Home হৃদয় রাঙানো প্রেম হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২৬

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২৬

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২৬
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

সৃষ্টিকর্তার বিধান অনুযায়ী সদ্য বিবাহ নামক পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে এক করা কপোত কপোতী। বাড়িময় বিরাজ করছে এক নয়া সুখ। সকলের মুখে দেখা যাচ্ছে অমায়িক হাসি। সহসা সেই হাসির বিলুপ্তি হয়ে আগমন ঘটলো এক অদ্ভুত শঙ্কার! ড্রয়িং রুমে কৃশানের উচ্চ কণ্ঠের শব্দে সকলে ছুটে এলেন সেথায়। চোখের সামনে আবিষ্কার করলেন এক ভয়াবহ চিত্র। পাত্র পক্ষের ছোট ভাইকে ফ্লোরে ফেলে এলোপাতাড়ি মেরে যাচ্ছে পাত্রীর বড়ো ভাই। তাও আবার বিয়ের দিন। ব্যপারটা উপস্থিত সকলকে এতটাই আশ্চর্য করল যে জায়গা থেকে নড়তে ভুলে বসলেন তারা।
নিজেকে ঘেরাও করে থাকা লোকজনের দিক বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই কৃশানের। ছেলেটার চোখ মুখ অস্বাভাবিক লাল। রাগের মাথায় মুখ- হাত ফুরসতহীন চলতেই আছে তার,

“ তোর সাহস কি করে হয় আমার জিনিসে নজর দেয়ার? ঐদিন বলেছিলাম না তোকে ওঁর থেকে দূরে থাকবি! বলেছিলাম কিনা বল! ”
নাক মুখ দিয়ে র*ক্ত বেরোতে থাকা আজাদের পক্ষ থেকে কোনো উত্তর আসলো না। ছেলেটার জান যায় যায় অবস্থা। কি থেকে কি ঘটে গেল এখনো মাথাতেই কেচ করছে না। কৃশানের কণ্ঠে তখন পিছন ফিরতে না ফিরতেই তার শক্ত হাতের অক্রমনে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। এরপর থেকে আর কোনো থামাথামি নেই একের পর এক আঘাত পেয়েই যাচ্ছে। কখনো এমন ঘটনার মুখোমুখি না হওয়ায় নিজেকে বাঁচাতেও সক্ষম হচ্ছে না। অকস্মাৎ কলার টেনে তাকে দাঁড় করালো কঠোর মানব। ওভাবেই সামনে এগোতে এগোতে বলল,
“ আজ তোর চোখ তুলে নেব আমি। যেই চোখ আমার স্ত্রীকে দেখার সাহস করে সেই চোখ দিয়ে দুনিয়া দেখার অধিকার নেই তোর! ”

“ এসব কি হচ্ছে জলিল সাহেব! আপনার ছেলের সাহস কি করে হয় আমার ছেলের সাথে এমন আচরন করার! ”
এতক্ষনে মুখ খুললেন উমরের বাবা উসমান মোল্লা। তিনি ধুপধাপ পা ফেলে এগিয়ে এলেন কৃশানের দিক। এক ধাবায় ছেলেকে ছাড়িয়ে নিলেন। কৃশানের উদ্দেশ্যে হুংকার ছুঁড়লেন,
“ তোমার সাহস কি করে হয় আমার ছেলের গায়ে হাত তোলার! ”
“ শুধু হাত তুলা কেন আপনার ছেলের মতো হাজারটাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলার সাহসও আমার আছে। ”
বলেই আবারও আজাদকে ধরতে গেল সে। এবার এসে তাকে থামিয়ে দিলেন জলিল মির্জা। কোনোরূপ কথা ছাড়াই শক্ত হাতে একটা চড় বসিয়ে দিলেন ছেলের গালে। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল চারিপাশ। সরবতার পর্ব চুকে গিয়ে শুরু হলো এক অদ্ভুত নীরবতা।
ইকরা ও হুমায়রা ব্যতিত সকলেই ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হয়ে গেছে ততক্ষণে। সামনের দৃশ্যে রীতিমত হা হয়ে গেছে সকলে। সবগুলো ভয়ার্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়ে রইল বাপ- ছেলের পানে।
রান্নাঘর থেকে চড়ের শব্দ কর্ণপাত হতেই কেঁপে উঠল হুমায়রা। চড়টা কার গালে পড়েছে বুঝতে বেগ পোহাতে হলো না। আশঙ্কায় জর্জরিত ছোট্ট দেহখানা এবার গলা কাটা মুরগির ন্যায় ছটফট করতে লাগল। মেয়েটা না পারছে বাইরে যেতে আর না পারছে ভিতরে থাকতে। সবকিছু মিলিয়ে অসহ্য চিন্তায় মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম।

থমথমে পরিবেশ, জলিল মির্জা রাগে ফুঁসছেন। ভদ্রলোক লজ্জায় বর পক্ষের দিক তাকাতেও পারছেন না ঠিকমতো। এমন একটা দিনেও তার ছেলে মারপিট করেছে তাও আবার ছেলের ছোট ভাইকে মেরেছে- কথাটা ভাবতেই নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন তিনি। ছেলের উদ্দেশ্যে রাগী স্বরে হুঙ্কার ছুঁড়লেন,
“ এতোটা অমানুষ কবে হলে তুমি! অমানুষও তো এমন কাজ করে না। কিসের জন্য তুমি হাত তুলেছো আজাদের গায়ে? ”
উত্তরে ভেসে আসলো একটা নির্লিপ্ত স্বর,
“ না জেনে কথা বলবেন না। ও মার খাওয়ার কাজ করেছে বলেই মেরেছি। ”
“ কি এমন করেছে আমার ছেলে? ”
উসমান মোল্লার প্রশ্নের পৃষ্ঠে তার দিক ঘুরে তাকাল কৃশান। বলল,
“ কি করেছে তা আপনার ছেলেকেই জিজ্ঞেস করুন। ”
“ আমার ছেলেকে কেন জিজ্ঞেস করবো? তুমিই বলো। ”
কোনোরূপ উত্তর করলো না কৃশান। তাকে চুপ থাকতে দেখে আরও রেগে গেলেন জলিল মির্জা। ঘটনা সামলাতে এগিয়ে এলেন খলিল মির্জা। শান্ত স্বরে বললেন,
” কৃশান কি হয়েছে সেটা বলো। কি করেছে আজাদ? ”
“ আমার স্ত্রীর দিকে নজর দিয়েছে ও। ”
ছোট খাটো একটা বিস্ফোরণ ঘটল মির্জা বাড়ির আলিশান ড্রয়িং রুমটায়। রাগে গজগজ করতে থাকা জলিল মির্জা এবেলায় এসে দমে গেলেন। পাত্র পক্ষের সকলেও চুপ মেরে রইলেন কিয়ৎক্ষণ। তবে কৃশানের কথাটা বিশ্বাস করতে পারলেন না উসমান মোল্লা। তিনি তার ছেলেকে খুব ভালো করে চিনেন। তার ছেলে কখনোই এ কাজ করতে পারেন না। তিনি প্রখর বিরোধিতা করে বললেন,

“আমার ছেলে কখনই এমন করতে পারে না। এমন ও তো হতে পারে তোমার স্ত্রী……”
“ আমার স্ত্রীর নাম উচ্চারণ করলে জিহ্বা ছিঁড়ে ফেলবো একদম।”
ভদ্রলোক কথা সম্পূর্ণ করার সুযোগ পেলেন না। পথিমধ্যেই কৃশানের ভয়ানক কণ্ঠে জবান বন্ধ হয়ে গেল তার। কণ্ঠটায় কি ছিল জানা নেই তবে অদ্ভুত ত্রাসে শরীরের পশম সুদ্ধ যেন দাঁড়িয়ে গেল উপস্থিত সকলের।
“ তুমি কিন্তু এবার বাড়াবাড়ি করছো। আমার বাবার সাথে এভাবে কথা বলার অধিকার তোমার নেই। ”
এতক্ষনে মুখ খুলল উমর। সকলের উৎসুক দৃষ্টি এবার নিক্ষিপ্ত হলো তার উপর। কৃশান ও তাকাল সেদিকে। পাল্টা জবাব দিল,
“ আমার স্ত্রীকে নিয়ে কথা বলার অধিকারও কারো নেই। ”
“ তোমার স্ত্রী যেহেতু বিষয়টা তে জড়িয়ে আছে সুতরাং…”
“ আমার স্ত্রী এতটাই পবিত্র যে তার পবিত্রতার কাছে তোর ভাইয়ের কুদৃষ্টি বারবার হেরে গেছে। আমার পবিত্র ফুলের সাথে কোনো অপবিত্রতা জড়িয়ে নেই। ওঁর নাম আরেকবার নিবি তো সব কটাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবো।
একটু থেমে বলল,

“ আগে নিজের ভাইকে যাচাই কর। ”
কৃশানের এমন তুই তুকারি তে ভরকে গেলো পাত্র পক্ষ। এমন বখাটে ছেলে আজ অব্দি দেখেন নি তারা। বড়দের সাথে কেউ এভাবে কথা বলে! এইদিকে মির্জা বাড়ির সকলেই নীরব দর্শক হয়ে আছেন। তারা ছেলের এমন আচরণে মোটেও অবাক হচ্ছেন না। যেখানে শুধু শুধুই তাদের ছেলে সবাইকে তুই তুকারি করে সেখানে এতকিছুর পরেও সম্মানিত শব্দ!
উমর সর্বদাই শান্ত স্বভাবের। তাকে সহজে রাগতে দেখা যায় না। নিজের শান্ত স্বভাবের মাধ্যমেই বেশ জটিল পরিবেশও সামলে নিতে পারে সে। আজকেও তার ব্যাতিক্রম হলো না। কৃশান যতোটাই উগ্র তাকে ততটাই শান্ত দেখা গেলো। সহসা নিজের ছোট ভাইয়ের দিক এগিয়ে এলো উমর। সামনে এসে শান্ত কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
” তুমি কি তার স্ত্রীর দিক নজর দিয়েছিলে? ”
“ …….. ”
“ জবাব দাও আজাদ! ”
ভাইয়ের শক্ত কণ্ঠে ও কৃশানের শক্ত চাহনিতে চুপ থাকতে সক্ষম হলো না আজাদ। ব্যাথাতুর মুখ দিয়েই বের করল সত্যটা,

“ জ্বি, আসলে তাকে খুব দেখার ইচ্ছা ছিল আমার তাই দেখতে চেয়েছিলাম। তবে কুদৃষ্টিতে নয়। ”
“ সে অন্য এক জনের স্ত্রী হওয়া সত্বেও তাকে দেখতে চাওয়া কি তোমার কুদৃষ্টি বলে মনে হয়না! ”
উত্তর দেয়ার মতো শব্দ খুঁজে পেল না ছেলেটা। অগ্যতা মাথা নুইয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। দীর্ঘশ্বাস ফেলল উমর।
“ আমার ছেলের ভুলের জন্য আমি ক্ষমা চাইছি। ”
উসমান মির্জার অনুতপ্ত কণ্ঠের পরিপ্রেক্ষিতে জলিল মির্জা কিছু বলতে নিবেন এর আগেই ভদ্রলোক নিজের দুই ছেলের হাত ধরে বাকি আত্মীয়দের উদ্দেশ্যে করে বলে উঠলেন,
“ চলো। ”
ভ্রু কুঁচকে গেল উপস্থিত সকলের। খলিল মির্জা বললেন,
“ কোথায় যাচ্ছেন আপনারা? এখনও তো খাবারই খাননি? ”
“ ক্ষমা করবেন, এ বাড়ির মেয়েকে বউ হিসেবে মানা আমার পক্ষে অসম্ভব। যে বাড়ির ছেলে এমন অভদ্র সে বাড়ির মেয়ে আর কেমনই বা হতে পারে। ”

উসমান মোল্লার কথায় রেগে গেলেন মির্জা বাড়ির সকলে। কিছু বলতে নিবেন এর আগেই নিজের বাবাকে থামিয়ে দিল উমর। বাবার থেকে হাত ছাড়িয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“ সে এখন শুধু এ বাড়ির মেয়ে নয়। আমার স্ত্রী হন তিনি। সুতরাং তাকে না নিয়ে কোথাও যেতে পারবো না আমি। ”
মুহূর্তেই পাল্টে গেল পরিবেশ। তব্দা খেয়ে ফেলেন উপস্থিত সবাই। বাদ পড়েনি কৃশানও। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে উমরের পানে তাকিয়ে রইল সে। এইদিকে ছেলের কথায় রেগে গেলেন উসমান মোল্লা। বললেন,
“ এইগুলো কি বলছো তুমি? এতকিছুর পরেও এ বাড়ির মেয়েকে নিজের স্ত্রী বলছো! ”
” কিছুক্ষণ আগেই তার সাথে আমার বিবাহ হয়েছে সুতরাং না বলার কোনো কারণ নেই। আপনি নিজেকে শান্ত করুন আব্বাজান। ভুল কিন্তু….”

“ ভুল যেই করুক না কেন! আচরন বিধি বলে একটা কথা আছে। যে বাড়ির ছেলে এমন অসভ্য আচরন করে সে বাড়ির মেয়েকি ভালো হবে নাকি! ”
“ একই কথা যদি আমরা বলি- যে বাড়ির ছোট ছেলে এমন সে বাড়ির বড় ছেলে ভালো হবে নাকি? ”
কৃশানের কথায় তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন ভদ্র লোক। ফুঁসে উঠে বললেন,
“ দেখলি, দেখলি! এরপরেও যদি তুই এখানে থাকতে চাস তো থাক। আমি চলে যাচ্ছি। ”
বলেই আজাদকে নিয়ে হাঁটা ধরলেন তিনি। সাথে বর পক্ষের বাকিরাও চললো তার সাথে। ঠায় দাঁড়িয়ে রইল উমর। তাকিয়ে রইল বাবার প্রস্থান পানে। আর মির্জা বাড়ির সকলে তাকিয়ে রইল তার পানে। কারও মুখেই কোনো রা নেই।
“ সে কোন রুমে আছেন? ”
উমরের প্রশ্নটা বুঝতে পেরে আঙ্গুল দিয়ে ইকরার রুম দেখিযে দিল নাজমিন বেগম। সাথে সাথেই সেদিকে হাঁটা দিল সুপুরুষ।

ড্রয়িং রুমে তখন শুধু মির্জা বাড়ির সদস্যদের উপস্থিতি রয়েছে। কারও মুখেই কোনো রা নেই। এতসব ঘটনার পর সকলেই একদম থম মেরে গেছে।
“ আজকের দিনটাতেও কি তোর এসব করার দরকার ছিল। একবার বোনটার কথাও ভাবলি না! ”
পরিবেশ স্বাভাবিক হতেই এতক্ষন ভিতরে পুষে রাখা রাগটা বহিঃপ্রকাশ করলেন ইয়াসমিন বেগম। সেদিকে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখাল না কৃশান। সে নিজের মতো হেঁটে রান্নাঘরের দিকে যেতে লাগল। বলল,
“ আমি দিনক্ষণ দেখে মারামারি করিনা। সামনের মানুষ দেখে মারি। ”
রান্নাঘরের চাপানো দরজাটা খুলতেই দৃশ্যমান হলো হুমায়রার সংকীর্ণ কায়া। কাচুমাচু ভঙ্গিতে সামনে তাকাল মেয়েটা। দেখতে পেলো স্বামীর রাগান্বিত মুখ খানা। এখনও স্বাভাবিক হয়নি মানুষটা। এত জেদ বুঝি কারো হয়!
ভাবনার মাঝেই তার পেলব হাত খানা নিজের পুরুষালী হাতের মুঠোয় পুরে নিল কৃশান। ওভাবেই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে হাঁটা ধরল রুমের উদ্দেশ্যে। ড্রয়িং রুম হতে ওদের পিছনটা দেখা গেল। সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আয়াত। পল্লব ঝাপটে ঝাপটে বারংবার চাইল দুজনের হাতের দিকে। কিশোরি হৃদয়ের কোথাও একটা অনুভব হলো হালকা চিনচিন ব্যাথার। সে তো ভেবেছিল কৃশান ভাই হুমায়রা ভাবীকে পছন্দ করে না। কিন্তু এতক্ষন যা ঘটল এরপর তো বুঝাই যাচ্ছে যে, কৃশান শুধু ভালোবাসে না বরং বাড়াবাড়ি রকমের ভালোবাসে হুমায়রাকে।

কাঁদতে কাঁদতে চোখ মুখের অবস্থা বেগতিক হয়ে গেছে ইকরার। রুম হতে বাপ-ভাই ও শ্বশুরের উচ্চ কণ্ঠ- সবকিছুই শুনেছে সে। শুধু শুনেনি স্বামীর শান্ত স্বরে বলা প্রতিটি মনোমুগ্ধকর কথা। যার দরুণ এভাবে কেঁদে যাচ্ছে। চোখ বেয়ে অনর্গল জলধারা গড়িয়ে পড়ার মাঝেই রুমের মধ্যে কারও অস্তিত্ব টের পেল। কেউ একজন খুব সন্তর্পনে এগিয়ে আসছে তার দিক। ঘোমটার আড়াল হতে ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকাল রমণী। নিজের সামনে আবিষ্কার করল ক্রিম কালারের জুব্বা পরিহিত এক সুদর্শন যুবককে। সাথে সাথেই চোখ নামিয়ে নিল মেয়েটা। কাঙ্ক্ষিত পুরুষটাকে দেখতেই বুকে ঝড় উঠল মেয়েটার। তৎক্ষনাৎ কান্না থামানোর চেষ্টা চালালো। সে তো ভেবেছিল মানুষটা হয়তো চলে গেছে।
“ চলুন। ”
একটা ঠান্ডা কন্ঠ কর্ণপাত হতেই নিজের ভাবনার জগৎ থেকে বেরিয়ে এলো ইকরা। চোখের সামনে স্থান পেল একটা ভরসা যোগ্য হাত। যা তার দিকেই বাড়িয়ে রাখা। কোলের মাঝে গুটিয়ে রাখা হাত ডান হাতটা সেই হাতের উদ্দেশ্যে বাড়িয়ে দিল সে। কিছুক্ষনের মধ্যেই তার কাঁপা কাঁপা হাতখানা স্থান পেল একটা সুঠাম হাতের মাঝে। ইকরার হাত ধরে তাকে বসা থেকে উঠালো উমর। পরপর স্ত্রীকে নিয়ে চললো নিজ গন্তব্যে।

কৃশানকে রুম পেরিয়ে ছাদের দিক এগোতে দেখে কপালে ভাঁজ পড়ল হুমায়রার। সে তো ভেবেছিল তারা রুমে যাচ্ছে। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে মানুষটার মনে অন্যকিছু চলছে। সে ক্ষীণ স্বরে বলল,
“এমন সময় ছাদে কেন যাচ্ছেন?
কোনোরূপ বাক্য নির্গত হলো না কৃশানের মুখ থেকে। সে নিজের মতো এগোতে লাগল। একেবারে ছাদের কর্নারে এসে হুমায়রার হাত ছাড়ল কৃশান। শক্ত কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ল,
“ তোকে বলেছিলাম না রুম থেকে বের না হতে? ”
“ রান্নাঘরে একটু কাজ ছিল। আর আম্মুকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছিলাম তো আপনার কাছে। আম্মু বলেনি আপনাকে? ”
“ খবর পাঠিয়েছিস তো কি হয়েছে! আমি এলে যাওয়া যেত না? ”
বলতে বলতেই হুমায়রার দিক এগোতে লাগল ছেলেটা। যতবারই তখনকার দৃশ্য মনে পড়ছে ততবারই রাগে মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে তার। হয়তো দরজার ওপাশ থেকে হুমায়রা বুঝতে পারেনি। তবে কৃশান ঠিকই দেখেছিল দরজার দিকে আজাদের বাড়ানো হাতটা। কিন্ত কৃশানের উপস্থিতিতে তা দরজা ছুঁতে সক্ষম হয়নি। ভাগ্যিস সে সঠিক সময়ে পৌঁছেছিল।
মানুষটার এমন রাগী চিত্তে হালকা ভয় সৃষ্টি হলো হুমায়রার মাঝে। দুকদম পিছিয়ে গেল মেয়েটা। সাথে সাথেই পিঠ ঠেকলো শক্ত রেলিং এ। জমে গেল সে। থেমে থেমে উচ্চারণ করল,

“ আসলে…”
“ আসলে…? ”
তাকে অনুসরণ করে বলল কৃশান। শুষ্ক ঢোক গিলে নিজেকে ধাতস্ত করল রমণী। কিছু বলতে নিবে এর আগেই তার বাহু ধরে শরীরটাকে ছাদের রেলিং এর বাইরে ঝুলিয়ে দিল কৃশান। ওমনিই ভয়ে তার বুকের কাছের শার্ট খামচে ধরল মেয়েটা। চোখ বড় বড় করে বলল,
“ ক.. কি করছেন? ”
“ কথা বললে তো শুনিস না । এখান থেকে ফেলে দেই তোকে? দেই ফেলে? ”
বলতে বলতেই বাহুতে আরেকটু জোর প্রয়োগ করল। ভয়ে মেয়েটার জান বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। চোখ মুখ খিচে নিল। অসহায় কণ্ঠে বলল,
“ হায় আল্লাহ, এমন করবেন না দয়া করে। ভয় লাগছে আমার। ”
“ তো আমার কি? ”
গা ছাড়া ভাব নিয়ে জবাব দিল কৃশান। দেখে মনে হচ্ছে না হুমায়রার ভয় পাওয়া নিয়ে তার কিছু এসে যায়। সে নির্লিপ্ত চোখে তাকিয়ে রইল হুমায়রার ভয়ার্ত মুখপানে। এর মাঝেই ফের শুনা গেল হুমায়রার মিহি স্বর,
“ শুনুন না, আপনি না ভালো স্বামী। এবারের মতো ক্ষমা করে দিন আমায়। এরপর থেকে আর আপনার কথা অমান্য করবো না। ”

“ ভালো স্বামী ” শব্দ দুটো কর্ণপাত হতেই রাগের মাঝেও হাসি পেল কৃশানের। হুমায়রার খিচে রাখা বন্ধ চোখের দিক তাকিয়ে শব্দহীন হেসে ফেলল সে। পরপর কিছুক্ষণ নীরব থেকে হুমায়রাকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে দিল। তৎক্ষনাৎ চোখ খুলে তাকাল মেয়েটা। সহসা তার কপালে কপাল ঠেকিয়ে দিল কৃশান। চোখ বুঁজে তলিয়ে গেল এক অজানা শান্তির জগতে।
মানুষটার অকস্মাৎ কান্ডে একেবারে জমে গেছে হুমায়রা। নড়া চড়া বন্ধ করে এক প্রকার জড়বস্তু হয়ে আছে।
এক মিনিট, দু মিনিট, তিন মিনিট….. এরপর চট করে হুমায়রাকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিল কৃশান। বলল,
“ যা এখান থেকে। ”
ভরকে গেল মেয়েটা। মানুষটার অভিব্যাক্তি বুঝতে না পেরে প্রশ্ন ছুঁড়ল,

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২৫ (২)

“ কি? ”
“ বলেছি যা এখান থেকে নয়তো এবার সত্যিই ফেলে দেব ছাদ থেকে। ”
চোখ ছোট ছোট করে স্বামী নামক অদ্ভুত মানুষটার তাকিয়ে রইল হুমায়রা। পরপর ঘুরে হাঁটা ধরলো। যেতে যেতে বলল,
“ বখাটে পুরুষ! ”
হুমায়রার যাওয়ার পানে তাকিয়ে সিগারেট ধরাচ্ছিল কৃশান। পথিমধ্যেই পরিচিত সম্বোধন টা কানে পৌঁছাল। ওমনিই ঠোঁট জোড়া কিঞ্চিৎ প্রসারিত হলো কঠোর মানবের।

হৃদয় রাঙানো প্রেম পর্ব ২৭

2 COMMENTS

Comments are closed.