভাইয়ের ন্যাচার বুঝেই গেছ। ভাই ছোটো থেকেই অস্বাভাবিক রকম ম্যাচিউর ছিল। সে জানত, কীভাবে কীভাবে সবকিছু ম্যানেজ করতে হয়। এই বাড়ি হোক বা চৌধুরি বাড়ি—রাজ আসলে কারান চৌধুরীরই চলে।”
হঠাৎ একটু থেমে তালহা যোগ করল, “তোমাকে অবশ্য ওই বাড়িতে কখনো নিয়ে যাওয়া হয়নি। আর ইচ্ছেও নেই।”
সোফিয়া চমকে তাকাল। “হোয়াই?”
“কারণ এই বাড়ির সঙ্গে ওই বাড়ির… মানে মামার বাড়ির কারোরই কোনো সম্পর্ক নেই।”
সোফিয়া ভ্রূ কুঁচকে ফেলল। “খেন নেই?”
তালহা ঠোঁট উলটে মাথা ঝাঁকাল। “এই ব্যাপারটা আমিও পুরোটা জানি না। শুধু জানি, কৌশিকা মামি মানে কারান ভাইয়ের মা চলে যাওয়ার পর থেকেই সবকিছু বদলে যায়।”
একটু থেমে সে কথার সুর বদলাল। “আচ্ছা, এসব বাদ দাও। তোমাকে বলি ওই বাড়িতে কে কে আছে…”
এরপর তালহা ধীরে ধীরে সোফিয়াকে সেই বাড়ি, সেই মানুষগুলো আর নিজের বেড়ে ওঠার অপ্রকাশ্য সত্যগুলোর সঙ্গে পরিচয় করাতে লাগল। ছোটোবেলা থেকে যে সব বাস্তবতার মুখোমুখি সে হয়েছে—যেগুলো তাকে উপরে উপরে শক্ত বানালেও, ভেতরে ভেতরে ভেঙে ফেলেছে সম্পূর্ণ, সেগুলো সবই বলতে থাকল।
এই দেশটার প্রতিই তার ভেতরে একধরনের তিক্ততা জন্মে গেছে। মানুষগুলোর প্রতি সেই তিক্ততা আরও গভীর। এই মাটিতে দাঁড়িয়ে সে নিজেকে কখনো আপন মনে করতে পারেনি। তাই সে চায়, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সোফিয়াকে নিয়ে এই দেশ ছেড়ে চলে যেতে।
আম্বিয়া আর ফাতিমাকে সে বহুবার বলেছে, এই নোংরা গ্রামে পড়ে থাকার কোনো মানে নেই। সবাই মিলে অস্ট্রেলিয়া চলে যাবে। কিন্তু আম্বিয়া কিছুতেই রাজি হননি।
তার মতো একজন সাহসী নারী কি তুচ্ছ মানুষের ভয়ে গ্রাম ছেড়ে পালাবে? সেটা তার আত্মসম্মানে আঘাত লাগবে। যে মাটিতে সে বড়ো হয়েছে, যে জমিতে তার ঘাম ঝরেছে, যেখানে তিলে তিলে গড়ে তুলেছে এই জমিদার বাড়ি, সেসব ছেড়ে সে কখনোই শান্তি পাবে না। যাই হয়ে যাক না কেন, শেষ নিশ্বাস এই মাটিতেই ফেলবেন। এই সিদ্ধান্তে সে অটল।
আর ফাতিমাও মাকে একা ছেড়ে কোথাও যাবেন না, এটাও পরিষ্কার। সেই সূত্রে তারান্নুম আর তুব্বাকেও এখানেই থাকতে হবে। তালহা যখন জানতে পারল, এই গ্রামে হুটহাট খু’ন হওয়া নতুন কোনো বিষয় নয়, বরং প্রায় বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই অদৃশ্য র’ক্তপাত নীরবে চলমান—তখন সে প্রথমবার সত্যিকারের বিচলিত হয়েছিল।
তখনই সে প্রস্তাব দিয়েছিল, তারান্নুম আর তুব্বাকে অন্তত এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হোক। না হলেও আসাদ-ইসহাকের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া যাক। কিন্তু আম্বিয়া রাজি হননি। যে ছেলেদের তিনি একসময় ত্যাজ্য করেছেন, তাদের ঘরে নিজের নাতনিদের পাঠানোর প্রশ্নই ওঠে না। তাছাড়া তিনি তো মরেও যাননি যে নিজের চোখের সামনে মেয়ের বা নাতনির কোনো অমঙ্গল হতে দেবেন।
কারণ তালহা তো তখন জানত না, এই গ্রামে সবচেয়ে বড়ো হ’ত্যাকারী আসলে আর কেউ নয়, স্বয়ং আম্বিয়া নিজেই। নিজের স্বামীসহ যে আটটি খু’ন তিনি করেছেন, সে ইতিহাস যে তালহার কাছে সম্পূর্ণ অজানা।
তবে গ্রামের আনাচে-কানাচে, নদীনালাতে যে কা’টা মাথাগুলো, যে বিকৃত দেহাংশগুলো মাঝেমধ্যে পাওয়া যায়, সেসব চেয়ারম্যান আবদুল শামসুজ্জামানের কাজকারবার। আর যেহেতু আম্বিয়ার স্বামী একসময় নিজেও চেয়ারম্যান ছিলেন, এই অন্ধকার জগতের অলিখিত নিয়মকানুন নিশ্চয়ই তার অজানা নয়!
আরও একটি যুক্তি ছিল, তারান্নুম আর তুব্বা তো চিরদিন এখানে থাকবে না। কয়েকদিনের অতিথি মাত্র। বিয়ে দিলেই শ্বশুরবাড়ি পাঠানো হবে।
সবচেয়ে বড়ো কথা, এই গ্রামের গোপন কাজগুলো গোপনই থাকে। কারণ কথা ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা চাপা পড়ে যায়। এই আত্মবিশ্বাসেই হয়ত আম্বিয়ার মনে হয়েছিল, অঙ্গ পাচারের মতো ভয়ংকর বিষয়গুলো আড়ালেই থাকবে।
এদিকে তালহাও আর জোর করেনি। এখানে শুধু তাদের পরিবার নয়, গ্রামে তো আরও বহু পরিবার আছে। কারো বড়ো ধরনের ক্ষতির কথা সে শোনেনি কখনো। তার উপর তার নানির মানসিক দৃঢ়তা অদম্য, অটল। সেই শক্তির ওপর ভর করেই পরিবার নিয়ে চিন্তাগুলোকে সে ধীরে ধীরে গুটিয়ে ফেলেছিল।
তার মনে হয়েছিল, যেখানে বিশ বছরেও কিছু হয়নি, সেখানে এখনো হওয়ার সম্ভাবনা কম। আর পুরোনো চেয়ারম্যানের পরিবারের দিকে আঙুল তোলার সাহস এই গ্রামে কারো নেই। এই বিশ্বাসটা তালহার গভীরে প্রোথিত ছিল।
এই কয় মাসে সে নিজেও তেমন কিছু ঘটতে দেখেনি। শুধু আধাখানা সত্য, আধাখানা গুজব মিশ্রিত গল্প শুনেছে, যে এখানে খু’ন হয়।
কিন্তু অঙ্গ পাচারের কথা গ্রামে ছড়িয়ে না পড়ার পেছনে মূলত দুটো নির্মম কারণ ছিল।
প্রথমত, বর্তমান চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান। যে পরিবারেরই সন্তান হারায়, কখনো ভয় দেখিয়ে, বা কখনো টাকার বিনিময়ে তাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
দ্বিতীয়ত, যদি সন্তান হারানোর শোকে কোনো মা-বাবা অতিরিক্ত করে ফেলেন, তখন সামনে আনা হয় পুলিশের ভয়। কারণ এই গ্রামের পুলিশ নিজেই এই অপরাধচক্রের অংশ।
অর্থাৎ এখানে কেউ অপরাধী নয়, আবার সবাই অপরাধী। আর এসবের মাঝখানে পড়ে আছে নিরুপায়, শিকড়গাড়া ভয় নিয়ে বেঁচে থাকা অসহায় গ্রামবাসী।
তারান্নুম আর ফারহানের কথোপকথনটা তখন দুষ্টু, মিষ্টি আর রোমাঞ্চে ভরে উঠেছিল। তারান্নুম ফারহানের প্রতিটি বাক্যে লজ্জায় একদম নুয়ে পড়ত, পালানোর পথ খুঁজত। আর ফারহান তো বরাবরই সেই সুযোগগুলো খুঁজে নিতেই বেশি অভ্যস্ত।
তারান্নুমের মনে এখন একটা সিদ্ধান্ত ঘুরপাক খাচ্ছে, এবারই হয়ত মনের কথা বলে দেওয়া উচিত। যে হ্যাঁ, সেও ফারহানের প্রতি অনুভূতি ধরে রেখেছে, এবং বিয়ে করতেও তার কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। কথাটা কীভাবে বলবে, কীভাবে সাজাবে, সেসবই গোছাতে ব্যস্ত আপাতত।
কিন্তু ঠিক তখনই ফারহানের ঘরের দরজা থেকে আয়লা ভিতরে ঢুকে বলল, “বেইবি, এই উইকেই ইব্রাহিমের সঙ্গে কারানের মিটিংটা ফিক্স করতে বলো। ও ছাড়া প্যালেস সিকিউরিটি ক্রস করা অসম্ভব। শুনেছি এবার শুধু অর্গান ট্রান্সপোর্ট না, নারী পাচারের প্ল্যানও চলছে; মেয়েদের বিদেশে পাঠানোর নামে হসপিটাল কন্ট্র্যাক্টস ব্যবহার করছে ওরা। সব কিছু সেট, আমাদের এবার শুধু ওদের স্ট্রাইক দিতে হবে। জল কিন্তু বহুত দূর গড়িয়েছে, নেক্সট উইক ওদের শিপমেন্ট বের হবে। যদি আমরা এখনই না ঢুকি, আর সুযোগ পাব না। এইবার পুরোটা প্ল্যান এগজিকিউট করতে হবে, কোনো লুপহোল থাকা চলবে না। ওদের মুভ অ্যান্টিসিপেট করতে হবে; একটুখানি ডিলে মানে সব শেষ। আমার কথা বুঝেছ তো?”
কথা বলতে বলতে আয়লা এসে ফারহানের পাশে বিছানায় বসে পড়ল। সে একেবারেই আঁচ করতে পারেনি যে সামনেই রাখা ম্যাকবুকটিতে ফারহান তারান্নুমের সঙ্গে কলে সংযুক্ত। আর তারান্নুম? সে তো তাদের কাজের জটিলতা সম্পর্কে কিছুই জানে না; জানালেও হয়তো তা অনুধাবন করতে পারবে না, এই উপলব্ধিতেই ফারহানের বক্ষদেশ তীব্রভাবে ধকধক করে উঠল, বিস্ময়ে ও উৎকণ্ঠায় তার দৃষ্টি মুহূর্তের জন্য কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল।
সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে ম্যাকবুকের ঢাকনাটি নিচের দিকে নামিয়ে দিল। পরক্ষণেই পাশের কনসোল টেবিলের ওপর সজোরে এক ঘুসি বসিয়ে ক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠল, “ওহ ফা’কিং শি’ট!”
আয়লা কিছুই বুঝে উঠতে পারল না, কী ঘটছে, কেন এই আকস্মিক বিস্ফোরণ! ফারহানের উত্তেজিত মুখমণ্ডল দেখে তার ভ্রূ যুগল কুঁচকে গেল। ফারহানের শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত ও অনিয়মিত হয়ে উঠছিল; বারবার জিভ দিয়ে শুষ্ক ঠোঁট ভিজাচ্ছিল সে। তারান্নুম এই মুহূর্তে কী ভাবছে, সে কল্পনাও করতে পারছিল না। অস্থিরতায় মাথার চুল মুঠোয় টেনে ধরল।
এই আকস্মিক রূপান্তরে ফারহানের মুখাবয়ব যেন সম্পূর্ণ অপরিচিত হয়ে উঠেছে, তা দেখে আয়লা কিছুক্ষণ উদ্বিগ্ন ও অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে রইল।
আয়লা ফারহানের বিছানার উপর রাখা ডান হাতের পিঠে হাত রেখে নরম কণ্ঠে বলল, “কি হয়েছে, ফারহান? ইজ এভ্রিথিং ওকে?”
কিন্তু ফারহানের অন্তরে তখন এমন এক সঞ্চিত ক্রোধ জমে উঠেছিল যে, সে এক ঝটকায় আয়লার হাতটি নিজের হাতের উপর থেকে ছিটকে সরিয়ে দিল। ঝটকাটির তীব্রতায় আয়লার বাহুসন্ধিতে অসহ্য যন্ত্রণা সঞ্চার হলো। ব্যথার অভিঘাতে অন্তরে অন্তরে সে কুঁকড়ে গেলেও, আয়লার কণ্ঠ থেকে কোনো শব্দ নিঃসৃত হলো না। সে স্থির, সংযত দৃষ্টিতে ফারহানের দিকে তাকিয়ে রইল, কারণ তার মন তখন সেই আচরণের অন্তর্নিহিত কারণ অনুধাবন করতে চাইছিল।
ফারহান তখন উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “ডোন্ট টাচ মি, ইউ ফা’কিং স্লা*ট।”
ফারহানের গলার কর্কশ ধ্বনিতেই বোঝা যাচ্ছিল, তার ভেতরে অগ্নির লেলিহান শিখা জ্বলছে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আজ যদি কুইনের সাথে আমার রিলেশনশিপের কিছু হয়ে যায়, তোকে জাস্ট মা’র্ডার করে ফেলব। গেট আউট অফ হিয়ার।”
অন্য সময়ে হলে আয়লা নিশ্চয়ই তাকে শান্ত করার প্রয়াস নিত, কিংবা তারান্নুমের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি সংযত করত। কিন্তু আজ যে আঘাত সে পেয়েছে, তা তার সহিষ্ণুতার সীমারেখা ভেঙে দিয়েছে। ফারহানের গালাগালি আয়লার অন্তরে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠল। তার চোয়াল দৃঢ় হয়ে কড়াকড়ি শব্দে আঁটসাঁট হলো। মুহূর্তের ব্যবধানে সে ফারহানের গালে সজোরে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল। আঘাতপ্রাপ্ত স্থানের শিরাগুলো থরথর করে কেঁপে উঠল।
ফারহান চমকে উঠে কিঞ্চিৎ মুখ খুলে হতবাক ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, কারণ আয়লার এই আচরণ তার কাছে সম্পূর্ণরূপে অপ্রত্যাশিত ছিল।
আয়লা বিছানা থেকে উঠে ফারহানের দিকে এগিয়ে মাথা উঁচু করে বলল, “পরবর্তীতে আমার সাথে ঠিকভাবে কথা না বললে তোর ওই মুখটাই আমি ভেঙে গুড়িয়ে দেব, শালা ডি*কহে*ড।”
এটা বলে গটগট পায়ে ফোঁস ফোঁস করতে করতে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল আয়লা।
ফারহান তখন আর ক্রোধ সংযত করতে পারছিল না। সহসাই সে ম্যাকবুকটি তুলে সজোরে ছুঁড়ে ফেলল। প্রচণ্ড অভিঘাতে ভগ্নাংশগুলো ঘরের চারদিকে বিক্ষিপ্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ল।
তবু অন্তর্গত ক্রোধের জ্বলন প্রশমিত হলো না। সে দ্রুত বাথরুমে প্রবেশ করে পোশাক না খুলেই মাথার ওপর ঠান্ডা জল ঢেলে দিল। জলধারা কপাল ছুঁয়ে চুল বেয়ে নীচে ঝরতে থাকল, অর্থাৎ অন্তরে দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা অগ্নিকে নিবৃত্ত করার এক অদম্য প্রয়াস চলছিল। কিন্তু তার শক্ত চোয়াল ও ঘাড়ে উদ্ভাসিত নীল শিরাগুলো স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছিল, সেই ক্রোধ মস্তিষ্কের এমন এক গভীর স্তরে প্রোথিত, যা জলধারার শীতলতাতেও নিস্তব্ধ হয় না।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে কক্ষে ফিরে আসতেই সে লক্ষ্য করল, ফোনের পর্দা জুড়ে তারান্নুমের একাধিক অপ্রাপ্ত কল এসেছে। ফারহান গায়ের ভেজা টি-শার্ট আর প্যান্ট বদলে নিল। তাড়াহুড়োর মধ্যে কোনো কিছুর দিকে তাকানোর অবকাশ না রেখে, কেবল একটি ট্রাউজার পরেই থেমে গেল। জিভ দিয়ে শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে নিল, কয়েকবার গভীর শ্বাস গ্রহণ করে নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করল। তারপর তোয়ালে দিয়ে মাথার জল মুছে, তারান্নুমের অডিয়ো কলটি গ্রহণ করল।
ফারহান তাকে বোঝানের জন্য কথা শুরু করবার আগেই তারান্নুম বলল, “মেয়েটা কে?”
ফারহান বোঝানোর সুযোগটা হারিয়ে ফেলেছে দেখে, খিঁচে চোখ বন্ধ করল। এরপর চোখ খুলে হালকা নিশ্বাস ফেলে ঢোক গিলে কাটকাট গলায় জবাব দিল, “আমার ফ্রেন্ড।”
তারান্নুম খুব শান্ত স্বরে বলল, “ফ্রেন্ড তাই না? তাইলে বেবি কইল কেন?”
ফারহান যেটা আন্দাজ করছিল, সেটাই হলো। তাই আফসোসে তার মাথা ফেটে যাচ্ছে, নিশ্বাসের মাত্রাও বেড়ে চলেছে। কিন্তু তবু খুবই ঠান্ডা গলায় সে তারান্নুমকে বোঝাতে লাগল, “তুমি ভুল বুঝছ, কুইন। ওই মানে… ও আমাদের সঙ্গে কাজ করে। আমার কলিগ ভাবতে পারো, এর বেশি কিছুই…”
ফারহানের কথা শেষ হওয়ার আগেই তারান্নুমের মুখমণ্ডলে অচেনা তিক্ততা জেগে উঠল। থমথমে কণ্ঠে বলল, “গ্রামের মাইয়া দেইখা ভাবছেন কিছুই বুঝবার পারি না। একটা মাইয়া গেঞ্জি-প্যান্ট পইরা আপনার রুমে আইসা, আপনারই পাশে বসল। আবার কি সুন্দর কইরা ‘বেবি’ ডাকল। বাহ! এরপরও ভাবছেন আপনি আমারে কিছু একটা বুঝাইয়া দিবেন আর আমি বুইঝা নিব! সব মেধা তো আল্লাহ আপনারেই দিছে, আমারে তো দেয় নাই, তাই না?”
তারান্নুমের গলার স্বর কড়া ছিল, কিন্তু শব্দগুলোতে ঠিকই কষ্টের তীব্রতা লুকিয়ে ছিল। ইতোমধ্যেই তার চোখ থেকে পানি ঝরছে। আর ফারহানও বুঝতে পারল, এই রাগের আড়ালে তার ভাঙা হৃদয়টা কেমনভাবে কাঁপছে।
ফারহান কথা গলাধঃকরে থেমে গেল। পরিস্থিতি এমন যে, এখন সে কিছু বললেও তারান্নুম তার কথাকে শুধু অজুহাতই ভেবে অভিমান করে বসে থাকবে। অনেকক্ষণ নীরব থাকার পর, গলায় কষ্ট ধরে রেখে বলল, “আমি এখন যা বলব, তোমার কিছুই বিশ্বাস হবে না। একটু অপেক্ষা করো!”
Tell me who I am 2 part 11
এটা বলে ফারহান কল কেটে দিল।
এদিকে তারান্নুমের চোখের জল আর থামছেই না। একসময় ফোনের স্ক্রিনের আলো নিভে গেল। সেও আর এক পা এগোতে পারল না। মাটির রাস্তার ধারে, ঘাসে ঢাকা জায়গাটায় ধপাস করে বসে পড়ল।
হাঁটুর ভাঁজে মাথা গুঁজে অঝোরে কাঁদার ফলস্বরূপ তার সদ্য পরিধেয় পোশাকটা চোখের জলে সিক্ত হয়ে উঠল, ধুলোমাখা মাটির সঙ্গে মিশে গেল, কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র দৃষ্টি নেই। গত কয়েক মাস ধরে ফারহানের জন্য যে স্বপ্নের সৌধ সে নিঃশব্দে গড়ে তুলেছিল, তা মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখের সামনে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ভেঙে পড়ছে।
বক্ষ যেন বিদীর্ণ হয়ে আসছে, অথচ অশ্রুধারার কোনো বিরাম নেই। অশ্রুসিক্ততায় তার ফরসা গাল ও নাসিকা রক্তিম হয়ে উঠেছে, দৃষ্টি স্থির—চোখের পলকও যেন পড়তে ভুলে গেছে। অন্তরে কেবল একটি প্রশ্নই অনবরত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, শেষ প্রান্তে এসে, এসব না হলেই কি চলত না?
