ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩২
নওরিন কবির তিশা
অরুণোদয়ের অলক্তাভ রঞ্জনে রঞ্জিত নীলিমা; নিশীথিনীর তিমির-যবনিকা অপসারিত হয়ে এক স্নিগ্ধ হিরণ্ময় দ্যুতি ধরিত্রীর অবহেলিত ধূলিকণা হতে বনস্পতির পল্লবশীর্ষ পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত হয়েছে। নব প্রভাতের সূচনা লগ্ন হতেই তুমুল ব্যস্ততা তালুকদার মঞ্জিলে।
পূর্বে জমিদার মঞ্জিল খ্যাত সে বাড়ির উত্তরসূরী শাহরিয়ার আর অহনার পরিণয় লগ্ন আজ। আত্মীয়স্বজনের কলকলি আর বৈবাহিক আয়োজনে হুলস্থুল কান্ড। একই বাড়িতে বর কনের অবস্থান থাকায় রীতিমতো এলাহি কাণ্ড বেঁধেছে।
অহনাকে বধূবেশে সাজানোর জন্য ধলেশ্বরী কক্ষটিকে রীতিমতো বিউটি পার্লার বানিয়ে ফেলেছে রাইসা, তামান্না, মেহেসানা, তিথি আর তৃষা। ওদের সকলের পরনে মিল রেখে এক রঙা লেহেঙ্গা। তামান্না অহনার চুলে শেষ মুহূর্তের চিরুনি চালিয়ে আয়নায় তৃষার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে এক গাল হেসে বলল,
-‘ ইশ! ভাবিমণিকে যা লাগছে না আজ! ভাইয়া তো জুম্মার নামাজ পড়তে গিয়ে খুতবা শোনার বদলে নির্ঘাত তোমার নাম জপ করবে। তাই না মেহু?
মেহেসানা তৃষার ওড়নার ভাঁজটা ঠিক করে দিতে দিতে ঠোঁট উল্টে কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-‘ আজ একটা ক্যাপ্টেন নেই বলে আমার নাম কেউ জপ করবে না।
তৃষা ওকে কিছু বলার আগেই পাশ থেকে তামান্না ওকে টিপ্পনী কেটে বলল,,
-‘ তুমি আর ঢং করো না তো। তোমার তো সার্জন আছে আমার তো তাও নাই! তাইনা রাইসা?
রাইসা পাশ থেকে মাথা নাড়লো,
-‘ একদম।
মেহেসানা কিছু একটা বলতে গিয়েও তামান্নার খোঁচায় বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। পুনর্বার কিছু একটা বলবার জন্য মুখ খুলতেই কক্ষের দরজায় একটা সশব্দ করাঘাত আর তার পরপরই আদ্রিয়ানের দরাজ কণ্ঠস্বর ভেসে এল,,
-‘ হ্যোয়াটস আপ লেডিস?
আদ্রিয়ান পরনে অফ হোয়াইট পাঞ্জাবি। বলিষ্ঠ বাহুর ভাঁজে বেশ ভালোই শোভিত হচ্ছে পাঞ্জাবিটা।ও ভেতরে পা রাখতেই মেহেসানা নাক কুঁচকে ওড়নাটা সামলে নিয়ে বেশ কড়া গলায় বলল,
-‘ আরে! আপনি আবার এখানে কেন? জানেন না এটা লেডিস জোন?
আদ্রিয়ান চোখে কুঁচকে বলল,-‘ কোথাও লেখা আছে?
মেহেসানা এবার দমে গেল। আদ্রিয়ান ওর বিষয়ে আর ভ্রুক্ষেপ না করে সরাসরি কক্ষে প্রবেশ করল। অহনার দিকের চেয়ে ওর মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে বলল,,
-‘ মাশাআল্লাহ বোন আমার। কত সুন্দর লাগছে তোকে।
অহন লাজুক হাসলো,-‘ ধন্যবাদ ভাইয়া।
আদ্রিয়ান মৃদু হেসে নিজের হাত সরালো। অতঃপর নিজের গতানুগতিক রূপে ফিরে বলল,,
-‘ বিয়ের দিন এত সাউন্ড পলিউশনে তোর কষ্ট হচ্ছে না তো বোন? হলে আমাকে বল। সলিউশনের ব্যবস্থা করব।
আদ্রিয়ানের সুক্ষ্ম খোঁটাটা মেহেসানা ধরতে এক মুহূর্ত দেরি করল না। ও হাতের আইলাইনারটা টেবিলের ওপর সশব্দে নামিয়ে রেখে রণচণ্ডী মূর্তিতে আদ্রিয়ানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল,
-‘ কী বললেন? সাউন্ড পলিউশন? মিস্টার ল্যাম্পপোস্ট, আপনি কি ইন্ডিরেক্টলি বলতে চাইছেন আমি এখানে বেশি কথা বলছি?
আদ্রিয়ান বেশ নির্বিকার ভঙ্গিতে পাঞ্জাবির স্লিভ ঠিক করতে করতে বলল,
-‘ উঠল কথা সবার মাঝে যার কথা যার বুকে বাজে। আমি কিন্তু স্পেসিফিকভাবে কারও নাম নিইনি মিস সাউন্ড বক্স। আর আপনি কি জানেন, অতিমাত্রায় নয়েজ মানুষের শ্রবণশক্তি নষ্টের পাশাপাশি মানসিক ভারসাম্যও বিগড়ে দেয়?
মেহেসানা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
-‘ আপনি এখান থেকে এক্ষুনি বের হন! অহনা আপুর মাইগ্রেনের দোহাই দিয়ে আপনি আসলে আমাকে অপমান করতে এসেছেন। যান, নিজের কাজ করুন গিয়ে!
অহনা পরিস্থিতির বেগতিক দেখে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে মেহেসানার হাত ধরল। ও বেশ মিনমিনে গলায় বলল,
-‘ আরে মেহু, শান্ত হও! ভাইয়া বোধ হয় ওই সাউন্ড বক্সের মিউজিকের কথা বলছিল। বাইরে যে বেগে গান বাজছে, তাতে সত্যিই আমার মাথার ভেতরটা ঝনঝন করছে।
আদ্রিয়ান এবার এক বিজয়ী হাসি হেসে মেহেসানার দিকে তাকাল। অতঃপর অহনার মাথায় ফিস স্নেহের পরশ বুলিয়ে বলল,
-‘ আমি এটার কথাই বলছি। কিন্তু কিছু মানুষ তো সব কিছুতেই নিজেকে কেন্দ্রবিন্দু ভাবে। সারাদিন মাইক্রোফোনের মতো না বকবক করলে যাদের পেটের ভাত হজম হয় না, তাদের কাছে তো জাস্টিস আশা করা বৃথা!
মেহেসানা আর কথা না বাড়ি মুখ বাঁকিয়ে দৃষ্টি সরালো।তৃষা হাসতে হাসতে স্থান ত্যাগ করতে করতে সকলের উদ্দেশ্যে বলল,,
-‘ তোমরা থাকো হ্যাঁ! টুইংকেল মেবি ঘুম থেকে উঠে গিয়েছে, আমি যাই ওকে রেডি করতে হবে।
টুইংকেলকে সাজিয়ে কিছুক্ষণ হলো নিচে নেমেছে তৃষা।শুক্রবার হাওয়ায় জুম্মা বাদ বিয়ের আয়োজন। সময়ের চাকা গড়িয়ে বেলা বেশ খানিকটা বেড়েছে, ঘড়ির কাঁটা এখন এগারোটা পাঁচের ঘর ছুঁয়েছে। আবহাওয়াটা আজ নাতিশীতোষ্ণ। মেঘের আনাগোনা চলছে অবিরাম; তবে বৃষ্টির দেখা নেই।
নতুন আরো অনেক আত্মীয়র সঙ্গে আলাপচারিতা চুকিয়ে ও মেহেসানাকে খুঁজতে মত্ত। কারণ একটাই সবাই মিলে ছবি তুলবে আজ ওরা। তবে একটা কেউ হাতের নাগালে পাওয়া যাচ্ছে না বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
তৃষার চঞ্চল অক্ষিযুগল ওদের খুঁজতে মত্ত। হুট করে অলিন্দে আবর্তিত এক দীর্ঘকায় পুরুষের সাথে ওর আকস্মিক সংঘর্ষ ঘটল। ধাক্কার চোটে তৃষা ভারসাম্য হারিয়ে পিছিয়ে যেতেই লোকটির একটি হাত ওর কনুই আঁকড়ে ধরে পতন রোধ করল। তৃষা থতমত খেয়ে মাথা নিচু করেই বলে উঠল,
-‘ অ্যা’ম সো স্যরি! আমি আসলে…।
তৃষা কথা শেষ করতে পারল না। দৃষ্টি তুলে তাকাতেই ওর চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। সম্মুখে দণ্ডায়মান পুরুষটির উন্নত নাসিকা, তীক্ষ্ণ চোয়াল আর ভরাট ওষ্ঠাধর ওকে থামিয়ে দিল যেন। লোকটার পরনে নেভি ব্লু রঙের শার্ট হতে সৌন্দর্যের বিচ্ছুরণ ঘটছে। লোকটি ঠোঁটের কোণে এক চিলতে স্নিগ্ধ হাসি ফুটিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
-‘ সাবধানে ম্যাম। পড়ে যেতেন তার একটু হলেই।
লোকটির কণ্ঠস্বর বড্ড গভীর তবে ভীষণ নমনীয়, তৃষা নিজের হাতের কবজি ছাড়িয়ে নিয়ে কিঞ্চিৎ আড়ষ্ট গলায় বলল,
-‘ অ্যাকচুয়ালি আমি আমার ফ্রেন্ডকে খুঁজছিলাম। আপনার চোট লাগেনি তো?
লোকটি স্মিত হেসে পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়াল; অদ্ভুত সম্মোহনী ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল,
-‘ নো।
তৃষা স্বভাব সুলভ মৃদু হাসলো, আর কথা না বাড়িয়ে ধীর পায়ে প্রস্থান করতে গেলো ঠিক তখনই পিছন থেকে ভেসে আসলো আগন্তুকদের কন্ঠস্বর,,
-‘ এই যে ম্যাম?
তৃষা পিছু ঘুরলো,-‘ হুম?
আগন্তুক যুবকটি বেশ মার্জিত ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে সহাস্যে বলল,
-‘ আই অ্যাম সো স্যরি, বাট আপনার নামটা কি জানতে পারি? জাস্ট টু নো ইফ আই হার্ট সামওয়ান ভেরি স্পেশাল অফ দিস ফ্যামিলি!
তৃষা কিঞ্চিৎ সংকুচিত হয়ে বলল,
-‘ জ্বী, আমি তৃষা। তৃষা নেওয়াজ।
যুবকটি হাত বাড়িয়ে সৌজন্যমূলক হাসল,,
-‘ নাইস টু মিট ইউ তৃষা ম্যাম। আই অ্যাম রিদ। রিদওয়ান আহমেদ খান। শাহরিয়ারের বন্ধু।
রিদওয়ানের সপ্রতিভ কথা বলার ধরণ আর অমায়িক হাসিতে তৃষার আড়ষ্টতা খানিকটা কেটে গেল। ও মৃদু হেসে বলল,
-‘ ও আচ্ছা, শাহরিয়ার ভাইয়ের বন্ধু আপনি!
তৃষার হাসির সময় ওর বাঁ গালে একটি ছোট কাটা দাগের মতো সূক্ষ্ম চিহ্ন ফুটে উঠল, যা হাসলে অবিকল টোলের মতো দেখায়। রিদওয়ান অপলক দৃষ্টিতে সেই মোহময়ী হাসির দিকে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই হালকা গলায় ও বলল,
-‘ ইউ্য নো হোয়াট তৃষা ম্যাম? আপনি যখন হাসেন, আপনার ওই গালের ছোট্ট চিহ্নটা জাস্ট অদ্ভূত দেখায়! ইউ আর সো প্রিটি। আই মাস্ট সে, আপনার বয়ফ্রেন্ড ইজ রিয়ালি লাকি টু হ্যাভ দিস বিউটিফুল স্মাইল এভরি ডে।
তৃষা হঠাৎ এমন প্রশংসায় বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল,,
-‘ থ্যাংকস, বাট আই ডোন্ট হ্যাভ এনি বয়ফ্রেন্ড।
রিদ অবাক কণ্ঠে বলল,-‘ রিয়েলি।
তৃষা ওকে কিছু বলতে যাওয়ার পূর্বেই ভেসে আসলো এক গম্ভীর পৌরুষ কণ্ঠস্বর,
-‘ কজ সি হ্যাজ হ্যাজবেন্ড।
ভেসে আসা কণ্ঠটায় তৃষা আর রিদওয়ান কৌতূহলী হয়ে সেদিকে তাকালো। আর্য এগিয়ে এসে নিজের বলিষ্ঠ হাতটা মুহূর্তেই তৃষার কাঁধের ওপর এক মালিকানা দৃঢ়তায় রাখলো। অতঃপর রিদওয়ানের দিকে একপলক হিমশীতল চাউনি হেনে ধারালো কন্ঠে বলল,
-‘ বয়ফ্রেন্ড নেই বলে হয়তো ওর হাসিতে খুব বেশি লাক খুঁজে পাচ্ছেন মিস্টার, কিন্তু ইনফরমেশনটা একটু কারেক্ট করে দিই সি ডাজন্ট হ্যাভ আ বয়ফ্রেন্ড, কজ শ্যি হ্যাজ আ হাজব্যান্ড। অ্যান্ড আই অ্যাম দ্য ওয়ান হু ডিলস উইথ হার এভরি ডে স্মাইল।
রিদওয়ান হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছে। ঘটনার আকস্মিকতায় মস্তিষ্ক যেনো নির্দেশনা নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে ওর। আর্য ওকে আরও স্তব্ধ করে দিতে ফের তৃষার উদ্দেশ্যে আদেশের স্বরে বলল,,
-‘ তোমার হাতটা দেখাও তো তৃষা।
তৃষা নিজেও বাক শক্তি হারিয়েছে যেনো। ও বোকা দৃষ্টি নিক্ষেপূর্বক চেয়ে আছে কাঁধে থাকা আর্যর হাতের দিকে। আর্য ওর এমন নির্লিপ্ততা সহ্য করলো না ফের তাগাদা দিয়ে বলল,
-‘ কি হলো দেখাও।
তৃষার ধ্যান ভাঙলো এবার,-‘ উ – উম?
-‘আরেএ’–আর্য আর দেরি না করে চট করে তৃষার বাঁ হাতে যেখানে ওর নামটা বড় বড় অক্ষরে লেখা সেটা রিদের সম্মুখে মেলে ধরে বলল,,
-‘ উম.. পারফেক্ট কালার তো খুব সুন্দর এসেছে।
তৃষা কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত হয়ে উঠেছে আর্যর এমন কাণ্ডে। রিদ অগোচরে আড়দৃষ্টি নিক্ষেপূর্বক পড়ে নিল ওর হাতে লেখা নামটা। পরক্ষণেই বুঝে গেল আর্যর বলা কথাটার সত্যতা। ও মুখ ছোট করে কিছু বলার আগেই আর্য ওর দিকে এক তাচ্ছিল্যের হাসি ছুঁড়ে দিয়ে তৃষার দিকে ফিরল,,
-‘ তৃষা, রুমে চলো! সেই নেভি ব্লু পাঞ্জাবিটা খুঁজে পাচ্ছি না যেটা তুমি কাল রাতে বারবার পরতে বলছিলে। রিদওয়ান, আই অ্যাম স্যরি ব্রো, আমার পার্সোনাল স্টাইলিস্টকে এখন আমার বড্ড প্রয়োজন। এনজয় দ্য ওয়েডিং!
আর্য রিদওয়ানকে আর কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তৃষার কোমরে হাত রেখে একপ্রকার আগলে নিয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়াল। তৃষা লজ্জায় আর বিস্ময়ে আর্যর দিকে তাকাতেই দেখল আর্যর চোয়াল এখনো শক্ত হয়ে আছে। সিঁড়ির মাঝপথে আসতেই তৃষা বলল,
-‘ আমি কখন আপনাকে ওই পাঞ্জাবি পরতে বললাম? আর আপনার ওই রঙের পাঞ্জাবি আছে নাকি?
আর্য সিঁড়ির বাঁকে তৃষাকে দেয়ালের সাথে কিঞ্চিৎ চেপে ধরে ওর চোখের দিকে ঝুঁকে এল। তীব্র অধিকারের স্বরে ভরাট কন্ঠে বলল,
-‘ কেন? তুমি জানো না আমার আলমারিতে কোন রঙের পাঞ্জাবি আছে আর কোনটা নেই?রিয়ালি, তৃষা? নিজের হাজব্যান্ডের ওয়ার্ডরোব সম্পর্কে এতটুকুও আইডিয়া নেই তোমার?
তৃষা দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে আমতা-আমতা করে বলল,
-‘ আসলে… কখনো জানার তো সেভাবে প্রয়োজন হয়নি। আর আপনিই তো সব সময় বলেন আপনি ক্যাজুয়াল শার্টে কমফোর্টেবল। আমি কেন মিছেমিছি আপনার পাঞ্জাবির খবর নিতে যাব?
তৃষার উত্তরে আর্যর চোয়াল আরও শক্ত হয়ে এল। ও তৃষার কানের খুব কাছে মুখ নিয়ে এসে গম্ভীর স্বরে বলল,
-‘ তাহলে এখন থেকে জানবে। আজ থেকে আমার প্রত্যেকটা পোশাক তোমার পছন্দে বের হবে। আর ওই যে বাইরে অচেনা মানুষদের সামনে তোমার হাসির এক্সিবিশন চলছিল, ওটা কি বন্ধ করা যায় না? যখন তখন যাকে তাকে ওভাবে হাসির স্যাম্পল বিলানো কি খুব জরুরি?
তৃষা একটু অবাক হয়ে ওর দিকে চেয়ে বলল,
-‘ আপনি কি রেগে আছেন? উনি তো জাস্ট শাহরিয়ার ভাইয়ের ফ্রেন্ড হিসেবে কথা বলছিলেন। সাধারণ সৌজন্যমূলক হাসিতে আপনার প্রবলেম কী?
আর্য এবার সরাসরি তৃষার চোখের দিকে তাকিয়ে হুকুমের সুরে বলল,
-‘ আমার প্রবলেম হাসিতে নয় তৃষা, আমার প্রবলেম আমার অধিকার নিয়ে। তোমার ওই টোল পড়া হাসিটা দেখার পারমিশন শুধু আমার আছে, বাইরের কারোর নয়। এরপর থেকে যখনই হাসবে, মনে রাখবে তোমার হাসির মালিকানা কিন্তু অলরেডি রেজিস্টার্ড। গেট ইট?
আর্যর তীব্র অধিকার বোধের পিঠে কোনো জবাব খুঁজে না পেয়ে তৃষা ধীর লয়ে মাথা নাড়ল। তবুও আর্যর মুখাবয়বের কাঠিন্যের এক বিন্দু পরিমাণও নড়চড় ঘটলো না।
-‘ গুড্য। তাহলে এক্ষুনি রুমে যাও আর আমার পাঞ্জাবী বের করো কোনটা পড়বো। কুইক।
তৃষা ঈষৎ সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লো। আর্য এবার ধীরে ধীরে ছেড়ে দিল ওকে। ছাড়া পেয়েই যেন হাত ছেড়ে বাঁচল তৃষা। এতক্ষণ যাবৎ আর্য ওর কোমর খানা বড্ড জোরালোভাবে চেপে ধরেছিল, যার ধরণ একপ্রকার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসার জোগাড় হচ্ছিল ওর।
তাই আর্যর বলিষ্ঠ বন্ধন হতে মুক্তি পেয়ে তৃষা দ্রুতপদে কক্ষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল। রুদ্ধদ্বার কক্ষে নিজের স্পন্দিত হৃদপিণ্ডের শব্দ যেন সে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিল। কাষ্ঠনির্মিত বিশালাকার আলমারিটা উন্মোচন করতেই সারি সারি পোশাকের ভিড়ে ওর চোখ আটকে গেল। নেভি ব্লু রঙের সেই রেশমি পাঞ্জাবিটা সযত্নে বের করে বিছানায় রাখতেই অলিন্দে আর্যর পদধ্বনি প্রতিধ্বনিত হলো।
আর্য ঘরে প্রবেশ করতেই তৃষা বিছানার পাঞ্জাবিটা দেখিয়ে কিঞ্চিৎ আড়ষ্ট স্বরে বলল,
-‘ এই যে আপনার পাঞ্জাবি। কাল আপনিই বোধহয় এটা আলমারির সামনের দিকে রেখেছিলেন। দেখুন তো, পছন্দ হয় কি না?
আর্য এক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে তৃষার দিকে তাকাল। ওর দৃষ্টিতে থাকা সেই তীব্র দহন তৃষাকে যেন মুহূর্তেই ভস্মীভূত করে দিতে চাইছে। ও কদম বাড়িয়ে কাছে এসে বিছানা থেকে পাঞ্জাবিটা হাতে নিয়ে বলল,,
-‘ পছন্দ হওয়া না হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না তৃষা। কজ ইটস ইওর চয়েস।
তৃষা কোনো প্রত্যুত্তর করল না। আর্যের এই অদ্ভুত গম্ভীর রূপটা ওর বড় চেনা, আবার বড্ড অচেনা। আর্য পাঞ্জাবিটা নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াতেই তৃষা ভাবল এই সুযোগে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু ওর অবাধ্য পা দুটো দরজার দিকে এক কদম বাড়াতেই দেশে এলো আর্যর বজ্রকন্ঠ,
-‘ কোথায় যাচ্ছ?
আর্য ওয়াশরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকাল। তৃষা ঘুরে দাঁড়িয়ে কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে বলল,
-‘ নিচে যাচ্ছি।
-‘ আমি যেতে বলেছি?
তৃষা ভ্রু কুঁচকে চাইলো,-‘ মানে?
আর্য এবার স্থির পায়ে পুনরায় তৃষার সামনে এসে দাঁড়াল,
-‘ আমার পারমিশন ছাড়া রুম থেকে আজ বের হবে না। যতক্ষণ না আমি তৈরি হচ্ছি, ততক্ষণ তুমি এখানেই থাকবে। গট ইট?
তৃষা এবার আস্কারা না দিয়ে বেশ স্পষ্ট স্বরেই বলল,
-‘ কেন? আমি এখানে অহেতুক দাঁড়িয়ে থেকে কী করব? আপনার তৈরি হতে বড়জোর দশ মিনিট লাগবে, আমি ততক্ষণ…
ওকে কথা শেষ করতে না দিয়ে আর্য তীব্র কন্ঠে বলল,,
-‘ কজ আমি বলেছি আর আই থিঙ্ক ইটস এনাফ ফর ইউ্য।
কথাটা শেষ করে আর্য আর উত্তরের অপেক্ষা করল না। পাঞ্জাবিটা কাঁধে ফেলে ও সশব্দে ওয়াশরুমের দরজাটা আটকে দিল। তৃষা স্তব্ধ হয়ে ওর প্রস্থান পথের দিকে চেয়ে রইল। মানুষটার হচ্ছেটা কি আজ?
অতিক্রান্ত হল কিছুক্ষণ হঠাৎ ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দে তৃষার ধ্যান টুটলো ও এতক্ষণ বিরক্তি কমাতে একদৃষ্টে জালনার বাইরে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ আনমনে ওয়াশরুমের দিকে তাকাতেই ওর হৃৎস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বেরিয়ে আসছে আর্য ওর সিক্ত বাবরি চুলগুলো অবিন্যস্তভাবে কপালে লেপ্টে আছে, যেখান থেকে চুইয়ে পড়া কয়েক ফোঁটা জল ওর তীক্ষ্ণ গ্রীবাদেশ বেয়ে গড়িয়ে পাঞ্জাবির কলার ভিজিয়ে দিচ্ছে।
আর্যর গভীর, ধূসর-নীলচে চোখের সেই মদিরাচ্ছন্ন চাউনি তৃষাকে যেন অজানা আবেশে স্থির করে দিল। আর্য ধীরপায়ে তৃষার একদম সামনে এসে দাঁড়াল; ওর গায়ের সেই সতেজ পারফিউম আর জলের ঘ্রাণ তৃষার ইন্দ্রিয়গুলোকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। তৃষা পাথরের মূর্তির মতো ওর দিকে চেয়ে রইল, যেন পলক ফেললেই এই ঘোর কেটে যাবে।
আর্য হঠাৎ নিজের ঠান্ডা আঙুলের ডগা দিয়ে তৃষার কপালে লেপ্টে থাকা একগুচ্ছ অবাধ্য চুল অতি সযত্নে কানের পিছে গুঁজে দিল। আর্যর সেই অতি লৌকিক স্পর্শে তৃষার সমস্ত শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল। আর্য ওর চোখের মণির গভীরে বিদ্ধ করে খুব নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
-‘চোখ সরাচ্ছেন না যে? ডিকশনারিতে কি আজ মুগ্ধতার নতুন কোনো ডেফিনিশন খুঁজে পেলেন নাকি?
তৃষা অপ্রস্তুত হয়ে তড়িৎবেগে দৃষ্টি সরিয়ে মেঝের দিকে চাইল। লজ্জায় ওর কপোলদ্বয় তখন লাল আভার বরণ নিয়েছে। ও ধরা গলায় কোনোমতে বলল,
-‘ আ-আমি নিচে যাচ্ছি।
বলেই তৃষা দরজার দিকে পা বাড়াতেই আর্যর বলিষ্ঠ হাতের হ্যাঁচকা টানে ও পুনরায় আর্যর সুঠাম বুকের খুব সন্নিকটে এসে আছড়ে পড়ল। আর্য ওর কবজিটা মুচড়ে না ধরে বরং এক মায়াবী আবেশে আগলে রেখে নিচু স্বরে শুধাল,
-‘ এত তাড়াহুড়ো কিসের ম্যাম? নাকি দৃষ্টি সরিয়েই পালিয়ে বাঁচতে চাইছেন?
তৃষা বুক ভরে দম নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে বলল,
-‘ একদম না! আমি জাস্ট… নিশ্বাস নিতে নিচে যাচ্ছিলাম। আপনার সামনে দাঁড়ালে অক্সিজেন লেভেল কেন জানি কমে যায়।
আর্য তৃষার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে ধূর্ত হাসিতে বলল,
-‘ অক্সিজেন কমে নাকি হার্টবিট বেড়ে যায়? আর আপনার সমস্যাটা ঠিক কোথায় বলুন তো? এই যে আপনি আমার চোখের দিকে তাকাতে পারছেন না, এটা কি ভয় নাকি অন্য কিছু?
তৃষা এবার একটু সাহস সঞ্চয় করে সরাসরি ওর চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করল,
-‘ অন্য কিছুর কথা পরে হবে, আগে এটা বলুন আপনার মাঝে মাঝে হয় কী? এক সময় তুমি এক সময় আপনি। এই তুমি-আপনির গোলকধাঁধায় আমি রীতিমতো কনফিউজড!
আর্যর দৃষ্টি এবার কিঞ্চিৎ নরম হয়ে এল,
-‘ সত্যি বলতে , আমি নিজেও জানি না। কিন্তু আপনার সামনে দাঁড়ালে আমার সব কিছু কেমন যেন গুলিয়ে যায়।
তৃষা আর্যর কথায় ওর দিকে গভীর দৃষ্টি মেলে বলল,-‘ মানে?
-‘ নাথিং।
আর্যর মুখে পুনরায় সেই নির্লিপ্ত ‘নাথিং’ শুনে তৃষার বিরক্তি এবার চরম সীমায় পৌঁছাল। ও ঝটকা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে গিয়েও থেমে গেল; আর্যর চোখের দিকে তাকাতেই ওর ভ্রু কুঁচকে এল বিস্ময়ে। আর্যর চোখের সেই চিরচেনা তীক্ষ্ণ ধূসর মণির চারদিকের শ্বেতশুভ্র অংশটা আজ অস্বাভাবিক রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে; যেন একরাশ ক্লান্তি কিংবা কোনো সুপ্ত দহন সেখানে বাসা বেঁধেছে।
তৃষা উদ্বেগের সাথে আর্যর কপালে হাত ছোঁয়ানোর চেষ্টা করে শুধাল,
-‘ আপনার চোখ দুটো এমন টকটকে লাল হয়ে আছে কেন? জ্বর আসছে নাকি ঘুম হয়নি?
-‘ ঘুমাতে দিয়েছেন?
-‘ মানে?
আর্য ঝট করে তৃষার হাতটা সরিয়ে দিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল। জানালার ওপারে মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে রুক্ষ স্বরে বলল,
-‘ কিছুই হয়নি। হলেও আমার জানা নেই, হয়তো কোনো ইনসোমনিয়া অ্যাটাক বা স্রেফ এনভায়রনমেন্টাল এলার্জি। আপনি নিচে যান, আমার জন্য ভাবতে হবে না।
তৃষা এক কদম এগিয়ে গিয়ে ওর হাত চেপে ধরে জেদ নিয়ে বলল,
-‘ মিথ্যে বলবেন না একদম।
-‘ আমি মিথ্যা বলি না।
-‘ তাহলে সত্যিটা কি?
-‘ কিছু না।
-‘ আবার মিথ্যা?
তৃষা আরও কিছু বলতে উদ্যত হয়েছিল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজায় কড়া নেড়ে রাইসার কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
-‘ ভাবিমণি! নিচে চলো, সবাই তোমাদের জন্য ওয়েট করছে।
তৃষা আর্যর উত্তরের জন্য একবার আকুল হয়ে তাকাল, কিন্তু আর্যর পাথুরে মুখাবয়বে তখন কেবলই এক দুর্ভেদ্য কাঠিন্য। ও নির্লিপ্ত গলায় শুধু বলল,
-‘ ওদের সাথে যান তৃষা। আমি আসছি।
ফিরে এসো অনুরাগে পর্ব ৩১
তৃষা অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ওর প্রস্থানপথের দিকে তাকিয়ে আর্যর দীর্ঘশ্বাসটা বুক চিরে বেরিয়ে এল। ওর চোখের ওই রক্তিম আভা কোনো অ্যালার্জি নয়, বরং এক দীর্ঘ রজনীর বিনিদ্র যুদ্ধের সাক্ষ্য। কাল রাতে তৃষা যখন ওর বুকে মাথা রেখে অবুঝের মতো মিশে ছিল,তখন ও চাইলে পারত সেই দুর্বল মুহূর্তের সুযোগ নিতে, কিন্তু ওর পৌরুষ আর নীতিবোধ ওকে বারবার বাধা দিয়েছে। ও চায় না তৃষার অনিচ্ছায় বা স্রেফ পরিস্থিতির চাপে ওদের মাঝে কোনো অধিকার জন্মাক।
তৃষাকে কোনো দূর্ঘটনায় দরুন ওর তন্দ্রাচ্ছন্নতা নামক দুর্বলতার সুযোগে নিজের স্পর্শ থেকে বাঁচাতে তাই শেষমেশ আর্য বিছানা ছেড়ে বারান্দার সারারাত কাটিয়ে দিয়েছে।যার দরুন অপূর্ব নেত্রের এমন করুন দশা ওর।

Golpo ta vison sundor tobe amniteo running golpo porchi amra pathok-pathikara sejonno regularly koi bar j cheak kori j porer part ki esheche naki sejonno regularly part gulo diben anong aktu beshi-o dile amra happy😊🤍
34 porvo kobe pabo