এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১১
নুসরাত ফারিয়া
আজকাল আলোর সময়টা তেমন ভালো যাচ্ছে না। কিছু না কিছু অঘটন ঘটিয়ে বসে থাকছে। এই তো আজ ভার্সিটি থেকে দুপুরের দিকে বাড়িতে ফেরার পর রাইসকুকারে পানি গরম করতে দিয়েছিল। অথচ মেয়েটা ভুলে বিকেলে রান্নাঘরে গিয়ে দেখে সে আবার একটা আকাম করে বসে আছে। পুরো রাইসকুকার ফাঁকা! ভাগ্যিস কোনো দূর্ঘটনা ঘটেনি, নয়তো আজ পুরো খান ভিলা আগুনে জ্ব’লত। তাহমিনা খান এখানে থাকলে নিশ্চিত তার চৌদ্দ গুষ্ঠি ধুয়ে দিত।
ভার্সিটি বর্তিত আলো বাড়িতে সবসময় একা মনমরা হয়ে থাকে। খুব বেশি একাকীত্ব অনুভব করলে দাদাজানের কাছে গিয়ে গল্পর আসর খুলে বসে। সে আবার একা থাকতে পারে না। ছোট বেলা থেকে যৌথ পরিবারের মাঝে বড় হওয়া মেয়ে ও। বাড়িতে সারাদিন হইহই করতেই থাকত। তার সঙ্গ দিত ছায়া, মায়া ও রহিত। বাড়ির বড়দের পিছনেও সবসময় লেগে থাকত। সবাইকে ভীষণ জ্বালাত সে। কিন্তু এখানে এসে অজান্তেই খাঁচায় বন্দী হয়ে গেছে। আশেপাশে তাকিয়েও কাউকে খুঁজে পায় না। আগে স্যারের সাথে টুকটাক ঝগড়া করলেও এখন সেটাও করে না। হঠাৎই সবকিছু কেমন জানি পাল্টে গিয়েছে। এই একাকীত্ব তাকে ভেতরে ভেতরে কুঁড়ে মা’রছে। সে না পারছে সহ্য করতে আর না পারছে কাউকে কিছু বলতে। কারণ ওই মানুষটার থেকেও দূরত্ব বেড়ে চলেছে। তারা হয়তো একই ছাঁদের নিচে, একই বিছানায় থাকে। কিন্তু তাদের মধ্যে বিশালাকৃতির অদৃশ্য দেয়াল রয়েছে। যেটা চাইলেও ভাঙা অসম্ভব প্রায়!
আলো শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার এই নতুন জীবনটা একদম ভালো লাগছে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে। এখানে কেউ-ই তাকে ভালোবাসে না, শুধু মাত্র একজন ছাড়া। যে মানুষটার এক কথায় না জেনেশুনে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। অথচ এখন সেটাই খুব বাজেভাবে গলায় বিঁধে গিয়েছে। সে ছিল আকাশের মুক্ত পাখি, কিন্তু এখন হয়ে গেছে ঘরকুনো পাখি। যেটা তাকে তিলে তিলে ক্ষ’তবিক্ষ’ত করছে। বারবার মনে হচ্ছে—তার জীবনটা এমন না হলেও পারত। আজ বড্ড মনে পড়ছে নিজের হাসিখুশি ছোট্ট পরিবারকে। ইচ্ছে করছে সবকিছু ছেড়ে ছুঁড়ে কোথাও একটা পালিয়ে যেতে! তাহলে হয়তো একটু শান্তি পেত।
আলো খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থেকে আবারো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ফোনটা নিয়ে একটা নাম্বারে ডায়াল করল। কিছুক্ষণ পর অপর প্রান্ত থেকে রিসিভ হতেই সে কানে গুঁজে ধীর কণ্ঠে বলে উঠলো,
-“শুনেছিলাম বিয়ের পর মেয়েরা পর হয়ে যায়। কিন্তু আমার বিশ্বাস ছিল, আমি কখনো তোমাদের পর হবো না। কিন্তু আফসোস! তোমরাও আমাকে পর করে দিলে বাবা।”
মতিউর রহমান অফিসে ছিলেন। সেসময় ভর সন্ধ্যা বেলা বড় মেয়ের ফোনকল পেয়ে কিছুটা অবাক হোন। কারণ আলো সবসময় রাতে কিংবা সকালেই কল দেয়। তিনি আর সময় নষ্ট না করে তড়িঘড়ি করে কল ধরে কিছু বলতে যাবে তখনই মেয়েটার কথা শুনে থমকে যায়। পর মূহুর্তে বললেন,
-“তুমি আমাদের মেয়ে ছিলে, আছো এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তুমি কখনোই পর হবে না আমাদের কাছে।”
আলো কিছু না বলে চুপ করে থাকল। মতিউর রহমান চিন্তিত হয়ে শুধায়,
-“ওখানে কিছু কী হয়েছে সোনা?”
-“কী হবে? কিছুই হয়নি।”
-“তাহলে তুমি হঠাৎ এমন কথা বলছো কেন?”
-“তোমাদের কথা খুব মনে পড়ছিল বাবা। কতদিন হলো তোমাদের দেখি না। তোমরা আমাকে ভুলে গেলেও কিন্তু আমি তোমাদেরকে প্রতিনিয়ত মিস করি। আচ্ছা ভালো থেকো! আর হ্যাঁ, অফিস থেকে সাবধানে বাড়িতে ফিরবে। আমি রাখছি। আসসালামু আলাইকুম।”
বলেই আলো কল কেটে দিল। অন্যদিকে মেয়ের এমন ব্যবহারে বেশ অবাক হলেন মতিউর রহমান!
ডাইনিংয়ে বসে থেকে সোবহান খান ও আধার খান ডিনার করছে। আলো উনাদের খাবার সার্ভ করে দিচ্ছে। তাকেও খেতে বলা হয়েছিল, কিন্তু সে খায়নি। বলতে গেলে তার খিদে নেই। দরজা থেকে ভেসে আসা কলিংবেলের শব্দ পেয়ে কপাল কুঁচকে গেল সবার। এত রাতে আবার কে এল? আলো তরকারির পাত্র টেবিলের ওপর রেখে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আমি দেখছি।”
একথা বলে সে বড় বড় পা ফেলে ড্রয়িংরুম পেরিয়ে দরজার কাছে যায়। এবং দরজা খুলতেই অবাক হয়।
-“ব….বাবা তুমি?”
অসময়ে এখানে নিজের বাবাকে দেখে অস্ফুটস্বরে আলো জিজ্ঞেস করে। মতিউর রহমান বিস্ময়ে মেয়ের মলিন চেহারার দিকে তাকিয়ে রয়। তার আগের মেয়ের সাথে এই মেয়েটার চেহারা মেলাতে খুব কষ্ট হলো বটে। আলো আগে থেকে পাঠকাটি হলেও এখন আরো শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে হালকা ডার্কসার্কেলও পড়েছে৷ চেহারা থেকে লাবণ্যতা হারিয়ে গেছে যেন। মতিউর রহমান নিজেকে সামলিয়ে মেয়ের মাথায় হাত রেখে আদুরে কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
-“আমাকে দেখে খুশি হওনি মামণি?”
আলো কিছু না বলে দু’হাতে বাবাকে ঝাপটে ধরে বুকের মাঝে মুখ গুঁজে ফিসফিসিয়ে বলল,
-“তোমাকে পেয়ে তোমার মেয়ে খুউউউব খুশি হয়েছে বাবা।”
মতিউর রহমান হাসলেন। ততক্ষণে ড্রয়িংরুমে সোবহান খান ও আধার চলে এসেছে।
-“বাবাকে কী বাহিরেই রাখবে নাতবউ? ভেতরে নিয়ে এসো।”
দাদাজানের কথা শুনে হুঁশ এল আলোর। সে আড়ালে চোখের পানি মুছে তড়িঘড়ি করে বাবাকে ছেড়ে বলল,
-“এসো বাবা, ভেতরে এসো।”
মতিউর রহমান ভেতরে এলেন। উনার পরণে ফর্মাল ড্রেসআপ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অফিস থেকে সোজা এখানেই এসেছেন। উনার পিছু পিছু ড্রাইভারও ভেতরে প্রবেশ করলেন। লোকটার দু’হাত ভর্তি ফলমূল, মিষ্টি, শুকনো জিনিস ও আরো অনেক কিছু। সেগুলো টি-টেবিলের ওপর রেখে ড্রাইভার চলে গেল বাহিরে। তখন সোবহান খান বললেন,
-“এতকিছু কেন নিয়ে আসতে গেলে?”
-“মেয়ের শশুর বাড়িতে কী কখনো খালি হাতে আসা যায়?”
-“এটা তোমার মেয়ের আরেকটা বাড়ি। সেখানে এত ফর্মালিটি মেইনটেইন করতে হবে না মতিউর। আমরা আমরাই তো।”
বিনিময়ে মতিউর রহমান হাসলেন। মেয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে—আলো হাসফাস করছে কিছু একটা বলার জন্য।
-“আমার কাছে এসো মামণি।”
আলো গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে বাবার পাশে বসল। মতিউর রহমান একহাতে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে ধীর কণ্ঠে বললেন, -“কিছু বলবে?”
আলো কপাল চুলকিয়ে বিরবির করে বলল, -“এই সময়ে এখানে কেন বাবা? না মানে সব ঠিক আছে তো?”
-“তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল, তাই এসেছি।”
আলো কিছু না বলে মাথা নাড়াল। মতিউর রহমান আশেপাশে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, -“তোমার শাশুড়ী মা কোথায়?”
-“উনি উনার বাবার বাড়িতে গিয়েছে বাবা।”
শেফালি চাচি চা-নাস্তা নিয়ে এসে সামনে থাকা টি-টেবিলের ওপর রাখল। মতিউর রহমান সোবহান খানের উদ্দেশ্যে বললেন,
-“বড় মেয়েটার বিয়ের তো অনেক দিন হয়ে গেল। আমরা সবাই ওকে খুব মিস করছি। তাই ভাবছিলাম, আজ ওকে আমার সাথে নিয়ে যাব। সামনেই ওর পরীক্ষা! আমাদের ওখানেই না-হয় থেকে পরীক্ষাটা দিক। পরীক্ষা শেষ হলে আবার এখানে ফিরে আসবে। এই কটা দিন ও আমাদের সাথে থাকলে আমরা খুব খুশি হতাম। আপনার কী মতামত?”
সোবহান খান থমথমে মুখে পাশে বসে থাকা নাতির দিকে তাকায়। উনার দৃষ্টি লক্ষ্য করে মতিউর রহমান মেয়ে জামাইয়ের উদ্দেশ্যে বললেন,
-“আমার মেয়েকে এখন নিয়ে গেলে কী তোমার কোনো অসুবিধা হবে বাবা?”
আধার স্বাভাবিক গলায় বলল, -“আপনি আপনার মেয়েকে নিয়ে যাবেন, এতে আমার কেন অসুবিধা হবে? তার যতদিন ইচ্ছে ততদিন থাকুক আপনাদের ওখানে। এতে আমার কোনো অসুবিধা নেই আঙ্কেল।”
মতিউর রহমান মনে মনে খুশি হলেন। এইদিকে আধারের মুখে “আঙ্কেল” সম্মোধন শুনে আলোর মনটা বিষাদে ভরে গেল। যেখানে সে এই বাড়িতে পা রাখতে না রাখতেই তাহমিনা খানকে “মা” বলে সম্মোধন করেছিল। সেখানে মানুষটা সবার সামনে কি নির্দ্বিধায় আঙ্কেল বলে ডাকলো তার বাবাকে! আলো আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে আজকাল একটু বেশি-বেশিই আশা করে বসে থাকে। যেটা কখনোই পূরণ হবার নয়।
-“তুমি তোমার বাবার সাথে যেতে চাও নাতবউ?”
দাদাজানের কথা শুনে আলো মাথা নাড়িয়ে শান্ত গলায় বলল, -“হ্যাঁ দাদাজান। আমি বাড়ি যেতে চাই।”
সোবহান খান কিছুক্ষণ চুপ থেকে মুচকি হেঁসে বললেন,
-“ঠিক আছে। তবে জলদি ফিরে আসবে কেমন?”
আলো মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। অথচ সে নিজেই জানে না, আদৌ এখানে আর ফিরে আসবে কি-না!
বাবা-মেয়েকে রাতের খাবার খাইয়ে তবেই ছাড়লেন সোবহান খান। আলো রুমে এসে নিজের ল্যাগেজ গুছিয়ে নিল। প্রয়োজনীয় জিনিস, বইপত্র ও হালকা-পাতলা জামাকাপড় নিয়েছে। ল্যাগেজের চেইন লাগানোর সময় বিপত্তি ঘটল। বই তোলার কারণে ফুলেফেঁপে উঠেছে ব্যাগের ভেতরটা। সে চেপেচুপেও চেইন লাগাতে পারছে না। তখন খেয়াল করল তার সামনে থেকে ল্যাগেজ উধাও! আলো চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকিয়ে দেখে আধার স্যার চেইন লাগিয়ে দিচ্ছে।
আলো কিছু না বলে চুপচাপ ওয়াশরুমে চলে গেল। একটু পর ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে তৈরি হয়ে নিল। পিছনে ফিরতেই আধার একটা ক্রেডিট কার্ড সামনে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-“এটা রাখো।”
-“কেন?”
-“হাতখরচের জন্য।”
আলো তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, -“যেখানে মানুষ হিসেবে আপনাকে পাওয়ার অধিকারটাই আমার নেই, সেখানে আপনার অর্থ বা অন্য কিছু গ্রহণ করার প্রশ্নই আসে না।
ভালো থাকবেন, নিজের ও সবার খেয়াল রাখবেন। আসছি!”
বলেই আলো আর না দাঁড়িয়ে চুপচাপ ল্যাগেজ নিয়ে চলে গেল। আর আধার থমথমে মুখে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল।
-“ঠিকমতো ঔষধ খাবে দাদাজান। আমার জন্য একটুও মন খারাপ করবে না। আর না তো চিন্তা করবে। আমি তাড়াতাড়ি ফিরে আসার চেষ্টা করব। তোমার যদি আমার কথা খুব মনে পড়ে, তাহলে টুপ করে চলে আসবে আমার কাছে। আমি তিনবেলায় তোমাকে ভিডিওকল করব। আর তেলমশলা জাতীয় বেশি খাবার একদম খাবে না। মিষ্টিও কম কম খাবে। শরীর খারাপ করলে কিন্তু আমি আর কথা বলব না তোমার সাথে। আমি চাই আমার দাদাজান সবসময় ফিটফাট থাকুক। নয়তো মেয়েরা পটবে কীভাবে হুহ্?”
আলো বাহিরে এসে দাদাজানের পাশে বসে একনাগাড়ে কথাগুলো বলে। সোবহান খান হেঁসে মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
-“ঠিক আছে। সব মানবো। আর তুমিও নিজের খেয়াল রাখবে। কোনো সমস্যা হলে অবশ্যই জানাবে তোমার দাদাজানকে।”
আলো একগাল হেঁসে দাদাজানকে জড়িয়ে ধরে টুপ করে গালে চুমু খেয়ে বলল, -“লাভ ইউ দাদাজান।”
সোবহান খান মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে মেয়েটার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিসিয়ে বললেন, -“তোমার পথ চেয়ে কিন্তু আমি অধীর আগ্রহে বসে থাকব নাতবউ। আশা করছি আমার এই অপেক্ষার প্রহর তাড়াতাড়ি শেষ হবে। তুমি আমাকে কখনো নিরাশ করবে না কেমন?”
-“ইনশাআল্লাহ দাদাজান। তোমার আলো কখনোই তোমাকে কষ্ট দিবে না!”
সোবহান খান মুচকি হেঁসে মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিলেন। আলো হাসিমুখে বিদায় নিয়ে বাবার সাথে চলে গেল। গাড়িতে বসার পর জানালা দিয়ে মাথা বের করে বাড়িটাকে দেখে নিল। ভেবেছিল আধার স্যার তাকে এগিয়ে দিতে আসবে। কিন্তু মানুষটার কোনো অস্তিত্বই দেখতে পেল না। আলো দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ততক্ষণে গাড়িটা নিজ গতিতে চলতে শুরু করে দিয়েছে। তবুও মেয়েটা এখনো চেয়ে আছে, পিছনে ফেলে আসা তার অনাকাঙ্ক্ষিত ছোট্ট সংসারের প্রাণে। যতদূর পর্যন্ত দেখা গেল, ঠিক ততোদূর পর্যন্ত অপলক নয়নে তাকিয়ে ছিল। আজ থেকে মানুষটা নিশ্চয়ই শান্তিতে থাকবে। দিনের বেলাতেও কেউ জ্বালাবে না, আর রাতের বেলাতেও কেউ ঘুমের ঘোরে কাছে গিয়ে বিরক্ত করবে না!
আলো ফিচেল হেঁসে মাথা ভেতরে ঢুকিয়ে বাবার কাঁধে মাথা রেখে চোখদুটো বুঁজে নিল। খান বাড়ির সামনে থেকে তাদের গাড়িটা অদৃশ্য হলেও দোতলার রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা এক মানবের ছায়া এখনো স্পষ্ট!
বহুদিন পর নিজ বাড়িতে এসে প্রাণভরে শ্বাস টেনে নিল আলো। এখন কিছুটা হলেও মনটা হালকা লাগছে। ছোট বোনের সাথে নিজের রুমে এসে ধপ করে বিছানার ওপর বসল। মায়া ফলের জুস নিয়ে এসেছে। মেয়েটা এবার জেএসসি দিবে। তাদের বাড়ির ছোট সদস্য ও।
-“আপু নাও।”
আলো মুচকি হেঁসে মায়ার হাত থেকে জুসের গ্লাসটা নিল। ছায়া বড় আপুর হাত খেয়াল করে অবাক কণ্ঠে বলল,
-“তোমার হাতে কী হয়েছে আপু?”
আলো জুস খেতে খেতে নিজের হাত দুটো দেখে ধীর কণ্ঠে বলল, -“সংসার করতে গেলে টুকটাক এমন ছ্যাকা খেতে হয়।”
-“দুলাভাই তোমার সাথে এল না কেন আপু?”
-“উনি ব্যস্ত মানুষ। এত সময় আসে নাকি উনার?”
ছায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে আওরায়, -“তুমি অনেক শুকিয়ে গেছো আপু।”
আলো হেঁসে বলল, -“নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগবেই। যাইহোক, অনেক রাত হয়ে এসেছে। তোরা গিয়ে ঘুমিয়ে পড়। আমিও ঘুমাব।”
ছায়া আর মায়া মাথা নাড়িয়ে চলে গেল। আলো কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে রুমের লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ল।
আলেয়া রহমান রুমে এসে দেখলেন উনার স্বামী রকিং চেয়ারে বসে থেকে কিছু একটা ভাবছেন। তিনি এগিয়ে এসে জানতে চাইলেন,
-“কী হয়েছে? আপনাকে এত চিন্তিত লাগছে কেন? সব ঠিক আছে?”
মতিউর রহমান জোরে শ্বাস ফেলে বললেন, -“সবকিছু ঠিক থেকেও যেন কিছু একটা ঠিক নেই।”
-“কোনো সমস্যা হয়েছে?”
-“আমার মেয়েটা ওখানে ভালো নেই আলেয়া। একটুও ভালো নেই।”
স্বামীর মুখে এমন কথা শুনে আলেয়া রহমান চমকে উঠলেন। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, -“এসব কী বলছেন আপনি? মেয়েটা ওখানে ভালো নেই মানে? তাহলে কী আধার এখনো বিয়েটা মেনে নেয়নি?”
-“উঁহু।”
আলেয়া আঁতকে উঠলেন। -“এখন কী হবে?”
মতিউর রহমান চেয়ারে মাথা ঠেকিয়ে দু’চোখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, -“জানি না। তবে এইটুকু বুঝতে পারছি, মেয়েটার ভালো করতে গিয়ে অজান্তেই মরীচিকার মাঝে ফেলে দিয়েছি। যেখানে থাকাটাও কষ্টকর এবং বের হয়ে আসাটাও আরো বেশি কষ্টকর!”
মামার বাড়িতে এসে আজ দিয়ে এক সপ্তাহ হলো। আলো সবকিছু ভুলে নিজের মতো জীবন উপভোগ করছে। সে আবার অহেতুক কিছু নিয়ে নিজেকে কষ্ট দিতে বা চিন্তায়, চিন্তায় ডিপ্রেশনে যেতে মোটেও ইচ্ছুক নয়! তার কাছে সবার আগে নিজেকে খুশি রাখা। কারণ সে নিজেকে প্রচুর ভালোবাসে। কেউ তাকে পছন্দ করে কি-না করে না, এতে একটুও মাথা ব্যথা নেই। তবে মাঝেমধ্যে মনটা বেইমানি করে তার সাথে। যেটা ভীষণ বিরক্তিকর!
আলো নীল সমুদ্রের জলে নগ্ন পায়ে হেঁটে চলেছে৷ তার মামার বাড়ি কক্সবাজারে হওয়ার সুবাদে এখানে এলেই সমুদ্রবিলাস করতে পারে। এর জন্য তার পছন্দের জায়গা হচ্ছে মামার বাড়ি। তাই তারা চার ভাই-বোনে চলে এসেছে ঘুরতে। এ ক’দিনে ওই বাড়ির লোকজনের মধ্যে শুধু দাদাজানের সাথেই কথা হয়েছে। এছাড়া আর কারোর সাথেই কথা হয়নি। আলো একবার ভেবেছিল স্যার নামক স্বামীকে কল দিবে। কিন্তু তার কাছে তো মানুষটার নাম্বারই নেই। সে চাইলে অন্য কারোর থেকে নিতে পারত, কিন্তু নেয়নি। যে মানুষটা তাকে ভুলে গিয়েছে, সেখানে আগ বাড়িয়ে ফোন-আলাপ করা মানায় না। যে যার মতো ভালো থাকুক!
-“এ্যাই আপুউউউ! দাঁড়াও দাঁড়াও।”
পিছন থেকে ছোট বোনের চিল্লানির আওয়াজ পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় আলো। অদূর থেকে ছায়া আর মায়া দৌড়ে আসছে। সে আশেপাশে তাকিয়ে দেখে এক জায়গায় রহিত ভাইয়া দাঁড়িয়ে থেকে ফোনে কথা বলছে। আর তার পাশে গুটিশুটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেঘলা আপু।
-“এই অসময়ে পানিতে ভেজার প্ল্যান করেছো নাকি? বাবা আসার সময় পইপই করে নিষেধ করেছে, সমুদ্রের পানিতে বেশি গোসল না করতে। কিন্তু তুমি? তুমি তো পারলে তিন বেলায় পানিতে ভিজো।”
ছায়ার কথা শুনে আলো বলল, -“বেশি পকপক না করে চল, কাঁকড়া খাবো।”
ছায়া আর মায়া মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল। তারা তিনবোন এগিয়ে গেল রহিতদের কাছে। তারপর একটু ঘোরাঘুরি, খাওয়াদাওয়া করে বাড়িতে ফিরে গেল।
-“এই আলো? তোর বরটা কী তোকে একটুও মিস করে না?”
ডিনার শেষে অন্ধকার রুমে বসে থেকে ল্যাপটপে মুভি দেখছিল সবাই মিলে। তখন মেঘলা আলোর উদ্দেশ্যে ফিসফিসিয়ে কথাটি বলে। মামাতো বোনের কথা শুনে আলো আইসক্রিম খেতে খেতে জিজ্ঞেস করল,
-“হঠাৎ এই প্রশ্ন?”
-“না মানে, এতদিন হয়ে গেল বউ বাইরে আছে। অথচ মানুষটা একবারের জন্যও তোকে কল দিল না। সব ঠিক আছে তো?”
আলোর খাওয়া থেমে গেল। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। আসলেই কী সবকিছু ঠিক আছে? উঁহু, নেই তো। কিছুই ঠিক নেই। তার সবটাই এখন এলোমেলোর পথে। আবছা আলোর মাঝে মেয়েটার মলিন চেহারা খেয়াল করে রহিত মেঘলার মাথায় চাটি মে’রে বলল,
-“তোর এই বোঁচা নাকটা সব বিষয়ে না গলালে হয় না?”
মেঘলা মা’র খেয়ে বিরবির করে বলল,
-“আমি আবার কী করলাম?”
-“পরে বুঝাচ্ছি তুই কী করেছিস। এখন মুখ বুঁজে চুপচাপ মুভি দেখ। নয়তো ঘাড় ধরে বের করে দিবো বেয়াদব।”
মেঘলা ছলছল চোখে তার বড় ভাইয়ের দিকে তাকায়। মাহিন ঠোঁট কামড়ে হেঁসে বলল, -“জানিস তো ও কেমন! চুপচাপ মুভি দেখ।”
মেঘলা কিছু না বলে মুখ ফিরিয়ে নেয়। অন্যদিকে ছায়া আর মায়া ঘুমে ঢুলছে। তখন বাজে রাত একটা। মুভি দেখা শেষে যে যার মতো চলে যায়। মায়া মেঘলার রুমে থাকে এবং ছায়া তার আপুর রুমে থাকে।
-“শুনুন?”
রহিত রান্নাঘরে এসেছিল ফ্রিজ থেকে পানির বোতল নিতে। পানি খেতে খেতে পিছনে ফিরতেই দেখতে পায় মেঘলা দাঁড়িয়ে আছে। পরণে লং টি-শার্ট, প্লাজু ও গলায় ওড়না পেঁচিয়ে রাখা। এবার অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। বেবি ফেসের জন্য বয়স বোঝা দায়। হাইট তার ঠিক বুক পর্যন্ত হবে মেবি। রহিত কিছুক্ষণ মেয়েটাকে পর্যবেক্ষণ করে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে লাগল। তখন পিছন থেকে মিহি কণ্ঠে ডেকে ওঠে মেঘলা। রহিত থেমে গিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“বল!”
মেঘলা দু’হাত কচলাতে কচলাতে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“না মানে, আসলে….আপনি এই বিয়েতে মন থেকে রাজি হয়েছেন?”
-“আজকাল তুই কিন্তু একটু বেশিই কথা বলছিস।”
মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ থেকে শান্ত গলায় বলল,
-“দেখুন আমি একটুও চাই না, আপনি শুধুমাত্র আপনার পরিবারের কথা ভেবে আমাকে বিয়ে করুন। আপনি যদি এই বিয়েতে রাজি না থাকেন তাহলে প্লিজ বলে দিন। আমি আর এসব নিতে পারছি না।”
কথাগুলো বলতে বলতে মেঘলার চোখদুটো ভরে উঠলো। এই মানুষটা কেন তার ভালোবাসা বুঝতে পারে না? সে যে এই লোকটাকে প্রচুর ভালোবাসে। তাই তো বেহায়ার মতো বাবার কাছে আবদার করেছিল এই মানুষটাকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে। তারপর দুই পরিবার বসে আলাপ-আলোচনা করে তাদের বিয়েটা ঠিক করল। আর তিনমাস পর তাদের বিয়ে। কিন্তু সে চেয়েও খুশি হতে পারছে না এই লোকটার অদ্ভুত বিহেভিয়ারের জন্য। সবসময় তাকে দূর দূর করে! তাই আজ মনে সাহস জুগিয়ে কথা বলতে এসেছে। কারণ সে চায় না, বিয়ের পর কোনোরকম অশান্তি হোক।
রহিত কাউন্টারের ওপর বোতল রেখে পিছনে ফিরে মেঘলার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
-“তোর কেন মনে হচ্ছে, আমি এই বিয়েতে মন থেকে রাজি না?”
-“কারণ আপনি আমাকে মোটেও পছন্দ করেন না। একটু সুযোগ পেলেই বকাবকি করেন নয়তো মা’রেন।”
-“ঠিক আছে। এখন থেকে নাহয় তোকে শুধু আদরই করব। চলবে?”
-“হু!”
অন্যমনষ্ক হয়ে জবাব দিতেই মেঘলার চোখ দুটো বড়বড় হয়ে গেল। সে তড়াক করে মাথা তুলে উপরে তাকাতেই এক জোড়া শক্ত-পোক্ত হাত এসে তার কোমর এবং ঘাড় চেপে ধরে কাছে টেনে নিল। মেঘলা বিস্ময়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকায় রহিতের ঘোর লাগা চোখের দিকে। সে কিছু বলতে যাবে তখনই তার ঠোঁট জোড়া শক্ত করে আঁকড়ে ধরল রহিত।
মেয়েটা এক মূহুর্তের জন্য থমকে যায়। পরক্ষণে দু’হাতে প্রিয় মানুষটার মাথার পিছনের চুলগুলো খামচে ধরে আবেশে আঁখি জোড়া বুজে নিল। তার চোখের কুর্ণিশ বেয়ে দুই ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তবে এটা কষ্টের নয়, বরং সুখের। কারণ সে তার সকল প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেয়ে গেছে আজ!
ফোনের ককর্শ শব্দে আলোর কাঁচা ঘুম ভেঙে যায়। সে সবেমাত্র শুয়েছিল। অথচ ঘুম ধরতে না ধরতেই উবে গেল। আলো একরাশ বিরক্তিতে পাশে থাকা টি-টেবিল হাতড়ে নিজের ফোনটা নিয়ে কল রিসিভ করে কানে ধরে ঘুমু ঘুমু কণ্ঠে বলল,
-“আসসালামু আলাইকুম! কে বলছেন?”
অপর প্রান্ত থেকে কেউ কিছু বলল না। আলো জোরে শ্বাস নিয়ে বলল, -“কথা যখন বলবেনই না, তখন অযথা রাতবিরেতে কল দিয়ে একটা মেয়েকে ডিস্টার্ব করেন কেন?”
এবারেও নিশ্চুপ। আলো কল কেটে দিল। কিন্তু আবারো ফোন এল।
-“হ্যালো? কে বলছেন?
-“………..”
-“শালার ঘরে বেয়াদব শালা, আমার সুন্দর ঘুমটা নষ্ট করে এখন বোবার ভান ধরে থাকা হচ্ছে? তোর কপালে বোবা বউ জুটবে দেখিস।”
বলেই খট করে লাইন কেটে দিল আলো। ফোনটা রেখে চোখ বুজে ঘুমানোর চেষ্টা করল। কিন্তু পর মূহুর্তে আবারো
কল এল। আলো দাঁত কিড়মিড় করে কলটা রিসিভ করে কানে গুঁজে বলল,
-“এই ভাই আপনার সমস্যা কী হুহ্? কিছু বলার থাকলে বলুন, নয়তো আমাকে ঘুমাতে দিন। নাহলে আপনার নামে মামলা ঠুকে দিবো। তখন জেলে বসে থেকে শক্ত রুটি চিবোতে চিবোতে মেয়েদের মাঝরাতে ফোন দিয়ে বিরক্ত কইরেন।”
অপর প্রান্ত থেকে শুধু ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা গেল। আলো তপ্ত শ্বাস ছেড়ে কেটে দিল। ফোন সাইলেন্ট করতে যাবে তখনই খেয়াল করল, আবার কল এসেছে অচেনা নাম্বার থেকে। আলো একটু সময় নিয়ে রিসিভ করে কানে গুঁজে চুপ করে থাকল। তারপর বিরবির করে বলল,
এক মুঠো চাঁদের আলো পর্ব ১০
-“আই অ্যাম নট সিঙ্গেল। আমার স্বামী, বাচ্চাকাচ্চা সব আছে। সো আমাকে লাইন মে’রে কোনো লাভ নেই। উল্টো আপনারই ক্ষতি হবে। আমার বরটা এক নাম্বারের সাইকো। উনি যদি জানতে পারে আপনার জন্য আমার ঘুম নষ্ট হয়েছে, তাহলে শিওর আপনার ঘুম কেঁড়ে নিবে৷ তাও সারাজীবনের জন্য। তাই বলছি, ভালো হয়ে যান। আবার যদি কল দেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে আপনি ছাগলের তিন নাম্বার ব্রেনলেস ছাও!”

Taratari din na porer part ta erokom vabe upload koren keno protidin korte paren na