অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১৬
শ্রাবণী ইয়াসমিন
রাশিয়া – ড্রেভেন ম্যানশন | দুপুর ৩:১০ | বিলাশবহুল বসার কক্ষ।
তিনতলা ড্রেভেন ম্যানশনের প্রাসাদসদৃশ বসার ঘরটা এখন যেন ঘন অন্ধকারে মোড়ানো কোনো নাট্যমঞ্চ।
চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন কাজের লোক, নিঃশব্দে। তাদের চোখে মুখে ভয়।
মাঝখানে এক অদ্ভুত নীরবতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আনায়া। তার পাশেই জেভিয়ার গম্ভীর, রক্তমাখা চোখ, ফুলে ওঠা শিরা, থরথর করে কাঁপছে তার হাত-পা।
ভূমিতে ছড়িয়ে আছে একটা দামি ফুলদানির ভাঙা কাঁচ।
ক্রিস্টাল গ্লাসের রক্তজবা রঙা ফুলদানিটি ঠিক জেভিয়ারের পায়ের কাছে গুঁড়িয়ে গেছে।
আর সেই কাঁচের ভাঙা টুকরোর মতই ছড়িয়ে আছে তার ভেতরের রাগ।
এক হাত দিয়ে জেভিয়ার শক্ত করে ধরে রেখেছে আনায়ার বাঁ হাত। তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন জন ড্রেভেন। চোয়াল শক্ত, মুখে কোনো শব্দ নেই। শুধু চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, সেই দৃষ্টিতে যেন প্রশ্নও আছে, আবার হুঁশিয়ারিও।
এরিক্স পাশে দাঁড়িয়ে। মুখ থমথমে। কিছু বলতে গিয়েও যেন বলছে না।
জেভিয়ার কারও দিকে তাকাচ্ছে না,তার দৃষ্টি শুধু কাঁচের ওপর। যেন নিজের রাগকেই দেখে নিচ্ছে সেখানে।
জন ড্রেভেন শেষমেশ নিজের ভারী কণ্ঠে ঠান্ডা কিন্তু কড়া স্বরে বলে উঠলেন,
– তুমি লিও’র সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছো কেন, জেভিয়ার? জানো না, সে আমার খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু? আর ওর মেয়ের সাথে তো তোমার এঙ্গেজমেন্টও হওয়ার কথা ছিলো!
কথাটা শেষ হতেই জেভিয়ারের গর্জন করে ওঠে,
– আ’ম অলরেডি ম্যারিড ড্যাড।এই প্রসঙ্গে আমি আর একটা কথাও শুনতে চাই না।
বসার ঘরে মুহূর্তেই চুপচাপ নিস্তব্ধতা। জন ড্রেভেন এবার আনায়ার দিকে তাকালেন। তাঁর চোখের গভীরতা বোঝা যাচ্ছে না। তারপর তিনি হালকা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে উঠলেন,
– তুমি এই বাচ্চা মেয়েটাকে বিয়ে করেছো, জেভিয়ার সত্যি বলছি, তুমি আজ আমাকে সত্যিকারের হাসালে।
তিনি এবার সরাসরি আনায়ার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন,
– তোমার বয়স কত, আনায়া?
আনায়া একটু চমকে উঠল। এত কিছু ঘটে যাওয়ায় সে এখনো তার পরিচয়টা ঠিক করে কাউকে দেয়নি! তাহলে এই লোকটা তার নাম জানল কীভাবে?
একটা খটকা লাগলেও তবু সে ভাবল,জেভিয়ার নিশ্চয়ই বলেছে তাকে।
আনায়া আস্তে মিনমিন করে বলে,
– উনিশ।
জন এক টুকরো ঠান্ডা হাসি হেসে জোরে বললেন,
– বাহ্! ৩০ বছরের ছেলে আমার ১৯ বছরের এক খুকিমেয়ে বিয়ে করে এনেছে! আর তার থেকেও বড় কথা, তুমি কোন আক্কেলে ওকে বিয়ে করলে, জেভিয়ার?
তুমি তো গিয়েছিলে অন্য কাজে!
জেভিয়ার কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে,
– আহ্ ড্যাড। আমার লাইফ এইটা তো আমি কাকে বিয়ে করব সেইটা আমার ব্যাপার। এই নিয়ে আমি আর কথা বলতে চাচ্ছি না আর নিজের বন্ধুকেও বুঝিয়ে বলে দিও কথাটা। নেক্সট টাইম আমাকে যদি তার মেয়ের সাথে বিয়ের কথা বলে, তাহলে তার মুখ ভেঙে আমি তার হাতে ধরিয়ে দিবো। মাইন্ড ইট।
এই বলেই জেভিয়ার গটগট পায়ে আনায়ার হাত ধরে ওপরে চলে যায়।
তখন মিস্টার লিও জেভিয়ার কে তার গাড়িতে আসতে বলেছিলো মূলত ইলোরা আর জেভিয়ার এর এঙ্গেজমেন্ট এর ব্যাপারে কথা বলার জন্য। এখন যেহেতু ওরা দেশে ফিরেছে তিনি ভেবেছিলেন শুভ কাজ টা দ্রুতই শেষ করবেন। তবে এই প্রসঙ্গে কথা উঠাতেই জেভিয়ার রেগে গিয়ে তাকে কিছু কথা শুনিয়ে মাঝ পথেই গাড়ি থেকে নেমে যায়।
আনায়া গোসল করে জেভিয়ার এর বিশাল রুমে বিছানার ওপর বসে আছে আর আশে পাশে চোখ ঘুরিয়ে দেখছে। রুমটা আধুনিকতার নিখুঁত সংমিশ্রণ।
মার্বেলের চকচকে মেঝে, দামী শ্যামল ধূসর কার্পেট, একপাশে কাঁচের বিশাল জানালা যার বাইরে দেখা যায় বরফে ঢাকা মস্কোর দূরের পাহাড়, আরেক কোণায় কালো কাঠের বইয়ের তাক সব কিছুতেই যেন এলিট এক রাজকীয়তা। ছাদ থেকে ঝুলে আছে এক বিশাল জার্মান ক্রিস্টাল লাইট হালকা সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়ছে সারা ঘরে।
আনায়া বিছানার উপর দু’পা গুটিয়ে বসে, চারপাশটা তাকিয়ে দেখছে। জেভিয়ার রুমে নেই, সে এখন গোসলে।
একটু পর, ওয়াশরুম থেকে দরজা খোলার শব্দ এলো।
জেভিয়ার বেরিয়ে এলো মাথায় সাদা তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছছে, আর শরীরে একটা সফেদ রঙের তোয়ালে শুধু কোমরের নিচে প্যাঁচানো।
আনায়া মুহূর্তেই চোখ তুলে তাকাল। তার চোখ একদম স্থির হয়ে গেলো জেভিয়ারের শরীরের উপর ফিটনেস করা সেই শরীর, ডিফাইনড অ্যাবস আর শার্প জ-লাইন। ভেজা চুল এক পাশ হয়ে গড়িয়ে আছে, আর চুলের পানি বেয়ে পড়ছে কাঁধ হয়ে পিঠে।
তার গা থেকে ফোটা ফোটা পানি বালিশের কভারে গড়িয়ে পড়ছে পুরো দৃশ্যটাই যেন কোনো হাই ফ্যাশন ম্যাগাজিন থেকে উঠে আসা লাইভ ফ্রেম।
জেভিয়ার তীক্ষ্ণ চোখে আনায়াকে পর্যবেক্ষণ করছে। আনায়া নিজেকে শুধু সফেদ রঙের তোওয়ালে দিয়ে পেচিয়ে রেখেছে যার ফলে তার ফর্সা হাটু দেখা যাচ্ছে আর বুকের অনেকটা অংশ উন্মুক্ত হয়ে বুকের খাজ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। সে ধীরে ধীরে হেঁটে এসে আনায়ার সামনে দাঁড়াল।
তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
– তুমি কি আমাকে সিডিউস করার জন্য এইভাবে বসে আছো?
আনায়া ওর চোখে চোখ রাখে। জেভিয়ারের মুখটা অস্বাভাবিক সুন্দর লাগছে আজ গালের দাড়িগুলো ছাঁটা, শেইপড ন্যাচারাল হ্যান্ডসোমনেস যেন আরেক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আনায়া হালকা দুষ্টু চোখে তাকিয়ে এক কোণে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
– হ্যাঁ, অবশ্যই। তুমি কি সিডিউস হচ্ছো নাকি? আমি তো জানি বুড়োরা সহজে সিফিউস হয়না।
জেভিয়ার চোখ ছোট ছোট করে বলে,
– আমি বুড়ো?
– তুমি ৩০ বছরের বুড়ো, আর আমি নাকি তোমাকে ২৬/২৭ বছরের যুবক ভেবেছিলাম, ভাবা যায়! তাইতো বলি তুমি এত দুর্বল কেন?
জেভিয়ার একবার নিজের ঘাড় বাকা করে আনায়ার দিয়ে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বলে,
– কিহ? আমি দুর্বল? আ’ম অলওয়েজ অ্যান এক্সপার্ট, স্পেশালি ইন বেড গেমস। হু নোওস বেটার দ্যান ইউ?
আনায়া নিজেকে কিছুটা সামলে নেয়, আর কিছু বলে না। সে এখন ঘুমন্ত নেকড়ে কে জাগাতে চায় না।
এরপর আনায়া চোখ নামিয়ে আস্তে করে বলে,
– আমার ব্যাগ খুজে পাইনি আমি। তোমার ভাই কই যেন রেখেছে। তাই আমি গোসল করে এসে পড়ার জন্যও কিছু পাইনি।
একটু থেমে আবার বলে,
– তোমাকে সিডিউস করার চেষ্টা করছি না একটুও। আমি শুধু মজা করে বলেছি।
জেভিয়ার ঠোঁট বাকিয়ে বলে,
– তবে আমি তো অলরেডি সিডিউস হয়ে গিয়েছি।
– ইউ আর লুকিং সো হর্ণি লাভবার্ড। আমার হর্ণি পাখি।
জেভিয়ার ধীরে ধীরে আনায়ার দিকে ঝুকে এগোতে থাকে। আনায়া হাতে ভর দিয়ে পেছনে যেতে থাকে। তবে শেষ রক্ষা হলো না। জেভিয়ার আনায়ার হাত চেপে ধরে বিছানায় ফেলে দেয় তাকে। আনায়ার দিকে ঝুকে আনার লালচে ঠোঁটজোড়া দখল করে নেয়। আনায়া জেভিয়ার কে ধাক্কাতে থাকে তবে জেভিয়ারকে এক চুল পরিমাণও সরাতে পারেনা।
জেভিয়ার আনায়ার গায়ের তোওয়ালে খোলার জন্য এক কোনা ধরে টান দিতে যাবে তিখনই আনায়া গায়ের তোওয়ালে চেপে ধরে চোখ বড় বড় করে হালকা কাপা কণ্ঠে বলে,
– আ..আমি মাত্রই শাওয়ার নিয়ে এসেছি জেভিয়ার। দ..দেখো, তুমি এখন আবার আমার দিকে এইভাবে এগোচ্ছো কেন?
– কজ,আই ওয়ান্ট টু ফা*ক ইউ বেইবি।
জেভিয়ার ভাবলেশহীন ভাবে জবাব দিয়ে সাথে সাথে এক টান মেরে তোওয়ালে খুলে ফেলে। আনায়ার উন্মুক্ত ফর্সা দেহ তার সামনে উন্মুক্ত হয়।
জেভিয়ার আনায়ার সম্পূর্ণ শরীরে ছোট ছোট করে কামড় দিতে থাকে। সে আনায়ার বুকের স্পর্শকাতর জায়গাটিতে নিজের মুখ ডুবিয়ে দেয়। আনায়া কেপে কেপে ওঠে।
আনায়া তাকে সরানোর জন্য হাত দিয়ে ঠেলতে থাকে। জেভিয়ার আনায়ার হাত চেপে ধরে তার লম্বা চিকন চিকন দুটো আঙুল নিজের মুখে পুড়ে নেয়। আনায়া আঙুলে উষ্ণ তাপ পেয়ে তার হাতও কাপতে থাকে।
আচমকাই কেউ দরজায় কড়া নাড়তে থাকে। আনায়া ছিটকে কিছুটা দূরে সরে যেতে চায় তবে জেভিয়ার এর শক্তপোক্ত বাধন থেকে নিজেকে ছাড়াতে পারে না। দরজায় আবারও কেউ কড়া নাড়ে। আনায়া জেভিয়ার এর মাথা ধরে তাকে নিজের বুক থেকে উঠাতে চায়। তবে বরাবরের মত এইবারও ব্যর্থ হয়।
দরজায় অনবরত শব্দ হয়েই চলেছে। আনায়া জেভিয়ার এর চুল টেনে ধরে উঠাতে চায়। জেভিয়ার ভ্রু কুচকে আনায়ার দিকে তাকায়,
– সমস্যা কি খামচাখামচি করছো কেন? আমি যখন তোমাকে টেস্ট করায় ব্যস্ত থাকবো অবশ্যই তখন ভুল।করেও আমাকে ডিস্টার্ব করবে না। নয়ত তুলে এক আছাড় মারবো।
আনায়া ফিসফিস করে বলে,
– অনেকক্ষণ ধরে কেউ ডাকছে দেখো না একবার। হয়ত তোমার বাবা এসেছে।
– সো হোয়াট? আমি আমার প্রাইভেট টাইমে কারও ডিস্টার্বেন্স সহ্য করি না।
আনায়া জেভিয়ার কে ঠেলেঠুলে বিছানা থেকে নামিয়ে দরজা খুলতে পাঠায়।
জেভিয়ার দরজা খুলে সামনে তাকাতেই তার রাগের মাত্রা তরতর করে বেরে যায়।তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এরিক্স। এরিক্স কিছু বলার জন্য মুখ খুলবে তার আগেই ভেসে আসে জেভিয়ার এর গর্জন।
– আউট।
এরিক্স ভ্রু কুচকে বলে,
– আউট মানে? আমি কি আড্ডা দিতে এসেছি নাকি? তোর সাথে আমার দরকারি……
পুরো কথা শেষ হওয়ার আগেই জেভিয়ার এরিক্স এর শার্টের বাম পাশে কর্লার চেপে ধরে বলে,
– আই সেইড গো ফ্রম হেয়ার।
এরিক্স রাগী চোখে জেভিয়ার এর দিকে তাকিয়ে আছে। সে জেভিয়ার কে একটা ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে সরিয়ে নিতে চায়। তবে ধাক্কায় জেভিয়ার এর নড়ে উঠলেও তাকে সরাতে পারেনি। কিছুক্ষণ পর জেভিয়ার এরিক্স কে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।
এরিক্স দরজার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গটগট পায়ে নিচে চলে যায়। এসে সরাসরি তার বাবার ঘরে গিয়ে পাশেই একটা কাচের টেবিলে জোরে করে লাথি বসায়। সাথে সাথেই টেবিলটা উলটো হয়ে পড়ে ভেঙে যায় কয়েক টুকরো হয়ে। তার বাবা তার দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে শান্ত ভাবে। আজ বেশ অনেকদিন পর সে এরিক্স কে এইভাবে রেগে যেতে দেখলো।
এরিক্স রাগে ফুঁসছে। একটার পর একটা দামি জিনিসপত্র ভেঙে ফেলছে। গ্লাস টেবিলটা গুঁড়িয়ে গেছে, পাশে রাখা মার্বেলের ফুলদানি ছিটকে পড়েছে মেঝেতে। এবার সে ঘুরে গিয়ে একটা নরম সোফায় লাথি মারলো। প্রচণ্ড শব্দ হলো।
জন ড্রেভেন উঠে এসে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
– এরিক্স! শান্ত হও। জেভিয়ার কোথায়?
এরিক্স দাঁতে দাঁত চেপে রাগে কাঁপছে। চোয়াল শক্ত করে বলল,
– ওই ফা*কা*র কেই ডাকতে গিয়েছিলাম… আর ও আমায়… আমায় অপমান করলো! কার সামনে জানো? ওর ওই দুদিনের জন্য ভাড়া করা বউটার সামনে!
তার চোখ লাল হয়ে গেছে। রাগে মুখ কাঁপছে।
– আজ আমায় যা বলেছে, সেটা আমি সারাজীবনেও ভুলবো না। আমি ওকে এই বাড়িতে আর রাখবো না। না ওকে, না ওর ওই অভিনয়ের রানীকে! দেখো তুমি… আমি কী করি!
জন ড্রেভেন তার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এরপর পকেট থেকে ফোন বের করলেন।
– দশ মিনিটের মধ্যে এসো আমার বাড়িতে।
ফোন কেটে তিনি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ।
এরিক্স তখনো পেছনে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে, চোখের কোণায় রাগে জল জমে গেছে।
প্রায় দশ মিনিট পর বিলাসবহুল একটা কালো গাড়ি এসে থামল ড্রেভেন ম্যানশনের সামনে। দরজা খুলে নেমে এলো এক অসাধারণ সুন্দরী নারী। বয়স আনুমানিক ২৬-২৭ বছর। পরনে ছিমছাম, ছোট ও ফিটিং পোশাক। সোনালি রঙা সোজা চুল কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে। ঠোঁটে টকটকে লাল রঙের লিপ্সটিক। হাই হিল পরে ধীর পায়ে হেঁটে ভেতরে প্রবেশ করল।
জন ড্রেভেন তার দিকে তাকিয়ে মাথা হালকা নাড়লেন,
– ওকে নিয়ে যাও এখান থেকে।
মেয়েটির নাম লরিনা। চোখে একধরনের ঠাণ্ডা তীক্ষ্ণতা। সে এগিয়ে এলো এরিক্সের দিকে, মুখে কোনো কথা নেই।
এরিক্সও কিছু না বলে তার দিকে তাকাল। বুঝে গেল কী করতে হবে।
তার চোখে রাগের ছায়া এখনো টাটকা, কিন্তু পেছনে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছেও নেই।
চোখের ইশারায় মেয়েটিকে হাঁটার ইঙ্গিত দিলো।
লরিনা এগিয়ে গেল, এরিক্স তার পেছনে।
যেতে যেতে এরিক্স দাঁড়িয়ে একবার ফিরে বলল,
– ড্যাড, তোমার বড় ছেলেটাকে একটু সামলে রেখো। নেক্সট টাইম… পরিণতি অনেক ভয়ঙ্কর হবে।
তখন এরিক্সের মুখের ওপর দরজা ধপ করে বন্ধ করে দিয়ে সামনে তাকিয়ে এতক্ষণের গম্ভীর মুখটা আরও কুঁচকে যায়। সে ঘুরে দাঁড়িয়ে বেডের দিকে তাকায়… কিন্তু বিছানা খালি।
তার চোখ তৎক্ষণাৎ তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে। ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকায়। ঘর নিস্তব্ধ। কোথাও আনায়ার কোনো সাড়া নেই।
হঠাৎই তার চোখ পড়ে ওয়াশরুমের দিকে।
ওয়াশরুমের দরজাটা সামান্য ফাঁক। সেই ফাঁক গলিয়ে এক জোড়া কৌতুহলী চোখ তাকিয়ে আছে ঠিক তার দিকেই। দরজার ফাঁক দিয়ে শুধু মাথাটুকু বের করে রেখেছে সে।
জেভিয়ারের কুঁচকে থাকা ভ্রু আচমকাই শিথিল হয়ে আসে। চোখে একরকম শান্ত বিষাদ জমে ওঠে।
সে ধীর পায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে… ঠিক তখনই।
আনায়া দ্রুত দরজাটা ভেজিয়ে দেয়। কিন্তু তার এই হঠাৎ প্রতিক্রিয়া যেন জেভিয়ারের বুকের কোথাও কাঁটা ফুটিয়ে দেয়।
রাগে হাত মুষ্ঠি করে ঠোঁট চেপে ধরে। তবে কিছু একটা মনে করে শুধু নিজের হাতঘড়ির দিকে একবার তাকায়। সময় দেখে ধীরে ধীরে রেডি হতে শুরু করে।
স্যূট পরে, হালকা পারফিউম স্প্রে করে, চুলে আঙুল চালিয়ে নিজেকে গুছিয়ে নেয়। দরজার পাশে রাখা ব্যাগটা তুলে নেয় নিজের প্রয়োজনীয় ফাইলসহ।
আর একবার ওয়াশরুমের দিকে তাকইয়ে বেরিয়ে পড়ে।
২০ মিনিট পর ওয়াশরুমের দরজা খুলে আনায়া ধীরে পা ফেলে বের হয়। ভেজা চুল থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে এখনক। গালে হালকা রক্তিমতা, চোখে ঘোলাটে অভিব্যক্তি।
বিছানার দিকে তাকিয়ে পড়ে যায় তার দৃষ্টি। খাটের ওপরে রাখা একটা ব্যাগ। সে নিরবে এগিয়ে যায় ব্যাগটার দিকে। চোখে একধরনের সংশয় নিয়ে চেইন খুলে দেখল ভিতরে তার জন্য রাখা একটা সুন্দর, পরিষ্কার ড্রেস।
একটা হালকা গোলাপি কালারের ড্রেস। সঙ্গে হালকা পারফিউমের সুবাস লেগে আছে। আনায়া নীরবে সেটা বের করে নেয়। ধীরে ধীরে শরীরে জড়িয়ে নেয় ড্রেসটা।
রাত অনেক গভীর হয়েছে চারদিক নিস্তব্ধ।
মস্কোর জানালা বেয়ে হালকা তুষারপাত পড়ছে বাইরের আলো ঘরের দেয়ালে সাদা নরম ছায়া ফেলে যাচ্ছে।
আনায়া বিছানার ওপর নিঃশব্দে শুয়ে আছে। দৃষ্টিটা ছাদে আটকে আছে অনেকক্ষণ ধরে, যেন ঘড়ির কাঁটার মতোই এক জায়গায় থমকে গেছে সব কিছু।
শুধু একবার সার্ভেন্ট এসে টেবিলে খাবার রেখে গিয়েছিলো। আদেশ ছিলো, সে যেন রুম থেকে না বের হয়। স্পষ্টভাবে বলা – “ঘর থেকে বের হওয়া নিষেধ।”
কে বলেছে? অবশ্যই জেভিয়ার।
কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি, শুধু চোখে তাকিয়ে কঠোর স্বরে বলে গিয়েছিলো বিকেলের আগে-
“ডোর লকড থাকবে। ডোন্ট ইভেন ট্রাই টু গেট আউট।”
আনায়া কিছু জিজ্ঞেস করেনি। জেভিয়ার এখনো ফেরেনি বাড়িতে।
নির্জনতা কানের পাশে ফিসফিস করে যেন বলছে-
“তুমি বন্দি, তুমি অবাঞ্ছিত, তুমি একটা সমস্যা।”
আনায়া ধীরে উঠে বসল। খাবারে হাত দেয়নি এখনো।
টেবিলে রাখা হালকা গরম স্যুপের ভাপও এখন আর নেই। ঠান্ডা হয়ে এসেছে অনেক আগেই।
সে জানালার দিকে এগিয়ে গিয়ে পর্দা সরায়।
বাইরে বরফ পড়ছে, একটানা। হিমশীতল পরিবেশে একটা কাঁপুনি অনুভব করে নিজের শরীরে।
সে হালকা কম্বলে নিজেকে জড়িয়ে আবার বিছানায় ফিরে আসে।
নিজেকে প্রশ্ন করে-
“এভাবে বন্দি হয়ে থাকতে হবে আমাকে? এটাই কি জেভিয়ারের ভালোবাসা?”
আনায়া চুপচাপ বিছানায় গিয়ে আবার শুয়ে পড়ে।
সে কিছুতেই ঘুমোতে পারছে না। পেটের খিদে চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু গলার তৃষ্ণা না। তৃষ্ণায় গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে উঠে দাঁড়ায়। ঘরের আশেপাশে তাকিয়ে দেখে পানি নেই। বোতল ফাঁকা। জগও খালি।
এক মুহূর্ত সে দ্বিধায় পড়ে,
“জেভিয়ার নিষেধ করেছিলো বের হতে, কিন্তু এখন?”
তবু বাধ্য হয়ে দরজার লক টিপে ধীরে পা ফেলে রুমের বাইরে বের হয়। ড্রেভেন ম্যানশনের করিডোর নিঃস্তব্ধ।
চারদিকে গা ছমছমে অন্ধকার। শুধু সামান্য আলোর রেখা পড়েছে সিঁড়ির বাঁক ঘেঁষে রাখা ছোট্ট ল্যাম্প থেকে।
সে ধীরে ধীরে নিচে নামতে থাকে। হঠাৎই একটা গোঙানির শব্দ ভেসে আসে। আনায়ার পা থমকে যায়।
শব্দটা ডানদিকের করিডোর থেকে, তার শশুরের রুমের দিক থেকে আসছে। ভ্রু কুঁচকে তাকায় সে। বুকের ভেতর কেমন দুরুদুরু করছে। সে আরেকটু এগিয়ে যায়। পায়ের শব্দ না হয়, এমনভাবে হাঁটছে যেন মেঝে ছুঁয়ে নেই ওর পা।
ঠিক তখনই ঝট করে দরজা খুলে যায়। আনায়া চমকে পেছনে সরে দাঁড়ায়। রুম থেকে বেরিয়ে আসে তাদের বাড়ির এক নারী সার্ভেন্ট।
তার চোখ ছলছল, চুল এলোমেলো, গায়ের পোশাক অগোছালো আর আর তার গালে, হাতে, ঘাড়ে স্পষ্টভাবে লালচে কালশিটের দাগ।
আনায়া হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে. সার্ভেন্ট মেয়েটা মাথা নিচু করে, কাঁপতে কাঁপতে দ্রুত হাঁটতে শুরু করে।
কোনো কথা বলে না। শুধু গায়ের জামাটা ঠিক করতে করতে গায়েব হয়ে যায় করিডোরের অন্য প্রান্তে।
আনায়া একচোট স্তব্ধ। তার মনে হাজারটা প্রশ্ন দানা বাঁধে এক মুহূর্তে।
অন্তস্থ হৃদয়ের তৃষ্ণা পর্ব ১৫
“ও কী দেখলো এখন?”
“ওই রুমে কী হয়েছিলো?”
ঠিক তখনই তার কাঁধে ঠান্ডা একটা স্পর্শ। কোনো কিছুর আগাম সংকেত ছাড়াই। আনায়া যেন মুহূর্তে পাথর হয়ে যায়।
