Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৩২

মহামায়া পর্ব ৩২

মহামায়া পর্ব ৩২
তুশকন্যা

​‘জার্মানির মিউনিখ’—আজকেট শহরটা যেন রূপকথার কোনো এক বিষণ্ণ রাজ্যে রূপান্তর হয়েছে। ঘড়ির কাঁটায় সকাল দশটা পেরোলেও আকাশের মুখ ভার। মেঘেদের ঘনঘটা চারপাশকে অদ্ভুত ধূসরতায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে। উত্তুরে হাওয়ার ঝাপটায় হাড়কাঁপানো শীতের আভাস।
মিউনিখের ব্যস্ত রাজপথগুলোতে জমে আছে বরফের পাতলা আস্তরণ। শহরের ঠিক মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক স্থাপত্যের এক বিস্ময়কর নাম— ‘ইউনিভার্সিটি হসপিটাল মিউনিখ’। শহরের অন্যতম সেরা এই হসপিটালটি তার অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
হসপিটালের পরিবেশটা শান্ত, কিন্তু এক অদ্ভুত অস্থিরতা যেন কাজ করছে এর করিডোরগুলোতে। ডাক্তাররা ব্যস্ত পায়ে হেঁটে চলছেন, রোগীরা অপেক্ষা করছেন তাদের পালার জন্য। হসপিটালের ভেতরে কৃত্রিম উষ্ণতা থাকলেও বাইরের আবহে বর্তমানে বইছে তীব্র শীতলতা।

​ঠিক সেই মুহূর্তে হসপিটালের সদর দরজার সামনে সশব্দে এসে থামল কুচকুচে কালো রঙের একটি মার্সিডিস জি-ওয়াগন। মার্সিডিসের সেই রাফ অ্যান্ড টাফ লুকের সাথে সামঞ্জস্য রেখে গাড়ির সামনের অংশে জ্বলজ্বল করছে ‘V-Kore’ লেখাটি। এই চিহ্নেই স্পষ্টত বোঝা গেল গাড়ির কাঙ্ক্ষিত সেই ব্যক্তিটি কে!
SUV’র ইঞ্জিন থামার সাথে সাথেই দরজা খুলে বেরিয়ে এল এক বলিষ্ঠ শরীরের দীর্ঘদেহী মানব। নাম তার কেনীথ, তবে মিউনিখের অলিগলিতে সে পরিচিত ‘ভিকে’ কিংবা ‘ভ্যাম্পায়ার কেনীথ’ সম্মোধনে।
​কেনীথের পরনে কুচকুচে কালো হাইনেক সোয়েটার, একই রঙের প্যান্ট আর পায়ে ভারী কালো বুট। তার ওপর চাপানো দীর্ঘকার কালো ওভারকোট। কাঁধ অব্দি তার অবিন্যস্ত ঝাকড়া চুলগুলো হালকা কোঁকড়ানো, যার কিছু অংশ পেছনে এলোমেলোভাবে মেসিবান করে বাঁধা।
কপালে এসে পড়া অবাধ্য চুলগুলো যেন তার তীক্ষ্ণ ভ্রু জোড়াকে আড়াল করার বৃথা চেষ্টা করছে। স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশিই লালচে চোখজোড়ায়, অবাধ ক্লান্তির ছাপ; অথচ চোখে-মুখে তীব্র এক কাঠিন্য ভাবগম্ভীর্য।বন্য আর শান্তর এক অদ্ভুত ভারসাম্য খেলা করছে তার অবয়বে।
​গাড়ি থেকে নেমেই কোটের পকেট থেকে একটি কালো মাস্ক বের করে চেহারার অর্ধেকটা ঢেকে নিল সে। এক সময়ের জনপ্রিয় মিউজিক ব্যান্ড ‘ব্লাডেন’ এর রকস্টার এবং বর্তমান সময়েও বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ‘ব্লাডেন’ এর স্বত্বাধিকারী হওয়ায় জনপ্রিয়তা আজও তার ছায়ার মতো পিছু নিয়ে বেড়ায়। কিন্তু ভিকে বরাবরই নিভৃতচারী, মানুষের ভিড় তার কাছে বিষাদতুল্য।

​হসপিটালের পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ তার নজর আটকে গেল একটি মার্সিডিস এস-ক্লাস কালো গাড়ির ওপর। গাড়িটির পরিচিত অবয়ব দেখে ভিকের সুগঠিত ভ্রু যুগল কিঞ্চিৎ কুঁচকে এল। পরিচিত কোনো ব্যক্তির বিষয়াদি তার মস্তিষ্কে কড়া নেড়ে গেল। পরক্ষণেই নিজেকে তটস্থ করে,নিরেট দৃষ্টি সোজা রেখে সে হসপিটালের ভেতরে প্রবেশ করল।
​লিফটে চেপে সরাসরি চারতলায় পৌঁছাল কেনীথ। করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় তার বুটের খটখট শব্দে নিস্তব্ধতা ভেঙে চারপাশ যেন প্রতিবার কেঁপে উঠছিল। নির্দিষ্ট কেবিনের সামনে এসে দাঁড়াল সে; নেমপ্লেটে লেখা— ‘ড. রেইনহার্ড রিচার্ড(RR), সিনিয়র নিউরোলজিস্ট’।
কেনীথ আলতো করে দরজায় নক করল।
​ভেতর থেকে গম্ভীর অথচ মার্জিত জার্মান কণ্ঠ ভেসে এল,
“হেয়ারাইন!” ( ভেতরে আসুন)।
​কেনীথ ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা গেল পঞ্চাশোর্ধ ডাক্তার সোনালী চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে আছেন। তার চোখেমুখে অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট। কেনীথকে দেখামাত্রই ড. রেইনহার্ডের চেহারায় সম্মানের এক আভা ফুটে উঠল। তিনি নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

কেনীথের মতো প্রভাবশালী এবং রহস্যময় ব্যক্তিত্বের সামনে এই বয়স্ক ডাক্তারও যেন কিছুটা বিনয়ী হয়ে পড়লেন।
ডক্টর মৃদু হেসে জার্মান ভাষায় বললেন,
“গুটেন মর্গেন, হের ভিকে! বিটে নেমেন জি প্লাৎস।”
(গুড মর্নিং,মিস্টার ভিকে! অনুগ্রহ করে বসুন।)
​কেনীথ মাস্কটা খুলল। তার সেই লালচে চোখের ক্লান্ত দৃষ্টি ডাক্তারের দিকে নিবদ্ধ করে শান্ত গলায় জবাব দিল,
“ডাঙ্কে, ডক্টর।”
(ধন্যবাদ ডাক্তার।)
​ডক্টর রেইনহার্ড বসতে বসতে বলল,
“ভি গেট এস ইনেন?আলস ওর্ডনুং?”
(কেমন আছেন আপনি? সব ঠিক আছে তো?)
কেনীথ জবাব দিল না। চুপচাপ কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। ডক্টর যেন তার ভাবমূর্তিতেই যা আন্দাজ করার তা করে নিল।
​নিমিষেই কেবিনের ভেতর এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করল। বাইরের তুষারপাতের শব্দ কাঁচের দেয়াল ভেদ করে ভেতরে আসতে পারছে না, কিন্তু ভেতরের পরিবেশটা বাইরের চেয়েও হিমশীতল।
ডক্টর রেইনহার্ড রিচার্ড তার চশমাটা ঠিক করে নিয়ে,আবারও কেনীথের দিকে তাকালেন। কেনীথ সোজা হয়ে বসে আছে, তার সেই লালচে মণির চোখ দুটোতে অদ্ভুত এক শূন্যতা।
​কেনীথ নীরবতা ভেঙে আচমকা প্রশ্ন করল,
“ডক্টর, ইমানি এসেছিল এখানে?”
​ডক্টর মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন। তার চোখের পলক স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত পড়ল। তিনি যেন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে আমতা-আমতা করে বললেন,

“আ… কোন ইমানি? আমি ঠিক চিনতে পারছি না।”
​কেনীথ কোনো উত্তর দিল না। সে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইল। তার সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে একবার পুরো কেবিনটা পরখ করে নিল। টেবিলের ওপর রাখা ফাইল, পাশের বুকশেলফ, এমনকি জানলার ভারী পর্দা— সবকিছুর ওপর দিয়ে তার চোখ ঘুরে এল।
দুজনের কথাবার্তাও চলল জার্মান ভাষায়; ইউরোপের এসকল দেশে ছোট হতে বড় সকল স্তরেই নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করাটা যেন একপ্রকার বাধ্যতামূলক।
এদিকে ভিকের এই নীরবতা ডক্টরের কাছে খানিকটা রূদ্ধশ্বাসকর। অদ্ভুত এক ক্ষীণ অস্থিরতা কাজ করছে তার মাঝে।অন্যদিকে কেনীথ আর কিছু না বলে, নিজের মূল আলোচনার প্রসঙ্গে ফিরে এল,
​”ডক্টর,মাথার পেছনের সেই যন্ত্রণাটা এবার অনেক বেশি বেড়েছে। ইনটেনসিটি (তীব্রতা) আগের চেয়ে অনেক গুণ বেশি। মাঝেমধ্যেই চোখের সামনের সবকিছু ঝাপসা মনে হয়; মস্তিষ্ক,ভাবনাচিন্তা… চারপাশটা একদম ব্ল্যাঙ্ক হয়ে যায়।”, কেনীথের কণ্ঠস্বর নিরেট, সে অকপটে নিজের কথা শেষ করল।
​ডক্টর চিন্তিত মুখে পেনটা নাড়াচাড়া করতে করতে বললেন,
“আপনাকে আমি বারবার বলেছি চিন্তামুক্ত থাকতে। আপনি কি ইদানীং কোনো বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত প্রেশার নিচ্ছেন? কোনো মানসিক উদ্বেগ?”
​কেনীথ কিছুক্ষণ মাথা নুইয়ে নিজের দুই হাতের শক্ত মুঠোর দিকে তাকিয়ে রইল। তার আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে আছে। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর শান্ত গলায় বলল,

“না, সেরকম কিছুই নেই।”
​পরক্ষণেই সে মাথা তুলে সরাসরি ডক্টরের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“এটার কি আদৌও কোনো পার্মানেন্ট সলিউশন আছে?”
​ডক্টর এবার কিছুটা দ্বিধা আর সংকোচ নিয়ে বললেন,
“দেখুন মিস্টার ভিকে, আমরা কয়েকবার সব ধরনের টেস্ট করিয়েছি। কিন্তু মেডিক্যাল-সাইন্সের ভাষায় সুনির্দিষ্ট কোনো বড় রোগ আমরা খুঁজে পাইনি। তবে আপনি চিন্তা করবেন না, আমরা বিশ্বের সেরা নিউরোলজিস্টদের সাথে মিটিং করে একটা সলিউশন বের করবই। আপনি দ্রুতই সুস্থ হয়ে উঠবেন।
তবে শর্ত একটাই—মাথায় একদম প্রেশার নিবেন না। সবসময় শান্ত থাকার চেষ্টা করবেন। নয়তো পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেলে যেকোনো মা”রাত্মক কিছু ঘটে যেতে পারে।”
​কেনীথ পুনরায় নিশ্চুপ হয়ে গেল। কেবিনের দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দটা এখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সে অত্যন্ত নিচু-নির্লিপ্ত স্বরে, প্রায় চাপা কন্ঠে শান্ত ভঙ্গিতে বলল,
“ডক্টর! আগেরবার আপনি বলেছিলেন আমার এই সমস্যার সঠিক সমাধান না পেলে, আমার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। সেক্ষেত্রে… আর কতদিন সময় আছে আমার হাতে?”
​কেনীথের কণ্ঠস্বর এতটাই শান্ত যে, মনে হচ্ছে সে কোনো সাধারণ আবহাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করছে। অথচ ডক্টর তার এই নির্লিপ্ত ভাবমূর্তি দেখে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। কেনীথ কি তবে সত্যিই নিজের মৃ”ত্যুকে খুব কাছ থেকে প্রত্যাশা করছে?
ডক্টর নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে তটস্থ হয়ে বললেন,
​”মিস্টার ভিকে! আপনি খামখা এসব চিন্তা করছেন। হ্যাঁ, আমি বলেছিলাম ওমন কিছু হওয়ার একটা ক্ষীণ আশঙ্কা আছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে সেটাই ঘটবে। আমরা বলছি তো, আমরা আপনার জন্য বেস্ট ট্রিটমেন্ট বের করব। আপনি শুধু নিজের ওপর ভরসা রাখুন।”
​কেনীথ আর কথা বাড়াল না। তার কথা ফুরিয়ে গেছে। সে হুট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ওভার-কোটের কলারটা ঠিক করতে করতে বলল,

“আজ তবে আসছি,ডক্টর!”
​ডক্টর রেইনহার্ড যেন আর কিছু বলার মতো শব্দ খুঁজে পেলেন না। কেনীথ ধীরপায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। দরজার হাতলে হাত রেখে সে হঠাৎ থেমে গেল। পেছনে ফিরে আবারও চাইল ডক্টরের দিকে।
​”ডক্টর! আমি যে আজ আপনার এখানে এসেছিলাম এটা যেন কেউ না জানে। এটা আমাদের মাঝেই সিক্রেট থাকুক। ইশ হফ্‌ফে, জি হাল্টেন ইয়ার ভর্ট(আশা করি,আপনি আমার কথা রাখবেন)।”
​ভিকের সেই রহস্যময় লালচে চোখের দিকে তাকিয়ে, ডক্টর ইতস্তত বোধ করলেও মাথা নেড়ে সায় দিলেন,
“জ্বী, অবশ্যই। আমি খেয়াল রাখব।”
​কেনীথ আর দাঁড়াল না। মাস্কটা মুখে টেনে দিয়ে সে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল; করিডোরের আলো-অন্ধকারে মিলিয়ে গেল অচিরেই। তবে চলে যাওয়ার পথে রেখে গেল কেবল একরাশ রহস্য আর অনিশ্চয়তা।

​কেনীথ কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতেই ঘরের এক কোণে থাকা বিশাল বুকশেলফের আড়াল থেকে খটখটে হিলের শব্দ ভেসে এল। ধীরপায়ে বেরিয়ে এল এক মোহময়ী নারী। তার দীর্ঘ তন্বী দেহাবয়বে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট।
পরনে ব্ল্যাক আর ডার্ক রেড কম্বিনেশনের একটি ওল্ড মানি আউটফিট, যার ওপর সযত্নে জড়ানো কালো রঙের একটি দামী ব্লাডেন টেক্সটাইলের লাক্সারিয়াস ট্রেঞ্চকোট। পায়ে YSL-এর শাইনি ব্ল্যাক হিল। লম্বা বাদামী সিল্কি চুলগুলো মাথার ওপরে নিখুঁতভাবে পনিটেইল করে বাঁধা।
মুখে হালকা মেকআপের ছোঁয়া থাকলেও সবার আগে নজর কাড়ে তার ঠোঁটে লেপ্টে থাকা ডার্ক রেড লিপস্টিকের গাঢ় প্রলেপ।​এই তীক্ষ্ণ সৌন্দর্য আর ব্যক্তিত্বই বলে দিচ্ছে, ইনি আর কেউ নন— ব্ল্যাডেন ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম স্তম্ভ এবং রেসিং সার্কিটের অপরাজেয় কুইন, নায়রা ইমানি।
​ইমানি তার তীক্ষ্ণ হ্যাজেল চোখের দৃষ্টি দরজার দিকে একবার স্থির করে নিল; যেন কেনীথের চলে যাওয়া পথের রেশটুকু মেপে নিল সে। পরক্ষণেই ঘুরে তাকাল ডক্টরের দিকে। অত্যন্ত সফিস্টিকেটেড ভঙ্গিতে নিজের হিলের সম্মুখ দিয়ে সামনের চেয়ারটার পা-য়া ঠেলে, সামান্য সরিয়ে নিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে পড়ল সে। তার প্রতিটি নড়চড়ে সর্বদাই এক ধরনের কমান্ডিং পাওয়ার কিংবা তীব্র আভিজাত্য,অ্যাটিটিউট বিদ্যমান।
​শুরুতে বেশ গাম্ভীর্য বজায় রেখে ইমানি কথা শুরু করল,
“সো ডক্টর, ভি-এর কন্ডিশন এখন ঠিক কোন পর্যায়ে? আপনি যা বললেন…ও কি সত্যিই পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাবে?”
কেনীথের সন্দেহ ভুল ছিল না। তার হসপিটালে পৌঁছানোর মিনিট দশেক আগেই ইমানি এখানে চলে এসেছে। অনেকদিন হতেই সে খোঁজ করছিল—কেনীথের মূল সমস্যাটা আদতে কোথায়। গত একবছরে বেশ পরিবর্তন দেখেছে সে। এর অবশ্য কারণও ছিল যথেষ্ট।

বছর খানেক আগে পাভেল আর কেনীথ যখন বাংলাদেশ থেকে জার্মানিতে ফিরে এলো; তাদের দেশে ঘটিয়ে আসা নানান কর্মকান্ড সম্পর্কে জানতে পারল—ইমানি পারল না কেবল দুটোকে ঝাড়ুপেটা করে বাড়ি ছাড়া করতে। প্রায় দুই-তিন মাস তাদের প্রতি তীব্র বির’ক্ত-ক্ষো’ভ নিয়ে সে একটানা কথা শুনিয়ে গিয়েছে। অথচ তার এতো ক্ষি”প্ততা পেছনে একটাই কারণ ছিল—কেনো তারা এমন অবোধের মতো কাজ করল? কেনো নিজেদের ঠিকমতো খেয়াল রাখল না।
সবশেষে নিজেকেই দোষারোপ করতে লাগল—কেনো সে কেনীথকে দেশে যাওয়ার জন্য রাজি করিয়ে ছিল। সবমিলিয়ে ক্ষি”প্ত রমণীর মেজাজ তখন হতেই তুঙ্গে। কিন্তু সেই ঘটনার পর হতে কেনীথের অসুস্থতা বেড়ে যাওয়াটাই ছিল তার জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা-উদ্বিগ্নতার কারণ। কেনীথের পুরোনো চোটে নতুন করে আঘাত লাগার ঘটনা শুনেই সে বুঝে গিয়েছিল,নিশ্চিত বড়কিছু গড়বড় হয়ে গিয়েছে। এছাড়া সময়ের সাথে সাথে কেনীথের অত্যধিক পরিমাণে নিশ্চুপ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি গম্ভীর্যের তীব্রতা—সবমিলিয়ে আজও সে কেনীথকে নিয়ে সর্বদা প্রচন্ড উদ্বিগ্ন।
কেনীথ শুরু হতেই নিজের বিষয়ে চাপা স্বভাবের বিধায়,শেষমেশ তাকে লোকজন দিয়ে একপ্রকার স্টক করেই সে আজ এইখানে পৌঁছাতে পেরেছে।

তবে বর্তমানে ডক্টরের সাথে কথোপকথন এগোতেই নায়রার সেই শক্ত খোলসটা যেন আলগা হতে শুরু করল। তার ললাটে ফুটে উঠল দুশ্চিন্তার সূক্ষ্ম ভাঁজ। ডক্টর এবার তার পেশাদারী মুখোশটা খুলে ফেলে লম্বা এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। বেশ চিন্তিত ভঙ্গিতে তিনি বললেন,
​”আই অ্যাম সরি মিস ইমানি! আপনার কথামতো আমি তাকে টেন্স-ফ্রি থাকতে বললেও বাস্তবতাটা কিন্তু অত্যন্ত জটিল। ওনার যে সমস্যা, সেটার যেমন আমরা এখন পর্যন্ত কোনো স্পেসিফিক ডায়াগনসিস করতে পারিনি, তেমনি ওনার শারীরিক অবস্থাও খুব একটা সুবিধাজনক নয়।
আঘাতটা বেশ পুরনো, সমস্যাটা ওনার শুরু থেকেই ছিল। কিন্তু বছরখানেক আগে মাথার পেছনের ঠিক একই স্থানে যে নতুন করে চোট লেগেছে, তাতে পরিস্থিতি আরও বিগড়ে গেছে। অথচ অদ্ভুত বিষয় হলো, ওনার প্রপার সমস্যাটাই আমরা চিহ্নিত করতে পারছি না।”
​ইমানি এবার রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। তার সেই আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে কিছুটা কম্পন দেখা দিল,
“বাট ডক্টর, এর তো একটা না একটা সলিউশন’ থাকার কথা! আপনারা পুরো ওয়ার্ল্ডওয়াইড ফেমাস, অথচ বলছেন কোনো সমাধান নেই? রোগ নেই অথচ কন্ডিশন ক্রিটিক্যাল— এটা কী করে সম্ভব?”
​ডক্টর চশমাটা টেবিলের ওপর রেখে ভারী গলায় বললেন,

“রোগ নেই বিষয়টা তেমন নয়। বরং রোগটা এখনো অনিশ্চিত। অনেকটা রেয়ার কেস বলা চলে। তবে এইটুকু নিশ্চিত যে, ভবিষ্যতে যদি উনি নতুন করে কোনো মানসিক চাপ নেন কিংবা আবারও ওই স্থানে কোনো আঘাত লাগে… আই হোপ ইউ আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট আই অ্যাম সেয়িং। তেমনটা হলে পরিস্থিতি পুরোপুরি আউট অফ কন্ট্রোল হয়ে যাবে।”
​ডক্টরের থমথমে মুখাবয়ব দেখে ইমানির কণ্ঠ দিয়ে কেবল অস্ফুট স্বরে দুটো শব্দ বেরিয়ে এল,
“ব্রেইন টিউমার… নাকি ব্রেইন ক্যান্সার?”
​ডক্টর নিশ্চুপ রইল। নিজের ভেতরের অসহায়ত্ব আর চেপে রাখতে পারল না ইমানি। সে আকুলভাবে ডক্টরের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ডক্টর! প্লিজ কিছু একটা করুন।”
​”দেখুন মিস ইমানি, আমরা আমাদের লেভেল থেকে সর্বচ্চ চেষ্টা করছি। কিন্তু বাকিটা উপরওয়ালার হাতে। আর ক্যান্সার বা টিউমারের প্রসঙ্গটা আসবে পরে; যদি কোনোভাবে আবারও ওই নির্দিষ্ট স্থানে আঘাত লাগে, তবেই তেমন কোনো সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
কিন্তু ওনার বর্তমান যা অবস্থা, সেটাও যথেষ্ট আশঙ্কাজনক। এই মুহূর্তে ওনার কোনোভাবেই এক্সট্রা স্ট্রেস নেওয়া চলবে না। খেয়াল রাখবেন উনি যেন সবসময় শান্ত থাকেন। দুশ্চিন্তা, উদ্বিগ্নতা… ওনার সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়াবে। আর তখন হয়তো…”
​ডক্টর কথাটি শেষ না করে মাঝপথে থামিয়ে দিলেন। ইমানি এক বুক ভারী শ্বাস ফেলে নিজের মুখ দুহাতে ঢেকে নিল। তার মতো শক্ত মনের মানুষের চোখেও আজ জল টলমল করছে। সে ধরা গলায় বলল,
​”কিছু একটা করুন ডক্টর! কিছু তো করুন। যত টাকা লাগবে আমি দেব, যত রকমের হেল্প লাগবে আমি করব। তবুও যেন ওর কিছু না হয়।”
​ইমানি নিজেকে কিছুটা সামলে নিতেই ডক্টর আশ্বাস দিয়ে আবারও বললেন,
“আপনি আপাতত ওনার দিকে খেয়াল রাখুন। বাকিটা আমরা দেখছি। ইউএসএ সহ আরও বেশ কিছু দেশের স্পেশাল নিউরোসার্জনদের সাথে আমাদের টিমের কথা হচ্ছে। খুব শীঘ্রই আমরা একটা বেস্ট সলিউশন বের করতে পারব বলে আশা করছি।”

​ইমানি কেবিন থেকে বেরিয়ে এলো। চোখে জল টলটল করলেও, সারা-গা অজানা এক তপ্ত রাগে রি-রি করছে। করিডোর ফাঁকা পেতেই সুসজ্জিত রমণী উম্মাদ হয়ে উঠল। হাতের YSL এর সাইড-পার্সটা সজোরে দেয়ালে আঁচড়ে ফেলতেই,ব্যাগের বেল্টখানা মূহুর্তে ছিঁড়ে গেল। সেই ছিঁড়ে বেল্টযুক্ত ব্যাগটাই সে নিজের দুহাতে আঁচড়ে, জুতো খানা দিয়ে সজোরে দেয়ালে আঘাত হানল। সকল চাপা রাগ যেন একবারেই উগড়ে বেরিয়ে আসছে।
“ইডিয়ট! নিজেও সহজে ম”রবে না,আমাদের শান্তিতে বাঁচতে দিবে না।”,চাপা স্বরে আওড়াল সে।
দ্রুততর নিজেকে শান্ত করার চেষ্টাও করল তৎক্ষনাৎ। আশেপাশের লোকজন তার এইরূপ আচরণ দেখে নিলে,তা মোটেও ভালোকিছু হবে না। ইমানি তার আঘাতপ্রাপ্ত বেঁকে যাওয়া হিলেই অকপটে হেঁটে যেতে লাগল লিফটের দিকে।
বদ্ধ লিফটের দরজাটা বন্ধ হতেই সে পুনরায় উগ্র রূপে ফিরে এলো। দুহাতে মাথা চেপে ধরে আওড়াল,
“কতবড় জা”নোয়ার হলে, এসব খবরও সিক্রেট রাখতে চায়! হারা*জাদা! একবারে মরে না কেন? তাহলে না শান্তি পেতাম।”

লিফটের দরজা খুলে যেতেই, ইমানি তৎক্ষনাৎ নিজেকে স্বাভাবিক করে ফেলল। যদিও কিছুক্ষণ আগের ইমানির চেয়ে বর্তমান ইমানির ভাবমূর্তি খানিক অদ্ভুত দেখাচ্ছে। কিন্তু সেসবে পরোয়া করার মতো মেয়ে সে নয়।
ইমানি ক্যাটওয়াক স্টাইলে জোরে জোরে অকপটে হেঁটে হসপিটাল থেকে বেরিয়ে পড়ল। নিজের কারে চড়ে তা স্টার্ট দেওয়া পূর্বে, দুহাতে শক্ত করে স্টিয়ারিংটা ধরে মাঝবরাবর মাথা ঠেকালো। এতক্ষণ রাগের মাথায় অনেককিছুই বলে ফেললেও,এখন সে সম্পূর্ণ শান্ত। শুধু ভেতরে এক তীব্র অস্থিরতা কাজ করছে।
ইমানি স্টিয়ারিংএ মুখ রেখেই জানালার বাইরে নজর ঘুরালো; ধূসর মিউনিখের তুষারপাতের দিকে স্তব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কেনীথের সাথে তার রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই; পাভেলের ক্ষেত্রেও তাই।কিন্তু নিজের ভাইয়ের উর্ধ্বেও যদি কোনো সম্পর্ক থেকে থাকে, তবে ইমানির জন্য তারা দুজন ঠিক তাই।
তারা তিনজন একে-অপরের সম্পূরক। একজনের কিছু হলে বাকি দুজনই যেন সম্পূর্ণ অচল। হ্যাঁ,ইমানি নারীজাত হয়েও অদ্ভুত এক কাঠিন্যের খোলসে মোড়ানো এক রমণী। তবে তার এই গুরুগম্ভীর্য ভাবমূর্তির পেছনের কারণটাই হলো তার অন্ধকার অতীত। যে অন্ধকার অতীত থেকে তাকে দেবদূতের ন্যায় উদ্ধার করেছিল পাভেল-কেনীথ। কৃতজ্ঞতা হোক কিংবা নির্ভরশীলতা—ইমানি কখনো তাদের থেকে আলাদা হতে চায়না।
ইমানি তুষারপাতের দিকে একমনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর, রাশভারী অসহায়ত্বের সাথে বলে ওঠে,
“গড! তুমি ভি-কে ঠিক করে দাও। পুরোপুরি সুস্থ করে দাও। ওর কিছু হয়ে গেলে, আমরা কেউ বাঁচব না।”

​বাইরে মিউনিখের আকাশ থেকে তুলোর মতো সাদা তুষার ঝরছে। জানালার কাঁচের ওপাশে এক ধূসর বিষণ্ণতা। জানালার পাশে বিছানায় আধশোয়া হয়ে আনমনা চোখে সেই দৃশ্য দেখছিল আনায়া। তার চোখে-মুখে একরাশ ক্লান্তি আর একাকীত্ব লেপ্টে আছে।
জার্মানিতে পা রেখেছে প্রায় এক সপ্তাহ হতে চলল, অথচ এই ঘর আর জানালার বাইরে তার পৃথিবীটা এখনো স্থবির। তার চঞ্চল বান্ধবী সাবা এর মধ্যেই পুরো শহর চষে ফেলেছে, কিন্তু আনায়ার মন যেন কিছুতেই এই নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারছে না।
মাথার মধ্যে একটাই চিন্তাভাবনা—আবার কবে দেশে ফিরবে, কিভাবে সেই কাঙ্ক্ষিত মানুষটার দেখা পাবে, কিভাবে তাকে নিজের মনের কথাগুলো বলবে। সে কিচ্ছু জানে না। উল্টো এদেশে কোন কুক্ষণে আসার পরিকল্পনা করেছিল—সেই আফসোসেই যেন আনায়া আধমরা। এখানে থেকে সে করবেই বা কি? সারাটাজীবন পড়াশোনার জন্য বাবার সাথে কত যুদ্ধ করল, তা মা অব্দি তার বাবার সাথে লড়ল, পড়াশোনার দোহাই দিয়ে বছরখানেক আগে নিজের বিয়েটাও ভাঙ্গল—অথচ আজ কোথায় গেল তার সেইসব বড়-বড় কথা?

সব বিগড়ে গিয়েছে। একটা মানুষ পুরোপুরি তাকে অসুস্থ করে ফেলেছে। যা হতে সে কোনো উপায়েই মুক্তি পাচ্ছে না।
কিন্তু তাকে তো সুস্থ হতে হবে;পুরোপুরি সুস্থ। যেখানে তার সুস্থতার একমাত্র কারিগর হতে পারে তার বড়আব্বুর একমাত্র সেই গুনধর ছেলে। কিন্তু তাকে সে পাবেই বা কোথায়?
আনায়া হতাশায় বালিশে মুখ গুঁজে দিল। পুনরায় মুখ তুলে তুষার ঝড়া প্রকৃতির দিকে চেয়ে বলল,
“খোদা! তোমার এতো বড় দুনিয়ায়, এতো মানুষ থাকতে আমার মাথাতেই কেন উনার ভুল চাপালে? এ-ভুত নামবে কিভাবে? কিছু তো করো, আর যে সহ্য হয়না আমার।”
​আনায়া পুনরায় ভারী শ্বাস ফেলল। ভার্সিটির ক্লাস শুরু হতে আরও দুদিন বাকি। এই অবসরে বিষণ্ণতা যখন তাকে পুরোপুরি গ্রাস করল, তখন সে আপনমনেই গুনগুন করে সুর ধরল,
“ভ্রমর কইয়ো গিয়া________

শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদে আমার অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে…”
​আনায়ার কণ্ঠের সেই করুণ সুর ঘরজুড়ে প্রতিধ্বনিত হওয়ার মাঝেই, হঠাৎ আনায়া নিজের সুর থামিয়ে দিল। পাশে ফিরে চমকে তাকাল সে। কিন্তু যাকে দেখল তাতে সে খুব বেশি অবাক হলো না। দিনে-দুপুরে যখন-তখন এই বড়-আব্বুর ফুত নামক ভুতটা তার ঘাড়ে চেপে বসে।
আনায়া নিজের পিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে থাকা, কাল্পনিক ভিভিয়ানের উদ্দেশ্যে হতাশায় নিমজ্জিত স্বরে বলল,
“এসেছেন? আর কত এভাবে? আমি অস্থির হয়ে উঠেছি, প্রচন্ড রাগও হয় আপনার প্রতি। আর কত কষ্ট দিবেন, এবার কিছু করুন। স্ব-শরীরে আমার সামনে আসুন। আমি আপনাকে ছুঁতে চাই, আপনাকে অনুভব করতে চাই…প্লিজ আমাকে বোঝার চেষ্টা করুন, মিস্টার ভিভিয়ান!”

আনায়া কাল্পনিক পুরুষ ভিভিয়ান সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। আনায়ার শান্ত মেজাজ হুট করেই খারাপ হলো। একপ্রকার তেড়ে ওঠার ভঙ্গিতে, ভিভিয়ানের টিশার্ট তথা বালিশের কভার দু’হাতে চেপে ধরল। চাপা স্বরে বলল,
“এ্যাই বড় আব্বুর ফুত! আপনি আমার কথা বুঝেন না? তাহলে কেনো করেন এসব? আপনার ভুতই কেন আমার মাথায় চড়েছে? কি চান আপনি? বলুন কি চান? আমায় পাগল বানাতে চান?
খুব তো বলেছিলেন আমি আপনার জন্য কাঁদব! কেঁদেছি তো, যে রাতে আপনি আমার কল্পনাতেও ধরা দেননি—সে রাতে আমি আপনার জন্য অজস্রে কেঁদেছি। এরপরও আপনার শান্তি হয়না? আপনি কি চান আমি কেঁদে কেঁদে আরেকটা মহাসাগর বানিয়ে ফেলি। তারপর ওখানে গিয়ে আপনাকে নিয়ে সংসার করব, বাচ্চাকাচ্চা যা হবে সব পানিতেই ডুবতে ডুবতে একেকটা জলপরি-জলপাঠা হয়ে যাবে!”
আনায়া থামতে না থামতেই, আবারও তীব্র বিরক্তির সাথে বলে ওঠে,
“ধূুর, কিসব বকছি আমি।”
আনায়া চোখ-মুখ খিঁচে ধরল। বালিশটা তৎক্ষনাৎ ছেড়ে দিয়ে চাপা স্বরে বলল,
“ম”রার দেশে এসেছি, এখানে আমি করবটা কি?”
আনায়ার এসকল বিড়বিড়ে আলাপের মাঝেই, ঘরে উৎসুক ভঙ্গিতে সাবা প্রবেশ করল। তার সাথে আরও এক রূপবতী তরুণী। মেয়েটির গায়ের রঙ দুধে-আলতা বর্ণের, তীক্ষ্ণ নাক আর গভীর বাদামী চোখ—যা দেখে অনায়াসেই বলে দেওয়া যায় সে এক পাকিস্তানি।
নাম তার ‘দুর-এ-আইজেল’ কিংবা ‘দুরে-আইজেল’; যার অর্থ এক অমূল্য ও স্বর্গীয় রত্ন। দুরে এই অ্যাপার্টমেন্টেরই অন্য একটি রুমে থাকে। সে সাবার মতো অতটা চঞ্চল বা রুক্ষ নয়, বরং তার ব্যক্তিত্বে এক ধরনের স্নিগ্ধ আভিজাত্য আছে। আনায়ার ওকে প্রথম দেখাতেই বেশ পছন্দ হয়ে গিয়েছিল। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, দুরে আনায়ারই ডিপার্টমেন্টের এবং মাতৃসুত্রে বাংলাদেশি হওয়ায় সে বেশ চমৎকার বাংলা বলতে পারে।
​সাবা উত্তেজনায় এপ্রকার ঝাঁপিয়ে আনায়ার পাশে এসে বসল।

“আনায়া! তুই কি এভাবে সারাদিন মরার মতো পড়ে থাকবি? একটা বিরাট খবর আছে! ব্লা’ডেন ব্যান্ড নাকি আবারও কনসার্ট করতে যাচ্ছে!”
​আনায়া ভ্রু কুঁচকে সাবার দিকে তাকাল। তার কাছে এই নামটা একদমই অচেনা। সে অবাক হয়ে জানতে চাইল,
“ব্লাডেন ব্যান্ড আবার কী? কোনো গানের দল?”
​দুরে এবার এগিয়ে এল। সে আনায়ার অবাক হওয়া দেখে মৃদু হেসে বলল,
“আরে আনায়া! তুমি ব্লাডেন চেনো না? ওরা তো শুধু জার্মানি নয়, পুরো ইউরোপ জুড়ে ফেমাস। বিশেষ করে ওদের লিড, ভিকে…উফফফ!”
​আনায়া এবার আরও বেশি বিভ্রান্ত। সে হাবলার মতো চেয়ে থেকে আবারও জিজ্ঞেস করল,
“এখন আবার এই ভিকে-টা কি?”
​সাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ব্যাঙ্গাত্মক সুরে বলল,
“তোর দ্বারা কিচ্ছু হবে না! তুই কি আসলেও দুনিয়ার কোনো খোঁজখবর রাখিস? নাকি মঙ্গল গ্রহ থেকে এসেছিস?”
​দুরে সাবার কথায় কান না দিয়ে আনায়াকে বুঝিয়ে বলতে শুরু করল,
“ভিকে মানে হচ্ছে ভ্যাম্পায়ার কেনীথ। ওই যে ব্লা’ডেন মিউজিক ব্যান্ড আছে না? ভিকে ইজ দ্য ওজি অব ব্লাডেন। আর বর্তমানেও জার্মানির টপ ইন্ডাস্ট্রি ব্লাডেন…ওটাও ওনাদেরই। মূলত ওরা একটা ট্রিও। ভিকে, ইমানি ম্যাম আর মিস্টার হান্স মিলে তাদের পুরো সাম্রাজ্য চালায়।

মহামায়া পর্ব ৩১

আর তুমি জানো আনায়া, আমার গার্ল ক্রাশ কে? ইমানি ম্যাম! উনি যে কী পরিমাণ জোস, বলে বোঝাতে পারব না। ওনার লুক, ওনার অ্যাটিটিউড— উফ! জাস্ট মারাত্মক!”
​আনায়া এতক্ষণ মুখ হাঁ করে ওদের রূপকথার মতো গল্পগুলো শুনছিল। সবকিছু তার মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে। তবে একটা নামে তার খটকা লাগল। সে বেশ বোকা বোকা চেহারা করে জিজ্ঞেস করে বসল,
​”তোমরা কি আমায় কোনো ফ্যান্টাসি স্টোরি শোনাচ্ছো? না মানে… ওই যে কী যেন নাম বললে, কেথী…আ সরি, কেনীথ… ভ্যাম্পায়ার কেনীথ! উনি কি কোনো মানুষ নাকি অন্য কিছু? বাস্তবে তো ভ্যাম্পায়ার বলে কিছু হয় না, তবে ওনার নাম এমন কেন? মানুষ কি সত্যিই এমন নাম রাখে?”
​আনায়ার এই প্রশ্ন শুনে সাবা আর দুরে একে অপরের দিকে তাকিয়ে হোহো করে হেসে উঠল। যেন আনায়া এই যুগের সবচেয়ে বড় রসিকতাটি করেছে।

মহামায়া পর্ব ৩৩