Home ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৯

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৯

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৯
প্রিয়স্মিতা তেহজীব রাই

মুখের উপর শীতল তরল জাতীয় কিছু আছড়ে পড়াতে চোখের মণি ইসৎ কেঁপে ওঠে প্রিয়তার।
বড় বড় সুদীর্ঘ আঁখি পল্লবগুলো নড়ে ওঠে বার কয়েক।
চেতনা ফিরতে শুরু করে ধীরে ধীরে।
অর্ধ অচেতন অবস্থায় ঠোঁট দুটো নাড়িয়ে কিছু বলে প্রিয়তা।
ঠোঁট নড়তে দেখে ভ্রু কুঁচকান ডিকে। কানটা সামান্য মুখের কাছে ধরতেই শুনতে পান—
“প্রণয় ভাই…”

খুব ধীর অথচ কাতর কণ্ঠের বাক্যটা শুনে ওষ্ঠ কোণে পৈশাচিক হাসি খেলে যায় ডিকের।
তিনি এক পলক মেয়েটার মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলান।
অতঃপর আশেপাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখেন।
নিজস্ব নারী ব্যতীত পর নারীর দেহে কোনোদিনও ডিকের লোভ লালসা নেই, তবে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা পিশাচগুলোর দৃষ্টি বলছে—তারা এক সেকেন্ডের জন্য পেলেও ছিঁড়ে খেয়ে নেবে।
যেন বাপের জন্মে মেয়ে দেখেনি কোনোদিন।
কে যেন বলেছিল, “এক মাঘে শীত যায় না।”
মরশুম বদলায়, আর শীতকালও বারবার ফিরে ফিরে আসে।
কিন্তু আবরার শিকদার প্রণয়ের জন্য তো এটা শীতকাল নয়—বর্ষাকাল।
তার সুখের নীল রঙা আকাশ ঢেকে গেছে, আষাঢ়ে কালো মেঘে, ধেয়ে আসছে কালবৈশাখী ঝড়।
চোখের সামনে প্রিয়তার আকর্ষণীয় বাঁকানো শরীরটা পড়ে থাকতে দেখে ভেতরে আগুন জ্বলছে সন্তোষের।
সে চোখ বন্ধ করে কল্পনা করে, ওই মাখনের মতো শরীরের বাঁকগুলো কেমন হবে।
কল্পনা করতেই সন্তোষের সর্বাঙ্গের পশম দাঁড়িয়ে যায়। পুরুষ দণ্ডের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে না।
সেও ডিকের পাশে দাঁড়িয়ে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে প্রিয়তার পানে।
একসময় অধৈর্য হয়ে বলে বসে—

“ডিকে বস, আপনি কিছু করবেন না? তাহলে এই মালটাকে আমি নিয়ে যাই?”
প্রিয়তার প্রতি সন্তোষের এমন বাক্য চয়ন শুনে থমকান ডিকে বস। সহসা কাশি উঠে যায় উনার।
না চাইতেও চোখের আকৃতি বৃহৎ হয়।
“এই আহাম্মক বলে কী!”
তবে তৎক্ষণাৎ নিজে সামলে নেন ডিকে বস।
সামান্য হাসেন। প্রণয়ের ওপর উনার বড় মায়া হয়।
ঠোঁট দিয়ে চুক চুক শব্দ তুলে মনে মনে তাচ্ছিল্য করে বলেন—
“ইসস, মাই সান… তোমার সাম্রাজ্যে তোমার পোষা কুকুরগুলো তোমার বউকে দেখে জিভের লালা ঝরাচ্ছে। ছু ছু ছু… কতটা অক্ষম তুমি!”
“বস।”
সন্তোষের কথায় ধ্যান ভাঙে ডিকে বসের।
তিনি ক্রুর হেসে সম্মতি জানান।
পৈশাচিক তৃপ্তি নিয়ে বলেন—
“অফকোর্স।”

সম্মতি পেতেই সন্তোষের লোলুপ কামাসক্ত চোখ-মুখ ঝিলিক দিয়ে ওঠে লালসায়, ঠোঁটে ফুটে শয়তানি হাসি।
অপর দিকে মলিন হয় অন্যান্য ছেলেগুলোর মুখ।
সন্তোষ এগিয়ে এসে দু হাত টেনে ধরে কাঁধে তুলে নিল প্রিয়তাকে।
ছুঁতেই অনুভব করল—এত নরম, এত কোমল, যেন ধরতেই মোমের মতো গলে গেলো।
এই জীবনে অজস্র নারী দেহের স্বাদ নেওয়া হলেও এমন নারী সে আগে কখনো ছোঁয়নি।
সন্তোষ প্রিয়তাকে নিয়ে চলে গেল সেকশন এ-তে।
হাতের ইশারা দিতেই একটা ছেলে এসে বোতল থেকে গ্লাসে মদ ঢেলে দিল।
ডিকে বস রেড ওয়াইনের গ্লাসে বৃদ্ধাঙ্গুলি ঘুরাতে ঘুরাতে সামনে বেহুঁশ হয়ে থাকা প্রহেলিকার দিকে তাকান।
ডিম্বাকৃতির বৃহৎ কাঁচের টেবিলের এক প্রান্তে মাথা এলিয়ে পড়ে আছে প্রহেলিকা।
এই আরেক মাথামোটা এতই নেশা করেছে যে নিজের হুঁশেই নেই, তাই দেখতেও পেল না—তার সম্মুখেই তার সব থেকে বড় শত্রুকে বধ করতে নিয়ে যাওয়া হলো।
আচ্ছা, প্রহেলিকা এটা দেখলে কী খুশি হতো!

কী জানি হতো বোধয়।
তবে এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ দেখা গেল না ডিকে বসের।
তার চোখ-মুখ জ্বলছে বহু বছরের ছাই চাপা প্রতিশোধের আগুনে।
আজ ৯টা বছর ধরে প্রতিদিন অপেক্ষা করেছে এই দিনের জন্য।
নিজের ছেলের মৃত্যুর বদলা নেওয়ার জন্য।
নিজের উপর হওয়া সকল জুলুমের বদলা নেওয়ার জন্য।
এতগুলো বছর খুনি চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও তাকে হন্যে হয়ে খুঁজেছেন তিনি।
যার ওপর নিজের আগামী সাম্রাজ্যের দায়িত্ব দেবেন বলে ভরসা করেছিলেন, যাকে পৃথিবীতে সব থেকে বেশি বিশ্বাস করেছিলেন—দিন শেষে সেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে সন্তর্পণে ছুরি মেরেছে পিঠে।
যেই পাতে খেয়েছে, সেই পাতই ফুটো করেছে।
তার কাছ থেকে ক্ষমতা নিয়ে তার বিরুদ্ধেই ব্যবহার করেছে, তার ছেলের খুনিকে আড়াল করে রেখেছে।
তিনি চাইলেই আজ প্রিয়তাকে তৎক্ষণাৎ খুন করে নিজের ছেলের হত্যার প্রতিশোধ নিয়ে নিতে পারতেন।
তবে এতে উনার মনের জ্বালা জুড়াত না।
বিশ্বাসঘাতকের ন্যায্য শাস্তি হতো না।

তাই এই ব্যবস্থা—এতে করে এক ঢিলে সবগুলো পাখি মরবে।
চোখ-মুখের শান্ত ভাবটা সরে গিয়ে চিরচারিত সেই হিংস্রতা চেপে বসল ডিকে বসের ভাবমূর্তিতে।
তিনি শান্ত অথচ ভয়ংকর কণ্ঠে বললেন—
“আমি তোমাকে মরতে দেবো না, মাই সান… আর বেঁচে থাকার অবস্থাতেও রাখবো না।”
“খুব ভালোবাসো, তাই না? ওর জন্যই তো আমার সাথে বিট্রে করেছ। তাই পানিশমেন্ট তো তোমাকে পেতেই হবে। অবাধ্য বাচ্চাদের কীভাবে সিধে করতে হয়, তা আমার খুব ভালো মতো জানা আছে।”
“আআআ… প্রণয়… আমার প্রণয়…”
মৃদু গুণগুণানির আওয়াজ পেয়ে সামনে দৃষ্টি পাত করলেন ডিকে।
প্রহেলিকা প্রায় অচেতন, তবুও প্রণয়ের নাম জপ করছে।
এমন দৃশ্যে বিতৃষ্ণায় মুখ কুঁচকালেন ডিকে।
হাতে থাকা রিভলবারটা দিয়ে কপাল চুলকে তীব্র ঘৃণা নিয়ে বললেন—
“লাভ ইজ অ্যা ফাকিং ডিসকাউন্টিং ইনফেকশন!”

সম্পূর্ণ চেতনা ফিরতেই নিজেকে কারো কাঁধে আবিষ্কার করল প্রিয়তা।
দুর্বল চোখ মেলে সামনে তাকিয়ে দেখল—সে বাতাসে ভাসছে, মানে কেউ তাকে কাঁধে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।
ব্যাপারটা বুঝে আসতেই বুকের ভেতর ছলাৎ করে উঠল প্রিয়তার।
শরীরের সমস্ত রক্ত জমে হিম হয়ে গেল এক মুহূর্তে।
তীব্র বেগে নাকে এসে লাগল মিশ্র মদের কড়া একটা বিদঘুটে ঘ্রাণ।
ব্যাপারটা মস্তিষ্কে পৌঁছাতে যতটা সময় লাগল, তার থেকে দ্রুত রিঅ্যাক্ট করল প্রিয়তা।
সেকেন্ড গড়ানোর পূর্বেই আকাশ-জমিন কাঁপিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল—
“এই এই কে… ছাড় আমায়!”

হাত-পা ছুড়তে লাগল প্রিয়তা, পাগলের মতো।
লোকটার গায়ে ধাক্কা দিতে লাগল।
তবে সন্তোষ এসবের তোয়াক্কাই করল না।
শয়তানি হেসে বলল—
“বাহ! কী কড়া মাল, তার ওপর এমন ঝাঁঝ! উফফফ… আজকের রাতটা যেমন কাটবে!”
ভেবেই পুলকিত হলো সন্তোষ।
সন্তোষের বাক্যগুচ্ছ কানে যেতেই শরীর থেকে আত্মা বেরিয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি হলো প্রিয়তার।
সন্তোষকে ঠেলে সরানোর চেষ্টায় তৎপর হয়ে উঠল, হুংকার ছেড়ে বলল—
“দুঃসাহস দেখানো ভালো, কিন্তু বেশি দুঃসাহস দেখানো মোটেও ভালো না। আমার প্রণয় ভাই জানতে পারলে জীবিত দাফন করে দেবে তোকে। ছাড় আমায়!”

প্রিয়তার কথায় যেন মজা পেয়ে গেল সন্তোষ।
প্রিয়তাকে একটা ঘরে নিয়ে ছুড়ে মারল বিছানায়।
আতঙ্কে কাঁপন ধরেছে প্রিয়তার রক্তের ফোঁটায় ফোঁটায়।
সে ভয়ার্ত চোখে তাকাল সন্তোষের দিকে।
কী বীভৎস, ভয়ংকর লাগছে—যেন সাক্ষাৎ নরপিশাচ।
কাঁপতে কাঁপতে পেছন দিকে পিছাতে শুরু করল প্রিয়তা।
হাতের মুঠোয় ওড়না শক্ত করে চেপে ধরল।
তার অবচেতন মন শুধু খুঁজছে প্রণয়কে।
পাগল পাগল লাগছে প্রিয়তার।
সন্তোষের ঠোঁটের কোণে বিদ্যমান শয়তানি হাসি।
সে পাশের টেবিল থেকে মদের বোতল তুলে ঢকঢক করে গলায় ঢেলে দিল অর্ধেকটা।
তার লোলুপ, জ্বলজ্বলে চোখ বারবার ঘুরে ফিরে যাচ্ছে প্রিয়তার বস্ত্রাবৃত অসংলগ্ন নারী দেহের ভাঁজে।
যেন মদ নয়—প্রিয়তার আকর্ষণীয় শরীরের নেশাই তার চেতনা নাশ করছে।
প্রিয়তার নরম, মাখনের ন্যায় ফর্সা পায়ের পাতায় কয়েকটা আঙুল ছুঁয়াতেই খিঁচে চোখ বন্ধ করে নিল সন্তোষ।
শিহরনে শরীরের লোমকূপ দাঁড়িয়ে গেল তার।
মুখ দিয়ে অদ্ভুত শব্দ বের করল—যেন এতটুকু করেই পরম তৃপ্তি পেয়ে গেছে সে।

“উফফফ!”
সন্তোষের স্পর্শ লাগতেই ঘৃণায় গা গুলিয়ে বমি পেল প্রিয়তার।
ঝটকা মেরে পা গুটিয়ে নিল।
আতঙ্কে দরদর করে ঘামছে তার পুরো শরীর।
তবে কান্না আসছে না প্রিয়তার।
এই পিশাচটা ছুঁয়ে দিয়েছে ভাবতেই পাটা এক কোপে শরীর থেকে আলাদা করে দেওয়ার বাসনা জাগছে মনে।
ভয়ের পাশাপাশি চরম রাগে আর অপমানে থরথর করে কাঁপছে প্রিয়তা।
চোয়াল শক্ত হয়ে চোখ-মুখ লাল হয়ে আসছে।
ক্ষিপ্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করল প্রিয়তা।
ঘরটার আশেপাশে তাকাল।
কালো রঙে আবৃত ঘরটায় একটা বিছানা আর একটা সাইড টেবিল ছাড়া কিছু নেই।
সন্তোষ ঠোঁট কামড়ে ধরল।
হাঁটুতে ভর দিয়ে ঝুঁকে এল প্রিয়তার দিকে।
পা থেকে কোমর পর্যন্ত নিচু হয়ে লম্বা শ্বাস টানল।
ওড়নায় হাত দিতে চাইলে গর্জে উঠল প্রিয়তা—

“একদম ছুঁবি না আমায়! নাহলে শরীর থাকবে ঠিকই, কিন্তু হাত থাকবে না!”
বাড়তি প্রতিক্রিয়া দেখাল না সন্তোষ।
ঠোঁট কামড়ে বিশ্রী হাসল।
এক টানে প্রিয়তার গা থেকে ওড়না ছুড়ে ফেলল মেঝেতে।
সাথে সাথেই উন্মুক্ত হলো প্রিয়তার ধবধবে কলারবোন, গলা, কাঁধ, বুকের কিছু অংশ।
ফর্সা ত্বকে লাল দাগগুলো অতি সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করলো সন্তোষের।
মুহূর্তেই তার উত্তেজনা যেন ক্রোধে পরিণত হলো। দাঁতে দাঁত চেপে শুধালো—
“তুই ভার্জিন না?”
“নাহ।”
প্রিয়তার স্পষ্ট জবাব।
প্রিয়তা ভেবেছিল এটা শুনে হয়তো সন্তোষ তাকে ছেড়ে দেবে, কিন্তু তার ভাবনাকে তৎক্ষণাৎ ভুল প্রমাণ করে দিল সন্তোষ।
এবার পেট থেকে গলা পর্যন্ত আবারও লম্বা শ্বাস টানলো। বিকৃত হেসে, হিশহিশিয়ে বলল—
“তাতে কী! এমন রসের যৌবন কোনোদিনও একজন খেয়ে শেষ করতে পারবে না। তাই সন্তোষ আজ ভরপুর খাবে।”

সন্তোষের কথাগুলো প্রিয়তার কানে উত্তপ্ত সিসা ঢেলে দেওয়ার মতো অনুভূতি দিল। হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এলো সহসা।
কেন জানি এখন আর ভয় লাগছে না। বরং রক্তে অন্যরকম তেজ কাজ করছে।
যে যেমনই হোক—রক্তের টান কিংবা বংশের টান কেউ কখনোই ভুলতে পারে না। তা যেন সর্বদাই সুপ্ত আগ্নেয়গিরি, মনের এক কোণে জমাট বেঁধে থাকে আজীবন।
প্রিয়তার বেলায়ও তার অন্যথা হলো না। সে শিকদার বংশের মেয়ে, শিকদারদের রক্ত যার শরীরে বয়—শিকদারদের জিন যে বহন করে, সে আর যাই হোক দুর্বল হতে পারে না কিংবা তার দুর্বলতা কোনোদিনও চিরস্থায়ী হতে পারে না।
তারা জন্মগতভাবেই শিকারী; তাদের বন্যতা কেবল আদর ভালোবাসা দিয়ে রুখে দেওয়া সম্ভব নয়।
তাদের ভেতর যে বারুদের স্তূপ থাকে, তা এক মুহূর্তে সবকিছু ছারখার করে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে।
সন্তোষ প্রিয়তার নারীদেহের কোমলতায় হাত বাড়াতেই এক অপ্রত্যাশিত কাণ্ড ঘটে গেল তৎক্ষণাৎ।
আচমকা অণ্ডকোষ চেপে ধরে প্রচণ্ড ব্যথায় ঘর কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো সন্তোষ। তার চোখ-মুখসহ সর্বাঙ্গ ব্যথার তীব্রতায় নীল হয়ে গেল মুহূর্তেই।
ধাক্কা দিয়ে তাকে নিজের ওপর থেকে সরিয়ে দিল প্রিয়তা। ঘৃণায় একদলা থুতু ছুড়ে মারল সন্তোষের মুখের ওপর।
কণ্ঠে রাজকীয় দম্ভ মিশিয়ে বলল—

“জায়গা মতো একটা লাথি খেয়েই তোর সব পুরুষত্ব হাওয়া হয়ে গেল। বলেছিলাম না—সবার সাথে হাতাহাতি করিস, কিন্তু আমার সাথে নয়!”
সন্তোষের গগনবিদারী চিৎকারে পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে। কেঁপে কেঁপে উঠছে ইট-কংক্রিটের দেয়ালগুলো।
কিন্তু আফসোস—সাউন্ডপ্রুফ রুমের বাইরে কেউ জানতে পারছে না।
প্রিয়তা তীব্র আক্রোশে সজোরে আরেকটা আঘাত বসালো সন্তোষের মেইন পয়েন্টে। আগেরবার হাঁটু দিয়ে লাথি দিয়েছিল, কিন্তু এবার সরাসরি পা দিয়ে দিল।
এক লাথিতেই বিছানা থেকে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ল সন্তোষ। গলা কাটা মুরগির মতো ছটফট করতে করতে চিৎকার করছে সে।
প্রিয়তার দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বিশ্রী গালি দিতে চাইল, কিন্তু তার আগেই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নাক বরাবর ঘুষি মারল প্রিয়তা।
শ্বাসনালীতে পা চেপে জোরে জাঁতা দিয়ে বলল—
“একটাও কটু শব্দ আমার নামে মুখ দিয়ে বের করবি না! নাহলে এখানেই জানে মেরে ফেলবো। তুই জানিস আমি কে?”

সন্তোষ ছটফট করতে করতে শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
প্রিয়তার পায়ের চাপ আরও দ্বিগুণ বাড়িয়ে বলল—
“আমি তোর মতো ছোটলোক বংশে জন্মাইনি! আমি শিকদার বংশের মেয়ে—তনয়া শিকদার প্রিয়তা, ওয়াইফ অফ আবরার শিকদার প্রণয়!
আমার স্ট্যান্ডার্ডে তোদের মতো লোককে আমার জুতা পরিষ্কার করার জন্যেও রাখি না।
আর তুই সপ্ন দেখিস আমাকে ছুয়ার।
আমার বংশ-মর্যাদা বলে তোদের মতো কীটকে পায়ের তলায় পিষে মেরে ফেলতে—যেটা আমি বর্তমানে করছি! আর তুই চেয়েছিলি আমাকে স্পর্শ করতে?
ব্লাডি বিচ!”
প্রিয়তার মুখটা রক্তলাল। নীলাভ চোখ দুটো দিয়ে যেন আগুন ঝরছে।
কণ্ঠ নির্ঘোষ—বাক্যবাণে ঠিকরে বেরোচ্ছে বংশীয় দম্ভ, অহংকার। ঠিক যেন সাদমান শিকদারের প্রতিচ্ছবি।
গলা সহ ফুলে ফেঁপে উঠেছে শরীরের ছোট থেকে ছোট শিরাটাও। ক্রোধে কাঁপছে শরীর।
শান্ত নীল চোখের রক্তিম আভা কেন যেন সন্তোষের ভেতরও কাঁপন ধরাচ্ছে। নিঃশ্বাস ফুরিয়ে দম আটকে আসছে তার। চোখ-মুখ উল্টে আসছে।
সে প্রিয়তার পা ধরে সরানোর চেষ্টা করতেই ভুল বুঝল প্রিয়তা।
চোখের পলকেই ঠাস করে চড় বসিয়ে দিল সন্তোষের গাল বরাবর।
তবে আঘাতটা যেন গায়ে লাগল না সন্তোষের। গলা থেকে পা সরাতেই তার দেহে প্রাণ ফিরল।
কিন্তু এবার যেন প্রিয়তাকে পাওয়ার ইচ্ছাটা তার মাথায় আরও দ্বিগুণভাবে চেপে বসল।
প্রিয়তার একেকটা আচরণ তার প্রবল ইচ্ছাকে জেদে পরিণত করে দিল।
ছাড়া পেতেই লাফিয়ে উঠে পড়ল সন্তোষ।
বাক্য ব্যয় না করে প্রিয়তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল।
কিন্তু এবারও অসফল হলো সে।

ঝটকা মেরে কোমরের ভাঁজ থেকে লুকিয়ে রাখা রিভলভার বের করল প্রিয়তা।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই খানদশেক বুলেট ঠাস ঠাস করে সন্তোষের কপাল বরাবর ঠুকে দিল।
সাথে সাথেই রক্তের কয়েকটা পিচকারি এসে আছড়ে পড়ল প্রিয়তার গলায়।
চোখের সামনে নিস্তেজ হয়ে পড়ে গেল সন্তোষ।
দু একবার ঝাঁকি দিয়ে শান্ত হয়ে গেলো।
প্রিয়তার হাতে রিভলভার। চোখ দুটোতে ক্ষোভ এখনো স্পষ্ট।
সন্তোষের রক্তে ইতিমধ্যেই ভিজে উঠেছে সাদা বিছানার চাদর।
আর এটার মাধ্যমে জীবনের দ্বিতীয় খুন সম্পন্ন করল প্রিয়তা।
কেন যেন এখন আর রক্তে ট্রিগার হচ্ছে না প্রিয়তা। বরং রক্ত দেখতে ভালো লাগছে—ভীষণ ভালো লাগছে।
এক ধরনের বিকৃত স্যাটিসফ্যাকশন কাজ করছে মনের ভেতর।
এমন তৃপ্তি যেন কিছুতেই নেই।

এই মুহূর্তে আরও দুই-একটা লাশ ঠিক এভাবেই ফেলতে মন চাচ্ছে নরম মনের প্রিয়তার।
খুন করাটা যেন সত্যিই নেশা—ভীষণ এফেক্টিভ একটা নেশা, একদম ড্রাগের অনুরূপ।
৯ বছর আগে যখন প্রথম খুনটা করেছিল—তখন অনেক দুর্বল ছিল প্রিয়তা। ছোট্ট একটা বাচ্চা কি-বা করতে পারে! তবুও সেদিন নিজের ইজ্জত রক্ষা করেছে প্রিয়তা। আর আজ তো সে আর ছোট নেই।
শিকদাররা মূলত মানুষরূপী পিশাচ—রক্তে যাদের প্রবল নেশা।
নেশা বললে ভুল হবে—সেখানে আসক্তি।
একবার তাদের দ্বারা মানুষ খুন হয়ে গেলে তারা আসলে নেশায় পড়ে যায়।
সে যত ভালো মানুষই হোক না কেন, ভেতরের শয়তানকে তখন ধামাচাপা দেওয়া কষ্ট হয়।
এখন যেমন অনুভূতি হচ্ছে প্রিয়তার।
রাগ এখনো সপ্তম আসমানে।
তৎক্ষণাৎ উল্টো দিক থেকে তালি দেওয়ার আওয়াজ ভেসে এল।
ঘাড় ঘুরিয়ে রক্তচক্ষু নিয়ে তাকালো প্রিয়তা।

ডিকে হাতে তালি দিতে দিতে ধীর পায়ে এগিয়ে আসছেন। ঠোঁটের কোণে বিদ্যমান বক্র হাসি।
লোকটাকে ভীষণ চেনা চেনা লাগল প্রিয়তার। ব্রেইনে সামান্য চাপ প্রয়োগ করতেই মনে পড়ে গেল—এই লোকটা বড় আব্বুর বিজনেস পার্টনার।
ব্যাপারটা মাথায় আসতেই ভ্রু কুঁচকে গেল প্রিয়তার।
প্রিয়তার ভাবনার মধ্যেই ডিকের শীতল কণ্ঠে ঘোর কাটল—
“আমি যতটুকু ভেবেছি, তুমি তো তার থেকেও বেশি ডেঞ্জারাস হয়েছো। ইম্প্রেসিভ।”
“আপনি এখানে? আপনি তো—”
“উহু উহু, বেবি গার্ল। তুমি আমাকে চিনতে ভুল করছো। আমি এখানে বিজনেসম্যান ডেভিড কিং নয়—আমি এখানে মাফিয়া কিং, ডিকে বস।”
ডিকের কথায় বিস্মিত হলো প্রিয়তা।
“আমি জানতাম তোমাকে যেমন দেখা যায়, তুমি মোটেও তেমন নও। তোমার মধ্যেও একটা সুপ্ত আগ্নেয়গিরি আছে। কিন্তু এত বড় বিস্ফোরণ ঘটাবে—সেটা আশা করিনি।
আসলে ঠিকই আছে—সাপের জাত তো। ছোট সাপেরও বিষ থাকে, বড় সাপেরও বিষ থাকে—ওই একই হলো।
আর তোমার যদি বিষ না থাকতো, তাহলে আমার ছেলেকে মারার কলিজা তোমার হতো না।”
ডিকের কথায় পিলে চমকে উঠল প্রিয়তা। হাত থেকে রিভলভারটা ফসকে পড়ে গেল।
বাঁকা হাসল ডিকে।

একটা তুড়ি বাজাতেই চার-পাঁচজন গার্ড এসে চেপে ধরল প্রিয়তার হাত-পা।
মুহূর্তেই ঘাবড়ে গেল প্রিয়তা। ছটফট করে উঠে নিজেকে ছাড়াতে চাইল।
কিন্তু এতগুলো পুরুষের সাথে তার মতো ছোট্ট ছানা কি আর পারে!
ডিকে বস চোখের ইশারা দিতেই তারা প্রিয়তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে লাগল।
আবারও চিৎকার দিয়ে কান্না করে দিল প্রিয়তা—
“প্রণয়য়য়য় ভাইইই!”
ডিকে বসের চোখে-মুখে দাউ দাউ করে জ্বলছে এত বছরের চাপা দেওয়া প্রতিশোধের আগুন।
আজ প্রণয়ের ঘরেই প্রণয়ের জানকে শেষ করে দেবেন তিনি—কেউ ঠেকাতে পারবে না।
এতদিন সোজা পথে অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এটা তো জানাই—সোজা আঙুলে ঘি ওঠে না।
তাই এবার আঙুলটা বাঁকিয়েছেন ডিকে বস।
প্রিয়তাকে কিডন্যাপ করার মাস্টার প্ল্যানটা আর কারো নয়—ডিকে বসের।
এই এক ঢিলে আজ অনেকগুলো পাখি মরবে।
তিনি খালিদ শিকদারকে দিয়ে পরিকল্পিতভাবে প্রিয়তাকে প্রণয়ের লোক দিয়ে তুলে এনেছেন।
আর অন্য কোথাও নয়—প্রণয়ের সাম্রাজ্যেই বন্দি করে রেখেছেন।
কারণ প্রণয় সারা দুনিয়া তন্ন তন্ন করে খুঁজলেও নিজের ঘরে খুঁজবে না।
আর এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছেন ডিকে বস।

আলোআঁধারিতে আচ্ছন্ন কক্ষ জুড়ে শীতল নিষ্ঠুরতা বিরাজমান।
যান্ত্রিক বিপ বিপ শব্দ প্রতিফলিত হচ্ছে ধাতব দেওয়ালের আনাচে কানাচে।
ব্যথায় যন্ত্রণায় নীল হয়ে যাচ্ছে প্রণয়ের আদরের প্রিয়তা।
এই সকল যান্ত্রিক নিষ্ঠুরতা সইতে অক্ষম হচ্ছে তার কোমল দেহখানা।
অব্যক্ত গুমড়ে ওঠা যন্ত্রণায় বিষিয়ে ওঠছে মন।
নিরব হাহাকাকে নীলাভ চোখের দুই পাশ বেয়ে গল গল করে প্রবাহিত হচ্ছে তরল নদী।
ডার্ক টর্চার রুমের বিশাল মনিটরে লাইন বাই লাইন ভেসে উঠছে প্রিয়তার পালস রেট, হার্ট রেট, মস্তিষ্কের অ্যাক্টিভিটি—শারীরিক সকল পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ। এমনকি শিরায় বয়ে চলা উষ্ণ রক্তের গতিপথও চোখের আড়াল হচ্ছে না।
যন্ত্রণার তীব্রতা অনুধাবন করা থার্মোমিটারের ন্যায় লম্বাটে ডেসিবলের রেড ডটটা ক্রমেই লাফিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে।
আর গলা কাটা মুরগির মতো ছটফটিয়ে উঠছে প্রিয়তা। যতই নড়াচড়া করে হাত পা নাড়ানোর চেষ্টা করছে, ততই বিষ লতার মতো যান্ত্রিক লৌহ হাতগুলো চরম নির্দয়তার সাথে আরো শক্ত করে চেপে ধরছে তার হাত-পা।
যেন মাংস চিরে হাড় অব্দি পৌঁছে যাবে তার দানবীয় থাবা।

এমন নিষ্ঠুরতার সাথে পরিচিত নয় প্রিয়তার কোমল শরীর, সে তো কেবল ভালোবাসা কুড়াতে শিখেছে।
আদর গায়ে মাখতে শিখেছে, তাই পীড়া সহ্য করার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের থেকে অনেকটাই কম প্রিয়তার।
তার সম্মুখে পায়ের ওপর পা তুলে আয়শি ভঙ্গিতে বসে আছেন ডিকে বস। এক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, আর অন্য হাতে স্লিপ কন্ট্রোল ডিভাইস। সংকুচিত ঠোঁটে লেগে আছে দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত সেই তৃপ্তির হাসি।
এই তৃপ্তি লাভের আশায় তিনি বেঁচে ছিলেন এতকাল!
তার বেঁচে থাকার প্রেরণা কেবল আজকের দিনটি।
প্রতিশোধ স্পৃহা তাকে মরতে দেয়নি।
চোখের সামনে নিজের ছেলের হত্যাকারীকে এভাবে কষ্ট আর যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখে তুষারপাত হচ্ছে তার জ্বলন্ত হৃদয়ে।
প্রিয়তার গলা দিয়ে শব্দ বের হচ্ছে না।
তার নরম কোমল হাত-পাগুলো নির্দয়ভাবে যান্ত্রিক হাত দ্বারা দুই হাতের কবজি চেপে ধরে রেখেছে।
এক চুল নড়তে পারছে না প্রিয়তা। নড়ার সামান্য চেষ্টা করলেও চাপ বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণ। দুই পায়ের গোড়ালিও একইভাবে লোহিত বেষ্টনীতে আটকে রাখা।
প্রিয়তার নিষ্পাপ চোখ দুটোতে প্রবল আকুতি।
সে নেতিয়ে পড়া করুণ কণ্ঠে ধীরে ধীরে বলার চেষ্টা করল,

“প – প্লিজ আমাকে এভাবে মেরে ফেলবেন না। আমার স্বপ্নগুলো এভাবে শেষ করে দেবেন না। আমাকে একটাবার আমার প্রণয় ভাইয়ের কাছে যেতে দিন, শেষ একটাবার তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরার সজোগ দিন।
ওই মানুষটাকে দেখার সুযোগ দিন, ওই অবুঝ লোকটা যে আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝে নাহ্।
আমাকে তার কাছে যেতে দিন।
তাকে যে আমার কিছু বলার আছে।
এটা না বলে আমি মরতে পারব না।
দয়া করুন।”
ডিকে বস ক্ষিপ্ত হলো প্রিয়তার ভিজে চোখের দিকে তাকিয়ে, দাঁতে দাঁত পিষল।
“তোমার স্বপ্ন! এই কথাটা বলতে লজ্জা করল না? লক্ষ কোটি মানুষের জীবন ধ্বংস করে, তাদের স্বপ্ন ভেঙে চুরে চুরমার করে দিয়ে নিজের স্বপ্ন গড়তে চাও? এতো সোজা? এত এত মানুষের অভিশাপ কুড়িয়ে ভালো থাকতে পারবে?”
তীব্র অবজ্ঞার সহিত কথাগুলো ছুড়ে দিলেন ডিকে বস।
প্রিয়তা তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ করার চেষ্টা করল। দ্রুততার সহিত পাশে মাথা নাড়িয়ে বলল,

“না – নান – না, আমি কারো ক্ষতি করিনি। আমি কখনো কারো খারাপ চাইনি, কারো জীবন ধ্বংস করিনি। আপনার ভুল হচ্ছে, কোথাও আপনি ভুল বুঝছেন।
প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন, আমাকে যেতে দিন। বিশ্বাস করুন, আপনার ছেলেকে আমি মারতে চাইনি। ইট ওয়াজ অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট। আমি খুব ছোট ছিলাম তখন, ভয় পেয়ে গেছিলাম।
প্লিজ আমাদের মারবেন না। আমি মরে গেলে আমার প্রণয় ভাইও বাঁচবে নাহ্।”
তাচ্ছিল্য উপচে পড়ল ডিকে বসের চোখে-মুখে।
সে এবার আর রাগলো নাহ্, বরং তার চোখ অদ্ভুদ উজ্জ্বল।
“আহ! কত মাসুম আর নিষ্পাপ তুমি।
আমি কখন বললাম তুমি মানুষের জীবন নষ্ট করেছো?”
“তাহলে?”
“তুমি প্রতিদিন এমন একজন মানুষের সাথে সংসার করছো—থাকছো, খাচ্ছো, ঘুমাচ্ছো। তুমি ভাবছো তুমি তাকে চিনে ফেলেছো, কিন্তু কতটা মূর্খ তুমি! যার সাথে চব্বিশ ঘণ্টা থাকো, তার সম্বন্ধে শূন্য শতাংশও ধারণা নেই।”
প্রিয়তা একটু হতবাক হলো। সে বুঝল না লোকটার কথা। এই লোকটা কি তার প্রণয় ভাইকে নিয়ে বলছে? কী জানে না প্রিয়তা? সে দুর্বল কণ্ঠে শুধালো,
“আপনি… আপনি কি বলতে চান?”

“এটাই যে, বিগত দুই মাস ধরে যার সন্তানকে যত্ন করে নিজের গর্ভে লালন-পালন করছো, সে যে কত মায়ের বুক খালি করে দিয়েছে, কত বাবার শেষ অবলম্বন তার সন্তানকে কেড়ে নিয়ে নিঃস্ব করে দিয়েছে—তার হিসেব রেখেছো?”
ডিকে বসের প্রথম কথায় পিলে চমকে উঠল প্রিয়তা। সহসা গা কাটা দিয়ে উঠলো—যে কথা পৃথিবীর কেউ জানে না, সেই কথা এই লোকটা কীভাবে জানল? তবে ওই ভাবনার সুতো বেশিদূর টেনে নিয়ে যেতে পারল না প্রিয়তা, তার আগেই মস্তিষ্কে আঘাত আনলো অন্য কথাগুলো।
প্রিয়তা অবিশ্বাসী দৃষ্টিতে সামনে বসা ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে রইলো কয়েক পল। অতঃপর আচমকাই আহত বাঘিনীর ন্যায় ক্ষেপে গেলো। এতক্ষণের অসহায় মুখখানা বদলে তেজী হয়ে উঠলো।
গর্জন করে উঠলো প্রিয়তা—
“আপনার সাহস কী করে হয় আমার প্রণয় ভাই সম্পর্কে এমন বাক্য চয়ন করার?
আমার পবিত্রতায় কলংক লেপে দেওয়ার?
আপনি জানেন আপনি কার সম্পর্কে কী বলছেন? আপনি আমার প্রণয় ভাইয়ের সম্পর্কে বলছেন—আমার অস্তিত্বের অবিনশ্বর সেই অংশ সম্পর্কে বলছেন, যাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় আমার পুরো পৃথিবী।
আমি তাকে খুব ভালো মতোই চিনি। তাই আমার ভালোবাসা সম্পর্কে এমন কঠোর বাক্য আমি কিছুতেই সহ্য করব না।

আমার প্রণয় ভাইয়ের মতো মানুষ কোনো অন্যায় করতে পারে নাহ্, আর কোনো মেয়ের বুক খালি করবে—এমন গল্প আপনি আমার কাছে বলার সাহস পান কীভাবে?
আমার প্রণয় ভাই সদ্যজাত শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ, পবিত্র। চাঁদের গায়ে কলংক থাকতে পারে, কিন্তু আমার প্রণয় ভাই নিষ্কলঙ্ক।”
প্রিয়তার মিথ্যে গৌরব আর অহংকার দেখে হাসি চাপতে পারলেন না ডিকে বস।
প্রিয়তা কথা সমাপ্ত করার পূর্বেই গা দুলিয়ে ঝংকার তুলে হেসে উঠলেন—যেন ভীষণ মজার কৌতুকপূর্ণ কোনো কথা বলেছে প্রিয়তা।
তার উচ্চ শব্দের হাসির ধ্বনি সাউন্ডপ্রুফ দেয়ালগুলোতে বাড়ি খেয়ে ভীষণ বীভৎস শোনাল প্রিয়তার কর্ণকুহরে। অস্বস্তি বাড়ল তার।
ডিকে বস আচমকা হাসি থামিয়ে কিঞ্চিৎ ঝুঁকে এলেন প্রিয়তার নিকট। পূর্বের হাসির রেশ টেনে বললেন—
“তোমার প্রণয় ভাইয়ের সম্বন্ধে বলা শুরু করলে সময় ফুরিয়ে যাবে, মেয়ে, কিন্তু বলা শেষ হবে না। এতটাই গুণী তোমার প্রণয় ভাই! তবে তোমার অন্ধ বিশ্বাস দেখে ইমপ্রেস না হয়ে পারছি না।”

ডিকে বস থামলেন। মনে মনে ভীষণ প্রফুল্ল হলেন। রহস্যময় কণ্ঠে প্রিয়তাকে চমকে দিতে বললেন—
“আচ্ছা, তোমার প্রণয় ভাইয়ের কথা কিছুক্ষণ এর জন্য না হয় দূরে সরিয়ে রাখি। আসি তোমার পরিবারের কথায়। যে পরিবারকে তুমি নিজের মনে করো—তোমার দেবতুল্য বাবা, চাচা, ভাই-বোন—এদের সম্পর্কে কতটুকু জানো তুমি? এদের স্বরূপটা দেখেছো কখনো? তোমার নিজের পরিবারের ইতিহাস জানো?”
ডিকে বসের ইঙ্গিত বুঝে খানিক চুপ মেরে গেলো প্রিয়তা। কিছুক্ষণের জন্য বিমূঢ় চিন্তায় তলিয়ে গেল সে। সে বেশ ভালই জানে—ডিকে বস ভুল কিছু বলছে না। শিকদার পরিবারের নিকৃষ্টতা সম্পর্কে প্রায় সবাই মোটামুটি জানে।
তাই সবটা সম্পর্কে বিস্তর ধারণা না থাকলেও এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞ নয় প্রিয়তা। সে কিছুটা জানে। তাই শিকদারদের কথা বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু এদের মতো নিচ নয় তার প্রণয় ভাই। গলায় ছুরি ধরলেও এমন কথা বিশ্বাস করবে না প্রিয়তা।
এদের সাথে তার প্রণয় ভাইকে গুলিয়ে ফেলা বা এদের সাথে তুলনা টানলে কিছুতেই সহ্য করবে না প্রিয়তা।
শিকল বাঁধা অবস্থায় তেড়ে যেতে চাইল প্রিয়তা।
তীক্ষ্ণ চোয়াল যুক্ত মুখাবয়ব কঠিন হয়ে এলো মুহূর্তেই।
হাতের মুঠো শক্ত করে হুংকার তুলে বলল—

“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি জানি আমার পরিবার খারাপ। আপনি তাদের সম্পর্কে যা ইচ্ছা বলতে পারেন, যা ইচ্ছা করতে পারেন—এতে আমার কিছুই যায় আসে না। কিন্তু আমার প্রণয় ভাই সম্পর্কে একটাও উল্টোপাল্টা কথা বললে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না। আমার জান এমন নয়।”
ব্যঙ্গাত্মক হাসলেন ডিকে বস। দায়সারা ভাবে পুনরায় চেয়ারে গায়ে এলিয়ে দিয়ে বললেন,
“ছোটখাটো বিষধর কীটগুলো নজরে এল, কিন্তু চোখের সামনে প্রবল মস্ত বিষের নীল সাগরটা নজরে এল না—মূর্খ মেয়ে মানুষ! যার প্রতি এত দরদ, এতো অন্ধবিশ্বাস, তার আসল রূপটা দেখেছো কোনোদিন? না জেনে যে শুধু শুধু তর্ক করছো, দেখলে সহ্য করতে পারবে।”
“কী সহ্য করবো, হ্যাঁ? কী সহ্য করবো? আপনি কী এমন জানেন, যেটা আমি জানি নাহ্?”
“তুমি যেটা জানো না, সেটা হচ্ছে—
Abrar Sikhdar Pronoy is the biggest criminal in the world.
He is a terrorist, a killer, a hacker, a smuggler, a drug dealer, an arms dealer, an organ trafficker, a human trafficker, a women trafficker, a child trafficker…
He is a psychopath and he is a monster.
And at last—he is a human hunter.”

“আর এখন তুমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছো, এই জায়গা আমার না। আমি এই জায়গার খদ্দের মাত্র। এই জায়গার মালিক কে জানো? তোমার স্বামী আবরার শিকদার প্রণয়। এই বিশাল সাম্রাজ্যের মালিক সে। হি ইজ দ্য কিং অব দ্য ডেভিল এম্পায়ার।”
“চুউপ! একদম চুপ করবেন আপনি! মিথ্যে, মিথ্যে, সব মিথ্যে! আর একটাও বাজে কথা বলবেন না আমার প্রণয় ভাই সম্মন্ধে। আপনাকে শেষ করে দেবো আমি, আপনার জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো। আমার দুর্বলতায় আঁচড় কাটার ভুল একদম করবেন না।”
প্রিয়তার লালচে চোখের হিংস্রতা ভয়ানক দেখাচ্ছে।
ক্রোধের আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে তার সমগ্র সত্ত্বা। সে ফের চিৎকার দিয়ে বলে প্রমাণ করতে চায়—
“আমার প্রণয় খারাপ নয়। আমি তাকে চিনি, আমি তাকে খুব ভালোভাবে চিনি। সে এগুলোর কোনো একটাও করতে পারে না। সবটা মিথ্যে বলছেন আপনি। আমার প্রণয় ভাই সম্বন্ধে আমাকে বিষিয়ে দিতে চাচ্ছেন। কী স্বার্থ আপনার?”
ডিকে বসের সরল জবাব—

“প্রতিশোধ নেওয়া। তবে এক বর্ণও মিথ্যে বলছি না আমি। তুমি জানো? তোমার স্বামী কিন্তু ছোট ছোট বাচ্চাদের কচি কচি শরীরগুলো কেটে আলাদা করে, তার নরম দেহাংশ বের করে, তার থেকে দুর্লভ ড্রাগ আর মেডিসিন তৈরি করে। আর এই ড্রাগ আর মেডিসিনের চাহিদা বিশ্ব বাজারে কতটা উগ্র, আর এই ব্যবসায় তোমার স্বামী নম্বর ওয়ানে আছে।”
“নাহহহহহহহ! আমার প্রণয় ভাই বাচ্চাদের সাথে এমন করতে পারে না। এসব মিথ্যে! আপনি এমন কেন করছেন আমার সাথে?”
“উঁহু, তোমার প্রণয় ভাই করেছে। আর একদিন, দুই দিন থেকে নয়—বহু বছর ধরে আসছে। তার হাত দুটো হাজারো শিশুর রক্তে রাঙানো। তোমার প্রণয় ভাই তোমার জন্য আশীর্বাদ হলেও বাহিরের দুনিয়ার জন্য ত্রাস, এক চলমান নিষ্ঠুর অভিশাপ।
তোমার প্রণয় ভাই যে হাতে তোমাকে স্পর্শ করে, ওই একই হাতে সে এই অন্ধকার সাম্রাজ্য শাসন করে।
তোমার প্রণয় ভাই একাই পৃথিবীর ৪০% ব্ল্যাক মানি কাভার করে। যত বেশি বাচ্চা, তত বেশি প্রফিট। আর তুমি বুঝতেই পারছো, এখানে তোমাকে কেনো তুলে আনা হয়েছে।”

শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যাচ্ছে প্রিয়তার। অতিরিক্ত নড়াচড়া করার দরুন আরও বেশি ব্যথা পাচ্ছে। হলহল করে অঙ্গের জ্বালা বাড়ছে ক্রমাগত। কিন্তু তার থেকেও বেশি জ্বলছে লোকটার এসব তিক্ত, বিষাক্ত কথায়।
প্রিয়তার মনে হচ্ছে, তার কানে কেউ গরম লাভা ঢেলে দিচ্ছে। তার কাতর নীলাভ চোখ দুটোর পানি থামছে না। সে জানে এসব মিথ্যে, তবু শুনতে খুব কষ্ট। বুকটা ভরে উঠছে অনীল বেদনায়।
কিন্তু তার প্রণয় ভাই এমন নয়—এর থেকে বড় সত্য কিছু হতে পারে না।
তাই অযথা লোকটার এসব পাগলের প্রলাপ আর শুনবে না বলে ঠিক করল প্রিয়তা। সে ডিকে বসের কথায় পাত্তা দিচ্ছে না।
ডিকে বস বুঝতে পেরে বাঁকা হাসলেন প্রিয়তার পানে তাকিয়ে। আর একটিও শব্দের অপচয় করলেন না। উঠে দাঁড়ালেন বসা থেকে।
মেয়েটা নিজেকে দুর্বল দেখালেও, তার চোখের রক্তিম চাহুনি আর তেজী গর্জন স্পষ্ট প্রমাণ করছে যে, সে আবরার শিকদার প্রণয়ের যোগ্য অর্ধাঙ্গিনী।
ভয় হচ্ছে প্রিয়তার। কণ্ঠনালী শুকাচ্ছে ক্রমাগত, তবে তা নিজের জন্য নয়—নিজের মধ্যে ঘুমন্ত ছোট্ট প্রাণটার জন্য। নিজের ভালোবাসার এক রত্তি সাক্ষরের জন্য।
এদের দিয়ে কোনো বিশ্বাস নেই। প্রিয়তা প্রাণপণে চাচ্ছে নিজের পেটটা আড়াল করতে, কিন্তু দুই হাত লোহার বেষ্টনীতে আবদ্ধ হয়ে মৃত্তিকার সঙ্গে লেগে থাকায়, তার ছোট্ট সোনাটাকে এই পশুর দৃষ্টি থেকে আড়াল করতে ব্যর্থ হচ্ছে প্রিয়তা।
তার খুব করে মনে পড়ছে প্রণয়ের সেই কথাটা—

“আমি ছাড়া, আমার এই উষ্ণ বুকের আলিঙ্গন ছাড়া, পৃথিবীর কোথাও এতটা সুরক্ষিত থাকবি নাহ্। এতো সুখের নিদ্রা তোর আসবে নাহ্।”
প্রণয়ের কথা মনে পড়তেই ডুকরে উঠলো প্রিয়তা।
তার অবুঝ মন খুব করে চাইলো, তার প্রণয় ভাই আসুক—নিয়ে যাক তাকে এই জাহান্নাম থেকে।
প্রিয়তার ঠোঁট কাঁপে। ভিজে উঠে চোখের ভারী পল্লবগুলো। পলক ঝাঁপটাতেই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে নুনা পানি। সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায় নিজের পেটের দিকে। ক্রন্দনরত কণ্ঠে খুব ধীরে বলে—
“আমার বাচ্চা, তুমি দেখছো? মাম্মা কত অসহায়! আমাদের জন্য তোমার পাপা ছাড়া স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার মতো আর কোনো জায়গা নেই, সোনা। তোমার পাপা তো জানেও না তুমি আসছো।
কতটা অভাগা আমি—তোমার পাপাকে জানাতেও পারলাম নাহ্ তোমার কথা। এখন একা একা… মাম্মা কি তোমাকে সেফ করতে পারবো?
আমার বাচ্চা, তুমি কিন্তু মায়ের জান। মা তোমাকে খুব, খুব, খুব ভালোবাসে।”
প্রিয়তার নিজেকে এত অসহায় লাগলো। চোখ বন্ধ করে ফুঁপিয়ে উঠলো প্রিয়তা। খবরটা জানা মাত্রই তো সে ছুটেছিল প্রণয়ের কাছে, তাদের অনাগত সন্তানের কথা জানাতে—কিন্তু দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি, তার সাথে এমন হবে।
ভাবনার মধ্যেই হঠাৎ কারো বিকট চিৎকার শুনে ধড়ফড়িয়ে চোখ মেললো প্রিয়তা। সাথে সাথেই নীল চোখের কুচকুচে মণি দুটোতে স্ক্রিনের তির্যক আলো ছুটে এসে প্রতিফলিত হলো।
পলক ঝাপটানোর পূর্বেই পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে গেল প্রিয়তার। শরীরের সকল স্নায়ু অসাড় হয়ে গেলো এক মুহূর্তে। শরীরের সকল বল হারিয়ে ফেললো প্রিয়তা। চোখের পলক ফেলতে ভুলে গেলো। হাড়ের জোড়ায় জোড়ায় ছেয়ে গেল অবসন্নতা।

দৃষ্টি প্রসারিত হলো প্রিয়তার। চোখ আটকে রইলো সামনের বিস্তৃত LED স্ক্রিনের দিকে, যেখানে একটি বীভৎস সহিংসতার ভিডিও ফুটেজ চলছে।
প্রিয়তার অবিশ্বাসী দৃষ্টি ছেয়ে আছে বিস্ময়ে। সে চেয়ে চেয়ে দেখছে, তার চিরচেনা মানুষটা কীভাবে তার চোখের সামনে অচেনা পিশাচে পরিবর্তিত হচ্ছে। তার সেই চিরচেনা চোখের রঙ কীভাবে পাল্টাচ্ছে!
যে চোখে ধূসর, সাদা, কালো পৃথিবীকে রঙিন দেখতো প্রিয়তা—সেই চোখই রঙহীন।
প্রিয়তার চোখের সামনে ভেসে ওঠা প্রত্যেকটা দৃশ্য যেন তার হৃদয়ে বিষাক্ত তীরের মতো আঘাত আনছে।
যে কণ্ঠ তার সাথে কখনো উচ্চস্বরে কথা বলেনি, সেই কণ্ঠে আজ দানবীয় হুংকার।
প্রিয়তার বিশ্বাসের আকাশটা চোখের সামনে তাদের ঘরের মতো ভেঙে ধুলোয় মিশে গেলো।
তবুও এত কিছুর পরেও চোখের সামনে দেখা চিত্রগুলোকে মস্তিষ্ক আর হৃদয় বিশ্বাস করতে অস্বীকৃতি জানায়।
এই সত্যটা মেনে নেওয়ার চেয়ে মরে যাওয়া প্রিয়তার জন্য বেশি সহজ।
কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই চোখ বন্ধ করে চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠে প্রিয়তা। তীব্র অনুনয় করে বলে—
“প্লিজ, প্লিজ, ওটা বন্ধ করুন! আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমি আর দেখতে পারছি নাহ্। আমার প্রণয় ভাই এমন কিছুই করতে পারে না। সব মিথ্যে, সব, সব, সব! নাহ্!”

তুমুল কান্নায় ভেঙে পড়ে প্রিয়তা। নিজের শরীরের উপর থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে শুরু করে। তার মনে হচ্ছে, সে হয়তো জ্ঞান হারাচ্ছে—কিন্তু এই মুহূর্তে কিছুতেই জ্ঞান হারাতে পারবে নাহ্ প্রিয়তা।
সত্য আর মস্তিষ্কের দোলাচলে পিষ্ট হতে থাকে তার আসক্ত মন। সে কিছুতেই এসব মানতে পারে না। কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ে। শরীরের যন্ত্রণা থেকে মনের যন্ত্রণা ভারী হয় কয়েকগুণ।
নীল চোখে নীল সমুদ্রের জোয়ার নামে।
প্রিয়তার অবস্থা দেখে ডিকে বসের কলিজায় বরফ পড়ে।
আহ্, এতো শান্তি।
তিনি আবারো সামনে এসে বসেন, ওষ্ঠকোণে বক্র হাসি ঝুলিয়ে শীতল কণ্ঠে নতুন তথ্য বললেন—
“উপসস! বলতে ভুলে গেছি—বিশ্বের কুখ্যাত অপরাধী টেরোরিস্ট ASR আর কেউ নয়, তোমার প্রণয় ভাই। প্রমাণ চাই? যদি বিশ্বাস না করো, প্রমাণ দিই।”
প্রিয়তা জবাব দেবে কী, সে তো কথা বলার অবস্থাতেই নেই।
তবে ডিকে বস প্রত্যুত্তরের আশায় বসে রইলেন না।
চোখের ইশারা দিতেই গার্ডরা টেনেহিঁচড়ে নিয়ে আসে সেই মেয়েটাকে। মেয়েটা প্রিয়তার এই অবস্থা দেখে অবাক হয়, সাথে মায়া ও লাগে, কিন্তু বুঝতে পারে না এখানে কী হচ্ছে। DK বস চেয়ারে গা এলিয়ে দেন। চোখের ইশারায় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বলেন—

“একে চেনো?”
মেয়েটা ইশারা অনুসরণ করে পেছন দিকে তাকায়।
স্ক্রিনের দিকে চোখ পড়তেই পিলে চমকে উঠে মেয়েটা কুঁকড়ে যায় আতংকে। স্বাভাবিক থেকে কাঁপতে শুরু করে থরথর করে; তার গাল-গলা বেয়ে দরদর করে ঝরনা ছুটে ঘামের। DK ধমকে উঠলেন—
“বলো! চেনো এই লোকটা কে? না বললে জানো তো, তোমার সাথে কী হবে?”
মেয়েটা ঝড়ের বেগে মুখ খুলে, মৃগী রোগীর মতো কাঁপতে কাঁপতে বলে—
“ASR!”
“নাহ্হহহহহ!” তৎক্ষণাৎ চিৎকার দিয়ে উঠে প্রিয়তা।

মেয়েটা চমকায়, কিছু বুঝতে পারে না। DK বস হাসেন। গার্ডদের ইশারা করতেই তারা নিয়ে চলে যায় মেয়েটাকে।
প্রিয়তার নিজেকে মানসিক রোগী মনে হয়। মস্তিষ্ক ফাঁকা ফাঁকা লাগে। যখনই তার বিশ্বাসের পাহাড় গুঁড়িয়ে যেতে চায়, তখনই ভালোবাসার পাহাড়ের বিশালতা রুখে দাঁড়ায়। মন মানতে রাজি হয় না। ওই মানুষটা এমন? প্রিয়তা তো সেই ছোট্ট কাল থেকে দেখছে ওই মানুষটাকে। তাহলে কিভাবে ওই মানুষটা ওমন হতে পারে?
কীভাবে বিশ্বাস করবে প্রিয়তা? ওই মানুষটাকে যে সে খুব ভালোবাসে। ওই মানুষটাকে অবিশ্বাস করার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়, তাহলে এখন বিশ্বাসই বা কীভাবে করবে?

প্রিয়তার বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে মনে মনে চরম তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন DK বস। তিনি তো এটাই চেয়েছিলেন। যাতে এক বুলেটে না মরে যায়; এদের দুটোকে এত সহজে তিনি মারবেন না, আবার বাঁচতেও দেবেন না। তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে দিতে পারবেন—প্রতিদিন একটু একটু করে মারবেন। এক সময় অতিষ্ঠ হয়ে এরা নিজেরাই তার পায়ে মৃত্যু ভিক্ষা চাইবে। তখন এদেরকে আরাম করে মারবেন, তার আগে মারবেন না।
প্রিয়তার দোলাচল দেখে আবারো চোখের ইশারা করলেন DK বস। প্রিয়তার শেষ আশা গুঁড়িয়ে দিতে আবারো স্ক্রিন জ্বলে উঠলো। চেনা দুটো কণ্ঠ কানে যেতেই ঝট করে দৃষ্টি তুলে তাকালো প্রিয়তা। যেখানে স্পষ্ট প্রণয় আর প্রহেলিকাকে দেখা যাচ্ছে। তাদের কথা ও শোনা যাচ্ছে।
প্রিয়তার চট করে মনে পড়ে গেল প্রহেলিকার সেই কথাগুলো। নিঃশ্বাসটুকু যেন এবার কণ্ঠনালীতেই রোধ হলো প্রিয়তার। তার মনে হলো, প্রহেলিকা তখন প্রণয়ের কথাই বলেছিল? আর সে সেটা বুঝতেই পারেনি—কতটা বোকা সে!
এতো কিছু জানার পর প্রিয়তার মনটা ঘৃণায় বিষিয়ে যাওয়া উচিত ছিলো, কিন্তু কী আশ্চর্য—তার মনে ঘৃণা আসছে নাহ্।

রাগে-ক্ষোভে শব্দ করে কেঁদে উঠলো প্রিয়তা। নড়েচড়ে উঠতেই হতচকিত হলো। ভয়ার্ত চোখে তাকালো নিচের ডিকে। সে হাতসহ পুরো শরীরের সব কিছু ফিল করতে পারছে, কিন্তু নিজের পা দুটোই ফিল করতে পারছে না। যেনো পা দুটো কেটে নিলেও কিছুই বুঝতে পারবে না প্রিয়তা—কোনো সেনসেশন নেই।
সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে ভয়ার্ত কন্ঠে সুধালো—
“আাামি আমি পা নাড়াতে পারছি না কেনো!”
“সিম্পল। হাঁটুতে লোকাল অ্যানেস্থেশিয়া পুশ করা হয়েছে।”
“ক-ক-কেনো?”
অস্বাভাবিক হারে বুক ঢিপ ঢিপ করতে শুরু করে প্রিয়তার।
প্রশ্ন শুনে পৈশাচিক হাসলেন DK বস। তার ওই নারকীয় হাসির মানে বুঝতে পারলো না প্রিয়তা, কিন্তু তার কলিজাটা মুচড়ে উঠলো অজানা আশঙ্কায়।
প্রিয়তাকে আতঙ্কিত হয়ে পড়তে দেখে DK বস প্রিয়তার একদম মুখের কাছে চলে এলেন। হিম শীতল কন্ঠে শুধালেন

“ভয় করছে?”
শিরদাঁড়া বেয়ে এক শীতল স্রোত নেমে গেল প্রিয়তার। গলা শুকিয়ে এলো প্রচণ্ড তৃষ্ণায়। সে কাঁপা কণ্ঠে জানতে চাইলো—
“ক-ক-কী চান আপনি?”
“আবরার সিকাদ্দার প্রণয় আমার সাম্রাজ্যের বিপরীতে যে সাম্রাজ্য শুরু করেছে, সেই সাম্রাজ্যের আর কোনো উত্তরাধিকারী দেখতে চাই না।”
“মা-ম-মানেএ?”
প্রিয়তার গলা কাঁপে।
ডিকে বস এক পৈশাচিক হাসি দেন। প্রিয়তার তলপেটে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলেন—
“আবরার শিকদার প্রণয় যে বীজ পুতেছে, সেটা অঙ্কুরিত হওয়ার আগেই শিকড়সহ উপড়ে ফেলতে চাই।”
প্রিয়তার মুখের রক্ত উড়ে যায়।
ডিকে বস ফের বলেন—

“তোমার গর্ভের দুই মাসের ভ্রূণটা খুলে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলতে চাই। তোমাদের না-রাজ রক্ত বংশের অনেক অহংকার, গৌরব। সেই অহংকারকে পায়ের তলে পিষে ফেলতে চাই, ধুলোয় মিশিয়ে দিতে চাই। আমার পালতু বাঘের বাচ্চাকে আমার বিপরীতে গর্জন করার উপযুক্ত শিক্ষা দিতে চাই। সর্বোপরি, আমার সন্তানকে ছিনিয়ে নেওয়ার মোক্ষম প্রতিশোধ নিতে চাই। আবরার সিকাদার প্রণয়কে হাড়ে মজ্জায় বোঝাতে চাই—সন্তান হারানোর যন্ত্রণা কতটা। তোমার গর্ভের ওই দুই মাসের ভ্রূণটাই হবে আবরার সিকাদার প্রণয়কে ধ্বংস করার মূল মন্ত্র।”
“নিজের রক্তকে যখন পলিথিনে মুড়িয়ে নোংরা ড্রেনে ছুঁড়ে ফেলবো, তখন বুঝবে এই ডিকের সঙ্গে পাঙ্গা নিলে কী হয়।”

ডিকে বসের নিষ্ঠুর বর্ণনা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলো প্রিয়তা। শিউরে উঠলো তার সমস্ত শরীর। কী বলেছে বুঝতেই আর্তনাদ করে উঠলো। বাচ্চাদের মতো বিলাপ করতে করতে বললো—
“নাহ্, নাহ্, নাহ্, নাহ্! দয়া করে এমনটা করবেন না। দয়া করে আমার বাচ্চাকে আঘাত করবেন না। আমার নিষ্পাপ বাচ্চাটার কোনো ক্ষতি করবেন না। ও তো এখনো দুনিয়াতেই আসেনি, ওর অস্তিত্বের বিকাশ তো এখনো ঠিকমত হয়নি। ওর কার কী ক্ষতি করতে পারে বলুন—আমার অবুঝ বাচ্চা কারো শত্রু হতে পারে না, কারো ধ্বংসের অস্ত্র হতে পারে না। আমার বাচ্চাটাকে ছেড়ে দিন, আমি ওকে ছাড়া বাঁচবো না।”
“সেটাই তো চাই।”
প্রিয়তা কাঁদতে কাঁদতে DK বসের পা জড়িয়ে ধরতে চায়, কিন্তু হাত আটকানোর দরুন পারে না। সে ছটফট করতে করতে বিলাপ করতে থাকে।

“দেখুন, দেখুন—আমি আপনার অপরাধী, আপনার ছেলের হত্যাকারী আপনার সামনেই আছি। আপনি আমায় মেরে ফেলুন, আমি বাঁচতে চাই না। কিন্তু আমার বাচ্চাকে মারবেন না। আমি ওকে দুনিয়া দেখাতে চাই। আমি অপরাধী, আমার বাচ্চা তো না। আমি পাপ করেছি, আমার বাচ্চা তো করেনি। আপনি আমার সাথে যা ইচ্ছে করুন, কিন্তু আমার সন্তানকে কিছু করবেন না। ও আমার ভালোবাসার চিহ্ন। ওর বাবা এখনো ওর কথা জানে না। আমার প্রণয় ভাই এখনো জানে না সে বাবা হতে চলেছে। প্লিজ, আমাদের বাচ্চার ক্ষতি করবেন না—ও নির্দোষ।”
DK বস তাচ্ছিল্য হাসলেন। বিদ্রুপ করে বললেন—
“কার সন্তানকে বাঁচাতে চাচ্ছো তুমি? যার জন্য হাজারটা মায়ের কোল শূন্য হয়েছে, তার কালো হাতে তুমি তার রক্তের আরেকটা পশুকে তুলে দিতে চাচ্ছো? একটা বিষবৃক্ষ থেকে আরেকটা বিষবৃক্ষের চারাকে দুনিয়ায় আনতে চাচ্ছো? তোমার পেটে ওটা আবরার শিকদার প্রণয়ের সন্তান—ওকে আমি ছাড়বো না।”
নিজের স্বামী-সন্তান সম্পর্কে এমন কটু বাক্য শুনে ক্ষিপ্ত হলো প্রিয়তা। ব্যগ্র কণ্ঠে বললো—

“আমার স্বামী-সন্তানকে নিয়ে একটা ও বাজে কথা বলবেন না।”
“যদি বলি, তুমি কি কিছু করতে পারবে? নিজের অবস্থা দেখেছো?”
থমকে গেল প্রিয়তা। নিজের শোচনীয় অবস্থা দেখে ভয়ে সিঁটিয়ে গেল। মন আর শরীরের ব্যথায় সে আর পেরে উঠছে না। তার কণ্ঠ খানিক নরম হলো। কণ্ঠে অজস্র কাতরতা মিশিয়ে মিনতি করলো—
“আমাদেরকে মেরে ফেলুন, কিন্তু ওকে বাঁচতে দিন। ও তো নিষ্পাপ, ওকে একটু দয়া করুন। আমরা না থাকি, ও আমাদের ভালোবাসার উত্তরাধিকারী হয়ে থাকুক। ওকে কিছু করবেন না।”
“ওটাই তো আসল অপরাধ। ওর কণ্ঠের ধমনীতে প্রবাহিত হচ্ছে আবরার সিকদার প্রণয়ের রক্ত—সেই বিশ্বাসঘাতকের রক্ত, যে ৯টা বছর আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, আমার দুই সন্তানকে শেষ করেছে। ওর শরীরে আবরার শিকদার প্রণয়ের DNA আছে। তাই ওর বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই।”

গলা কাটা মুরগির মতো ছটফট করছে প্রিয়তা। সে কিছুতেই এই সন্তানকে মারতে দেবে না। এই সন্তানকে সে পৃথিবীর আলো দেখাবে। ক্রমাগত অনুনয়-বিনয় করতে করতে প্রিয়তা হঠাৎ লক্ষ করলো তার পা দুটো অটোমেটিক্যালি দুই দিকে ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। প্রিয়তা আর্তনাদ করে চিল্লিয়ে ওঠে। সে পা দুটো জুড়ে একত্র করতে চাচ্ছে, কিন্তু অবশ হয়ে থাকা পা দুটোর উপস্থিতি অনুভব করতে পারছে না, যেন পা দুটো তার শরীরের অংশই নয়।
প্রিয়তার কলিজাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। একজন মা চোখের সামনে তার গর্ভের সন্তান চিরতরে হারাতে চলেছে।
প্রিয়তা অসহায় হয়ে বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। অভ্যাস বসত চিৎকার দিয়ে ডাকলো—
“প্রণয় ভাই!”

কিন্তু তার কণ্ঠের সেই করুণ আর্তনাদ যেন আর শব্দ হয়ে ফুটছে নাহ্।
প্রিয়তা অনুভব করলো তার হাতের বাঁধন আরও রূঢ় হচ্ছে। টর্চার রুমের সেই নিগূঢ় নিস্তব্ধতা ভেঙে বিকট যান্ত্রিক শব্দে সচল হয়ে উঠলো দানবীয় নিষ্ঠুর সেই মেশিনটি। প্রিয়তা ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে দেখলো সেই স্টিলের হাতগুলো যেন জ্যামিতিক নকশা মেপে এগিয়ে আসছে তার দিকে। প্রিয়তার বুকের ভেতর ধক করে ওঠে হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই। মরে যেতে মন চায়। চোখের পলকেই মেশিনের সামনে থাকা লেজার রশ্মি প্রিয়তার তলপেট স্ক্যান করে নিলো।
চেয়ার নিয়ে অন্য দিকে ঘুরে গেলেন DK বস। ঠোঁটে লেগে তার সন্তুষ্টির হাসি। আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত। তারপর…আবারো অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন ডিকে বস।
তার হাসির বিকট শব্দগুলো ধাতব দেওয়ালে বাড়ি খেয়ে প্রিয়তার কর্নে পৌঁছায়।
প্রিয়তার ভয়ে কাঁপছে সর্ব অঙ্গ। সে সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে পা সংকুচিত করতে চায় কিন্তু হয় না তার পায়ের উপর কোনো জোর নেই। সেই স্টিলের হাত পা দুটো আড়াআড়ি ভাবে আরও মেলে ধরে। তৎক্ষণাৎ একটা স্পিকুলার যন্ত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রিয়তার যোনি পথের গভীরে প্রবেশ করে। প্রিয়তা অনুভব করে এই বিক্ষিপ্ত তীব্র প্রসারণ, যা প্রিয়তার যোনি পথের নরম মাংসকে টেনে মেলে ধরতে চায়। যন্ত্রণায় গলা ফাটিয়ে কেঁদে ওঠে প্রিয়তা। তার করুন কান্নার ধ্বনিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। যান্ত্রিক সেন্সরগুলো প্রিয়তার যোনি মুখকে মেলে ধরার চেষ্টা করে যাতে উম্মুক্ত থাকে।

প্রিয়তা শরীরের পীড়ার থেকে মনের পীড়া অনুভব করে বহুগুণ। ফুঁপিয়ে বলার চেষ্টা করে—
“মাকে কোনোদিন ও ক্ষমা করো না জান বাচ্চা, মা খুব দূর্বল তোমাকে রক্ষা করতে অক্ষম হয়েছে।কিন্তু মাকে একা ফেলে ও চলে যেয়ো নাহ্ সাথে নিয়ে যাও”
প্রিয়তার অসহায় দুই নেত্রে ভারী বর্ষণ নামে।
হঠাৎ অনুভব করে নরম কিছু। নিচের দিকে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে রক্ত হিম হয়ে যায়।
একটি স্বচ্ছ নমনীয় প্লাস্টিকের নালি প্রিয়তার জরায়ু মুখ দিয়ে গভীর থেকে গভীরে তরতর করে সেঁধিয়ে যাচ্ছে। ব্যথায় চিৎকার দিয়ে উঠলো প্রিয়তা। তার চিৎকার কাঁপিয়ে দিলো ধাতব দেওয়াল গুলো সেই ক্যানুলাটা জরায়ু দেওয়াল ভেদ করে মুহূর্তেই প্রিয়তার গর্ভাশয়ে পৌঁছে গেল। যেখানে ৮ সপ্তাহের রক্ত-মাংসের সেই ছোট্ট প্রাণটা তখনো কেবল একটি ছোট্ট প্রাণের স্পন্দন হয়ে মায়ের উষ্ণতায় মমতায় একটু একটু করে বিকশিত হচ্ছিল। সে যেন আঁচই করতে পারলো না তার জীবন শুরু হওয়ার পূর্বেই মৃত্যু নামক তিরস্কার তার কপালে জুটতে চলেছে। অসহ্য যন্ত্রণায় প্রিয়তার দম বন্ধ হয়ে আসছে। দাঁতের চেপে ঠোট কেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে।
প্রিয়তা মৃত্যু কামনা করতে শুরু করেছে নিজের।
মেশিনের কন্ট্রোল প্যানেলে DK বস লাস্ট ইনস্ট্রাকশন দিতে নিলেই কিছুটা দূর থেকে ভেসে আসা সশব্দ গর্জনে ঘরের প্রতিটি ধাতব দেওয়াল ঝংকার তুলে কেঁপে উঠলো—

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৮৮

“Stop! I said stop!”
প্রিয়তা নিভু নিভু ঝাপসা চোখে তাকালো সেই শব্দের উৎসে। চিরচেনা পুরুষালী অবয়ব দৃষ্টিগুচর হতেই ঝড় ওঠে প্রিয়তার সমগ্র কায়া জুড়ে। ফ্যাকাসে ঠোঁটের কোন ফুটে উঠে ম্লান হাসি।

ভালোবাসার সীমানা পেরিয়ে পর্ব ৯০

4 COMMENTS

Comments are closed.